সন্ত্রাস- ছাত্রলীগের ‘আত্মরক্ষা’ ও নিষ্ক্রিয় আইন by মশিউল আলম

Saturday, February 8, 2014

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাম্প্রতিক সহিংসতায় ‘যতজনের হাতে অস্ত্র দেখা গেছে, তারা সবাই ছাত্রলীগের নয়’—প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে এই কথা বলেছেন।
এর মানে দৃশ্যমান অস্ত্রধারীদের কয়েকজন ছাত্রলীগের। তাহলে ছাত্রলীগের এই অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে কী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে? প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘ছাত্রলীগের যারা, আমরা তাদের বহিষ্কার করেছি। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’ বহিষ্কার মানে ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কার। এটা রাষ্ট্রের কোনো আইনি পদক্ষেপ নয়, সাংগঠনিক ব্যবস্থামাত্র। তাঁরা যে ফৌজদারি অপরাধ করেছেন, সে বিবেচনায় এটি নিতান্তই এক লঘু পদক্ষেপ, যা লোক দেখানো বলে কেউ ধরে নিলে তাকে দোষ দেওয়া যাবে না। তা ছাড়া আমরা জেনেছি, বহিষ্কৃত হয়েছেন সেদিনের অস্ত্রধারীদের মধ্য থেকে মাত্র দুজন। কিন্তু সংবাদমাধ্যমে অন্তত ছয়জন অস্ত্রধারীর ছবি ছাপা হয়েছে, যাঁরা ছাত্রলীগের নেতা। বাকি চারজনকে কেন বহিষ্কার করা হয়নি? তাঁদের বিরুদ্ধে আদৌ কোনো পদক্ষেপ কি নেওয়া হয়েছে?

ছাত্রলীগের অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে ‘আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে’—প্রধানমন্ত্রীর এই উক্তি তথ্য না আশ্বাস, তা আমরা জানি না। কিন্তু কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার খবর এখনো পাওয়া যায়নি। বরং যাঁদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তাঁরা কেউই ছাত্রলীগের নন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে যে চারটি মামলা দায়ের করা হয়েছে, সেগুলোর কোনোটিতেই ছাত্রলীগের অস্ত্রধারী কোনো নেতাকে আসামি করা হয়নি। আসামি করা হয়েছে ছাত্র ফেডারেশন, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন প্রভৃতি ছাত্রসংগঠনের নেতা-কর্মীদের, যাঁরা প্রগতিশীল ছাত্রজোটের ব্যানারে বর্ধিত ফি ও সন্ধ্যাকালীন মাস্টার্স কোর্স বন্ধ করার দাবিতে আন্দোলন করছেন।
আর ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের আসামি করা হয়েছে—এটা কোনো খবর নয়। কারণ, এটা যে করা হবে, তা আগে থেকেই সবার জানা। মামলা দায়েরের আগেই সরকারের একাধিক নেতা সংবাদমাধ্যমে বলেছেন, গোলাগুলি করেছেন আন্দোলনকারীদের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা শিবিরের কর্মীরা। কিন্তু রহস্যজনক ব্যাপার হলো শিবিরের কোনো অস্ত্রধারীর ছবি কেউ তুলতে পারেনি। এমনকি আন্দোলনকারী সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে কেউ কোনো অস্ত্রধারী শিবিরের কর্মীকে দেখেছেন, এ রকম খবরও পাওয়া যায়নি। শিবিরের কর্মীরা সম্ভবত নিজেদের অদৃশ্য রেখে অস্ত্রচালনার কায়দা রপ্ত করেছেন কিংবা তাঁরা এমন মন্ত্র জানেন, যা পড়ে ফুঁ দিয়ে তাঁরা ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি ফোটাবেন কিন্তু কেউ তাঁদের দেখতে পাবে না। শুধু অ্যাকশনের সময় অদৃশ্য থাকা কেন? অ্যাকশন শেষ করার পরও তাঁরা বেমালুম গায়েব হয়ে যাওয়ার কায়দা জানেন। নইলে পুলিশ তাঁদের একজনকেও গ্রেপ্তার করতে পারল না কেন? শিবির কি ছাত্রলীগ যে আইনের হাত তাঁদের স্পর্শ করার হিম্মত রাখে না?
না, ছাত্রলীগের কেউ অপরাধ করলে আইন তাঁকে স্পর্শ করতে পারে না—এমন সাধারণীকরণ সঠিক নয়। দৃষ্টান্ত উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং। বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ডের বিচারে ছাত্রলীগের ২২ জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের কথা তিনি বলেছেন। আদালতের রায়ে ১৪ জনের ফাঁসির রায়ের সংবাদ ইতিমধ্যে সুবিদিত এবং প্রশংসিত। কিন্তু স্মরণ না করে পারা যায় না যে বিশ্বজিতের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের বাঁচানোর চেষ্টা হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ সংবাদ সম্মেলন করে বলেছিলেন, হত্যাকারীদের কেউই ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী নন। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীরও বলেছিলেন একই ধরনের কথা। কিন্তু হত্যাদৃশ্যের ভিডিও ফুটেজ সম্প্রচারমাধ্যমে বারবার প্রচার, পুরো সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা এবং দেশব্যাপী ধিক্কার উঠেছিল। জনমতের প্রবল চাপের ফলে ঘটনার দুদিন পর কোতোয়ালি থানার পুলিশ ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় আট ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছিল এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেছিলেন যে তাঁরা বিশ্বজিৎ হত্যা মামলার আসামি। কিন্তু ওই দিনই ঢাকা মহানগরের পুলিশ কর্মকর্তারা সাংবাদিকদের বলেন, বিশ্বজিৎ হত্যার ঘটনায় পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করেনি, যাঁদের গ্রেপ্তারের কথা বলা হচ্ছে তাঁরা কেউ বিশ্বজিৎ হত্যার সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। এ রকম কেলেঙ্কারির মধ্য দিয়ে পরস্ফুিট হয়েছিল একটিই বিষয়: সরকার বিশ্বজিৎ হত্যাকারী ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের আইনের আওতায় নিতে চায় না, পার পাইয়ে দিতে চায়। ওই নৃশংস হত্যাকাণ্ড নিয়ে সংবাদমাধ্যম দিনের পর দিন লেগে না থাকলে যে বিচার শেষ পর্যন্ত পাওয়া গেছে, তা পাওয়া যেত কি না সন্দেহ।
কিন্তু সে জন্য বিশ্বজিৎ হত্যার বিচার করার জন্য সরকারের যে ধন্যবাদ ও প্রশংসা প্রাপ্য তা অস্বীকার করা যায় না। ধন্যবাদ আমরা দিয়েছি, প্রশংসা করতেও কার্পণ্য করিনি। এবং আমরা চাই আইন প্রয়োগের এই দৃষ্টান্ত বিরল ব্যতিক্রম হিসেবে না থেকে যেন সরকারের সাধারণ প্রবণতা হয়ে ওঠে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের ১৬ জনকে হত্যা করা হয়েছে, ছাত্রলীগের ছেলেরা সেখানে যেতে পারে না, তাদের রগ কেটে দেওয়া হয়—প্রধানমন্ত্রীর এসব অভিযোগের প্রতিকার করার দায়িত্ব সরকারের, আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষের, ছাত্রলীগের নয়।
প্রধানমন্ত্রী সংসদে প্রশ্ন তুলেছেন, ‘আমাদের ছেলেদের কি জীবন বাঁচাবার অধিকার নেই?’ সরকারপ্রধানের কণ্ঠে এমন কথা উচ্চারিত হলে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা আগ্নেয়াস্ত্র বহন ও ব্যবহারে আরও উৎসাহিত হবেন। এমন কথা তিনি এর আগেও বলেছেন। অবশ্য প্রধানমন্ত্রী এবার এ কথাও বলেছেন, ‘তবু সন্ত্রাসী সন্ত্রাসীই, সন্ত্রাসীদের বরদাশত করা হবে না।’ কিন্তু তার পরেই আবার ‘আত্মরক্ষার অধিকার সবার আছে’—এ কথাও বলেছেন। ফলে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের কাছে এই বার্তা পৌঁছে যেতে পারে যে ‘আত্মরক্ষার্থে’ আগ্নেয়াস্ত্র বহন ও ব্যবহার করার পক্ষে খোদ প্রধানমন্ত্রীর সায় আছে।
কিন্তু ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা আগ্নেয়াস্ত্র বহন ও ব্যবহার করলে ছাত্রশিবিরের সঙ্গে তাঁদের পার্থক্য থাকে না। ইসলামী ছাত্রশিবির সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালায় বলে সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ করার দাবি ক্রমেই প্রবলতর হয়েছে। তারা তাদের রগকাটা কুখ্যাতি অতিক্রম করে পেশাদার দুর্বৃত্তদের মতো চোরাগোপ্তা হামলাকারী গোষ্ঠী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। বিশেষত গত এক বছরে জামায়াত-শিবিরের ব্যাপক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড তাদের জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। তাদের ব্যাপারে আপত্তি শুধু দেশের ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই, আমেরিকাসহ পশ্চিমা দেশগুলোও তাদের প্রতি প্রচণ্ড নাখোশ। জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে তাদের প্রধান অভিযোগ ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিয়ে নয়, বরং তাদের সন্ত্রাসী তৎপরতা নিয়ে।
সন্ত্রাসের কারণে ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ করার দাবি তুললে একই কারণে ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করার দাবিও যুক্তি পেয়ে যায়। কিন্তু কার যুক্তি কে মানবে, কে মানে এই দেশে? সন্ত্রাসী আচরণের কারণে ছাত্রলীগকে ছাত্রশিবিরের সঙ্গে তুলনা করলে তার প্রতিবাদে এই যুক্তি উত্থাপন করা হতে পারে যে ছাত্রলীগ আক্রমণ করে না, আত্মরক্ষার তাগিদে প্রতিক্রিয়া করে মাত্র। আত্মরক্ষার অধিকার তো ছাত্রলীগেরও আছে। কিন্তু ছাত্রলীগের অভিভাবক দল আওয়ামী লীগ সরকার পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে বলে আত্মরক্ষা কিংবা যে প্রয়োজনেই হোক, ছাত্রলীগ আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারসহ সহিংসতায় লিপ্ত হলে সরকারের এমন বেকায়দা হয় যে মন্ত্রীরা দিশাহারা হয়ে অসত্য-অর্ধসত্য কথা বলেন। সংবাদমাধ্যম সমালোচনায় মুখর হয়ে ওঠে। এভাবে ছাত্রলীগ গত পাঁচ বছরে অজস্রবার সরকারকে ভীষণ বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে। কিন্তু সরকার এটা সহ্য করে কেন?
‘সন্ত্রাসী সন্ত্রাসীই, সন্ত্রাসীদের বরদাশত করা হবে না’—প্রধানমন্ত্রীর এই উক্তি আন্তরিক হলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে সেদিন যে ছয় অস্ত্রধারী ছাত্রলীগের নেতাকে দেখা গেছে, যাঁদের সশস্ত্র ছবি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, তাঁদের প্রত্যেককে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করা হোক। তাঁদের আইনের ধরাছোঁয়ার বাইরে রেখে এক গন্ডা মামলা দায়ের করে শত শত শিক্ষার্থীর গায়ে ফৌজদারি আসামির ছাপ্পড় মেরে দেওয়া কোনো কাজের কথা নয়। আর ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরাই যদি সব সন্ত্রাসের হোতা হয়ে থাকেন, তাহলে তাঁদের একজনকেও পুলিশ এখন পর্যন্ত অস্ত্র-বিস্ফোরকসহ পাকড়াও করতে পারল না কেন, এই প্রশ্নেরও জবাব পাওয়া দরকার।
শান্তিপূর্ণভাবে যাঁরা আন্দোলন করছেন তাঁদের মামলার আসামি করা ঠিক হয়নি, বাম ধারার ছাত্রসংগঠন করা আইনের দৃষ্টিতে কোনো অপরাধ নয়, আসামির তালিকা থেকে তাঁদের নাম বাদ দেওয়া উচিত। শত শত শিক্ষার্থীকে আসামি করে তাঁদের মাথার ওপর একাধিক ফৌজদারি মামলা ঝুলিয়ে রাখলে বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থিরতা কাটবে না, পড়াশোনার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরবে না। কিন্তু এখনকার প্রধান বিবেচনা হওয়া উচিত, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দিয়ে স্বাভাবিক শিক্ষাজীবনে ফিরতে হবে।

মশিউল আলম: সাংবাদিক, কথাসাহিত্যিক।

সংগঠনটি কি সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে?- স্বরূপে ফিরেছে ছাত্রলীগ!

Tuesday, February 4, 2014

নতুন করে ক্ষমতাসীন হয়ে বর্তমান সরকার নানা ক্ষেত্রে পরিবর্তনের আশ্বাস দিয়েছে, কিন্তু সরকারি দলের ছাত্রসংগঠনকে সম্ভবত ছাড় দিয়ে এর বাইরে রাখা হয়েছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারি দলের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগ প্রমাণ দিল যে তারা তাদের পুরোনো চরিত্রই ধরে রেখেছে। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দমনে শুধু পুলিশ দিয়ে কাজ হয়নি, মাঠে নামতে হয়েছে বা নামানো হয়েছে ছাত্রলীগকেও!

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর অস্ত্র নিয়ে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের হামলার এই ন্যক্কারজনক ঘটনার দায় প্রাথমিকভাবে ছাত্রলীগের ওই বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির হলেও সামগ্রিকভাবে সংগঠনটির এবং চূড়ান্ত বিচারে সরকারের। একটি ছাত্রসংগঠনের নেতা-কর্মীরা কিসের জোরে এমন বেপরোয়া হয়ে ওঠে, তা আমাদের সবারই জানা। প্রথম আলো পত্রিকায় অস্ত্র হাতে যাদের ছবি ছাপা হয়েছে, তারা অচেনা দুর্বৃত্ত নয়, এদের মধ্যে রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদক! তাঁরা অস্ত্র হাতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করেছেন! এঁদের নেতা বানিয়েছেন কারা? কাদের সমর্থন ও আশীর্বাদ রয়েছে তাঁদের ছাত্রলীগের নেতা হওয়ার পেছনে?
বর্ধিত বেতন-ভাতা প্রত্যাহার বা সন্ধ্যাকালীন মাস্টার্স কোর্স বন্ধের আন্দোলন কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক হতে
পারে। ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে বসে তা ঠিক করার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের। এর পরও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী রয়েছে। এসব বাদ দিয়ে ছাত্রলীগকে কেন মাঠে নামতে হলো? সরকারের তরফে সায় না থাকলে এভাবে প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে মাঠে নামার বিষয়টি কতটুকু বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে! এই অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিয়ে সরকারকে এখন প্রমাণ করতে হবে যে এই দুর্বৃত্তপনা ও অপকর্মে তাদের কোনো সায় ছিল না।
শিক্ষামন্ত্রী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনায় ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করে ‘তদন্তের ভিত্তিতে দায়ীদের’ বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন। আমরা শুধু আশ্বাস নয়, কার্যকর ব্যবস্থা দেখতে চাই। অস্ত্রধারী হিসেবে যাদের ছবি গণমাধ্যমে এসেছে, তারা তো এরই মধ্যে চিহ্নিত। একজন সাধারণ অস্ত্রধারী দুর্বৃত্ত ও ছাত্রলীগের এই নেতাদের মধ্যে আইনগত পার্থক্য করার কোনো সুযোগ নেই। আমরা দেখতে চাই, আইন তার নিজের গতিতে চলছে। কিন্তু সরকারি দলের ছাত্রসংগঠনের নেতাদের জন্য কি আইন নিজের মতো চলে? রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ ও ছাত্রলীগের হামলার ঘটনার পর কর্তৃপক্ষ অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করেছে এবং শিক্ষার্থীদের হল ত্যাগের নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু সবাই সময়মতো হল ত্যাগ করলেও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা নির্দিষ্ট সময়ের পরও হলে অবস্থান করছিলেন।
নতুন করে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর সরকারি দলের ছাত্রসংগঠন তাদের যে জঘন্য রূপ প্রকাশ করল, এর বিরুদ্ধে সরকার কী ব্যবস্থা নেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

ধরাছোঁয়ার বাইরে ছাত্রলীগের সেই অস্ত্রধারীরা

প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে গুলি করেছিল তারা। ক্যাম্পাসের পরিচিত মুখ। কিন্তু ঘটনার এক দিন পেরুলেও তাদের কারও টিকি স্পর্শ করতে পারেনি পুলিশ। হয়নি কোন মামলাও।
উল্টো চার মামলার আসামি হয়েছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কোন আলামতও দেখা যায়নি গতকাল পর্যন্ত। এদিকে হামলা ও সংঘর্ষের জের ধরে বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করায় গতকাল সকালেই সব ক’টি হল ত্যাগ করে শিক্ষার্থীরা। তবে প্রশাসনের নির্দেশ অমান্য করে ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ গতকাল দুপুর ১২টা পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু হলে অবস্থান করে। পরে রাবি ছাত্রলীগ সভাপতির নেতৃত্বে নেতাকর্মীরা হল থেকে বেরিয়ে আসে। এদিকে গতকাল দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয় রেজিস্ট্রার বাদী হয়ে বিস্ফোরক ও ভাঙচুরের ঘটনায় তিন শতাধিক শিক্ষার্থীর নামে মতিহার থানায় দু’টি মামলা করেছেন। এ ছাড়া সন্ধ্যায় পুলিশ বাদী হয়ে আরও দু’টি মামলা করে। তবে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা ও গুলিবর্ষণের ঘটনায় গতকাল পর্যন্ত কোন মামলা দায়ের বা কাউকে আটক করতে পারেনি পুলিশ। এদিকে রোববারের ঘটনা তদন্তে ছাত্রলীগও একটি কমিটি গঠন করেছে। গতকাল স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। মামলার বিষয়ে মতিহার থানার উপ-পরিদর্শক চিত্তরঞ্জন বলেন, মামলা দু’টির একটিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাজে বাধাদান, বিশৃঙ্খলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ আনা হয়েছে। অপরটি বিস্ফোরক আইনে মামলা করা হয়েছে। প্রথম মামলায় ৬০ জনকে নামসহ অজ্ঞাত দেড় শ’ এবং দ্বিতীয় মামলায় ৫০ জনের নামসহ অজ্ঞাত দেড় শ’ জনকে আসামি করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, থানার এসআই মাসুদুর রহমান বাদী হয়ে সোমবার সন্ধ্যায় দুটি পৃথক মামলায় ৪৫ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত ১৫০ জনকে আসামি করা হয়। মামলা দু’টি একটি সরকারি কাজে বাধা এবং অপরটি বিস্ফোরক আইনে দায়ের করা হয়েছে। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি তন্ময় আনন্দ অভি বাদী হয়ে শিবিরের বিশ্ববিদ্যালয় শাখা সভাপতি আশরাফুল আলম ইমনসহ ১২ জনের নাম উল্লেখ করে রাবি ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে একটি মামলা করা হয়েছে বলেও পুলিশের ওই কর্মকর্তা জানান। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১২ সালের ২রা অক্টোবর আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে শিবির-ছাত্রলীগের মধ্যে সংঘর্ষে ছাত্রলীগের যেসব নেতাকর্মী প্রকাশ্যে অস্ত্রবাজি করেছিল তাদের কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। বরং তাদের কেউ কেউ পুরস্কৃতও হয়েছে।

ওই সময় রাবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক তৌহিদ আল তুহিন (তৎকালীন সাংগঠনিক সম্পাদক), কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আখেরুজ্জামান তাকিম (তৎকালীন সহ-সভাপতি), রাবি ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদক তানিম (গণশিক্ষা সম্পাদক), রাবি ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি আতিক রহমান আতিক (উপ-দফতর সম্পাদক), যুগ্ম সম্পাদক নাসিম আহমেদ সেতু (উপ-পাঠাগার সম্পাদক) বেশ কয়েকজনকে পুলিশের সামনে প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে গুলি ছুড়তে দেখা গেছে। পরে এরা সবাই ছাত্রলীগের কাণ্ডারি হিসেবে খ্যাতি পেয়েছে। এ ছাড়া গত বছরের ২৮শে নভেম্বর ক্যাম্পাসের প্রধান ফটকের সামনে ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়কে ছাত্রলীগের অন্তত ১০ নেতাকর্মীর হাতে পুলিশের সামনে অস্ত্রবাজি করতে দেখা গেছে। সে সময় ছাত্রলীগের দফতর সম্পাদক আনিসুর রহমান, পলাশ, ফয়সাল আহমেদ রুনু, সাহানুর ইসলাম শাকিল, নাসিম আহমেদ সেতু, সুদীপ্ত সালামসহ বেশ কিছু নেতাকর্মীকে গুলি ছুড়তে দেখা যায়। এসব ছবি বিভিন্ন পত্রিকা ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াতেও এসেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত রোববার বর্ধিত ফি বাতিল ও সান্ধ্য কোর্স বন্ধের দাবিতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন-কর্মসূচিতে বিনা উসকানিতে হামলা চালায় ছাত্রলীগ। তাদের মুহুর্মুহু গুলি ও ককটেল হামলায় অন্তত ৩০ জন শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধ হন। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস স্ট্যান্ডের পেছন থেকে রাবি ছাত্রলীগের সভাপতি মিজানুর রহমান রানা একটি সাদা চাদর গলায় পেঁচিয়ে পিস্তল নিয়ে শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। একই সময় তার বাম পাশে কালো শার্ট পরে পিস্তল দিয়ে গুলি ছুড়তে দেখা যায় ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি রানা চৌধুরীকে। ওই সশস্ত্র দলটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ভবনের সামনে এসে পিস্তল উঁচিয়ে শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে আমির আলী হল সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শামসুজ্জামান ইমন। একই সময়ে ইমনের সামনেই কালো জ্যাকেট পরা সাদা পিস্তল হাতে গুলি ছুড়তে দেখা যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের যুগ্ম সম্পাদক নাসিম আহমেদ সেতুকে। সেতুর সামনে এগিয়ে শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে সাংগঠনিক সম্পাদক ফয়সাল আহম্মেদ রুনু। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মমতাজ উদ্দীন কলা ভবন পর্যন্ত তাড়া করেন কালো চাদর পরা সাবেক যুগ্ম সম্পাদক সুদীপ্ত সালাম। এ সময় তাকে এক হাতে পিস্তল ও অন্য হাতে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটাতে দেখা গেছে। সাবেক কমিটির এই নেতা বিভিন্ন হামলা ও সংঘর্ষে অস্ত্রবাজিতে নিজের পারদর্শিতা প্রমাণে সফল হলেও দলে তিনি বঞ্চিত নেতা হিসেবে পরিচিত।
প্রশাসন ও ছাত্রলীগের তদন্ত কমিটি
শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক খালিকুজ্জামানকে প্রধান করে গত রোববার রাতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের জরুরি সিন্ডিকেট সভায় পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক নজরুল ইসলাম, ফলিত গণিত বিভাগের অধ্যাপক শামসুুল আলম সরকার, সিন্ডিকেট সদস্য এডভোকেট ইব্রাহিম হোসেন এবং কমিটির সদস্য সচিব হলেন বিশ্ববিদ্যালয় রেজিস্ট্রার অধ্যাপক এন্তাজুল হক।
অপরদিকে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগও ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। কমিটির সদস্যরা হলেন- কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি জয়দেব নন্দী, শাহিনুর রশীদ জুয়েল, জিয়াউল হক, যুগ্ম সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাক ও দপ্তর সম্পাদক শেখ রাসেল। তদন্ত কমিটিকে আগামী পাঁচদিনের মধ্যে কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি মিজানুর রহমান রানা বলেন, ছাত্রলীগ অস্ত্র নিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর কোন হামলা করেনি। বরং শিবিরের ক্যাডাররাই ক্যাম্পাসে হামলা চালালে আমাদের নেতাকর্মী আহত হয়। নিজেদের বাঁচাতে আমরাও আক্রমণ করি।
ছাত্রলীগের কাছে অস্ত্র থাকার বিষয়ে সোজাভাবে না বলে ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, প্রতিটি মানুষ যেখানে জীবনের নিরাপত্তা গ্রহণ করে ছাত্রলীগও নিজেদের নিরাপত্তার জন্য অনেক কিছুই করছে। অন্যদিকে, মতিহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জিএম সামসুর নূর বলেন, ছাত্রলীগের অস্ত্রধারী নেতাদের আটক করতে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। খুব দ্রুত অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা হবে বলেও জানান তিনি।
অস্ত্রধারীরা সন্ত্রাসী: শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অস্ত্র হাতে যারা মহড়া দিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। সচিবালয়ে নিজের দপ্তরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, যার হাতে অস্ত্র থাকে, সে ছাত্র নয়, সন্ত্রাসী। তার কোন দল থাকতে পারে না।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিষয়ে তিনি বলেন, তদন্ত কাজ চলছে। যারা দোষী সাব্যস্ত হবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। ছাত্রদের ওপর হামলাকারী কারা, তাদের অস্ত্র কোথায় গেল, আন্দোলনে কার কি ভূমিকা ছিল- সব বিষয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
শিক্ষক সমিতির সংবাদ সম্মেলন: বিশ্ববিদ্যালয়ের জুবেরী ভবনসহ বিভিন্ন ভবনে হামলা ও ভাঙচুরের প্রতিবাদে দুপুর সাড়ে ১২টায় ডিনস কমপ্লেক্সে সংবাদ সম্মেলন ও মানববন্ধন করেছে শিক্ষক সমিতি। সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক সুলতান-উল ইসলাম লিখিত বক্তব্যে বলেন, সান্ধ্যকালীন মাস্টার্স কোর্স বন্ধ ও বর্ধিত ফি বাতিলে দাবিতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে কিছু শিক্ষার্থী আন্দোলন করছিল। এ নিয়ে গত রোববার ক্যাম্পাসে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় তারা শিক্ষকদের সঙ্গে চরম দুর্ব্যবহার করে এবং বিভিন্ন একাডেমিক ভবন, আবাসিক হল এমনকি শিক্ষকদের বাসভবন, চেম্বার ও অফিসে হামলা-ভাঙচুর চালায়। এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মাঝে অসন্তোষ বিরাজ করছে। শিক্ষক সমিতি নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক সংগঠন হিসেবে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তে একটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ক্লাব ও বাসভবনে হামলার ঘটনায় তারা তীব্র নিন্দা জানায়। এর আগে সকাল সাড়ে ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনের সামনে একই দাবিতে শিক্ষক সমিতি মানববন্ধন করে।
সাংবাদিকদের মানববন্ধন: অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত সাংবাদিকদের উপর পুলিশি হামলার প্রতিবাদে গতকাল দুপুর সোয়া ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত সাংবাদিকদের ব্যানারে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন তারা। মানববন্ধনে বক্তারা সাংবাদিকদের উপর পুলিশি  হামলার নিন্দা জানান।
গ্রেপ্তার ১: মতিহার ওসি জানান, রোববার ক্যাম্পাসে ভাঙচুরের অভিযোগে সোমবার ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র সজীব আহমেদকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ যাদের নাম পেয়েছে, তাদের মামলায় আসামি করা হয়েছে।

নিরাপত্তা ও শিক্ষা দুটোই জরুরি বিষয়- স্কুলে পুলিশ ক্যাম্প

Wednesday, January 22, 2014

রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে গত বছর নানা সময়ে চরমভাবে ব্যাহত হয়েছে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন। এখন পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক হয়েছে, শুরু হয়েছে নতুন শিক্ষাবর্ষ।
কিন্তু ঠাকুরগাঁও জেলার গোপালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন এখনো স্বাভাবিক হতে পারছে না। স্কুলটি এখন পুলিশ ক্যাম্প, ফলে ক্লাস ও পাঠদান সবই বন্ধ!

গত বছর ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষার যে ক্ষতি হয়েছে, তা পুষিয়ে নেওয়ার জন্য নতুন বছরের শুরুতে নতুন উদ্যমে পাঠদান শুরুর বিষয়টিই ছিল প্রত্যাশিত। শিক্ষার্থীরা নতুন বইও পেয়েছে, কিন্তু স্কুল বন্ধ থাকায় এই স্কুলটি শিক্ষার্থীদের জীবনে গত বছরের ক্ষতির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নতুন ক্ষতি। স্কুলটিকে পুলিশ ক্যাম্প বানানোর পেছনে বাস্তব কারণ রয়েছে। ভোটের দিন বিএনপি ও জামায়াতের কর্মীদের হামলার শিকার হয়েছে ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার হওয়া স্কুলটি। আর ভোটের পর সেই একই গোষ্ঠীর হামলার শিকার হয় কাছাকাছি এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের দোকান ও বাড়িঘর। এ নিয়ে সংঘাত-সহিংসতায় একজনের প্রাণহানিও ঘটেছে। ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ক্যাম্প বসানো হয় স্কুলটিতে। শিক্ষা না নিরাপত্তা—এ বিবেচনায় সম্ভবত নিরাপত্তার বিষয়টিই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চয় গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনও তো এভাবে দিনের পর দিন নষ্ট করার সুযোগ নেই। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিশুদের শিক্ষার দিকটিকেও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এখন প্রতিযোগিতামূলক সমাপনী পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই ক্লাস বন্ধ থাকায় এই বিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা অন্যান্য বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের চেয়ে পিছিয়ে পড়বে। স্কুলটি খোলা রেখে কীভাবে সে অঞ্চলের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখা যায় বা বিকল্প হিসেবে কোথায় পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা যায়, সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। আমরা এ ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসনের মনোযোগ প্রত্যাশা করছি। আর সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার ভার শুধু প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর ছেড়ে না দিয়ে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়কেও অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে।

এ নিপীড়ন সার্বক্ষণিক ও বহুমাত্রিক by জাকারিয়া পলাশ

Sunday, January 19, 2014

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক স্বাধীন সেন বলেছেন, সদ্য নির্বাচন কেন্দ্রিক সাম্প্রদায়িক হামলাগুলো আমাদের নজরে আসছে। কিন্তু নিপীড়ন চলছে সার্বক্ষণিক।
নির্বাচন নিপীড়নকে আরও প্রত্যক্ষ করে তুলেছে, নিপীড়নের সহিংস রূপের প্রকট প্রকাশ ঘটিয়েছে মাত্র। প্রতিদিনের জীবনযাপনে আমরা সাম্প্রদায়িক বিভেদকে পরিপুষ্ট করে চলেছি। একই সঙ্গে বলে চলেছি, আমরা অসাম্প্রদায়িক।

মানবজমিন অনলাইনকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, সাম্প্রদায়িক হামলার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনা যেমন দরকার, তেমনই দরকার বিভেদের অনুশীলনগুলোকে চিহ্নিত করে সেগুলো দূর করার রাস্তা খোঁজা। সাংবিধানিক, আইনগত, চর্চাগত বৈষম্যগুলোকে দূর করার তৎপরতা জোরেশোরে শুরু করা দরকার।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসের দাপুটে বয়ান আর জাতীয়তাবাদী আখ্যানে সাম্প্রদায়িক সংঘাত ও সহিংসতার চেতনাগত প্রেক্ষাপটকে স্বীকার করা হয় না। একে কেবল ‘রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন’ হিসেবে শনাক্ত করা হয়। এটাই সাম্প্রদায়িকতা জারি থাকার অন্যতম প্রধান কারণ। অন্যদিকে, সাংবিধানিক, আইনগত ও গণতান্ত্রিক বিধিবিধানের পক্ষপাতদুষ্ট প্রয়োগের মধ্য দিয়েই স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা পৌনঃপুনিকভাবে ঘটে চলেছে।
সাম্প্রদায়িকতার ইতিহাসের এই গবেষক আরও বলেছেন, বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক নিপীড়নের ঐতিহ্য নতুন নয়। আমার মতে, সাম্প্রদায়িকতা প্রধানত দুই রকমের, এক. ইতিহাস ও চৈতন্যগত; দুই. বিভিন্নভাবে নির্মিত ও সৃষ্ট। উপনিবেশপূর্ব ও উত্তর-ঔপনিবেশিক ইতিহাসে ধর্মীয় ও জাতিগত বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘাত আর এক সম্প্রদায়ের ওপরে আরেক সম্প্রদায়ের সহিংসতার ঘটনাবলি বিভিন্ন ঐতিহাসিক শর্ত দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। ‘বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ’-এই কথাটির পেছনেও ঐতিহাসিক অসত্যতা আছে। মুক্তিযুদ্ধের পরে বাংলাদেশে অ-মুসলিম ও অ-বাঙালিদের ওপরে নানামুখী নিপীড়নের, নির্যাতনের ও রাষ্ট্রীয় অন্যায়ের অনেক ঘটনা আছে। ঐতিহাসিক ও চৈতন্যগতভাবে জন্ম নেয়া সাম্প্রদায়িক বিভেদকে বিলোপ করার চেষ্টা করা হয়নি। বরং তাকে আড়াল করে আমরা ‘সংখ্যাগুরুর’ দাপটকে বৈধতা দিয়ে চলেছি।
এই সহিংসতার পেছনে দায়ী কারা এমন প্রশ্নে তিনি বলেছেন, পুনঃপুনঃ সাম্প্রদায়িক হামলার পেছনে শুধুমাত্র ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’কে দায়ী করলে সামগ্রিক চিত্র স্পষ্ট হয় না। সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক দিকগুলোও এখানে মুখ্য। অ-মুসলিম ও অ-বাঙালিদের জমি, বসতভিটা ও ব্যবসা দখলের আইনি ও বেআইনি তৎপরতাগুলো ব্যাপক ও স্বাভাবিকভাবে চলে আসছে। এর পেছনে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষিতের মতো বহুমাত্রিক বিষয় জড়িত ছিল।
বারবার হামলা, নির্যাতনের পরও দায়ীরা দায়মুক্তি পেয়ে যাচ্ছে। এর পেছনে কোন রাজনৈতিক স্বার্থ আছে বলে মনে করেন কি? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সাংবিধানিকভাবেই তো বাংলাদেশে অ-মুসলিম ও অ-বাঙালিরা প্রথম শ্রেণীর নাগরিক নন। বিশেষ পরিস্থিতিতে ‘সংখ্যালঘুদের’ জন্য আলাদা নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেয়ার ঘটনা এটাই প্রমাণ করে। অর্পিত সম্পত্তির মত নিবর্তনমূলক আইন এখনও বলবৎ রয়েছে। সাম্প্রদায়িক সহিংসতা কমিয়ে আনার জন্য রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি হিসেবে আলাদা আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়ার কথা ভাবা যেতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে যে, যে ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ বিভিন্ন সময়ে সহিংসতা ও হামলার সঙ্গে জড়িত থাকে তারা রাষ্ট্র ও ক্ষমতা বদলের সঙ্গে সঙ্গে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা পায়। বিচার না করাও এক ধরনের পৃষ্ঠপোষকতারই প্রমাণ। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত কোন সাম্প্রদায়িক হামলাকারীরই বিচারের ও শাস্তির নজির নেই। শুধু রাজনৈতিকই নয়, দলীয় স্বার্থ, আত্মীয়তার স্বার্থ, অর্থনৈতিক স্বার্থ, গোষ্ঠীগত স্বার্থ- এমন নানামুখী ও বিচিত্র স্বার্থ এখানে জড়িত থাকে। আর এ সাম্প্রদায়িকতা সর্বদলীয়। বিচারহীনতা এর অন্যতম কারণ। তবে সেটা একমাত্র কারণ না। আমাদের যাপিত জীবনে অসাম্প্রদায়িকতা যেমন সত্য, সাম্প্রদায়িকতাও তেমনই বাস্তব। একটি গভীর বহুত্ববাদী সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য সামাজিক ও সাংস্কৃতিক লড়াই শুরু করা জরুরি। একথা আজ প্রমাণিত যে, এই লড়াই লড়তে গেলে বিদ্যমান ইতিহাস চৈতন্য, জাতীয়তাবাদী স্বৈরাচার, আর বহু ব্যবহারে জীর্ণ ভাষা ও অভিব্যক্তির জায়গায় ভিন্ন ভাষা-অভিব্যক্তি-চর্চার সন্ধান আমাদের করতে হবে। সেটা দীর্ঘমেয়াদি কাজ। আপাতত, দায়িদের বিচারের আওতায় আনা আর সহিংসতার শিকার মানুষগুলোর মধ্যে স্বাভাবিকতার বোধ ফিরিয়ে আনা দরকার। সেই উদ্যোগ রাষ্ট্র, সরকার, প্রচারমাধ্যম এবং সংখ্যাগুরুসহ ক্ষমতাশালী পক্ষগুলোকেই নিতে হবে।
 
Support : Dhumketo ধূমকেতু | NewsCtg.Com | KUTUBDIA @ কুতুবদিয়া | eBlog
Copyright © 2013. News 2 Blog 24 - All Rights Reserved
Template Created by Nejam Kutubi Published by Darianagar Publications
Proudly powered by Dhumketo ধূমকেতু