পহেলা মে ।। শাহাদাত হোসাইন সাদিক

Saturday, April 30, 2011

আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস
মে দিবস নামেও পরিচিত। মে মাসের প্রথম দিনটিকে পৃথিবীর অনেক দেশে পালিত হয়। বেশকিছু দেশে মে দিবসকে লেবার ডে হিসাবে পালন করা হয়। এদিনটি সরকারীভাবে ছুটির দিন।

পহেলা মে
সারা বিশ্বের শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের সংগ্রামী ঐতিহ্য ও অধিকার প্রতিষ্ঠার ইতিহাসের এক স্মরনীয় ও আন্তর্জাতিক এবং সংহতির উদযাপনের এক অনন্য দিন  মহান মে দিবস বা আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। এই দিবসটি শ্রেনী বৈষম্যের অবসানের লক্ষ্যে সংকল্পবদ্ধ ও সংগঠিত হয়। ১ মে শুধু একটি দিবসই নয়, একটি ইতিহাস, একটি ঘটনা। ১৮৮৬ সালের ১লা মে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোর শহরে ৮ ঘন্টা শ্রম দিবস, মজুরি বৃদ্ধি তথা ন্যায্য মজুরি, কাজের উন্নত পরিবেশ ইত্যাদির দাবিতে ১লা মে একটি শ্রমিক সংগঠন ধর্মঘটের ডাক দেয়। এই ধর্মঘটে প্রায় ৩ লক্ষ শ্রমিক যোগ দেয়। বর্বর  ও পিশাচিক পন্থায় সে ধর্মঘট দমন করা হয়। শ্রমিকদের এক সমাবেশে পুলিশ গুলি চালায় এর ফল স্বরূপ পরের দিন সে মার্কেটে শ্রমিকরা প্রতিবাদ সমাবেশে মিলিত হলে কারখানার মালিকরা সেখানে বোমা বিস্ফোরন ঘটায়, ফলে শ্রমিক নেতাসহ ১১জন প্রাণ হারায়। সংঘটিত ঘটনা ও পরবর্তী ঘটনাবলী থেকে এই দিবসের উৎপত্তি।
পূর্বে শ্রমিকদের অমানবিক পরিশ্রম করতে হত,
প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা আর সপ্তাহে ৬ দিন। বিপরীতে মজুরী মিলত নগণ্য, শ্রমিকরা খুবই মানবেতর জীবনযাপন করত, ক্ষেত্রবিশেষে তা দাসবৃত্তির পর্যায়ে পড়ত। ১৮৮৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের একদল শ্রমিক দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজ করার জন্য আন্দোলন শুরু করেন, এবং তাদের এ দাবী কার্যকর করার জন্য তারা সময় বেঁধে দেয় ১৮৮৬ সালের ১লা মে। কিন্তু কারখানা মালিকগণ এ দাবী মেনে নিল না। ৪ঠা মে ১৮৮৬ সালে সন্ধ্যাবেলা হালকা বৃষ্টির মধ্যে শিকাগোর হে-মার্কেট নামক এক বাণিজ্যিক এলাকায় শ্রমিকগণ মিছিলের উদ্দেশ্যে জড়ো হন। আগস্ট স্পীজ নামে এক নেতা জড়ো হওয়া শ্রমিকদের উদ্দেশ্যে কিছু কথা বলছিলেন। দূরে দাঁড়ানো পুলিশ দলের কাছে এক বোমার বিস্ফোরন ঘটে, এতে এক পুলিশ নিহত হয়। পুলিশবাহিনী তৎক্ষনাত শ্রমিকদের উপর অতর্কিতে হামলা শুরু করে যা ভয়বহতায় রূপ নেয়। এতে ১১ জন শ্রমিক শহীদ হন। পুলিশ হত্যা মামলায় আগস্ট স্পীজ সহ আটজনকে অভিযুক্ত করা হয়। এক প্রহসনমূলক বিচারের পর ১৮৮৭ সালের ১১ই নভেম্বর উন্মুক্ত স্থানে ৬ জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। তাকে পরে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়। ফাঁসির মঞ্চে আরোহনের পূর্বে আগস্ট স্পীজ বলেছিলেন, "আজ আমাদের এই নি:শব্দতা, তোমাদের আওয়াজ অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী হবে"। ২৬শে জুন, ১৮৯৩ ইলিনয়ের গভর্ণর অভিযুক্ত আটজনকেই নিরপরাধ বলে ঘোষণা দেন, এবং রায়টের হুকুম প্রদানকারী পুলিশের কমান্ডারকে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত করা হয়।

শ্রমজীবী মানুষের আন্দোলনের উক্ত গৌরবময় অধ্যায়কে স্মরণ করে ১৯৮০ সাল থেকে প্রতি বছরের ১লা মে  বিশ্বব্যাপী পালন হয়ে আসছে “মে দিবস” বা আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস”। পহেলা মে সেই আন্দোলনের কথাই আমাদের স্বরণ করিয়ে দেয়। ১৮৯০ সালের ১৪ জুলাই অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল সোশ্যালিষ্ট কংগ্রেসে ১ মে শ্রমিক দিবস হিসেবে ঘোষনা করা হয় এবং তখন থেকে অনেক দেশে দিনটি শ্রমিক শ্রেনী কর্তৃক উদযাপিত হয়ে আসছে। রাশিয়াসহ  পরবর্তীকালে আরো কয়েকটি দেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সংঘটিত হবার পর মে দিবস এক বিশেষ তাৎপর্য অর্জন করে। জাতিসংঘে একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক শাখা হিসাবে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (অরগানাইজেশন বা আই .ত্রল.ও) প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়ে শ্রমিকদের অধিকার সমূহ স্বীকৃতি লাভ করে এবং সকল দেশে শিল্প মালিক ও শ্রমিকদের তা মেনে চলার আহবান জানায়। এভাবে শ্রমিক ও মালিকদের অধিকার সংরক্ষণ করে। বাংলাদেশ আই.এল.ও কর্তৃক প্রণীত নীতিমালার স্বাক্ষরকারী একটি দেশ। সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শ্রমিক শ্রেনীর প্রাধান্যের কারনে অধিকাংশ সমাজতান্ত্রিক দেশে বেশ গুরুত্বও সংকল্প সহকারে মে দিবস পালন করা হয়। বাংলাদেশে মে দিবসে সরকারি ছুটি পালিত হয়। এখানে বেশ উৎসাহ উদ্দীপনার সঙ্গে মে দিবস পালিত হয়।

দেশে অতীতকাল থেকে এখনও পর্যন্ত শ্রমিক নিযার্তন চলছে। স্থান, কাল, পাত্র ভেদে যেই নিযার্তন আমরা দেখি তা হলো শ্রমিককে গালাগাল করা, মানসিক টেনশনে রাখা, হুমকি দেয়া কোনো কোনো পর্যায়ে শারীরিক নির্যাতন করতেও দেখা যায়। গার্মেন্টসসহ অনেক ক্ষেত্রে ৮ ঘন্টার পরিবর্তে বিনা ওভারটাইমে ১২-১৪ ঘন্টা কাজ করানো হয় ১২ ঘন্টা কাজ করিয়ে বেতন দেয় ৮ ঘন্টার। শ্রমিক আইনে ২৪ ঘন্টার মধ্যে ১২ ঘন্টা কাজ করার কোন বিধান নেই। কোন কোন শিল্প-কারখানার সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও কাজ করায়, এমনকি মে দিবসের প্রচলিত ছুটি থেকেও তারা বঞ্চিত।

বিশ্বের দেশে দেশে নির্বাচিত শোষিত শ্রমিকশ্রেনী নতুন শতাব্দীর প্রথম দশকে এখনো খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষার ন্যুনতম অধিকার থেকেও বঞ্চিত। বাংলাদেশের শ্রমিক শ্রেনীর হাজারো সমস্যা। বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষ উন্নত বিশ্বের শ্রমিকদের মতো সুযোগ-নিরাপত্তা কাজের পরিবেশ এখনো পায়নি, এদেশের শ্রমিকদের অথনৈতিক অবস্থা ভালো নয়। নারী ও শিশু শ্রমিকরা শোষণের শিকার হচ্ছে, কর্মস্থলে নির্যাতন ক্রমশ বেড়ে চলেছে। সেখানকার নারী নিযার্তনের ধরন ও প্রকৃতি সামাজিক নারী নির্যাতন থেকে একেবারেই আলাদা।

আমরা আজকের এই স্মৃতিময় দিনে দুনিয়ার মেহনতি মানুষের সঙ্গে এক হয়ে শিকাগোর সেই আতœত্যাগী শ্রমিকদের স্মরণ করি, নিবেদন করি তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।

তথ্য সূত্র ঃ
উইকিপিডিয়া
মে দিবস- আয়েশা খাতুন।


পহেলা বৈশাখ ।। জহির রহমান

Tuesday, April 19, 2011

সে অনেক আগের কথা,
কয়েক পুরুষ আগের কথা। আমাদের পূর্ব পুরুষেরা যা কিছু দেখতেন, সম্মোহিত হতেন, সবকিছুর সম্মানের কাছে, সব কিছূর শক্তির কাছে তারা নিজেদেরকে নিতান্ত ক্ষুদ্র মনে করতেন। সাপ-বিচ্ছু থেকে শুরু করে বস্তুজগতের এমন কোন শক্তি কিংবা প্রাণের অস্তিত্ব ছিল না যা মানুষের পূজার সামগ্রীতে পরিণত হয় নি। আমাদের পূর্বপুরুষেরা মানুষের ভেতর সৃষ্টিকরে রেখেছিল শ্রেণীভেদ, একের স্পর্শে অন্যের পবিত্রতা নষ্ট হতো, একের উপস্থিতিতে অন্যের আসবাবপত্র, বাসন কোসন সবকিছু অপবিত্র হতো। তখনকার সমাজে ইশ্বরের বানীও ছিল গুটিকয়েক মানুষের সম্পত্তি, ইশ্বরের বানী শোনার অধিকার ছিল সংরক্ষিত। তাই তো কারো কানে ইশ্বরের বানী ভুলেও পৌঁছুলে তাকে গুনতে হতো চরম মাশুল, গলিত সীসায় বন্ধ করে দেয়া হতো তার কান ।
সে সময়ে,
আরবে এক জোতির্ময় পুরুষ এলেন, যিনি শেখালেন মানুষের প্রকৃত পরিচয়। আর দশটা জীবের মতো মানুষও সাধারণ কোন প্রানী নয় বরং মানুষের পরিচয় হলো মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব, আশরাফুল মাখলুকাত। তিনি এসে শোনালেন সাম্যের গান। মানুষে মানুষে নেই কোন ভেদাভেদ, সবাই এক আল্লাহরই বান্দা, তিনি শেখালেন ।
তার আগমনে বিশ্বের কোনে কোনে পরে সাড়া, সে সত্যের স্রোতধারা এক সময় আরব সাগর পারি দিয়ে ভাসিয়ে দেয় বাংলাদেশ। মানুষের তৈরী শ্রেণী বৈষম্যের দেয়াল এতদিন যাদের ইতরের চেয়ে নিম্নস্তরের জানোয়ার বানিয়ে রেখেছিল, সেই মহাপুরুষের অনুসারীদের ভালোবাসায় নিমিষেই ভেঙ্গেপড়ে দাসত্বের শৃংখল। বাংলাদেশের লাঞ্ছিত, সুবিধা বঞ্চিত, নীচু জাতের মানুষেরা দলে দলে শামিল হলেন ইসলামে, ইতর প্রাণী থেকে উঠে এলেন মানুষের কাতারে।

হ্যা, তখন আমাদের সংস্কৃতি ছিল, সে সংস্কৃতি ছিল পূজোর সংস্কৃতি। গাছ, মাটি, পাথর, সূর্য, চন্দ্র, তারা সবকিছুর পুজোয় জড়িয়ে ছিল আমাদের সংস্কৃতি। কৃষি কাজে পুজো, ফসল তুলতে পুজো, নতুন অন্নে পুজো, সবকিছুতেই পুজোর ছড়াছড়ি। সে সংস্কৃতিকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে সকল শক্তি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে একমাত্র আল্লাহর দাসত্ব মেনে নিয়েছিলেন পূর্বপুরুষেরা।  গ্রহণ করেছিলেন ইসলাম, হয়ে ছিলেন মুসলমান, হয়েছিলেন পুতপবিত্র মানুষ।

আজ এতো বছর পরে কেউ কেউ আবার ফিরে পেতে চায় সেই পতিত সংস্কৃতি, যাকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন সবাই। ফিরে পেতে চান সেই সংস্কৃতিকে যে সংস্কৃতির প্রতিটি নিয়মে ছিল পৌত্তলিকতার গন্ধ। তাইতো আজ বাঙ্গালী সংস্কৃতির নামে পৌত্তলিকতাকে ফিরিয়ে আনায় অবিরাম প্রচেষ্টা। একটি ভাষাকে কেন্দ্র করে সংস্কৃতি জন্মাতে পারে, তবে বাংলার কোন স্বতন্ত্র সংস্কৃৃতি নেই, বাঙ্গালী সংস্কৃতি নামে পুরোটাই হিন্দু ধর্মীয় সংস্কৃতি। পহেলা বৈশাখের  নামে এখানে বাংলা সনের শুরুর দিনের একটা রঙচঙা উৎসব হয় বটে, বলা হয় ওটা সার্বজনীন উৎসব, অথচ ইতিহাস ভিন্ন কথা বলে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে ১৯১৭ সালের পহেলা বৈশাখে হোম কীর্ত্তণ ও পূজোর মাধ্যমে শুরু হয় আধুনিক পহেলা বৈশাখের মঙ্গলযাত্রা। পহেলা বৈশাখে হালখাতা পূজা নামে হিন্দুদের আলাদা উৎসব রয়েছে, রয়েছে চৈত্রসংক্রান্তি, শিবপূজা, রয়েছে লোমহর্ষক চরক পূজা।  বাংলা সনের প্রতিটি পার্বনই হিন্দু ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানসর্বস্ব। পৌষ সংক্রান্তি , পৌষ পার্বণ এর সবগুলোই হিন্দুধর্মীয় সংস্কৃতি।

যারা মুসলমান তারা একবারও তলিয়ে দেখে না যে ওটা তাদের সংস্কৃতির অংশ নয়, এমনকি বাঙ্গালী সংস্কৃতিও নয়। কেউ যদি বাঙ্গালী সংস্কৃতির নামে হালখাতা পূজো শুরু করতে চায়, হোম কীর্ত্তণ করতে চায়, চৈত্র সংক্রান্তির শিবপূজা করতে চায়, পৌষ পার্বণের নামে দেবতার নামে পিঠে উৎসর্গ করতে চায় তবে সেতো সেই পৌত্তলিকতাকেই গ্রহণ করলো। ইদানিং কট্টর মুসলিমরাও রমনার পার্কে আলাদা ভাবে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান করে। হিন্দুদের অনুষ্ঠানের চাকচিক্য দেখে এরা এতটাই বিভ্রান্ত যে, যে কোন মূল্যে পৌত্তলিকতাকে ইসলামের নামে গ্রহণ করে জোড়াতালি দিয়ে মুসলমানিত্ব টিকিয়ে রাখতে চায়। এরা মহররমে রথ যাত্রার মতো তাজিয়া মিছিল করে, মঙ্গলযাত্রা করে, হিন্দুরা যেমন দেবতার পায়ের কাছে মঙ্গলপ্রদীপ জ্বালে, এরাও তেমনি মঙ্গলপ্রদীপ জ্বেলে বর্ষবরণ করে।

একজন হিন্দু পূজো করবে এটাই স্বাভাবিক। তার ধর্মের প্রতি তার শ্রদ্ধা আছে, ভালোবাসা আছে, তার ধর্মকেই সে শ্রেষ্ঠ মনে করে বলেই পালন করে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান। তাই বলে তার ধর্ম-কর্মের জৌলুশ দেখে মুসলমানরাও যদি বিভ্রান্ত হয়, যে কোন মূল্যে সেসব অনুষ্ঠানকে সার্বজনীন অনুষ্ঠান নাম দিয়ে পালন করে, তবে তাতে কেবল ইসলামী সংস্কৃতি সম্পর্কে তার অজ্ঞতাই প্রকাশ পায়। সার্বজনীন নাম দিলেই যদি সব কিছু জায়েজ হয়ে যায় তবে নাম সর্বস্ব মুসলমানেরা সার্বজনীন দূর্গাপূজাই বা বাদ রাখে কেন, নাকি ওখানেও ওরা ধুপকাঠি নেড়ে নেড়ে ঠিকই আরতী দিয়ে আসে?

অথচ ইসলামের স্বতন্ত্র সংস্কৃতি রয়েছে। এ সংস্কৃতি সব ধরণের শেরক ও বেদায়াত থেকে মুক্ত। আমরা বাঙ্গলা ভাষাভাষীরা ইসলাম গ্রহণ করে মুসলমান হয়েছি, আরব হই নি, আরব ভাষাকে মাতৃভাষা বলে গ্রহণ করিনি, তাহলে বুঝা যায় ভাষা সংস্কৃতির প্রধান কোন বিষয় নয়। বাংলাদেশে ইসলামের আগমনের পূর্বে যে সংস্কৃতি ছিল তা ছিল পৌত্তলিক সংস্কৃতি, হিন্দু সংস্কৃতি, বাঙ্গালী সংস্কৃতি নয়। ঠিক তেমনি মুসলমানদের আছে ইসলামী সংস্কৃতি, শেরক বিদয়াত মুক্ত সংস্কৃতি, আরবীয় সংস্কৃতি নয়। আমাদের সংস্কৃতি ভাষা কেন্দ্রিক নয়, তাওহীদভিত্তিক।

তাই যারা বাংলা ভাষা ও ইসলামপূর্ব এ দেশীয় পৌত্তলিক সংস্কৃতিকে গুলিয়ে ফেলেন তাদের একবার ভেবে দেখা উচিত, যে সংস্কৃতি মানুষকে মানবীয় গুণগুলো বিসর্জন দেয়া শেখায়, মানুষে মানুষে শ্রেণীভেদ সৃষ্টি করে, যে সংস্কৃতিতে ইশ্বর গুটিকয়েক লোকের সম্পত্তি হয়ে যায় সে সংস্কৃতিকে বাঙ্গালী সংস্কৃতির নামে আমরা আবার কেন গ্রহণ করবো? ইসলামী সংস্কৃতি যদি ব্যর্থ হয়ে যায়, ইসলামী সংস্কৃতি যদি পৌত্তলিক সংস্কৃতির চেয়ে নিম্নমানের প্রতীয়মান হয় তবে ফিরে যাওয়ার সুযোগ ছিল। অথচ বিশ্বের প্রতিটি জ্ঞানীব্যক্তি মাত্রই জানেন ইসলামের চেয়ে সফল আদর্শ আজো পৃথিবীর কোথাও সৃষ্টি হয় নি। তাহলে একটি সর্বশ্রেষ্ঠ সংস্কৃতিকে বিসর্জন দিয়ে আস্তাকুড়ে ফেলে দেয়া সংস্কৃতিকে আবার বুকে তুলে নেয়া কতটুকু যৌক্তিক একবার কি তা ভাবা উচিত নয়?


লেখক : সম্পাদক, মাসিক কিশোর সাহিত্য

এপ্রিল ফুল ।। শাহাদাত হোসাইন সাদিক

এপ্রিল ফুল
বাক্যটা মূলত ইংরেজী। অর্থ এপ্রিলের বোকা। এপ্রিল ফুল ইতিহাসের এক হৃদয় বিদারক ঘটনা। প্রতি বছর পহেলা এপ্রিল এলেই একে অপরকে বোকা বানানো এবং নিজেকে চালাক প্রতিপন্ন করার জন্য এক শ্রেণীর লোকদের বিশেষভাবে তৎপর হয়ে উঠতে দেখা যায়। বলা বাহুল্য যে তারা অপরকে বোকা বানিয়ে নিজেরা আনন্দ উপভোগ করে থাকেন।

দুঃখ ও পরিতাপের বিষয়

সর্বাধিক দুঃখ ও পরিতাপের বিষয় হচ্ছে এই যে, সরল প্রাণ মুসলমানগণ ধোঁকা-বাজির করুন শিকারে উপনীত হয়েছিল এইদিন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস আজ মুসলিম জাতির এক শ্রেণীর লোকেরা সে ইতিহাস ভুলে গিয়ে এপ্রিলের দিনটিকে স্বাচ্ছন্দে অংশ গ্রহণ করছেন এবং প্রচুর কৌতুক ও রসিকতা উপভোগ করছেন। যে ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই আনন্দ উল্লাস উপভোগ করা হচ্ছে তা যে কত ভয়াবহ, কত নিষ্ঠুর, কত হৃদয় বিদারক, সে কথা ভাবতে অবাক হই, আর দেহ-মন হয়ে উঠে শিহরিয়ে।


৭১১ খৃস্টাব্দ
মুসলিম নৌবহর ভূমধ্য সাগরে ভাসিয়ে দিয়ে বীরসেনানী নাবিক তারিক ঘোষণা দিয়ে ছিলেন যে, হে মুসলিম বাহিনী তোমাদের সম্মুখে শত্রুসেনা এবং পশ্চাতে ভূমধ্য সাগরের উত্তাল তরঙ্গ মালা, তোমরা কি ভূমধ্য সাগরে ডুবে নিজেদের জীবনকে বিপন্ন করতে চাও? নাকি অত্যাচারি স্পেনীয় শাসক রডারিকের বিরুদ্ধে জেহাদ করে ইসলামের বিজয় নিশান স্পেনের বুকে উড়াতে চাও। যদি তাই হয় তাহলে সামনে অগ্রসর হও। এই রক্তস্তব্দ বক্তব্যের পর মুসলমানগণ মহান প্রজ্ঞাময় আল্লাহ তা’আলার নামে রডারিকের রনসম্ভারে সুসজ্জিত বিশাল বাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ছিল এবং কেড়ে নিয়ে ছিল স্পেন। গড়ে উঠেছিল গ্রানাডার কর্ডোভায় আটশ বছরের আলোড়ন সৃষ্টিকারী সভ্যতা।

কিন্তু
মুসলিম শাসকরা যখন কুরআন ও সুন্নাহর কথা একেবারে ভুলে গিয়ে জন-সাধারণের সুখ-শান্তির মূলে পদাঘাত করে ভোগ বিলাসে মত্ত হয় তখন তারা হারিয়ে ফেলে ইসলামী চেতনা। তাদের এই দুর্বলতার সুযোগে খৃস্টানরা মুসলিম শাসকদের বিরুদ্ধে সুসংগঠিত হতে থাকে এবং ঘোষণা করে যে দুধর্ষ মুসলিম বাহিনীকে যদি হটানো না যায়, তাহলে আগামী দিনগুলোতে ইউরোপের সকল গীর্জা থেকে মুসলমানদের আজান ধ্বনী শোনা যাবে। এই উদ্দেশ্য সফল করার জন্য ‘পর্তুগীজ’ রাণী ‘ইসাবেলা’কে পার্শ্ববর্তী রাজা “ফার্ডিন্যান্ডের” সাথে বিবাহ সূত্রে আবদ্ধ হয়। ফলে উভয়ে নেতৃত্ব দেয় খৃস্টান বাহিনীর। একের পর এক স্পেনের অধিকাংশ এলাকা খৃস্টানদের দখলে চলে যায়। মুসলিম বাহিনী তখন উপায়ন্তর না পেয়ে আশ্রয় নেয় রাজধানী গ্রানাডায়। অবশেষে ফার্ডিন্যান্ড বাহিনীও গ্রানাডার দ্বার প্রান্তে এসে পৌঁছে যায়। মুসলিম বাহিনী তখন ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। এ সময় ফার্ডিন্যান্ড ঘোষণা করে যে, “মুসলমানগণ যদি শহরের প্রবেশ দ্বার উম্মুক্ত করে দিয়ে এবং নিরস্ত্র অবস্থায় মসজিদে অবস্থান করে, তবে তাদেরকে বিনা রক্তপাতে মুক্ত করা হবে”। অসহায় মুসলমানগণ আল্লাহর উপর ভরসা করার কথা ভুলে গিয়ে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে যুদ্ধ বন্ধ করে দেয়, এবং তাদের আশ্বাস অনুযায়ী মসজিদে আশ্রয় নেয়। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস কুখ্যাত ফার্ডিন্যান্ড মসজিদের চারি পার্শ্বে আগুন লাগিয়ে নৃশংসভাবে হাজার হাজার নিরপরাধ মুসলমানদেরকে হত্যার মাধ্যমে বিশ্বাস ঘাতকতার পরিচয় দেয়, এবং রক্তে রঞ্জিত করে গ্রানাডার রাজপথ, এবং তাদেরকে জোরপূর্বক খৃস্টান বানায়। যে দিন এ সব নির্মম নৃশংসতা কর্মকান্ড করে ছিল, সে দিন ছিল “১লা এপ্রিল ১৪৯২ সাল”। ফার্ডিন্যান্ড সে দিন আনন্দে আত্মহারা হয়ে বলে ছিল “হায় মুসলমান! এপ্রিল ফুল (অঢ়ৎরষ ভড়ড়ষ) তোমরা এপ্রিলের বোকা। স্পেনীয়দের দ্বারা মুসলমানদের ভড়ড়ষ বা বোকা বানানোর এই নিষ্ঠুর বিশ্বাস ঘাতকতা স্মরণীয় রাখার জন্য খৃস্টান জগৎ প্রতি বছর ১লা এপ্রিল এলে রসিকতার খেলা খেলে, যে খেলা আমাদের কাছে বড় করুণ আর বেদনাময়।

আর
আমরা মুসলমানরা উদ্দেশ্য এবং অর্থ না বুঝে প্রতি বছর ১লা এপ্রিল এলেই হৃদয় বিদারক ঘটনাকে চাপা দিয়ে আনন্দ উল্লাসে পরিণত করত: বিজাতীয় সংস্কৃতি পূজা করে চলছি। আসলে আজ আমরা আমাদের স্বর্ণঝরা গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস থেকে বিছিন্ন। আলোচিত “এপ্রিল ফুল” খৃস্টানদের একটি বিশেষ ষড়যন্ত্র যা মুসলমানদের ঐতিহ্যে চরম আঘাত হানে। কেননা ইতিহাস পর্যালোচনা করলে প্রতীয়মাণ হয় যে, তারা মুসলমানদিগের শুধু অত্যাচার নির্যাতন কংকাল সার এবং কাঙ্গালেই পরিণত করেনি বরং তারা কৌশলে আমাদের জাতীয় ইতিহাস ঐতিহ্যে ও আঘাত হানছে দিনের পর দিন। সে কথাও কারো অজানা নয়।

পরিশেষে
সকল মুসলমানদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান এই যে, সঠিক ইতিহাস-ঐতিহ্য শিক্ষা করত: প্রচলিত কু প্রথাকে উৎখাত করুন। এবং প্রকৃত ইসলামী আদর্শে উদ্বুদ্ধ জীবন গঠন করুন। তবেই আমরা সত্যিকার মুসলমান হিসেবে বেঁচে থাকার সার্থকতা খুঁজে পাব।
হে আল্লাহ আমাদের সে ক্ষমতা ও তাওফীক দান করুন॥ আমীন।

লেখক : সহকারী শিক্ষক, রায়পুর আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজ, রায়পুর, লক্ষ্মীপুর।

ধর্মান্ধতা এবং বিজ্ঞানবিমুখতার কুপ্রভাব by শহিদুল ইসলাম

Saturday, January 22, 2011

ক. অল্প কিছু মানুষ এ দেশে একটি বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখে আসছেন অনেক দিন ধরেই। ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি অক্ষয় কুমার দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেন, সত্যেন বসু, মেঘনাদ সাহা, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, কুদরাত-এ-খুদাসহ অল্প কিছু মানুষ এ নিয়ে ভেবেছেন-লিখেছেন।
তাঁদের লেখা পড়ে আমরা অনুপ্রাণিত হয়েছি এবং তাঁদের স্বপ্নের সঙ্গে আমাদের স্বপ্ন মিলিয়ে দিয়ে আমরাও সামান্য কিছু কাজ করেছি। 'সোনার পাথরবাটির' মতো আমাদের সে স্বপ্ন ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে গেছে। আমরা ভেবেছি, স্কুলের পাঠ্যসূচিকে বিজ্ঞানমনস্ক করলেই আমাদের সবার চাওয়া-পাওয়ার সফল বাস্তবায়ন হবে। আমরা যখন স্কুলে পড়তাম, তখনো যে বিজ্ঞানের কিছু বিষয় আমাদের পড়তে হয়নি তা নয়। পড়েছি। কিন্তু কখনো ভাবিনি তার সঙ্গে জীবনের বা বাস্তবতার কোনো সংযোগ বা সম্পর্ক আছে। মনের মধ্যে ধর্মান্ধতা ও বিজ্ঞানবিরোধিতা পুষে রেখে যাঁরা আমাদের বিজ্ঞান পড়াতেন, তাঁরাও বিজ্ঞানের ওপর খুব ভরসা রাখতেন বলে আমার মনে হয় না। মুখস্থ করে বেশি নম্বর পাওয়াই যেন তার একমাত্র উদ্দেশ্য। তাই রবীন্দ্রনাথ পাঠ্যপুস্তককে দুই ভাবে ভাগ করেছিলেন। তার এক ভাগ টেঙ্ট বুক বোর্ড কর্তৃক প্রকাশিত পুস্তক, যাকে তিনি 'অপাঠ্য' বলে রায় দিয়েছিলেন। টেঙ্ট বুক বোর্ড কর্তৃক প্রকাশিত 'পাঠ্য' বই পড়ে কারো মন যে জিজ্ঞাসু হয়ে উঠতে পারে, তা বাংলাদেশের বাইরে এসে উপলব্ধি করতে পারছি। গত ৩ জানুয়ারি ২০১১ ভোরের কাগজে প্রকাশিত 'সূর্যের সঙ্গে বসবাস' লেখাটি পড়লে পাঠক বুঝবেন এখানে শুধু প্রাইভেট নয়, সরকারি স্কুলেও 'স্ক্রিপচার' ক্লাস নামে ধর্মশিক্ষা চালু রয়েছে। তবে সে ক্লাস বাধ্যতামূলক নয়। শুনলাম, সেখানে বিজ্ঞানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বিষয়ও পড়ানো হয়। ফলে ছয়-সাত বছরের শিশু সে ক্লাসের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে এবং নিজেরাই সিদ্ধান্ত নেয়, সে ক্লাসটি না করার। আমাদের দেশে এ কথাটি কেউ বিশ্বাস করবেন না। একটি ছয়-সাত বছরের শিশু কী পড়বে, না পড়বে_সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা গ্রহণ করতে পারে_এটা আমরা কল্পনাও করতে পারি না বলেই আজকের এ লেখার অবতারণা।

দুই. ৫ জানুয়ারি ২০১১। এই লেখাটি লিখছি প্রবাসে বসে। অস্ট্রেলিয়ায় মেয়ের বাসায় কিছু বইপত্র নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করছিলাম ড্রইং রুমের টেবিলে বসে। বাড়িতে আমি ও আমার সাত বছরের নাতি সূর্য। ভীষণ চঞ্চল, দারুণ বুদ্ধিমান। কিন্তু পাঠ্য বইয়ের প্রতি খুব একটা আকর্ষণ নেই। তার মা-বাবা তাকে পাঠ্য বই নিয়ে বসিয়ে রাখতে সদাব্যস্ত। কখনো-সখনো বিরক্ত-রেগেও যায়। তবু তাকে আমার বুদ্ধিমান মনে হয়েছে। তার ঘর বোঝাই বই আর বই। দেয়ালে আঁটা পৃথিবীর মানচিত্র ও সমাজ-বিবর্তন এবং বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ের ওপর আঁকা মোটা আর্ট কাগজের বড় বড় ছবি। পৃথিবীর কোথায় কোন দেশ জিজ্ঞেস করলে সঙ্গে সঙ্গে দেখিয়ে দেয়। দ্বিমাত্রিক ও ত্রিমান্ত্রিক ছবি বলতে কি বোঝায় তা সে জানে। আর্কিমিডিসের 'ইউরেকা', কপারনিকাসের সৌরজগৎ, নিউটনের আপেল_এমনকি ডারউইনের 'বানরতত্ত্ব' ও আইনস্টাইনের 'আপেক্ষিক তত্ত্ব' সবই সে জানে। তার মানে বিজ্ঞানের ইতিহাসের বড় বড় মোড় পরিবর্তন সম্বন্ধে সে ভালোই জানে। খাতার সাইজের দুই-তিন শ বই ঘরটির তিনটি দেয়ালে ঠাসা। অধিকাংশই বিজ্ঞানের। ওর সঙ্গে সারাক্ষণ গল্প করতে আমার ভালো লাগে। যা জানে না, তা নিয়ে প্রশ্ন করতে সামান্য লজ্জা বা দ্বিধা করে না। কটা বইয়ের নাম লিখব? কয়েকটি Science Encylopedia ছাড়াও এমন কোনো বিষয় নেই, যার ওপর ২-৪ খানা বই নেই। যেমন Weather : climate & climatic change, Power, What is Inside ‡reat Inventions, Farns & the World Food Supply, Outdoor Science, From Cycle to Spauship, Special Effects in Film & Television, Fossils ছাড়াও আছে Pocket Scientists। সত্যি কথা বলতে কী, আমি বিজ্ঞানের ছাত্র হয়েও ওর বই থেকে অনেক কিছু বুঝতে পেরেছি, যা আগে পারিনি।

তিন. আজ উত্তেজিত হয়ে সে আমাকে ডাকল। আমি তড়িঘড়ি টেলিভিশনের সামনে এলাম। সূর্য বলল_'এই দেখ, রিচার্ড হ্যামন্ড! এই বইটা ও লিখেছে।' বলে সে একটা বই আমাকে দিল। বইটার নাম 'Can you feel the FORCE?' এবিসিতে তার পরিচালনায় একটি শিশুদের বিজ্ঞান শিক্ষার অনুষ্ঠান। নাম "Richard Hammond's Blast খধন." আজকের বিষয় গ্যালিলিওর 'লস অব ফলিং বডি'। একটি ওয়াশিং মেশিন ও একটি মাইক্রোওয়েভ ক্রেনে করে ওপরে তুলে ছেড়ে দিল। অবশ্যই ওয়াশিং মেশিনটা আগে মাটিতে পড়ে ভেঙে গেল। তারপর গ্যালিলিওর তত্ত্বটির ব্যাখ্যা দিলেন হ্যামন্ড। হ্যামন্ডের ভূমিকা থেকে একটু পড়ি। তিনি লিখছেন_'কার, বাইক (সাইকেল), বিমান, স্পিডবোট, হোভারক্র্যাফট, যা কিছু চলন্ত তা আমি ভালোবাসি। কারণ সেগুলো সব action-কাজ-চলন্ত। এসব গতিশীল জিনিস নিয়েই পদার্থবিদ্যা। যখন একটি গাড়ি দুর্ঘটনায় পতিত হয়, গাছ থেকে একটি আপেল মাটিতে পড়ে অথবা বিদ্যুৎ চমকায়, পদার্থবিজ্ঞানের তত্ত্ব তোমাকে বলে দেয় 'কি হচ্ছে?' তুমি ভাবতে পারো বিজ্ঞানীরা সব কিছুর উত্তর জানে কিন্তু সত্য হলো এই যে, বিজ্ঞানের জগৎ অজানা ও অসংখ্য প্রশ্নে ভর্তি। সেই জন্য এই বইখানা প্রশ্নের পর প্রশ্নে ভরপুর। সেসব প্রশ্নের অধিকাংশেরই সহজ উত্তর আছে কিন্তু কিছু প্রশ্নের উত্তর আজও জানা সম্ভব হয়নি। কোনো কোনো উত্তর তোমাকে অবাক করবে, কোনো কোনো উত্তরে তুমি অবাক হবে ও আঘাত পাবে_আবার কোনো প্রশ্ন তোমাকে চিন্তায় ফেলে দেবে। 'একটি প্রশ্ন হলো, একটি হাতি ও একটি পাখির পালকের ছবি এঁকে প্রশ্ন তোলা হয়েছে কোনটা দ্রুত পড়বে?' মাধ্যাকর্ষণ বা gravity থেকে প্রথম চিন্তা করেন গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল (৩৮৪-৩২২ খ্রি.পূ.)। অ্যারিস্টটল দেখেছিলেন এক খণ্ড ইট একটি পালকের চেয়ে দ্রুত নিচে এসে পড়ছে। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ভারী জিনিস দ্রুত নিচে এসে পড়বে। কোনো পরীক্ষা ছাড়াই তিনি এ সিদ্ধান্তে পেঁৗছেছিলেন। কিন্তু তাঁর উত্তর ছিল ভুল। প্রায় ২০০০ বছর কেউ বিষয়টি পরীক্ষা করে তার সত্য-মিথ্যা যাচাই করেনি। গ্যালিলিও (১৫৬৪-১৬৪২) প্রমাণ করেন অ্যারিস্টটল ভুল। শুনলাম, ওই টিভি সিরিয়ালে আর্কিমিডিসের চৌবাচ্চায় গোসল করা, নিউটনের সামনে আপেল পড়ার বিষয় নিয়ে শিশুদের সঙ্গে হ্যামন্ড নিয়মিত অনুষ্ঠান করেন। এসব অনুষ্ঠান দেখে একটি পাঁচ-ছয় বছরের শিশুও বিজ্ঞানের প্রতি আকর্ষিত হতে বাধ্য। দৈনন্দিন জীবন থেকে শিশুরা বিজ্ঞানী মন নিয়ে বড় হতে পারে।

চার. রবীন্দ্রনাথ যাই বলুন না কেন, পাঠ্য-পুস্তকের প্রভাব আমাদের জীবনে অপরিসীম। পাঠ্য-পুস্তকে যা লেখা থাকে, সেটাই আমাদের কাছে সত্য। তাই পাঠ্য-পুস্তকের গুরুত্ব ছোট করে দেখার উপায় নেই। কিন্তু আমাদের পুরো শিক্ষাব্যবস্থায় বিজ্ঞানমনস্কতার স্থান খুবই কম আছে। টেঙ্ট বুক বোর্ডসহ শিক্ষা বিভাগে যাঁরা কাজ করেন, তাঁরা 'চাকরি' করেন। শিক্ষার্থীরা কি শিখছে, সেসব শিক্ষার ফলে তারা কি ধরনের মানুষ হচ্ছে, তা নিয়ে চিন্তা করা তাঁদের কোনো চাকরির শর্তের মধ্যে পড়ে না। সরকারও বিজ্ঞানমুখী শিক্ষার জন্য প্রতিবছর পাঠ্যসূচিতে বেশি বেশি বিজ্ঞানের পাঠ ঢুকাচ্ছে। কিন্তু একটা বিষয় আমাদের সবার দৃষ্টি এড়িয়ে যায়, স্কুলের শিক্ষার প্রভাব পুরো জাতি বা সমাজের ওপর তেমন কোনো আলোড়ন তুলতে পারছে না। ধর্মান্ধতা ও বিজ্ঞানবিমুখতাই আমাদের সমাজে আজ প্রবল প্রভাব বিস্তার করে আছে। শুধু স্কুলে বিজ্ঞানমুখী পাঠ্যসূচি তেমন কোনো ফল প্রদান করছে না। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের ভাবাদর্শই স্কুল পাঠ্যসূচিতে প্রতিফলিত হয়। তাই সমাজে বিজ্ঞানের প্রভাব বাড়ানোর জন্য সামাজিক আন্দোলনের বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে টেলিভিশন বড় ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু আমাদের দেশে টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ বিনোদনমূলক ও খেলাধুলার ওপর যতটা জোর দেন শিক্ষা, বিজ্ঞান ও যুক্তির প্রতি ততোধিক অন্যমনস্ক। হ্যামন্ডের মতো অনুষ্ঠান আমাদের টেলিভিশনের কাছে আশা করা যায় না। তার অনেক কারণ। প্রথম, মালিকপক্ষের মনমানসিকতা। তাঁরা কি চান দেশের মানুষ যুক্তিবাদী হয়ে উঠুক? বিজ্ঞানমনস্ক হয়ে উঠুক? যদি চান, তাহলে যত অল্প সুযোগই থাকুক, যতই খরচ হোক না কেন, হ্যামন্ডের মতো অনুষ্ঠান করা অসম্ভব নয়। আমাদের টেলিভিশন, সিনেমা মুম্বাই ও কলকাতার অনুষ্ঠানের ধারা অনুসরণ করে কত অনুষ্ঠান করে। টেলিভিশনের মালিক, কলাকুশলী, সাংবাদিক প্রায় দেশ-বিদেশে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে যান। হ্যামন্ডের মতো অনুষ্ঠান কি তাঁদের চোখে পড়ে না? টেলিভিশনের অনুষ্ঠান ও পাঠ্যপুস্তক দেখে আমাদের মনে হয়, আমাদের বিশ্বাসবিরোধী কোনো সত্য তাঁরা সন্তর্পণে এড়িয়ে চলেন। সমাজে প্রচলিত ধর্মান্ধতা ও বিজ্ঞানবিরোধিতা যেন আমাদের পাঠ্যপুস্তক, মূলধারার টেলিভিশন অনুষ্ঠান এবং সংস্কৃতিচর্চার ওপর এখনো আধিপত্য বিস্তার করে আছে। কেবল পাঠ্যপুস্তকে বিজ্ঞানবিষয়ক প্রশ্ন ও উত্তর সনি্নবেশ করে শিশুদের মনে বিজ্ঞান সম্পর্কে আগ্রহ জাগানো যাবে না। পরিবারে, সমাজের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে বিজ্ঞানচর্চা শিশুদের বিজ্ঞানের পথে নিয়ে যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে টেলিভিশন বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

দুশো বছরে বাংলায় লালনভাব ও লালনসঙ্গীতের ক্রম ধারাপাত

লালনশাহী ঘরানার সাধুসঙ্গ এ কালামযোগে সূচিত হয়ে থাকে। কোনো গলদ না রেখে আমরাও আলোচনার গোড়ায় তাই শাঁইজির এ মহতী কালামের অনুসরণে তাঁর চরণে প্রার্থনা করি: দয়াল, আমাদের অন্তরে সেই সুরস ও সুমতি দাও যাতে আমরা তোমার ভাবলোকে ডুব দিয়ে অমূল্য রতন পেতে পারি। লালনভাবজগত মহাসমুদ্রের মতো।

তাঁর অতলে লুকিয়ে আছে অমূল্য মণিমাণিক্য। এ মহাধন শুধু আত্মহারা মুক্তি পাগল সাধকদের পক্ষে লভ্য। আমাদের উদ্ধৃত এ কালামের শব্দ-বাক্যগুলোর মর্মার্থ খুব রহস্যময় হলেও অত্যন্ত বাস্তব সত্য। যেমন 'এলাহি' কথাটির অর্থ 'উপাস্য প্রভুগুরু' তথা 'সদ্গুরু'। 'আলম' অর্থ জগত। এর আরবি বহুবচন হলো আলামিন। অর্থাৎ জগতসমূহ। এখানে অবশ্য জগত মানে বিশেষ মনোজগত। উপরোক্ত কালামে শাঁইজির বলছেন, আলস্নাহর চেহারা আছে। তাঁর হাতও আছে। সম্যক গুরু একজন সামাদ আলস্নাহরূপে ভক্তদের মনোজগতের বাদশাহ্ আলমপানা। তিনিই নানা বিপদাপদে ফেলে শিষ্যের দৃঢ়তা পরীক্ষা করেন। আবার তিনিই পরিত্রাণ করেন ভক্তের বাঁচামরা সবই দয়াল মোর্শেদের মর্জিনির্ভর। তাই ভক্তের আমিত্ব বা অহম্ বলতে কিছু থাকে না। তিনি সর্বদা আপন গুরুমুখি তন্ময় আশেক।

এরপর বাকি দুটি অন্তরাতে শাঁইজি গুরুশিষ্যের আন্তসম্পর্ক কোরানে বর্ণিত নূহ নবী থেকে ভারতবর্ষে মোহাম্মদী ইসলাম ধর্মের মহান প্রচারক খাজাবাবা নিজামউদ্দিন আউলিয়া পর্যন্ত পরম্পরা আমাদের মানসপটে ফুটিয়ে তুলেন। পরিশেষে বলছেন 'লালন কয় মোর কী হয় জানি'। এমন দৈন্যভাব প্রকাশের মাধ্যমে দ্বীনে এলাহির সর্বকালীন-সর্বজনীন সত্যকে অখণ্ডভাবে আমাদের সামনে দাঁড় করান।

প্রবীণ সাধুদের মুখে শুনেছি তাঁরা শাঁইজির এ কালামকে প্রচলিত আরবি কোরানের 'দ্বার উদঘাটিকা' সূরা ফাতেহার বাংলা তফসিররূপে মূল্যায়ন করেন। নূহ থেকে নিজামউদ্দিন সবাই একেশ্বরে বিলীন। আমরা বাইরে থেকে দুই দেখলেও শাঁইজি দেখেন এক। খণ্ড খণ্ড বিকাশের মধ্যে অখণ্ডমণ্ডলের মাণ্ডলীনৃত্য চলছেই নূহ নবী থেকে নিজামউদ্দিন আউলিয়ার বিস্তৃত পরম্পরায়। মধ্যবতর্ী নবী-রসুলগণ যেমন দাউদ, সোলায়মান, মুসা, ঈসা, মোহাম্মদ, আলী, হোসাইন, খাজা গরীবে নেওয়াজ হয়ে নিজামউদ্দিনে যার বিকাশক্রিয়া অব্যাহত আছে। লালন শাঁইজিকে আমাদের অ্যাকাডেমিক বুদ্ধিবেনিয়াগণ খণ্ড একটি দেহমাত্র মনে করে হিন্দু-বাউল-নিম্নবর্গীয় সংস্কারের গণ্ডিতে ধরতে গিয়ে নিজেরাই ধরা খায়। তাঁকে বিচ্ছিন্নভাবে ২০০ বছরের একটি কালসীমার মধ্যে আবদ্ধ করে ধরতে গিয়ে বারবার পিছলে পড়লেও শাঁইজি তাঁর ভাবলোকে হাজার বছরের সব খণ্ডতাকে অতিক্রম করে কালজয়ী মহাসত্যের অভিব্যক্তি হয়ে ওঠেন। তিনি স্থানকালমুক্ত মহাপুরুষ বলেই অখণ্ডসত্তা। কিন্তু আমরা স্থানকালের গণ্ডিতে বাঁধা বদ্ধজীব। দুশো বছরের অাঁকশি দিয়ে তাঁকে আমরা ধরতে চাই। অথচ তিনি পেরিয়ে আসেন হাজারো বছরের সব ধারণাতান্ত্রিক ক্ষুদ্রতাকে। সত্য প্রকাশের নিরবিচ্ছিন্ন প্রবাহ ধরে জন্ম-জন্মান্তরে বহুরূপে নানা নামে তিনিই তিনিময় মহান শুদ্ধসত্তা।

ফকির লালন শাঁইজির আলোচিত কালামে বর্ণিত নিজামউদ্দিন আউলিয়া আসলে কে ? তাঁর মতো মহাপুরুষকে কতটুকুই বা উপলব্ধির ক্ষমতা রাখি আমরা? অল্পকথায় তাঁর আত্মিকশক্তি সম্বন্ধে যদি কেউ জানতে চাই তাহলে যাযাবরের লেখা 'দৃষ্টিপাত' নামক উপন্যাস থেকে একটি ঘটনার উলেস্নখ করা যায়। এখানে অসামান্য সে কাহিনির ছোট একটি অংশ তুরে ধরা হলো:

'দরজা খুলে গেল ইতিহাসের এক অতীত অধ্যায়ের। পাঠান সম্রাট আলাউদ্দিন খিলজি তৈরী করলেন একটি মসজিদ সেদিনকার দিলস্নীর একপ্রান্তে। তার মৃতু্যর দীর্ঘকাল পরে একদা এক ফকির এলেন সেই মসজিদে। ফকির নিজাম উদ্দিন আউলিয়া। স্থানটি তাঁর পছন্দ হলো। সেখানেই রয়ে গেলেন এই মহাপুরুষ। ক্রমে প্রচারিত হলো তাঁর পুণ্যখ্যাতি। অনুরাগী ভক্তসংখ্যা বেড়ে উঠল দ্রুতবেগে।

স্থানীয় গ্রামের জলাভাবের দিকে দৃষ্টি আকৃষ্ট হলো তাঁর। মনস্থ করলেন খনন করবেন একটি দিঘি যেখানে তৃষ্ণার্তেরা পাবে জল, গ্রামের বঁধূরা ভরবে ঘট এবং নামাজের পূর্বে প্রক্ষালন দ্বারা পবিত্র হবে মসজিদে প্রার্থনাকারীর দল। কিন্তু সংকল্পে বাধা পড়ল অপ্রত্যাশিতরূপে। উদ্দীপ্ত হলো রাজরোষ। প্রবল পরাক্রান্ত সুলতান গিয়াসউদ্দিন তোগলকের বিরক্তিভাজন হলেন এ সামান্য ফকির দিওয়ানা নিজামউদ্দিন আউলিয়া।

তোগলক রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা গিয়াসউদ্দিনের পিতৃপরিচয় কৌলিন্যমুক্ত নয়। ক্রীতদাসরূপে তার জীবন আরম্ভ। কিন্তু বীর্য এবং বুদ্ধি দ্বারা আলাউদ্দিন খিলজির রাজত্বকালেই গিয়াসউদ্দিন নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন একজন বিশিষ্ট ওমরাহরূপে। সম্রাটের 'মালিকদের' মধ্যে তিনি হয়েছিলেন অন্যতম। আলাউদ্দীনের মৃতু্যর পরে ছয় বছর পরপর রাজত্ব করলো দুজন অপদার্থ সুলতান, যারা আপন অ গম শাসনের দ্বারা দেশকে পৌঁছে দিলো অরাজকতার প্রায় প্র্রান্তসীমানায়। গিয়াসউদ্দীন তখন পাঞ্জাবের শাসনকর্তা। এমন সময় খসরু খান নামক এক ধর্মত্যাগী অন্ত্যজ হিন্দু দখল করলো দিলস্নীর সিংহাসন। গিয়াসউদ্দিন তার সৈন্যদল নিয়ে অভিযান করলেন পাঞ্জাব থেকে দিলস্নী, পরাজিত ও নিহত করলেন খসরু খানকে। সগৌরবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলেন বাদশাহী তখতে।

গিয়াসউদ্দিনের দৃঢ়তা ছিল, রাজ্যজয়ের শক্তি ছিল, শাসনের দক্ষতা ছিল। কিন্তু ঠিক সে অনুপাতে তার নিষ্ঠুরতাও ছিল ভয়াবহ। একদা দায়িত্বজ্ঞানহীন লোকের অসাবধানী রসনায় রটনা শোনা গেল গিয়াসউদ্দিনে মৃতু্যর। সুলতানের কানেও পেঁৗছালো সে ভিত্তিহীন জনরব। কিছুমাত্র উত্তেজনা প্রকাশ না করে সুলতান আদেশ করলেন তার সিপাহসালারকে, 'লোক আমাকে মিথ্যা কবরস্থ করেছে। কাজেই আমি তাদের সত্যিসত্যি কবরে পাঠাতে চাই'। অগণিত হতভাগ্যের জীবনাবসান ঘটলো নিমেষে, গোরস্থানে শবভূক পশুপাখির হলো মহোৎসব।

কিন্তু গিয়াসুদ্দিনের বিচক্ষণতা ছিল। সেকালে মুগলদের আক্রমণ এবং তার আনুষাঙ্গিক হত্যাকাণ্ড ও লুণ্ঠন ছিল উত্তর ভারতের এক নিরন্তর বিভীষিকা। গিয়াসুদ্দিন তাদের আক্রমণ ব্যর্থ করতে পত্তন করলেন নতুন নগর, তৈরি করলেন নগর ঘিরে দুর্ভেদ্য প্রাচীর এবং প্রাচীর দ্বারে দুর্জয় দুর্গ। একদিকে ক্ষুদ্র পর্বত আর একদিকে প্রাচীর বেষ্টীত নগরী মাঝখানে খনিত হলো বিশাল জলাশয়। সংবৎসরের পানীয় সম্পর্কে নিশ্চিত আশা থাকতো প্রজাপুঞ্জের।

ফকির সুলতান সংঘর্ষ ঘটালো এই নগর নির্মাণ, কিংবা আরও সঠিকভাবে বললে বলতে হয় নগর প্রাচীর নির্মাণ উপলক্ষ করেই। নিজামউদ্দিন আউলিয়ার দিঘি কাটাতে মজুর চাই প্রচুর। গিয়াসুদ্দীনের নগর তৈরী করতেও মজুর আবশ্যক সহস্র সহস্র। অথচ দিলস্নীতে মজুরের সংখ্যা অত্যন্ত পরিমিত, দুজায়গায় প্রয়োজন মেটানো অসম্ভব। অত্যন্ত স্বাভাবিক যে, বাদশাহ চাইলেন মজুরেরা আগে শেষ করবে তার কাজ, ততক্ষণ অপেক্ষ করুক ফকিরের খয়রাতি খনন। কিন্তু রাজার জোর অর্থের, সেটা পরিমাপ করা যায়। ফকিরের জোর হূদয়ের, তার সীমা শেষ নেই। মজুরেরা বিনা মজুরিতে দলে দলে কাটতে লাগলো নিজামুদ্দিনের দিঘি। সুলতান হুঙ্কার ছেড়ে বললেন, 'তবে রে'। কিন্তু তার ধ্বনি আকাশে মিলাবার আগেই এত্তালা এলো আশু কর্তব্যের। বাংলাদেশ বিদ্রোহ দমন করতে ছুটতে হলো সৈন্যসামন্ত নিয়ে।

শাহজাদা মুহম্মদ তোগলক রইলেন রাজধানীতে রাজ প্রতিভুরূপে। তিনি নিজামুদ্দিনের অনুরাগীদের অন্যতম। তার আনুকূল্যে দিবারাত্রি খননের ফলে পরহিতব্রতী সন্যাসীর জলাশয় জলে পূর্ণ হলো অনতিবিলম্বে। তোগলকদের নগর রইলো অসমাপ্ত। অবশেষে সুলতানের ফিরবার সময় হলো নিকটবতর্ী। প্রমাদ গণনা করল নিজামুদ্দিনের অনুরাগীরা। তারা ফকিরকে অবিলম্বে নগরত্যাগ করে পলায়নের পরামর্শ দিলো। ফকির মৃদুহাস্যে তাদের নিরস্ত করলেন, 'দিলস্নী দূর অস্ত' দিলস্নী অনেক দূরে। প্রত্যহ যোজন পথ অত্রিক্রম করছেন সুলতান। নিকট হতে নিকটতম হচ্ছেন রাজধানীর পথে। প্রত্যহ ভক্তেরা অনুনয় করে ফকিরকে। প্রত্যহ একই উত্তর দেন নিজামউদ্দিন 'দিলস্নী দূর অস্ত'।

সুলতানের নগর প্রবেশ হলো আসন্ন, আর মাত্র একদিনের পথ অতিক্রমণের অপেক্ষা। ব্যাকুল হয়ে শিষ্য-প্রশিষ্যেরা অনুনয় করলো সন্ন্যাসীকে, 'এখনও সময় আছে, এইবেলা পালান'। গিয়াসুদ্দিনের ক্রোধ এবং নিষ্ঠুরতা অবিদিত ছিলো না কারো কাছে। ফকিরকে হাতে পেলে তাঁর কী দশা হবে সেকথা কল্পনা করে তারা ভয়ে শিউরে উঠলো বারংবার। স্মিতহাস্যে সেদিনও উত্তর করলেন বিগত ভয়, সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী, 'দিলস্নী হনুজ দূর অস্ত'। 'দিলস্নী এখনও অনেক দূর' বলে হাতে জপের মালা ঘোরাতে লাগলেন নিশ্চিত ঔদাসীন্যে।

নগরপ্রান্তে পিতার অভ্যর্থনার জন্য মুহম্মদ তৈরী করেছেন মহার্ঘ মণ্ডপ। কিংখাবের শামিয়ানা। জরিতে জহরতে ঝলমল। বাদ্য-ভাণ্ড, লোক-লস্কর, আমীর-ওমরাহ মিলে সমারোহের চরমতম আয়োজন। বিশাল ভোজের ব্যবস্থা। ভোজের পরে হস্তিযূথের প্রদর্শনী প্যারেড।

মণ্ডপের কেন্দ্র ভূমিতে ঈষৎ উন্নতভূমিতে বাদশাহের আসন। তার পাশেই তার উত্তরাধিকারীর। পরদিন গোধূলি বেলায় সুলতান প্রবেশ করলেন অভ্যর্থনা মণ্ডপে। প্রবল আনন্দোচ্ছ্বাসের মধ্যে আসন গ্রহণ করলেন। সিংহাসনের পাশে বসালেন নিজ প্রিয়তম পুত্রকে। কিন্তু সে মুহম্মদ নয়, তার অনুজ।

ভোজনান্তে অতিবিনয়াবনত কণ্ঠে মুহম্মদ অনুমতি প্রার্থনা করেন সম্রাটের কাছে: জাহাপনার হুকুম হলে এবার হাতির কুচকাওয়াজ শুরু হয়, হস্তীযূথ নিয়ন্ত্রণ করবেন তিনি নিজে। গিয়াসুদ্দিন অনুমোদন করলেন স্মিতহাস্যে। মুহম্মদ মণ্ডপ থেকে নিষ্ক্রান্ত হলো ধীর শান্ত পদক্ষেপে।

কড়্ কড়্ কড়র কড়াৎ।

একটি হাতির শিরসঞ্চালনে স্থানচু্যত হলো একটি স্তম্ভ। মুহূর্তের মধ্যে সশব্দে ভূপাতিত হলো সমগ্র মণ্ডপটি। চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো অসংখ্য কাঠের থাম। চাপাপড়া মানুষের আর্তকণ্ঠে বিদীর্ণ হলো অন্ধকার রাত্রির আকাশ। ধুলোয় আচ্ছন্ন হলো দৃষ্টি। ভীত সচকিত ইতস্তত ধাবমান হস্তীযূথের গুরুভার পদতলে নিষ্পিষ্ট হলো অগণিত হতভাগ্যের দল। এবং বিভ্রান্তকর বিশৃঙ্খলার মধ্যে উদ্ধারকমর্ীরা ব্যর্থ অনুসন্ধান করলো বাদশাহের।

পরদিন প্রাতে মণ্ডপের ভগ্নস্তূপ সরিয়ে আবিষ্কৃত হলো বৃদ্ধ সুলতানের মৃতদেহ। যে প্রিয়তম পুত্রকে তিনি উত্তরাধিকারী মনোনীত করেছিলেন মনে মনে তার প্রাণহীন দেহের উপরে সুলতানের দু বাহু প্রসারিত। বোধ করি আপন দেহের বর্মে রক্ষা করতে চেয়েছিলেন তার স্নেহাস্পদকে।

সমস্ত ঐহিক ঐশ্বর্য প্রতাপ মহিমা নিয়ে সপুত্র গিয়াসুদ্দিনের শোচনীয় জীবনান্ত ঘটলো নগরপ্রান্তে। দিলস্নী রইলো চিরকালের জন্য তার জীবিত পদক্ষেপের অতীত। দিলস্নী দূর অস্ত। দিলস্নী অনেক দূর।

নিজামুদ্দিনের দরগায় প্রবেশ করে আজও প্রথমেই চোখে পড়ে আউলিয়া খনিত পুকুরটি। তার পাশে দিয়ে এক প্রশস্ত চত্বর যার মাঝখানে সমাধিস্থ হয়েছে তাঁর দেহ। সমাধির উপরে ও আশেপাশে রচিত হয়েছে সুদৃশ্য ভবন ও অলিন্দ। উত্তরকালের সম্রাট শাজাহান সমাধির চারিদিক ঘিরে তৈরী করেছেন সমাধির শ্বেতপাথরের খিলান; প্রাঙ্গণ বেষ্টিত করেছেন সূক্ষ্ম কারুকার্য খচিত জালিকাটা পাথরের দেয়ালে। দ্বিতীয় আকবর রচনা করেছেন সমাধির উপরস্থ গম্বুজ। ফকিরের পুণ্যনামের সঙ্গে আপনাকে যুক্ত করে নিজেকে তারা ধন্যজ্ঞান করেছেন।

গিয়াসুদ্দিনের রাজধানী তোগলকাবাদ আজ বিরাট ধ্বংসস্তূপে পরিণত। বিবিসিআই রেলওয়ের লাইন গেছে তার উপর দিয়ে। একমাত্র প্রত্নতাত্তি্বকের গবেষণার এবং টু্যরিস্টদের দ্রষ্টব্য হিসেবে আজ তার গুরুত্ব। নিজামুদ্দিনের দরগায় আজও মেলা বসে প্রতিবছর। দূরদূরান্ত থেকে পুণ্যকামীরা আসে দর্শনাকাঙ্ক্ষায়। সেদিনের রাজধানী তার অভ্রভেদী অহঙ্কার নিয়ে বহুদিন আগে মিশেছে ধুলোয়। দীন সন্ন্যাসীর মহিমা পুরুষানুক্রমে ভক্তজনের সশ্রদ্ধ অন্তরের মধ্যে দিয়ে রয়েছে অমস্নান। যার আকর্ষণ দূরকালে প্রসারিত।

দুনিয়ার রাজা-বাদশারা আধ্যাত্মজগতের মহাপুরুষ-শাহেনশাহ্দের কাছে কত না দুর্বল আর তুচ্ছ তা এ দৃষ্টান্ত থেকে সহজে অনুমান করা যায়। হ্যা, তোগলোকি রাজাদের মতো আমরা যারা বৈষয়িক বৈভবের আকর্ষণ আর আমিত্বের অহঙ্কারে অন্ধ তাদের পক্ষে লালন শাহের মতো মহাপুরুষকে চেনা-জানা 'দূর অস্ত'ঃ'হনুজ দূর অস্ত"।


আবদেল মাননান
২৬ নভেম্বর ২০১০ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লালন বিশ্বসংঘ আয়োজিত সেমিনারে পঠিত মূল প্রবন্ধ।

শিক্ষা:শিক্ষায় নৈতিকতা by ড. আবুল হাসান মুহাম্মদ সাদেক

Tuesday, January 11, 2011

শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। উন্নয়নের সোপান। কিন্তু শিক্ষা মানে কি? শিক্ষার সংজ্ঞায়নে বেশ ভুল বুঝাবুঝি আছে। অনেক সময় আমরা শিক্ষার প্রকৃত অর্থ বুঝি না। কখনো যা বুঝি, তা ভুল করে বুঝি। এই ভুল বুঝার কারণে কোন কোন দেশে শিক্ষার হার বেশি মনে করি।

কিন্তু সে তথাকথিত শিক্ষা জাতীয় ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে না। সুতরাং শিক্ষার সঠিক সংজ্ঞায়ন প্রয়োজন। গোড়ার কথা হলো, শিক্ষা ও সাক্ষরতা সমার্থক নয়। সাক্ষরতা দ্বারা পেশাগত জ্ঞান বুঝায়। আর শিক্ষা হলো পেশাগত দক্ষতার সাথে এমন গুণাবলীর সমন্বয়, যা মানুষকে প্রকৃত মানুষ বানায়। এ অর্থে শিক্ষা হলো মানবীয় গুণাবলী সমন্বিত জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও পেশাগত দক্ষতা। মানবীয় গুণাবলীর মধ্যে নৈতিকতা হলো সবচেয়ে প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ গুণ। এই নৈতিকতার অভাবে অনেক সম্ভাবনাময় দেশও পেছনে পড়ে আছে।

নৈতিকতা বিবর্জিত শিক্ষা থেকে অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষাহীনতা উত্তম। কারণ, পেশাগত দক্ষতা মানুষকে দক্ষ করে তোলে, যার ফলে একজন মানুষ নিজের এবং দেশ ও জাতির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। আবার কেউ যদি দুর্নীতির মাধ্যমে জাতির সর্বনাশ করে নিজ সম্রাজ্য কায়েম করতে চায়, তাও সে দক্ষতার সাথে করতে পারে। একজন অদক্ষ ও মূর্খ চোর দ্বারা বড় চুরি সম্ভব নয়। একজন দক্ষ ও পেশাগত জ্ঞানসম্পন্ন মানুষই বড় ধরনের দুর্নীতি করতে পারে। যে কোন দেশের দুর্নীতিবাজদের তালিকা পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে, তাতে মূর্খ মানুষের সংখ্যা হবে অত্যন্ত নগণ্য, আর তথাকথিত শিক্ষিতদের সংখ্যাই হবে অধিক।

এ সমস্যা থেকে উত্তরণের উপায় কি? এ সমস্যার সমাধান শিক্ষা বন্ধ করা নয়, বরং শিক্ষার সংস্কার। শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও মানবীয় গুণাবলীর সমন্বয় প্রয়োজন। আসলে শিক্ষা হলো একটা ব্যাপক পরিভাষা। কোন বিষয়ের জ্ঞানকে সে বিষয়ে পেশাগত জ্ঞান বলা যায়। যখন এর সাথে নৈতিকতা ও প্রয়োজনীয় মানবীয় গুণাবলীর সমন্বয় হয়, তখনই তাকে শিক্ষা বলা যায়।

কিছুদিন আগে কাতারে এক আন্তর্জাতিক সম্মেলন হয়। এতে পৃথিবীর নানা দেশ থেকে শিক্ষাবিদ, বিশেষজ্ঞ ও নীতি নির্ধারক ব্যক্তিত্বগণ উপস্থিত ছিলেন। বিশেষ করে অংশগ্রহণকারী নির্বাচনে সকল ধর্মের প্রতিনিধিত্বের উপর গুরুত্ব দেয়া হয়। কাজেই সেখানে সকল প্রধান প্রধান ধর্মের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাবিদ, শিক্ষানুরাগী ও নীতি নির্ধারকগণ উপস্থিত ছিলেন। যেমন ইসলাম ধর্ম, হিন্দু ধর্ম, খ্রীষ্টান ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্ম ও ইহুদী ধর্মের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বগণ উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশ থেকে সে সম্মেলনে আমার অংশগ্রহণের সৌভাগ্য হয়েছে। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে মতানৈক্য থাকলেও একটি বিষয়ে সবাই ঐক্যমত পোষণ করেছেন। তা হলো এই যে, শিক্ষা ব্যবস্থার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সর্বপর্যায়ে নৈতিকতার সমন্বয় প্রয়োজন। এছাড়া কোন সমাজ ও জাতি কাঙ্ক্ষিত মানের উন্নয়ন সম্ভব নয়। দুর্নীতির কারণে শত চেষ্টা সত্ত্বেও উন্নয়ন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়। এছাড়া আরেকটি বিষয়ে ঐক্যমত স্থাপিত হয়েছে। তা হলো, যে জাতির মানুষ যে ধর্মে বিশ্বাসী তাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় সে ধর্মভিত্তিক নৈকিতার শিক্ষার সমন্বয় বাঞ্ছনীয়। কারণ, নৈতিকতার সাথে ধর্মীয় ভাবধারার জবাবদিহির বিশ্বাস অন্তভর্ুক্ত হলে সে নৈতিকতার কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায়।

'তলস্তয়' গল্প এবং অন্যান্য প্রসঙ্গ by নূরুল ইসলাম নূরুচান

লস্তয় গল্প প্রসঙ্গে কিছু বলব। তবে এর আগে অন্যান্য প্রসঙ্গ নিয়ে কিছু কথা বলে নিই। গুণবিচারি সম্পাদক শামীম রেজার সম্পাদনায় শিলালিপি শুরু থেকে এ পর্যন্ত নব নব বিষয় নিয়ে আবির্ভূত হচ্ছে তার পাঠকদের সামনে। শিলালিপির নতুন যে কয়টি বিষয় পাঠক হিসেবে আমার ভালো লাগে তা হলো পাঠ প্রতিক্রিয়া, যা পড়ছি যা লিখছি এবং যেভাবে লেখা হলো।

শিলালিপির আগে আর কোনো সাহিত্য সাময়িকী এ ধরনের বিভাগ চালু এবং বিষয়ভিত্তিক সংখ্যা করেছে বলে আমার জানা নেই।
কালের কণ্ঠের সাহিত্য সাময়িকী শিলালিপির ৪৪তম সংখ্যা (২৬ নভেম্বর ২০১০) 'বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক', লেখকদের ঈশ্বর তলস্তয়-এর মৃত্যু-শতবর্ষের শ্রদ্ধা নিবেদন আয়োজনটি আমাদের মুগ্ধ করেছে। প্রধান কবি বেলাল চৌধুরীর 'তলস্তয় : মৃত্যু শতবর্ষের শ্রদ্ধাঞ্জলি', দেবেশ রায়ের 'তলস্তয়ের হৃদয়সংবেদী ডায়েরি' এবং কায়সার আহমেদ দুলালের লেখা 'কবি সুফিয়া কমালের অপ্রকাশিত কবিতা' অনন্য সংযোজন। এদিকে আন্দালিব রাশদী লেখকদের ঈশ্বর তলস্তয়কে নিয়ে 'তলস্তয়' শিরোনামের একটি গল্প (!) লিখে মহান দায়িত্বটি পালন করেছেন? আমরা জানি, একজন লেখকের সৃষ্টি এবং তাঁর জীবনস্মৃতি নিয়ে প্রবন্ধ-নিবন্ধ লেখা যায়; কিন্তু লেখককে নিয়ে গল্প লেখা যায়_এটা অজানাই ছিল। আন্দালিব রাশদীর গল্পটি পড়ে মনে হয়েছে, তলস্তয়ের লেখা একান্ত ব্যক্তিগত ডায়েরিটি তাঁর মৃত্যুর শতবর্ষ পর গল্প লেখকের (আন্দালিব রাশদী) হাতে এসে পড়েছে তাঁর সৌভাগ্যের কারণে (!)। গল্প পড়ে আবার এও মনে হয়েছে, 'লেখকদের ঈশ্বর' তলস্তয়ের নৈতিক চরিত্র হননের মাধ্যমে পুরো লেখকগোষ্ঠীকে বারবনিতাপাড়ায় যাওয়া বা বেদেনিদের কাছে যাওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে, যাতে লেখকরা নোংরা যৌন অভিজ্ঞতার কথা তাঁদের গল্প-উপন্যাসে লিখতে পারেন (!)। দেওয়ান আতিকুর রহমানের চমৎকার অলংকরণে 'তলস্তয়' গল্পটির বারবনিতা চন্দ্র বানুর প্রশ্নোত্তরে গল্পের প্রধান চরিত্র জানায়, তাঁর নাম 'লেভ তলস্তয় এবং মানবধর্ম।' চন্দ্র বানু বলে, '...সব ধর্মের মানুষই এই কাম করে। আমার কাছে আসে।' 'মানবধর্ম' বলে এখানে লেখক আন্দলিব রাশদী মানুষকে সব ধর্মের ঊধর্ে্ব তোলার চেষ্টা করেছেন, যা ধ্রুব সত্য। যা হোক, 'তলস্তয়' গল্পটি একটি গাঁজাখোরি গল্প বলেই আমার মনে হয়েছে। এবং এও মনে হয়েছে যে ওই গল্পের মাধ্যমে আন্দলিব রাশদী পুরো লেখকগোষ্ঠীকে হেয়প্রতিপন্ন করেছেন, যা আদৌ যুক্তিযুক্ত হয়নি।

নূরুল ইসলাম নূরুচান
সাধারচর
শিবপুর, নরসিংদী
 
Support : Dhumketo ধূমকেতু | NewsCtg.Com | KUTUBDIA @ কুতুবদিয়া | eBlog
Copyright © 2013. News 2 Blog 24 - All Rights Reserved
Template Created by Nejam Kutubi Published by Darianagar Publications
Proudly powered by Dhumketo ধূমকেতু