নানা কৌশলে সীমান্তে হত্যা-নির্যাতন চলছেই by মেহেদী হাসান

Saturday, September 24, 2011

ভারতের পক্ষ থেকে বারবার আশ্বাস দেওয়া সত্ত্বেও সীমান্তে নিরস্ত্র বাংলাদেশি হত্যা বন্ধ হয়নি, বরং সাম্প্রতিক সময়ে সিলেট সীমান্তে বাংলাদেশিদের ওপর ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) পাশাপাশি সে দেশের খাসিয়া জনগোষ্ঠীর লোকজনও গুলি ছুড়ছে। সীমান্তে ভারতের নির্মিত কাঁটাতারের বেড়া বিদ্যুতায়িত করে রাখার কারণে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে এবং বিএসএফের ছোড়া পাথরের আঘাতে বাংলাদেশি নাগরিক হতাহত হচ্ছে। আটকের পর নিতম্বে ইনজেকশনের মাধ্যমে পেট্রল-জাতীয় তরল পদার্থ পুশ করে নতুন কায়দায় নির্যাতনের ঘটনাও ঘটছে।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সীমান্ত সম্মেলনে সীমান্তে নিরস্ত্র বাংলাদেশি হত্যা ও নির্যাতনের এ বিষয়গুলো উঠবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। আজ রবিবার ঢাকায় শুরু হচ্ছে বিজিবি ও বিএসএফের মহাপরিচালক পর্যায়ের এ সম্মেলন। চলবে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। ছয় দিনের সম্মেলন হচ্ছে পিলখানায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদর দপ্তরে। এর আগে গত মার্চ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে নয়াদিলি্লতে পাঁচ দিনব্যাপী সীমান্ত সম্মেলন হয়। রীতি অনুযায়ী এবারের সম্মেলন হচ্ছে ঢাকায়।
গতকাল বিজিবির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, এবারের সীমান্ত সম্মেলনে বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোসহ আরো কিছু দ্বিপক্ষীয় ইস্যু নিয়ে আলোচনা হবে।
সম্মেলনে যোগ দিতে বিএসএফ মহাপরিচালক রমন শ্রীবাস্তবের নেতৃত্বে ২১ সদস্যের ভারতীয় প্রতিনিধিদল আজ রবিবার ঢাকায় এসে পেঁৗছবেন। সম্মেলনে বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আনোয়ার হোসেন ২৩ সদস্যের বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন।
সীমান্তে হত্যা-নির্যাতন : বাংলাদেশের বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের হিসাব অনুযায়ী, ২০০০ সাল থেকে গত আগস্ট মাস পর্যন্ত বিভিন্ন সীমান্তে মোট ৯৯৮ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছে। এর মধ্যে বিএসএফের হাতে ৯২৩ এবং ভারতীয় বেসামরিক নাগরিকদের হাতে ৭৫ জন। একই সময়ে বিএসএফের হাতে ৬৬১ এবং ভারতীয় বেসামরিক নাগরিকদের হাতে ৩৩৫ জন বাংলাদেশি আহত হয়। প্রায় ১১ বছরে সীমান্তে ৯৫৭ জন অপহৃত এবং ১০৭ জন বাংলাদেশি নিখোঁজ হয়। ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১৪ জন বাংলাদেশি।
যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ গত বছর এক প্রতিবেদনে সীমান্তে ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের পরও বিএসএফ জওয়ানরা পার পেয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছে।
জানা গেছে, সিলেটের গোয়াইন ঘাট উপজেলার পান্তুমাই গ্রামের আবদুল মজিদের ছেলে তেরা মিয়া (১৮) গত ১১ সেপ্টেম্বর পাদুয়া সীমান্তে বাংলাদেশি ভূমিতে গরু চরানোর সময় গুলিবিদ্ধ হন। সীমান্তের ওপর থেকে আসা ওই গুলি বিএসএফ ছোড়েনি। তাদের উপস্থিতিতে ভারতীয় খাসিয়ারা গুলি করে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় বিজিবির পক্ষ থেকে বিএসএফের কাছে প্রতিবাদলিপি পাঠানো হয়। এর আগে ১২ আগস্ট ওই সীমান্তের বিছনাকান্দি এলাকায় কামাল উদ্দিন জহুর (৩২) ও কামাল আহমদ (৩০) নামের দুই বাংলাদেশি পাথর কোয়ারিতে কাজের সময় ভারতীয় খাসিয়াদের গুলিতে নিহত হন।
অধিকারের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্টে বিএসএফ একজন বাংলাদেশিকে পাথর ছুঁড়ে হত্যা করেছে। বিএসএফের গুলিতে আহত হয় আরো একজন। এর আগে ২২ জুলাই চুয়াডাঙ্গা জেলার দামুড়হুদা থানার ঠাকুরপুর গ্রামের লিয়াকত হোসেনের ছেলে মো. সেলিম উদ্দীন (২২) ভারতের রাঙ্গিয়ারপোতা থেকে ৯০ নম্বর সীমান্ত পিলারের পাশ দিয়ে দেশে ফেরার পথে বাঁশের বিদ্যুতায়িত বেড়ায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান। চোরাচালান রোধের অজুহাতে বিএসএফ রাত ৮টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত সীমান্তের এ বেড়ায় ১১ হাজার ভোল্টের বৈদ্যুতিকসংযোগ দিয়ে বিদ্যুতায়িত করে রাখে বলে অভিযোগ রয়েছে। সীমান্তে যেখানে কাঁটাতারের বেড়া এখনো নির্মিত হয়নি, সেখানে বাঁশ দিয়ে বেড়া দিয়েছে ভারত।
মে মাসের প্রতিবেদনে অধিকার বলেছে, গত ৭ মে দিনাজপুর জেলার সুন্দরা সীমান্ত এলাকায় ফয়জুর রহমানের ছেলে হাফিজুর রহমান (৩০) বিএসএফের গুলিতে নিহত হন। এর আগের দিন কুড়িগ্রামের রাজিবপুর সীমান্তে রউফ মিয়া নামের এক বাংলাদেশি কৃষককে বিএসএফ অপহরণ করে নিয়ে যায়।
গোয়াইনঘাট উপজেলার ভিতরগুল গ্রামের আবদুল মালেকের ছেলে রুবেলকে (১৬) গত এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে সিলেটের গোয়াইনঘাট সীমান্তে অপহরণের পর গুলি করে হত্যা করে ভারতীয় খাসিয়ারা। নিহতের পরিবার ও স্বজনরা জানিয়েছে, এই কিশোর তার দুই বন্ধুসহ সীমান্তের কাছাকাছি বাংলাদেশের ভূখণ্ডেই পায়চারি করছিল। গত ১৮ এপ্রিল সাতক্ষীরা জেলার গাজীপুর সীমান্তে মনসুর আলীর ছেলে রেকাতুল ইসলাম (১৭) বিএসএফের গুলিতে মারা যায়।
বারবার আশ্বাস : গত ৭ জানুয়ারি কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার অনন্তপুর সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার সময় বিএসএফের গুলিতে কিশোরী ফেলানি নিহত হওয়ার কয়েক দিন পরই ঢাকায় বাংলাদেশ ও ভারতের স্বরাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের বৈঠক হয়। বৈঠকে ভারতীয় স্বরাষ্ট্রসচিব গোপাল কৃষ্ণ পিল্লাই সীমান্তে হত্যা বন্ধের আশ্বাস দেন। এর আগেও প্রধানমন্ত্রীসহ বিভিন্ন পর্যায়ে আশ্বাস দিলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি জানিয়ে সাংবাদিকরা এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে ভারতের স্বরাষ্ট্রসচিব বলেছিলেন, 'ভারত আবারও সীমান্তে হত্যার সংখ্যা শূন্যে নামিয়ে আনার আশ্বাস দিচ্ছে এবং এটি নিশ্চিত করতে বিএসএফ সদস্যের সঙ্গে কাজ করছে।'
ভারতীয় স্বরাষ্ট্রসচিবের নতুন করে আশ্বাসের পরও সীমান্তে হত্যা দৃশ্যত থামেনি। ওই মাসে মোট চারজন বাংলাদেশি বিএসএফের গুলি ও নির্যাতনে নিহত হয়। পরের মাসে বিএসএফের নির্যাতনে এক বাংলাদেশি নিহতসহ ছয়জন আহত হয়। মার্চ মাসে দুজন বাংলাদেশি সীমান্তে নিহত হয়েছে ভারতীয় বেসামরিক নাগরিকের গুলিতে। একই মাসে বিএসএফের গুলিতে আহত হয় ২১ জন। এপ্রিল মাসে বিএসএফের গুলিতে পাঁচ ও ভারতীয় বেসামরিক ব্যক্তিদের গুলিতে একজন বাংলাদেশি প্রাণ হারায়। ওই মাসেই বিএসফের গুলি ও নির্যাতনে আহত হয় ১২ বাংলাদেশি। অন্যদিকে, ভারতীয় বেসামরিক ব্যক্তিদের গুলিতে আহত হয় আরো দুজন। মে মাসে বিএসএফের গুলি ও নির্যাতনে চারজন এবং ভারতীয় বেসামরিক ব্যক্তিদের নির্যাতনে একজন বাংলাদেশির মৃত্যু হয়। জুনে বিএসএফের গুলিতে দুজন এবং নির্যাতনে একজন নিহত হয়। জুলাই মাসে বিএসএফের গুলিতে একজন এবং নির্যাতনে দুজন মারা যায়। আগস্ট মাসে মারা যায় বিএসএফের হাতে একজন। এ সময় ভারতীয় বেসামরিক নাগরিকদের গুলিতে নিহত হয় আরো দুজন।
আশ্বাস সত্ত্বেও সীমান্তে হত্যা-নির্যাতন চলার বিষয়ে গত ৭ জুন ঢাকায় সাংবাদিকরা জানতে চাইলে সফররত ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিব (বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের রাষ্ট্রদূত) নিরুপমা রাও বলেছিলেন, 'আমরা সব ধরনের সহিংসতার বিরুদ্ধে। অনেক সময় ভারতীয়রা মারা যায়, কখনো কখনো বাংলাদেশিরা। কারো মৃত্যুই আমাদের কাম্য নয়। রাতে সীমান্তে কারফিউ থাকে। চোরকারবারীরা সাধারণত রাতে সীমান্ত অতিক্রম করে। নিরস্ত্র সাধারণ মানুষও করে। আমরা এ হত্যা বন্ধে রূপরেখা নিয়ে কাজ করছি। এর মধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে সীমান্তের কয়েকটি অংশে বিএসএফকে প্রয়োজনে প্রাণঘাতী নয় এমন অস্ত্র ব্যবহার করতে বলা হয়েছে।'
এরপর ৭ জুলাই ঢাকা সফরের সময় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস এম কৃষ্ণা সাংবাদিকদের বলেন, 'সীমান্তে এখনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চলছে। অপরাধ ঠেকানোর সর্বশেষ উপায় হলো হত্যা। হতাহতের শিকার হওয়া ৪০ শতাংশ ভারতীয় নাগরিক। বাংলাদেশের মতো বন্ধুপ্রতীম রাষ্ট্রের নাগরিকদের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে সতর্ক হওয়ার জন্য বিএসএফকে বলা হয়েছে। সীমান্ত একটি স্পর্শকাতর ইস্যু।'
গত ৩০ জুলাই ঢাকায় সফরকালে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদাম্বরম বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি নিহত হওয়াবিষয়ক এক প্রশ্নের উত্তরে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, সীমান্ত পাড়ি দেওয়া ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে যাতে কোনো অবস্থাতেই গুলি ছোঁড়া না হয়, সেজন্য বিএসএফ জওয়ানদের কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ওই নির্দেশনা দেওয়ার পর এ বছর সীমান্তে নিহতের সংখ্যা সাতে নেমে এসেছে। বিএসএফ জওয়ানরা হামলার শিকার হয়ে আত্মরক্ষার্থে গুলি ছুঁড়তে বাধ্য হয়েছে বলে তিনি জানান।
হত্যা বন্ধে ভারতীয় কৌশল : নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কূটনীতিক কালের কণ্ঠকে বলেছেন, সীমান্তে হত্যা বন্ধে কয়েক মাস আগে বিএসএফ পরীক্ষামূলকভাবে প্রাণঘাতী নয় এমন অস্ত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর দৃশ্যত ওই বাহিনীর গুলিতে হতাহতের ঘটনা কমেছে। কিন্তু বিএসএফের উপস্থিতিতে সীমান্তে বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে ভারতীয় বেসামরিক নাগরিকদের অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগের। কার স্বার্থে কে ওই অস্ত্রের জোগান দেয়, তার অনুসন্ধান করা উচিত।
ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদাম্বরম কেবল আত্মক্ষার্থেই বিএসএফ গুলি চালায় বলে যে মন্তব্য করেছিলেন, তা খুব একটা ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন না ওই কূটনীতিক। তিনি বলেন, প্রতিটি হতাহতের ঘটনাতেই বিএসএফ আত্মরক্ষার্থে গুলি করেছে বলে দাবি করে থাকে। অথচ হতাহতদের নিরস্ত্র অবস্থায় পাওয়া যায়।
বিজিবির সাবেক এক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, মারণাস্ত্রের বিকল্প ব্যবহারের কথা শুনে তিনি খুব একটা আশাবাদী ছিলেন না। সবাই গুলি বন্ধের দাবি করে। কিন্তু গুলি ছাড়াও শারীরিক নির্যাতনের মাধ্যমে হতাহতের অনেক ঘটনা ঘটে। এগুলোও বন্ধ হওয়া উচিত।
গত ২২ জুন বিএসএফের ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল (ডিআইজি) পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা বিবিসিকে মারণাস্ত্রের বিকল্প ব্যবহার শুরুর কথা নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, বিএসএফ জওয়ানদের হাতে পাম্প অ্যাকশন গান বা ছড়রা বন্দুক তুলে দেওয়া হয়েছে, যা সাধারণত ছোট আকারের পাখি মারার কাজে ব্যবহার করা হয়।
বিএসএফের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্ত এলাকায় বাংলাদেশিদের নিতম্বে ইনজেকশনের মাধ্যমে পেট্রল পুশ করার অভিযোগও উঠেছে। জানা গেছে, যশোর জেলার শার্শা উপজেলার সীমান্তবর্তী ধান্যখোলা গ্রামের আবদুস সামাদের ছেলে শরিফুল ইসলাম (২৬), মিজানুর রহমানের ছেলে শাহিন (২৫) ও ময়েনুদ্দিনের ছেলে মুলফিক্কারকে (২৫) বিএসএফ গত ১৬ জুন রাতে হকিস্টিক ও লাঠি দিয়ে পিটিয়ে নিতম্বে দুই সিরিঞ্জ করে পেট্রল পুশ করে।
ঢাকায় আজ থেকে সীমান্ত সম্মেলন
গত ৩০ জুলাই বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা স্বাক্ষর হয়। এ ছাড়া গত ৬ ও ৭ সেপ্টেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং ঢাকা সফরের সময় '৭৪-এর স্থল সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য একটি প্রটোকল স্বাক্ষর হয়। এবারের সীমান্ত সম্মেলন ওইসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বিশেষ ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বিজিবির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সম্মেলনের আলোচ্যসূচিতে রয়েছে সীমান্ত এলাকায় নিরস্ত্র বাংলাদেশিদের গুলি করে হত্যা ও আহত করা, অবৈধভাবে আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম বা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ, বাংলাদেশিদের আটক ও ধরে নিয়ে যাওয়া, বাংলাদেশি নাগরিক অপহরণ ইত্যাদি।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরো জানানো হয়, ভারতীয় প্রতিনিধিদলে থাকবেন বিএসএফ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ফ্রন্টিয়ার ইন্সপেক্টর জেনারেল (আইজি), ভারত সরকারের স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। সম্মেলন উপলক্ষে বিশেষ অতিথি হিসেবে বিএসএফ মহাপরিচালকের স্ত্রীও বাংলাদেশ সফর করবেন।
বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলে বিজিবির উপমহাপরিচালক, পরিচালক (অপারেশন ও প্রশিক্ষণ), সংশ্লিষ্ট সেক্টর কমান্ডার, বিজিবি সদর দপ্তরের স্টাফ অফিসার ছাড়াও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর এবং যৌথ নদী কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অংশ নেবেন।
আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর জয়েন্ট রেকর্ড অব ডিসকাশন্স (জেআরডি) স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে সম্মেলন শেষ হবে বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।

ফেলানী হত্যার ঘটনায় ভারতের দুঃখ প্রকাশ

Thursday, January 20, 2011

কুড়িগ্রাম সীমান্তে বাংলাদেশি কিশোরী ফেলানী হত্যার ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছে ভারত। একই সঙ্গে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে সীমান্তে গুলি না চালানোর আশ্বাস দিয়েছে দেশটি। গতকাল বুধবার বিকেলে ঢাকায় শেরাটন হোটেলে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-ভারত স্বরাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের বৈঠকে ভারতীয় পক্ষ এ আশ্বাস দেয়।
জানা গেছে, আজ বৃহস্পতিবার সকালে যৌথ সংবাদ সম্মেলনেও ভারতের পক্ষ থেকে সীমান্তে গুলি না চালানোর আশ্বাস দেওয়া হতে পারে। এদিকে বৈঠকে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক দুই আসামি ক্যাপ্টেন (অব.) মাজেদ ও রিসালদার মোসলেম উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তরের জন্য ভারতের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ। বৈঠক সূত্র জানায়, বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ওই দুই খুনি বর্তমানে ভারতে আছে বলে বাংলাদেশ সরকারের কাছে তথ্য রয়েছে। এর ভিত্তিতেই বাংলাদেশ ভারতের কাছে ওই খুনিদের গ্রেপ্তার করে হস্তান্তরের অনুরোধ জানায়। তাদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারি আছে বলে উল্লেখ করেছে বাংলাদেশ। তবে ভারত এ ব্যাপারে আরো তথ্য চেয়েছে বলে জানা গেছে।
উল্লেখ্য, গত ১২ ফেব্র“য়ারি ঢাকায় আইন মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠক শেষে আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার সফিক আহমেদ বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ছয় আসামিকে এ বছরের মধ্যেই ফিরিয়ে আনার
ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। ক্যাপ্টেন (অব.) মাজেদ ও রিসালদার মোসলেম উদ্দিন ছাড়া পলাতক ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত অন্য আসামিরা হলেন লে. কর্নেল (বরখাস্ত) নূর চৌধুরী, মেজর (বরখাস্ত) শরিফুল হক ডালিম, লে. কর্নেল (বরখাস্ত) খন্দকার আবদুর রশিদ ও লে কর্নেল (অব.) এ এম রাশেদ চৌধুরী।
এদিকে ভারতীয় পক্ষ বাংলাদেশের কারাগারে আটক অনুপ চেটিয়াকে ফেরত চেয়েছে। গতকালের বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন স্বরাষ্ট্রসচিব আবদুস সোবহান সিকদার। তিনি কালের কণ্ঠকে জানান, সীমান্ত সমস্যার সমাধানে পৌঁছানো যাবে বলে তিনি আশা করছেন। এ বৈঠকের ধারাবাহিকতায় আগামী দেড় মাসের মধ্যে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকায় আসবেন।
বাংলাদেশ-ভারত স্বরাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের বৈঠকের আগে গতকাল দুপুরে দুই দেশের যুগ্ম সচিবদের নেতৃত্বে যৌথ ওয়ার্কিং গ্র“পের বৈঠক শেষ হয়। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে স্বরাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের বৈঠকে আলোচ্যসূচি হিসেবে নির্ধারিত সুপারিশমালায় সই করেন বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (রাজনৈতিক) ড. কামাল উদ্দিন আহমেদ এবং ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (উত্তর-পূর্ব) শম্ভু সিং। স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা নিয়ে অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে বলে দাবি করেন দুই দেশের প্রতিনিধিদলের প্রধানরা।
ফেলানী হত্যার জন্য ভারত দুঃখ প্রকাশ করেছে কি না জানতে চাইলে যুগ্ম সচিব সুস্পষ্টভাবে কিছু বলেননি। অন্যদিকে ভারতের যুগ্ম সচিব শম্ভু সিং বলেন, ‘আমি দুঃখিত। কারণ আমি এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য যথার্থ ব্যক্তি নই।’ তবে অনুষ্ঠান শেষে দেওয়া যৌথ সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বিএসএফের হাতে নিহত নির্দোষ বাংলাদেশি নাগরিকদের মৃত্যুর বিষয়ে আলোচনার সময় বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শন এবং অবশ্যই হত্যা বন্ধের অনুরোধ জানিয়েছে। অন্যদিকে ভারতের প্রতিনিধিদল সম্প্রতি কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী সীমান্তের কাছে বাংলাদেশি কিশোরী (ফেলানী) হত্যার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছে এবং সমবেদনা জানিয়েছে। সেই সঙ্গে সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার জন্য বৈধ পথগুলো ব্যবহার করতে এবং বিশেষ করে রাতে সীমান্তে চলাচলে নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে জনগণকে অবহিত করতে অনুরোধ জানিয়েছে।
গতকাল বিকেলে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রসচিব আবদুস সোবহান সিকদার সাংবাদিকদের বলেন, ফেলানী হত্যার জন্য ভারত দুঃখ প্রকাশ করে গুলি না চালানোর আশ্বাস দিয়েছে। ১৯৭৪ সালের সীমান্ত চুক্তির আওতায় অপদখলীয় ভূমি, ছিটমহল বিনিময়ের মতো বিষয়ে এ বৈঠক থেকেই সিদ্ধান্তে পৌঁছা যাবে বলে তিনি আশাবাদী। আগামী এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ সফরে আসবেন বলে আশা প্রকাশ করে স্বরাষ্ট্রসচিব বলেন, তখন সব সমস্যার সমাধান চূড়ান্ত হবে।
বৈঠক সূত্র জানায়, গত মঙ্গলবার যুগ্ম সচিবদের নেতৃত্বে বৈঠকের সময়ই ফেলানী হত্যার ঘটনায় বিব্রত বোধ করেছিল ভারতীয় প্রতিনিধিদল। গতকাল সচিব পর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ফেলানী হত্যার বিষয়ে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত ছবি ও খবর ভারতীয় প্রতিনিধিদলের সামনে তুলে ধরা হয়। এ সময় ভারতীয় পক্ষ এ ব্যাপারে বিব্রত বোধ করে দুঃখ প্রকাশ করে বলে, এমন হত্যা তারা সমর্থন করে না।
বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা ভারতের স্বরাষ্ট্রসচিব জি কে পিল্লাইয়ের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদলকে ফেলানী হত্যার ছবি দেখানোর সময় দুইবার বলেছেন, ‘বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হওয়ার সময় তাঁরা ফেলানী হত্যার কারণ জানতে চাইবেন। আপনারা উত্তর নিয়ে আসবেন।’
সূত্র জানায়, আজ ভারতীয় পক্ষ সাংবাদিকদের সামনে সীমান্তে গুলি বন্ধের আশ্বাস দেওয়ার পাশাপাশি ফেলানীকে হত্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিএসএফ সদস্যের বিরুদ্ধে নেওয়া ব্যবস্থার কথা জানাতে পারে। গতকালের বৈঠকে তারা ফেলানীর ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে এসেছিল।
এদিকে মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ, নারী ও শিশু পাচার, বন্দি প্রত্যর্পণ, নিরস্ত্র বাংলাদেশিদের হত্যা, সীমান্তে বেড়া, অভিবাসন ইস্যু বিশেষ করে ভিসাব্যবস্থা সহজীকরণ বিষয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে। ভারতের মূল দাবি ছিল, বাংলাদেশ থেকে কথিত ভারতীয় জাল মুদ্রা তৈরির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। অন্যদিকে বাংলাদেশের দাবি ছিল, সীমান্তে সব ধরনের হত্যা বন্ধ করা।
বৈঠকে উপস্থিত একাধিক সূত্র বলেছে, ভারত অনুপ চেটিয়াকে ফেরত চায়। তবে বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে সুবিধাজনক অবস্থায় আছে।
জানা গেছে, ভারতের কারাগারে মোট ৫২৬ জন বাংলাদেশি আটক আছে। তাদের পরিচয় নিশ্চিত করে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।
জানা গেছে, ভারতের স্বরাষ্ট্রসচিব আজ সকালে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুনের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। এরপর শেরাটন হোটেলে দুই দেশের প্রতিনিধিদল আবার বৈঠকে বসবে।

সীমান্তে হত্যা বন্ধের উপায় খুঁজতে রাজি ভারত

Tuesday, January 18, 2011

বাংলাদেশ-ভারত যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকের প্রথম দিন সীমান্তে হত্যা বন্ধ করতে বিকল্প উপায় খুঁজতে ভারত রাজি হয়েছে বলে জানা গেছে। গতকাল মঙ্গলবার বৈঠকে দুই পক্ষই সীমান্তে হত্যাকাণ্ডকে নিজেদের জন্য ‘বিব্রতকর’ বলে আখ্যায়িত করেছে। আজ বুধবার যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠক শেষে এ বিষয়ে যৌথ ঘোষণা দেওয়ার পর দুই দেশের স্বরাষ্ট্রসচিবদের নেতৃত্বে বৈঠক শুরু হবে বলে জানা গেছে।

সূত্র জানায়, গতকাল বৈঠকের শুরুতেই নিরপরাধ ও নিরস্ত্র বাংলাদেশি নিহত হওয়ার ঘটনা সরকারের জন্য বিব্রতকর বলে উল্লেখ করে বাংলাদেশ তা বন্ধের দাবিতে জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করে। ভারতীয় কর্তৃপক্ষও বাংলাদেশের আবেগ ও যুক্তি বুঝতে পেরে সীমান্তে গুলি করে হত্যা না করে বিকল্প অনুসন্ধানে সম্মত হয়। আর এ বিষয়গুলো ‘যৌথ আলোচনার দলিলে’ (জয়েন্ট রেকর্ডস অব ডিসকাশনস) তুলতেও রাজি হয়েছে ভারতীয় পক্ষ।
ঢাকায় শেরাটন হোটেলে গতকালের বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে নেতৃত্ব দেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (রাজনৈতিক) ড. কামাল উদ্দিন আহমেদ। ভারতের পক্ষে নেতৃত্ব দেন সে দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (উত্তর-পূর্ব) শম্ভু সিং।
সূত্র জানায়, যুগ্ম সচিব পর্যায়ের এ বৈঠক থেকে পাওয়া ‘জয়েন্ট রেকর্ডস অব ডিসকাশনস’ অনুযায়ী আজ বিকেল ৩টায় একই স্থানে আবার বৈঠক হবে। তাতে সচিব পর্যায়ের বৈঠকের আলোচ্যসূচি নির্ধারিত হবে। সচিব পর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে নেতৃত্ব দেবেন স্বরাষ্ট্রসচিব আবদুস সোবহান শিকদার। ভারতের পক্ষে নেতৃত্ব দেবেন সে দেশের স্বরাষ্ট্রসচিব জি কে পিল্লাই।
গতকাল বৈঠক শেষে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতা যুগ্ম সচিব (রাজনৈতিক) কামাল উদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, সীমান্ত, নিরাপত্তা ও পারস্পরিক সহযোগিতা নিয়েই মূলত কথা হয়েছে। বৈঠকে সীমান্তে বাংলাদেশিদের গুলি করে হত্যার ঘটনায়
বাংলাদেশের কঠোর মনোভাবের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
জানা গেছে, কিশোরী ফেলানী হত্যার বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বৈঠকে তুলে ধরা হয়। এছাড়াও নিরস্ত্র ও নিরীহ বাংলাদেশিদের গুলি করে হত্যা করা বন্ধ করতে জোরালো যুক্তি ও দাবি উপস্থাপন করে বাংলাদেশ।
সীমান্তে নিরাপত্তারক্ষীদের হাতে প্রাণঘাতী নয় (নন লিথাল) এমন অস্ত্র দেওয়া যায় কি না, তাও ভেবে দেখতে রাজি হয়েছে ভারত। যুগ্ম সচিব (রাজনৈতিক) কামাল উদ্দিন আহমেদ একে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি বলে আখ্যায়িত করেছেন।
বৈঠক সূত্র জানায়, ‘দণ্ডিত বন্দি বিনিময়, ফৌজদারি অপরাধ বিষয়ে আইনি সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ, সংঘটিত অপরাধ ও অবৈধ মাদক চোরাচালান প্রতিরোধবিষয়ক তিনটি চুক্তির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়েও আলোচনা হয়েছে। জানা গেছে, শুধু অনুপ চেটিয়া নয়, দুই দেশেরই দণ্ডিত বন্দি নাগরিকদের বিনিময় নিয়ে কথা হয়েছে।
বাংলাদেশ আজকের বৈঠকগুলোতেও সীমান্তে হত্যার প্রতিবাদ জানাবে বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন এবং স্বরাষ্ট্রসচিব আবদুস সোবহান শিকদার সাংবাদিকদের জানিয়েছেন।
অধিকার : এদিকে মানবাধিকার সংস্থা অধিকার এক বিবৃতিতে বলেছে, ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) বেপরোয়া হত্যা বন্ধে শুধু প্রতিবাদ নয়, সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা ও বিচার দাবি প্রয়োজন।

সীমান্তে মারণাস্ত্রের ব্যবহার বন্ধ করবে বিএসএফ! by মেহেদী হাসান

Saturday, January 15, 2011

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে মারণাস্ত্রের ব্যবহার বন্ধের সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। কূটনৈতিক সূত্রে এ খবর জানা গেছে। তবে আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, আগামী ফেব্র“য়ারি মাসের মধ্যে ত্রিপুরা সীমান্তে বিএসএফ পরীক্ষামূলক রাবার বুলেটের ব্যবহার শুরু করবে।

ভারতে অনুপ্রবেশ রোধে এ ব্যবস্থা সফল হলে আগামী দিনগুলোতে মারণাস্ত্রর ব্যবহারের বদলে বিকল্প অস্ত্র ব্যবহার করা হবে। উল্লেখ্য, বর্তমানে শুধু কাশ্মীর সীমান্তে নিরাপত্তারক্ষী বাহিনী প্রাণঘাতী নয় (নন-লিথাল) এমন অস্ত্র ব্যবহার করে। এদিকে ঢাকায় স্বরাষ্ট্রসচিব আবদুস সোবহান শিকদার ভারতের এ উদ্যোগের কথা অনানুষ্ঠানিকভাবে জানার কথা স্বীকার করে কালের কণ্ঠকে বলেছেন, সীমান্তে হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। বাংলাদেশ অনেক আগেই ভারতের কাছে এ দাবি জানিয়েছিল। ভারত এ ধরনের উদ্যোগ নিলে বাংলাদেশ অবশ্যই একে সাধুবাদ জানাবে।
গত বছরের জানুয়ারি মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় ঘোষিত ৫১ দফা যৌথ ইশতেহারের ১৮ নম্বর অনুচ্ছেদে সীমান্তে হত্যাকাণ্ড বন্ধে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীই তাঁদের সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এর পরও বিএসএফের গুলি ও নির্যাতনে বাংলাদেশিদের মৃত্যু হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের হিসাবে গত বছর বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে ৭৪ জন বাংলাদেশি নিহত হয়। তাদের মধ্যে ২৪ জনকে নির্যাতন ও ৫০ জনকে গুলি করে হত্যার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া গত বছর ৪৩ বাংলাদেশিকে বিএসএফ অপহরণ করেছে বলে সংগঠনটির বার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন দীর্ঘদিন সীমান্তে বিএসএফের নির্বিচার হত্যাকাণ্ড ও দৃশ্যত দায়মুক্তিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এমনকি বিশ্লেষকরা বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তকে বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা বলে আখ্যায়িত করেছেন।
গত ডিসেম্বর মাসে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ প্রকাশিত ‘ট্রিগার হ্যাপি : অ্যাক্সেসিভ ইউজ অব ফোর্স বাই ইন্ডিয়ান ট্র–পস অ্যাট দ্য বাংলাদেশ বর্ডার’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সীমান্তে বিএসএফ
জওয়ানদের দ্বারা নির্বিচার হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণের অসংখ্য প্রমাণ মিলেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় সংগঠনটির পরিচালক মিনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেছেন, বিএসএফকে বেপরোয়া মনে হয়েছে। সন্দেহভাজন মনে হলেই যে কাউকে গুলি করার নির্দেশ তাদের দেওয়া আছে। সীমান্ত এলাকায় মানুষের মৌলিক অধিকারগুলোর অধিকাংশই অনুপস্থিত। এর আগে গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকায় অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে বৈঠক শেষে বিএসএফের মহাপরিচালক (ডিজি) শ্রী রমন শ্রীবাস্তব সীমান্তে গুলি বন্ধের আশ্বাস না দিয়ে বলেছিলেন, নিরাপত্তার স্বার্থে সীমান্তের ভারতীয় অংশে সান্ধ্য আইন (কারফিউ) চলছে। এই কারফিউ ভেঙে রাতের আঁধারে সীমান্ত পাড়ি দেওয়া ব্যক্তিদের অপরাধী বলেও তিনি আখ্যায়িত করেছিলেন। সম্প্রতি বিএসএফের গুলিতে ফেলানির নির্মম মৃত্যুতে আবারও সীমান্ত পরিস্থিতির ভয়াবহতা উন্মোচিত হয়েছে।
গত শুক্রবার নয়াদিল্লির একটি সূত্র জানায়, ভারতের সেনাবাহিনীতে যখন স্মরণকালের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন চলছে, তখন বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে মারণাস্ত্র ব্যবহার বন্ধের কথা ভাবছে বিএসএফ। ঢাকায় কূটনৈতিক সূত্র কালের কণ্ঠকে জানিয়েছে, পরীক্ষামূলকভাবে বিভিন্ন সীমান্তে প্রাণঘাতী নয় এমন অস্ত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএসএফ। এ প্রচেষ্টা সফল হলে মারণাস্ত্রের ব্যবহার বন্ধ হবে। জানা গেছে, সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে আগামী মাস থেকেই ত্রিপুরা সীমান্তে রাবার বুলেট ব্যবহার করা হবে। এতে অনুপ্রবেশকারীরা আহত হলেও নিহত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে না।
সূত্রে জানা যায়, সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায়ও পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে বিএসএফ। শিগগিরই বিএসএফের ত্রিপুরা ডিভিশন সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারে হেলিকপ্টার পাবে। এই হেলিকপ্টার প্রায় ৮৫৬ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার ও রসদ সরবরাহ কাজে বিএসএফকে সহযোগিতা করবে। এ ছাড়া সীমান্তে বিএসএফ সদস্যদের দায়িত্ব পালনের সুবিধার্থে নাইট ভিশন চশমা ও আগাম সতর্ক ব্যবস্থা চালু হবে।
সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার কাজ আগামী বছরের মার্চ মাসের দিকে শেষ হওয়ার কথা। সন্দেহভাজন সন্ত্রাসীরা বেড়া নেই এমন স্থানগুলো ব্যবহার করছে বলে বিএসএফ মনে করে। তাই সীমান্তরক্ষী বাহিনী ওই স্থানগুলোর দিকে বেশি নজরদারি করবে।
বিএসএফের মারণাস্ত্র ব্যবহার না করার সিদ্ধান্তের ব্যাপারে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রসচিব আবদুস সোবহান শিকদার গতকাল দুপুরে কালের কণ্ঠকে বলেন, তিনিও অনানুষ্ঠানিক বিভিন্ন সূত্রে এ বিষয়ে জেনেছেন। সীমান্তে দায়িত্ব পালনকারী নিরাপত্তা বাহিনী, বিশেষ করে বিএসএফের গুলিতে যাতে কেউ মারা না যায় সে জন্য বাংলাদেশ বেশ আগেই প্রাণঘাতী গুলির বিকল্প ব্যবহারের প্রস্তাব দিয়েছিল। আনুষ্ঠানিকভাবে ভারত এখনো এ বিষয়ে কিছু জানায়নি। ভারত এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিলে বাংলাদেশ অবশ্যই একে স্বাগত জানাবে।
স্বরাষ্ট্রসচিব আরো বলেন, সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে অনেককে প্রাণ দিতে হয়েছে। নিহতদের সবাই চোরাকারবারি নয়।
ফেলানির মর্মান্তিক মৃত্যুর বিষয়ে স্বরাষ্ট্রসচিব বলেছেন, ওই মৃত্যুর ব্যাপারে ভারত এখনো কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি। এ সপ্তাহে ঢাকায় অনুষ্ঠেয় স্বরাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের বৈঠকে বিষয়টি তোলা হবে বলে তিনি জানান।
বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবির (সাবেক বিডিআর) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল রফিকুল ইসলাম গণমাধ্যম সূত্রে সীমান্তে বিএসএফের মারণাস্ত্র ব্যবহার না করার সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করে কালের কণ্ঠকে বলেছেন, ‘গত এক বছরে সীমান্তে সব হত্যাকাণ্ড গুলির কারণে হয়নি। বাংলাদেশিদের ধরে নিয়ে নির্যাতন করেও হত্যা করা হয়েছে। বিএসএফ পাকিস্তান সীমান্তে দায়িত্ব পালন করলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তাদের হত্যার হার অনেক বেশি। বিডিআর-বিএসএফ পর্যায়ের বৈঠকেও আমরা তাদের মারণাস্ত্র ব্যবহার না করার জন্য অনুরোধ করেছিলাম। সার্ক সম্মেলন উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভুটানের থিম্পু সফরকালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে বৈঠকেও এ ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের বৈঠকে সীমান্তে হত্যা বন্ধের আশ্বাস দিয়েও ভারত তা রক্ষা করেনি। তা ছাড়া অনেক স্থানে পিলারগুলো দৃশ্যমান না থাকায় সীমান্ত চিহ্নিত করার ক্ষেত্রেও সমস্যা রয়েছে। এর পরও আমাদের জেলেদের ধরে নিয়ে নির্যাতন করে হত্যার পর বলা হয় আÍরক্ষার্থে বিএসএফ গুলি ছুড়েছে। অসমর্থিত সূত্রে আমি মারণাস্ত্র ব্যবহার না করার কথা জেনেছি। আমি এ ব্যাপারে খুব একটা আশ্বস্ত নই।’
এদিকে মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের সেক্রেটারি আদিলুর রহমান গতকাল কালের কণ্ঠকে জানান, এ মাসেই বিএসএফের গুলিতে চার বাংলাদেশি নিহত হয়েছে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার তার নিজ দেশের জনগণ ও বাংলাদেশের জনগণের বিরুদ্ধে আগ্রাসী নীতি গ্রহণ করেছে। আগে বিএসএফ মারণাস্ত্র ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করুক, এরপর তাঁরা তাঁদের প্রতিক্রিয়া জানাবেন। ফেলানি হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে অধিকার আজ একটি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করবে বলে তিনি জানান।

শাসকের কানে পৌঁছায় না ফেলানীর বাবার বিলাপ! by রাহীদ এজাজ

Sunday, January 9, 2011

‘হামরা গরিব মানুষ, প্যাটের ভোকোত ভারত গেছিলাম, আর কোনো দিন যাবার নই। বাবা গো, তোমরা হামার বেটির লাশ আনি দেও, নিজ হাত মাটি দেমো।’ গত শনিবার এ কথাগুলো বলে বিলাপ করছিলেন নুরুল ইসলাম। মৃত্যুর দুই দিন পর সন্তানের লাশের মতো ভারী বোঝা কাঁধে নেওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার রামখানা ইউনিয়নের বানারভিটা গ্রামের এই হতদরিদ্র দিনমজুর।
নুরুলের বিলাপ শাসনযন্ত্রের কানে পৌঁছায় না। কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকায় ৮ জানুয়ারি প্রকাশিত কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলন্ত মৃতদেহের ছবিও হূদয় স্পর্শ করে না! ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডের তিন দিন পরও সরকার কোনো প্রতিবাদ করে না। কেন? গরিব বলে? আর কী বলেই বা বর্বরোচিত ওই হত্যাকাণ্ডের দায় এড়াবে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী? তারা কি বলবে, ১৫ বছরের ফেলানী দুষ্কৃতকারী, হামলা করেছিল বিএসএফের ওপর?
বছরের পর বছর বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে নির্বিচারে চলছে বিএসএফের হত্যাকাণ্ড। যদিও একতরফা হত্যাগুলোর পক্ষে সাফাই গেয়ে থাকে বিএসএফ। গত ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় বিডিআর-বিএসএফ সীমান্ত সম্মেলন শেষে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর প্রধান রমণ শ্রীবাস্তব বলেছিলেন, সীমান্তে প্রাণহানির যে ঘটনাগুলো ঘটছে তা ‘হত্যা’ বলা ঠিক হবে না। বলা উচিত ‘নিহত’ হচ্ছে। কারণ ‘হত্যা’ ও ‘নিহত’ দুটি শব্দের দ্যোতনা আলাদা। সীমান্তে প্রাণহানির যে ঘটনাগুলো ঘটছে, তার অধিকাংশই রাতের বেলা। ওই সময়ে সীমান্তে অনুপ্রবেশ করে তারা সীমান্ত আইন লঙ্ঘন করছে। ওই সময়ে যারা সীমান্ত পাড়ি দেয়, তাদের নিশ্চয়ই নিরপরাধ বলা যায় না। এ সময় সীমান্ত পেরিয়ে যারা ভারতে যায়, তারা অধিকাংশ সময় বিএসএফ সদস্যদের হামলা করে। আর আত্মরক্ষার জন্য বিএসএফকে গুলি ছুড়তে হয়। ওই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, নিরপরাধ বাংলাদেশি হত্যা বন্ধে ভারত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।
পত্রিকার খবরে জেনেছি, ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির উপকণ্ঠে একটি ইটভাটায় তিন ছেলে ও তিন মেয়েকে নিয়ে কাজ করত নুরুল ইসলামের পরিবার। গত শনিবার কুলাঘাট এলাকার একটি ছেলের সঙ্গে বিয়ে ঠিক হয় ফেলানীর। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে উপার্জিত হাজার ত্রিশেক টাকা আর কিছু গয়না নিয়ে গত বুধবার দিল্লি থেকে দেশের পথ ধরেন বাবা আর মেয়ে। ওই দিন দালালের সহায়তায় বেশ কয়েকবার পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত পাড়ি দিতে ব্যর্থ হন বাবা-মেয়ে। শুক্রবার ভোরে মই দিয়ে কাঁটাতারের বেড়া পেরোন নুরুল। কিন্তু কাঁটাতারে কাপড় আটকে যায় মেয়ে ফেলানীর। ভয়ে চিৎকার করে ওঠে সে। শেষ পৌষের কনকনে শীতের ভোরে কিশোরীর আর্তচিৎকার থামিয়ে দেয় বিএসএফের নির্দয় বুলেট। হত্যার কয়েক ঘণ্টা পরও বিএসএফ লাশটি ঝুলিয়ে রাখে।
প্রশ্ন হচ্ছে, আর কত লাশ পড়লে বন্ধ হবে বিএসএফের হত্যাযজ্ঞ? প্রতিবছর বিভিন্ন পর্যায়ের বৈঠকে হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে বাংলাদেশ উদ্বেগ জানালে ভারত হত্যা বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। অব্যাহতভাবে চলছে এ হত্যাকাণ্ড।
মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিএসএফ ২০১০ সালে ৭৪ জন নিরপরাধ ও নিরস্ত্র বাংলাদেশিকে হত্যা করেছে। ২০০৯, ২০০৮ ও ২০০৭ সালে এ সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৯৬, ৬২ ও ১২০।
প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরও বাংলাদেশি হত্যা বন্ধে ভারতের আন্তরিকতা প্রশ্নবিদ্ধ। আর নিরপরাধ লোকজনের হত্যা রোধে বাংলাদেশ সরকারের পদক্ষেপও যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে ফেলানীর মৃত্যুর ৪৮ ঘণ্টা পরও পররাষ্ট্র কিংবা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে সক্রিয় হতে দেখা যায়নি। এ অবস্থায় আমরা আর কত ফেলানীর স্বপ্ন চুরমার হওয়ার দর্শক হয়ে থাকব?

কিশোরী হত্যার ৩০ ঘণ্টা পর লাশ হস্তান্তরঃ বিএসএফের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ

Saturday, January 8, 2011

ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে বাংলাদেশি কিশোরী ফেলানী (১৫) নিহত হওয়ার ঘটনায় কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী ও নাগেশ্বরী উপজেলায় প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। এই হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করে গতকাল শনিবার হাজার হাজার মানুষ সীমান্তে বিক্ষোভ করে।

৩০ ঘণ্টা পর গতকাল শনিবার বিএসএফ ফেলানীর লাশ ফেরত দিয়েছে। আইনি-প্রক্রিয়া শেষে আজ রোববার স্বজনদের কাছে লাশ হস্তান্তর করার কথা রয়েছে।
বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর) ফুলবাড়ীর ভারপ্রাপ্ত কোম্পানি কমান্ডার নায়েক সুবেদার আবদুল জব্বার গতকাল প্রথম আলোকে জানান, পতাকা বৈঠকের পর বিএসএফ লাশ ফেরত দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘ফেলানী হত্যাকাণ্ডের ঘটনা অনাকাঙ্ক্ষিত ও মানবতাবিরোধী। আমরা এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে।’
গতকাল ফুলবাড়ীর অনন্তপুর সীমান্তে গিয়ে দেখা যায়, সকাল থেকে ফেলানীর লাশ দেখার জন্য তীব্র শীত উপেক্ষা করে হাজার হাজার মানুষ সেখানে সমবেত হয়েছে। দুপুর সোয়া ১২টার দিকে লাশ হস্তান্তরের সময় তাঁদের অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। তাঁরা সবাই বিএসএফের এই হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করেন। কাশীপুর গ্রাম থেকে আসা মজিবর রহমান অভিযোগ করেন, সীমান্তে প্রায়ই বিএসএফ বিনা উসকানিতে গুলি করে মানুষ মারে। এটা মেনে নেওয়া যায় না। সরকারের প্রতিবাদ করা উচিত। দক্ষিণ রামখানা গ্রামের কৃষক আ. হামিদ ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘হামরা গরিব বলি তারা গুলি করি মারবে। প্যাটের ভোকোত মানুষ ভারত যায় কাজ করব্যার, তাই বলি মারি ফেলাবে বাহে। কোনো আইন নাই?’ অনন্তপুরের দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী হায়দার আলী বলে, ‘আমরা সবাই এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই।’
ফেলানীর বাড়ি নাগেশ্বরী উপজেলার রামখানা বানারভিটা গ্রামে শোকের মাতম চলছে। স্থানীয় মানুষজন এই হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করেন।
ফেলানীর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তাঁর বাবা নুরুল ইসলাম শোকে যেন পাথর হয়ে গেছেন। স্বজন ও প্রতিবেশীরা তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। একপর্যায়ে তিনি বলেন, ‘বাবা গো তোমরা হামার বেটির লাশ আনি দেও, নিজ হাত মাটি দেমো। হামরা গরিব মানুষ প্যাটের ভোকোত ভারত গেছিলাম আর কোন দিন যাবার নই...’বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। নুরুল জানান, ফেলানীর মা ভারতে আছেন। তিনি জানেন না মেয়ে মারা গেছেন। ফুলবাড়ীর কুলাঘাট এলাকার এক ছেলের সঙ্গে ফেলানীর বিয়ে ঠিক হয়েছিল। শনিবার বিয়ের দিন ধার্য ছিল। তিনি মেয়ের বিয়ের জন্য ৩০ হাজার টাকা এবং কিছু গয়নাও ভারত থেকে এনেছিলেন। কিন্তু সব শেষ হয়ে গেল।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গতকাল বিডিআর ও বিএসএফের মধ্যে পতাকা বৈঠকের পর দুপুর সোয়া ১২টায় লাশ ফেরত দেয় বিএসএফ। পতাকা বৈঠকে বিডিআরের পক্ষে নায়েক সুবেদার আবদুল জব্বার এবং বিএসএফের ১৮১ নম্বর ব্যাটালিয়নের চৌধুরীহাট ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার রাম ব্রিজ রায় নেতৃত্ব দেন। বৈঠকে বিডিআর এই হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানায়। জবাবে বিএসএফ দুঃখ প্রকাশ করে ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা না ঘটে, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখবে বলে জানায়। পরে বাংলাদেশের পক্ষে লাশ গ্রহণ করেন নায়েক সুবেদার আবদুল জব্বার। এ সময় নাগেশ্বরী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ছানাউল্ল্যাহ মিয়া ও ফুলবাড়ী থানার এসআই মো. নুরুজ্জামান উপস্থিত ছিলেন।
এসআই নুরুজ্জামান জানান, ফেলানীর লাশ থানায় রাখা হয়েছে। রোববার কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্তের পর লাশ স্বজনদের হাতে হস্তান্তর করা হবে।
উল্লেখ্য, গত শুক্রবার নুরুল ও ফেলানী ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে অনন্তপুর সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টা করেন। নুরুল প্রথমে মই বেয়ে কাঁটাতার পেরিয়ে আসেন। ফেলানী মইয়ে উঠলে তার কাপড়চোপড় কাঁটাতারে আটকে যায়। এ সময় সে ভয়ে চিৎকার শুরু করে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই বিএসএফের বুলেট তার বুক ঝাঁজরা করে দেয়।
নূরুলের পুরো পরিবার ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির একটি ইটভাটায় শ্রমিকের কাজ করেন।
 
Support : Dhumketo ধূমকেতু | NewsCtg.Com | KUTUBDIA @ কুতুবদিয়া | eBlog
Copyright © 2013. News 2 Blog 24 - All Rights Reserved
Template Created by Nejam Kutubi Published by Darianagar Publications
Proudly powered by Dhumketo ধূমকেতু