ইউপি নির্বাচনে সহিংসতাঃ গুলিতে নিহত ২, তিন শতাধিক আহত

Monday, June 13, 2011

উনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে হামলা ভাঙচুর গুলি অগি্নসংযোগ ও হতাহতের ঘটনা ঘটেই চলছে। সারাদেশে নির্বাচনী সহিংসতায় নিহত দুইজন, আহত তিন শতাধিক। আটক আটজন। ঝিনাইদহে সংঘর্ষে গুলিবর্ষণ হয়েছে, আহত হয়েছে বিশজন, আটক দুজন। কুড়িগ্রামে ব্যালট পেপার ছিনতাইকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে আহত শতাধিক, আটক পাঁচজন। সরাইলে (ব্রাক্ষণবাড়িয়া) সংঘর্ষে নিহত দুজন, আহত দশজন।

নবীনগরে (ব্রাক্ষণবাড়িয়া) আহত একজন এবং আটক একজন। মুক্তাগাছায় (ময়মনসিংহ) প্রতিপক্ষের বাড়িতে অগি্নসংযোগ করা হয়। সংঘর্ষে আহত হয় সাতজন। দুপক্ষ থানায় পাল্টাপাল্টি মামলা দায়ের করেছে। বিরামপুরে (দিনাজপুর) প্রিজাইডিং কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ভোট কারচুপির অভিযোগ করেছে চারজন প্রার্থী। নির্বাচনী সহিংসতায় ও পুলিশের অস্ত্র ছিনতাইয়ের অভিযোগে মামলার গ্রেফতার এড়াতে সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) বর্তমানে পুরুষ শূন্য। ময়মনসিংহে হামলার ঘটনায় দু চেয়ারম্যান প্রার্থীর পাল্টাপাল্টি মামলা। মুন্সীগঞ্জে দফায় দফায় সংঘর্ষ হামলা ও পাল্টা হামলায় আহত শতাধিক। যশোরের অভয়নগর উপজেলার সিদ্ধিপাশা ইউপি নির্বাচনে এক পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের লিখিত অভিযোগ করেছেন ইউনিয়নের এক চেয়ারম্যান প্রার্থী। দেশের নানা স্থান থেকে আমাদের সংবাদদাতা ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :
ঝিনাহদহ : শৈলকুপায় ইউপি নির্বাচনে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের দু'গ্রুপের সংঘর্ষে বিশজন আহত হয়েছে। এ সময় গুলি বর্ষণের ঘটনা ঘটে। পুলিশ দুই চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীকে আটক করেছে। সূত্র জানায়, উপজেলার ১১ নং আবাইপুর ইউনিয়নে সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান থানা আওয়ামী লীগের সদস্য মোক্তার হোসেন মৃধা ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা এবং চেয়ারম্যান প্রার্থী আমজাদ হোসেন মোল্লার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ দু'গ্রুপে দ্বন্দ্ব রয়েছে। সূত্র জানায়, শনিবার রাতে যুগনী-বাঘিনী গ্রামে আমজাদ হোসেন মোল্লার মিটিংয়ের ওপর প্রতিপক্ষ হামলা চালালে ছয়জন আহত হয়। এর জের ধরে গতকাল সকালে মোল্লার লোকজন হাটফাজিলপুর বাজারে মৃধার নির্বাচনী কার্যালয়ে হামলা চালালে দুপক্ষে সংঘর্ষ লেগে যায়। এক পর্যায়ে মৃধা একটি বিল্ডিংয়ে অবরুদ্ধ হয়ে পড়লে তিনি লাইলেন্স করা শটগান দিয়ে ছয় রাউন্ড গুলি ছোড়ে। গোলা বর্ষণ, ইটপাটকেল ও ঢাল-সড়কির শব্দে বাজার রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এ সময় আহত হয় বিশজন। আহতের মধ্যে গুরুতর অবস্থায় দুজনকে ঝিনাইদহ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, সংঘর্ষ চলাকালে হাটফাজিলপুর ক্যাম্পের পুলিশ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে। পরে শৈলকুপা থানা ও ঝিনাইদহ থেকে অতিরিক্ত দাঙ্গা পুলিশ ঘটনাস্থলে পেঁৗছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে। শৈলকুপা থানার ওসি ছগির মিয়া জানান, আমজাদ হোসেন মোল্লা ও মোক্তার হোসেন মৃধাকে আটক করা হয়েছে।
কুড়িগ্রাম : কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলায় নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর পরাজিত প্রার্থীর সমর্থকরা প্রিজাইডিং অফিসারের গতি রোধ করে ব্যালট পেপার ছিনতাই, আনসার সদস্যদের সঙ্গে হাতাহাতি এবং বিজয়ী প্রার্থীর সমর্থকদের মারধর করে। ছিনতাই হয় ব্যালট পেপারের বস্তাসহ তিনটি মোটরসাইকেল। এ সময় পুলিশ ও আনসার সদস্যসহ উভয় পক্ষের শতাধিক আহত হয়। পুলিশ পাঁচজনকে আটক করে। গুরুতর আহত অবস্থায় একজনকে রংপুর মেডিকেল কলেজে ভর্তি করা হয়।
সরাইল (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) : সরাইলে পরাজিত প্রার্থীর সমর্থকদের হামলায় শনিবার উপজেলা চেয়ারম্যানের ভাইসহ দুজন নিহত ও দশজন আহত হয়েছে। সূত্র জানায়, নির্বাচনের পরাজিত প্রার্থী মো. মনির উদ্দিনের লোকজন সকাল সাড়ে দশটায় উপজেলা চেয়ারম্যান রফিকউদ্দিন ঠাকুরের বাড়িতে হামলা করে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায় এবং বাড়ি ও কয়েকটি দোকান ভাঙচুর করে। হামলায় বেশ কয়েকজন আহত হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় ঠাকুরের ভাই আনিস ঠাকুরকে সরাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। আহত লিলু মিয়া জেলা সদর হাসপাতালে নেয়ার পথে মারা যান।
নবীনগর (ব্রাক্ষণবাড়িয়া) : নবীনগর উপজেলার শ্রীরামপুরে পরাজিত চেয়ারম্যান প্রার্থী আজহার হোসেন জামালের সহকর্মী নুরু মিয়াকে দা ও চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করেছে দুর্বৃত্তরা। জানা গেছে, শনিবার রাতে পরাজিত চেয়ারম্যান প্রার্থীর সহকর্মী নুরু মিয়া মেয়ের বাড়ি থেকে নিজ বাড়িতে যাওয়ার পথে শিবির নামক স্থানে পৌঁছলে একই গ্রামের লিজনের নেতৃত্বে একদল দুর্বৃত্ত দা ও চাপাতি দিয়ে তার হাত পা কেটে দেয়। স্থানীয় লোকজন নুরু মিয়াকে নবীনগর হাসপাতালে নিয়ে আসলে কর্তব্যরত ডাক্তার আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে প্রেরণ করে। বর্তমানে সে পঙ্গু হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে। এই ঘটনায় থানায় মামলা হলে পুলিশ গতকাল জসিম মিয়া নামে একজনকে আটক করেছে।
মুক্তাগাছা (ময়মনসিংহ) : মুক্তাগাছার পাঁচ বাশাটী ইউনিয়নে দুই চেয়ারম্যান প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ, হামলা, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও প্রার্থীর বাড়িতে অগি্নসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এতে দুই গ্রুপের সাতজন আহত হয়। থানায় পাল্ট-পাল্টি মামলা হয়েছে। সূত্র জানায়, দুই চেয়ারম্যান প্রার্থী নুরুল ইসলাম আকন্দ ও আব্দুল বারী সরকারের সমর্থকদের মধ্যে শনিবার ভোট নিয়ে তর্ক-বিতর্ক হলে সন্ধ্যায় আকন্দের এক কর্মীকে প্রতিপক্ষের লোকজন মারধর করে। আকন্দের সমর্থকরা শনিবার রাতে প্রতিবাদ মিছিল বের করলে প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে। উভয়পক্ষের মধ্যে রাত দেড়টা পর্যন্ত বাঁশের লাঠি ও দেশীয় অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে ধাওয়া ও পাল্টা ধাওয়া ঘটে। এ সময় উভয় পক্ষের সাতজন আহত হয় এবং বারী সরকারের বাড়িতে অগি্নসংযোগের ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে মুক্তাগাছা থেকে ফায়ার সার্ভিসের দমকল বাহিনী গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। দুপক্ষ থানায় পাল্টা-পাল্টি অভিযোগ দায়ের করেছে।
বিরামপুর (দিনাজপুর) : বিরামপুর উপজেলার চার নং দিওড় ইউনিয়নে ইউপি নির্বাচনে ভোট কারচুপির অভিযোগ করছে চারজন পরাজিত সদস্য পদপ্রার্থী। অভিযোগে বলা হয়, ৫ জুন অনুষ্ঠিত ইউপি নির্বাচনে চার নং দিওড় ইউনিয়নের এক নং ওয়ার্ড রঘুনাথপুর ভোট কেন্দ্রের প্রিজাইডিং কর্মকর্তা সদস্য পদের প্রতিদ্বন্দ্বী মো. সুলতান মাহমুদ মিন্টুর যোগসাজশে ভোট গণনার আগে আমাদের এজেন্টকে হুমকি দিয়ে কেন্দ্র থেকে বের করে দিয়ে মিন্টুকে বিজয়ী ঘোষণা করে। প্রতিবাদ করতে সে পুলিশকে দিয়ে আমাদের হুমকি দেয়। যে কারণে প্রিজাইডিং কর্মকর্তা এজেন্টদের স্বাক্ষর ছাড়াই ফলাফল শিট রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে জমা দেন।
সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) : সুন্দরগঞ্জে নির্বাচনোত্তর সহিংসতায় পুলিশের অস্ত্র ছিনতাইয়ের পর অস্ত্র উদ্ধার ও ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত দুজনকে পুলিশ গ্রেফতার করলেও দায়েরকৃত মামলায় চলি্লশজন আসামি থাকায় গ্রেফতার আতংকে পুরো একটি গ্রাম এখনও পুরুষ শূন্য হয়ে পড়েছে। সরজমিনে উপজেলার বজরা কঞ্চিবাড়ীর গয়েসপাড়া এলাকায় দেখা গেছে, প্রতিটি বাড়িতে তালা। মহিলারা জানায়, ৫ জুন পুলিশ ও আনসারদের আহত করে কে বা কারা রাইফেল ছিনতাই করা হয়। ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে এক চেয়ারম্যানপ্রার্থীসহ দুজনকে আটক করা হলেও এজাহারে নাম অজ্ঞাত থাকায় গ্রামটির পুরুষরা এলাকায় ফিরছে না।
ময়মনসিংহ : ফুলবাড়িয়া উপজেলায় গতকাল ভোরে উপজেলার বালিয়ান ইউনিয়নে আ'লীগ চেয়ারম্যান প্রার্থীর বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর করেছে আ'লীগের অপর চেয়ারম্যান প্রার্থীর সমর্থকরা। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ভোর চারটার দিকে আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থী মফিজ উদ্দিন ম-ল নির্বাচনী কার্যক্রম শেষে তেলিগ্রাম বাজারে আসার পথে চামার বাজাইল মোড়ে এসে পেঁৗছলে অপর আ'লীগের প্রার্থী মোতালেব সরকারের সমর্থকরা তাকে লাঞ্ছিত করে। এর তিন ঘণ্টা পর ম-লের সমর্থকরা মোতালেব সরকারের বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও লুটপাট করে। মোতালেব সরকার বাদী হয়ে ফুলবাড়িয়া থানায় সত্তরজনের নামে মামলা দায়ের করেন। অপরদিকে মফিজ উদ্দিন ম-ল বাদী হয়ে আশিজনের নামে মামলা করেন।
মুন্সীগঞ্জ : মোল্লাকান্দি ইউনিয়নের রাজারচর, সামারচর ও খাসকান্দি এলাকায় রিপন পাটোয়ারী ও শাহ আলম মলি্লকের সমর্থকদের মাঝে দফায় দফায় সংঘর্ষ হামলা ও পাল্টা হামলায় আহত হয়েছে শতাধিক। জানা গেছে, ভোট চাওয়াকে কেন্দ্র করে এই হামলার ঘটনা ঘটেছে। হামলা পাল্টা হামলা এখনো অব্যাহত আছে। আহতদের মধ্যে দুজনের অবস্থা গুরুতর।
অভয়নগর (যশোর) : অভয়নগর উপজেলার সিদ্ধিপাশা ইউপি নির্বাচনে এক পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আচরণবিধি লংঘনের লিখিত অভিযোগ করেছেন ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রার্থী বিএম নজরুল ইসলাম। অভিযোগে জানা যায়, অভয়নগর থানার এএসআই জাহাঙ্গীর আলম ওই ইউনিয়নে একজন চেয়ারম্যান প্রার্থীর পক্ষ নিয়ে সরাসরি নির্বাচনী এলাকার ভোটারদের কাছে ভোট প্রার্থনা করছেন। যারা তার কথায় কাজ করতে রাজি হচ্ছেন না, তাদের গালি-গালাজ, হুমকি-ধমকি ও মারপিট করছেন। জাহাঙ্গীর আলম ১০ জুন অপ্রাপ্ত বয়স্ক ইমরান হোসেনকে চশমা প্রতীকের পোস্টার লাগাতে বললে ইমরান অপারগতা প্রকাশ করায় তাকে বেদম মারপিট করে অজ্ঞান অবস্থায় ফেলে রেখে যায়। স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে ফুলতলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে।

সিদ্ধিরগঞ্জে শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষে নিহত ১

Monday, January 24, 2011

চাকরি স্থায়ীকরণ ও মজুরি বাড়ানোর দাবিতে গতকাল রোববার নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে এসিআই ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের কারখানার শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। এ সময় পুলিশের গুলিতে এনামুল হক (২৫) নামের এক শ্রমিক নিহত এবং ১৫ জন আহত হয়েছেন বলে শ্রমিকেরা অভিযোগ করেছেন। তবে পুলিশের দাবি, শ্রমিকদের ইটপাটকেলের আঘাতে এনামুলের মৃত্যু হয়েছে।

দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের সময় বিক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা হামলা চালিয়ে কারখানার প্রতিটি বিভাগ তছনছ করেন। ভাঙচুর করেন ১২টি গাড়ি। পুরো কারখানা পরিণত হয় ধ্বংসস্তূপে। শ্রমিকদের ইটপাটকেল নিক্ষেপ এবং পুলিশের লাঠিপেটায় আহত হয়েছেন ১০ পুলিশ সদস্য, পথচারী, শ্রমিকসহ অন্তত শতাধিক ব্যক্তি।
সংঘর্ষের সময় শ্রমিকেরা প্রতিষ্ঠানের মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) ইশতিয়াক আহম্মেদকে মারধর ও অবরুদ্ধ করে রাখেন। এক ঘণ্টা পর তাঁকে গুরুতর আহতাবস্থায় উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। কারখানার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানা যায়নি।
নিহত এনামুলের বাড়ি রংপুর জেলায়। তিনি নারায়ণগঞ্জ শহরের হাজীগঞ্জ এলাকায় একটি বাসায় ভাড়া থাকতেন। এসিআই ওষুধ কারখানায় অস্থায়ী শ্রমিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
গতকাল রাত সোয়া আটটায় নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল মর্গে নিহত এনামুলের নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়। তাঁর মুখ ও বুকে অনেকগুলো রাবার বুলেটের চিহ্ন।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্র জানায়, সিদ্ধিরগঞ্জের গোদনাইল পানিরকল এলাকায় অবস্থিত এসিআইয়ের ওষুধ কারখানায় ১৬৭ জন স্থায়ী শ্রমিক ও ৬০০ অস্থায়ী শ্রমিক কাজ করেন। গত বৃহস্পতিবার স্থায়ী এক শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়েছে দাবি করে অস্থায়ী শ্রমিকেরা কাজ বন্ধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন। একপর্যায়ে তাঁরা মজুরি বাড়ানোর দাবি জানান। অস্থায়ী শ্রমিকদের দৈনিক ১২০ থেকে ১৪০ টাকা মজুরি দেওয়া হয়। শ্রমিকেরা এই মজুরি ২৫০ টাকা করার দাবি জানান।
দাবি আদায়ে অস্থায়ী শ্রমিকেরা গতকাল সকালে কাজ বন্ধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন। তাঁরা কারখানার ভেতরে দফায় দফায় বিক্ষোভ মিছিল করেন। শ্রমিকেরা তাঁদের দাবি আদায়ে অনড় থাকেন। একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা প্রতিষ্ঠানের মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) ইশতিয়াক আহম্মেদকে অবরুদ্ধ করে রাখেন। তাঁরা কারখানার দুটি ইউনিটে (এনিমেল ড্রাগস ও হিউম্যান ড্রাগস) ভাঙচুর চালান। এতে আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে বেলা ১১টায় ঘটনাস্থলে যায় সিদ্ধিরগঞ্জ থানার পুলিশ। এ সময় আন্দোলনরত শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ বেধড়ক লাঠিপেটা করে। শ্রমিকেরা পাল্টা পুলিশের ওপর ইটপাটকেল ও ওষুধের কাচের বোতল নিক্ষেপ করেন। শুরু হয় দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ। শ্রমিকেরা কারখানার ভেতরে সাতটি মাইক্রোবাস, তিনটি কাভার্ড ভ্যান, একটি পিকআপ ভ্যান ও একটি প্রাইভেট কার ভাঙচুর করেন। দফায় দফায় চলে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া আর সংঘর্ষ।
পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কাঁদানে গ্যাসের শেল ও রাবার বুলেট ছোড়ে। এতে অন্তত ১৫ জন গুলিবিদ্ধ হন। তাঁদের শহরের খানপুরে অবস্থিত ২০০ শয্যাবিশিষ্ট নারায়ণগঞ্জ হাসপাতালে পাঠানো হয়। দুপুর সাড়ে ১২টায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় কারখানার অস্থায়ী শ্রমিক এনামুলের মৃত্যু হয়।
আহত ব্যক্তিদের মধ্যে আর্মড পুলিশের নায়েক মনির হোসেন, কনস্টেবল হেলাল এবং ২৬ শ্রমিককে শহরের ২০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এঁদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। আহত অন্যদের স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
গতকাল বেলা তিনটায় গিয়ে দেখা যায়, পুরো কারখানা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। কারখানার জানালার কাচ, চেয়ার, টেবিলসহ আসবাব, কম্পিউটার, বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ভাঙচুর করা হয়েছে। প্রতিটি কক্ষই ছিল তছনছ। কারখানা পাহারা দিচ্ছিল পুলিশ ও র‌্যাব সদস্যরা। কারখানার কর্মকর্তাদের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তাঁরা কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শ্রমিক সোহেল, ময়না, সজীব ও মামুন জানান, ‘আমরা মূল মজুরি ১২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫০ টাকা করার দাবি করছিলাম। কিন্তু কারখানা কর্তৃপক্ষ আমাদের দাবি মেনে নেয়নি। দাবি আদায়ে আন্দোলন করলেই শ্রমিকদের ছাঁটাই করা হয়। ১৫ বছর ধরে চাকরি করছেন এমন অনেক শ্রমিক আছেন, যাঁদের চাকরি এখনো স্থায়ী করা হয়নি। এসব দাবিতে কয়েক দিন ধরে আমরা কারখানায় শান্তিপূর্ণভাবে কর্মবিরতি পালন করছিলাম। কিন্তু গতকাল সকালে পুলিশ আমাদের ওপর বেপরোয়া লাঠিপেটা ও গুলিবর্ষণ করে। পুলিশের গুলিতে আমাদের সহকর্মী এনামুল হক নিহত হন। গুলিবিদ্ধ হন আরও ১৫ শ্রমিক। আহত হন শতাধিক।’
এসিআই কারখানার সিবিএ সভাপতি নুরুল হক দাবি করেন, পুলিশ নিরীহ শ্রমিকদের ওপর বেপরোয়া লাঠিপেটা ও গুলিবর্ষণ করেছে। তিনি হতাহতদের ক্ষতিপূরণ দাবি করেন।
এ বিষয়ে এসিআই কারখানার আহত কর্মকর্তা ইশতিয়াক আহম্মেদ জানান, শ্রমিকেরা অযৌক্তিক দাবিতে কয়েক দিন ধরে কারখানায় কর্মবিরতি পালন করছেন। গতকাল সকালে শ্রমিকেরা কারখানায় হামলা ও ভাঙচুর করলে পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষ বাধে।
সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম বদরুল আলম জানান, শ্রমিকেরা কারখানায় ভাঙচুর চালালে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ৩০-৪০টি কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ ও লাঠিপেটা করে। একপর্যায়ে শ্রমিকেরা লাঠিসোঁটা নিয়ে পুলিশের ওপর হামলা চালালে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শতাধিক রাউন্ড রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। তবে পুলিশের গুলিতে এনামুলের মৃত্যু হয়নি। শ্রমিকদের ইটপাটকেলের আঘাতে তাঁর মৃত্যু হয়েছে।
ওসি বদরুল জানান, সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত এনামুলের লাশের সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত করা হয়নি। সংঘর্ষ, কারখানায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছে। পুলিশ সুপার বিশ্বাস আফজাল হোসেন জানান, ‘ঘটনাটি শুধুই শ্রমিক অসন্তোষ, নাকি পেছনে কারও ইন্ধন রয়েছে, আমরা তা খতিয়ে দেখছি।’

হবিগঞ্জ : শান্তির শহরে হঠাৎ রেষারেষি

Tuesday, January 18, 2011

৫ বছর পেরোনো করিমুন্নেছা একটি ভোট দিতে চেয়েছিলেন। ছেলে ফরহাদ এলাহী সেতু মাকে কোলে করে স্থানীয় আবাসিক এলাকা প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু এরই মধ্যে কেন্দ্রটি দখল হয়ে যায়। ওই মাকে ফিরতে হয় ভোট না দিয়েই।

হবিগঞ্জে ২০০৪ সালের পৌর নির্বাচনের ভোট না দিতে পারার এই কষ্টটি এখনো তাড়িয়ে বেড়ায় ছেলে সেতুকে। সেতুর মা কি এবার ভোট দিতে পারবেন? এবারও কি দখল হবে ভোটকেন্দ্র?
ছিমছাম শান্তির শহর হবিগঞ্জে আজ পৌর নির্বাচন। এখানে মূল লড়াই মহাজোট প্রার্থী শরীফ উল্লাহ ও বর্তমান মেয়র এবং বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী জি কে গউছের মধ্যে। কিন্তু নির্বাচনের আগের দিন গতকাল শহরবাসীর মনে ও মুখে ছিল শুধুই আতঙ্কের ছাপ। গত ১৩ বছর ধরে পৌর নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র দখলের সংস্কৃতি এই আতঙ্কের মূল কারণ। মহাজোট ও বিএনপি সমর্থিত দুই প্রার্থীর মধ্যে হামলা, মামলা, বিরোধীদলীয় প্রার্থীর সমর্থকদের গ্রেপ্তারকে কেন্দ্র করে শান্ত শহরবাসীর মনে এ আতঙ্ক ভর করে। পাশের পৌর এলাকা শায়েস্তাগঞ্জে অফিস পোড়ানো ও ককটেল নিক্ষেপের ঘটনা এই আতঙ্ককে বাড়িয়ে দেয় বহুগুণে। তবে দুপুর ২টা থেকে শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সতর্ক তৎপরতায় অনেকে কিছুটা আশ্বস্ত হন।
শহরের স্বনামধন্য সংস্কৃতিকর্মী রুমা মোদক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গত পৌর নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি। ভোটকেন্দ্র দখল হয়েছিল। এবারও বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটছে। কিন্তু আমরা চাইছি একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন, যেখানে আমরা এবার নির্বিঘেœ ভোট দিতে পারব।’
শহরবাসীর কাছ থেকে জানা গেছে, গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমল থেকেই হবিগঞ্জ পৌর নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র দখলের সংস্কৃতি শুরু হয়। ওই সময় শহীদ উদ্দিন চৌধুরী প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বিভু চৌধুরীকে পরাস্ত করেন ভোটকেন্দ্র দখল করে। পরে চারদলীয় জোট সরকারের আমলে ২০০৪ সালে বর্তমান মেয়র জি কে গউছ প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী শহীদ চৌধুরীকে পরাস্ত করেন একইভাবে ভোটকেন্দ্র দখলের মধ্য দিয়ে। নিজের আমল থেকে ভোটকেন্দ্র দখলের বিষয়টি অস্বীকার করে সাবেক আওয়ামী লীগ দলীয় পৌর চেয়ারম্যান শহীদ উদ্দিন চৌধুরী দোষ চাপাচ্ছেন বর্তমান মেয়র জি কে গউছের ঘাড়ে। শহীদ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, “আমি ভোটকেন্দ্র দখলের সংস্কৃতি চালু করিনি। ওই সময়ে প্রতিদ্বন্দ্বী বিভু চৌধুরীকে পরাজিত করেছি জনগণের কাছ থেকে পাওয়া ভোটের মধ্য দিয়ে। ২০০৪ সালের পৌর নির্বাচনে বর্তমান মেয়র প্রার্থী জি কে গউছ সাত-আটটি কেন্দ্র দখল করে ‘কেন্দ্র দখলের’ সংস্কৃতি চালু করেন।”
তবে জি কে গউছ বলেন, ‘২০০৪ সালের নির্বাচনে আমি প্রায় দ্বিগুণ বেশি ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছি। আমি কোনো ভোটকেন্দ্র দখল করিনি। বিরোধীরা আমার জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে এই প্রচারণা চালাচ্ছে।’
গত দুই বছরে হবিগঞ্জে অন্য রকম সৌহার্দের রাজনীতি চলেছে। ছিল না কোনো হানাহানি। এমনকি বর্তমান মেয়র জি কে গউছ আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য আবু জাহিরের সঙ্গে গোপনে সুসম্পর্ক বজায় রেখেই চলেছেন। কিন্তু পৌর নির্বাচনের কয়েকটি দিন সামনে রেখে শুরু হয়েছে রেষারেষি। হানাহানির আশঙ্কায় খোদ রাজনীতিকরাই ভীত। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে কারাবরণকারী, একাধিক মামলার আসামি জি কে গউছ নিজেই ভীত। বললেন, ‘আমি ও আমার কর্মীরা নিরপেক্ষ নির্বাচন নিয়ে শঙ্কিত। সেনা মোতায়েন না হলে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না। আমি আজ (গতকাল) প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে পরিস্থিতি তুলে ধরে সেনা মোতায়েনের দাবি জানিয়েছি।’
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মহাজোট ও বিএনপি প্রার্থীর মধ্যে এখন চরম বৈরি অবস্থান। সর্বশেষ গত শুক্রবার দুপুরে শহরের চৌধুরী বাজারে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী জি কে গউছের সমাবেশ চলছিল। ওই সমাবেশে বক্তব্য দিয়েছিলেন কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. সাখাওয়াত হাসান জীবনসহ অন্য নেতারা। বিএনপি অভিযোগ করেছে, এ সময় যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কর্মীরা বিএনপিদলীয় নেতাদের ওপর হামলা চালায়। গউছের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে, ওইদিন মহাজোটের প্রার্থী শরীফ উল্লার পক্ষে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করে সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মো. আবু জাহির ও অ্যাডভোকেট আবদুল মজিদ খান শত শত দলীয় কর্মী নিয়ে শহরে মিছিল করেছেন। ওইদিন রাতেই জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম রানা বাদী হয়ে জি কে গউছের ভাই জি কে গফফারসহ ৫৩ দলীয় নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে হবিগঞ্জ সদর থানায় মামলা করেন। জানা গেছে, বিএনপি প্রার্থী গউছ এই হামলার ব্যাপারে থানায় এজাহার দায়ের করলে থানা এটিকে মামলা হিসেবে গ্রহণ করেনি। এ ব্যাপারে হবিগঞ্জ সদর থানার ওসি শেখ কবিরুল হোসেন বলেন, মহাজোটের দায়ের করা মামলাটি তদন্ত করছি। এরপর বিএনপির অভিযোগের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। জি কে গউছ গতকাল দুপুরে পরিস্থিতি বর্ণনা করে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখন আমার কর্মীরা পুলিশের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। এজেন্টদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।’ তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে থানার ওসি কবির বলেন, ‘আমরা কাউকে হয়রানি করছি না। ওয়ান্টেড আসামিদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।’
মহাজোট প্রার্থী শরীফ উল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হবিগঞ্জে শান্তিপূর্ণ নির্বাচনী প্রচারণায় বিএনপি হামলা চালিয়ে অশান্ত পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা চালাচ্ছে। বিএনপির চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ নেতা ইলিয়াস আলী আমাদের সর্বজনশ্রদ্ধেয় দুই সংসদ সদস্যকে কটাক্ষ করে গত শুক্রবার উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন। আমরা জনগণের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করতে সব ধরনের অপতৎপতার বিরুদ্ধে সক্রিয় আছি।’
 
Support : Dhumketo ধূমকেতু | NewsCtg.Com | KUTUBDIA @ কুতুবদিয়া | eBlog
Copyright © 2013. News 2 Blog 24 - All Rights Reserved
Template Created by Nejam Kutubi Published by Darianagar Publications
Proudly powered by Dhumketo ধূমকেতু