সমকালীন অনুরণন by নন্দিনী মুখার্জি

Tuesday, August 16, 2011

বাংলা বছরের শুরুতে আমাদের লোকশিল্প নিয়ে বিবিধ আয়োজনের সমাগমে সারা দেশ যেন হয়ে ওঠে লোকজ শিল্পের হাট। ঢাকায় দুটি প্রদর্শনীর আয়োজন ছিল ভিন্নধর্মী। একটি সরাচিত্র এবং অপরটি শখের হাঁড়ি নিয়ে। এমন আয়োজন নাগরিক জীবনে এক ব্যতিক্রমী ভাবনাকে সজাগ করে তুলেছে।
ঢাকা আর্ট সেন্টার, ধানমন্ডিতে শেষ হলো শিল্পী সুকুমার পালের ‘ফিরে চল মাটির টানে’ শিরোনামে সরাচিত্র প্রদর্শনী। বাংলা নববর্ষকে বরণ করে নেওয়ার এক ব্যতিক্রমী প্রয়াস ছিল এখানে। শুধু প্রদর্শনী নয়, এর পাশাপাশি একটি কর্মশালার আয়োজনও করা হয়েছিল। তরুণ শিল্পীদের অংশগ্রহণে শিল্পী সুকুমার পাল এই কর্মশালায় সরাচিত্র অঙ্কন ও সমকালীন চিত্রকলার সঙ্গে আমাদের লোকশিল্পের যোগসূত্র তৈরির চেষ্টা করেছেন। তিনি মনে করেন, দেশজ শিল্পের শক্তি অনুভব না করলে কাজে যথার্থতা খুঁজে পাওয়া যায় না।
এ দেশে ধর্মীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে কিছু সরাচিত্র চোখে পড়লেও ঐতিহ্যবাহী সরাচিত্র এখন বিলুপ্তির পথে। তিনি মূলধারার শিল্পকলার সঙ্গে একাত্ম না হয়ে দেশীয় ঐতিহ্যবাহী অথচ অবহেলিত শিল্প নিয়ে নিরলস কাজ করে চলেছেন। ‘বিস্তৃত মুখ ঈষৎ গভীর মৃৎপাত্র’কে বাঙালিরা সরা বলে। সাধারণত হাঁড়ি বা কলসি ঢাকার পাত্র হিসেবেই ব্যবহূত হয় সরা। আকৃতি ও ব্যবহারের ভিন্নতায় সরার নানা নামকরণ দেখা যায়; ঢাকনাসরা, এয়োসরা, ফুলসরা, ধূপসরা, আমসরা, লক্ষ্মীসরা প্রভৃতি। সরা বিভিন্ন ধর্মীয় ও পালা-পার্বণে ব্যবহূত হয়। হিন্দুসম্প্রদায়ের বিয়ে এবং মুসলমানদের গাজি বা মহররমের ছবি সরাতে অঙ্কিত হয়।
শিল্পী সুকুমার পাল ঐতিহ্যবাহী সরাচিত্র থেকে রং-রেখা ছাড়াও গোলাকৃতির পটভূমিকেও গ্রহণ করেছেন। তিনি চারুকলা অনুষদ থেকে লেখাপড়া শেষ করে সংস্কৃতির এই শিকড়ে ফিরে গেছেন।
গ্যালারি জলরঙ—এটি একটি অনলাইন গ্যালারি হিসেবে পরিচিত ছিল এত দিন। এখন বনানীতে ছোট পরিসরে অন্যান্য গ্যালারির মতো শুরু হয়েছে তাদের নতুন যাত্রা। সম্প্রতি এই গ্যালারিতে শুরু হয়েছে লোকশিল্পী সুশান্ত পালের একক চিত্র প্রদর্শনী।
সুশান্ত পাল শৈশব থেকেই শখের হাঁড়ির সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠেন। তাঁর রয়েছে বংশানুক্রমিক দক্ষতা। স্বভাবতই ঐতিহ্যবাহী নকশা ব্যবহার করেন সুশান্ত পাল। শখের হাঁড়ির পাশাপাশি ২০০৯ সাল থেকে তিনি কাগজে পেইন্টিং শুরু করেন।
বাংলাদেশের বর্তমান জীবনধারায় মাটির পাত্রের ব্যবহার সীমিত। তাই পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে ক্যানভাস বা কাগজে সুশান্ত পাল আঁকতে শুরু করেছেন। তবে লক্ষ করলে দেখা যায়, রং, রেখা, বিন্যাস, নকশার প্রবণতা মাটির পাত্রের মতোই। এমনকি প্যানেলও শখের হাঁড়ির মতো। তাই বলা যায়, হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী শখের হাঁড়ির রং, রেখা, নকশার এ এক নতুন পদ্ধতি। তাঁর আঁকা সব পেইন্টিংই ট্র্যাডিশনাল মোটিফের পুনরাবৃত্তি নয়। তাঁর কিছু কিছু পেইন্টিং ট্র্যাডিশনাল পেইন্টিং থেকে সম্পূর্ণরূপে আলাদা। শুধু তা-ই নয়, তাঁর চিত্রমালা পটুয়া, মালাকার বা আচার্যদের মতো নয়। বাংলাদেশের ভিজুয়াল আর্টে এ এক নতুন মাত্রা তৈরি করেছে। সুশান্ত পালের চিত্রকলাকে ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা বা রূপান্তর-প্রক্রিয়া বলা যায়। এই প্রদর্শনী আমাদের শিল্প-ঐতিহ্যে স্থান করে নিতে পারবে বলে আশাবাদী হওয়া যায়। ২২ এপ্রিল প্রদর্শনী শেষ হবে।

চারুকলা- রূপকথার দেশে by শাশ্বতী মজুমদার

শিশু ও কিশোরদের জীবনের একটি বড় অংশ হলো তার কল্পনার জগৎ। সেখানে মায়ের বকুনি নেই, শিক্ষকের হোমওয়ার্ক নেই। কল্পনার জগতে কখনো তারা আকাশে মেঘের সঙ্গে খেলা করে আবার পানিতে জলকন্যার সঙ্গে গপ্প জুড়ে দেয়। তাদের এই কল্পনার জগৎ আরও জীবন্ত হয়ে ওঠে যখন তাদের রঙিন ছবি থাকে বইয়ের পাতায়।
বাচ্চাদের ছবিওয়ালা এই ছড়া বা গল্পের বইগুলো হলো দৃশ্যগত এবং টেক্সচুয়াল বয়ান। বাচ্চাদের কল্পনার জগৎকে এই বইগুলো ধারণ করে এবং তাদের সাহিত্যের স্বাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। জার্মানিতে বাচ্চাদের এই বুক ইলাস্ট্রেশন ব্যাপক জনপ্রিয়। সম্প্রতি জার্মানির বিখ্যাত ইলাস্ট্রেটর য়ুলিয়া কার্গেল ঢাকায় এসেছেন। তিনি বাংলাদেশের শিল্পীদের নিয়ে বুক ইলাস্ট্রেশনের ওপর একটি কর্মশালার আয়োজন করেছেন।
বাচ্চাদের বুক ইলাস্ট্রেশন খুব সহজ নয়। ছবিগুলো সাধারণত গল্প বা ছড়া অনুযায়ী আঁকতে হয়। শিশুদের জন্য ছবিগুলোকে অবশ্যই হতে হবে সরল, সহজবোধ্য—সেই সঙ্গে তাদের মনোযোগ ধরে রাখার মতো আকর্ষণীয়। য়ুলিয়া কার্গেল তাঁর কর্মশালায় সমকালীন বুক ইলাস্ট্রেশনের ধারা ও নতুনত্বের দিকে গুরুত্ব দেন। শিল্পীরা একটি নির্দিষ্ট বিষয় বা গল্পকে ভিত্তি করে ছবি আঁকেন। এই কর্মশালা আট দিন চলে। পরে ১৩ এপ্রিল এই শিল্পকর্মগুলো নিয়ে একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয় জার্মান কালচারাল সেন্টারে।
প্রদর্শনীর নাম রাখা হয়েছে ‘দ্য ওয়ার্ল্ড ইন ফোর কালারস’। শিল্পীরা তাঁদের বিষয় অনুসারে ছবির মাধ্যমে গল্প বলার চেষ্টা করেছেন। এ জন্য শিল্পীরা এক বা একাধিক ছবি এঁকেছেন। ছবিগুলোতে ঘটনা অনুসারে ১, ২ ও ৩ করে নম্বর দিয়ে সাজানো। তাই ছবিগুলো দেখলেই গল্পগুলো আন্দাজ করা যায়। যেমন, ‘মমস ড্রিম’ ছবিটি শিল্পী সৈয়দা তাহলিমা হকের। ছবিতে ছোট্ট মম ও তার পুষি সকালে ঘুম থেকে উঠতে চায় না, কিন্তু মায়ের ডাকে উঠতে হয়। ঢুলুঢুলু চোখে তারা বাথরুমে গিয়ে ব্রাশ করে। একসময় তারা বাবল তৈরি করে। এরপর এক প্রজাতির পেছনে দৌড়াতে দৌড়াতে মম ও তার পুষি বিড়াল এসে পৌঁছায় আজব বাগানে। মম আবিষ্কার করে, তারও প্রজাপতির মতো ডানা আছে, সে উড়তে থাকে। মেঘেদের সঙ্গে খেলা করে, সূর্যও তাদের দেখে হাসে। ছাদের ওপর মমর বন্ধুরা তার দিকে তাকিয়ে থাকে, তাকে ডাকে। এবার মম তার বাড়িতে ফিরতে চায়। এ সময় মমর ঘুম ভেঙে যায়।
শিল্পী আবদুল্লাহ আল বসিরের ‘চিলড্রেনস ডে আউট’ ছবিতে দেখা যায়, বাচ্চারা ঘরে বসে ছবি আঁকছে। একসময় তাদের আঁকা পশু-পাখিগুলো ক্যানভাস থেকে বেরিয়ে আসছে, তাদের সঙ্গে খেলা করছে।
শিল্পী মানবেন্দ্র ঘোষ এঁকেছেন ‘ওয়ানস আপন এ টাইম দেয়ার ওয়াজ এ হেন’। রঙের ব্যবহার ও শক্তিশালী ড্রইংয়ের মাধ্যমে তিনি মুরগির গল্প উপস্থাপন করেছেন।
‘কোয়াক ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ: ব্যাঙের ডাক’ ছবিটি এঁকেছেন শিল্পী এলিজাবেথ এ ফাহরি মনসুর। শিল্পী ছবিতে কাগজ কেটে কেটে বিভিন্ন পশু-পাখির ফর্ম তৈরি করে ক্যানভাসে কম্পোজ করেছেন।

ছায়ানৃত্য by দ্রাবিড় সৈকত

চিত্রশিল্পের ভাষা বৈশ্বিক হওয়ার পরও থাকে কিছু স্থানীয় বৈশিষ্ট্য, সমসাময়িকতার গন্ধ ও শিল্পীমানসের ব্যক্তিক অনুভূতি। শিল্পী সিলভিয়া নাজনীনের চলমান একক প্রদর্শনী এমনই এক আয়োজন; ধানমন্ডির ক্যাফে ম্যাংগোতে চলছে।

প্রথাগত গ্যালারিতে ছবি দেখা দর্শক প্রথমে কিছুটা হোঁচট খেতে পারেন; পেইন্টিং দেখতে গিয়ে হয়তো দেখা যাবে, ছবিটির ঠিক নিচে দুজন কফি খাচ্ছেন কিংবা একান্ত আলাপচারিতায় মগ্ন। গ্যালারিতে চিত্রপ্রদর্শনী দেখা থেকে একটু আলাদা প্রস্তুতি নিতে হবে এই প্রদর্শনীতে। ‘ছায়া নৃত্য’ শিরোনামে শিল্পী সিলভিয়া নাজনীনের এই প্রদর্শনীতে উপস্থাপিত হয়েছে বিবিধ বৈচিত্র্যপূর্ণ বিষয়ের পঁচিশটি শিল্পকর্ম। বিষয়বস্তু, বিন্যাস, রং ও উপস্থাপনের ভিন্নতায় এই প্রদর্শনী তারুণ্যের গতিময়তায় উচ্চকিত। ‘ড্যান্সিং উইথ শ্যাডো’ শিরোনামের একটি শিল্পকর্মে দেখা যায় বর্তমান নারীর একাকিত্ব ও মগ্নতার পশ্চাৎপটে একটি বিশাল কাকের অশুভ প্রতিকৃতি। মিশ্র মাধ্যমে সম্পন্ন করা এই শিল্পকর্মটি বর্তমান নারীসমাজের প্রতিকূল বাস্তবতার প্রতীকী উপস্থাপন। এ ছাড়া ‘আই হ্যাড ড্রিম’, ‘ম্যালাঙ্কলি মিউজিক’, ‘মুড’ শিরোনামের পেইন্টিংগুলো দর্শকমানসে ছড়িয়ে দেয় এক অদ্ভুত বিষণ্নতা। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারী যেন এক ভিনদেশি পাখি। কখনো তার সৌন্দর্যের বন্দনা, কখনো বৃক্ষ হয়ে যাওয়া, কখনো বা নৌকা হয়ে জল ছেড়ে কল্পিত ডানায় অন্তরিক্ষে উড়ে যাওয়ার চিত্রকল্পে রুক্ষ বাস্তবতাই প্রতিধ্বনিত হয় সিলভিয়ার অধিকাংশ শিল্পকর্মে। সৌন্দর্য উপাসনার ছন্দায়িত রং-রেখায় সময়ের কর্কশ আঁচড় আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এই সমাজ পুরোপুরি মানবিক নয়, এখানে বৈষম্যের খড়্গ ধারালো হয় প্রতিনিয়ত, সমাজের সুবিধাভোগী অংশ যা মানতে প্রস্তুত নয়।

মণিপুরি তাঁত শিল্প কি হারিয়েই যাবে?

Sunday, July 3, 2011

সিলেট বলতেই যে দুই-তিনটি বিষয় সবার আগে চোখের সামনে ভেসে ওঠে, তার অন্যতম মণিপুরি তাঁত শিল্প। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশে এর চাহিদা ও খ্যাতি ছড়িয়েছে অনেক আগেই। কিন্তু বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত ঐতিহ্যবাহী মণিপুরি তাঁত শিল্প সময়ের ব্যবধানে আজ বিলুপ্তির পথে। প্রয়োজনীয় মূলধন, প্রশিক্ষণ আর সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় হারিয়ে যেতে বসেছে এই শিল্প। অথচ প্রতিকূলতা কাটাতে পারলে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী মণিপুরি তাঁত শিল্প হতে পারত বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম মাধ্যম।
বৃহত্তর সিলেটের মৌলভীবাজার ও সিলেট জেলায় মূলত অধিকাংশ মণিপুরি বসবাস করে। সিলেট নগরীর মাছিমপুর, লালদীঘিরপাড়, লামাবাজার, জল্লারপাড়, রাজবাড়ি, মির্জাজাঙ্গাল, বাগবাড়ি, সাগরদীঘিরপাড়, সুবিদবাজার, মিরের ময়দান, আম্বরখানা, কুশিঘাট, গোয়াইপাড়া, খাদিমনগর, গঙ্গানগর এলাকায় মণিপুরি সম্প্রদায়ের বসবাস। মণিপুরি পরিবারের মহিলারা তাঁতে কাপড় বোনার ব্যাপারে স্বশিক্ষিত এবং তারাই মূলত এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত। তাদের নিপুণ হাতে তৈরি বৈচিত্র্যময় নকশাখচিত মনিপুরি বস্ত্র দেশের পাশাপাশি বিদেশেও সমাদৃত। পর্যটকরা সিলেটে এলে তাই খোঁজ করে মণিপুরি তাঁতবস্ত্রের। ২০০৪ সালে জার্মানি ও ইতালিতে এবং ২০০৭ সালে দুবাই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় মনিপুরি তাঁতবস্ত্র ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছিল। এর আগে ১৯৭৮ সালে প্রথমবারের মতো ঢাকার বস্ত্র মেলায় মণিপুরি তাঁতের স্টল দেওয়া হয়েছিল। ওই মেলায় মণিপুরি তাঁতবস্ত্র সম্মানসূচক পুরস্কার অর্জন করে। প্রতিবছর ব্যক্তি উদ্যোগে প্রচুর মনিপুরি বস্ত্র বিদেশে গেলেও যথাযথ পদক্ষেপ না থাকায় এখনো সরাসরি বিদেশে বাজারজাত করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি এ পণ্যের।
সাধারণত মণিপুরী মহিলারা নিজেদের পরিবারের ব্যবহারের পোশাক কোমর তাঁতে নিজেরাই তৈরি করে। পাশাপাশি ঘরে উৎপাদিত বাড়তি কাপড়গুলো তারা বিক্রি করে। এই কাপড় নিয়ে নগরীর কিছু এলাকায় কেবল মণিপুরি বস্ত্রের দোকান গড়ে উঠেছে। লামাবাজার, জিন্দাবাজার, শাহজালাল (রহ.) দরগাগেট, সুবিদবাজার, খাদিমনগর এলাকায় বেশ কিছু মণিপুরি কাপড়ের দোকান রয়েছে। এসব দোকানে মণিপুরিদের তৈরি শাড়ি, চাদর, বিছানার চাদর, গামছা, মাফলার, ওড়না, থ্রিপিস, ব্যাগ, টেবিল ক্লথ পাওয়া যায়। এসব পণ্যের রয়েছে আলাদা বিশেষত্ব। এ কারণেই তা অনেকের পছন্দের জিনিস। মণিপুরি নারী সত্যবামা দেবী জানান, আগে কেবল বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও মেলায় মণিপুরি তঁাঁতবস্ত্রের স্টল দেখা যেত। এখন নগরীর অনেক এলাকায় মণিপুরি বস্ত্রের স্থায়ী দোকান গড়ে উঠেছে।
যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মণিপুরি বস্ত্রের ফ্যাশনেও এসেছে পরিবর্তনের ছোঁয়া। তবে মনিপুরি তাঁত শিল্পের বিকাশ ও প্রসারের ক্ষেত্রে তার ছাপ পড়েনি। বরং নানা সংকটের কারণে নতুন প্রজন্ম এই শিল্পের প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে, সরে যাচ্ছে এ পেশা থেকে। এই শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানায়, তাদের বংশ পরম্পরায় প্রাপ্ত তাঁত শিল্প আজ গভীর সংকটের মুখে। পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে তীব্র প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকতে এই শিল্পকে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে। তার ওপর এই শিল্পের কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি ও দুষপ্রাপ্যতা, সেই সঙ্গে ভারতীয় পণ্যের আগ্রাসনে মণিপুরি তাঁত শিল্প পার করছে চরম সংকটকাল। তাতে মণিপুরিরা ক্রমেই আগ্রহ হারাচ্ছে তাঁতবস্ত্র উৎপাদনের ব্যাপারে।
কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি ব্যবসায় বিরূপ প্রভাব ফেলছে জানিয়ে নগরীর লামাবাজারের সিলেট মণিপুরি শাড়ি ঘরের বিক্রয়কর্মী মঙ্গলা দেবী বলেন, 'সুতার দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রতিটি বস্ত্রের ক্ষেত্রে মূল্য বৃদ্ধি করতে হয়েছে। এতে করে বেচাকেনা আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে। এভাবে চললে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে যাবে।' সংশ্লিষ্টরা জানায়, তাঁতের একটি শাড়ি বুনতে প্রায় এক সপ্তাহ সময় লাগে। চাদর তৈরি করতে লাগে দুই থেকে চার দিন। কিন্তু তৈরিকৃত পণ্য বিক্রি করে সে তুলনায় পারিশ্রমিক পাওয়া যায় না। তাঁরা অভিযোগ করে বলেন, বাজারে অবাধে ভারতীয় শাড়ি ও চাদর আসায় এসব কাপড়ের সঙ্গে মণিপুরিদের হাতে তৈরি কাপড় প্রতিযোগিতায় মার খাচ্ছে। তাঁদের প্রশ্ন, সাত-আট দিনে একটি শাড়ি তৈরি করে পর্যাপ্ত দাম না পেলে কাপড় বুনে লাভ কি। তাই বর্তমানে যারা বিকল্প কাজ পাচ্ছে না, কেবল তারাই একেবারে বেকার থাকার চেয়ে ঘরে বসে কাপড় তৈরি করছে। একসময় মণিপুরি মহিলাদের প্রায় সবাই তাঁতে কাপড় বুনলেও এখন তাদের অনেকেই পা বাড়াচ্ছে বিকল্প পেশার দিকে। বর্তমানে বৃহত্তর সিলেটের মণিপুরি সম্প্রদায়ের অল্পসংখ্যক লোকই বাণিজ্যিকভাবে কাপড় তৈরির সঙ্গে জড়িত।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় অনেকে অর্থের সংস্থান করতে বিভিন্ন এনজিওর দ্বারস্থ হচ্ছে। কিন্তু চড়া সুদে ঋণ নিয়ে সুবিধা করতে পারছে না। তারা জানায়, কোমর তাঁত বসাতে বেশি পুঁজি লাগে না বলে এটি অনেক মণিপুরি পরিবারেই বসানো হয়। কিন্তু এতে বেড শিট, বেড কাভার, পিলোর মতো হাতেগোনা কয়েকটি পণ্য ছাড়া অন্য কোনো বস্ত্র বোনা যায় না। শাড়ি, থ্রিপিস, ওড়নার মতো পরিধেয় বস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় তাঁত বসানোর ব্যয় অনেক বেশি। একটি যন্ত্রচালিত ব্রড ব্র্যান্ডের তাঁতের সরঞ্জাম কিনতে ৫০ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকা লাগে। তাই যাদের পুঁজি কম, তারা বাধ্য হয়ে কোমর তাঁত ব্যবহার করে। পুঁজির অভাব ছাড়াও আরো কিছু কারণে মণিপুর িতাঁত শিল্পের প্রসার হচ্ছে না। এ শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা জানায়, 'প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সিলেটে পাওয়া যায় না। নরসিংদী ও ঢাকা থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করতে হয়।'
১৯৭৯ সালে সমাজকল্যাণ ও মহিলাবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে ১০টি তাঁত দিয়ে সিলেট নগরীর শিবগঞ্জে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে মণিপুরি তাঁতবস্ত্র উৎপাদন শুরু হয়েছিল। পরে সরকারি সাহায্য বন্ধ এবং প্রশিক্ষণ ও কাঁচামালের অভাব দেখা দেয়ায় চালু হওয়ার আট বছরের মাথায় তাঁতগুলো বন্ধ হয়ে যায়। ২০০৮ সালের আগস্টে বাংলাদেশ মণিপুরি আদিবাসী ফোরামের উদ্যোগে মহিলা তাঁতি সম্মেলনে মহিলা ও শিশুবিষয়ক, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা এবং সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী মণিপুরি তাঁত শিল্পের জন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার আশ্বাস দেন। তবে পরে তা আর বাস্তবায়িত হয়নি। মণিপুরি তাঁত শিল্পের আধুনিকায়নে কোনো ধরনের উদ্যোগ না নেওয়ায় মান্ধাতার আমলের ধারায় এখনো চলছে এর বুনন ও উৎপাদন কাজ। পাশাপাশি সরকারিভাবে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ না থাকায় ক্রমেই হারিয়ে যেতে বসেছে মণিপুরি তাঁত শিল্প।
বাংলাদেশ মণিপুরি মহিলা সমিতির চেয়ারপারসন এস রিনা দেবী বলেন, 'ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে সবার আগে প্রয়োজন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা। পাশাপাশি এই শিল্পে নিয়োজিতদের যথাযথ প্রশিক্ষণ এবং ঋণ সুবিধা দিলে এটি আরো বিকশিত হবে।' তিনি বলেন, 'আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে এ শিল্পকে গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। এর ফলে দেশে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রাও আসবে।'

একই গগনের দুই জ্যোতিষ্ক by নিয়ামত হোসেন

Monday, June 13, 2011

ঠাৎই যেন চলে গেলেন মোহাম্মদ কিবরিয়া। শিল্পী কিবরিয়া। দেশের শিল্প ও সংস্কৃতি ভুবনের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ছিলেন তিনি। চারুকলা ৰেত্রের একজন দিকপাল। অগণিত ভক্ত, ছাত্র ও অনুরাগীরই শুধু নয়, আমাদের দেশের একজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন তিনি। বয়স যাই হোক, এভাবে তিনি চলে যাবেন সেটা কেউ আশা করেনি। সেজন্যই তাঁর চলে যাওয়ার খবর যিনিই শুনেছেন, তিনি চমকে ওঠেছেন।
যেন হঠাৎ করেই চলে গেলেন বিশিষ্ট এই চিত্রশিল্পী। এ দেশে আধুনিক বিমূর্ত চিত্ররীতির অন্যতম প্রবর্তক তিনি। এই ৰেত্রে তাঁর অবদান বিরাট। দেশে শিল্পীমহলে তিনি এর স্বীকৃতি পেয়েছেন। একই সঙ্গে আর যেসব শিল্পী এই ধারা প্রবর্তনে ভূমিকা রেখেছেন তাঁরাও আজ দেশে খ্যাতিমান। আজ দেশের শিল্পকলার ৰেত্রে যে অগ্রগতি এসেছে তার পেছনে অবদান রয়েছে অনেকেরই। শিল্পী কিবরিয়া তাঁদেরই অন্যতম। আমাদের চিত্রকলা আজ অনেক দূর এগিয়েছে। একটা সময় ছিল যখন চিত্রকলা ছিল না বলা যাবে না, ছিল, কিন্তু আধুনিক চিত্রকলা ছিল না। বেশ কয়েকজন নিবেদিতপ্রাণ শিল্পীর হাত ধরে আমাদের চিত্রকলা এগিয়ে এসেছে। এর মধ্যে এসেছে আধুনিক রীতি। এদেশে সে রীতির অন্যতম প্রবর্তক মোহাম্মদ কিবরিয়া। এদেশে চিত্রশিল্পের এগিয়ে যাওয়ার প্রাথমিক পর্যায়ে যাঁরা অক্লানত্ম পরিশ্রম করেছেন তাঁদের মধ্যে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, পটুয়া কামরুল হাসান, শফিউদ্দিন আহমদ প্রমুখের পরবর্তী ধাপেই আছেন মোহাম্মদ কিবরিয়া। এদেশে আধুনিক শিল্পকলার অন্যতম প্রবর্তক হিসেবে তাঁর অবদান বিরাট। এই ধারারই শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, আমিনুল ইসলাম, আবদুর রাজ্জাক প্রমুখ। এঁরা সকলেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে খ্যাতিমান। এদেশে আধুনিক চিত্রকলার প্রবর্তন ও প্রসারের ৰেত্রে এঁদের প্রত্যেকের অবদান অনস্বীকার্য।
বিমূর্ত চিত্রকলা বোঝেন না এ কথা অনেকে বলেন। কথাটি পুরোপুরি ঠিক নয়। শিল্পী কিবরিয়ার মৃতু্যর পর এক স্মরণসভায় বিশিষ্ট শিল্পী হাসেম খান তাঁর স্মৃতিচারণে ঠিক এই বিষয়টি নিয়ে স্মৃতিচারণ করে নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন।
মোহাম্মদ কিবরিয়ার চিত্র প্রদর্শনী চলছে। বহু লোক দেখতে আসছে। একদিন এল বোরকাপরা এক বধূ ও তাঁর স্বামী এক রিকশাচালক। ওই মহিলা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে একটি ছবি খুব আগ্রহ নিয়ে দেখছেন। একবার সামনে একবার পাশে এভাবে কয়েকবার দেখার পর স্বামীকে ডেকে ছবিটা দেখে বললেন, দেখো দেখো এটা সরষে খেত না? ছবিটি বুঝতে পেরে আনন্দিত এই মহিলা। শিল্পীর স্বার্থকতা এখানেই। দর্শকদের মনোযোগ আকৃষ্ট করছেন এবং বিশেষ ধরন বা ভঙ্গিতে উপস্থাপন করছেন তাঁর বিষয়বস্তু।
অমায়িক মানুষ ছিলেন শিল্পী কিবরিয়া। রুচিবান মানুষ। অনেকটা নিভৃতচারী। তাঁর একটা বিশেষ গুণ ছিল বাংলা সাহিত্যের প্রচ- ভক্ত ছিলেন তিনি। এদেশের এবং পশ্চিমবঙ্গের খ্যাতিমান লেখকদের গল্প উপন্যাস তিনি নিয়মিত পড়তেন। সাহিত্যের সঙ্গে ছিল তাঁর আজীবন সখ্য। চিত্রকলা এবং সাহিত্যের অবস্থান দূরে নয়, নিকটে। সাহিত্য যেমন একটা মাধ্যম তেমনি চিত্রকলাও একটি গুরম্নত্বপূর্ণ মাধ্যম যার মাধ্যমে প্রকাশ করা যায় মনের ভাব বা অনুভূতি। দুটির রূপ ভিন্ন হলেও তাদের অবস্থান পরস্পরের কাছাকাছি। সঙ্গীতও তাই। তাই বলা যায়, এগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক দূরের নয়, নৈকট্যের। কবি গুরুকে তাই দেখা যায়, কবিতা, গল্প, উপন্যাস এবং তার সঙ্গে সঙ্গীতচর্চার এক পর্যায়ে কবি চলে আসেন চিত্রকলায়।
আমাদের দেশে অনেক শিল্পীই সাহিত্যের অনুরাগী, কবি-সাহিত্যিকদের সঙ্গে তাঁদের হৃদতাপূর্ণ সম্পর্ক। লেখকদের বইয়ের ছবি বা প্রচ্ছদ অাঁকার ৰেত্রেই নয়, সামগ্রিকভাবে শিল্পীরা সাহিত্য অঙ্গনের সঙ্গে নানাভাবে যুক্ত। কোন কোন শিল্পী সাহিত্য রচনার সঙ্গেও সংশিস্নষ্ট। শিল্পী কিবরিয়া ছিলেন সাহিত্য অনত্মপ্রাণ মানুষ। বাংলা সাহিত্যের প্রচ- অনুরাগী ছিলেন। তাঁর শিল্পপ্রেম এবং সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ মিশে গিয়েছিল একাকার হয়ে। বিদগ্ধ এই মানুষটি তাঁর ছাত্রদের মধ্যে একাধারে শিল্পের প্রতি অনুরাগ এবং সাহিত্যের প্রতি ভালবাসা যেমন জাগিয়ে তুলেছিলেন, তেমনি তাদের মধ্যে জাগিয়ে তুলেছেন দেশপ্রেমও। আমাদের আধুনিক চিত্রশিল্পী তাঁকে মনে রাখবে। তিনি আমাদের শিল্পকলার ইতিহাসে বেঁচে থাকবেন, বেঁচে থাকবেন তাঁর অগণিত সহকর্মী, ছাত্র ও অনুরাগীর মধ্যে।
শিল্পী কিবরিয়ার চলে যাওয়ার অর্থ বাংলাদেশের শিল্প গগন থেকে এক উজ্জ্বল নৰত্রের বিদায়।
প্রতিবেশী ভারতের শিল্প গগনের এক নৰত্রের চলে যাওয়ার সংবাদ পাওয়া গেল এ সময়েই। তিনি শিল্পী হুসেন। পুরো নাম মকবুল ফিদা হুসেন। তবে হুসেন নামেই পরিচিত তাঁর দেশব্যাপী এবং একই সঙ্গে বিশ্বব্যাপীও। আপাদমসত্মক শিল্পী তিনি। তাঁর চালচলন জীবনযাপন সবই একজন প্রকৃত শিল্পীর মতো। কোন ভনিতা নেই, সহজ-সরল সুন্দর জীবন। বিলাসিতার ধার ধারেন না। শিল্পী হুসেন বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে পক্বকেশ ও শ্মশ্রম্নম-িত এক সরল মানুষের চেহারা। বিলাসিতা দূরের কথা অনেক সময় তিনি পায়ে জুতা স্যান্ডেলও ব্যবহার করতেন না।
দেশ-বিদেশে তাঁর নাম। অগণিত ভক্ত। ছবির দামও অনেক। এক নিলাম ঘরে তাঁর একটা ছবির দাম উঠেছিল ২০ লাখ ডলার পর্যনত্ম। সহজ-সরল এই মানুষটি থাকতেন সাদাসিদ্ধাভাবে। পশ্চিমা দেশের এক ম্যাগাজিনে তাঁকে বলা হয় 'ভারতের পিকাসো।' আসলে বড় মাপের মহৎ সব শিল্পী নিজ নিজ ৰেত্রে অনন্য। কারও সঙ্গে কারও তুলনা হয় না। সবাই নিজ নিজ ৰেত্রে অনন্য। পিকাসো পিকাসোই। তাঁর সঙ্গে কারও তুলনা চলে না। হুসেন হুসেনই। তাঁর সঙ্গেও তুলনা চলে না কারও।
হুসেনের বিষয়ে সর্বপ্রথম যে কথাটি বলা যায়, সেটি হচ্ছে হুসেন স্বশিৰিত শিল্পী। কোনদিন কোন একাডেমী বা স্কুল থেকে চিত্রকলায় শিৰা নেননি। নিজের ভেতরেই ছিল শিল্প। নিজেই সেটাকে বিকশিত করে জগদ্বিখ্যাত হন।
নিজ দেশে ছিলেন খুবই জনপ্রিয় একজন মানুষ। পথে ঘাটে শহরে নগরে ঘুরে বেড়িয়েছেন। শিল্পীর চোখে দেখেছেন মানুষ ও পরিপাশর্্ব। ছবি অাঁকতেন যেখানে সেখানে। কাগজ পেন্সিল কলম তুলি একটা হলেই হলো। সাবলীল দৰতায় একের পর এক হয়ে যেত স্কেচ। সকল পর্যায়ে মানুষ তাঁর ছবি ভালবাসত। তাঁর ছবি বুঝত সাধারণ মানুষও। ভারতের অনেক সম্মান তিনি পেয়েছেন। পেয়েছেন পদ্মশ্রী ১৯৫৫ সালে। তারপর পেয়েছেন পদ্মভূষণ, পদ্মবিভূষণও পেয়েছেন।
জন্ম তাঁর ভারতের মহারাষ্ট্রে। সেই মহারাষ্ট্রের মুম্বাইতে সিনেমার বিশাল বিশাল ছবি অাঁকার মধ্য দিয়ে তাঁর কর্মজীবন শুরম্ন। সিনেমার ব্যানার বা পোস্টার ইত্যাদি অাঁকার মাধ্যমে বাসত্মব শিল্পী জীবনের সূচনা তাঁর। পাশাপাশি চলে নিজের ছবি অাঁকা। ১৯৫২ সালে তাঁর প্রথম একক চিত্র প্রদর্শনী হয় সুইজারল্যান্ডে। সেই থেকে তিনি পান আনত্মর্জাতিক খ্যাতি।
চলচ্চিত্রের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন শিল্পী হুসেন। মাধুরী দীৰিতকে নায়িকা করে তিনি তৈরি করেন একটি চলচ্চিত্র। তার নাম 'গজগামিনী।' এরপর আরেকটি চিত্র নির্মাণ করেন টাবুকে নিয়ে। প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাণে হাত দেন ১৯৬৭ সালে। তাঁর প্রথম ছবি 'থ্রম্ন দ্য আইজ অব এ পেইন্টার।' ছবিটি বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয় এবং সেখানে 'গোল্ডেন বিয়ার'-এ সম্মানিত হয়।
ভারতজুড়ে খ্যাতিমান শিল্পী হুসেন হিন্দুদের দেবী সরস্বতীর একটা ছবি অাঁকায় হিন্দু উগ্রবাদী কট্টরপন্থীদের রোষানলে পড়েন। তাঁর বাড়িতে উগ্রপন্থী একদল লোক হামলা চালিয়ে তাঁর অনেক ছবি নষ্ট করে দেয়। তাঁরা তাঁকে হত্যার হুমকিও দেয়। উগ্রপন্থীরা এই মহান শিল্পীর অাঁকা ঐ ছবির ব্যাপারে নগ্নতার অভিযোগ তোলে।
শিল্পী হুসেন ২০১০ সালে স্বেচ্ছানির্বাসনে চলে যান কাতারের নাগরিকত্ব নিয়ে। তিনি বাস করতে থাকেন লন্ডনে। সেখানেই তাঁর জীবনাবসান ঘটে। ভারতের এই বিখ্যাত শিল্পী ছিলেন সে দেশের কোটি কোটি মানুষের প্রিয় শিল্পী, ভারত সরকারও তাঁকে দিয়েছে উচ্চতর সব সম্মান ও মর্যাদা। অথচ ধর্মান্ধ মৌলবাদী উগ্র সাম্প্রদায়িক হিন্দুদের একটি গ্রম্নপ তাঁর বিরম্নদ্ধাচরণ করে অসম্মান করে তাঁকে। শিল্পী হুসেন বেঁচে থাকবেন তাঁর দেশ ভারতের শিল্পকলার ইতিহাসে। বেঁচে থাকবেন বিশ্বের আধুনিক চিত্রকলার ইতিহাসেও।
লেখক শিল্পীদের জন্ম হয় কোন না কোন দেশে। কিন্তু তাঁরা কোন একটি দেশের সম্পদ নন। তাঁদের কাজ বিশ্বের সকল দেশের সকল মানুষের। সাহিত্যই হোক চিত্রকলাই হোক এবং যে কোন দেশেই সেগুলো রচিত বা অঙ্কিত হোক, সেগুলো বিশ্ব শিল্প ভুবনের অংশ। শিল্পীদের তাই নিজস্ব দেশ থাকলেও তাঁরা সব ধরনের গ-ির উর্ধে, সকল দেশের তাঁরা। শিল্পী কিবরিয়া যেমন আমাদের তেমনি সবার, শিল্পী হুসেন যেমন ভারতের, তেমনি তিনি আমাদেরও। এই দুই শিল্পীর মৃতু্য তাই শুধু বাংলাদেশ ও ভারতেরই ৰতি নয়, ক্ষতি বিশ্ব শিল্প ভুবনেরও।
এই দুই মহান শিল্পীর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা।

আশা হতাশার বয়ন by সিলভিয়া নাজনীন

Wednesday, June 8, 2011

শিল্পীর সংবেদনশীলতা সৃষ্টি করে শিল্প। শিল্পের গঠন, গড়ন ও গভীরতার স্তরে স্তরে বীজের মতো ছড়িয়ে থাকে নানাবিধ সুপ্ত কথকতা। পরিশুদ্ধ আত্মার অনুনাদ ধ্বনিত হয় মহৎ শিল্পের পরম্পরায়। শিল্পীকুলের অভিলক্ষ সেই মহাসারণি। ‘কনটেমপ্লেশন’ শিরোনামে মুর্শিদা আরজু আল্পনার একক প্রদর্শনী। চলছে ধানমন্ডির ঢাকা আর্ট সেন্টারে। বার্লিন প্রবাসী শিল্পী আল্পনা তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতা, নানা বিচ্ছিন্ন অনুভূতিকে একত্র করেছেন তাঁর চিত্রকর্মে।

শিল্প বিশ্লেষিত হয় শিল্পের সৌন্দর্য, রং, ব্যঞ্জনা, ইতিহাস, ভাষা এবং উপস্থাপনের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। আল্পনার চিত্রকর্মে সৌন্দর্যবোধ উজিয়ে জীবনদর্শন প্রকট হয়ে উঠেছে। ঢাকায় বেড়ে ওঠা এবং জার্মানিতে দীর্ঘ সময়ের জীবনযাপন—এই সময়কে তিনি নতুন দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করেছেন তাঁর প্রতিটি ক্যানভাসে। তাঁর চিত্রপটে টেক্সটের ব্যবহার দর্শককে আরও একাত্ম হওয়ার পথ তৈরি করে দেয়। প্রদর্শনীর অধিকাংশ শিল্পকর্মই শিল্পীর আত্মজৈবনিক অভিজ্ঞতার প্রকাশ।
মাধ্যম নিয়ে শিল্পীর বিশেষ কোনো ভাবনা নেই বলেই মনে হয়। ভাবের স্ফুরণই মুখ্য হয়ে ওঠে তাঁর ক্যানভাসে। অ্যাক্রেলিক, পেনসিল, কালি, চারকোল, জলরঙের ব্যবহারে বক্তব্য ফুটিয়ে তোলাই তাঁর মোক্ষ। ব্যক্তিগত গণ্ডির বাইরে তাঁর ভাবনার বলয়কে ছড়িয়ে দেওয়ার তাগিদ থেকেই তিনি গল্পের মতো বর্ণনা করেন তাঁর চাওয়া-পাওয়া, নারীসত্তার সংকট, প্রেম-বিরহ, স্মৃতি-বিস্মৃতির বহুস্তরিক আখ্যান। তাতে শিল্পগুণ পুরোপুরি রক্ষিত হয়, এ কথা জোর দিয়ে বলা যায় না।
শিল্পী আল্পনার কাজ নারীবাদী চেতনায় ঋদ্ধ। নারীর দৈনন্দিন সংকট, আশা-আকাঙ্ক্ষা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের বিবিধ বর্ণনায় চিত্রতলে মূর্ত হয়ে ওঠে বর্তমান সময়ের বৈরী বিশ্বব্যবস্থা। বর্তমান ব্যবস্থার পরিবর্তনে তাঁর কাজ প্রতিবাদের অভিব্যক্তিতে উচ্চকিত। সারফেসকে নানা ধরনের অসংগতিপূর্ণ বিভাজনের মাধ্যমে এবং বর্ণ প্রয়োগের অমার্জিত পদ্ধতিতে তাঁর কাজে তৈরি হয় অসামঞ্জস্য এবং ভাসমানতার অনুভূতি, যা দর্শকের অস্বস্তিকে প্রকট করে তোলে।
শিল্পী তাঁর আত্মজৈবনিক অভিঘাতে উন্মুল। তৃতীয় বিশ্ব, নারী প্রশ্ন, বর্ণবৈষম্যের অভিশাপ এখনো ছোবল মারার জন্য প্রস্তুত। দেশ-কাল-সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে শিল্পের ভূমিকা কতটুকু তা আজ প্রশ্নবিদ্ধ। শিল্পীর ব্যক্তি অনুভূতির একান্ত প্রকাশের চেয়ে শিল্পে তাঁর মনস্তাত্ত্বিক উপস্থিতিই বিবেচনার বিষয়। শিল্পী বলেন, তাঁর চিত্রপটে পাশ্চাত্যের বড় শহরে বসবাস ছাপ রেখেছে। প্রতিনিয়ত নানা প্রশ্নের উদ্রেক, রহস্যময়তা, আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন, মর্মপীড়া, উপস্থিতি, অনুপস্থিতি, ফ্যান্টাসি, ট্যাবু প্রভৃতির সমাবেশ ঘটেছে।
অভিব্যক্তিবাদী শিল্পধারার সঙ্গে তাঁর কাজের নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে। বিভিন্ন ইমেজের আপাত বিচ্ছিন্ন উপস্থিতি, রঙের পাতলা পর্দা গলিয়ে বেরিয়ে আসা ব্যক্তি মনস্তত্ত্ব শিল্পী আল্পনার শিল্পকর্ম বস্তুত সময়ের অস্থির পাণ্ডুলিপি।

প্রচ্ছদের প্রবাদপুরুষ by শাশ্বতী মজুমদার

কাইয়ুম চৌধুরী যখন ঢাকা আর্ট কলেজে পড়ছেন তখন পূর্ববঙ্গে ইসলামি ভাবধারার ছবির খুব রমরমা। শিল্পীরা ক্যালিগ্রাফি করছেন, নন অবজেক্টিভ ফর্মে ছবি আঁকছেন।

কাইয়ুম চৌধুরী এই পথের ধার দিয়েও গেলেন না। তিনি গ্রামবাংলার ছেলে। চিত্রা নদীর পাড়ে তাঁর শৈশব কেটেছে। নদী, নৌকা, জেলে আর গ্রামীণ জীবন তাঁর সত্তায় মিশে আছে। এদিকে তাঁর শিক্ষক শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতিকে চিত্রে তুলে ধরতেই আগ্রহী। তাঁর লোকশিল্পের সংগ্রহশালা কাইয়ুম চৌধুরীকে দেখাল নতুন পথ।
এসব কারণে কাইয়ুম চৌধুরী লোকশিল্পের কর্মকে অবলম্বন করে গ্রামবাংলার ছবি আঁকতে শুরু করলেন। সৃষ্টি করলেন তাঁর চিত্রের নিজস্ব ধারা। গ্রামীণ ঐতিহ্যের ফর্মকে আধুনিক রূপদান করে শিল্প সৃষ্টি করেছেন এই শিল্পী। কাইয়ুম চৌধুরী ছবির ক্যানভাসের ক্ষেত্রেও ব্যতীক্রমী পথ গ্রহণ করেন। পেইন্টিং খুব বেশি না করে তিনি ঝুঁকলেন প্রচ্ছদের দিকে। ছোটবেলা থেকেই তাঁর আগ্রহ ছিল প্রচ্ছদের দিকে। তাঁর ছবি আঁকার অনুপ্রেরণা এসেছে বইয়ের ছবি দেখে। ছোটবেলায় তাঁদের বাড়িতে ভারতবর্ষ, প্রবাসী এসব পত্রিকা আসত। এসব পত্রিকায় ছিল অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রামকিঙ্কর বেইজ, বিনোদবিহারীদের মতো বিখ্যাত শিল্পীদের আঁকা ছবি। এসব ছবি তাঁকে খুব একটা আকর্ষণ করতে পারেনি। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন ওই ছবিগুলো দেখতাম, খুব সুন্দর ছবি। কিন্তু মনে খুব দাগ কাটত না। দাগ কাটত গল্পের বই কাঞ্চনজঙ্গা সিরিজের প্রচ্ছদ ও ভেতরে আঁকা ছবিগুলো। কাঞ্চনজঙ্গা সিরিজের সব ছবি প্রতুল বন্দ্যোপাধ্যায়ের করা। আর ভালো লাগত সমর দের করা প্রচ্ছদের ছবি। জসীমউদ্দীনের এক পয়সার বাঁশি বইয়ের প্রচ্ছদ আমাকে মুগ্ধ করেছিল।
ছোটবেলায় কাইয়ুম চৌধুরীর প্রচ্ছদশিল্পের প্রতি যে গভীর অনুরাগ সৃষ্টি হয়েছিল তা-ই তাঁকে পরবর্তীকালে প্রচ্ছদশিল্পের কিংবদন্তিতে পরিণত করে।
প্রথমদিকে তাঁর চিত্রে কিছুটা কিউবিস্ট ধারার প্রভাব দেখা যায়। পরবর্তী সময়ে তাঁর কাজের ধারা পরিবর্তিত হয়। তাঁর ফিগারগুলো আরও বেশি বিমূর্ত ও লিরিক্যাল হয়ে ওঠে। আমাদের লোকশিল্পের সাবলীলতা ফুটে ওঠে তাঁর শিল্পে, লোকশিল্পের ফর্মগুলোকে আত্মস্থ করেছেন নিবিড়ভাবে। লোকশিল্পীরা টেপা পুতুল বানায় বিক্রির জন্য। একটা পুতুলের পেছনে বেশি সময় তো দেওয়া যাবে না। ওরা তাই পুতুলের ফর্মটাই মিনিমাইজ করে ফেলেছে। এভাবেই গড়ে উঠেছে লোকশিল্পের নিজস্ব ধারা। কাইয়ুম চৌধুরী ১৯৩২ সালের ৯ মার্চ ফেনীতে জন্মগ্রহণ করেন। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি শিল্পচর্চার মাধ্যমে বাংলাদেশের চারুশিল্পের জগৎকে সমৃদ্ধ করে চলেছেন। এ দেশের প্রচ্ছদশিল্প ও গ্রাফিক ডিজাইনের ক্ষেত্রে তিনি অবিসংবাদিত একজন ব্যক্তিত্ব।

সমকালীন শিল্পঃ শিল্পীর ক্যানভাসে by শাশ্বতী মজুমদার

Wednesday, March 2, 2011

শিল্পী রোকেয়া সুলতানার কাজের মূল বৈশিষ্ট্য ছন্দোময় কম্পোজিশন আর উষ্ণ রঙের ব্যবহার। নারী ও প্রকৃতি তাঁর কাজের প্রধান বিষয়। আশির দশকে ম্যাডোনা সিরিজ এঁকে বিখ্যাত হয়েছিলেন এ শিল্পী। তাঁর বিখ্যাত কয়েকটি সিরিজ হলো জল, বায়ু, মাটি, সম্পর্ক।
রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দের কবিতা তাঁর কর্মের অনুপ্রেরণা। টেম্পারা, মিক্সড মিডিয়া, এক্রেলিকে তিনি বেশির ভাগ ছবি এঁকেছেন। ক্যানভাসে উজ্জ্বল রঙের ব্যবহার, ফোরগ্রাউন্ডের সঙ্গে ব্যাকগ্রাউন্ডের প্রভেদের অনুপস্থিতি, ছন্দোময় রেখার মাধ্যমে ফিগারের উপস্থাপন শিল্পীর কাজে এনে দিয়েছে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। তাই কাজের ভিড়েও তাঁর কাজকে আলাদাভাবে শনাক্ত করা যায়।
ক্যানভাসকে শিল্পী তুলনা করের তাঁর ব্যক্তিগত ডায়েরির সঙ্গে। কারণ তাঁর প্রতিদিনকার আবেগ আর অনুভূতিরই রূপদান করেন তাঁর শিল্পকর্মে। নিজের শিল্পকর্ম সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য হলো ‘আমি আমার শিল্পকর্মকে নির্দিষ্ট কোনো শিল্প আন্দোলনে অন্তর্ভুক্ত করতে চাই না বরং বিশুদ্ধভাবে নিজস্বতা বজায় রাখতে চাই।’
সমকালীন বাস্তবতা নারীর আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটে তাঁর শিল্পকর্মে।
‘ধরণী’ নামের চিত্রকর্মটি তিনি সম্প্রতি এঁকেছেন। এখানে বিশাল ক্যানভাসে একটি নারী-ফিগারকে চিত্রায়িত করেছেন, যার শরীরের বিভিন্ন অংশ ওয়ার্ডরোবের ড্রয়ারে ভাগ করা, ফিগারটির পাশেই একটি কালো রঙের চেয়ার।
ছবিটি নিয়ে শিল্পী তাঁর নিজস্ব ভাবনা সম্পর্কে বলেন, মেয়েরা সামাজিক ও পারিবারিকভাবে ছোটবেলা থেকেই থাকে বঞ্চিত। তারা তাদের কথা, চাওয়া-পাওয়া সব সময় প্রকাশ করার সুযোগ পায় না। তাই তাদের অবদমিত গোপন ইচ্ছাগুলো লুকিয়ে থাকে তাদের মনের নিভৃত কোণে। দৈনন্দিন কাজে ব্যবহূত ড্রয়ারে আমরা যেমন আমাদের জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখি, তেমনি মেয়েদের এই গোপন ভালো-মন্দ আকাঙ্ক্ষাগুলোও তারা লুকিয়ে রাখে মনের এক একটি কোণে। আর পাশের চেয়ারটি হয়তো বা কেউ আসবে বা তাদের আত্মিক মুক্তিকে আহ্বান করবে, এরই প্রতীক।
শিল্পী তাঁর প্রিয় রং লাল আর হলুদ ব্যবহার করে ছবিটি এঁকেছেন। তাঁর সংবেদনশীল সত্তার প্রকাশ ঘটেছে ছবিটিতে। এই ছবির ধারাবাহিকতায় আরও ছবি আঁকবেন বলে তিনি জানান।
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে নারীর অবস্থান নিয়ে শিল্পী উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে ইভ টিজিং এবং এর শিকার মেয়ে ও তাদের আত্মীয়স্বজনের দুর্ভোগ নিয়ে শিল্পী মর্মপীড়ায় ভোগেন। এ বিষয়ে তিনি মানুষের সচেতন হওয়া দরকার বলে মনে করেন। পরবর্তী সময়ে এ বিষয় নিয়ে ধারাবাহিকভাবে কাজ করবেন বলে ভাবছেন।
শিল্পী রোকেয়া সুলতানার জন্ম চট্টগ্রামে ১৯৫৮ সালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে ১৯৮০ সালে বিএফএ ডিগ্রি লাভ করেন। কলকাতার বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছাপচিত্রে এমএফএ ডিগ্রি লাভ করেন। বর্তমানে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ছাপচিত্র বিভাগে শিক্ষকতা করছেন। রোকেয়া সুলতানা প্রথম নারী শিল্পী, যিনি ১৯৯৯ সালে এশিয়ান বিয়ানালে পুরস্কার লাভ করেন।

সৃজনে নবযাত্রার প্রয়াস by মোবাশ্বির আলম মজুমদার

Friday, February 11, 2011

ফ্রেমের সামনে দাঁড়াতেই দর্পণে নিজের প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে। কাচের গায়ে কাচ জোড়া দিয়ে কাজী রকিব তৈরি করেন স্থাপনাশিল্পের আদলে শিল্পকর্ম। বর্গাকৃতির কাচের গায়ে আঁচড় কেটে তৈরি করেছেন বৃষ্টির অবয়ব। প্রথাগত রং লেপনের প্রক্রিয়ার বাইরে নতুন শিল্পভাষা নির্মাণ আমাদের শিল্পে যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা।

শিল্পচর্চায় নিবিড় মনোযোগী হয়ে কাজ করছেন এবং সৃষ্টিকর্মে বৈচিত্র্যপূর্ণ নিরীক্ষায় সফল যাঁরা, তাঁদের কাজের অষ্টম আয়োজন সৃজনে ও শেকড়ে শুরু হয়েছে গত ৪ জানুয়ারি বেঙ্গল গ্যালারি অব ফাইন আর্টসে। ১০ জন শিল্পীর ৪০টি শিল্পকর্ম নিয়ে স্থান পেয়েছে প্রদর্শনীতে।
সত্তর এবং আশির দশকের শিল্পীদের সঙ্গে মেলবন্ধন ঘটেছে নব্বই ও শূন্য দশকের শিল্পীদের এ প্রদর্শনীতে। আমাদের সমৃদ্ধ লোকঐতিহ্য, প্রকৃতি, মানুষ ও মানুষী জীবনযাত্রার নানা ঘটনাপ্রবাহকে বিষয় করে শিল্পীরা ছবি এঁকেছেন। প্রদর্শনীর জ্যেষ্ঠ শিল্পী মোহাম্মদ মোহসীন চারটি অ্যাক্রিলিক মাধ্যমে আঁকা বিমূর্ত ছবিতে প্রকৃতির ঋতু পরিবর্তনের মনোমুগ্ধকর রঙের উপস্থাপন করেছেন। শীতের ভোরের কুয়াশাচ্ছন্ন সকালকে নীল ও সবুজাভ নীলের ব্যবহারে প্রকৃতির বিমূর্ততা প্রকাশ করেছেন ‘ইমেজ অব উইন্টার মরনিং’ ছবিতে। মোমিনুল ইসলাম রেজা ক্যানভাসে স্পর্শকাতর তিনটি রঙের ব্যবহার করেছেন। সবুজ, লাল ও নীল এই তিনের ব্যবহার রঙের সমন্বয়ের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য এনেছে। লাল জমিনে কালো চতুর্ভুজের উপস্থাপন সবুজের মাঝে অপেক্ষাকৃত কম লালের ব্যবহার দৃষ্টিকে বন্দী করে এক কেন্দ্রে। প্রথাবিরুদ্ধ সৌন্দর্য নির্মাণ মোমিনুলের কাজের বৈশিষ্ট্য। কাগজের গায়ে খোদাই চিত্রের আদল তৈরি, বিন্দুর পাশে বিন্দুর গড়ন মোহাম্মদ ফকরুল ইসলামের শিল্পভাষা। নতুন ভাবনা ও কৌশলকে প্রয়োগ করে নিবিড়ভাবে সৃষ্টি করেন শিল্পকর্ম। সেপিয়া ও ধূসর কালো রঙের কাগজের গায়ে তেল প্রয়োগের পর সুচালো উপকরণের সাহায্যে বিন্দু সৃষ্টি করে কখনো বৃত্তাকার, চৌকোনা, বর্গাকৃতির ক্যানভাস সৃষ্টি করেন শিল্পী। প্রদর্শনীর সর্বকনিষ্ঠ শিল্পী মাকসুদা ইকবাল। মৌলিক রঙের ওপর স্তরে স্তরে রঙ চড়িয়ে বুনট সৃষ্টি করেছেন ‘সারফেস’ শিরোনামের ক্যানভাসগুলোতে। যা প্রকৃতিতে ছড়ানো রঙের বিন্যাসকে ব্যক্ত করে। প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়া ১০ জন শিল্পী মোহাম্মদ মোহসীন, ইফফাত আরা দেওয়ান, মোমিনুল ইসলাম রেজা, কাজী রকিব, ফারেছা জেবা, মোহাম্মদ ফকরুল ইসলাম, লায়লা শারমিন, শাহজাহান আহমেদ বিকাশ, আনিসুজ্জামান, মাকসুদা ইকবাল নীপা। প্রদর্শনীটি শেষ হবে ১৩ ফেব্রুয়ারি।
 
Support : Dhumketo ধূমকেতু | NewsCtg.Com | KUTUBDIA @ কুতুবদিয়া | eBlog
Copyright © 2013. News 2 Blog 24 - All Rights Reserved
Template Created by Nejam Kutubi Published by Darianagar Publications
Proudly powered by Dhumketo ধূমকেতু