তাণ্ডব ও চেতনা by মাকসুদুল আলম

Saturday, February 22, 2014

কারও তাঁবেদারি না করার স্লোগানে অবিচল দৈনিক মানবজমিনের ১৭তম বর্ষে পদার্পণ উপলক্ষে দেরিতে হলেও সংশ্লিষ্ট সবাইকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা।
প্রবাসে দীর্ঘদিন পত্রিকাটির একজন নিয়মিত পাঠক। গুণগত মান, সার্বিক পরিবেশন, স্বাস্থ্য বিষয়ক ফিচার ও পত্রিকাটির গভীর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন আমার খুবই পছন্দের। প্রধান সম্পাদক একজন অভিজ্ঞ পেশাদার সাংবাদিক। টেলিভিশনে চেনামুখ। সাহসী সৎ নীতিবান ও নির্লোভ বলেই অধিক পরিচিত। প্রধান সম্পাদকের সঠিক দিকনির্দেশনায় সব স্টাফের সাধনায় ট্যাবলয়েড দৈনিকটির জনপ্রিয়তা পাঠক মহলে দিন দিন বছর বছর বেড়েই চলেছে বলে আমার বিশ্বাস। দ্বিমত পোষণ করার সুযোগ খুব কম। হালুয়া রুটির ভাগবাটোয়ারা আর ক্ষমতার সুবিধাভোগের অপরাজনীতির প্রতি আকর্ষণ থাকলে আজ  হয়তো সম্পাদক নিজে সরকারের মন্ত্রিসভায় ঠাঁই করে নিতে পারতেন। সম্পদের পাহাড় গড়তে পারতেন। খুবই স্বাভাবিক। আর  সাংবাদিক না হয়ে প্রবাসী হলে হয়তো বিদেশের মাটিতে স্ত্রী-সন্তানাদি নিয়ে সুখে শান্তিতে বসবাস করতেন। বিলেতেও বাড়ি-গাড়ি ধন-সম্পদ অর্জন করতেন। জানের ভয় নিয়ে মাঝরাতে বাড়ি ফিরতে হতো না। তবে সমাজের অতিসাধারণ মানুষের ভালবাসায় সিক্ত হতেন কি-না জানা নেই। মধ্যরাত পর্যন্ত টিভির সামনে সচেতন দর্শক তার সংবাদপত্র বিষয়ক অনুষ্ঠান দেখার জন্য অপেক্ষা করত কিনা বলতে পারছি না। মানুষের ভালবাসা মনের অনেক বড় শান্তি। যে কেউ তা পায় না। ক্ষমতার জোরেও তা অর্জন করা যায় না। ধন-সম্পদ আর বিত্তবৈভবের পাহাড়ের বিনিময়েও এ শান্তির দেখা মেলে না। এ শান্তি উপলব্ধি করতে হয়।
ভাষা ও সংস্কৃতির মাস ফেব্রুয়ারি। এ মাসেই ঢাকার পশ্চিম রাজাবাজারে নিজেদের বেডরুমে খুন হয়েছিলেন সাংবাদিক সাগর সারওয়ার ও তার স্ত্রী মেহেরুন রুনি। দু’বছরেও শেষ হয়নি তদন্তের সেই দু’দিন। তদন্তের অগ্রগতি জানতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে তলব করেছে হাইকোর্ট। ন্যায় বিচার এদেশে সোনার হরিণ। আশায় আশায় দিন যাবে। আশা পূরণ হবে না। শেষ পর্যন্ত গুঁড়েবালি পড়বে তাতে। ফেব্রুয়ারি এলেই বাংলা ভাষার কদর বাড়ে। ঢাকায় বসে প্রাণের বইমেলা। প্রদান করা হয় একুশে পদক। আমার এক বন্ধু বলেছে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পর এখন নাকি হাইজ্যাক হয়েছে একুশের চেতনাও। দলীয়করণ হয়েছে একুশে পদকও। বন্ধুর মতে, জন্মবার্ষিকী ও মৃত্যুবার্ষিকী নিয়ে এদেশে পত্রিকার পাতায় বাহারি বিজ্ঞাপন দেখা গেলেও তাতে স্থান পায় না মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক এমএজি ওসমানীর কথা। পাঠ্যপুস্তক থেকে উধাও হওয়ার পর এখন পত্রিকার পাতা থেকেও উধাও এই মহান নেতা। অথচ এ মাসেই ছিল ওসমানীর মৃত্যুবার্ষিকী। নব্য-চেতনার আবেগের পানিতে ধুয়ে মুছে গেছে তার সব স্মৃতি। ওদিকে এক মাসের মধ্যে ইলেকট্রনিক মিডিয়া, বিজ্ঞাপন, গাড়ির নম্বরপ্লেট, সাইনবোর্ড ও ব্যক্তিগত নামফলক বাংলায় লেখার নির্দেশ দিয়েছে উচ্চ আদালত। সর্বস্তরে বাংলা ভাষার যথাযথ প্রয়োগ হলে খুব ভাল কথা। আপত্তি থাকার কথা নয়। নির্দেশ প্রদানকারী উচ্চ আদালতেও ইংরেজির পাশাপাশি বাংলার প্রচলন হলে আরও ভাল হয়। এটা এখন জনদাবিতে পরিণত হয়েছে।
এবার একটু ভিন্ন প্রসঙ্গ টানছি। পরপর বিগত দু’সপ্তাহ জাপানের রাজধানী টোকিও সহ গোটা পূর্ব জাপানে তীব্র তুষারপাত হয়েছে। আবহাওয়া কর্তৃপক্ষের পূর্বাভাসের চেয়েও অনেক বেশি বরফ পড়েছে। পিচ্ছিল রাস্তায় গাড়ি চালাতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হতে হয়েছে অনেককে। দু’দফায় প্রবল তুষার ঝড়ে একেবারেই ভেঙে পড়েছিল টোকিওর যোগাযোগ ব্যবস্থা। ব্যাহত হয়েছিল স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। স্থানে স্থানে ঘর-বাড়ি রেলস্টেশন ও স্টেডিয়ামের ছাদ ভেঙে পড়ে, রাস্তাঘাটে বড় গাছের ডালপালা ভেঙে পড়ে ইত্যাদি নানা কারণে দু’দফায় সব মিলিয়ে প্রায় ৩০ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। আহত  হয়েছে কয়েক হাজার লোকজন। বিগত দেড় যুগেও টোকিওতে এমন তুষারপাত হয়নি। সর্দিজ্বর, ইনফ্লুয়েঞ্জা ছড়িয়ে পড়েছিল চারদিকে। অবস্থার এখন কিছুটা উন্নতি হয়েছে। এবার দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়া যাক বাংলাদেশের দিকে। শুরু হয়েছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। প্রথম পর্বে ১৯শে ফেব্রুয়ারি ৯৭টি উপজেলায় ভোটগ্রহণ শেষ হলো। নির্বাচনকে ঘিরে জেলায় জেলায় ছিল টান টান উত্তেজনা ও উৎকণ্ঠা। ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। এ নির্বাচনে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে মাঠে ছিল সেনাবাহিনী। তাদের সঙ্গে ছিল র‌্যাব, বিজিবি, পুলিশ ও আনসার বাহিনী। কাগজে কলমে অরাজনৈতিক স্থানীয় সরকার নির্বাচন হলেও বাস্তবে জাতীয় নির্বাচনের আমেজ পরিলক্ষিত হয়েছে। জানুয়ারির ভোটারবিহীন নির্বাচনের পর দেশের মানুষ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছে। দুধের স্বাদ কিছুটা হলেও ঘোলে মিটিয়েছে। লড়াই হয়েছে তবে হাড্ডাহাড্ডি বলা যায় না। বিস্তারিত ফলাফল পাঠকের জানা। মান-সম্মান রক্ষার ভোটযুদ্ধে আপাতত বিএনপি-জামায়াত জোট বিজয়ী হয়েছে। সরকারি দল সমর্থিত প্রার্থীদের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতিতেই ভোটকেন্দ্র দখল করে জালভোট প্রদান, ব্যালট বাক্স ছিনতাই ও ভোট কারচুপির অভিযোগ উঠেছে। সরকার সমর্থিত প্রার্থীদের বিরুদ্ধে বিএনপির ভোট জালিয়াতির অভিযোগ নির্বাচন কমিশন আমলে নেয়নি। সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও সুপ্রিমকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেছেন ‘করিম রহিমের অভিযোগ চলবে না। সেলিমের অভিযোগ আমলে নেয়া হবে। নির্বাচন কমিশনের এমন দ্বৈত ভূমিকা অগ্রহণযোগ্য।’ ব্যাপক কারচুপির পরও এই ফলাফল। একেবারে ভরাডুবি। অদ্ভুত নির্বাচনে ক্ষমতাসীনদের তাণ্ডবের প্রতিবাদে ৯টি উপজেলায় স্থানীয়ভাবে নিরুত্তাপ হরতাল পালিত হয়েছে। নির্বাচন অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হলে জয়-পরাজয়ের ব্যবধান আরও বাড়তে পারতো। সন্দেহ নেই।
অতীত নিয়ে খুব বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করতে নেই। বেশি দূর যাচ্ছি না। বিগত দু’বছরে আমাদের দেশে সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনাবলী মনে করলে স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে নানা ছলচাতুরি ও কলাকৌশল। সাংবাদিক সাগর-রুনি হত্যার পর থেকে ঘটেছিল নানারকম লোমহর্ষক ঘটনা। গুলশানের কূটনীতিপাড়ায় খুন হয়েছিল সৌদি কূটনীতিক খালাফ আলী। মধ্যরাতে ঘটেছিল সাবেক রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের ৭০ লাখ টাকার অর্থ কেলেঙ্কারির চাঞ্চল্যকর ঘটনা। এরপর ঘটে ইলিয়াস আলীর গুমের ঘটনা। আগারগাঁও এলাকায় ঘটে ব্যাপক সাংবাদিক নির্যাতন। দিনদুপুরে সিএমএম কোর্ট সংলগ্ন এলাকায় পুলিশ ক্লাবের ভেতরে ঘটে তরুণীর শ্লীলতাহানির মতো ঘটনা। এরপর জাতীয় সংসদের সাবেক বিরোধী দলের চিফ হুইপের পা ও মাথা ভেঙে দেয়া পুলিশের পদোন্নতি হয়। মাসখানেক  সভা-সমাবেশে গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ড. মুহাম্মদ ইউনূস সম্পর্কে চলে সরকারের মন্ত্রীদের মুখরোচক অশ্লীল কটূক্তি। এরপর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের একটি বক্তব্যকে বিকৃত করে জাতীয় সংসদে তুচ্ছতাচ্ছিল্য ও অসম্মান করা হয়। ঘণ্টাব্যাপী তার বিরুদ্ধে চলে বিষোদগার। এরপর শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীরা ফটকাবাজ বলে বেফাঁস মন্তব্য করা হয়েছিল। একের পর এক ঘটেছিল এরকম হাজারও ঘটনা। এবারও অবস্থা অনেকটা অপরিবর্তিত। যথেষ্ট মিল রয়েছে। ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে গণতন্ত্রকে হত্যা করা। হবু বিশেষ দূতকে জোর করে হাসপাতালে বন্দি করে রাখা। সাবেক বিরোধীদলীয় প্রধানকে গৃহবন্দি করে রাখা। সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় প্রশাসন যন্ত্র ব্যবহার করে বিরোধীদলের ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ কর্মসূচি লণ্ডভণ্ড করে দেয়া। অপহরণ-খুন, ক্রসফায়ার-এনকাউন্টার, গুম তথা বিচারবহির্ভূত রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ডকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া। আত্মরক্ষার নামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্রলীগের অস্ত্রধারীরা বন্দুকযুদ্ধে লিপ্ত হওয়া। সাবেক বিরোধীদলের নেত্রীকে লেডি লাদেন বলে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করা। বিরোধীদলীয় নেত্রীর প্রবাসে অবস্থানরত ছেলেকে আল-কায়েদার বাংলাদেশী এজেন্ট বলে তাচ্ছিল্য করা। হেয় করা। প্রকাশ্য গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ‘ক্যাশ চাই ক্যাশ’ বলে বেফাঁস মন্তব্য করা। সর্বশেষে আল-কায়েদা প্রধান আয়মান আল জাওয়াহিরির কথিত অডিও বার্তাটি ইন্টারনেট ব্লগে ছড়িয়ে দেয়া ও এ সংক্রান্ত ভারতীয় সাংবাদিক সুবীর ভৌমিকের কাল্পনিক গাড়িবোমা তত্ত্ব আবিষ্কার করা। সব যেন একই সূত্রে গাঁথা। সুবীর ভৌমিক হয়তো সত্যিসত্যিই দক্ষিণ এশিয়ায় আগুন লাগিয়ে দিতে চাইছেন। প্রতিবেদন লেখার নামে দক্ষিণ এশিয়ায় হয়তো রক্তাক্ত সহিংসতার বীজ বপন করতে চাইছেন। তার কল্পিত বাংলাদেশের সঙ্গে বাস্তবতার তফাৎ অনেক। আগামী দিনগুলোতেও এভাবেই হয়তো ঘটতে থাকবে একের পর এক ঘটনা। সময়ের ব্যবধানে একই ছলচাতুরি ও কলাকৌশলের ভিন্ন রূপ দেখতে পাচ্ছি চোখের সামনে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদাকে জড়িয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার ছলচাতুরি বলা যায় ভেস্তে গেছে। নতুন বোতলে পুরনো মদ পরিবেশন করায় সবাই তা টের পেয়ে গেছে। প্রত্যাশিত সুফল বয়ে আনতে ব্যর্থ হয়েছে জঙ্গিবাদ কার্ড। দাম্ভিকতাকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করেছে জনগণ। না বলেছে ভয়ভীতির অপসংস্কৃতিকে। অপহরণ, খুন, ক্রসফায়ার, গুম তথা বিচারবহির্ভূত রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে তারা। ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে গণতন্ত্র হত্যাকারী এক ব্যক্তির নিরঙ্কুশ তাণ্ডবের নীরব প্রতিবাদ জানিয়েছে। ব্যালটের মাধ্যমে তারা চলমান রাজনৈতিক অপসংস্কৃতিকে ধিক্কার জানিয়েছে।

২১শে ফেব্রুয়ারি ২০১৪, টোকিও

হাম-রুবেলার গণতন্ত্র by মাকসুদুল আলম

Friday, February 7, 2014

গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল বেঁচে থাকলে হয়তো নতুন করে গণতন্ত্রের সংজ্ঞা লিখতেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান পার্টির প্রথম প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কন বেঁচে থাকলে হয়তো বাংলাদেশ সফরে এসে গণতন্ত্রের তালিম নিতেন। তাদের প্রবর্তিত গণতন্ত্রের সংজ্ঞা বাংলাদেশে অচল।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বা সমাজবিজ্ঞানীদের ধারণাপ্রসূত গণতন্ত্রের চর্চা আমাদের দেশে নেই। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম না। চাইলেও বিস্তারিত ব্যাখ্যা করার ক্ষমতা নেই। পাঠ্যপুস্তকে জেনেছি গণতন্ত্র মানে জনগণের শাসন। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে দেখেছি গণতন্ত্র এমন একটি শাসনব্যবস্থা যেখানে রাষ্ট্রের বা কোন সংগঠনের ধনী-গরিব প্রত্যেক নাগরিকেরই নীতিনির্ধারণ করার ক্ষেত্রে বা জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে সমান অধিকার নিশ্চিত করা হয়ে থাকে। গণতন্ত্রে খেলার মাঠ সবার জন্য সমান। পাকা-কাঁচা সবাই সমান খেলোয়াড়। এ শাসনব্যবস্থায় সবার অংশগ্রহণের সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হয়ে থাকে। আমাদের নাগরিকদের বেলায় সেই অধিকার বা সুযোগ কোনটাই নেই। আমাদের দেশে যে গণতন্ত্রের চর্চা হয় তাতে জনপ্রতিনিধি নির্বাচনে জনগণের ভূমিকা নেই। অটো-এমপি নির্বাচিত হন। নির্বাচনের আগেই আসন ভাগাভাগি হয়ে যায়। ভোটারদের ভোট দেয়ারও প্রয়োজন পড়ে না। ফলাফল থাকে জানা। কে সরকার গঠন করবে তা-ও থাকে আগেভাগেই ঠিকঠাক। জনমতের তোয়াক্কা করার প্রয়োজন পড়ে না। জনপ্রতিনিধি সিলেকশনে এখানে অর্থ-বিত্ত, ক্যাডার-বাহিনীর আধিপত্য ও ক্ষমতার দাপট যোগ্যতার মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয় বললেও বাড়িয়ে বলা হবে না। সাবেক সামরিক শাসক ও জাতীয় পার্টির কোণঠাসা চেয়ারম্যানের মতে সংরক্ষিত আসনে টাকা-পয়সা ছাড়াও প্রয়োজন আবেদনময়ী চেহারা-সুরত, যা কিনা নারীদের প্রতি রীতিমতো বৈষম্যমূলক মন্তব্য। শিক্ষা-দীক্ষা, সততা, ন্যায়নীতি, রুচি, আভিজাত্য, সামাজিক মূল্যবোধ ও দেশপ্রেমের কদর নেই আমাদের গণতন্ত্রে। কে কত বড় গডফাদার, কে কত ভোট কিনতে পারবে বা অস্ত্রের মুখে কত ভোট সংগ্রহ করতে পারবে তা বিবেচিত হয় দলীয় মনোনয়নের বেলায়। এ ক্ষেত্রে সব দলই প্রায় একই নীতি অনুসরণ করে। ক্ষমতাসীন বা বিরোধী দল বলে কোন কথা নেই। ফলে আমাদের রাজনীতি এখন বিষবাষ্পে কলুষিত। তা এখন সওদাগরের হাতে। জনসেবার লেবাসে চলছে পেশিশক্তির মহড়া। জাল যার জলা তার। চাপাতি-ককটেল যার তালগাছ তার- চলছে এমন অবস্থা। আব্রাহাম লিঙ্কন তার বিখ্যাত গেটিসবার্গ বক্তৃতায় গণতন্ত্রকে সবার কাছে সহজভাবে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন। সবারই জানা। বলেছিলেন এটি ‘জনগণের দ্বারা জনগণের জন্য জনগণের শাসনব্যবস্থা’। আমাদের গণতন্ত্রের সঙ্গে এ সংজ্ঞার রয়েছে আকাশ-পাতাল ব্যবধান। তাই বিভিন্ন সময় বক্তৃতা-বিবৃতিতে এ নিয়ে টিটকারিও করা হয়েছে। আমরা যে গণতন্ত্রের চর্চা করি তা হলো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকেন্দ্রিক। গণতন্ত্র এখানে ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি মাত্র। একবার গদিতে আসীন হলে ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত না হওয়া পর্যন্ত হালুয়া-রুটি খাওয়া। রাতারাতি সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলার সবচেয়ে দ্রুততম উপায় এটি। রাতে পুঁটি মাছ চাষ করলে পরদিন সকালেই রুই-কাতলা ফলে। ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে ব্যাংক, বীমা, বিশ্ববিদ্যালয়, টেলিযোগাযোগ প্রযুক্তি, ইন্টারনেট গেইটওয়ে, রেডিও-টিভি চ্যানেলসহ যাবতীয় লাইসেন্স কুক্ষিগত করার মোক্ষম সময়। শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানি, সরকারি বাড়ি দখল, চাকর-বাকরদের জন্যও ঢাকায় প্লট-ফ্ল্যাটের ব্যবস্থা করার সুবর্ণ সুযোগ। আমাদের গণতন্ত্র মানে সাধারণ নাগরিকদের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলা। রাষ্ট্রীয় প্রশাসনকে দলীয় কাজে ব্যবহার করা। ভিন্নমতকে বুটের চাপায় পিষ্ট করা। ক্রসফায়ারের নামে নির্বিচারে সরাসরি গুলি করা। মানবাধিকারকে জাদুঘরে পাঠিয়ে দেয়া। রাষ্ট্রীয় নির্বাহী পদে থেকে খেয়াল-খুশিমতো আইনি ব্যাখা দেয়া। গণমাধ্যম নিপীড়নে বেপরোয়া হয়ে ওঠা। আমরা যে গণতন্ত্রের চর্চা করি তাতে জাতীয় সংসদের বিরোধী দলের প্রয়োজন পড়ে না। অ্যারিস্টটল বা আব্রাহাম লিঙ্কনের গণতন্ত্রে ভাগবাটোয়ারার ভিত্তিতে সর্বদলীয় সরকার, ঐকমত্যের সরকার শব্দগুলোর প্রচলন ছিল না। তারা বেঁচে থাকলে অনন্ত এ শব্দগুলো তাদের নতুন করে রপ্ত করতে হতো। কাউকে গৃহবন্দি করে, কাউকে জোর করে অসুস্থ বানিয়ে হাসপাতালে বন্দি করে, কাউকে রাজনৈতিক মামলায় ফাঁসিয়ে, ডাণ্ডা মেরে ঠাণ্ডা করেও যে গণতন্ত্রের চর্চা হয় তা তাদের চাক্ষুষ দেখতে হতো। নিত্যনতুন অভিনব কৌশলে বালুভর্তি ট্রাকে ও জলকামান ব্যবহার করেও যে গণতন্ত্রের চর্চা হয় তা শিখতে হতো। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের চর্চাকৃত তথাকথিত গণতন্ত্র এখন হাসপাতালের আইসিইউ কক্ষে। এ গণতন্ত্রকে সমুন্নত রাখতে নিয়ম রক্ষার স্বার্থে ৫ই জানুয়ারি হাম-রুবেলার টিকা সফল হয়েছে দাবি করা হলেও বাস্তবে তা এখন মুমূর্ষু অবস্থায় আছে। যত দ্রুত সম্ভব সমঝোতার ভিত্তিতে সঠিক চিকিৎসা করা না হলে অকালেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে পারে এ শিশু গণতন্ত্র।
বালুভর্তি ট্রাক নয় এবার অস্ত্রভর্তি ট্রাক। গুলশানের ৭৯ নম্বর সড়কে ফেলানো দু’টি বা পাঁচটি নয়, বন্দর থেকে খালাস পাওয়া পুরো ১০ ট্রাক। বহুল আলোচিত চট্টগ্রামের ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলায় তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকারের মন্ত্রীদের শাস্তি হওয়ায় মামলার পুনঃতদন্তের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। আদালতে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে। জাতীয় সংসদে বলা হয়েছে, ‘এ অস্ত্র চোরাচালানের সঙ্গে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও হাওয়া ভবনের সম্পৃক্ততা খতিয়ে দেখা হবে। সব ষড়যন্ত্রের বিচার করা হবে। তদন্ত করে প্রমাণ মিললে সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।’ ভাল কথা। তবে এই হক কথাটি ছাত্রলীগের বেলায় প্রযোজ্য হলে হয়তো দেশবাসীর আস্থা অর্জন করা সম্ভব হতো। ছাত্রলীগের আত্মরক্ষার অধিকারের নমুনা এখন দেশবাসী টিভির খবরে ও পত্রপত্রিকায় দেখতে পাচ্ছে। এ ছাত্র সংগঠনের অস্ত্রধারীরা কিছু দিন পরপর দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ও রাস্তাঘাটে নামীদামি সব আধুনিক অস্ত্রের মহড়া দিয়ে থাকে। অস্ত্রধারীরা থাকে আইনের ঊর্ধ্বে। প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ডের বিচার করেছি বলে মুখে ফেনা তোলা হলেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের অস্ত্রধারীদের একজন ছাড়া কাউকে ধরা হয়নি। মামলা হলেও আসামি করা হয়নি। একজনকে ধরতেও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ মহল থেকে নির্দেশের প্রয়োজন পড়েছে। চট্টগ্রামের ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলা প্রসঙ্গে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজিপি)-এর চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ বলেছেন, ‘চারদলীয় জোট সরকারের আমলে আটক হওয়া ১০ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালান মামলার দায় তৎকালীন সরকারকেই নিতে হলে আওয়ামী-লীগ ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারি পিলখানায় ৫৭ জন সেনা অফিসারসহ নিহতদের হত্যাকাণ্ডের দায়ভার কে নেবে?’ এটিও হক কথা। সরকারের চলতি মেয়াদের শেষ নেই হুমকি-ধমকির। প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের জরিপকারীদের তদন্তের দাবি করা হয়েছে। বলা হয়েছে, যে জরিপকারীদের কোন ধারণাই নেই কিভাবে জরিপ চালাতে হয়। হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে জরিপের ক্লাসে বহিরাগতদের অংশগ্রহণের কোন সুযোগ থাকলে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের জরিপকারীদের পাঠানোর ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানাচ্ছি। ওই মন্তব্যে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, কিছু পশ্চিমা দূতাবাস ও এ দু’টি পত্রিকা ‘মারাত্মক ভুল’ করেছে। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনকে কালিমালিপ্ত করতে চেয়েছিল তারা।
৫ই জানুয়ারির ভোটারবিহীন নির্বাচনে মৌলভীবাজার-৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে পরে সমাজকল্যাণমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েই নিজ এলাকায় মিষ্টি বিতরণ করেছেন সৈয়দ মহসীন আলী। শহরজুড়ে আনন্দ মিছিল করেছেন। মন্ত্রীর চেয়ারে বসেই সংবাদকর্মীর প্রশ্নের জবাবে ক্ষিপ্ত কণ্ঠে হুঙ্কার ছেড়ে বলেছেন, ‘হু ইজ বিএনপি? দিস ইজ মহসীন আলী। আমরা এদের (বিএনপিকে) ডেমোলিস (বিলুপ্ত) করে দেব।’ কিছুদিন পর নিজেই প্রায় ডেমোলিস হওয়ার মতো অবস্থা। প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে নিজের কাণ্ডজ্ঞানের যথোপযুক্ত পরিচয় দেন এ মন্ত্রী। সিলেট বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের জেএসসি ও পিএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে মঞ্চে বসেই ধূমপান করে দেশব্যাপী সমালোচিত হন এ মন্ত্রী। প্রকাশ্যে ধূমপান দণ্ডনীয় অপরাধ হলেও মেধাবী শিক্ষার্থীদের সামনে বসেই ধূমপান করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন তিনি। নিজে সংবাদের শিরোনাম হয়ে উঠেন। অবস্থা বেগতিক দেখে পরে সংবাদ সম্মেলন করে প্রকাশ্যে ধূমপান করার জন্য ক্ষমা চান তিনি। সমাজকল্যাণমন্ত্রীর অসামাজিক কর্মকাণ্ডে হতভম্ব হয়ে সামাজিক যোগাযোগ ওয়েবসাইট ফেসবুকে অনেকে মহসীন আলীকে পরিবেশ বা স্বাস্থ্য বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন, যা পাঠকের হাসির খোরাক যুগিয়েছে মাত্র।
 
Support : Dhumketo ধূমকেতু | NewsCtg.Com | KUTUBDIA @ কুতুবদিয়া | eBlog
Copyright © 2013. News 2 Blog 24 - All Rights Reserved
Template Created by Nejam Kutubi Published by Darianagar Publications
Proudly powered by Dhumketo ধূমকেতু