গরিবের চাল পাচার by গরিবের চাল পাচার

Tuesday, January 18, 2011

৬ জানুয়ারি, রবিবার দুপুর ২টা থেকে ৩টা এই এক ঘণ্টায় ঢাকার কারওয়ান বাজারের ভেতর দিয়ে তেজগাঁওয়ের দিকে যাওয়ার রাস্তায় একে একে এসে থামে বেশ কয়েকটি ট্রাক। ট্রাকগুলোতে চালের বস্তা। বস্তার গায়ে লেখা ‘খাদ্য অধিদপ্তরের জন্য’।

চাল ভরা বস্তার পাশাপাশি কিছু খালি বস্তাও থাকে। ট্রাকগুলো সর্বোচ্চ ১০ মিনিটের জন্য একেকটি দোকানের সামনে থামে। কয়েকজন শ্রমিক দ্রুত চালের বস্তাগুলো নামিয়ে ফেলেন। এরপর খুব তাড়াতাড়ি ট্রাকগুলো চলে যায়। দোকানের শাটার নামিয়ে ফেলা হয়।
গত বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টায় রাজধানীর শেওড়াপাড়ায় গরিব মানুষের জন্য ওএমএসের চাল বিক্রির একটি ট্রাকের সামনে প্রায় ২০০ মানুষের লাইন। পশ্চিম শেওড়াপাড়ার আমেনা বেগম জানান, সকাল সাড়ে ১০টায় চাল কিনতে এসেছেন। তখন দুটি লাইনে প্রায় আড়াই শ মানুষ ছিল। এখন সামনে আছে তিনজন। আজ তিনি চাল পেতেও পারেন।
কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, কারওয়ান বাজারে গত রবিবার যে ট্রাকগুলো চাল নামিয়ে গেছে, সেগুলো এই গরিব মানুষদের কাছে কম দামে বিক্রির জন্য সরকারের দেওয়া ওএমএসের চাল। এগুলো পাচার হয়ে চলে আসছে দোকানে দোকানে। বিক্রি হচ্ছে কমপক্ষে ৩৫ টাকা কেজি দরে।
অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, এ চাল খাদ্য অধিদপ্তর থেকে ডিলাররা পান সাড়ে ২২ টাকা কেজি দরে। দেড় টাকা কমিশন ধরে তাঁদের সেটা দরিদ্রদের কাছে বিক্রি করার কথা ২৪ টাকা করে। কিন্তু তাঁরা ‘ঘুষ দিয়ে আনতে হয়’Ñএ অজুহাতে এই চালের একটা অংশ পাচার করে দেন।
জানা যায়, অসাধু ব্যবসায়ীরা
ডিলারদের কাছ থেকে সেটা কেনে ৩০ টাকা কেজি দরে আর খুচরা দোকানে সেটা বিক্রি হয় কমপক্ষে ৩৫ টাকা দরে। এভাবে চোরাই চক্রের কারসাজিতে
দরিদ্র মানুষ বঞ্চিত হয় কম দামের চাল থেকে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও তাদের ফিরে যেতে হয় খালি হাতে।
বরাদ্দ পাওয়া চালের বড় অংশ নিয়মিতই এভাবে পাচার করছে ওএমএসের ট্রাকসেল, দোকান ও ফেয়ার প্রাইস কার্ডের (এফপিসি) ডিলাররা। এ অভিযোগে গত ২২ দিনে সারা দেশে ছয়জনের ডিলারশিপ বাতিল করেছে খাদ্য অধিদপ্তর।
শুধু তাই নয়, ওএমএসের চাল নিয়ে অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে আরো গুরুতর তথ্য। পাচারের এ ঘটনা সম্পর্কে জানার জন্য খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের বক্তব্য নিতে গেলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে তদন্তদল পাঠান কারওয়ান বাজারে। তারা আবার সেখানে গিয়ে উদ্ঘাটন করে যে, ওই চাল পুলিশের রেশনের এবং সেটাও অবৈধভাবে পাচার হয়ে চলে এসেছে বাজারে। কালের কণ্ঠের তোলা ছবিতে চালের বস্তায় খাদ্য অধিদপ্তরের সিল স্পষ্ট দেখা যায়। কর্মকর্তারা বলেন, এই সিল ওএমএস এবং পুলিশের রেশনেরÑদুই রকম চালের বস্তাতেই থাকে।
রাজধানীর ডিলারদের সঙ্গে কথা বলে অভিযোগ পাওয়া যায়, সরকারি চাল বরাদ্দ পেতে খাদ্য অধিদপ্তরের গুদামের দারোয়ান থেকে শুরু করে রেশন অফিসের কর্মকর্তাদের লটপ্রতি ২০ টাকা থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়। ফলে চাল বিক্রির কমিশনের টাকা প্রায় পুরোটাই চলে যায়। এ খরচ পোষাতেই ডিলাররা কিছু চাল বিক্রি করে দেন ব্যবসায়ীদের কাছে। আর এ কাজে তাঁদের সহায়তা করেন ঢাকা রেশনিং অফিসের কিছু অসাধু কর্মকর্তা।
খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আহমদ হোসেন খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গত ২৫ ডিসেম্বর থেকে ওএমএস চালুর পর এ পর্যন্ত সারা দেশের ছয়জন ডিলারের ডিলারশিপ ও লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। আমরা সর্বাÍক চেষ্টা চালাচ্ছি এসব অনিয়মের সঙ্গে যারা জড়িত থাকবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার। খাদ্য অধিদপ্তরের লোকজন এর সঙ্গে জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ তিনি বলেন, ‘কিছু কিছু ডিলার এ কাজ করে থাকতে পারে। তবে এটা সামগ্রিক চিত্র নয়। যারা এসব কাজ করছে, তারা ধরা পড়ে যাচ্ছে।’
একজন ডিলার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘প্রতিটন চালের ডেলিভারি অর্ডার (ডিও) পেতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে এক হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়। এ ছাড়া পরিদর্শককে দৈনিক ৫০০ টাকা, ডিও লেখাতে ১০০ টাকা, চাল মাপাতে লেবার চার্জের বাইরে অতিরিক্ত ২০০ টাকা, ডিও পোস্টিং করাতে ১০০ টাকা, গেট পাস পেতে ৫০ টাকা, দারোয়ানকে ২০ টাকা, ডিও পোস্টিংয়ের পিয়নকে ২০ টাকা ঘুষ দিতে হয়। কর্মকর্তাদের সঙ্গে সুসম্পর্কের ভিত্তিতে কখনো কখনো এ হার কমবেশি হয়।’
ওই ডিলার আরো বলেন, ‘ট্রাকসেল কর্মসূচির (ট্রাকে ওএমএসের চাল বিক্রি) একজন ডিলার দৈনিক তিন টন (তিন হাজার কেজি) চাল বরাদ্দ পান। প্রতি কেজিতে দেড় টাকা কমিশনে তাঁর লাভ হয় সাড়ে চার হাজার টাকা। লাভের টাকার চার হাজার টাকা চলে যায় ঘুষের পেছনে। এর সঙ্গে দৈনিক এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকা ট্রাক ভাড়া এবং চাল বিক্রির তিনজন শ্রমিকের মজুরি ৬০০ টাকা খরচ যোগ করলে লাভের বদলে উল্টো এক হাজার ৩০০ টাকা লোকসান দিতে হয়।’
ওই ডিলার বলেন, ‘এ কারণেই রাজধানীসহ প্রায় সারা দেশের বেশির ভাগ ডিলার বরাদ্দ পাওয়া চালের বড় অংশ বিক্রি করে দেন। ২৪ টাকা কেজির চাল গোপনে বিক্রি করা হয় ৩০ টাকা দরে। এক টন চাল গোপনে বিক্রি করতে পারলেই ছয় হাজার টাকা লাভ হয়।’
ফেয়ার প্রাইস কার্ডের একজন ডিলার জানান, প্রতি মাসে চাল ও গম মিলিয়ে পাঁচ টন খাদ্য বরাদ্দ পান তিনি। এগুলো ছাড় করা ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে তাঁর ব্যয় হয় ১০ হাজার টাকার বেশি। কিন্তু আয় হয় সাড়ে সাত হাজার টাকা। এ কারণে চাল পাওয়ার পরপরই ডিলাররা অল্প কিছু সারা মাসে বিক্রির জন্য রেখে বাকিটা গোপনে বেচে দেন।
ফেয়ার প্রাইস কার্ডের ওই ডিলার বলেন, একটি চক্র আছে, যারা গরিব মানুষকে চাল দেওয়ার কথা বলে তাদের কাছ থেকে ফেয়ার প্রাইস কার্ড সংগ্রহ করে রেখে দেয়। পরে ওই কার্ড ব্যবহার করে খাদ্য অধিদপ্তরের কাছে চালের হিসাব দেয়।
কারওয়ান বাজারে যারা এসব চাল কেনে, তাদের মধ্যে দুজন হলো হালিম ও জাহাঙ্গীর। কারওয়ান বাজারের কাছে পূর্ব তেজতুরি বাজারে একটি আবাসিক হোটেলের নিচতলায় তাদের দোকান। ওই হোটেলের সামনে তাদের আরো একটি দোকান রয়েছে। কিন্তু দোকানগুলোর কোনো নাম নেই।
গত রবিবার গোপনে ওই দোকানে খাদ্য অধিদপ্তরের চাল নামানোর ছবি তোলা হয়। পরে ওই দোকানে গেলে হালিম ও জাহাঙ্গীর এ প্রতিবেদককে উৎকোচ সাধেন। তবে তাঁরা দাবি করেন, এসব চাল ওএমএসের নয়। রাজারবাগের পুলিশের মেস থেকে কেনা হয়েছে। পুলিশের মেস থেকে নিয়মিতই এসব চাল ও গম আসে।
কিন্তু রবিবার যে ট্রাকের ছবি তোলা হয়, তার হেলপারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ট্রাকটি এসেছিল খিলক্ষেত বিশ্বরোড থেকে।
হালিম বলেন, ‘আপনি এগুলো নিয়ে পত্রিকায় লিখলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। আমরা কিছু করে খাচ্ছি, সন্ত্রাস তো আর করছি না।’
হালিম ও জাহাঙ্গীরের দোকানে গতকাল অভিযান চালান খাদ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব এনায়েত হোসেন। তিনি কালের কণ্ঠকে জানান, দোকান মালিকরা পুলিশের কাছ থেকে ডিও কেনার প্রমাণ উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, কোনটা ওএমএসের চাল আর কোনটা পুলিশের রেশনের চাল, তা পার্থক্য করা যায় না। পুলিশও আইনত এভাবে চাল বিক্রি করতে পারে না।
এ বিষয়ে পুলিশের জনসংযোগ শাখার এডিসি মাসুদুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, চালের মান খারাপ হওয়ায় পুলিশের মেস থেকে এভাবে কিছু চাল বিক্রি করে অন্য খাদ্য কেনা হয়।
পুলিশের আরেকজন শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পুলিশের রেশনের চাল এভাবে বিক্রি করা সম্পূর্ণ অবৈধ। তবে দীর্ঘদিন ধরে এটা চলে আসছে। চালের মান খারাপ হওয়া এবং কিছু চাল উদ্বৃত্ত থাকে বলে তা বিক্রি করে মেস ব্যবস্থাপকরা পুলিশের জন্য তরকারি ও মাছ-মাংস কিনে থাকে।’
গত ২৫ ডিসেম্বর থেকে সারা দেশে ওএমএস চালু হয়। খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকাসহ সাতটি বিভাগীয় শহরে ও কয়েকটি শ্রমঘন জেলায় ২৬০টি খোলা ট্রাকে ওএমএসের চাল বিক্রি করা হচ্ছে। সারা দেশে দোকান ডিলারের সংখ্যা দুই হাজার ৯০০। দৈনিক প্রতি ট্রাকের জন্য চাল দেওয়া হচ্ছে তিন টন। আর দোকানে বিক্রির জন্য এক টন। এ ছাড়া ফেয়ার প্রাইস কার্ডের ডিলাররা চাল পান সপ্তাহে পাঁচ টন। আগামী মাসের প্রথম দিন থেকে প্রতি কেজি চাল এক টাকা বেড়ে ২৫ টাকা দরে বিক্রি হওয়ার কথা।

তথ্যবিভ্রাটও চালের দাম বাড়ায় by আশরাফুল হক রাজীব

Sunday, January 16, 2011

চাল ও গম উৎপাদনের যে তথ্য কৃষি মন্ত্রণালয় ও পরিসংখ্যান ব্যুরো দেয়, তা আমলে নিলে দেশে কোনো খাদ্যঘাটতির কথা থাকে না; বরং ২৫ থেকে ৩৩ লাখ টন চাল উদ্বৃত্ত থাকে। কাজেই অর্থনীতির চিরায়ত সূত্র অনুযায়ী, বাজারে খাদ্য তথা চালের দাম না বেড়ে কমার কথা।

কিন্তু বাস্তবতা উল্টো। দেশে যে খাদ্য উদ্বৃত্ত নেই, বরং ঘাটতি রয়েছে, তার জলজ্যান্ত প্রমাণ হলো বাজার। এই ভরা মৌসুমেও বেশ কিছুদিন ধরে বাজারে চালের দাম বাড়ছেই। গত এক বছরে দাম বাড়ার এ হার ৪৯ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিভিন্ন দপ্তরের ভুল তথ্যের কারণে বাজারের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই সরকারের। কারণ খাদ্য মন্ত্রণালয় যেসব তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পরিকল্পনা করছে, তা সঠিক নয়। এ কারণে খাদ্যশস্য, বিশেষ করে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের কোনো পরিকল্পনাই কাজে আসছে না।
অর্থনীতির সূত্র অনুযায়ী, বাজারে খাদ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকলে দাম বাড়ার কথা নয়। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, খাদ্য উৎপাদনের যে বাম্পার ফলনের তথ্য সরকারের তরফ থেকে বলা হয়, তা আদৌ ঠিক কি না? অথবা চাহিদার যে হিসাব দেওয়া হচ্ছে, তা সঠিক কি না? কিংবা আরো যেসব জরুরি তথ্য রয়েছে, যেমনÑজনসংখ্যা, মাথাপিছু খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ ইত্যাদি, এগুলো সঠিক কি না, সে প্রশ্নও আছে। খাদ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করলে এ চিত্রই ফুটে ওঠে।
খাদ্যমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক গত শনিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘খাদ্য পরিকল্পনার বিভিন্ন উপাদান, যেমনÑজনসংখ্যা, মাথাপিছু খাদ্য গ্রহণের চাহিদা অথবা খাদ্য উৎপাদনের পরিসংখ্যানে গোলমাল রয়েছে। এ কারণে পরিকল্পনার সঙ্গে বাস্তবতার কিছুটা অমিল রয়েছে। সমস্যাটি সমাধানের চেষ্টা করছি। আশা করি, চলতি বছরের আদমশুমারিতে এর সমাধান বের হয়ে আসবে।’
তবে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী গতকাল রবিবার কালের কণ্ঠকে জোর দিয়ে বলেন, ‘কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যে কোনো গলদ নেই। মাঠপর্যায় থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। আবার তথ্য সংগ্রহে স্পারসোর সহায়তাও নেওয়া হয়। সমস্যা যদি জনসংখ্যায় হয়, তাহলে আমার কিছু বলার নেই। মাথাপিছু খাদ্য গ্রহণের হারেও সমস্যা থাকতে পারে। তার পরও অস্বীকার করি না, খাদ্য উৎপাদনের পরিসংখ্যানে কিছু সমস্যা আছে। তবে সেটা দিন দিন কমে আসছে। সামনের দিনগুলোতে আরো কমে যাবে।’
কৃষিমন্ত্রী আরো বলেন, পরিসংখ্যানের জটিলতা থাকুক বা না থাকুক, বাংলাদেশের খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে। এই তথ্য সরকারের নয়, এটা জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার। তারা বলেছে, গত দুই বছরে যে চার-পাঁচটি দেশের খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে, তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। সরকার কৃষিতে ভর্তুকি দিচ্ছে। ভরা মৌসুমে কৃষক ধানের দাম পাচ্ছে, যা আগে কখনো পায়নি। ঘূর্ণিঝড় আইলা এবং হওরে প্লাবন না হলে কৃষি উৎপাদন গত দুই বছরে কোথায় গিয়ে দাঁড়াত, তা মূল্যায়নের দায়িত্ব সাধারণ মানুষের ওপর ছেড়ে দিলাম।’
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর দেশে বোরো চালের উৎপাদন হয়েছে এক কোটি ৮৭ লাখ টন। আমন হয়েছে এক কোটি ৩৫ লাখ টন আর আউশ ২৫ লাখ টন। মোট উৎপাদন হয়েছে তিন কোটি ৪৭ লাখ টন চাল। এর মধ্যে ১২ ভাগ খাদ্যশস্য বীজ হিসেবে সংরক্ষণ এবং মাঠ থেকে আনা ও মাড়াই প্রক্রিয়ায় নষ্ট হয় বলে ধরা হয়। ফলে এ পরিমাণ খাদ্যশস্য বাজারে আসে না। এ অংশটুকু বাদ দিলে দেশে মোট খাদ্যশস্যের উৎপাদন তিন কোটি পাঁচ লাখ ৩৬ হাজার টন। এর সঙ্গে দেশে উৎপাদিত ১০ লাখ টন গম ও আমদানি করা ৩০ লাখ টন খাদ্যশস্য যোগ করলে মোট খাদ্যশস্যের পরিমাণ দাঁড়ায় তিন কোটি ৪৫ লাখ ৩৬ হাজার টন।
আর বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য মতে, গত অর্থবছরে (২০০৯-১০) বোরো চাল এক কোটি ৮৩ লাখ টন, আমন এক কোটি ২২ লাখ টন, আউশ ১৭ লাখ টন এবং গমের উৎপাদন ছিল ৯ লাখ ৬৯ হাজার টন। মোট খাদ্যশস্যের উৎপাদন ছিল তিন কোটি ৩১ লাখ ৬৯ হাজার টন।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ ২০০১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী দেশের জনসংখ্যা ১২ কোটি ৪৪ লাখ। তাদের গতকালের জনসংখ্যা-ঘড়ি অনুযায়ী দেশের বর্তমান জনসংখ্যা ১৪ কোটি ৯৮ লাখ ৭২ হাজার ৪৪৮ জন। অনেকের ধারণা, আসলে জনসংখ্যা হবে ১৬ কোটি। খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিটের হিসাব মতে প্রতিদিন মাথাপিছু খাদ্যশস্যের চাহিদা ৪৮৯ গ্রাম। অর্থনীতিবিদদের মতে, একজন মানুষের প্রতিদিনের খাদ্য চাহিদা ৫০০ গ্রাম। সেই হিসাবে ১৬ কোটি লোকের জন্য বছরে খাদ্য চাহিদার পরিমাণ দাঁড়ায় দুই কোটি ৯২ লাখ টন। এর মধ্যে প্রায় ২০ লাখ জনসংখ্যা রয়েছে, যাদের বয়স ছয় মাসের নিচে এবং যারা দানাদার খাদ্যশস্য গ্রহণ করে না। জনসংখ্যার এ অংশটুকু বাদ দিলে খাদ্য চাহিদার পরিমাণ দাঁড়ায় দুই কোটি ৮২ লাখ ৬৩০ টন।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের দেওয়া খাদ্যশস্যের উৎপাদনের হিসাব সঠিক হলে দেশে ৩৩ লাখ ৩৫ হাজার ৩৭০ টন খাদ্যশস্য উদ্বৃত্ত থাকার কথা। কাজেই আমদানি তো নয়ই বরং বাংলাদেশ খাদ্য রপ্তানি করতে পারে। আর বাজারে দাম বাড়ারও কারণ নেই।
ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক ও কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. মাহবুব হোসেন বলেন, ‘চাহিদার চেয়ে জোগান বেশি হলে চালের দাম বাড়ার কোনো কারণ নেই। জোগান কম হলেই দাম বাড়ে। তাই বলা যায়, সঠিক তথ্যের অভাবে সরকারের পরিকল্পনা যথাযথ হয় না। খাদ্যের মতো একটি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তথ্যবিভ্রাট কারোই কাম্য নয়। বিষয়টি সরকারকে আমিও জানিয়েছি। কৃষি মন্ত্রণালয় মাঠকর্মী ও স্পারসোর মাধ্যমে যে পরিসংখ্যান সংগ্রহ করে তা প্রশ্নাতীত নয়। পরিসংখ্যান ব্যুরো জনসংখ্যার যে হিসাব দিচ্ছে তা নিয়ে অনেকের সন্দেহ থাকে। আর খাদ্য মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিট মাথাপিছু খাদ্য চাহিদার যে তথ্য দিচ্ছে তাও শতভাগ ঠিক নয়। এ অবস্থা চলতে দেওয়া উচিত নয়।’
খাদ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, দেশে উৎপাদিত খাদ্য ও আমদানি করা চালের বাইরেও বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা বাংলাদেশকে খাদ্য সহায়তা দেয়, যা তারা বিভিন্ন এনজিওর মাধ্যমে বিতরণ করছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, কৃৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের গ্রাম পর্যায়ের অফিসগুলোর উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার (ব্লক সুপারভাইজার) মাধ্যমে সরকার খাদ্যশস্যের তথ্য সংগ্রহ করে। কৃষক কতটুকু জমিতে কী ফসল চাষ করছে, উৎপাদন কেমন হতে পারে এবং ফসল কাটার সময় প্রকৃত উৎপাদন কেমন হলোÑসে হিসাব দিয়ে থাকেন তাঁরা। অভিযোগ রয়েছে, এসব কর্মকর্তা কৃষকের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করেন না। জরিপের জন্য সর্বজনস্বীকৃত কোনো পন্থাও তাঁরা ব্যবহার করেন না। বড় একটি আবাদি মাঠের পাশে গিয়ে সেখানে কতটুকু জমি আছে লোকজনের কাছে শুনে এর ওপর ভিত্তি করে একটি আনুমানিক উৎপাদনের হিসাব দেন। অথবা আগে থেকে সংগ্রহ করা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে অফিসে বসেই একটি কাল্পনিক তথ্য সরকারকে দেন, যার ওপর ভিত্তি করে খাদ্য পরিকল্পনা করা হয়।
সাধারণত কৃষি মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যানের সঙ্গে পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যের মিল থাকে না। এ নিয়ে সব সরকারের সময়ই প্রশ্ন উঠেছে। গত চারদলীয় জোট সরকারের সময় অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান পরিসংখ্যানের অমিল দূর করার জন্য অনেক বৈঠক করেন। গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে পরিসংখ্যানগত অমিল দূর করার জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে কমিটি গঠন করা হয়। সেই কমিটিও তাদের রিপোর্টে বিভিন্ন পরিসংখ্যানগত অমিলের জন্য খাদ্যমূল্য সংকটসহ নানা সংকট সৃষ্টির কথা তুলে ধরে। মহাজোট সরকারের কৃষিমন্ত্রীও গত বছর পরিসংখ্যান ব্যুরোর কর্মকর্তাদের ভর্ৎসনা করেন।
একজন কৃষি অর্থনীতিবিদ জানান, কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাব মতে যদি বোরো মৌসুমে বাম্পার ফলনই হবে তাহলে চালের দাম চড়া থাকার কোনো কারণ নাই। কৃষক, ব্যবসায়ী বা মজুদদাররা যদি মজুদও করে থাকেন তা সাধারণত আমন মৌসুম পর্যন্ত ধরে রাখেন। অথচ এবার আমন মৌসুমে কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে উৎপাদন ভালো হওয়ার কথা জানানোর পরই চালের বাজার ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। এমন নজির খুব কম রয়েছে। অপরদিকে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের চালের বাজারের তেমন পার্থক্য নেই। তাই ভারত থেকে বৈধ বা অবৈধ কোনোভাবেই তেমন একটা চাল আসছে বা যাচ্ছে না। তাহলে বিপুল পরিমাণ উৎপাদিত খাদ্যশস্য কোথায় যাচ্ছে?

চাল-ডালসহ পাঁচ পণ্যের মজুদ বাড়াবে সরকার

Thursday, January 13, 2011

বাজারের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পাঁচটি পণ্যের মজুদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) মাধ্যমে প্রয়োজনীয় চাল ও গম আমদানি করবে সরকার।

এ ছাড়া টিসিবির মাধ্যমে ভোজ্য তেল, চিনি, ডাল ও ছোলা আমদানি করা হবে। গতকাল বৃহস্পতিবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত জরুরি সমন্বয় সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় আশা প্রকাশ করা হয়, এ আমদানির ফলে আগামী এপ্রিল মাসে বোরো মৌসুম শুরুর সময়ও সরকারের গুদামে সাত লাখ টনের বেশি চাল ও গম মজুদ থাকবে। টিসিবি যাতে এসব পণ্য কিনতে পারে, সে জন্য সরকারের কাছে এক হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হবে। সভায় বাণিজ্যমন্ত্রী মুহাম্মদ ফারুক খান ও খাদ্যমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাকসহ দুই মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সভা শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের জানান, এ বছর সরকারের তিন লাখ টন চাল আমদানির সিদ্ধান্ত ছিল। বিশ্ব খাদ্য সংকটের প্রেক্ষাপটে সরকারিভাবে অতিরিক্ত ৯ লাখ টন চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে সাড়ে ছয় লাখ টন চাল আমদানির ঋণপত্র (এলসি) খোলা হয়েছে। সরকার শুরুতে এ বছরের জন্য সাড়ে সাত লাখ টন গম আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এখন তা বাড়িয়ে ১০ লাখ টন করা হচ্ছে। এ ছাড়া বেসরকারি উদ্যোক্তারা গতবারের মতো এবারও প্রায় ৩০ লাখ টন গম আমদানি করবেন।
বাণিজ্যমন্ত্রী আরো জানান, ভোজ্য তেলের বাজার স্বাভাবিক রাখতে টিসিবির মাধ্যমে দুই লাখ টন সয়াবিন ও পাম অয়েল আমদানি করা হবে। খাদ্য ও চিনিকল করপোরেশনের আওতাধীন চিনিকলগুলোতে এ বছর গতবারের তুলনায় উৎপাদন দ্বিগুণ হবে আশ্বাস দিয়ে মন্ত্রী বলেন, এর ফলে অভ্যন্তরীণভাবে এক লাখ টন চিনি পাওয়া যাবে। টিসিবির মাধ্যমে আরো দুই লাখ টন চিনি আমদানি করা হবে। মন্ত্রী জানান, টিসিবির গুদামে প্রায় ২৫ হাজার টন ডাল মজুদ রয়েছে। এর বাইরে আরো ১০ হাজার টন ডাল আমদানি করা হবে। এ ছাড়া আগামী রমজান মৌসুমের জন্য আগাম প্রস্তুতি হিসেবে ২০ হাজার টন ছোলা আমদানি করবে টিসিবি। এসব পণ্য খাদ্য মন্ত্রণালয়ের গুদামে রাখা হবে। পণ্য আমদানির খরচ বাবদ সরকারের কাছে এক হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার প্রভাব দেশের বাজারেও পড়ছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) ভবিষ্যতে খাদ্য সংকট আরো প্রকট হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সরকার বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। বিশ্ব খাদ্য সংকটের নেতিবাচক প্রভাব যাতে দেশের বাজারে না পড়ে, সে জন্য সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে বিদেশ থেকে খাদ্য আমদানি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
খাদ্যমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক বলেন, চাল ও গমের দাম বেশি হওয়ায় শ্রমজীবী মানুষের কষ্ট হচ্ছে। সরকার আমদানি বাড়িয়ে দাম সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে। এ ছাড়া খোলা বাজারে চাল বিক্রি (ওএমএস) ও ফেয়ার প্রাইস পদ্ধতিতে দরিদ্রদের মাঝে কম দামে চাল ও গম সরবরাহ করা হচ্ছে।
চালের দাম বাড়ার কারণ সম্পর্কে খাদ্যমন্ত্রী বলেন, এ বছর ধানের উৎপাদন বেড়েছে। কিন্তু দেশের প্রকৃত জনসংখ্যার হিসাব নেই। তা ছাড়া অনেক কৃষকের ঘরে ধান ও চাল মজুদ রয়েছে। কয়েক মাস পরে দেশে চালের দাম আরো বাড়বেÑএ আশায় মিলমালিকরা ধান ও চাল মজুদ করছে। তা ছাড়া গম ও আটার দাম বাড়ার কারণে চালের ওপর বেশি চাপ পড়ছে। খাদ্যমন্ত্রী আরো বলেন, ভারতের গুদামে দুই কোটি ৫৬ লাখ টন চাল মজুদ থাকার পরও দেশটির সরকার দাম কমাতে পারছে না।
সরকারের গুদামে এখন আট লাখ ২২ হাজার টন গম ও চাল মজুদ রয়েছে উল্লেখ করে খাদ্যমন্ত্রী বলেন, আগামী এপ্রিল মাসের মধ্যেই আরো ছয় লাখ টন চাল ও পাঁচ লাখ টন গম দেশে এসে পৌঁছবে। আর এ সময়ে খরচ বাদ দিলেও সরকারের মজুদ থাকবে সাত লাখ ২২ হাজার টন চাল ও গম মজুদ থাকবে। আর তত দিনে বোরোর চাল বাজারে পাওয়া যাবে।
ছয় লাখ টন চাল আমদানির এলসি খোলা হয়েছে জানিয়ে খাদ্যমন্ত্রী বলেন, আরো আড়াই লাখ টন চাল আন্তর্জাতিক টেন্ডারে সংগ্রহ করা যাবে। অবশ্য ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ড ছাড়া আর কোনো দেশে চাল পাওয়া যাচ্ছে না। এসব দেশ থেকে চীন, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইন প্রচুর চাল আমদানি করেছে। ভারত থেকে তিন লাখ টন চাল আমদানির আলোচনা হচ্ছে। সেখান থেকে পাওয়া না গেলেও কোনো না কোনো দেশ থেকে তা সংগ্রহ করা যাবে।
সভায় বাণিজ্যসচিব মো. গোলাম হোসেন, খাদ্যসচিব বরুণ দেব মিত্র, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এ টি এম মুর্তজা রেজা চৌধুরী, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডাব্লিউটিও সেলের মহাপরিচালক অমিতাভ চক্রবর্তী, টিসিবির চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সারোয়ার জাহান, খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আহমদ হোসেন খান, খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিটের মহাপরিচালক নাসের ফরিদসহ উভয় মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

৬৫ হাজার মেট্রিক টন ভোজ্য তেলের মজুদ গোপনের তথ্য ফাঁস

Wednesday, January 12, 2011

সংকটকে দায়ী করে দাম যখন লাগামছাড়া, তখনই ৬৫ হাজার মেট্রিক টন ভোজ্য তেলের মজুদ গোপন করার ঘটনা ধরা পড়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও শুল্ক কর্তৃপক্ষের সরেজমিন তদন্তে এ জালিয়াতির তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

গত ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশের আমদানিকারক রিফাইনারিগুলো সরকারকে এক লাখ ২৪ হাজার মেট্রিক টন অপরিশোধিত ভোজ্য তেল মজুদ থাকার কথা জানালেও একই সময়ে চট্টগ্রামের তেল মজুদকারী টার্মিনালগুলোতে ট্যারিফ কমিশনের সদস্যদের উপস্থিতিতে পরিচালিত তদন্তে এর মজুদ ধরা পড়ে এক লাখ ৮৯ হাজার ৩৭২ মেট্রিক টন। এর ফলে দেখা যাচ্ছে, প্রায় ৬৫ হাজার টন ভোজ্য তেল মজুদের তথ্য গোপন করা হয়েছে সরকারের কাছে। গতকাল বাণিজ্যমন্ত্রীর নির্দেশে তদন্ত প্রতিবেদনটি সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে পাঠানো হয়েছে পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণের জন্য। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
চট্টগ্রাম কাস্টমস কমিশনার সৈয়দ গোলাম কিবরিয়া ভোজ্য তেলের মজুদসংক্রান্ত তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা সরকারের নির্দেশমতো ভোজ্য তেলের ট্যাংকে মজুদ তেল মেপে ওই প্রতিবেদন তৈরি করেছি।
আমরা মনে করি, যে তথ্য আমরা সরেজমিন তদন্তে পেয়েছি সেটাই সঠিক। তা ছাড়া ভোজ্য তেল মজুদ সংকট ও আমদানি হচ্ছে না বলে আমদানিকারকদের পক্ষ থেকে যে কথা উঠেছে সে প্রসঙ্গে কাস্টমস কমিশনার বলেন, ভোজ্য তেলের আমদানি স্বাভাবিক রয়েছে।
ভোজ্য তেলের দাম সরকারিভাবে নির্দিষ্ট করে দেওয়ার পরও এর দাম তো কমেইনি বরং অব্যাহতভাবে বেড়েই চলেছে। অজুহাত হিসেবে ভোজ্য তেল আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়া ও দেশে পর্যাপ্ত মজুদ না থাকাকে দায়ী করেন। এ অবস্থায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় চট্টগ্রাম শুল্ক কর্তৃপক্ষকে মজুদ পরিস্থিতি জানাতে নির্দেশ দেয়। তারই ধারাবাহিকতায় শুল্ক কর্তৃপক্ষ ঢাকা থেকে যাওয়া ট্যারিফ কমিশনের সদস্যদের উপস্থিতিতে পর্যবেক্ষণ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় প্রতিবেদনটির আলোকে করণীয় নির্ধারণ করতে গতকাল তা সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরে জরুরি ফ্যাক্স করে পাঠায়।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ভোজ্য তেল পরিশোধনকারী সমিতি সরকারকে জানিয়েছে চট্টগ্রামের ছয়টি ট্যাংক টার্মিনালে মোট অপরিশোধিত সয়াবিন তেল মজুদ রয়েছে ৬৩ হাজার টন আর অপরিশোধিত পাম-অয়েল রয়েছে ৬১ হাজার টন। সব মিলিয়ে অপরিশোধিত ভোজ্য তেলের মজুদ দেখানো হয়েছে এক লাখ ২৪ হাজার টন। এ ব্যাপারে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনবিআরের একজন শুল্ক কর্মকর্তা গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, যে পরিমাণ ভোজ্য তেল মজুদের তথ্য গোপন করা হয়েছে, বার্ষিক চাহিদার গড় হিসাবে তা সারা দেশের প্রায় ১৫ দিনের তেলের চাহিদার সমান। বাজারে ভোজ্য তেলের মজুদ থাকা সত্ত্বেও সংকট দেখিয়ে দাম বাড়ানোর একটি অপচেষ্টা হতে পারে এটি।
অথচ তদন্তে ওই ছয় অয়েল ট্যাংক টার্মিনালে ভোজ্য তেলের মজুদ পাওয়া গেছে এক লাখ ৮৯ হাজার ৩৭২ টন। ইলিয়াছ ব্রাদার্স লিমিটেডের টার্মিনালে মোট ভোজ্য তেল মজুদ রয়েছে ৩১ হাজার ৪২৩ টন। অথচ সরকারকে এ টার্মিনালে মজুদের পরিমাণ জানানো হয়েছে ২৪ হাজার ৫০০ টনের। কম দেখানো হয়েছে ছয় হাজার ৪২৩ টন। এ টার্মিনালে সরকারি তদন্তে যে মজুদ পাওয়া গেছে তা হলোÑমেরিন ভেজিটেবল অয়েলের ১৯ হাজার ৯২৬ টন, এস আলম সুপার এডিবল অয়েলের চার হাজার ৮২৩ টন ও ইলিয়াছ ব্রাদার্সের ছয় হাজার ৬৬৩ টন। ভ্যান ওমেরনি ট্যাংক টার্মিনাল ও ইন্টারন্যাশনাল অয়েল টার্মিনালে মজুদ দেখানো হয়েছে তার সঙ্গে সরকারি তদন্তে পাওয়া মজুদের মিল রয়েছে। ভ্যান ওমেরনি টার্মিনালে অপরিশোধিত ভোজ্য তেলের মজুদ ৩৯ হাজার ৭৫৭ টন। এর মধ্যে ইউনাইটেড এডিবল অয়েলের পাঁচ হাজার ৪০৭ টন, এস আলমের আট হাজার ৮০১ টন, এম এম ভেজিটেবলের ৩৭ টন, সুপার অয়েলের তিন টন, দীপা ফুডের পাঁচ হাজার ৬৭৬ টন, বে ফিশিংয়ের পাঁচ হাজার ৯৬৬ টন, উত্তম অয়েলের এক হাজার ১৩৪ টন, ডিউটিটি অয়েলে এক হাজার ৩৮২ টন, শবনম ভেজিটেবলের চার হাজার ৯৮৭ টন, জাসমির ভেজিটেবলের পাঁচ হাজার ১৫৬ টন, ফারজানা অয়েলের এক হাজার ১৯৩ টন ও রুবাইয়া ভেজিটেবলের ১৪ টন তেল রয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল অয়েল মিলস লিমিটেড ট্যাংক টার্মিনালে মোট মজুদ রয়েছে ২১ হাজার ৭২৪ টন। এর মধ্যে এস আলম অয়েলের এক হাজার ২৪২ টন, সুপার অয়েলের ছয় হাজার ৮৯০ টন, ফারজানা অয়েলের তিন হাজার ৯৬৩ টন, দীপা ফুডের পাঁচ হাজার ২৭৪ টন ও রুবাইয়া ভেজিটেবলের চার হাজার ৩৫৪ টন তেল আছে।
পরিশোধনকারীদের পক্ষ থেকে বে ফিশিং করপোরেশন টার্মিনালে কোনো মজুদ নেই বলে জানানো হলেও সেই ট্যাংক টার্মিনালে সরকারি তদন্তে মজুদ ভোজ্য তেল পাওয়া গেছে ২৬ হাজার ৩২১ টন। এর মধ্যে শবনম ভেজিটেবলের ১১ হাজার ৪৯৪ টন ও বে ফিশিং করপোরেশনের ১৪ হাজার ৮২৬ টন তেল আছে।
পরিশোধনকারীদের পক্ষে সাউথ ইন্টারন্যাশনাল ট্যাংক টার্মিনালে মজুদ ভোজ্য তেলের পরিমাণ জানানো হয়েছিল ২৩ হাজার টন। অথচ তদন্তে মজুদ ভোজ্য তেল পাওয়া গেছে ৫৬ হাজার ৯৬ টন। এর মধ্যে এস আলমের ২২ হাজার ৬১০ টন, বাংলাদেশ এডিবল অয়েলের তিন হাজার ৩০০ টন, সামান্নাজ সুপার অয়েলের ১২ হাজার ৯৩১ টন, এসজি অয়েলের দুই হাজার ৩৫৩ টন, ইউনাইটেড এডিবল অয়েলের সাত হাজার ৪৪০ টন ও তানভীর অয়েলের সাত হাজার ৪৫৬ টন তেল রয়েছে।
ইস্টার্ন ফিশারিজ ট্যাংক টার্মিনালে মজুদ ভোজ্য তেল পাওয়া গেছে ১৪ হাজার ৪৯ টন। সরকারকে জানানো হয়েছে ১৪ হাজার টনের তথ্য। গোপন করা হয়েছে ৪৯ টনের তথ্য। তদন্তে পাওয়া মুজদের মধ্যে এস আলমের দুই হাজার ৩১৩ টন, এম এম ভেজিটেবলের সাত হাজার ৭৫৭ টন, মারিন ভেজিটেবলের তিন হাজার ৯৭৮ টন ও রুবাইয়া ভেজিটেবল অয়েলের এক মেট্রিক টন অপরিশোধিত ভোজ্য তেলের মজুদ রয়েছে।

সহজে ব্যাংক ঋণ পেয়ে ধান মজুদের হিড়িকঃ চালের দাম বাড়ছেই

Saturday, January 8, 2011

ধান-চাল উৎপাদনের প্রধান জেলাগুলোতে এখন ব্যাংক ঋণের ছড়াছড়ি চলছে। ব্যাংকগুলো প্রতিযোগিতা করে কৃষক পর্যায় পর্যন্ত ঋণ বিতরণে মেতে উঠেছে। মূলত এই ব্যাংক ঋণের কল্যাণে শুরু হয়েছে ধানের নতুন এক ধরনের মজুদদারি। আর এতেই বেড়ে যাচ্ছে চালের দাম।

জেলাপর্যায়ে ও রাজধানীর চালের আড়তে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চালের দাম বাড়ার মূল কারণ হাটবাজারে ধানের দাম বেশি। মজুদদারি, ধান কেনার জন্য মিলগুলোর প্রতিযোগিতা এবং ব্যাংকের দেওয়া ঋণ ধানের দাম বাড়ানোর পেছনে ভূমিকা রেখেছে। ব্যাংক ঋণ ও ক্ষুদ্রঋণ ছোট কৃষকদেরও টাকার চাহিদা পূরণ করছে। ফলে আরো দাম বাড়ার আশায় তাঁরাও ধান বিক্রি করছেন না। তবে তাঁদের মজুদ তুলনামূলক খুবই কম। মূলত মিল মালিক, চাতাল মালিক, ফড়িয়া, ব্যবসায়ী ও বড় কৃষকদের ধান মজুদ প্রবণতার কারণেই এই ভরা মৌসুমেও চালের দাম বেড়ে চলেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ পরিশোধের সময়সীমা কমিয়ে দিয়েও এ ক্ষেত্রে সুফল পাচ্ছে না। কারণ এক ব্যাংকের ঋণ শোধের সময় হলে অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে মজুদদাররা টাকার চাহিদা পূরণ করছেন। আর ব্যাংকগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতার কারণে ঋণ খুবই সহজলভ্য হয়ে গেছে। অভিযোগ রয়েছে, মিলের সম্পত্তির দামের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি ঋণ দিচ্ছে ব্যাংকগুলো। ফলে ধানের বাজারদর অনেক বেশি পড়ছে। বেশি দামের ধান থেকে তৈরি চাল আরো কয়েক দফা হাতবদল হয়ে খুচরা বিক্রেতাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে অনেক বেশি দামে।
উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে প্রচুর চালকল গড়ে উঠেছে। কিন্তু আমন মৌসুমে জেলাগুলোতে মোট ধানের উৎপাদন মিলগুলোর চাহিদার তুলনায় কম। মৌসুম শেষ হয়ে যাওয়ার পরও মিল চালু রাখতে ধানের মজুদ করেন মালিকরা। এ জন্য তাঁরা অন্যের চেয়ে বেশি দামে হলেও ধান কিনতে চান। এতেও চালের দাম বাড়ে।
এসব বিষয়ে খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আহমেদ হোসেন খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চালের দাম বাড়ার একটা কারণ হতে পারে মিলারদের কারসাজি। তাঁরা ধান কিনে মজুদ করে রাখছেন। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তাঁরা বিপুল পরিমাণ ধান কিনছেন। এ ধান বাজারে না ছাড়া হলে স্বাভাবিকভাবেই দাম বাড়বে।’
আহমেদ হোসেন খান বলেন, ‘ধান-চালের দাম বাড়ার সুফল কৃষকও পাচ্ছেন। এখন কৃষকরা অনেক সচ্ছল। তাঁরা দাম না বাড়লে ধান বিক্রি করছেন না।’
দুই মাস ধরে বাড়ছে দাম : গতকাল শনিবার রাজধানীর কাজীপাড়া বাজারে প্রতি কেজি মোটা চাল বিক্রি হয়েছে ৩৬ টাকা দরে। কারওয়ান বাজারে চালের সর্বনিু দাম রাখা হচ্ছে ৩৫ টাকা। আর বাবুবাজার-বাদমতলীর আড়তে প্রতি কেজি মোটা চালের পাইকারি দর ৩৩-৩৪ টাকা। উত্তরাঞ্চলে মোটা চালের ধানের দাম মণপ্রতি ৮০০-৮৫০ টাকা। মৌসুমের শুরুতেই এ দাম ১০০-১৫০ টাকা বেড়ে গেছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা।
কারওয়ান বাজারের লাকসাম ট্রেডার্সের বিক্রেতা আমান উল্লাহ জানান, প্রতি সপ্তাহেই কমবেশি হারে চালের দাম বাড়ছে। এমনকি সকালে একদরে বিক্রি হলে বিকেলেই তা বেড়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে বাজারে এ অবস্থা চলছে। তিনি বলেন, ‘ক্রেতা এলে আমাদের খুব খারাপ লাগে। কারণ তাদের কথা দিয়ে কথা রাখতে পারি না। সকাল-বিকেল দাম বেড়ে যায়।’
বাবুবাজারের শিল্পী রাইস এজেন্সির বিক্রেতা কাওসার হোসেন বলেন, দুই মাস ধরে প্রায় প্রতিদিন চালের দাম মণপ্রতি ১০ টাকা থেকে ২০ টাকা করে বাড়ছে। এভাবে দুই মাসে মণপ্রতি বেড়েছে প্রায় ২০০ টাকা।
ঢাকার বাইরে নওগাঁয় গতকাল খুচরা বাজারে মোটা চাল ৩৩ থেকে ৩৪ টাকা এবং চিকন জিরা শাইল ও নাজির ৪৪ থেকে ৪৫ টাকা দামে বিক্রি হয়েছে। শেরপুরে পাইকারি বাজারে মোটা চাল ৩১.৪০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
অন্য রকম মজুদদারি : ভরা মৌসুমে চালের দাম বাড়ার কারণ অনুসন্ধান করে জানা গেছে, এর পেছনে চাতালমালিক, মিলমালিক, ফড়িয়া ও বড় কৃষকদের মজুদ প্রবণতাই দায়ী। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তাঁরা বিপুল পরিমাণ ধান মজুদ করেছেন। বাজারে সরবরাহের চেয়ে ক্রেতা বেশি হয়ে যাওয়ায় দাম বেড়ে গেছে। আর কৃষকরা লাভের আশায় কিছু কিছু ধান ধরে রাখছেন। এর সুফলও তাঁরা পাচ্ছেন।
দিনাজপুর চালকল মালিক গ্র“পের সাধারণ সম্পাদক শহীদুর রহমান পাটোয়ারী মোহন কালের কণ্ঠকে জানান, অটোমিলগুলো ব্যাংক থেকে দু-তিন কোটি টাকা করে প্লেস লোন নিয়েছে। অন্য মিলগুলোর ঋণ আছে কমপক্ষে ৫০ লাখ টাকা করে।
দিনাজপুরের বাহাদুর বাজারের পাইকারি চাল বিক্রেতা গোলাম মোস্তফা কালের কণ্ঠকে জানান, ঋণের টাকায় ধান মিলে মিলাররা গড়ে তুলেছেন বিশাল মজুদ। স্থানীয় পাইকারি বিক্রেতাদের হাতে তেমন চাল নেই। যত চাল ছাঁটাই হয়, তার বেশির ভাগের ক্রেতা জেলার বাইরের ব্যবসায়ীরা। আগাম টাকা দিয়ে ধান কিনে তাঁরা ইচ্ছেমতো চাল ছাঁটাই করে বাজারে ছাড়েন। এ জন্য স্থানীয় অটোমিলগুলোর অধিকাংশের নিয়ন্ত্রণ তাঁদের হাতে। মিলারের ঘরে মজুদ দেখা গেলেও এসবের মালিক বাইরের ব্যবসায়ীরা। সিন্ডিকেট চাইলে বাজারে চাল ওঠে। দাম বাড়ে পাইকারি এবং খুচরা বাজারে। আলোচনার বাইরে রয়ে যায় ব্যাংকের প্লেস লোন এবং মজুদদার ব্যবসায়ীদের ভূমিকা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ব্যবসায়ী জানান, দিনাজপুর শিল্প কারখানায় উন্নত নয়। অথচ গত কয়েক মাসে জেলা শহরে শাখা খুলে বসেছে প্রায় এক ডজন বেসরকারি ব্যাংক। মূলত চালকলভিত্তিক সেক্টরে মৌসুমি বিনিয়োগ থেকে লাভের আশায় ব্যাংকের শাখা খোলার হিড়িক চলছে দিনাজপুরে।
নওগাঁ পৌর চাল বাজারের ক্ষুদ্র চাল ব্যবসায়ী রিংকু সাহা জানান, নওগাঁর প্রতিটি মিলেই কিছু না কিছু চাল মজুদ থাকেই। এর পরিমাণও বিপুল। ওই মজুদ যদি বের করে আনা যায়, তবে চালের দাম অনেকটাই কমে যাবে।
একই এলাকার এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘মিলমালিকদের ঋণ দিতে ব্যাংকগুলো প্রতিযোগিতায় নেমেছে। একই সম্পত্তির ওপর এক ব্যাংক যে পরিমাণ ঋণ দেয়, আরেকটি ব্যাংক প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে সেই ঋণের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। উদ্বৃত্ত ঋণের টাকা দিয়ে ব্যবসায়ীরা সহজলভ্য হিসেবে ধান-চাল মজুদ করছেন। এতে বেড়ে যাচ্ছে চালের বাজার।
ঢাকার বাবুবাজারের চাল ব্যবসায়ী কাওসার হোসেন বলেন, ‘বাস্তবতা হলো ধানের মজুদ এখন ফড়িয়া ও মিলমালিকদের দখলে। তাঁরাই দাম নিয়ন্ত্রণ করছেন। বাজারে চালের কোনো ঘাটতি নেই যে ওই কারণে দাম বাড়বে।’
শেরপুর জেলা রাইস মিলমালিক সমিতির সভাপতি আশরাফুল আলম তালুকদার সেলিম বলেন, এখন মিলের সংখ্যা অনেক বেশি। সবাই বাজারে ধান কিনতে যায়। কিন্তু দেখা যায়, বাজারে ২৫ জনের ধান আছে, ব্যবসায়ীর সংখ্যা ৫০ জন। স্বভাবতই প্রতিযোগিতার কারণে ধানের দাম বাড়ছে। আর উৎপাদন খরচ বাড়ার কারণে চালের দামও বাড়ছে। তিনি জানান, অনেক মিল মালিক এবং ধান-চাল ব্যবসায়ী আছেন, যাঁরা এখন ধান কিনে রাখছেন, তিন চার মাস পর চাল করে বিক্রি করবেন। তা ছাড়া কৃষকরাও এখন সচেতন। তাঁরা যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু ধান বিক্রি করে বাকি ধান গোলায় ধরে রাখছেন। এসব কারণেই মূলত চালের দাম বাড়ছে।
ঋণের টাকায় ধান-চাল মজুদ ঠেকাতে গত ২৯ ডিসেম্বর ঋণ পরিশোধের সময়সীমা কমিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই দিন এক সার্কুলারে ধান, চাল বা চাতাল ব্যবসায়ীদের ঋণ পরিশোধের সীমা কমিয়ে ৩০ দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। আগে মিলমালিকদের ক্ষেত্রে এ ঋণ পরিশোধের সর্বোচ্চ সীমা ছিল ৪৫ দিন এবং ধান বা চাল ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৩০ দিন ছিল।
---
রাজীব আহমেদ (ঢাকা), সালাহ উদ্দিন আহমেদ (দিনাজপুর), ফরিদুল করিম (নওগাঁ) ও হাকিম বাবুল (শেরপুর)
 
Support : Dhumketo ধূমকেতু | NewsCtg.Com | KUTUBDIA @ কুতুবদিয়া | eBlog
Copyright © 2013. News 2 Blog 24 - All Rights Reserved
Template Created by Nejam Kutubi Published by Darianagar Publications
Proudly powered by Dhumketo ধূমকেতু