Home » , , , » জনসংখ্যা রফতানি ও বাংলাদেশ by গাউসুর রহমান

জনসংখ্যা রফতানি ও বাংলাদেশ by গাউসুর রহমান

Written By Unknown on Tuesday, January 4, 2011 | 3:37 AM

নসংখ্যা রফতানি আমাদের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জনসংখ্যা সমস্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তরিত করার ক্ষেত্রেও জনসংখ্যা রফতানির অভাবনীয় অবদান রয়েছে। মানবসম্পদ উন্নয়নে জনসংখ্যা রফতানি অন্যতম 'পাওয়ার হাউস' হিসাবে বিবেচিত। কিন্তু জনসংখ্যা রফতানি বাড়ার বদলে দিনে দিনে কমছে।
রফতানি বৃদ্ধিতে আমাদের প্রয়োজনীয় উদ্যোগেরও অভাব রয়েছে। এ ব্যাপারে জোর প্রচেষ্টা চালানোর কোন ভূমিকা নেই। চলতি বছরে বিদেশে জনসংখ্যা রফতানির লক্ষ্যমাত্রা ৭৫ হাজার কমেছে বলে সংবাদপত্রে খবর প্রকাশিত হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে জাতীয় সংসদেও আলোচনা করা হয়েছে।

গত বছর বিশ্বমন্দা সত্ত্বেও জনশক্তি রফতানি হয়েছে আমাদের দেশ থেকে ৪ লাখ ৭৫ হাজার, এবার সেখানে বিশ্বমন্দা কাটিয়ে ওঠা সত্ত্বেও জনসংখ্যা রফতানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ লাখ। জনসংখ্যা রফতানির হ্রাসের এ প্রক্রিয়ার পিছনে কি রহস্য কাজ করছে, তা আমাদের জানা নেই। জনসংখ্যা রফতানি কমে আসলে তা আমাদের অর্থনীতিতে বিরূপ-প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে। জাতীয় অর্থনীতিতে এ অনাকাঙ্ক্ষিত চাপ আমাদের অর্থনীতির জন্যে দুঃসংবাদ। গত ১০ মাসে জনসংখ্যা রফতানি কমেছে প্রায় ২০ ভাগ। বিদেশ থেকে গত ১০ মাসে অর্ধ লাখেরও বেশি কর্মী দেশে ফিরে এসেছে।

আমাদের অর্থনৈতিক গতিশীলতার ক্ষেত্রে রেমিটেন্স গুরুত্বপূর্ণ নিউক্লিয়াস হিসাবে কাজ করে। রেমিটেন্স আমাদের মোট অভ্যন্তরীণ আয় বা জিডিপির ৩০ ভাগ। জাতীয় অর্থনীতির তাই অন্যতম চালিকাশক্তি এই রেমিটেন্স। জনসংখ্যা রফতানি কমলে রেমিটেন্সও কমে আসবে। রেমিটেন্স প্রবাহ বাড়ানোর ক্ষেত্রে জনসংখ্যা রফতানি বৃদ্ধির কোন বিকল্প নেই। আর তাই রেমিটেন্স প্রবাহ বাড়ানোর প্রয়োজনে জনশক্তি রফতানির বর্ধিত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ ও লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হবে। এমতাবস্থায় প্রবাসীদের তিন বন্ডে সুদের হার বাড়ানোর সরকারের চিন্তাকে আমরা স্বাগত জানাই। সাম্প্রতিককালে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স প্রবাহ কমে যাওয়ায় এবং হুন্ডি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় সরকার এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে চাইছে। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে সরকারকে বিষয়টি গভীরভাবে ভেবে দেখতে হবে। তিনটি বন্ডের সুদের হার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিলে এবং বন্ডে ফের বিনিয়োগ সুবিধা দিলে আমাদের অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক না নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে- সেটিও নতুন করে ভেবে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। ২০০৯ সালে দেশে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সের পরিমাণ ছিল ১০ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলার, যা বিগত সময়ের চেয়ে বেশি। আগেই বলা হয়েছে যে, দেশের রেমিটেন্স মোট জিডিপি'র ২০ ভাগ। বৈদেশিক বিনিয়োগের ১৮ গুণ ও বৈদেশিক সাহায্যের ১৯ গুণ বেশি। কিন্তু রহস্যজনক কারণে রেমিটেন্সের এই উচ্চ প্রবৃদ্ধি চলতি অর্থবছরে এসে কমে যায়। ১ জুলাই থেকে ওয়েজ আনার্স বন্ড, ইউএস ডলার বন্ড ও ইউএস প্রিমিয়ার বন্ডে পুনরায় বিনিয়োগের সুযোগ বাতিল করে উলেস্নখিত বন্ডসমূহের সুদের হার ১২ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে ১০ শতাংশ করার কারণেই রেমিটেন্স কমেছে বলে সংশিস্নষ্ট ক্ষেত্রের অভিজ্ঞদের কেউ কেউ মনে কেরন।

সরকারের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে রেমিটেন্স প্রবাহ কমেছে বলে কারো কারো ধারণা। তারা মনে করেন-এর ফলে কেবল রেমিটেন্স প্রবাহই কমেনি; বরং ইউএস ডলার বন্ড, ওয়েজ আনার্স বন্ড, ইউএস প্রিমিয়ার বন্ডে বিনিয়োগের হার ১১ শতাংশ কমে গেছে। প্রবাসীরা দেশে এই তিনটি বন্ডে বিনিয়োগ করা রেমিটেন্স তুলে নিয়ে নিজ নিজ কর্মস্থলে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন বলেও সংবাদপত্রে খবর প্রকাশিত হয়েছে। বাস্তবতা যা-ই হোক না কেন- সরকারকে মনে রাখতে হবে যে, আমাদের অর্থনীতির জন্যে সহায়ক রেমিটেন্স আয়ের খাতটি যেন প্রবাসীদের মধ্যে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি না করে। প্রবাসীদের সঞ্চয়ী বন্ডে যেন নেতিবাচক চিত্র তৈরি না হয়; সেদিকে সরকারকে বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে।

আমাদের দেশে জনসংখ্যা এখনও বড় জাতীয় সমস্যা। এই সমস্যাকে সমাধান করতে এবং জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তরিত করার ক্ষেত্রে দক্ষ, আধা দক্ষ, অদক্ষ শ্রমিক, ওয়েজ আর্নাররা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে সরকারকে কার্যকরি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে জনসংখ্যা রফতানির জন্যে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে। কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তির সংখ্যা বাড়াতে পারলে আমরা জনসংখ্যা রফতানি স্বাভাবিকভাবেই বাড়াতে পারবো। বিদেশে শ্রমবাজার সৃষ্টিতে আমাদের সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

মানব উন্নয়ন সূচকে আমরা যদি অগ্রগতি সাধন করতে চাই, তাহলেও আমাদের জনসংখ্যা রফতানি বাড়াতে হবে। এটি করতে পারলে অনিবার্যভাবেই রেমিটেন্স প্রবাহ বাড়বে। রেমিটেন্সের অর্থ দেশে যাতে যথাযথভাবে বিনিয়োগ করা যায়, সেদিকেও বিশেষভাবে নজর দিতে হবে। বিদেশে বেশি বেশি দক্ষ জনশক্তি রফতানি করা ছাড়া মানব উন্নয়ন সূচকের অগ্রগতি সাধন সম্ভব নয়। এজন্যে বিদেশে যেতে ইচ্ছুক জনগোষ্ঠীকে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জনশক্তিতে রূপান্তরিত করে সেই জনশক্তিকে বিদেশে রফতানি করা সম্ভব হলে রেমিটেন্স প্রবাহ যেমন বাড়বে, তেমনি অগ্রগতি সাধন হবে মানব উন্নয়ন সূচকে।

জনসংখ্যা রফতানি কিভাবে বাড়ানো যায়, বৈদেশিক কমংস্থান মন্ত্রণালয়কে নতুন করে ভাবতে হবে এবং যুগোপযোগী পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, নার্স, মেকানিক্সসহ কারিগরি শিক্ষাপ্রাপ্ত ও কারিগরি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনশক্তিকে কিভাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বেশি বেশি হারে রফতানি করা যায়, সেভাবে সংশিস্নষ্ট কর্তৃপক্ষকে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। আমরা যদি বিদেশে জনসংখ্যা রফতানি বৃদ্ধি করতে না পারি, তাহলে জনসংখ্যা সমস্যার বিরূপ প্রভাব পড়বে আমাদের অর্থনীতিসহ জাতীয় জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে।

আমাদের দেশে কৃষি জমি দিনে দিনে কমছে। অথচ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে জনসংখ্যা। বাড়ছে অভাব-অনটন। এমতাবস্থায় জনসংখ্যা রফতানি, দক্ষ জনসংখ্যা রফতানি অমিত সম্ভাবনা ও কল্যাণ বয়ে আনতে পারে। আমাদের অর্থনীতির বুনিয়াদ মজবুত করার ক্ষেত্রে এই জনসংখ্যা রফতানি নিশ্চিত বিনিয়োগ হিসাবে বিবেচিত। শুধু নিশ্চিত বিনিয়োগ নয়, নিরাপদ বিনিয়োগ হিসাবেও জনসংখ্যা রফতানিকে বিবেচনা করা যায়। রমিটেন্স প্রবাহ বাড়ানোর ক্ষেত্রে জনসংখ্যা রফতানির যেমন প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে, তেমনি বিদেশে কর্মরত জনশক্তির পারিশ্রমিক যাতে কাজ ও দক্ষতা অনুযয়ী নির্ধারিত হয়, সেজন্যেও সরকারকে উদ্যোগী ভূমিকা রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, জনসংখ্যা রফতানি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সরকার যদি কূটনীতিক তৎপরতা বৃদ্ধি করে, তাহলে জনসংখ্যা রফতানির সুফল ও রেমিটেন্স প্রবাহ আমাদের অর্থনীতির ইতিবাচক খাতের সঙ্গে একই ধারায় প্রবাহিত হবে।

0 comments:

Post a Comment

 
Support : Dhumketo ধূমকেতু | NewsCtg.Com | KUTUBDIA @ কুতুবদিয়া | eBlog
Copyright © 2013. News 2 Blog 24 - All Rights Reserved
Template Created by Nejam Kutubi Published by Darianagar Publications
Proudly powered by Dhumketo ধূমকেতু