ঢাবি শিক্ষক রুমানার ওপর যেভাবে চালানো হয় নির্যাতন

Monday, June 13, 2011

ঢাবি শিক্ষক রুমানা মঞ্জুর কম্পিউটারে কাজ করছিলেন। এ সময় তার স্বামী সাঈদ হাসান রুমে ঢুকেই দরজা লাগিয়ে দেন। রুমানা কিছু বুঝে ওঠার আগেই সাঈদ তার মাথায় লাঠি দিয়ে আঘাত করেন। সঙ্গে সঙ্গে রুমানা পড়ে যান। এরপর সাঈদ তার গলা চেপে ধরেন। তার দু’চোখ আঙুল দিয়ে খুঁচিয়ে নষ্ট করে দেন। তাদের সন্তান আনুষার সামনেই ঘটে এ ঘটনা। আনুষা এ সময় মাকে নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচাতে কান্নাকাটি করেন।

রুমানা ও আনুষার চিৎকারে কাজের মেয়েসহ অন্যরা বাইরে থেকে দরজা খুলে তাকে রক্ষা করেন। ল্যাবএইড হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করান স্বজনরা। আর সেখানে বর্তমানে আশঙ্কাজনক অবস্থায় রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রুমানা মঞ্জুর। হাসপাতাল ও পারিবারিক সূত্র জানায়, রুমানার দু’টি চোখেই ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে। একটি চোখ নষ্ট হয়ে গেছে। অপরটিও নষ্টের পথে। মাথা ও সারা শরীরে আঘাতের চিহ্ন। ডাক্তাররা আপ্রাণ চেষ্টা করছেন অন্তত চোখ রক্ষা করতে। প্রয়োজনে তাকে বিদেশে চিকিৎসার জন্য বলা হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে। শনিবার রুমানার পিতা মেজর (অব.) মঞ্জুর হোসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিনের কাছে তার মেয়ের ওপর বর্বরোচিত অত্যাচারের বর্ণনা করেছেন। রুমানা এর আগে ২রা জুনও নির্যাতনের শিকার হন। সে সময় রুমানার পিতা মেজর (অব.) মঞ্জুর হোসেন মেয়ের শরীরে আঘাতের চিহ্ন দেখে কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি নির্যাতনের কথা জানান। বিষয়টি জানতে পেরে ঘরজামাই হাসান সাঈদকে তার বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেন এবং তার মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক না রাখার কথা বলেন। এরপর হাসান সাঈদ তার ভাইয়ের বাসা ১০, পরীবাগের ইস্টার্ন কটেজের (ফ্ল্যাট নম্বর ৬০৩) বাসায় চলে যান। সেখানে সাঈদ ঘুমের বড়ি খেয়ে অচেতন হয়ে পড়লে তাকে ল্যাবএইড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সুস্থ হয়ে তিনি ফের শ্বশুরের বাসায় যান। সেদিন ছিল ৫ই জুন। এরপর ঘটে এক নৃশংস নির্যাতনের ঘটনা। ল্যাবএইড হাসপাতালে গিয়ে কথা হয় রুমানার পিতা মেজর (অব.) মঞ্জুর হোসেনের সঙ্গে। তিনি জানান, তার মেয়ের অবস্থা আশঙ্কামুক্ত নয়। ডাক্তাররা আপ্রাণ চেষ্টা করছেন তাকে সুস্থ করতে। তার সারা শরীরের আঘাতের চিহ্ন। তিনি বলেন, এখনই বিস্তারিত বলতে চাইছি না। পরে বিস্তারিত জানানো হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, রুমানা ২০১০ সালের ১লা আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এক বছরের শিক্ষা ছুটি নেন। তিনি কানাডার ইউনিভার্সিটি অব বৃটিশ কলম্বিয়ায় মাস্টার্স করার জন্য এ ছুটি নেন। চলতি বছরের ১লা আগস্ট তার শিক্ষা ছুটি শেষ হওয়ার কথা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নেয়া ছুটির আবেদনে লেখা আছে একটি সেমিনারে অংশ নিতে তার আগামীকাল তার ভারতে যাওয়ার কথা ছিল। তার স্বামী সাঈদ হোসেন রুমানার বিদেশ যাওয়ার ঘোর বিরোধী ছিলেন। রুমানা দেশে আসার পর থেকে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে এ নিয়ে প্রায়ই ঝগড়া হতো। এক বছর ছুটি শেষে তার ফের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে যোগদানের কথা ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমদ বলেন, কি কারণে রুমানার ওপর এ ধরনের নির্যাতন হলো তার সঠিক কারণ জানা যায়নি। তিনি বলেন, রুমানা শিক্ষক হিসেবে অত্যন্ত ভদ্র। তিনি চাপা স্বভাবের মেয়ে। অধ্যাপক ফরিদ বলেন, তার পরিবারের পক্ষ থেকে যে কোন ধরনের সাহায্য চাওয়া হলে তা করা হবে। আমি বিষয়টি তার পিতাকে বলেছি। তার পিতা মেয়ের ওপর নির্যাতনের ঘটনা আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন। রুমানার স্বামী সাঈদ হোসেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে পড়ালেখা করেছেন। তিনি বর্তমানে বেকার। থাকেন শ্বশুর বাড়িতেই। রুমানা ১২ই মে কানাডা থেকে দেশে আসে। একটি অসমর্থিত সূত্র জানায়, স্বামী বেকার আর স্ত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এ নিয়ে তাদের পারিবারিক কলহ লেগেই থাকত। এছাড়া রুমানা কানাডা যাওয়ার পর থেকে সাঈদ হোসেন তাকে সন্দেহের চোখে দেখতেন। এ সন্দেহ থেকেও বর্বরোচিত ঘটনা ঘটতে পারে এমনটাও আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। রুমানার গ্রামের বাড়ি মাগুরা জেলার শালিখা থানার গজদুর্বা গ্রামে। তিনি ঢাকাতেই পড়ালেখা করেছেন।
ধানমন্ডি ১০ নম্বর রোডের ৩/১ নম্বর বাসার (টাইহাট ভবন) ৪ তলার সি/১ নম্বর ফ্ল্যাটটি ভাড়া নিয়েছেন রুমানার পিতা মঞ্জুর হোসেন। রুমানা তার স্বামী হাসান সাঈদকে নিয়ে এ বাসাতেই থাকতেন। একই বাসায় থাকতেন রুমানার বাবা-মা। ঘটনার দিন রুমানার মা ছিলেন গ্রামের বাড়িতে। পিতা ছিলেন বাসার বাইরে। বাসায় ছিলেন রুমানা, ৫ বছর বয়সী তাদের একমাত্র কন্যা শিশু আনুষা এবং ৩ গৃহপরিচারিকা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হাসান সাঈদ ছিলেন অটোরিকশা ‘মিশুক’ ব্যবসায়ী। ৪-৫টি গাড়ি ছিল তার। বছর দেড়েক আগে সব ক’টি গাড়ি বিক্রি করে টাকা বিনিয়োগ করেন শেয়ার ব্যবসায়। শেয়ার ব্যবসায় লোকসানে পড়ে তিনি বেশ কিছুদিন ধরে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন, তার চোখেও রয়েছে সমস্যা। চশমা ছাড়া তিনি কিছু দেখেন না।
মঞ্জুর হোসেনের এক ছেলে এবং এক মেয়ে। রুমানাই বড়। তার ভাই দেশের বাইরে থাকেন। তাই হাসান সাঈদকে ঘরজামাই রাখেন তিনি। নির্যাতন শুরুর আগে রুমের ভেতর থেকে লক করে দেয়া হয়েছিল। ছোট্ট ফুটফুটে শিশুর সামনেই নির্মম নির্যাতন চালানো হয় রুমানার ওপর। শিশুটি তার মাকে নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা করতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়েছে। অনেক অনুনয়, বিনয়, কান্নাকাটি, চিৎকার চেঁচামেচি করেছে আনুষা। কোন কিছুতেই পিতার হৃদয় গলাতে পারেনি ওই শিশু। রুমানার নাকের বাম পাশের অংশ কামড়িয়ে ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। নাখ, মুখ, কানসহ শরীরের অনেক জায়গায় মাংস ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। রুমানাকে বাসার নিচে নামানোর পর যারা তাকে দেখেছে তাদের একজন বলেন, রুমানা ম্যাডামের অবস্থা দেখে আমি হতবাক হয়ে গিয়েছি। তার চোখ, মুখ, গাল, নাখ এবং কপাল বেয়ে অঝোরে রক্ত ঝরছিল।
গতকাল টাইহাট ভবনে গেলে রুমানার পরিবারের পক্ষ থেকে কেউ-ই বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি। সূত্র জানায়, রুমানা এবং তার মেয়ের আর্তচিৎকারে কাজের মহিলারা বাইরে থেকে রুমটি খোলে। রুম খোলার সঙ্গে সঙ্গেই হাসান সাঈদ পালানোর চেষ্টা করে। কাজের মহিলারা তাকে জাপটে ধরে। তিনি ঝাঁকি দিয়ে কাজের মহিলাদের সরিয়ে দিয়ে বলেন, আমি যাচ্ছি। আপনারা রুমানাকে দেখেন। বিকাল ৫টার দিকে বাসা থেকে চলে গিয়ে সন্ধ্যার দিকে হাসান সাইদ আবার বাসায় আসেন। মঞ্জুর হোসেনের নিষেধাজ্ঞার কারণে তাকে বাসায় প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। পরে তিনি বাসার ছাদ থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা চালান। পরে তার ভাই এসে তাকে অনেক বুঝিয়ে ছাদ থেকে নামান। এরপর থেকে সাঈদ পলাতক। তবে তিনি বিষয়টির নিষ্পত্তির জন্য মঞ্জুর হোসেনকে ফোন করাচ্ছেন বলে সূত্র জানায়। মঞ্জুর হোসেন বলেছেন, রুমানার শারীরিক অবস্থা খুবই গুরুতর। আমার মানসিক অবস্থাও খুব খারাপ। দোয়া করুন যাতে রুমানা সুস্থ হয়। রুমানা সুস্থ হলে অনেক কথা আপনাদের বলা হবে।
রুমানা মঞ্জুর ১৯৯৩ সালে রাজধানীর আজিমপুরের অগ্রণী স্কুল থেকে স্টার মার্ক নিয়ে এসএসসি ও ১৯৯৩ সালে ভিকারুন নূন নিসা স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে স্টার মার্ক নিয়ে এইচএসসি পাস করেন। এরপর ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে। ২০০২ সালে বিভাগ থেকে সেকেন্ড ক্লাস ফার্স্ট হয়ে অনার্স ও ২০০৪ সালে মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অর্জন করেন। ২০০৪ সালের ৩রা জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। ২০০৯ সালে ২৫শে অক্টোবর সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পান। বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগদানপত্রে তিনি বিবাহিত উল্লেখ করেছেন। স্বামীর নাম লিখেছেন মোঃ হাসান সাঈদ। তাদের একটি কন্যা সন্তান রয়েছে। রুমানার আহত হওয়ার খবর শুনে শনিবার রাতেই ল্যাবএইড হাসপাতালে ছুটে যান জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান। তিনি রুমানার পিতার সঙ্গে কথা বলে একটি অভিযোগ মানবাধিকার কমিশনে দেয়ার অনুরোধ করেন। অধ্যাপক মিজানুর রহমান মানবজমিনকে বলেন, এটি অত্যন্ত বর্বরোচিত ঘটনা। আমাদের সমাজে এ ধরনের ঘটনা ঘটেই চলেছে। তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকও আজ নিরাপদ নন। আমি তার ওপর নির্যাতনের ঘটনা শুনে বিস্মিত হয়েছি। এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার হওয়া উচিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহায়তা করা হবে। ভিসি বলেন, আমরা কোন জগতে বাস করছি একটি ঘটনাই তার প্রমাণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের ওপর যে ধরনের নির্যাতন করা হয়েছে তা না দেখে বিশ্বাস করা যাবে না। আমরা এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই। এদিকে রুমানা মঞ্জুরের পিতা মেজর (অব.) মঞ্জুর হোসেন বাদী হয়ে ধানমন্ডি থানায় একটি মামলা করেন। মামলা নম্বর ৫। মামলাটির তদন্ত করছেন এসআই মকবুল হোসেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মকবুল হোসেন বলেন, ঘটনার পর থেকেই সাঈদ পলাতক। তাকে গ্রেপ্তারের জন্য আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ছাত্র মেহেদী হাসান বলেন, রুমানা ম্যাডাম অত্যন্ত ভদ্র । তিনি ছাত্রদের প্রচণ্ড ভালবাসেন। আমরা তার সুস্থতা কামনা করি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. কে এম সাইফুল ইসলাম খান বলেন, আমরা বিষয়টি জানতে পেরেছি। তার পিতা একটি মামলা করেছেন। আমাদের পক্ষ থেকে সহায়তা চাওয়া হলে সব ধরনের সহায়তা করা হবে।
টাইহাট ভবন পরিচালনা পরিষদ সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান খান জানান, ৫ই জুন বিকালে কান্নাকাটি এবং চিৎকার চেঁচামেচি শুনে আমি রোমানার বাসায় যাই। দেখি, কাজের বুয়ারা রুমানার রক্তাক্ত শরীর জড়িয়ে ধরে আছে। সঙ্গে সঙ্গেই রুমানার বাবাকে ফোন করি। কালবিলম্ব না করে আমার গাড়ি দিয়েই ল্যাব এইড হাসপাতালে ভর্তি করি। তার বাবা আমার পুরনো বন্ধু। আমি মিডিয়ায় বিষয়টি জানাতে চেয়েছিলাম। তার বাবা আমাকে জানাতে দেয়নি। এ রকম লোমহর্ষক ঘটনা আমি নিজ দায়িত্বে মিডিয়াকে জানাবো কি জানাবো না তা নিয়ে ছিলাম দোদুল্যমানতায়। এ দোদুল্যমানতায় আমি প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়ি। তিনি জানান, এত নম্র-ভদ্র এবং ব্রিলিয়ান্ট মেয়ে আমি খুব একটা দেখি না। ৬-৭ বছর ধরে রুমানা এ বাসায় থাকেন। তার জীবনে এ রকম দুর্বিষহ যন্ত্রণা নেমে আসবে- কল্পনা করতে পারিনি। তিনি জানান, অনেকদিন ধরেই আমার একটি প্রশ্ন ছিল, বুয়েট থেকে পাস করা রুমানার স্বামী সাঈদ কেন ঘর জামাই থাকেন? কেন তিনি কোন চাকরি করেন না?  শাহজাহান খান জানান, এক সময় তার কয়েকটি মিশুক গাড়ি থাকলেও এখন আর নেই।

দুই ময়নাতদন্তের অমিল খতিয়ে দেখার নির্দেশ

Thursday, February 10, 2011

রীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার চামটা গ্রামের কিশোরী হেনার মৃতদেহের দুটি ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের অমিল খতিয়ে দেখার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। এ জন্য একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠন করতে স্বাস্থ্যসচিব ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আদালত কমিটিকে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের দায়িত্বে অবহেলা ও গাফিলতি রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখে ভবিষ্যতে ময়নাতদন্তের ক্ষেত্রে ভুল এড়াতে সুপারিশসহ ৩০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলেছেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী ও শেখ মো. জাকির হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। আর যাতে এ ধরনের ঘটনা না ঘটে, সে জন্য ব্যক্তিগত পর্যায়ে পুলিশের মহাপরিদর্শককে নজরদারি রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া হেনার পরিবারের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শরীয়তপুরের পুলিশ সুপার ও নড়িয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
আদালতের নির্দেশে গতকাল হাইকোর্টে হাজির হন হেনার বাবা দরবেশ খাঁ ও খালাতো বোন মিনু বেগম। হাজির হন শরীয়তপুরের সিভিল সার্জন গোলাম সারোয়ার, সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা নির্মল চন্দ্র দাস, চিকিৎসা কর্মকর্তা রাজেশ মজুমদার, গাইনি বিশেষজ্ঞ হোসনে আরা, চিকিৎসক সুলতান আহমেদ, নড়িয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবুল খায়ের, উপপরিদর্শক মো. আসলাম উদ্দিন ও সালিস বৈঠকে নেতৃত্ব দেওয়া ইদ্রিস ফকির। আদালত তাঁদের জবানবন্দি গ্রহণের পর নির্দেশসহ আদেশ দেন।
শুনানিকালে আদালত বলেন, ফতোয়া একটি ফৌজদারি অপরাধ। দেশে ফতোয়া চলবে না। চিকিৎসকদের উদ্দেশে আদালত বলেন, ‘আপনারা একটা মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছেন।’ এ ধরনের ঘটনা অতীতেও ঘটেছে—এমন মন্তব্য করে আদালত বলেন, গ্রামে-গঞ্জে এ ধরনের মিথ্যা, ভুয়া পোস্টমর্টেম (ময়নাতদন্ত) রিপোর্ট দেওয়া হচ্ছে। আদালত উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের ওপর একটি মামলার বিচার নির্ভর করে। এ ধরনের ময়নাতদন্ত রিপোর্ট দাখিল করা হলে প্রকৃত আসামিরা পার পেয়ে যাবে, সাজা হবে না। আদালত বলেন, ‘আপনারা যে রিপোর্ট দাখিল করেছেন, তা পুরোপুরি মিথ্যা। পুনরায় ময়নাতদন্ত রিপোর্টের সঙ্গে শরীয়তপুরের চিকিৎসকদের রিপোর্টের ব্যবধান আকাশ আর জমিনের।’
আদালতের আদেশ: হেনার ঘটনায় যাঁরা ফতোয়া দিয়েছেন ও দোররা মেরেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে নতুন করে মামলা দায়ের এবং মামলার অন্য আসামিদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করতে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হেনার সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুতকারী নড়িয়ার উপপরিদর্শক আসলাম উদ্দিন ও এজাহার নথিভুক্তকারী পরিদর্শক (তদন্ত) মির্জা এ কে আজাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পুলিশের মহাপরিদর্শককে (আইজিপি) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে কী বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা আগামী ১৫ দিনের মধ্যে জানাতে বলা হয়।
এ ছাড়া উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটিতে ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ও হাসপাতালের পরিচালক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের প্রতিনিধিসহ আইন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন করে প্রতিনিধি রাখার কথা বলা হয়েছে। আর ফতোয়ার বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরি করতে ফতোয়া দেওয়া যে অপরাধ, তা তুলে ধরে প্রচার চালাতে তথ্য মন্ত্রণালয়কে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে মসজিদ, মাদ্রাসাসহ স্থানীয় পর্যায়ে ফতোয়াবিরোধী প্রচার চালানোর জন্য ব্যবস্থা নিতে ধর্ম ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে বলা হয়েছে।
আদালত ইদ্রিস ফকিরকে গ্রেপ্তারের তাৎক্ষণিক নির্দেশ দেন। পরে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
বক্তব্য উপস্থাপন: সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আদালতে হাজির হন। দুপুর সোয়া ১২টার দিকে শুনানি হয়। শুনানিতে নিজ নিজ অবস্থান ব্যাখ্যা করেন তাঁরা।
শুরুতে আদালত সিভিল সার্জনকে দ্বিতীয় দফায় করা ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পড়তে বলেন। গোলাম সারোয়ার আঘাতের চিহ্ন রয়েছে বলে উল্লেখ করলে আদালত বলেন, ‘আপনারা হেনার শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন দেখতে পাননি। কিন্তু ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে করা পুনঃ ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে একাধিক আঘাতের চিহ্ন উল্লেখ করা হয়েছে। এটা কীভাবে হলো? হেনার শরীরের আঘাতগুলো (ইনজুরি) কেন আপনারা শনাক্ত করতে পারলেন না?’
সিভিল সার্জন বলেন, দুটি টিমের ডাক্তারদের মধ্যে অভিজ্ঞতার তফাত রয়েছে।
এটা কি আপনার ব্যাখ্যা? হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার কত সময় পর হেনার মৃত্যু হয়েছে?
—২৫ জানুয়ারি হেনা হাসপাতালে ভর্তি হয়। ৩০ জানুয়ারি সকাল ১০টায় হাসপাতাল থেকে ছাড়া পায়। যখন ছাড়া পায়, তখন হেনা পুরোপুরি সুস্থ ছিল। কিন্তু হেনা মৃত্যুবরণ করে ৩১ তারিখ রাত নয়টায়। ফলে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার এবং মৃত্যুর মাঝে ব্যবধান ছিল ৪৮ ঘণ্টা। সিভিল সার্জন সময় ভুল বলায় তা শুধরে দিয়ে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এম কে রহমান বলেন, ৩৪ ঘণ্টা ব্যবধান ছিল।
আদালত সিভিল সার্জনের উদ্দেশে বলেন, তাহলে ভূত এসে মেয়েটিকে (হেনা) মেরে দিল? আদালত সিভিল সার্জনকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘আদালতের সঙ্গে প্রতারণার চেষ্টা করলে আপনাকে জেলে পাঠানো হবে। সত্য বললে অনুকম্পা পেতে পারেন।’ আদালত জানতে চান, কে কে ময়নাতদন্ত করেছেন?
সিভিল সার্জন অন্য তিন চিকিৎসকের নাম উল্লেখ করেন।
—আবাসিক চিকিৎসক (মেডিসিন) ও শিশু বিশেষজ্ঞ কি যোগ্য?
—জেলা পর্যায়ে তাঁরাই ময়নাতদন্ত করে থাকেন।
এ পর্যায়ে প্রথম ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনটি পড়তে বলেন আদালত।
—একটি আঘাতের চিহ্ন ছিল।
ঢাকায় করা দ্বিতীয় ময়নাতদন্তের রিপোর্টের সঙ্গে এর ভিন্নতা সম্পর্কে মতামত দেন।
—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
দুটি সত্য হতে পারে না। একটি সত্য হলে অন্যটি মিথ্যা হবে। শরীয়তপুরের প্রতিবেদনে ইনজুরি নেই, ঢাকার প্রতিবেদনে ইনজুরি আছে। কত দিন পেশায় আছেন?
—৩১ বছর।
আকাশ-জমিন পার্থক্য হলো কেন? মতামত দেন। সম্পূর্ণ অমিলের কারণ কী? সত্য বলেন। সত্য না বললে কাউকে ছাড়া হবে না।
সিভিল সার্জন চুপ করে থাকেন।
আদালত অপর চিকিৎসকের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বৈজ্ঞানিক সরঞ্জামের একটা বিষয় আছে।
মারা গেল কীভাবে?
—সুস্থ হওয়ার পর হাসপাতাল থেকে তাকে (হেনা) ৩০ জানুয়ারি ছাড়া হয়।
হাসপাতাল ত্যাগের সঙ্গে মারা যাওয়ার সময়ের ব্যবধান কত সময়?
—৪৮ ঘণ্টার মতো।
পৌনে একটার দিকে হেনার ঘটনা নিয়ে সংবাদপত্রের প্রতিবেদন আদালতের নজরে আনেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহ্বুবে আলম। তিনি বলেন, ‘বলা হয়েছে, দাগ না থাকলে আমরা কী করব—বলে সিভিল সার্জন মন্তব্য করেন কীভাবে!’ এ বিষয়ে আদালত সিভিল সার্জনকে বক্তব্য রাখতে বলেন। সিভিল সার্জন বলেন, ‘এটা আমি বলিনি।’ আদালত মন্তব্য করেন, সাংবাদিকেরা মিথ্যা, ভুল তথ্য দেন না। সাংবাদিকেরা যা বলেছেন, তা সত্য হয়েছে। আপনারা যা বলেছেন তা মিথ্যা, ভুল। আদালত জানতে চান, ৩৪ ঘণ্টার মধ্যে মৃত্যু কীভাবে হলো, এটা কি স্বাভাবিক? সিভিল সার্জন বলেন, এটা আনন্যাচারাল (অস্বাভাবিক)।
অপর চিকিৎসক হোসনে আরার কাছে প্রতিবেদনের অমিল সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, দুটিতে কোনো মিল নেই। আদালত জানতে চান, কার চাপে ছিলেন? হোসনে আরা বলেন, ‘আমি চিকিৎসায় ছিলাম না।’
সোয়া একটার দিকে আদালত হেনার বোন মিনু বেগমের বক্তব্য শুনতে চান।
আপনি কি হেনার সঙ্গে হাসপাতালে ছিলেন?
মিনু বলেন, ছয় দিন ছিলাম।
হাসপাতাল ছাড়ার সময় হেনা সুস্থ ছিল কি?
অল্প সুস্থ ছিল। ধরে ধরে নিয়ে যেতে হয়, হাঁটতে পারছিল না। বাড়িতে নেওয়ার পর বিছানায় পড়ে ছিল। রুহুল খান (আসামি মাহাবুবের বাবা) নাম কেটে (হাসপাতাল থেকে) দেওয়ার জন্য বলেছে। ডাক্তাররা ভালো করে চিকিৎসা করেনি।
ডাক্তারদের বলেছিলেন?
—সে পুরো সুস্থ হয়নি।
এরপর আদালত উপপরিদর্শক আসলামকে সুরতহাল প্রতিবেদন পাঠ করতে বলেন। আসলাম সুরতহাল প্রতিবেদন পাঠ করেন। আদালত বলেন, সিআরপিসির ১৭৪ ধারায় সুরতহাল প্রতিবেদনের কথা বলা রয়েছে। কিন্তু আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় কি বলা রয়েছে কার সঙ্গে প্রেম ছিল এটা সুরতহাল প্রতিবেদনে আসবে? মাহাবুবের সঙ্গে হেনার প্রেম ছিল, এটা সুরতহাল প্রতিবেদনে কেন লিখেছেন? লাশের শরীরে কোনো ইনজুরি আছে কি না, সেটা বের করার দায়িত্ব আপনার। আপনি তদন্ত না সুরতহাল প্রতিবেদন করতে গেছেন, সত্য কথা বলেন। আসলাম বলেন, মিথ্যা বলিনি। আদালত প্রশ্ন করেন, কাকে বাঁচানোর জন্য এটা করেছেন? তিনি নিশ্চুপ থাকেন।
এরপর আদালত স্থানীয় ইউপি মেম্বার ইদ্রিস ফকিরকে বক্তব্য দেওয়ার জন্য ডাকেন। আদালত বলেন, সংবাদপত্রে প্রতিবেদন বেরিয়েছে, আপনি এ মৃত্যুর ঘটনাটি টাকার মাধ্যমে আপসরফা করতে চেয়েছিলেন।
ইদ্রিস বলেন, ‘আমি হেনার চিকিৎসার জন্য তার পিতা দরবেশ খাঁকে ২০-৫০ হাজার টাকা দেওয়ার জন্য মাহাবুবের পিতাকে বলেছিলাম। কোনো আপসের প্রস্তাব দেইনি।’
এই পর্যায়ে আদালত হেনার পরিবারের সদস্যদের ডাকেন। হেনার পিতা দরবেশ খাঁ ইদ্রিস ফকিরকে দেখিয়ে বলেন, ‘তিনি হেনার মৃত্যুর ঘটনাটি সাড়ে তিন লাখ টাকায় আপসরফার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। আমি থানায় গিয়ে এজাহার দায়ের করেছি।’
আদালত বলেন, ‘আপনি কি নিজ হাতে এজাহার লিখেছেন?’
—আমি মুখে ঘটনা বলেছি, থানার লোক সেটা লিখেছে।
এজাহার আপনাকে পড়ে শোনানো হয়েছে?
—না। আমি লেখাপড়া না জানায় শুধু টিপসই দিয়েছি।
আদালত নড়িয়া থানার ওসির কাছে জানতে চান, দরবেশ খাঁকে কেন এজাহার পড়ে শোনানো হয়নি? এজাহারে ধর্ষণ-সম্পর্কিত কোনো তথ্যও নেই। ওসি বলেন, ‘আমি ওই দিন থানায় দায়িত্বে ছিলাম না। দায়িত্বে ছিলেন পরিদর্শক এ কে আজাদ। তবে ইদ্রিস ফকির সালিসে জড়িত ছিলেন।’
এ পর্যায়ে দরবেশ খাঁ বলেন, ‘আমি থানায় বলেছি আমার মেয়েকে ধর্ষণ করা হয়েছে। ওই মেম্বার (ইদ্রিস ফকির) বলে, মেয়েকে ১০১টা ও ছেলেকে ২০১টা মার। মারা যাওয়ার আগে মিটমাট করার কথা বলে মেম্বার টাকা দিতে চায় সাড়ে তিন লাখ।’
আদালত বলেন, ‘সাত লাখ টাকা মেম্বার আপনাকে দিতে চেয়েছেন না?’ দরবেশ বলেন, না, সাড়ে তিন লাখ।
এ পর্যায়ে আদালত ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে জানতে চান, সুরতহাল রিপোর্টে প্রেমের কাহিনি আইন অনুসারে আসে কি না?
—না।
কেন ইদ্রিসকে গ্রেপ্তার করা হয়নি?
—খুঁজে পাইনি। ঢাকায়ও চেষ্টা করা হয়েছে। এফআইআরে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন-সংক্রান্ত আইনের ৯ ধারা কেন উল্লেখ করা হয়নি?
—উনি (দরবেশ খাঁ) যা বলেছেন, তা লেখা হয়েছে।
উনি (দরবেশ) বলেছেন, তাঁকে পড়ে শোনানো হয়নি। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কে?
—প্রথমে আসলাম দেখেছেন। এখন এ কে আজাদকে তদন্ত কর্মকর্তার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এটা অনেকটা শিয়ালের কাছে মুরগি বর্গা দেওয়ার মতো। এরপর আদালত আদেশ দেন।
প্রসঙ্গত, ২ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলোতে ‘মেয়েটির জন্য কারও মায়া হলো না!’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই দিন প্রতিবেদনটি আদালতের নজরে আনেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সহসভাপতি সীমা জহুর। এর পরিপ্রেক্ষিতে আদালত স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আদেশ দেন। এরপর ৭ ফেব্রুয়ারি আদালত দোররা মারার পর নিহত শরীয়তপুরের হেনা আক্তারের লাশ তুলে পুনরায় ময়নাতদন্ত করতে নির্দেশ দেন। গত ৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে ময়নাতদন্ত করা হয়। পরে তা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের মাধ্যমে আদালতে জমা দেওয়া হয়।
আমাদের শরীয়তপুর প্রতিনিধি জানান, মামলার প্রধান আসামি মাহাবুবকে গতকাল শরীয়তপুর মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালতে হাজির করা হয়। এরই মধ্যে মামলাটি সিআইডিতে ন্যস্ত করা হয়েছে। ফলে সিআইডির পরিদর্শক মনিরুজ্জামান মাহাবুবের সাত দিনের রিমান্ড চান। জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম অশোক কুমার দত্ত পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
হেনা হত্যা মামলাটি পরিচালনার জন্য স্থানীয় বেসরকারি সংস্থা মাদারীপুর লিগ্যাল এইড অ্যাসোসিয়েশন একজন আইনজীবী নিয়োগ করেছে। সংস্থাটি মামলার যাবতীয় ব্যয় বহনের ঘোষণা দিয়েছে। সংস্থাটির শরীয়তপুর জেলা সমন্বয়কারী আবদুল আউয়াল বলেন, ‘মামলাটি সরকারপক্ষ পরিচালনা করবে। কোনো গাফিলতি যাতে না থাকে, সে জন্য এ হত্যা মামলাটি পরিচালনা করার জন্য আমরা একজন আইনজীবী নিয়োগ করেছি।’
সিআইডির পরিদর্শক মনিরুজ্জামান জানান, মাহাবুবকে সিআইডির হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করা হয়েছে।

মেয়েটির জন্য কারও মায়া হলো না!

Wednesday, February 2, 2011

৪ বছরের কিশোরী হেনা ৭০-৮০টি দোররার আঘাতের পর মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। তার আগে ছোট্ট এই মেয়েটি সয়েছে ধর্ষণের ভয়ংকর শারীরিক-মানসিক যন্ত্রণা। মৃত্যু তাকে হয়তো সব যন্ত্রণা আর এই কুৎসিত সমাজ থেকে মুক্তি দিয়েছে।

হেনার ফুফাতো বোনসহ আত্মীয়রা জানান, শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার চামটা গ্রামের দরিদ্র কৃষক দরবেশ খাঁর মেয়ে হেনা। গত রোববার দিবাগত রাতে মেয়েটি প্রাকৃতিক কাজে ঘরের বাইরে যায়। এ সময় তার দূর সম্পর্কের চাচাতো ভাই মাহাবুব (৪০) তার মুখে কাপড় গুঁজে দিয়ে পাশে তার পরিত্যক্ত একটি ঘরে নিয়ে ধর্ষণ করেন। মেয়েটির চিৎকারে প্রথমে মাহাবুবের স্ত্রী ও ভাই বেরিয়ে আসেন। কিন্তু তাঁরা মেয়েটিকে উল্টো মারধর করেন। একপর্যায়ে হেনার বাবা-মা, ভাই-বোনসহ বাড়ির লোকজন বের হয় এবং মেয়েটিকে উদ্ধার করে। হেনাদের ঘর থেকে মাহাবুবের ঘরের দূরত্ব ২০-২৫ গজ হবে বলে জানিয়েছে স্বজনেরা।
নড়িয়া থানা ও এলাকার সূত্র জানায়, ঘটনা জানাজানি হলে পরের দিন সোমবার চামটা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ইদ্রিস ফকিরের নেতৃত্বে সালিস বৈঠকের আয়োজন করা হয়। সালিসে উপস্থিত হন চামটা আবুল বাশার মাদ্রাসার শিক্ষক সাইফুল ও গ্রামের মসজিদের ইমাম মফিজ উদ্দিন। ইদ্রিস ফকির, লতিফ মীরমালত, আক্কাস, ইয়াসিন ও জয়নাল মীরমালতের সমন্বয়ে পাঁচ সদস্যের বিচারক বোর্ড গঠন করা হয়। তাঁরা ইমাম ও মাদ্রাসার শিক্ষকের সঙ্গে পরামর্শ করে ধর্ষণকারী ও ধর্ষণের শিকার কিশোরী উভয়কেই দোররা মারার রায় দেন। মাহাবুবকে ২০০ দোররা ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা আর কিশোরী হেনাকে ১০০ দোররা মারার ঘোষণা দেওয়া হয়। কিন্তু ধর্ষকের শাস্তি অর্ধেক কমিয়ে তাৎক্ষণিক সালিসকারীরা তাঁকে ১০০ দোররা মারেন। হেনাকে ৭০-৮০টি দোররা মারার পর সে অচেতন হয়ে মাটিতে পড়ে যায়। স্বজনেরা তাকে উদ্ধার করে নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার রাতে হেনা মারা যায়।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা গোলাম ফারুক প্রথম আলোকে জানান, সোমবার রাতে জরুরি বিভাগে ভর্তি করার কিছুক্ষণ পরই হেনা মারা যায়।
সালিসকারীরা হেনার মৃতদেহ গ্রামে নিয়ে তড়িঘড়ি দাফনের উদ্যোগ নেন। খবর পেয়ে পুলিশ গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে মরদেহ উদ্ধার করে। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে ইউপি সদস্য ইদ্রিস ফকির, ধর্ষক মাহাবুব ও সালিসকারীরা পালিয়ে যান। পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ধর্ষক মাহাবুবের স্ত্রী, জয়নাল মীরমালত, আলাবক্স করাতি ও ইমাম মফিজ উদ্দিনকে আটক করে। শরীয়তপুরের পুলিশ সুপার শহিদুর রহমান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
হেনার বাবা দরবেশ খাঁ কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমি গরিব হওয়ায় প্রভাবশালীরা আমার মেয়ের সঙ্গে এমন আচরণ করেছেন। এভাবে দোররা মেরে মেয়েটিকে মেরে ফেলা হবে, কখনো ভাবিনি। আমি মেয়ে হত্যার বিচার চাই।’
মাহাবুবের স্ত্রী দাবি করেন, তাঁর স্বামীর সঙ্গে অসামাজিক কাজ করায় গ্রামের মানুষ হেনাকে আটক করে মারধর করে। তিনি সেখানে উপস্থিত হয়ে তাকে মারধর করেছেন।
চামটা ইউপির চেয়ারম্যান গিয়াস উদ্দিন রাঢ়ী বলেন, ‘ঘটনাটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। ভাবতেই লজ্জা লাগছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত।’
পুলিশের হাতে আটক সালিস বৈঠকে উপস্থিত থাকা আলাবক্স করাতি বলেন, ‘দোররা মারার ফতোয়া আমরা দিইনি। প্রভাবশালী সালিসকারীদের চাপের মুখে এর প্রতিবাদ করতে পারিনি। মেয়েটির এমন পরিণতি হবে বুঝতে পারলে প্রতিবাদ করতাম।’
আটক হওয়া ইমাম মফিজ উদ্দিন বলেন, ‘দোররা মারার রায় ঘোষণা করেছেন বিচারকেরা। উপস্থিত অন্যরা তা বাস্তবায়ন করেছেন। তবে সালিসকারীরা আমাদের সঙ্গে পরামর্শ করেছিলেন। আমরা বলেছি, ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলে ছেলে ও মেয়ে উভয়কেই শাস্তি পেতে হবে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল মামুন গতকাল রাতে জানান, ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের ধরতে পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নড়িয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল খায়ের ফকির গতকাল রাত নয়টার দিকে জানান, হেনার মৃতদেহ উদ্ধার করে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। এরপর ময়নাতদন্তের জন্য লাশ শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। মেয়েটির বাবা বাদী হয়ে গ্রেপ্তার হওয়া চারজনসহ ১৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন।
পুলিশ সুপার এ কে এম শহিদুর রহমান প্রথম আলোকে জানান, অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হবে।

কাশ্মীরি বন্দিদের ওপর 'নির্যাতন' চালিয়েছে ভারত

Sunday, January 23, 2011

ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী জম্মু ও কাশ্মীরে বন্দিদের ওপর ব্যাপক হারে নির্যাতন চালাত। সেখানকার বিভিন্ন বন্দিশালা ঘুরে দেখার পর রেডক্রসের আন্তর্জাতিক কমিটি ২০০৫ সালে বিষয়টি নয়াদিলি্লতে নিয়োজিত মার্কিন দূতাবাসের কূটনীতিকদের জানিয়েছিল।

তাদের দাবি, ভারত সরকার নির্যাতনের বিষয়টি দেখেও না দেখার ভান করে। উইকিলিকসের ফাঁস করা তারবার্তা থেকে গত শুক্রবার এ কথা জানা গেছে। বার্তা অনুযায়ী, ২০০৫ সালের এপ্রিলে রেডক্রস নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে বন্দি নির্যাতনের বিষয়ে বিভিন্ন তথ্যপ্রমাণ নয়াদিলি্লতে মার্কিন কূটনীতিকদের কাছে পাঠায়। তারা জানায়, বৈদ্যুতিক শক, যৌন নিপীড়ন, পানিতে চুবিয়ে নির্যাতন, ঝুলিয়ে রাখা ছাড়াও বসা অবস্থায় পায়ের ওপর ভারী ধাতব জিনিস রেখে তার ওপরে নিরাপত্তা কর্মীরা বসে নির্যাতন চালাত। ভারত সরকার এসব নির্যাতনের ঘটনা দেখেও না দেখার ভান করেছে।
রেডক্রস কূটনীতিকদের জানায়, ২০০২ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত রেডক্রসের কর্মীরা কাশ্মীরের বিভিন্ন বন্দিশিবির ১৭৭ বার পরিদর্শন করে। এ সময় তারা প্রায় দেড় হাজার বন্দির সঙ্গে কথা বলে। বেশির ভাগ বন্দিই ছিল সাধারণ নাগরিক। সন্দেহবশত তাদের অনেককে দীর্ঘদিন ধরে আটকে রাখা হয়েছে। তারাই নির্যাতনের ধরন সম্পর্কে জানায়।
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র এই তারবার্তার ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করেনি। রেডক্রসের আন্তর্জাতিক কমিটি জানিয়েছে, তারা বিষয়টি তদন্ত করছে।
জম্মু ও কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ এ বিষয়ে শুক্রবার এনডিটিভিকে জানান, তাঁর সরকার ক্ষমতায় আসার আগে এসব ঘটনা ঘটেছে। কাজেই তিনি এ ব্যাপারে কিছু জানেন না। 'আমি এসব ঘটনার মধ্যে নেই। এটা ২০০৫ সালের ঘটনা। আপনারা জানেন, তখন কারা ক্ষমতায় ছিল। আমাদের সময়ে এমন ঘটনা ঘটেনি, ভবিষ্যতে কখনো ঘটবেও না।' তাঁর সরকারের আমলেই প্রথম অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের একটি দলকে কাশ্মীর সফরের অনুমতি দেওয়া হয় বলেও জানান আবদুল্লাহ।
২০০২ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত কংগ্রেস ও পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টির (পিডিপি) জোট সরকার ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের ক্ষমতায় ছিল।
কাশ্মীর পুলিশের মহাপরিদর্শক এস এম সোহাই বলেন, রেডক্রসের বরাত দিয়ে প্রকাশিত খবর ভিত্তিহীন ও অপপ্রচার। 'নির্যাতনের কোনো ঘটনা ঘটেনি। আমি জানি না, রেডক্রস কিভাবে এসব তথ্য পেয়েছে। কারণ কাশ্মীরের ওই সব জায়গায় তাদের প্রবেশাধিকার নেই। কাজেই এ খবরের কোনো ভিত্তি নেই।' সূত্র : এএফপি।

মুসলিম জঙ্গিদের চেয়ে হিন্দু চরমপন্থীরা বিপজ্জনক : রাহুল

মুসলিম জঙ্গিদের চেয়ে হিন্দু চরমপন্থীদের ভারতের জন্য বড় হুমকি বলে মনে করেন কংগ্রেস দলের নেতা রাহুল গান্ধী। উইকিলিকসে নয়াদিলি্লর মার্কিন দূতাবাসের ফাঁস হওয়া তারবার্তায় এ কথা জানা গেছে।

গত শুক্রবার প্রকাশিত তারবার্তায় বলা হয়, গত বছর ভারতে মার্কিন রাষ্ট্রদূত টিমোথি রোমারের সঙ্গে আলাপকালে কংগ্রেস দলের প্রেসিডেন্ট সোনিয়া গান্ধীর ছেলে রাহুল জানান, ভারতের মুসলমানদের মধ্যে কিছু লোক হয়তো ২০০৮ সালের মুম্বাই হামলার জন্য দায়ী লস্কর-ই-তৈয়বার মতো জঙ্গি গ্রুপগুলোকে সমর্থন করে। তবে ভারতের জন্য আরো বড় হুমকি হচ্ছে হিন্দু মৌলবাদী দলগুলোর উত্থান। এরা ধর্মীয় উত্তেজনা সৃষ্টির মাধ্যমে মুসলমান সম্প্রদায়ের সঙ্গে বিরোধে জড়ায়।
বার্তায় বলা হয়, সব ধরনের সন্ত্রাসবাদ এবং সাম্প্রদায়িকতা ভারতের জন্য হুমকি বলে জোরালো যুক্তি দেন রাহুল। তিনি বলেন, 'কে কে সন্ত্রাস করছে তাতে কিছু আসে-যায় না, আসল কথা হচ্ছে সব ধরনের সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আমাদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন।'
একটি ডানপন্থী হিন্দু জাতীয়তাবাদী দলকে নিষিদ্ধ ইসলামী ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে তুলনা করে গত অক্টোবরে এক রাজনৈতিক বিতর্কের আগুনে ঘি ঢালেন রাহুল। তাঁর মতে, উভয় গোষ্ঠীই চরম মৌলবাদী ভাবধারাকে উৎসাহ দেয়।
উইকিলিকসে ফাঁস হওয়া রাহুলের ওই মন্তব্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শিবসেনা দলের প্রধান বাল ঠাকরে এবং বিরোধী হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। বিজেপির মুখপাত্র প্রকাশ জাভদেকার বলেন, 'রাহুলরা ভারত এবং হিন্দু মূল্যবোধ সম্পর্কে জানেন না বলেই এ কথা বলছেন।'
গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, 'উইকিলিকসের তথ্যে এখন বোঝা যাচ্ছে, মার্কিনিদের কাছে কে তথ্য যুগিয়ে আসছে। এখন পরিষ্কার, কেন আমেরিকা পাকিস্তানকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে।' বাল ঠাকরে হিন্দু সন্ত্রাসবাদ সম্পর্কে মন্তব্য করার ব্যাপারে রাহুলের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি রাহুলকে অতি স্মার্ট না হওয়ার উপদেশ দেন। সূত্র : এএফপি।

আমি কসাইদের মতো জবাই করতে পারি

Tuesday, January 18, 2011

সংগঠনের কর্মসূচিতে অংশ না নেওয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্য সেন হল শাখা ছাত্রলীগ সভাপতি সাইদ মজুমদার ও তার সহযোগীরা ১৩-১৪ জন শিক্ষার্থীকে পিটিয়েছেন এবং তিনজনকে হল থেকে বের করে দিয়েছেন। অভিযোগ পাওয়া গেছে, ঢাবি ছাত্রলীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক শওকত ইসলাম তৃতীয় সেমিস্টারের ওই শিক্ষার্থীদের হুমকি দিয়ে বলেছেন, 'আমি কসাইদের মতো জবাই করতে পারি।

আমাকে যদি ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কার করে, তার পরও তোদের জবাই করা কোনো ব্যাপার না। হল থেকে এখনই বের হয়ে যাবি। তোদের যেন ক্যাম্পাসে আর না দেখি।' ছাত্রলীগের ভয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আহত ওই শিক্ষার্থীরা কালের কণ্ঠের প্রতিবেদকের কাছে গতকাল 'মধ্যরাতের' নির্যাতনের এ কথা জানান।
জানা গেছে, গতকাল সোমবার রাত ২টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্য সেন হলের অতিথি কক্ষে শিক্ষার্থী নির্যাতনের এ ঘটনা ঘটে। শিক্ষার্থীরা জানান, হলের অতিথি কক্ষে প্রতিরাতে ছাত্রলীগের সভা হয়। তারা জানান, সূর্য সেন হলের ২২৬ (ক) নম্বর কক্ষে একত্রে ২২ জন শিক্ষার্থী গাদাগাদি করে থাকেন। এ কক্ষ 'গণরুম' বলে পরিচিত। এ কক্ষের কেউ সেদিন অতিথি কক্ষে না যাওয়ায় হল ছাত্রলীগ সভাপতি তাঁদের ডেকে পাঠান। ওই কক্ষের ১৩-১৪ জন শিক্ষার্থী অতিথি কক্ষে এলে, দরজা বন্ধ করে তাঁদের সভায় না আসার কারণ জানতে চান সভাপতি সাইদ। শিক্ষার্থীরা তখন পরীক্ষার কথা জানালে সভাপতি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। একপর্যায়ে সভাপতিসহ ছাত্রলীগের অন্য নেতা-কর্মীরা তাঁদের মারধর করেন। নির্যাতিতরা সবাই তৃতীয় সেমিস্টারের শিক্ষার্থী।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিক্ষার্থী কালের কণ্ঠকে জানান, 'আমাদের কয়েকজনের পরীক্ষা থাকায় সেদিন গেস্ট রুমে যেতে পারিনি। আমরা একটা ভালো রুমের জন্য সভাপতির কাছে দাবি করেছিলাম। এ জন্য তারা আমাদের গালিগালাজ করেছে। পরে চেয়ারের পায়া দিয়ে, সোফায় মাথা ঠেকিয়ে, দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে মেরেছে।' তিনি আরো অভিযোগ করেন, 'এসব ঘটনা যাতে বাইরে প্রকাশ না হয়, সে জন্য নানাভাবে হুমকিও দিচ্ছে।' এদিকে ঢাবি শাখার ছাত্রলীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক শওকত ইসলাম তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ অস্বীকার করে কালের কণ্ঠকে বলেন, 'আমি এ ধরনের কথা বলিনি। একজন ছাত্র হিসেবে এ ধরনের কথা মানায় না। এখানে নিশ্চয় অন্য কোনো যোগসাজশ রয়েছে।' সূর্য সেন হল ছাত্রলীগ সভাপতি সাইদ মজুমদার গতকাল বিকেলে কালের কণ্ঠকে বলেন, 'কোনো প্রোগ্রামে তাদের পাওয়া যায় না। তাই গেস্ট রুমে ডেকে সামান্য চার্জ করেছি মাত্র।' কিন্তু এর আগে সকালে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, 'বড় ভাইদের সালাম দেয় না, সম্মান করে না, প্রোগ্রামে আসে না, তাদের মারব না তো কী করব?'
এ ব্যাপারে সূর্য সেন হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. খোন্দকার আশরাফ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, 'আমার কাছে কেউ কোনো অভিযোগ করেনি। হল থেকে বের করে দেওয়ার ঘটনা আমি সাংবাদিকদের কাছ থেকেই শুনতেছি। আর কিছু জানি না।' প্রসংগত, গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর শহীদুল্লাহ হলে প্রায় একই কারণে ৪৪ শিক্ষার্থীকে হল থেকে বের করে দেয় ছাত্রলীগ।
 
Support : Dhumketo ধূমকেতু | NewsCtg.Com | KUTUBDIA @ কুতুবদিয়া | eBlog
Copyright © 2013. News 2 Blog 24 - All Rights Reserved
Template Created by Nejam Kutubi Published by Darianagar Publications
Proudly powered by Dhumketo ধূমকেতু