মুড়াপাড়ায় একদিন by সালেহ শফিক

Sunday, February 6, 2011

যেতে দুই ঘণ্টা লেগে গেল। আমি আর অপু আসলে বেড়াতে বের হইনি। আমরা সূত্রাপুর থানার দুই বাসিন্দা 'এই সেই' নানা কিছু নিয়ে মাথা ঘামাই মাঝেমধ্যে। গত নভেম্বরে ঘামল গার্মেন্টশ্রমিকরা রাস্তায় নেমে এলে। তারা সরকারনির্ধারিত বেতন কাঠামোয় বেতন চায়।

কিন্তু মালিকের তো টাকার মায়া আছে। তাঁকে শালা-শালি নিয়ে সুইজারল্যান্ড যেতে হয়। খোঁজখবর নিয়ে আমরা ভুলতায় রওনা হলাম সায়েদাবাদ থেকে। বাসটা যাবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, আমরা ভুলতা নেমে পড়ব। সিনহা গ্রুপের টেঙ্টাইল মিল এলাকা দেখতে দেখতে কাঁচপুর ব্রিজ পার হয়ে সিলেট মহাসড়কে উঠি। সড়কের দুই পাশে রিরোলিং মিল, ডাইং ফ্যাক্টরি ছাড়া আর কিছু দেখার নেই। ভুলতায় এসে দেখি বাজারঘাট ঠিকঠাক চলছে, কোথাও কেউ রাস্তা আটকে বসে নেই। আমরা হতাশ হব কি না মনস্থির করতে পারছিলাম না। বাজারে দু-একজনকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারি, গতকাল রবিনটেক গার্মেন্ট কর্তৃপক্ষ সপ্তাহখানেক সময় চেয়ে শ্রমিকদের সঙ্গে বোঝাপড়া করেছে। আজ তাই গণ্ডগোল নেই। কুছ পরোয়া নাই ভাব নিয়ে মুড়াপাড়া চললাম। রিকশাওয়ালা ২০ টাকায় রাজি হয়ে গেল। মুড়াপাড়ার কথা জেনেছিলাম গাইড ট্যুর সূত্রে। আগে তারা শীতলক্ষ্যা নদী ধরে পর্যটকদের মুড়াপাড়া জমিদারবাড়ি নিয়ে আসত। দিনে দিনে বেড়ানোর জন্য ঢাকার কাছে এটি ভালো জায়গা। যেতে যেতে জানতে পারি চালক আসলে রবিনটেকের শ্রমিক। যত দিন গার্মেন্ট বন্ধ থাকবে তত দিন রিকশা চালাবে। অপু জিজ্ঞেস করে, আন্দোলন না করে কি সমস্যা মেটানো যায় না? চালক বলে, 'আমরা কি ইচ্ছা কইরা রাস্তায় নামি ভাই?
: এখন যদি পুরাই বন্ধ হয়ে যায়?
: বড়লোকের ট্যাকার মায়া বেশি। বন্ধ করব না।'
রাস্তার দুই ধারে প্রচুর ঝুট (কাপড়ের বাড়তি অংশ) শুকাতে দেওয়া। এ এলাকায় অনেক প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠেছে। মুড়াপাড়া এসে আবদুল লতিফ জুট মিলের দরজায় নামি। ভেতরে যেতে চাইলে দারোয়ান বলে, মালিক আসছে।
অগত্যা দরজা থেকেই বিদায় হই। জমিদারবাড়ির দিকে যেতে থাকি। পিচঢালা পথ থেকে কাঁচা রাস্তায় নামি আমগাছের সারির ভেতর দিয়ে। সদর দরজা সাদামাটা। তবে বাড়িটি প্রথম দেখাতেই মন কেড়ে নিল। দোতলা বাড়ি বিরাট উঁচু। ইয়া মোটা মোটা গোটাকয়েক সিমেন্টের থামের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সামনে সবুজে মোড়া মাঠ। মাঠের মাঝখানে বাড়ির দিকে মুখ করে কালো কোট পরে কে যেন বসে আছে! কাছে গিয়ে দেখি রুটি-ভাজি খাচ্ছেন। সালাম দেওয়া থেকে মুখকে বিরত রাখলাম। আলাপে জানলাম তিনি মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ। বয়স বেশি নয়, মাস দুয়েক হলো এসেছেন, পরিবার এখনো আনেননি, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক। জানতে চাই, জমিদাররা জাতে কী ছিলেন? কিভাবে পয়সা করলেন? তিনি বলেন, 'আমি এখনো জেনে উঠতে পারিনি।' আমরা বলি, ভেতরে যেতে পারব?
তিনি মাথা ঝাঁকিয়ে হ্যাঁ বলেন। দুটি থামের মাঝখানে কাঠের পাটাতনে পা রাখি। চোখের সামনে ভেতর-বাড়ির উঠান, ডানে দোতলায় ওঠার সিঁড়ি। সিঁড়িই টানল আগে। দোতলার বারান্দা প্রশস্ত, ঘরের দরজা-জানালা কাঠের। দরজার ওপরের প্যানেলে গাঢ় নীল ও লাল কাচের নকশা_ফুল, পাতা, ময়ূর ইত্যাদির। ঘরগুলো বন্ধ। এসব ঘরে এখন কলেজের ক্লাস বসে। বারান্দার দক্ষিণ মাথায় বসার জায়গা আছে। বসে বসে সামনের বড় পুকুর দেখি। আমবাগানও দেখি। এ বাড়ির বিশেষ আকর্ষণ এর বয়সী আমগাছগুলো। তারপর সঙ্গে আনা বিস্কুট খাই। জমিদারবাড়িতে বসে বিস্কুট খাওয়ার বিশেষ আনন্দ আছে। দুপুর গড়িয়ে এলে হাই তুলে উঠে দাঁড়াই। সরু প্যাসেজ ধরে ভেতর-বাড়ির ছাদে যাই। দোতলার ছাদে ওঠার লোহার সিঁড়িটা দেখি ভেঙে পড়ে আছে। কষ্ট পেলাম বড়! ভেতর-বাড়ির ছাদ থেকে উবু হয়ে নিচে উঠান দেখি। দোতলার ছাদে একটা পিরামিড দেখে হৈ হৈ করে উঠি। নিচে নেমে এসে দুর্গামণ্ডপ দেখি। পূর্বদিকের রান্নাঘরটি বেশ বড়। বেরিয়ে এসে বাড়ির পেছন দিকে যাই। বাগান করার জন্য জায়গা আছে। আছে পুরনো একটি তেঁতুল গাছ। এ দিকটায় কেমন যেন পুরনো পুরনো গন্ধ। এক বৃদ্ধকে দেখি গোসল সেরে আসছেন। বাড়ি তাঁর চাঁদপুর। স্বাধীনতার আগে থেকে এখানে আছেন। কর্তাদের (জমিদার) শেষ পুরুষকে দেখেছেন। তাঁরা সন্দ্বীপ এলাকায় ব্যবসা করতেন। জাতে কায়স্থ। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের সময় পাততাড়ি গুটিয়ে কলকাতায় চলে গেছেন।
আলাপ-সালাপ সেরে আমবাগানের ভেতর দিয়ে সামনে চলে এলাম। পাশাপাশি দুটি মন্দির দেখলাম। একটা মন্দিরের প্রবেশমুখে খিলান আছে, মাথায় গম্বুজও আছে_কোন দেবতার ঠাহর করতে পারলাম না। আরেকটা মন্দির, বোধকরি শিবের হবে। গায়ে অনেক রিলিফ ওয়ার্ক (সিমেন্টে গড়া দ্বিমাত্রিক মূর্তি)_গঙ্গা, সরস্বতী, বরাহ, কূর্ম ইত্যাদি। এই প্রথম যমুনা দেবীর মূর্তিও দেখলাম। তারপর আর কাজ খুঁজে পেলাম না। বাজারে গিয়ে একটি মিষ্টির ঘরে বসলাম। পরোটা-ভাজি সুস্বাদু লাগল। অপু আবার গার্মেন্ট আন্দোলনের খোঁজখবর নিতে গেল। নতুন কিছু জানা গেল না। আমরা নৌকায় শীতলক্ষ্যা পার হয়ে টেম্পুস্ট্যান্ডে গেলাম। গ্রামের ভেতর দিয়ে পিচঢালা পথ। বাচ্চারা রাস্তার মাঝখানেই ছোটাছুটি করছে। ওদেরই বা দোষ কী! পথ খেয়েছে খেলার মাঠ। জমির দাম এখানে বেলায় বেলায় বাড়ছে। ঝিলের জমিও লাখ টাকা। টেম্পু নামিয়ে দিল চিটাগাং রোডে। ভ্রমণক্লান্ত দুই সূত্রাপুরিয়া ঝিমুতে ঝিমুতে বাড়ির পথ ধরলাম। উল্লেখ্য, মুড়াপাড়া নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ থানার একটি গ্রাম। জমিদার বাড়িতে বসেছে বেসরকারি মহাবিদ্যালয়।

কিভাবে যাবেন
ঢাকার সায়েদাবাদ থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়াগামী বাসে চড়ে নামতে হবে ভুলতা-গাউছিয়া। ভাড়া ৫০ টাকা। মুড়াপাড়া বাজারে খাওয়ার ভালো আঞ্জাম আছে। শীতলক্ষ্যার তাজা মাছও মিলতে পারে।

মনীষার সব আকাঙ্ক্ষা সুন্দরবনের জন্য

Wednesday, January 19, 2011

‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি। আমি এসেছি সুন্দর নেপাল থেকে ঐশ্বর্যময় বাংলাদেশে। প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য নির্বাচনে সুন্দরবনকে এইমাত্র ভোট দিলাম। আমার হৃদয়ের সব আকাক্সক্ষা সুন্দরবনের জন্য।’ সুন্দরবন ও বাংলাদেশের প্রতি এভাবেই নিজের অনুভূতি প্রকাশ করলেন ভারতীয় চিত্রতারকা মনীষা কৈরালা।

জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) শুভেচ্ছা দূত হিসেবে ‘সুন্দরবনকে ভোট দিন’ প্রচারাভিযানে বাংলাদেশে এসে তিনি ভোট দিলেন সুন্দরবনকে। বিনিময়ে বাংলাদেশের মানুষ করতালি আর হৃদয়ের উষ্ণ শুভেচ্ছায় ভরিয়ে দিল তাঁকে। গতকাল বুধবার শান্ত-মারিয়াম ফাউন্ডেশন রাজধানীর নভো কনভেনশন সেন্টারে সুন্দরবনের জন্য ভোট প্রচার কার্যক্রম অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে সুন্দরবনকে ভোট দেন সাবেক প্রধান বিচারপতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান। এ ছাড়া অন্য অতিথিদের মধ্যে ভোট দেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট প্রমোদ মানকিন, সংগীতশিল্পী মমতাজ বেগম এমপি প্রমুখ। এই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে মনীষার সঙ্গে এসেছিলেন তাঁর মা সুষ্মা কৈরালা ও বাবা প্রকাশ কৈরালা।
অনুষ্ঠানে দর্শক-শ্রোতাদের মধ্যে দারুণ সাড়া লক্ষ করা গেছে। নিজের দেশকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে তাঁরা এ অনুষ্ঠানে অংশ নেন। ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনায় তাঁরা চিৎকার করে বলে ওঠেন, ‘ভোট ফর সুন্দরবন’।
মনীষা কৈরালা বলেন, ‘বাঙালি ও বাংলাদেশ আমার হৃদয়জুড়ে রয়েছে। বঙ্গোপসাগর, ম্যানগ্রোভ বনভূমি সুন্দরবনসহ বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আমাকে মুগ্ধ করেছে। আমি সুন্দরবনকে ভোট দিলাম। আপনারা তো অবশ্যই দেবেন। আমি চাই সুন্দরবন বিশ্বের প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্যের মধ্যে স্থান করে নিক। শান্ত-মারিয়ামের এই ক্যাম্পেইন সার্থক হোক। বাংলাদেশ ও নেপালের বন্ধুত্ব দৃঢ় হোক।’
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান বলেন, ‘পৃথিবীর নানা দেশের উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় বস্তু দেখতে পেয়েছি বলে আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি। এর মধ্যে আমি অনেক বনও দেখেছি, কিন্তু সুন্দরবনের মতো এমন সুন্দর বন আর দেখিনি। আমি তাকে স্নেহময়ী সুন্দরবন বলে ডাকি। ভোট দিয়ে বাঙালি অনেক কিছুই করেছে। তবে শুধু ভোট দিলেই হবে না, সুন্দরবনের শুশ্রৃষা ও দেখভাল করতে হবে। কেননা সে (সুন্দরবন) আমাদের দেখভাল করে। আইলার সময় নিজে ক্ষতবিক্ষত হয়ে সে আমাদের রক্ষা করেছে। সুন্দরবনকে ভোট দেওয়ায় মনীষাকে অনেক ধন্যবাদ। আসুন সবাই সুন্দরবনের জন্য কাজ করি।’
আলোচনা অনুষ্ঠান শেষে ইন্টারনেটে ক্লিক করে প্রথম ভোট দিয়ে এই প্রচার কার্যক্রম উদ্বোধন করেন মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান। এরপর ভোট দেন মনীষা কৈরালা। অতিথিদের মধ্যে এরপর একে একে ভোট দেন অ্যাডভোকেট প্রমোদ মানকিন, সংগীতশিল্পী মমতাজ বেগম, ভাষাসৈনিক আবদুল মতিন, শিল্পী হাশেম খান, তারামন বিবি বীরপ্রতীক, বিটিআরসির সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ মার্গুব মোর্শেদ প্রমুখ।
শান্ত-মারিয়াম ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে অতিথিদের হাতে ফুল, ক্রেস্ট ও রয়েল বেঙ্গল টাইগারের প্রতিকৃতি তুলে দেন এর চেয়ারম্যান ইমামুল কবীর শান্ত এবং ভাইস চেয়ারম্যান তাহমিন কবীর চৌধুরী মারিয়াম।
সুন্দরবনকে নিয়ে মমতাজের গানের মধ্য দিয়ে শেষ হয় অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানের মিডিয়া পার্টনার ছিল বৈশাখী টিভি। তারা অনুষ্ঠানটির ধারণ করা অংশ প্রচার করে রাত সাড়ে ১২টায়।
ইন্টারনেটে সুন্দরবনকে ভোট দেওয়া যাবে www.new7wonders.com এই ওয়েবসাইটে। এ ছাড়া টেলিফোনে ভোট দিতে +৪১৭৭৩১২৪০৪১ নম্বরে ফোন করতে হবে। এরপর একটি বার্তা শোনা যাবে। পরে চাপতে হবে সুন্দরবনের সাংকেতিক নম্বর ৭৭২৪-এ।

প্রচারের অংশ হিসেবে চিত্রকর্ম ও স্থিরচিত্র প্রদর্শনী : ‘সুন্দরবনকে ভোট দিন’ প্রচারাভিযানের অংশ হিসেবে আয়োজন করা হয়েছে চিত্রকর্ম ও স্থিরচিত্র প্রদর্শনীর।
সকালে প্রধান অতিথি হিসেবে মনীষা কৈরালা হাজির হয়েছিলেন উত্তরায় শান্ত-মারিয়াম ফাউন্ডেশনের চিত্রকর্ম ও স্থিরচিত্র প্রদর্শনী উদ্বোধন করতে। সে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন নেপালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত অধ্যাপক নিমচন্দ্র ভৌমিক। শুভেচ্ছা বক্তব্য শেষে তিনি ফিতা কেটে প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন। তার পর নেপালের শিল্পী গনেশ চিত্রকর, কিরণ চিত্রকর ও দীর্গা চিত্রকরের তোলা ছবি এবং জাপান প্রবাসী মোস্তাফিজুল হকের চিত্রকর্ম ঘুরে দেখেন। সবার জন্য প্রদর্শনীটি খোলা থাকবে সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত। ২৫ জানুয়ারি প্রদর্শনীর শেষ দিন।

বান্দরবানের বুদ্ধধাতু জাদি মন্দির স্থাপত্যকলার অপূর্ব নিদর্শন

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি খ্যাত পার্বত্য জেলা বান্দরবানের পর্যটন কেন্দ্রগুলোর মধ্যে অন্যতম স্পট হিসেবে বুদ্ধ ধাতু জাদি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এটি বুদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের উপাসনালয় হিসেবে গড়ে তোলা হলেও এখন এটি স্থাপত্যকলার অপূর্ব নিদর্শন হিসেবে সকলের কাছে পরিচিতি লাভ করেছে।

বৌদ্ধ ধর্মীয় গুরু (ভান্তে) উচহ্লা ভান্তে কতর্ৃক প্রতিষ্ঠিত এই বুদ্ধ ধাতু জাদি এখন লোকজনের মুখে মুখে স্বর্ণ জাদি বা স্বর্ণ মন্দির হিসেবে সমধিক পরিচিতি পেয়েছে। জাদিটির মূল অংশ অর্থাৎ যেখানে বুদ্ধ ধর্মাবলম্বী ও উচহ্লা ভান্তের অনুসারীরা উপাসনা করে, সেখানে বুদ্ধ মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে সেই মূল অংশটি স্বর্ণাবরণে তৈরি বলে এটি স্বর্ণ জাদি বা স্বর্ণ মন্দির হিসেবে বেশি পরিচিত।

এ জাদি বান্দরবান শহর থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে বান্দরবান-চন্দ্রঘোনা সড়কের বালাঘাটা পুলপাড়ায় অবস্থিত। এই জাদিটি এখন বৌদ্ধ সমপ্রদায়ের তীর্থস্থানই কেবল নয়, এটি দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য অন্যতম আকর্ষণীয় স্পটে পরিণত হয়েছে। অপূর্ব নির্মাণ শৈলী ও নানা কারুকার্য খচিত এ জাদি দেখে মনে হবে যেন আপনি অন্য দেশে অবস্থান করছেন।

শহরের বালাঘাটা পেরিয়ে অল্প কিছুদূর গিয়ে সদর উপজেলার কুহালং ইউনিয়নের পুলপাড়ায় প্রায় ৪০০ ফুট উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় চোখে পড়বে সোনালী কারুকার্যখচিত এই জাদি। এ বুদ্ধ ধাতু জাদি যেন এক মনোরম দর্শনীয় স্থান। পার্বত্য বান্দরবানে গড়ে ওঠা এ জাদি শুধু বাংলাদেশে নয় বিদেশেও সুনাম অর্জন করেছে।

বুদ্ধ ধাতু জাদিটি নানা কারণে অত্যন্ত সুনাম ও পরিচিতি পেয়েছে। ইতিমধ্যে এ জাদি পরিদর্শন করে গেছেন মিয়ানমারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খিন নিউন্ত ও মন্ত্রী পরিষদবর্গ, ভারতের হাই কমিশনারসহ বিপুল সংখ্যক দেশি-বিদেশি পর্যটক। এর নির্মাণশৈলী দেখে অভিভূত হয়েছেন তারা। মিয়ানমারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এই স্বর্ণ জাদির জন্য ৪০ হাজার মার্কিন ডলার অনুদান দিয়েছিলেন।

বান্দরবানের উলেস্নখযোগ্য কয়েকটি দর্শনীয় স্থানের মধ্যে বুদ্ধ ধাতু জাদি অন্যতম। মিয়ানমার ও চীনের বৌদ্ধ তীর্থস্থান বা প্যাগোডার আদলে ২০০০ সালে প্রায় ৪শ' ফুট উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় বিহারাধ্যক্ষ উপঞা জোতথেরো (প্রকাশ উচহ্লা ভান্তে) এই বৌদ্ধ বিহারটি নির্মাণে প্রধান ভূমিকা পালন করেন। জানা গেছে, মিয়ানমারের শোয়েডাগং প্যাগোডা, সুলে প্যাগোডা, শোয়েডং নিয়াত প্যাগোডাসহ ৫টি প্যাগোডার অনুকরণে বান্দরবানে বুদ্ধ জাদিটি নির্মাণ করা হয়েছে। এটি নির্মাণের পর থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ধর্মপ্রাণ বুদ্ধ নর-নারী পুণ্য লাভের আশায় প্রতি বছর বুদ্ধ ধাতু জাদি পরিদর্শন ও উপাসনা করতে আসেন। শুধু বাংলাদেশ নয় প্রতিবেশী মিয়ানমার, থাইল্যান্ডসহ বৌদ্ধ প্রধান রাষ্ট্রগুলোতেও এর সুনাম ছড়িয়ে পড়ায় সেসব দেশের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরাও এই বুদ্ধ ধাতু জাদি পরিদর্শন করতে আগমন করেন। প্রতিবছর সেপ্টেম্বর মাসে এ জাদি প্রাঙ্গণে বসে ৩ দিনব্যাপী ধমর্ীয় মেলা। এতে অংশ নেয় হাজার হাজার পুণ্যাথর্ী ও দেশ- বিদেশের পর্যটক।

মিয়ানমারের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এই ধাতু জাদিটি দেখতেই বান্দরবানে আগমন করেছিলেন। মিয়ানমারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খিন নিউন্ত মিয়ানমারের সেক্রেটারী-১ থাকাকালীন বান্দরবান বুদ্ধ ধাতু জাদিটির জন্য ব্যক্তিগতভাবে ৫ লাখ কিয়েট অনুদান প্রদান করেন। বিহারটিতে ভিক্ষু শ্রমন মিলে মোট ২০ জন অনাথ রয়েছে। মিয়ানমারের প্রধানমন্ত্রী খিন নিউন্ত জাদির উন্নয়নে যে ৪০ হাজার মার্কিন ডলার অনুদান দিয়েছিলেন তা দিয়ে নির্মিত হয়েছে লাইব্রেরী, মিউজিয়াম ও অন্যান্য স্থাপনা। এছাড়া ধর্মপ্রাণ বৌদ্ধ নর-নারী ও উচহ্লা ভান্তের অনুসারীরাও ব্যক্তিগতভাবে এই জাদির উন্নয়নে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করছে।

বুদ্ধ জাদিটির মূল অংশে আরোহণ করতে কিছুটা বেগ পেতেই হয়। দীর্ঘ পাহাড়ি পথ ও ১৭০ ধাপ সিঁড়ি বেয়ে যেতে হয় সেখানে। তবে কষ্ট স্বীকার করে উঠতে পারলেই জাদির চারিদিকের আকর্ষণীয় দৃশ্য পাহাড়ে ওঠার ক্লান্তি মস্নান করে দেবে। এর মূল প্রবেশপথ দিয়ে ঢুকেই প্রথমে চোখে পড়বে বৌদ্ধ মিউজিয়াম। মিউজিয়ামে থরে থরে সাজানো রয়েছে গৌতম বুদ্ধের সময়ের বিভিন্ন ঘটনাপঞ্জির বাহারি মূর্তি। এসব মূর্তির নির্মাণ কাজে রয়েছে অভিজ্ঞতার ছাপ। মিয়ানমারের বিখ্যাত সব কারিগরদের নিপূণ হাতের ছোঁয়া রয়েছে প্রতিটি কাজে। মিউজিয়াম পেরুলেই জাদির মূল অংশ, যেখানে ধর্মপ্রাণ নারী-পুরুষ প্রার্থনা করে। জাদির শীর্ষে আরোহণ করলে চোখে পড়বে শহরের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য। এর চূড়ায় বাতাসের দোলায় টুংটাং করে বাজতে থাকা ঘন্টার ধ্বনি যে কাউকেই অন্যরকম আবেশে মোহিত করে। এ চূড়া থেকেই চোখে পড়বে জাদির পাশেই গড়ে উঠা দেবনাগ রাজ পুকুর (দেবতা পুকুর)সহ জাদির অন্যান্য স্থাপত্য কলা। এই দেবতা পুকুরটি সাড়ে ৩শ' ফুট উঁচুতে হলেও সব মওসুমেই সেখানে পানি থাকে। বৌদ্ধ ভান্তেদের মতে এটা দেবতার পুকুর, তাই এখানে সব সময় পানি থাকে।
 
Support : Dhumketo ধূমকেতু | NewsCtg.Com | KUTUBDIA @ কুতুবদিয়া | eBlog
Copyright © 2013. News 2 Blog 24 - All Rights Reserved
Template Created by Nejam Kutubi Published by Darianagar Publications
Proudly powered by Dhumketo ধূমকেতু