আশ্চর্য সব মানুষ by কাজল ঘোষ

Tuesday, January 21, 2014

রাজধানীর কিছু রাস্তায় যখন হাঁটি বা যানজটে থমকে গিয়ে পাখিদের কিচিরমিচির শব্দ কানে বাজে- কি এক ঘোর আমাকে তাড়া করে ফেরে। যেন নতুন এক স্বপ্নের ভুবন।
কোলাহল আর ভিড় ঠেলে কখনও যদি পাঁচতারা হোটেল সোনারগাঁওয়ের ফুটপাতে সন্ধ্যায় হাঁটাচলার সুযোগ হয় তাহলে খানিকটা থেমে কান পাতুন। শুনতে পাবেন পাখির সুতীব্র চিৎকার। শত হাইড্রোলিক  হর্নের আওয়াজ ভেদ করে আপনাকে যেন আমন্ত্রণ জানাচ্ছে পাখিরা। হঠাৎ কোন এক বসন্তের দুপুরে রমনার ফুটপাত দিয়ে হাঁটলে কোকিলের মন্ত্রমুগ্ধ স্বর আপনাকে নিয়ে যাবে অন্য ভুবনে। মৎস্য ভবনের মোড় থেকে ইস্কাটন গার্ডেনের সন্ধ্যার রূপ সত্যিই আমাকে নিয়ে যায় অনেক পেছনে। যেখানে আমি ম্যাচ বক্স নিয়ে সারি সারি গাছের ভিড়ে ঝিঁঝিঁ পোকা খুঁজে ফিরতাম আনমনে। এই স্বপ্নচারিতা শুধু আমাকে আবিষ্ট করে রাখে এক দল বৃক্ষ। যারা এক দল ক্ষমতালোভী মানুষের মতো স্বার্থপর নয়। যারা তাদের ছায়া দিয়ে এক মায়াঘেরা পরিবেশ রচনা করেছে যুগ-যুগান্তরে। অথচ কি বীভৎসতা আর নির্মমতা নিয়ে আমরা করাতে তাদের নির্মূল করেছি গত কিছুদিন। তা-ও গণতন্ত্রের নামে, মৌলিক অধিকারের নামে। অথচ আমরা সবাই জানি, সমাজ আর সভ্যতা বিনির্মাণে কি ভূমিকা এই গাছেদের। আমরা বেঁচে আছি গাছের অবারিত দানে। অট্টালিকা ঘেরা এই শহরে যতটুকু গাছ দেখি তা তো রাস্তার মাঝখানে অসহায়; ক্ষীণকায় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কিছু গাছ। এখানেও কালো থাবা। সেদিন বিজয়নগরের পথ ধরে যেতেই খেয়াল করলাম একটু পর পর কাটা গাছের গুঁড়ি। গত বছরের ৫ই মে জামায়াত-শিবির, হেফাজত আর জাতীয় পার্টির বিপথগামী কর্মীদের রোষানলের শিকার হয় বিজয়নগর থেকে পল্টন মোড় পর্যন্ত কয়েক শ’ গাছ। বিরোধী জোটের টানা অবরোধ আর হরতালে তা বিস্তৃত হয়েছে দেশজুড়ে। সাতক্ষীরা, যশোর, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বগুড়া, জয়পুরহাট, রংপুর, দিনাজপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট, পাবনা, সীতাকুণ্ড, গাইবান্ধা ও চাঁদপুর জেলার রাস্তার দু’পাশে দাঁড়িয়ে শতবর্ষের হাজার হাজার গাছ রাজনৈতিক সহিংসতার বলি হয়েছে। আগুনে পুড়ে মৃত্যু, পুলিশের গুলিতে মৃত্যু আর দুর্বৃত্তদের চোরাগোপ্তা হামলার শিকার হয়ে মৃত্যু হলেও পক্ষে বা বিপক্ষে বিবৃতি আসে। একে অন্যের দায় এ ওর ঘাড়ে চাপায়। কিন্তু করাতে বলি হওয়া গর্জন, শিরিষ, শিমুল, পলাশ, গামার, জারুল, ইউক্যালিপটাস, মেনজিন, গজারিরা ছটফট করলেও প্রাণ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনি। প্রকাশিত হিসাবে দেখা গেছে, গত ১০ মাসে রাজনৈতিক সহিংসতার সময় ৫০ হাজারের বেশি গাছ কাটা পড়েছে। বেশির ভাগ গাছই এখনও পরিণত হয়নি। প্রতিটির দাম ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। পরিণত হলে কমপক্ষে এই গাছের প্রতিটির মূল্য হতো ৩০ হাজার টাকা করে। গড়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রায় ১০০ কোটি টাকার গাছ নিধন করা হয়েছে। নিধন হওয়া ৫০ হাজারের মধ্যে অন্তত ৪৫ হাজার গাছেরই মালিক সামাজিক বনায়নের ও ব্যক্তিমালিকানাধীন। এলজিইডির হিসাব অনুযায়ী তাদের ৩,৫১০টি, সওজের ২,৬৪০টি গাছ রাজনৈতিক সহিংসতায় ধ্বংস হয়েছে। অথচ এ ধ্বংসযজ্ঞের বিরুদ্ধে কোন পরিবেশকর্মী প্রতিবাদে সোচ্চার হননি। অথচ বিদেশী তহবিলের লোভে জলবায়ু সম্মেলনে দেশ বিভূঁইয়ে ঘুরে বেড়ানো আর নিজেদের বড় পরিবেশবাদী দাবি করার লোকও সংখ্যায় এদেশে অনেক। অনেকে বড় বড় পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখায়। এদের কেউই রাস্তায় দাঁড়াননি নির্মমভাবে বৃক্ষ নিধনের প্রতিবাদে। করেননি মানববন্ধন, সাদা পতাকা মিছিল। দোহাই আপনাদের, যে যেই দলেরই হোন না কেন এই নিরপরাধ গাছেদের এভাবে নিধন করবেন না। এরা আপনাদেরই জীবনদান করেছেন কালে কালে। শেষ করবো রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশের ক’টি লাইন দিয়ে- পৃথিবীর এই ক্লান্ত এ অশান্ত কিনারার দেশে, আশ্চর্য সব মানুষ রয়েছে...।

দ্রোহ ও সৃজনের জেলজীবন by মুর্তজা বশীর

Friday, February 11, 2011

নানা অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে কারাবরণ করেছেন বাংলাদেশে ও বিশ্বের নানা প্রান্তের কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক। জেল-জুলুমেও তাঁদের চিরতরে স্তব্ধ করা যায়নি। তাঁদের সেই সংগ্রামী চেতনাকে ধারণ করেই আয়োজন জেলখানার লেখালেখি। লিখেছেনঃ মুর্তজা বশীর

১৯৫০ সালের ৭ জুন আমি জেলে যাই। সেদিন কমিউনিস্ট পার্টি ‘মুক্ত এলাকা দিবস’ ঘোষণা করেছিল। স্থানগুলো হলো বাংলাদেশের ময়মনসিংহের উত্তরাঞ্চলের হাজং, পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার কাকদ্বীপ আর মাদ্রাজের তেলাঙ্গানা। জনযুদ্ধ তখন শুরু হয়েছে। আমি একটা পোস্টার এঁকেছিলাম। যার বিষয় ছিল ময়মনসিংহের মানচিত্র হাতুড়ি-কাস্তে দিয়ে ঘেরা। পোস্টারের ওপরে লেখা ছিল মুক্ত এলাকা দিবস, যা দেয়ালে লাগাতে গিয়ে আমি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হই।
জেলে আমাকে রাখা হয় ১৪ সেলে। ‘শকুন্তলা ফাটক’ বলে যার একটা সুন্দর নাম ছিল। আমার রাজনৈতিক সতীর্থ আবদুল্লাহ আলমুতী শরফুদ্দীন, আলী আকছাদ, শ্রমিকনেতা আবদুল বারি এবং ক্ষেতমজুর নেতা মনু মিয়াও এখানে ছিল। জেলের ১৪টি কক্ষই দুদিকে লম্বা শিক দিয়ে ঘেরা ছিল। দুজন করে থাকার নিয়ম, তবে একজনও থাকত।
সকালে যখন লকআপ খুলে দেওয়া হতো, তখন আবদুল্লাহ আলমুতী, আলী আকছাদসহ অন্যরা শুনতে চাইত, রাতে আমি কী লিখেছি। রাতে লেখা গল্প-কবিতা তখন আমি পড়ে পড়ে তাদের শোনাতাম।
প্রথম দিকে যখন খাতা ছিল না, মুতী ভাই কিছু লেখার জন্য মাঝেমধ্যেই তাগাদা দিতেন। তখন খবরের কাগজের সাদা মার্জিনের মধ্যে পেনসিল দিয়ে লিখতাম। জেল কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে আমি কমলা রঙের মলাট দেওয়া একটা খাতা আনিয়েছিলাম এবং ওই লেখাগুলো উঠিয়ে রেখেছিলাম।
সেখানে আমি সতীর্থ সঙ্গীদের প্রতিকৃতি এঁকেছিলাম। কয়েকজন কয়েদিও ছিল। জেলখানায় একটা রজনীগন্ধার ঝাড় এত ভালো লেগেছিল যে মনে হয়েছিল মুক্ত জীবন। তার ড্রয়িংও আমি করেছি। ওই খাতায় আমি বেশ কিছু গল্প-কবিতাও লিখেছিলাম।
কবিতাগুলো ছিল মূলত সুকান্ত ভট্টাচার্যের অনুকরণে, গণচীনের অভ্যুদয় ও নতুন জীবনের জয়গান নিয়ে। দুঃখটা হলো, এসবের সবই আমার হারিয়ে গেছে।
আমাদের বেগমবাজারের বাসায় মূল ফটক দিয়ে ছোট একটা করিডোর ছিল, যেখানে ঢুকলেই ছিল ইলেকট্রিকের মিটার, তার পাশে তালা মারা দরজা। ওটিই ছিল আমার স্টুডিও। সেখানে আমি ছবি আঁকতাম। ওই ঘরে একটা কালো টিনের বাক্সে আমার জেলজীবনের খাতাটা রাখা ছিল। সঙ্গে ছিল ইতালি থেকে আমিনুল ইসলামের লেখা চিঠি ও ছবি এবং শিল্পী পরিতোষ সেন ও দিলীপ দাশগুপ্তের লেখা চিঠি ও ছবি।
এ ছাড়া খুবই মূল্যবান একটি জিনিস যত্ন করে খামের ভেতর রাখা ছিল। বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারির শহীদ আবুল বরকতকে রক্তাক্ত অবস্থায় ধরেছিলাম। আমার হাতে ছিল কাঁদানে গ্যাস থেকে বাঁচার জন্য পানিভেজা রুমাল। ওই রুমালের এক কোণে একটা লাল ফুল এমব্রয়ডারি করা ছিল। যার লাল উজ্জ্বল রং রক্তের উজ্জ্বলতায় হারিয়ে গিয়েছিল। বায়ান্নর সেদিনের ঘটনা আমার আজও স্পষ্ট মনে আছে। একুশে ফেব্রুয়ারি। তখন দুপুর গড়িয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রাবাসের সারি সারি ব্যারাকের সম্মুখের ঘাসে আমি এবং হাসান হাফিজুর রহমান বসেছিলাম চার-পাঁচটা ব্যারাক পেরিয়ে, লাল খোয়া রাস্তার একধারে।
হাসান বলছিল নতুন কবিতার কথা, আর আমি ভাবছিলাম আজকে জাদুঘরে ঢাকা আর্ট গ্রুপের ২য় চিত্র প্রদর্শনীর কথা। যেখানে আমার তেলচিত্রগুলো রাখা ছিল। হঠাৎ দেখলাম, ব্যারাকগুলোর দক্ষিণ পাশ দিয়ে একটা চলন্ত জটলা। দৌড়ে গেলাম। বেশ লম্বা, শ্যামবর্ণ, মুখমণ্ডল পরিষ্কারভাবে কামানো, সারা চেহারায় বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটায় ভরে যাওয়া ঘাম আর পরনের প্যান্টের পেটের নিচ থেকে কল খুলে দেওয়ার মতো অঝোরে রক্তের ঢল। সবার সঙ্গে আমিও তাকে ধরেছি, আমার সাদা পাজামায় কে যেন আবীরের রং পিচকারি দিয়ে ছড়িয়ে রাঙিয়ে দিল। আমি তাকে ধরেছি বুকের কাছে, আমার মাথা তার মুখের কাছে। একসময় সে চোখ তুলে তাকাল। একটা ছোট শিশুর ন্যায় গড়গড় করে নামতা পড়ার মতো করে বলল, আমার বাড়িতে খবর দেবেন...আমার নাম আবুল বরকত...বিষ্ণুপ্রিয় ভবন, পল্টন লাইন...।
পরমুহূর্তে জবাই করা মুরগির মতো হাঁ করে জিব কাঁপিয়ে ফিসফিস করে বলল, পানি। পানি।
বাঁ হাত দিয়ে মৃদুভাবে ধরেছি তার পিঠ, ডান হাতখানা তার বুকের ওপর। সে হাতে রুমালখানা রেখেছি ধরে, যা মুখের ঘাম মোছার কারণে ভেজা আর নোংরা। ভাবলাম কী করব। জিব কাঁপছে অনবরত খোলা মুখের ভেতর। একটু ইতস্তত করলাম। মনে দ্বিধা, এক ধরনের অপরাধ বোধ। কিন্তু তা ক্ষণিকের জন্য। জিবটা বারবার নড়ছে। পরমুহূর্তেই নিংড়িয়ে দিলাম হাতের রুমাল।
শহীদ বরকতের অমর স্মৃতিমাখা সেই রুমালসহ আমার জেলজীবনের সবকিছুই বাক্সবন্দী অবস্থায় ওই রুম থেকে চুরি হয়, যা আমার জীবনে অনেক বড় ক্ষতি করেছে। চোরেরা পরে হয়তো সবই ফেলে দিয়েছে। কারণ, এসবে তার কোনো কাজেই আসবে না। নেওয়ার সময় হয়তো ভেবেছিল, অনেক দামি কিছু আছে।
প্রসঙ্গত, একুশে ফেব্রুয়ারির এই ঘটনা নিয়ে আমি হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ সংকলনে ‘একটি বেওয়ারিশ ডায়েরির কয়েকটি পাতা’ বলে একটি গল্প লিখি। এবং সেই সংকলনে ‘রক্তাক্ত একুশে’ নামে একটি লিনোকাটও করেছিলাম। একটি কবিতাও লিখেছিলাম ‘পারবো না’ এই শিরোনামে, যা ছাপা হয়েছিল সেই বছরই কলকাতায় সুভাষ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত পরিচয় পত্রিকায়।

মুর্তজা বশীর: শিল্পী, সাহিত্যিক, গবেষক। বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

সম্প্রীতির মহামিলন ক্ষেত্র by আবদুল হামিদ মাহবুব

Monday, February 7, 2011

কদিকে জ্বলছে ৯টি চিতা। তার পাশে সারিবদ্ধ ১২টি কবর। ১২টি লাশের জানাজা পড়াতে দাঁড়িয়েছেন একজন মৌলভী, তাঁর পিছে অস্ত্র হাতে দণ্ডায়মান একদল মুক্তিযোদ্ধা আর কিছু সাহসী মানুষ। ওদিকে চিতায় শব পোড়ানোর কাজটি একজন পুরোহিতের তত্ত্বাবধানে চলছে, তাঁকে সহযোগিতা করছেন হিন্দু-মুসলিম আরেক দল মানুষ।

এই দৃশ্য ১৯৭১ সালের ২০ ডিসেম্বর মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠের পূর্ব-দক্ষিণ কোণের। সেই ১৯৭১ সাল থেকে মৌলভীবাজারবাসীর কাছে বেদনাবিধুর একটি দিন ২০ ডিসেম্বর। এ দিনটি স্থানীয় শহীদ দিবস হিসেবে পালন করেন মৌলভীবাজারবাসী। মিত্রবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধারা মৌলভীবাজারের বিভিন্ন স্থানে ক্যাম্প স্থাপন করে অবস্থান নেন। এ ধরনের একটি ক্যাম্প ছিল মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে। পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মাত্র চার দিন অতিবাহিত হয়েছে। ওই ক্যাম্পের মুক্তিযোদ্ধারা দুপুরের খাবার আয়োজনে ব্যস্ত। কেউ ভাতের থালা হাতে নিয়েছেন, কেউ খাবার সংগ্রহের জন্য লঙ্গরখানায় যাচ্ছেন। এ সময়ই প্রচণ্ড বিস্ফোরণে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ক্যাম্প লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। মুহূর্তে প্রায় অর্ধশত মুক্তিযোদ্ধার দেহ খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে এদিক-সেদিক ছড়িয়ে পড়ে। আকস্মিক এ ঘটনায় মৌলভীবাজারবাসী হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। তখন যাঁরা শহরে ছিলেন প্রথম অবস্থায় অনেকেইে বুঝতে পারেননি, কোথায় কী ঘটেছে। পরে খবর ছড়িয়ে পড়ে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ক্যাম্পের হৃদয়বিদারক ঘটনার কথা। দলে দলে মানুষ ছুটে আসে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে। ভয়াবহ এ অবস্থা দেখে মানুষজন বুঝে উঠতে পারছিল না তাদের কী করণীয়। অবশেষে মিত্রবাহিনীর লোকজনও এখানে আসেন। তখনো আহতাবস্থায় যাঁরা ছটফট করছিলেন, তাঁদের কয়েকটি ট্রাকে উঠিয়ে চিকিৎসার জন্য ভারতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এদিকে যাঁরা শহীদ হলেন, তাঁদের কারো শরীর থেকে মাথা উড়ে গেছে, কারো বা দেহের মধ্যাংশ ছিন্নভিন্ন হয়ে এদিক-সেদিক ছড়িয়ে পড়েছে। বিধ্বস্ত ক্যাম্প ভবনের পার্শ্ববর্তী গাছের ডালে কারো দেহের কোনো অংশ লেগে ঝুলে আছে। সে এক বীভৎস দৃশ্য। না দেখলে অনুমান করা কঠিন। ছিন্নভিন্ন এই দেহগুলো সৎকারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এসব মৃতের মধ্যে কে মুসলমান, কে হিন্দু_এসব শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। তার পরও যাঁদের পরিচয় কোনোভাবে মিলানো যায় সে অনুযায়ী মুসলমান-হিন্দু আলাদা করে ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী কবরস্থ করা ও চিতায় পোড়ানোর উদ্যোগ নেন তৎকালীন গণপরিষদ সদস্য আওয়ামী লীগ নেতা মো. আজিজুর রহমানের নেতৃতে একদল সাহসী মানুষ। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিভিন্ন স্থানে ফেলে যাওয়া ও পুঁতে রাখা মাইন-গ্রেনেড উদ্ধার করে বিদ্যালয়ের ক্যাম্পে এনে জড়ো করে রাখা হয়েছিল। এ বিস্ফোরকগুলোই হঠাৎ বিস্ফোরিত হয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে। হিন্দু-মুসলিম এই শহীদদের ছিন্নভিন্ন দেহগুলো ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী জাতপাতের ঊধর্ে্ব উঠে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের মৃতদেহ হিসেবে সমাহিত করা হয় মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠের পূর্ব-দক্ষিণ কোণে। সেই ১৯৭১ সাল থেকে এ স্থানটি হচ্ছে সম্প্রীতির এক মহামিলন ক্ষেত্র।

স্মৃতিলেখায় সেলিম আল দীন স্মরণ উৎসব by জাহারাবী রিপন

ৎসব ফুরিয়ে গেলে সে উৎসবের আনন্দ কিংবা আমেজ কিছুই থাকে না। কেবল থাকে স্মৃতির স্নায়ুকোষে জমানো কিছু কথার চিত্রলেখা। কিন্তু তা কখনো আভাষিত আবার কখনো অদৃশ্য দৃশ্যচিত্রের অঙ্কনরেখায় নানা বোধের আবহ সৃজন করে মনে। মুকুরে প্রতিবিম্বিত যেন কোনো ছায়াচিত্র।

দেখা-অদেখার অম্বরে তারকাদলের আলোক বিচ্ছুরণে বিম্বিত করে স্মৃতিপুষ্পের স্বর্ণাভ ছবি। সেতারের সোনালি তারে লেগে থাকা যেন কোনো ধ্রুপদ সঙ্গীতের রেশ_ মনে আনে অপার আনন্দ। স্মরণে-বিস্মরণে স্মৃতিরেখায় তবে কোনো উৎসবের দৃশ্যচিত্র অঙ্কন করি।

ঢাকায় 'সেলিম আল দীন স্মরণ_২০১১'-এর আয়োজন। গত ১৪-১৬ জানুয়ারি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীতে অনুষ্ঠিত হলো। উৎসবে 'এই দোলনচাঁপা বোধের ভেতর থেকে ফুটবে ভোরের ফুল'_এ সেস্নাগান যেন আমাদেরও বোধ ও বুদ্ধিতে অদেখা অক্ষয় কোনো পারিজাতের ভোর সৃজন করে। নাট্যকার সেলিম আল দীনের লেখা থেকে নির্বাচিত হয়েছে এই সেস্নাগান। কেন? হয়তো আমরা তাঁর মতোই দোলনচাঁপা বোধে কোনো নান্দনিক প্রভাত দেখব বলে। লেখকের বা শিল্পীর দেখা ভোর আর আমাদের দেখা ভোরে তফাৎ খানিক তো থাকবেই। একদা সেলিম আল দীন 'গ্রন্থিকগণ কহে' নাটকে বলেন_ 'দাদা, যে দেখে সে লিখে'। মধ্যযুগের আরেক কবি কৃষ্ণরাম দাস বলেন_'যৎ দৃষ্টং তৎ লিখিতং'। কিন্তু এ দেখা তো কবির দেখা। আমাদের দেখা তো মাত্র তাকানো ভিন্ন কিছু নয়। কী বোধে ভোর দেখি_হয়তো দোলনচাঁপা নয়। তবুও ভোর দেখি_হূদয়ে অনুভব করার চেষ্টা করি ভোরের ফুল। এমনি এক ফুলগন্ধী ভোরে ১৪ জানুয়ারি, ২০১১ ঢাকার শ্যামলী বাসস্ট্যান্ড থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশে যাত্রা করি। কেন? নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের তৃতীয় প্রয়াণ দিবসে তাঁর সমাধিতে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন করতে। আমাদের এই যাত্রার ভেতরে যুদ্ধংদেহী কোনো অভিপ্রায়ের উন্মাদনা নেই_আছে কেবল নীরবে সমর্পণের অশ্রু ও পুষ্পাঞ্জলি। শোক এখানে শঙ্কা নয় বরং স্মরণে বোধে দোলনচাঁপা ভোর হয়ে ফোটে। শ্রদ্ধার্ঘ্য_নিবেদনের নয়নচাঁপা।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকে পেঁৗছে আমরা প্রবেশমুখে বাধাপ্রাপ্ত হই। কারণ সেদিন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী দিবসের বিশেষ আয়োজনে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর আগমন নির্ধারিত আছে। তার আগে তো সে সাজানো ফটক দিয়ে আমাদের প্রবেশের প্রশ্নই আসে না। বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উদ্যাপনের সংশিস্নষ্টজনদের তুলনায় আমরা খুব বেশি নই। কিন্তু কম_তাও বলা যাবে না। স্বপ্নদলের প্রায় পঞ্চাশ জন নাট্যকর্মী_তার প্রধান সম্পাদক জাহিদ রিপন এবং আমি। তবে সংখ্যার চেয়ে নিবেদনের উত্তাপে আমরা গণন সংখ্যার অধিক বলতে হবে। অনন্তরে প্রতিগামী পথ পরিত্যাগ করে আমরা অন্য ফটকের পথ ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে প্রবেশ করি। সেখানেও আরেক বাধা। আমাদের বাহন বাসের সম্মুখ দিয়ে স্কুলের ছোট্ট শিশুদের সারিবদ্ধ অভিগমনের পথযাত্রা প্রত্যক্ষ করি। কিন্তু তাতে অভিগমনের দৃশ্য ছাপিয়ে যেন শীত ভোরের কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস আর কুয়াশার শুভ্র সন্তরণ খানিক হলেও প্রকট হয়ে উঠেছে। তা শিশুদের উষ্ণ ধমনীর উদ্দামতাকে কোথাও কাবু করতে পারেনি। হয়তো অভিগমন পথের নির্দেশনাতে শিক্ষকের শাসনের রক্তচক্ষুকে মনে রেখেছে এই শিশুরা। আর তা তো রাখতেই হবে। ছেলেবেলা থেকেই দেখে আসছি_এ যেন নৈমিত্তিকতা। কোথাও কোনো বড় অতিথির আগমন ঘটলেই স্কুলের শিশুদের এমন শীত-গ্রীষ্ম পারায়ে যাবার আমন্ত্রণ আসে। সারিবদ্ধভাবে তাদের শৃঙ্খলা মানতে হয়। কী শীত_কী গ্রীষ্ম! শীতের কুঞ্চন কিংবা গ্রীষ্মের দাবদাহ শিশুদের যেন গায়ে লাগে না। তারা তো আমাদের মতো মানুষ নহে_শিশু!

সে যাই হোক, ক্যাম্পাসে অবতরণের খানিক পরে ডাক এলো_যেতে হবে সেলিম আল দীন সমাধি প্রাঙ্গণে। স্বপ্নদলের নাট্যকর্মী সুকর্নর দেখানো পথে পথে ড্রাইভার বাস নিয়ে সমাধি প্রাঙ্গণে পেঁৗছে গেল। আমরা বাস থেকে নামলাম। নেমেই দেখি_সবেমাত্র নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ, ঢাকা থিয়েটার এবং গ্রাম থিয়েটার পুষ্পাঞ্জলি পর্ব শেষ করে নীরবে স্মরণ পথে দাঁড়িয়ে গেছে। নাট্যবর নাসির উদ্দিন ইউসুফ, পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়, হুমায়ুন কবীর হিমুসহ ঢাকা থিয়েটার ও গ্রাম থিয়েটারের অনেকেই আছেন। আছেন সেলিম আল দীনের সহধর্মিণী পারুল ভাবিও। শোক স্মরণের নীরবতা ভঙ্গ করার দুঃসাহস না দেখিয়ে আমরা সহযাত্রীগণ সকলে সমাধিতে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন করলাম। অতঃপর আমাদেরও একই পরিণাম। খানিক দাঁড়িয়ে নীরব অশ্রুপাত। আর তো কিছু নয়। যিনি বিদেহী্ল_ সশরীরে কথা বলছেন না_তাঁকে নিবেদন ও স্মরণের এই তো পথ। হয়তো নীরবতাও কথা বলার এক বিস্ময়কর মাধ্যম বলতে হবে। আমার সে ভোরে তাই মনে হয়েছে।

প্রয়োজনের তাগিদে হঠাৎ নীরবতা ভঙ্গ করলেন জাহিদ রিপন। তিনি নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু ভাইয়ের কাছে সমাধি প্রাঙ্গণে নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন স্মরণে উৎসর্গীকৃত সঙ্গীত পরিবেশনার অনুমতি প্রার্থনা করলেন। সম্মতি এলো। সি্নগ্ধ বাদন আবহে শুরু হলো সঙ্গীত। প্রথমে 'পুণ্যশেস্নাক হে/ সেলিম আল দীন'_এই গান দিয়ে শুরু হলে মধ্যখানে 'মঙ্গল প্রদীপে পূজিব তোমারে/ আর তো কিছুই জানি না'_সুর-তালের শরণ্য আবাহন শুনতে পেলাম। এবং অবশেষে 'হে মানব ভুবনের মৃত অস্থিপুঞ্জ_ঘুমাও/ ধুলিধূম্র মৃত্তিকার দগ্ধ বক্ষে_নিঃসাড় ঘুমাও'_এই গানটির মধ্য দিয়ে জীবিতের উষ্ণ ধমনীতে মৃতের নিঃসাড় হিম স্মৃতিকণার স্পর্শ অনুভব করলাম। যে নেই তাঁর উদ্দেশে গানের গীতিকথার অমৃত উচ্চারণ_তিনি কি শুনছেন? না শুনলে_হায় এ কী এ ব্যর্থ প্রয়াস! তবুও গাইতে হবে_স্মৃতি ও শোকের অদ্বৈত সম্মিলনে_এই তো নিয়তি। সঙ্গীত পর্ব চুকিয়ে সরে এলাম সমাধি প্রাঙ্গণ থেকে_আবার ঢাকা_শিল্পকলা একাডেমী প্রাঙ্গনে। সেখানে নানা আকৃতির সেলিম আল দীন প্রতিকৃতিতে সাজানো হলো উৎসব প্রাঙ্গণ। প্যানাফ্লেক্সে নাট্যচার্যের প্রতিকৃতির পাশে তাঁরই লেখা নাটক থেকে সকল শোভন উদ্ধৃতি দৃশ্যমান। কোনো কোনো উদ্ধৃতি অন্তরের ভেতরে শরতের রৌপ্যশীর্ষ কাশবনের দোলা নিয়ে জেগে ওঠে_এই তো সেলিম আল দীন! আবার কোনোটি মাঘের হিম শীতে বহে আনা শীত ও দুঃখ-বাস্তবতার ছবি অঙ্কন করে মনে। বাস্তব বোধে জীবনবাস্তবতার চিত্র পৃথিবীর খুব কম শিল্পীর চারুলেখায় অঙ্কিত হয়েছে_এ সত্য তো আমাদের মানতেই হবে। যদি প্রশ্ন করি কালকে_তবে বলবে সে_মহাকাল কজনকে মনে রেখেছে! বলতে দ্বিধা নেই, সেলিম আল দীন মনে রাখার মতো কিছু শিল্পবাণী লিখে গেছেন_তারই স্বাক্ষর তো স্বপ্নদলের প্যানাফ্লেক্সে উদ্ধৃত এই লেখাগুলো। ভাবতে ভালোই লাগে।

সন্ধ্যা প্রায় সমাগত। জাতীয় নাট্যশালার উৎসব উদ্বোধনের স্থান পরিপাটি করে সাজানো হয়েছে। মঙ্গল প্রদীপ অপেক্ষমাণ। একটু পরেই জ্বলবে বাতি। অগি্নহীন পিলসুজের মতো দর্শকবৃন্দও অপেক্ষা করছেন। উৎসবের খানিক অগি্ন ও উত্তাপের আকাঙ্ক্ষায়। কখন অনুষ্ঠান শুরুর উদ্বোধন ঘোষণা হবে। দিবসের উপান্তে দিগন্তরেখার আরক্তিম আভা নিয়ে সন্ধ্যা এলো। রাঙা ভোরের ওপিঠ আলো করে। তখনই স্বপ্নদলের পঞ্চ নাট্যকন্যা_মিতা, লাবণী, পারুল, আলো ও সোনালি দশখানি মঙ্গল প্রদীপ হাতে নৃত্যছন্দে ধীর লয়ে গেয়ে উঠলেন_'পুণ্যশেস্নাক হে/ সেলিম আল দীন/ প্রাচ্যমঞ্চের পার্থ হে তুমি/ নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনঃ'। তাদের পরনে বাসন্তি বরণ শাড়িতে মরিচ পাড়ের সংযোজন_ফুলহাতা লাল বস্নাউজে যেন উৎসবের আবহ বহে এনেছে। প্রয়াণ উৎসবের আয়োজনে রঙের এই বৈপরীত্য যেন খানিক হলেও ভুলিয়ে দেয় বিয়োগ বেদনা। উদ্ধৃত গানের কথার সঙ্গে কৃষ্ণকাঠি, খঞ্জনি, ঢোল, মন্দিরা, করতাল, হারমোনিয়াম, জিপসি, মার্কাস প্রভৃতি সংগত করলো বাদকদল। গানে, বাদ্যে, নৃত্যে স্মরণের এক অভিনব সঙ্গীত যোজনা। ত্রয়ীর ঐক্যতানে পুরো আসর যেন অভিভূত_স্বপ্নদল এক মনোগ্রাহী সঙ্গীত-কোরিওগ্রাফি প্রদর্শন করল। উক্ত সঙ্গীত-কোরিওগ্রাফির মধ্য দিয়ে উদ্বোধক শিক্ষাবিদ ড. মুস্তাফা নূর-উল ইসলাম উৎসব আয়োজনের উদ্বোধন ঘোষণা করলেন। অতঃপর আসরে ও চারিধারে নাট্যকর্মী ও আমন্ত্রিক জনাদের হাতে হাতে শত মঙ্গল প্রদীপের প্রজ্জলন শোভাময় হয়ে উঠল। আনুষ্ঠানিকতা ও উৎসব পরিপূরক সত্তা যেন এক অদ্বৈতের সুতায় বাধা পড়ে গেল। তিনদিন চলবে এই উৎসব।

উদ্বোধনের পরে নাট্যবর নাসির উদ্দিন ইউসুফের আবাহনে মধ্য আসরে এলেন সেলিম আল দীনের সহধর্মিণী বেগমজাদী মেহেরুন্নেসা পারুল, অভিনেত্রী শিমুল ইউসুফ, অভিনেতা রাইসুল ইসলাম আসাদ, নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের সভাপতি ড. আমিনুল ইসলাম, কণ্ঠশিল্পী ফাহমিদা নবী প্রমুখ। কেন? এবার সেলিম আল দীন রচিত ও সুরারোপিত গানের এ্যালবাম 'আকাশ ও সমুদ্র অপার'-এর মোড়ক উন্মোচনের পালা। নাট্যকারের সহধর্মিণী বেগমজাদী মেহেরুন্নেসা পারুল যথারীতি মোড়ক উন্মোচন করলেন। শিল্পী ফাহমিদা নবী অনুষ্ঠান সঞ্চালক বাচ্চু ভাইয়ের অনুরোধে 'আমি যতবার উড়াল মেঘেদের ছুঁতে চাই'_ এ্যালবামের এই গানটি গেয়ে শোনালেন। দ্বিতীয়বার সঙ্গীত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে উৎসবে আরো খানিক আনন্দের মাত্রা যোগ হলো।

অতঃপর সেলিম আল দীনের দুটি নাটকের প্রদর্শনীর আয়োজন। জাতীয় নাট্যশালায় শিমুল ইউসুফের নির্দেশনা ও ঢাকা থিয়েটারের প্রযোজনায় 'ধাবমান' এবং পরীক্ষণ থিয়েটার হলে রিজোয়ান রাজনের নির্দেশনা ও চট্টগ্রামের প্যান্টোমাইম মুভমেন্টের প্রযোজনায় 'প্রাচ্য'-র নির্বাক প্রদর্শন সম্পন্ন হলো। 'ধাবমান' নাটকটি অনাকাক্ষিত মৃতু্য ও হত্যার বিরুদ্ধে এক তীব্র প্রতিবাদ। অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে নির্দেশক দুরন্ত গতি ও আবেগের অহংকারে নিত্য ধাবমান মৃতু্যকে মঞ্চে উপস্থাপনার প্রয়াস পেয়েছেন। উলেস্নখ্য যে, এ নাটকটি ইতঃপূর্বে বার কয়েক দেখার কারণে দ্বিতীয় নাটকটি দেখতে মনোনিবেশ করলাম। কী আশ্চর্য_ 'প্রাচ্য' নির্বাক নাটকেও কুশীলবদের ভাষাময় শারীরিক অভিব্যক্তিতে যেন সবাক দৃশ্যচিত্রের স্বাদ পাওয়া গেল। খুব সুন্দর নাট্যপ্রযোজনা। নাটকটির অন্তিম পর্বে এসে আমি এক নতুন বিষয়ের সংযোজন লক্ষ করলাম। নাট্যকার নাটকে প্রাচ্য মানবীয় বোধে অন্যায়কারীকে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখলেও নির্দেশকের অভিপ্রায়ে তা ভিন্ন বোধের বার্তা বয়ে এনেছে। তিনি এ নাট্য উপস্থাপনায় ক্ষমার চেয়েও প্রান্তিক মানবের অসহায়ত্ব ও শৃঙ্খলিত জীবনায়নের বিষয়কেই প্রাধান্য দিয়েছেন। এরূপ কর্ম-দৃষ্টান্তে মনে হয়_ নবীন নাট্যপ্রজন্ম সেলিম আল দীনকে নানা ব্যাখ্যা ও ভাঙনের মধ্য দিয়ে নবরূপে গ্রহণ করেছে। নাটক দেখে আশান্বিত হলাম।

উৎসবের দ্বিতীয় দিবসের অপরাহ্নে ছিল 'সেলিম আল দীনের নাটকে সংলাপ ও সঙ্গীতের দ্বৈতাদ্বৈতবাদিতা' শীর্ষক সেমিনারের আয়োজন। মূলে প্রবন্ধকার মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলামের উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে শুরু হয় সেমিনার। উক্ত সেমিনারের সভাপতি ও সঞ্চালকের ভূমিকায় ছিলেন নাসির উদ্দিন ইউসুফ। সেমিনারের বিষয়-দৃষ্টে প্রতীয়মান হয় যে, দ্বৈতাদ্বৈতবাদী লেখক হিসেবে সেলিম আল দীনকে অন্বেষণের প্রয়াস এই প্রবন্ধে অন্বিষ্ট হয়েছে।

অতঃপর সন্ধ্যার সমাগমে পরীক্ষণ থিয়েটার হলে মঞ্চস্থ হলো নাট্যকার সেলিম আল দীনের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকথা বিষয়ক প্রবন্ধ অবলম্বনে নাট্যপ্রযোজনা_ 'ফেস্টুনে লেখা স্মৃতি'। পরিবেশনায় স্বপ্নদল। সফল মঞ্চরূপকার জাহিদ রিপনের নিবিড় পরিচর্যায় নির্মিত এ নাট্যে নির্দেশনার দায়িত্ব পালন করেন সামাদ ভুঞা ও রওনক লাবণী। এ নাট্যপ্রযোজনার মধ্য দিয়ে নাট্যকার সেলিম আল দীনের আরেক পরিচয়_ মুক্তিযোদ্ধা এবং অনন্তরে তাঁর প্রবন্ধ থেকে নাট্যরূপের বিনির্মাণের সম্ভাবনায় যেন দ্বৈতাদ্বৈতবাদী আরেক সেলিম আল দীনকে আমরা আবিষ্কার করি। নাটক শেষে উক্ত নাটকের নাট্যরূপকার হিসেবে মঞ্চে আমার ডাক এলো। মঞ্চে আরো এলেন পারুল ভাবি এবং নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু ভাই। উলেস্নখ্য যে, এ নাট্য সেলিম আল দীনের আজীবন শিল্পসঙ্গী নাসির উদ্দিন ইউসুফকে উৎসর্গ করা হয়েছে। নাটক দেখে তিনি মঞ্চ-উপস্থাপনার পাশাপাশি দুই বন্ধুর মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ ও অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বললেন। সেও তবে আরেক স্মৃতিকথার গন্ধ বিলোপন করে মনে। দর্শকবৃন্দ তন্ময় হয়ে শ্রবণ করেন। অতঃপর বিরতি এবং তারপরে নির্দেশক জাহিদ রিপন স্বপ্নদলের পরিবেশনায় এদিন উৎসবে দ্বিতীয় নাট্যপ্রযোজনা 'হরগজ' দেখার আমন্ত্রণ জানান সকলকে।

'হরগজ' নাটকের কাহিনী-পটে প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিনাশী ভুবনকে বিশ্ব ভাঙনের সমান্তরালে উপস্থাপনের চেষ্টা করেন নাট্যকার। তরুণ নির্দেশক জাহিদ রিপন তা অত্যন্ত সতর্ক ও সহমর্মিতায় মঞ্চে আনতে সমর্থ হয়েছেন বলতে হবে।

সেদিন দ্যাশ বাংলা থিয়েটার স্টুডিও থিয়েটার হলে সেলিম আল দীন রচিত 'জুলান' নাটক মঞ্চায়ন করে। উলেস্নখ্য যে, দীর্ঘকাল পূর্বে রচিত হলেও দলটি প্রবীর গুহের নির্দেশনায় এই প্রথমবারের মতো নাটকটি মঞ্চে আনলেন। এজন্য অবশ্যই তাদের ধন্যবাদ প্রাপ্য।

উৎসবের তৃতীয় দিন সন্ধ্যায় স্টুডিও থিয়েটার হলে সেলিম আল দীনের রচনা থেকে চমৎকার পাঠ করে কথা আবৃত্তি চর্চা কেন্দ্রের সদস্যরা। এ দিনে সেলিম আল দীন রচিত দুটি নাটকের একটি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ এবং অপরটি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী মঞ্চায়ন করে। প্রথমোক্তটি 'কেরামতমঙ্গল' নাটকের নির্দেশক রেজা আরিফ এবং দ্বিতীয়টি 'পুত্র' নাটকের নির্দেশক মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন। দুজনই নবীন নির্দেশক। 'পুত্র' নাটক দরশনে বাঙালি প্রান্তিক দম্পতির পুত্র হারানোর বেদনা আমাকেও যেন সমান বেদনাবিদ্ধ করে। রচনা ও নির্দেশনার যুগল সম্মিলনেই হয়তো তা সম্ভব হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী ও নির্দেশককে অভিনন্দন। নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ এবং নির্দেশক রেজা আরিফকেও অভিনন্দন। কারণ 'কেরামতমঙ্গল'-এর মতো একটি বিশাল ক্যানভাসে রচিত নাটককে মঞ্চের সীমিত পরিসরে উপস্থাপনা তো কম কথা নয়।

এদিন উৎসবের উপান্তে এসে স্বপ্নদলের কথা আবারও বিশেষভাবে বলতে হয়। উৎসবের শুরুতে এবং শেষে তাদের সঙ্গীত পরিবেশনা মনে রাখার মতো। নাটক সমাপনান্তে স্বপ্নদল পরীক্ষণ থিয়েটার হলের লবিতে শুরু করে সঙ্গীত পরিবেশনা। কিছুক্ষণ। অতঃপর নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু ভাইয়ের আহ্বানে সাড়া দিয়ে লবি থেকে সঙ্গীত সহযোগে নিচে নেমে আসে। সেখানে আরো কিছুক্ষণ সঙ্গীত। এরপর বাচ্চু ভাই উৎসব সমাপ্তি ঘোষণার মধ্য দিয়ে পুনরায় স্বপ্নদলকে সঙ্গীত পরিবেশনে আবাহন করেন। স্বপ্নদল 'মঙ্গল প্রদীপে পূজিব তোমারে/ আর তো কিছুই জানি না'_ এই সঙ্গীত পরিবেশনার মাধ্যমে আবারও নাট্যগুরু সেলিম আল দীনকে স্মরণ করেন। স্বপ্নদলের বছরব্যাপী পরিকল্পিত উৎসবের সেস্নাগান 'স্মরণে নাট্যভাষে নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন' যেন আরো একবার আমাদের মনে অজ্ঞাতসারেই প্রবেশ করে।

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ, ঢাকা থিয়েটার এবং বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার-এর যৌথ আয়োজনের এই সফল উৎসবের স্মৃতিলেখা এখানেই শেষ করছি।

আত্মজীবনীর পাণ্ডুলিপি থেকে

মর একুশে গ্রন্থমেলা-২০১১তে প্রকাশিত হবে কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকের আত্মজীবনীর দ্বিতীয় অংশ 'উঁকি দিয়ে দিগন্ত'। বইটি প্রকাশ করেছে ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ। প্রচ্ছদ করেছেন সমর মজুমদার। বইটির দাম রাখা হয়েছে ২৪০ টাকা। ইত্তেফাক সাময়িকীর পাঠকদের জন্য এখানে বইটির চুম্বক অংশটুকু ছাপা হলো।

বলা আমাকে মাটিতে নামিয়েছে কি নামায়নি, ঝড়ের মতো দাশুমাস্টার এসে ঘরে ঢুকলেন। ঠিকমতো আলোগুলো জ্বালানো হয়নি। কোনো দিকে না চেয়ে দাশুমাস্টার বললেন, এই, তোরা দু-ভাই আমার সঙ্গে আয়। আর তোরা সব সোজা বাড়ি চলে যা।

আমাদের হারিকেনের বাতি একদম কমানো। মাস্টারমশাইয়ের পিছু পিছু আমরা দু-ভাই হাঁটছি। চাঁদ নেই, অন্ধকারটা চোখে সয়ে আসছে। কাত্যায়নী ঠাকরানির মাটির বাড়িটা এদিকের শেষ হিঁদুবাড়ি। ঠাকরানি বহুদিন দেশছাড়া, বাড়িটা ফাঁকা পড়ে আছে। ওই বাড়ির পরেই খোনা ফকিরের দোকানের পাশ দিয়ে শিবতলার দিকে যাওয়ার গলিরাস্তাটা, তার পরেই মোসলমানপাড়ার শুরু আর শুরুতেই আমাদের ফাঁকা নতুন বাড়ি। এই বাড়িটা বাবা কিনেছিলেন বিনোদবাবুর কাছ থেকে। সেজন্য এখনো ওটা বিনোদবাবুর বাড়ি। আমরা পুরনো বাড়িতেই থাকি। এ বাড়িটা পড়ে আছে খালি। একটা পেয়ারা গাছ, দু-কোণে দুটো ডুমুরগাছ। গাধাপুইনি, কাঁটানটে আর ঘাসেভরা বাড়িটা। কাছে আসতেই দেখি দেয়াল ঘেঁষে ঠিক কোণের কাছটায় অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। মানুষগুলোকে আবছা দেখা যাচ্ছে। কারা আছে, কে আছে বোঝার উপায় নেই। একজন একটু কাছে এগিয়ে এল, দেখলাম শ্রীধর কাকা, তার হাতে একটা পাঁঠা কাটার টাঙি। একবার যেন মনে হল, খোনা ফকিরের বড় ছেলে শঙ্করীদা আর বোধহয় আগুরিদের বেন্দাবনদাকে দেখলাম। সবারই হাতে কিছু-না-কিছু আছে, লাঠি, হুড়কো, বগি_এইসব।

একজন হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল, কে যায়, মোলস্নাদের ছেলে দুটি? দাশুমাস্টার কথা বলে উঠলেন। গলা নয় যেন শানানো ইস্পাত, খবরদার, আমার ছাত্তর ওরা। আমি ওদের বাড়িতে পেঁৗছে দিয়ে আসি।ঃএইখানেই ওদের ছেড়ে দাও মাস্টার, আর এগিয়ো না। মোচনরা সব ওদের আস্তানায় জড়ো হয়েছে।ঃসে আমি দেখছি, দাশুমাস্টার বললেন।

শুকনোর দিনে ধুলোভরা রাস্তায় পা ডুবে যাচ্ছে। এইটুকু রাস্তা, মনে হচ্ছে অনেক দূর। আস্তানায় এসে দেখি সারা মোসলমানপাড়ার মানুষ সেখানে জড়ো হয়েছে। একদিকে রাস্তার ইটের ভাঙা মিনার, তার মাথায় পাকুড়গাছের চারা আর একদিকে ফাঁকা উঠোনের মতো জায়গা। সেখানে আমরা হা-ডু-ডু, হিঙেডারি খেলি, মাদার মহররম সব সেখানেই শুরু হয়। জায়গাটা এখন মানুষে ভরা। সবার হাতেই বাঁশ, লাঠি, একটা-দুটো কিরিচ। লাঠিওয়ালারাই বেশি। মোসলমানপাড়ার বাকি নেই কেউ; শুধু বাবা, নাজিরবক্স চাচার বুড়ো বাপ_এরকম কয়েকজন নেই। এমনকি লতিফ চাচার মতো আধবয়েসি মানুষটাও কোঁচরভর্তি কি কি নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। দাশুমাস্টার একেবারে ভিড়ের মধ্যে ঢুকে বললেন, এই শোনো তোমরা, মোলস্নাবাড়ির ছেলে এই দুটি আমার কাছে পড়তে যায়। ওদের দিয়ে গেলাম। কেউ কোনো কথা বলল না। যা, এখানে দাঁড়াস না, বাড়ি চলে যা, এই বলে মাস্টারমশাই নিজের বাড়ির দিকে ফিরলেন। কেউ একটি কথাও বলল না। ধুলোভরা সাদা অাঁধারে দাশুমাস্টার একবারে মিলিয়ে গেলে একজন বলে উঠল, কপাল ভালো মাস্টারের, ভালোয় ভালোয় ফিরে গেল!

মনে হল, মোসলমানপাড়ার সবাই এসেছে। তবে মোটমাট ক-টাই বা লোক? সবসুদ্ধ এক শ' হয় কি না! লাঠি ঠুকতে ঠুকতে লাফিয়ে বেড়াচ্ছে মলিস্নকবাড়ির ফকির চাচা। তার ডান পায়ের বুড়ো আঙুলে খুব খারাপ একটা পচা ঘা। ওই ঘা বহুকাল ধরে শুকোয়নি। পানসে রক্ত গড়িয়ে পড়ে সেখান থেকে। হাড়-মাংস খসে পড়েছে, আঙুলটার আর সামান্যই বাকি। লোকে বলে কুঠ্ হয়েছে। খোঁড়াতে খোঁড়াতে কাছে এসে আমাকে দেখে বলল, কি বলব বাপ, আলস্না মেরে রেখেছে, নাইলে ওই কটা হিঁদু মালাউনকে এক লাপটেই সাবড়ে দেতম। লতিফ চাচা কোঁচড়ে কি নিয়ে যেন ঘুরছে, একজন বলল, বালি, সামনা সামনি হলেই হিঁদুগুনোর চোখে বালি ছুঁড়ে একদম কানা করে দেওয়া হবে, তারপর পিটিয়ে, ঠেঙিয়ে কিংবা কুপিয়ে কুপিয়ে মারো কেন আরাম করে। শুনলাম খবর দেওয়া হয়েছে সেই লেঠেলদের গাঁ ধারসোনায়, আসছে তারা সব। অবশ্যি হিঁদুরাও তাদের হিঁদু-গাঁ ক্ষীরগাঁয়ে খবর দিয়েছে। ভয়-পেদো হিঁদুরা আসবে কি-না কে জানে। মোসলমানপাড়া ঢোকার মোড়ে মোড়ে আড়াআড়ি করে গরু-মোষের গাড়ি রেখে দেওয়া হয়েছে। ওইসব পেরিয়ে আসতে আসতেই তাদের খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মারা হবে। ভারি মজা! গাঁয়ে শুধু হিঁদু আর মোসলমানরা আছে! ওহিদ চাচা, বঁ্যাক চাচা, ননু কাকা, ভুতো কাকা, মোবাই শেখ, মনবশ চাচা, ষষ্ঠীদা, পঞ্চাদা, পঞ্চা হাড়ি, চক্কোবত্তি মশাই, আশু ভশ্চায্যি, রাম সামন্ত_এরা কেউ নেই। কোনোদিন ছিলও না। শুধু হিঁদু আর মোসলমান আছে!

পণ্ডিতমশাই বলে গেলেন, আগে বাড়ি যা, কোথাও দাঁড়াবি না। এতক্ষণ আমরা দু-ভাই বোকার মতো ঘোরাঘুরি করছিলাম, শেখদের বাড়ির নাছ-দুয়োরের পাশের গলি দিয়ে বাড়ি যাব, শুনতে পেলাম, ও-বাড়ির একটা ঘর থেকে কে যেন চেঁচিয়ে মেদিনী ফাটাচ্ছে। দুয়োর খুলে দে, খুলে দে বলছি, এই মা, হারামজাদি, দুয়োর খোল্, মালাউনের বংশ রাখব না, একবার ছেড়ে দে খালি। খুলবি না? এই ভাঙলম দুয়োর! দুমদাম শব্দ আসতে লাগল। ঘরে কিবরিয়া আটক আছে। ও কেমন খেপা সবাই জানে, মহররম খেলতে গিয়ে মানুষ খুন করার জোগাড় করে, মাদার নাচাতে গিয়ে একেকটা বাড়ি লণ্ডভণ্ড করে দেয়। ও ছাড়া থাকলে এতক্ষণে রক্তগঙ্গা বয়ে যেত।

ভাত দেওয়ার সময় ফুফু একটি কথা বলেনি। আমরা সবাই মাথা নিচু করে খাচ্ছিলাম। রাত খুব তাড়াতাড়ি নিশুতি হয়ে যাচ্ছিল বলেই বোধহয় আস্তানা আর বিনোদবাবুর বাড়ির কোণ থেকে হলস্না-চিৎকার অনেক স্পষ্ট শুনতে পাওয়া যাচ্ছিল। এমনকি দু-চারটে কথাও শোনা যাচ্ছিল। ভাতঘর থেকে বেরিয়ে কোনো চাচাকেও দেখতে পেলাম না। জানি না কেউ কেউ আস্তানায় গিয়েছে কিনা।

ঘরে আজ অন্ধকার নীল ফোঁটাটা নেই। আলোই জ্বলছিল। বাবা বিছানার ওপর বসে। মা-ও ঘরে। দেয়ালে একনলা বন্দুকটা ঠেস দিয়ে রাখা, ফ্লুট বাঁশিটা একই জায়গায় রয়েছে, ভেসিলিন-মাখানো খাঁড়াটাও দেয়ালে টাঙানো। বাবা মাকেই বলছিলেন, সন্ধেবেলায় ওবেদ শেখ তার দলিজে বসে ছিল। মোসলমানপাড়া থেকে হিঁদুপাড়ার দিকে গরুর গাড়ি যাওয়ার রাস্তা সে বন্ধ করে দেবে। ওর গোয়ালের একদিকের কোণের দেয়াল গাড়ির চাকার ধাক্কা লেগে বারবার ভাঙছে বলে সে ওপথে গাড়িই যেতে দেবে না। দেয়ালের কোণে একটা খুঁটো পুঁতে দিলেই তো দেয়াল বাঁচে! ক-বার নাকি তেমন খুঁটো পুঁতেছিল, কারা উপড়ে দিয়েছে। সে তাই রাগ করে একটা খুঁটো দিয়েছে দেয়ালের কোণে আরেকটা রাস্তার ঠিক মাঝখানে। এটা সে করতে পারে না, সরকারি রাস্তা তো তুমি বন্ধ করতে পার না! এদিকে রামযুক্ত হাজরার গরুর গাড়ি আসছিল কয়লাটয়লা নিয়ে। হিঁদুপাড়ার রাস্তায় কাদা, সে মোসলমানপাড়া দিয়ে যাবে। রাস্তার খুঁটো দেখে তার মেজাজ খারাপ। ওবেদ তো বসেই ছিল দলিজে, রামযুক্তটা গোঁয়ার, সে তাকে কোনো কথা না বলে রাস্তার মাঝখানের খুঁটোটা উপড়ে ফেলল। বেশ, তাই কর্, খুঁটোটা উপড়ে ফেলে চলে যা, তা না, সে দেয়ালের কোণের খুঁটোটাও তুলে ফেলে দিল। ওবেদ নিজে উঠে এসে রামযুক্তর ঘাড় চেপে ধরল, রামযুক্ত, এই তোর গাড়ি আটকে দেলাম। দেখি তুই কেমন বাপের ব্যাটা, গাড়ি নিয়ে যা দেখি। বোধহয় কিবরিয়া আশেপাশে ছিল, সে এক ছুটে এসে রামযুক্তের গলা ধরে ঝুলে পড়েছে। লেগে গেল ঝটাপটি। রামযুক্ত আমার সঙ্গে যাত্রায় সং-এর পার্ট করত, আমি জানি তার গায়ে খুব বল। এক ঝটকায় কিবরিয়াকে ঝেড়ে ফেলে সে শুধু বললে, গাড়ি যেতে দিবি না? গাড়ি যেতে দিবি না? এই থাকল গাড়ি, যাচ্ছি আমি। শালার নেড়ের খুব বাড় বেড়েছে। শালাদের পাড়া জ্বালিয়ে দোব আজ। এই বলে গাড়ি ওইখানেই রেখে রামযুক্ত চলে গেল। এখন গাড়ি মাঝখানে_এদিকে মোসলমানরা, ওদিকে হিঁদুরা। আমি জানি একটা কিছু ঘটবেই। বাতাসভরা বিষ। নিঃশ্বাস সবাইকেই নিতে হচ্ছে। বিষ ঢুকবে না?

ভাষা আন্দোলন রাজনৈতিক স্বাধীনতা দিয়েছে

Tuesday, February 1, 2011

মাদের সংস্কৃতি, সাহিত্য আর ইতিহাসের কাছে ফিরে যাওয়ার তাগিদ দেয় একুশে ফেব্রুয়ারি। এর মানে হচ্ছে, যাতে আমরা আমাদের সময়কে এবং নিজেদের নতুন করে ভিন্নভাবে বুঝতে সক্ষম হই। আরো স্পষ্ট করে বললে বলা যায়, নিজেদের বোঝার অর্থই হচ্ছে একুশে ফেব্রুয়ারি-কেন্দ্রিক গুরুত্ব।

এই গুরুত্ব আমাদের চলমান জীবনধারার ক্ষেত্রে খুব আবশ্যক। একুশের মাসে আমাদের সংস্কৃতি, সাহিত্য ও ইতিহাসের যে তাগিদ আমরা প্রতিবছর অনুভব করি, তা জাতির প্রেরণার বড় শক্তিও বটে। একুশের শহীদদের দায়িত্ব যদি আমাদের রাজনীতি না নেয়, তাহলে আমাদের সংস্কৃতি, সাহিত্য ও ইতিহাসের পতন ঘটবে। রফিক, সালাম, জব্বার, বরকতরা হচ্ছেন আমাদের ইতিহাসের বীর। তাঁরা জীবন উৎসর্গ করে আমাদেরকে সংস্কৃতি, সাহিত্য ও ইতিহাসের কাছে ফিরিয়ে আনেন। তাঁরা অধিকার আদায়ের সংগ্রামের প্রতীক।
বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি ছিল একটি পরিপূর্ণ রাজনৈতিক অভ্যুত্থান। এই অভ্যুত্থানের অগ্রবাহিনী ছিল ছাত্র ও যুবসমাজ। কিন্তু মনে রাখা দরকার, ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা আর ভাষাকে সমৃদ্ধ করা দুটো এক বিষয় নয়। এ ক্ষেত্রে বলা যায় জার্মানি, ফ্রান্স, স্পেনে ভাষা আন্দোলন হয়নি; কিন্তু সেসব দেশে ভাষা ও সাহিত্যের ব্যাপক অগ্রগতি লক্ষ করা যায়। সে জন্য বড় অবদান রেখেছেন ওই সব ভাষার প্রধান লেখকরা। আমাদের এখানে এ কাজটি হয়নি। আমাদের সার্বিক প্রয়োজনেই বিলম্বে হলেও এ কাজটি শুরু করা দরকার। আমরা যদি মনে করি, শুধু ভাষা আন্দোলনের ত্যাগের বিষয়টির ওপর জোর দিয়েই ভাষার উৎকর্ষ সাধনের কাজটি সম্পাদন করে ফেলব, তাহলে তা ভুল হবে। ভাষা আন্দোলনের চেতনাসংলগ্ন থাকতে হলে আমাদের ভাষা ও সাহিত্যের অগ্রগতির কাজ চালিয়ে যেতে হবে। ভাষা আন্দোলনের পর সুদীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হলেও আমাদের ভাষা ও সাহিত্য রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, নজরুলের যুগে যা ছিল, তা থেকে কতটা এগিয়েছে? এ প্রশ্নটি উপেক্ষা করা যাবে না। ভাষা আন্দোলন আমাদের যে রাজনৈতিক স্বাধীনতা দিয়েছে তাকে অর্থবহ করে তুলতে হবে।

লেখক : বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর
শিক্ষাবিদ, শিল্পকলা বিশ্লেষক ও সাহিত্যিক

বই এবং খানিকটা অথবা অনেকটা সংশয় by শান্তনু কায়সার

Saturday, January 29, 2011

র তিন দিন পর ১ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণে শুরু হচ্ছে অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১১। বইমেলা নিয়ে ‘সাহিত্য সাময়িকীর’ বিশেষ আয়োজন
Remember
First to possess his books, for without them
He is but a sot, as I am.
(The Tempest/Act 3, Scene 2)
উদ্ধৃতাংশটি ক্যালিবান বলছে প্রসপেরোর শত্রুদের উদ্দেশে, কী করে তাকে জব্দ করা যায়।
অন্যদিকে প্রথম অঙ্কের দ্বিতীয় দৃশ্যে ক্যালিবানই তার প্রভু প্রসপেরোকে বলছে—You taught me language, and/My profit on’t/Is, I know how to curse। অর্থাৎ আপনি আমাকে ভাষা শিখিয়েছেন, তাতে সুবিধা হচ্ছে, আমি এখন জানি কীভাবে অভিশাপ দিতে হয়। এ থেকে বইয়ের দ্বান্দ্বিক সত্যকে বোঝা যায়। ভাষা নিজে ভালো বা মন্দ না হলেও বই কিন্তু নৈর্ব্যক্তিক অথবা নিরপেক্ষ নয়। আমাদের একুশের গ্রন্থমেলার বয়স যেহেতু এখন খুব একটা কম নয়, সেহেতু এটাকে নিয়ে খানিকটা ভাবনা ও বিশ্লেষণের সুযোগ রয়েছে।
তার আগে বলি, বাংলা একাডেমীর একুশের ঐতিহ্যের রয়েছে দ্বান্দ্বিক চারিত্র্য। কী করে ভুলি, একজন পরিচালককে (তখনো মহাপরিচালকের পদ সৃষ্টি হয়নি) তাঁর ভুল ভূমিকার জন্য এবং ভাষা আন্দোলনকে নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কবিতা যিনি লিখেছেন, সেই রকম একজনকে স্বৈরাচারী শাসকের মন্ত্রী হওয়ার কারণে বটতলার অনুষ্ঠানমঞ্চ থেকে তুলে দেওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে স্বৈরাচারী ওই আমলে আহমদ শরীফ বেশ কয়েকবার ২০ ফেব্রুয়ারির বৈকালিক অধিবেশনে সভাপতির ভাষণ দিতে গিয়ে নির্জলা যে সত্য কথা বলতেন, তাতে তৎসম-কণ্টকিত দুরূহতা অতিক্রম করে তা জনসাধারণের এতটাই সানন্দ অনুমোদন পেত যে সমস্ত প্রাঙ্গণ করতালিতে মুখরিত হয়ে উঠত।
বই যতই প্রিয় হোক, হোক তা পাঠকের প্রেরণা ও অনুপ্রেরণার উৎস, সবাই ত্যাগ করলেও বইয়ের মতো বন্ধু যে পাঠককে ত্যাগ করে না, বরং তাকে ভরিয়ে তোলে; তা সত্ত্বেও প্রকাশকের কাছে বই একটা পণ্যও বটে। তিনি হিসাব করে দেখেন, কী বই, কত দিনে বিক্রি হবে; তাঁর বিনিয়োগ করা অর্থ কত দিনে ফেরত পাওয়া যাবে, আদৌ অথবা কতটা মুনাফা পাবেন এবং এ বই তাঁকে আর কী কী ও কী পরিমাণ দেবে। আমাদের যতই ভালো লাগুক, বাজার অর্থনীতিতে বই তো আর আলাদা কিছু হতে বা পেতে পারে না।
যে প্রকাশক বলেন তিনি মানসম্মত বই প্রকাশে আগ্রহী, তিনিই আবার নানা চাপ ও স্বার্থের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। যে প্রকাশকেরা বলেন, তাঁদের প্রকৃত প্রকাশকের সংখ্যা ৭০-৭২ বা বড়জোর ১০০, তাঁরা একুশে গ্রন্থমেলার আগে দ্বিগুণ/তিনগুণে কী করে পৌঁছান; সেই প্রকাশকেরা যেসব সময় নীতি মেনে চলেন, তা-ও নয়। চাণক্যনীতির সুযোগ নিতে তাঁরাও খুব পিছিয়ে থাকেন না।
সেদিন এক প্রকাশক বলেন, লেখক যদি প্রকাশকের সঙ্গে লিখিত চুক্তির ভিত্তিতে বই না দেন, তাহলে তিনি কী করে আইনি অধিকার দাবি করতে পারেন। কিন্তু আমরা জানি, লেখক দুর্বল পক্ষ। বাড়ি ভাড়ার ক্ষেত্রে ভাড়াটেকে যেমন জিম্মি হয়ে থাকতে হয়, সাধারণভাবে লেখকের অবস্থাও তা-ই। আর যেসব লেখক ক্ষমতাবান অর্থাৎ অসম্ভব জনপ্রিয়, তাঁদের রয়্যালিটির টাকা তো প্রকাশকেরা বাড়িতে গিয়ে আগামও দিয়ে আসেন। লেখক হলেও তাঁরা ব্যতিক্রম।
মানসম্মত নয় এমন বই প্রকাশ করা আমাদের ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু মুদ্রণ-বিস্ফোরণের এই সময়ে এর প্রকাশ রুদ্ধ কিংবা অন্তত সীমিত করা যে অসম্ভব, সেকথা বাস্তববুদ্ধিসম্পন্ন যেকোনো মানুষই স্বীকার করবেন। এখন বঙ্কিমের যুগ নয় যে ‘লেখক’রা ‘যশের জন্য লিখিবেন না।’ এই ধরনের ব্যক্তিরা বিশ্বাসও করেন না যে ‘তাহা হইলে যশও হইবে না, লেখাও ভালো হইবে না।’ বঙ্কিম যে বলেছিলেন, ‘যাহা লিখিবেন, তাহা হঠাৎ ছাপাইবেন না, কিছুকাল ফেলিয়া রাখিবেন’—সেই ধৈর্যও সবার নেই। এত সুযোগ থাকতে গ্রন্থকার না হওয়াই বরং মূর্খের কাজ!
অতএব যা ঘটার তা-ই ঘটে। আবুল মনসুর আহমদ ভোট-ভিক্ষুকদের কথা বলেছিলেন, আমরা প্রায়ই বই-ভিক্ষুকদের দেখা পাই। লাইন ধরে তাড়া খাওয়া গ্রন্থকারেরা যেভাবে নিজের বইয়ের কথা ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সামনে বলেন, তাতে খাঁটি পাঠকের লজ্জার শেষ থাকে না।
গত কয়েক বছরে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে যেভাবে ‘ভালো’ ফল করে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকছে, তাতে সাহিত্য ও জ্ঞানচর্চার বাস্তব পরিস্থিতি কী দাঁড়াচ্ছে, তার নির্মোহ জরিপ হলে বোঝা যেত, সাধারণত পাঠকেরা কী পড়েন বা পড়তে চান। এ অবস্থায় বইয়ের ভালো কাটতি আমাদের সৃজন ও মননচর্চায় কতটা ভূমিকা রাখে বা রাখতে পারে, সে ভাবনাকেও তুচ্ছ করে দেখা যায় না।
অর্থনীতির গ্রেশামস ল যে বলে মন্দ টাকা ভালো টাকাকে তাড়িয়ে দেয়, আমাদের গ্রন্থমেলারও সেই চারিত্র্য দাঁড়াচ্ছে কি না, এখন থেকেই বুঝি তা একটু একটু করে দেখা দরকার। আর এই ফাঁকে সারপ্লাস ভ্যালু তথা উদ্বৃত্ত মূল্য কোথায়, কার পকেটে ঢুকছে, সেটাও জনস্বার্থে দেখা প্রয়োজন।
দুই.
সারা দেশেই নানা গ্রন্থাগার রয়েছে। গ্রন্থাগারগুলো কতটা ভালো চলছে কিংবা সৎ ও অনুসন্ধিৎসু পাঠকদের কাছে পৌঁছাতে পারছে কি না, সেটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, বিশেষত নিচের পর্যায়ে গ্রন্থাগারের প্রকৃত ভূমিকার কথা কেউ আর ভাবেই না। দুর্বৃত্তায়িত নানা পথে এসব ক্ষেত্রে যে বইগুলো কেনা হয়, শিক্ষার্থীদের বোধহয় সেসব বই না পড়াই ভালো। তাতে অন্তত তাদের পক্ষে দূষণমুক্ত হওয়া অথবা থাকা সম্ভব। আর সাধারণ ও গণগ্রন্থাগারগুলোর পরিচালনার ক্ষেত্রে নির্বাচিত ব্যক্তিদের কাছে পঠন-পাঠন কোনো বিষয় নয়, বিষয় হচ্ছে সামাজিক মর্যাদা রক্ষা ও কর্তৃত্বের প্রকাশ।
কিন্তু কী হওয়া উচিত ছিল বা কী হতে পারত, তার একটি পুরোনো উদাহরণ দেওয়া যায়। ১৯১৩ থেকে ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত কলকাতার রামমোহন লাইব্রেরির সভাপতি ছিলেন জগদীশচন্দ্র বসু। তাঁর মৃত্যুর পর ১৯৩৮ থেকে ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত আমৃত্যু এর সভাপতি ছিলেন প্রফুল্লচন্দ্র রায়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ১৯১১ সাল থেকে আমৃত্যু এই গ্রন্থাগারের সহসভাপতি ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
ঐতিহ্য, উত্তরাধিকার ও বিজ্ঞানী প্রফুল্লচন্দ্র বইয়ে শ্যামল চক্রবর্তী প্রফুল্লচন্দ্র সংগৃহীত বইয়ের যে তালিকা ও বিবরণ দিয়েছেন, তাতে দেখা যায়, তিনি রোমান্টিক কবিদের ও নন্দনতত্ত্ববিষয়ক গ্রন্থাবলি অত্যন্ত খুঁটিয়ে পড়ছেন এবং মার্জিনে এ বিষয়ে মন্তব্য লিখে রাখছেন।
তাহলে প্রশ্ন, একুশ শতকে এসে আমরা কি এগিয়ে, না পিছিয়ে গিয়েছি অথবা যাচ্ছি?
তিন.
তবুও একুশে গ্রন্থমেলার সার্থকতাই আমাদের কাম্য। অনেক অপূর্ণতা থাকলেও বাংলাদেশ যেমন আমাদের অনেক দিয়েছে, বইয়ের জগতে এসেও তেমনি আমাদের প্রাণ ভরে যায়। বই হাতে নিয়ে এটিকে দেখতে দেখতেও আমরা অন্তত এই মেলার অনেক অপূর্ণতার কথা ভাবতে পারি। আর সৎভাবে অপূর্ণতার কথা ভাবলে সেখান থেকে বেরিয়ে আসার সম্ভাবনার কথাও আমাদের না ভেবে উপায় নেই। পরিমাণগত বাস্তবতাই একসময় আমাদের গুণগত পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যাবে। যাবেই। এ ছাড়া তো আমাদের ভিন্ন কোনো পথ নেই।

গণসংগীতের স্বরূপ-সন্ধান by যতীন সরকার

Thursday, January 27, 2011

বাংলাদেশের গণসংগীত: বিষয় ও সুরবৈচিত্র্য তরুণ গবেষক সাইম রানার বইটির শীর্ষনামেই এর পরিচয় পরস্ফুিট হয়ে উঠেছে। এ দেশের মনন সাহিত্যে এই বাণীসাধকের অভ্যুদয়কে আমি সর্বান্তঃকরণে অভিনন্দন জানাই।

বইটির ‘মুখবন্ধ’র প্রথম অনুচ্ছেদেই তিনি লিখেছেন, “...অস্ত্রই একমাত্র প্রতিরোধের ভাষা হতে পারে না। যে-কোনো সৃজন, মনন, সাধন কিংবা তান্ত্রিক জ্ঞান দিয়েও প্রতিরোধ করা সম্ভব জগতের যত পঙ্কিলতা। তা গানে হোক, দেহভঙ্গিমায় কিংবা ইশারা-ইঙ্গিতে হোক, চিত্রে বা ফসলের আবাদে হোক—নিষ্পেষিত মানুষেরা যুগে যুগে, কালে কালে কখনোই ঠগেত বসে থাকেনি। প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের ব্যাপ্তি সংস্কৃতির ভিতর দিয়ে বিকশিত হয়েছে। বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন ‘চর্যাপদ’ কিংবা লোকগীতি ‘ভাওয়াইয়া’, লোকনাট্য ‘গম্ভীরা’, তেমনি একেকটি জনপদের অধিকারের ভাষা। গণসংগীতও বিংশ শতাব্দীর অভিনব এক শিল্পদর্শন, যা সাম্রাজ্যবাদ, ফ্যাসিবাদ শোষকের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধ জাগরণের প্রতিষ্ঠিত আঙ্গিক হিসেবে মূল্যায়নযোগ্য।”
অনেক প্রস্তুতি নিয়ে ও আটঘাট বেঁধেই যে বাংলাদেশের গণসংগীতের স্বরূপ-উদ্ঘাটনে তিনি ব্রতী হয়েছেন—বইটির পাঠ-সমাপনান্তে যেকোনো পাঠককেই তা স্বীকার করতে হবে। সাইম রানা শুধু কৃতী গবেষকই নন, একজন কুশলী সংগীতরচয়িতা ও সংগীতশিল্পীও। তিনি তো ‘এক যুগ ধরে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন মঞ্চ, টেলিভিশন চ্যানেল ও রেডিওতে নিজের লেখা ও সুর করা গান নিয়মিত পরিবেশন করে আসছেন।’ এ কারণেই যথাযথ কাণ্ডজ্ঞান, তত্ত্বজ্ঞান ও রসজ্ঞানের সমন্বয়ে গণসংগীতের সংজ্ঞার্থ নির্ণয়, বিষয়ের স্বরূপ-সন্ধান ও সুরবৈচিত্র্যের বিশ্লেষণে তিনি সমান দক্ষতা প্রদর্শন করতে পেরেছেন।
সূচনালগ্ন থেকেই আমাদের দেশে গণসংগীত যে ‘বাংলা গানের বিভিন্ন শাখা-উপশাখা এবং বিদেশি সংগীতকে আশ্রয় করে বেড়ে উঠেছে’ সেসবের বিস্তৃত আলোচনা এ বইয়ে ঠাঁই পেয়েছে। বাংলা গণসংগীতের অনুপুঙ্খসমেত সব বিষয়কেই লেখক স্পর্শ করেছেন। স্বাধীনতা-পূর্বকাল থেকে শুরু করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী একাল পর্যন্ত রচিত ও গীত সব ধরনের গণসংগীতের প্রতি মনোযোগ দেওয়া মোটেই সহজ কাজ নয়। সাইম রানা সেই কঠিন কাজেই প্রবৃত্ত হয়েছেন এবং সিদ্ধিকে করতলগত করতে সক্ষম হয়েছেন।
তিনটি অধ্যায় ও পরিশিষ্টে সাতটি ক্রোড়পঞ্জীসংবলিত এই বইয়ের দ্বিতীয় ক্রোড়পঞ্জীতে নির্বাচিত নয়টি গানের আন্তর্জাতিক পদ্ধতিসম্মত স্বরলিপি সংযোজন করায় শিল্পী-গবেষক সাইম রানা অবশ্যই গণসংগীতশিল্পীদের কৃতজ্ঞতাভাজন হবেন।
বইয়ের উপসংহারে তিনি দাবি করেছেন, ‘এই গ্রন্থটি সংগীতবিষয়ক হলেও তার ক্ষেত্র মূলত তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে। রাজনৈতিক ইতিহাস, প্রগতিশীল আন্দোলনের ইতিহাস এবং সমাজতান্ত্রিক দর্শন। উপযুক্ত তিনটি বাহনের ওপর ভর করে বিশ্লেষিত হয়েছে বলে বিষয়বৈচিত্র্যের নান্দনিকতা বা সাহিত্যমূল্য ঐতিহাসিক ক্রমবিকাশের ওপর ভিত্তি করে দাঁড় করানো হয়েছে। অন্যান্য শিল্পমাধ্যমের সঙ্গে তুলনামূলক অবস্থানও প্রাসঙ্গিকভাবে উঠে এসেছে বিভিন্ন অঞ্চলে। এই গ্রন্থের সার্থকতা যেমন পূর্ববর্তী গবেষকদের গভীর অনুসন্ধান ও প্রেরণার ফসল...অপরদিকে লেখকের নিজস্ব ধরনে বিশ্লেষণের ভেতর দিয়ে উঠে এসেছে আরও নতুন নতুন ক্ষেত্রের ইঙ্গিত।’
লেখকের এই দাবির যথার্থতা সম্পর্কে সন্দেহ পোষণের কোনো অবকাশ নেই বটে, কিন্তু ভাষা ব্যবহারে সর্বত্র তিনি আড়ষ্টতা কাটিয়ে উঠতে পারেননি বলেই আমার মনে হয়েছে। এ ধরনের বইয়ের রচনারীতিতে আরও স্বচ্ছতা ও প্রাঞ্জলতা কাঙ্ক্ষিত।

আনওয়ার আহমদ স্মৃতিতে, শ্রদ্ধায় by মনি হায়দার

Saturday, January 22, 2011

তিনি ছিলেন কবি ও গল্পকার। কিন্তু সৃজনশীল এই দুটি মাধ্যমের মানুষ হয়েও আনওয়ার আহমদ এদেশের মানুষের অন্তরে বেঁচে আছেন সম্পাদক হিসেবে। কেনো তাঁর এই পরিচয়? এই পরিচয় তিনি তার কাজের ভেতর দিয়ে অর্জন করেছিলেন। বলতে দ্বিধা নেই_ সম্পাদক হওয়ার জন্যই তিনি জন্মেছিলেন এই বাংলায়।
আর একটু পরিষ্কার করে বললে বলতে হয়_ শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি লালনের জন্য আনওয়ার আহমদ সারা জীবন সাধনা করেছেন। শিল্পের মানুষদের বিপদে আপদে না ডাকলেও তিনি মমতার মন নিয়ে পাশে দাঁড়াতেন। না, বিনিময়ে তিনি কিছু কখনও চাইতেন না।। আমার ধারণা_ তিনি জানতেন_ এই সমাজের সবাই দুহাত পেতে নেয়, দিতে পারে না কিছুই। নেয়াটাই মোক্ষ। নেয়াটাই ধ্যান। নেয়াটাই যেন অধিকার। নিঃশেষে প্রাণ উজাড় করে দিতে পারে কম লোক। আনওয়ার আহমদ এই 'কম' দলের মানুষ ছিলেন আজীবন, আমৃতু্য।

১৯৬৫ সালে সম্পাদক হিসেবে তিনি সিনে পত্রিকা 'রূপম' প্রকাশ শুরু করলেন। ১৯৪১ সালে জন্ম নিলে তখন তাঁর কতইবা বয়স? চবি্বশ বছর মাত্র। চবি্বশ বছরের যুবকের সম্পাদক হওয়া, স্বপ্ন ও সাহিত্য ফেরি করে বেড়ানো_ সেকালের প্রাদেশিক রাজ্য পূর্ব বাংলায় ছিল সাহসী এবং ব্যতিক্রম। কালের পরিভ্রমণে বাংলাদেশে 'রূপম' হয়ে দাঁড়ালো গদ্যের বা গল্প বিষয়ক একমাত্র পত্রিকা। মৃতু্যর কয়েকদিন আগে শেষ সংখ্যাটি প্রকাশ করেছিলেন পেনশনের টাকায়। বগুড়া তাঁর জন্মস্থান। বগুড়ার তরুণ লেখকদের তিনি ছিলেন আশ্রয়স্থল। কেবল বগুড়া নয়_ঢাকার অনেক লেখক তাঁর বাসায় দিনের পর দিন আড্ডা দিয়েছেন। তাঁর অর্থে লালিত হয়েছেন। অনেক লেখকের প্রথম বই নিজের টাকায় প্রকাশ করেছেন তার 'রূপম' প্রকাশনী থেকে। সেই বই আবার নিজে জনে জনে বিলি করেছেন। পত্রিকা অফিসের সাহিত্য সম্পাদককে দিয়ে আলোচনা ছাপানোর ব্যবস্থা করেছেন।

আশির দশকের শুরুতে ঢাকা শহরের জাতক হলেও আনওয়ার আহমদ সম্পর্কে জানতে পারি আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে। কয়েকবার তাঁর ইস্কাটনের বাসায় গেলেও তাঁর সঙ্গে তখন অভিজ্ঞতাবোধের কারণে খাপ খাওয়াতে পারিনি। সে সময়ে তাঁর সঙ্গে আমার জমেনি। কিন্তু জমলো তাঁর জীবনের শেষ পাঁচ ছয় বছরে। আমার অফিস ছিল শাহবাগে, বেতারে। তিনি থাকতেন লালমাটিয়ায়। প্রায় প্রতিদিন দুপুরে আসতেন শাহবাগের আজিজ মার্কেটে। আমিও আসতাম। জমে উঠতো আড্ডা। তখনও আজিজ মার্কেটে হাল ফ্যাশনের পোশাকের আসর বসেনি। লেখক-শিল্পীদের পদভারে মুখরিত থাকতো। সেই জমানো আলাপে আড্ডায় দেখেছি_ তাঁর ভেতরে বাস করে এক আশ্চর্য অবোধ অভিমানী শিশুমন। তিনি কোলকাতায় কি একটা কাজে বেড়াতে যাবেন। আমাকে বরলেন_ কাউকে দিয়ে পাসপোর্টের ব্যবস্থা করতে। পাসপোর্টের কাজ করে এমন একজনকে পরিচয় করিয়ে দিলাম আনওয়ার ভাইয়ের সঙ্গে। তাকে টাকা পয়সাও দিলেন আনওয়ার ভাই। কিন্তু পাসপোর্ট পেতে দুদিন কি তিনদিন দেরি হলো। আনওয়ার ভাই আমার ওপর অসম্ভব চটে গেলেন। পাসপোর্ট নির্দিষ্ট সময়ে হাতে না পাওয়া যেন আমার অপরাধ। খুব কড়া কথা বললেন।

আমি মনে মনে ভাবলাম_এমন অবিবেচক মানুষের সঙ্গে আর সম্পর্ক রাখবো না। পাসপোর্ট হাতে পাওয়ার পর গণ প্রকাশনীর দোকানে আমার কাছে চিঠি লিখলেন দুঃখ প্রকাশ করে। আমাকে দুপুরে ভুড়িভোজ করালেন। আমাদের স্বল্পকালীন অভিমার পর্ব এখানেই সমাপ্তি ঘটে। অবশ্য এই রকম অভিমান পর্ব প্রায়ই ঘটতো_ যার কোনো প্রয়োজন থাকতো না। কিন্তু ওই যে তাঁর ভেতরে বাস করতো এক অবাক অভিমানী মন! আমি শুনেছি তাঁর অন্যতম সুহূদ বন্ধু আবদুল মান্নান সৈয়দের সঙ্গে প্রায়ই ঝগড়া লেগে থাকতো। দুমাস, ছয় মাস কথা বা যোগাযোগ বন্ধ থাকতো দুজনের মধ্যে। আবার একদিন মান ভুলে দু'জনে আড্ডায় মেতে উঠতেন। আমি অনেক লেখককে দেখেছি_ আনওয়ার ভাইকে দেখে পালিয়ে বেড়াতেন। কারণ_ সম্পাদক আনওয়ার আহমদ তাঁর গল্প পত্রিকা 'রূপম' অথবা কবিতা পত্রিকা 'কিচ্ছুধ্বনী'র জন্য লেখা চেয়েছেন। তিনি লেখা চেয়ে লেখা না পাওয়া পর্যন্ত লেখককে অতীষ্ঠ করে তুলতেন। তিনি যে লেখককে নির্দিষ্ট করতেন তার আগামী সংখ্যার লেখার জন্য, তার কাছ থেকে দুই পদ্ধতিতে লেখা আদায় করতেন। প্রায় দুদিন পর পর ছোট্ট কাগজে তাগাদা দিয়ে খামে চিঠি লিখতেন। নইলে বাসায় ফোন থাকলে_ সকালে দুপুরে বিকেলে রাতে ফোন করে করে লেখা আদায় করে তবে ক্ষান্ত হতেন।

আনওয়ার ভাই মাঝারি গড়নের প্রায় কালো রঙের মানুষ ছিলেন। মুখটা ছিল মায়াবি। চোখে থাকতো স্বপ্ন। সব সময়ে পড়তেন সাদা শার্ট আর প্যান্ট। এখন আমার মনে হয়_ সাদা পোশাক পরিধানের ভেতর দিয়ে তিনি তাঁর ভেতরের সাদা সত্তাকে প্রকাশ করতেন।

শেষ জীবনে একা থাকতেন লালমাটিয়ার ফ্ল্যাটে আনওয়ার আহমদ। চারপাশে তাঁর সবই ছিল, তারপরও কিছু ছিল না। প্রথম জীবনের মানুষগুলো তাঁর কাছ থেকে নানা কারণে দূরে ছিল। তবে তিনি কখনও একা থাকতেন না। সব সময় তাকে ঘিরে একটা আড্ডা গড়ে উঠতোই। আজিজ মার্কেটের নিচতলায় দুটো বইয়ের দোকান ছিল পাশাপাশি। একটা গণ প্রকাশ। অন্যটি পলল প্রকাশনী । এই দুটি দোকান ঘিরে আড্ডা জমতো। তবে বেশি জমতো গণ প্রকাশে। তার বন্ধুরা বা আড্ডার মানুষেরা সব সময়ে তাঁর বয়সের চেয়ে অনেক কম বয়সের থাকতো। তিনি আশ্চর্য দক্ষতায় ও মমতায় তরুণদের ভেতরে নিজেকে জারিত করতে পারতেন। পারতেন উজ্জীবিত করতে।

মনে পড়ে তাঁর মৃতু্যদিনের গল্প। হঁ্যা_ গল্পই। ২০০৩ সালের ২৩ ডিসেম্বর বিকালে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে একটি সাহিত্য সংগঠন বেশ কয়েকজনকে সংবর্ধনা দিয়েছিল। তার মধ্যে আনওয়ার ভাইও ছিলেন। যেহেতু আনওয়ার ভাই সংবর্ধিত ব্যক্তি, সেহেতু আমরাও সেখানে উপস্থিত হলাম। সংবর্ধনা শেষে আনওয়ার ভাই হঠাৎ ঘামতে শুরু করলেন। আমরা_ মানে আমি, কবি মিজান রহমান, খায়রুল আলম সবুজসহ আরও অনেকে। সবুজ ভাই তাঁকে বিশ্রাম নিতে বললেন। আনওয়ার ভাই একটা টেবিলের উপর শুয়ে পড়লেন। কে কোথা থেকে কি একটা ঔষধ এনে দিলে আনওয়ার ভাই মুখে দিলেন এবং আমাদের সঙ্গে আম গাছতলায় এসে আড্ডায় বসলেন। সবুজ ভাই তাঁকে যতো শুয়ে থাকতে বলেন তিনি কেয়ার করেন না। আসলে তিনি আড্ডা ছেড়ে শুয়ে আছেন ভাবাই যায় না। আড্ডা দিতে দিতে রাত নটার দিকে, তাও সবুজ ভাইয়ের ধমকে _ আমরা উঠতে বাধ্য হলাম। বাংলা মোটরেরর মোড়ে এসে একটা রিকশায় তুলে রিকশাঅলাকে বললাম_ রিকশাঅলা ভাই, এই বয়স্ক মানুষটাকে যত্নের সঙ্গে পৌঁছে দিও।

আনওয়ার ভাই প্রতিবাদ করে বললেন_ এই রিকশাঅলা, আমি না ওরাই বয়স্ক। আমি চির তরুণ। রিকশাঅলা সহ আমরা হাসলাম। রিকশা চলে গেলে আমরা যে যার বাসায় চলে গেলাম। পরের দিন সকাল সাড়ে নটার দিকে 'উষালোকে' সম্পাদক মোহাম্মদ শাকেরউলস্নাহ ফোন করে মর্মান্তিক খবরটা জানালেন। আনওয়ার ভাই ছোট ছোট গল্প লিখেছেন অনেক। প্রায় অণু গল্প। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে তাঁর একলা ঘরে তিনি নিজেই একটা অণুগল্প হয়ে গেলেন_ ২৪ ডিসেম্বর ২০০৩ এ রাতে পরম মৃতু্যকে আলিঙ্গন করে।

পরের দিন বিকেলে আজিজ মার্কেটে পলল প্রকাশনীতে তাৎক্ষণিক এক স্মরণসভার আয়োজন করেছিলাম। সেখানে অনেক মানুষের সমাবেশ হয়েছিল আনওয়ার ভাইকে মনে রেখে। শুধুমাত্র শিল্পের জন্য একজন মানুষ কতোবড় ত্যাগ করতে পারেন, তিনি তাঁর উজ্জ্বল উদাহরণ। তাঁর মৃতু্যর পর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে আয়োজিত এক স্মরণসভায় আবদুলস্নাহ আবু সায়ীদ বলেছিলেন_ 'আনওয়ার আহমদ শিল্পের শহীদ'। তিনি যথার্থই বলেছিলেন। বাংলা কথাসাহিত্যের পুরুষোত্তম আখতারুজ্জামান ইলিয়াস একটা লেখায় আনওয়ার আহমদকে সত্যিকারের সম্পাদক হিসেবে অভিহিত করেছিলেন , দুজনেরই জীবদ্দশায়। এই বাংলাদেশে তিনি তাঁর কাজের তেমন কোনো স্বীকৃতি পাননি। তাঁর ভেতরে দুঃখবোধ থাকলেও কখনও প্রকাশ করেননি।

আনওয়ার আহমদের প্রকাশিত কাব্যের সংখ্যা_পনেরোটি। বিখ্যাত কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ_ রিলকের গোলাপ, মানবসম্মত বিরোধ, নির্মাণে আছি, হঠাৎ চলে যাবো, শেষ সম্বল শেষ দান। গল্পের বই চারটি। আরও বেরিয়েছিল_ আনওয়ার আহমদের শ্রেষ্ঠ কবিতা, আনওয়ার আহমদের গল্প। এ ছাড়াও আর অনেক কাজ তিনি করেছেন, যা আমরা মনে রাখিনি।

আগেই বলেছি, এদেশে আনওয়ার আহমদ কোনো পুরস্কার পাননি। ট্রাজেডি হচ্ছে তাঁর মৃতু্যর সাত মাস পর কোলকাতার লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরী ও গবেষণা কেন্দ্র থেকে তাঁকে পুরস্কৃত করে চিঠি দিয়েছিল। সেই চিঠি ও পুরস্কার গ্রহণ করেছিলেন তাঁর পুত্র নাজিম আনওয়ার রূপম। এটাও একটা গল্প।

আনওয়ার ভাই, আপনার সপ্তম মৃতু্যদিবসে আপনাকে প্রণতি জানাই। মরণসাগর পাড়ে আপনি ভালো থাকুন। জানি_আমাদের যাবতীয় দীনতাকে ক্ষমা চাইবার আগেই ক্ষমা করে দিয়েছেন আপনি আপনার স্বভাব অনুসারে।

আবুল হুসেন 'বুদ্ধির মুক্তি' আন্দোলনের পথিকৃৎ

'জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব'_এই আপ্তবাক্য সামনে রেখে বিংশ শতাব্দীর প্রথিতযশা দার্শনিক আবুল হুসেন তাঁর 'বুদ্ধির মুক্তি' আন্দোলনের সূচনা করেন। বাঙালি মুসলমান সমাজের যুগ যুগান্তরের আড়ষ্ট বুদ্ধিকে মুক্ত করে জ্ঞান-পিপাসা জাগিয়ে তোলাই ছিল, তাঁর 'বুদ্ধির মুক্তি' আন্দোলনের লক্ষ্য।

তাঁর দর্শনের মূল নির্যাস ছিল মুক্তচিন্তার অনুশীলন। স্বাধীন মতপ্রকাশকে তিনি স্বজাতির আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক মুক্তির পূর্বশর্ত বলে মনে করতেন। বাঙালি মুসলমানদের আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার অনীহার সমালোচনা করে আবুল হুসেন বলেন, 'আমাদের শিক্ষাঙ্গনেই আমরা জ্ঞানের সঙ্গে বিরোধ করে আসছি। দর্শন, বিজ্ঞান ও আর্টকে আমাদের শিক্ষা কেন্দ্র হতে গলাধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছি, এই ভয়ে_পাছে আমাদের ধর্ম নষ্ট হয়। ধর্ম আমাদের এতই নাজুক!'

জন্ম পরিচিতি, শিক্ষা ও রচনাবলি

অবিভক্ত বাংলার প্রথিতযশা প্রাবন্ধিক, সমাজ সংস্কারক, চিন্তাবিদ ও দার্শনিক আবুল হুসেন ১৮৯৬ খ্রিষ্টাব্দের ৬ জানুয়ারি যশোর জেলার পানিসারা গ্রামে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস যশোরের কাউরিয়া গ্রামে। পিতা হাজী মোহাম্মদ মুসা ছিলেন একজন বিশিষ্ট আলেম।

শিক্ষা জীবনে ১৯১৪ খ্রীষ্টাব্দে আবুল হুসেন যশোর জেলা স্কুল হতে মেট্রিকুলেশন, কোলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ হতে আইএ ও বিএ এবং কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় হতে ১৯২০ সালে অর্থনীতিতে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯২২ সালে বিএল এবং ১৯৩১ সালে এমএল ডিগ্রি লাভ করেন।

পেশাগত জীবনে কোলকাতার হেয়ার স্কুলের শিক্ষকতা দিয়েই কর্মজীবন শুরু করেন। বছর খানেক পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি ও বাণিজ্য বিভাগের লেকচারের পদসহ মুসলিম হলের হাউস টিউটর নিযুক্ত হন ১৯২১ সালে। ১৯৩২ খৃষ্টাব্দে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকুরী ছেড়ে কোলকাতা হাইকোর্টে আইন পেশায় নিয়োজিত হন। অবিভক্ত বাংলার বিধান সভায় পাশকৃত ওয়াক্ফ আইনের খসড়া আবুল হুসেনই প্রস্তুত করেন।

মানবদরদী আবুল হুসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকুরী কালীন সময় হতেই 'শিক্ষা ও জ্ঞানের আলো' বিতরনের মাধ্যমে মানুষের মাঝে সচেতনতা আনায়নে কাজ শুরু করেন। কৃষি নির্ভর দেশ মাতৃকার কৃষক সমাজের দুঃখ দুর্দশার মুক্তির পথ নির্দেশনায় তিনি কৃষকের আর্তনাদ, কৃষকের দুর্দশা, কৃষি বিপস্নবের সূচনা নামক প্রবন্ধ রচনা করেন। ঢাকায় যে 'বুদ্ধির মুক্তি' আন্দোলনের সূত্রপাত হয়, যার মূলমন্ত্র ছিল- "জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব' তার নেতৃত্ব দেন অগ্রভাগে থেকেই। তিনি ঢাকায় মুসলিম সাহিত্য সমাজ গঠনের সাথে জড়িত ছিলেন এবং এর মুখপত্র 'শিখা' সম্পাদনা ও প্রকাশ করে এর আন্দোলনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন। কাজী আবদুল ওদুদ, কাজী মোতাহার হোসেন, ডঃ মুহাম্মদ শহীদুলস্নাহ্ ও আবুল ফজল তাঁকে এ কাজে সহযোগিতা করেন।

অন্ধভাবে ধর্ম ও সমাজবিধি পালন নয়; মুক্তবুদ্ধি ও যুক্তি দ্বারা ধর্ম ও প্রথাকে যাচাই করার পক্ষে তিনি জোড়ালো মতামত উপস্থাপন করেন। এতে ঢাকার রক্ষনশীল মুসলিম সমাজ ক্ষিপ্ত হয়ে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলে। যার ফলশ্রুতিতে ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দে আবুল হুসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকুিরতে ইস্তফা দিয়ে কোলকাতায় চলে যেতে বাধ্য হন। সেখানে তিনি আইন ব্যবসা শুরু করেন।

মাত্র ৪৩ বছর বেঁছে ছিলেন এই বাঙালি মনীষা। ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ১৯৩৮ সালের ১৫ অক্টোবর কোলকাতায় মৃতু্যবরণ করেন। এই ছোট্ট জীবনকালে তিনি 'মুসলমানদের শিক্ষা সমস্যা, মুসলিম কালচার, বাঙলার নদী সমস্যা, শতকরা পঁয়তালিস্নশের জের, সুদ রিবা ও রেওয়াজ, নিষেধের বিড়ম্বনা, ঐবষড়ঃ্থং ড়ভ ইবহমধষ, জবষরমরড়হ ড়ভ ঐবষড়ঃং ড়ভ ইবহমধষ, উবাবষড়ঢ়সবহঃ ড়ভ গঁংষরস ষধ িরহ ইৎরঃরংয ওহফরধ নামক গ্রন্থসমূহ রচনা করেন। তাঁর রচনায় মুক্তবুদ্ধি, উদার চিন্তা ও অসামপ্রদায়িক সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার প্রতিফলন ঘটেছিল।

আবুল হুসেনের দর্শন, বুদ্ধির মুক্তি

১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারিতে ঢাকায় ড. মুহাম্মদ শহীদুলস্নাহ্র নেতৃত্বে 'মুসলিম সাহিত্য সমাজ' গঠিত হয়। এই সংগঠনের মূল লক্ষ্য ছিল সাহিত্য চর্চার মাধ্যমে বাঙালি মুসলমানদের সমাজ সচেতন করে তোলা। নানারূপ অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার হতে মুক্ত করা। এই সংগঠনটির নাম মুসলিম সাহিত্য সমাজ হলেও এর কর্মকান্ড আবর্তিত হত হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে সকল বাঙালির জন্য। এই সংগঠনের মুখপত্র ছিল 'শিখা' সে সূত্রে এর সঙ্গে যারা যুক্ত ছিলেন তাঁরা 'শিখা গোষ্ঠীর' লেখকরূপে পরিচিত হন। মুসলিম সাহিত্য সমাজের মূলমন্ত্র ছিল বুদ্ধির মুক্তি। আর এই শিখার সম্পাদক-প্রকাশক হিসাবে আবুল হুসেন ছিলেন 'বুদ্ধির মুক্তি' আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিদের অন্যতম। শিখা গোষ্ঠীর অন্যান্য লেখকদের মধ্যে কাজী আবদুল অদুদ, (১৮৮৭-১৯৪৮) কাজী মোতাহার হোসেন (১৮৯৭-১৯৮১), কাজী আনোয়ারুল কাদির (১৮৮৭-১৯৪৮) মোতাহের হোসেন চৌধুরী (১৯০৩-৫৬) আবুল ফজল এবং আবদুল কাদির (১৮৮৭-১৯৪৮) এর নাম উলেস্নখযোগ্য। মুসলিম সাহিত্য সমাজের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্বন্ধে আবুল হুসেন বলেন, 'বাঙালি মুসলমান সমাজের যুগ-যুগান্তরের আড়ষ্ট বুদ্ধিকে মুক্ত করে জ্ঞানের অদম্য পিপাসা জাগিয়ে তোলা।'

আবুল হুসেনের দর্শনের মূল নির্যাস ছিল মুক্তচিন্তার অনুশীলন। স্বাধীন মত প্রকাশকে তিনি স্বদেশের স্বজাতির আর্থ সামাজিক ও রাজনৈতিক মুক্তির পূর্বশর্ত বলে মনে করতেন। বাঙালি মুসলমানদের আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চার অনীহার সমালোচনা করে আবুল হুসেন বলেন- আমাদের শিক্ষাঙ্গনেই আমরা জ্ঞানের সঙ্গে বহুদিন হতে বিরোধ করে আসছি। দর্শন, বিজ্ঞান ও আর্টকে আমাদের শিক্ষা কেন্দ্র হতে গলাধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছি, এই ভয়ে- পাছে আমাদের ধর্ম নষ্ট হয়। ধর্ম আমাদের এতই নাজুক।

"ব্রিটিশের সঙ্গে ইউরোপের জ্ঞানদীপ্ত মন যখন এ দেশে আসলো এবং আমাদের আড়ষ্ট মনকে আঘাত করল, তখন হিন্দু সমাজ সে আঘাতে জেগে উঠলো এবং জ্ঞানদীপ্ত মনকে বরণ করে নিল। আর আমরা মুসলমানরা সে আঘাতে জাগতে তো চাই-ই নি বরং চোখ রাঙিয়ে সে মনকে দূরে সরিয়ে দিয়েছি। ইয়োরোপের জ্ঞানকে আমরা প্রত্যাখ্যান করেছি। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, আজ পর্যন্ত আমরা আমাদের সে নিদারুণ ভুলের সংশোধনের চেষ্টা করি নাই। বরং সে ভুলকে বর্তমানে আরো জোর করে আঁকড়ে ধরেছি।"

জ্ঞান সাধনাই ছিল জ্ঞান তাপস আবুল হুসেনের জীবন দর্শন। তাই তো তিনি তাঁর প্রথম পেশা হিসাবে শিক্ষাকতাকেই বেছে নিয়েছিলেন। থাকতে চেয়েছেন শিক্ষকতায় মনে প্রাণে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় যোগ দেবার পাশাপাশি নিজের সাহিত্য সাধনা ও সমাজ সংস্কারমূলক কর্মকান্ডের মাধ্যমে এদেশের সাধারণ মানুষকে জ্ঞানের পথে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছেন। বাঙালির মধ্যে জ্ঞানস্পৃহা জাগরণে আবুল হুসেনের বাংলার বলশী (১৩৩২ বঙ্গাব্দ) এবং বাঙালি মুসলমানের শিক্ষা সমস্যা (১৩৩৫) অসমান্য অবদান রেখেছে। আবুল হুসেনের দর্শনের মূল কথা ছিল 'জ্ঞানেই মুক্তি' আর বুদ্ধির মুক্ত চর্চা ছাড়া জ্ঞানের ফল সার্বিকতা পায় না। তাই তিনি মুসলিম সাহিত্য সমাজের মুখপত্র 'শিখা' সম্পাদনার মধ্য দিয়ে "জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব"। এই শেস্নাগানের মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে বুদ্ধির মুক্তির জন্য কাজ করেন।

আবুল হুসেন এর দর্শনে মানবতাবাদ ও অসামপ্রদায়িকতা

বাঙালি মানবতাবাদী দার্শনিক হিসাবে আবুল হুসেন মানসে লালন করতেন অসামপ্রদায়িক মানবতাবাদের আদর্শ। যার প্রমাণ আবুল হুসেন এর নিজের লেখনিতেই পাওয়া যায়। মুসলিম সাহিত্য সমাজের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য প্রসঙ্গে লিখিত নিবন্ধে তিনি লিখেন, 'কেহ হয়ত মনে করবেন এ সমাজের নাম 'মুসলিম সাহিত্য সমাজ' হওয়ায় হিন্দু সাহিত্যিকগণের কোন সম্পর্ক এতে নেই। কিন্তু এই বার্ষিক রিপোর্ট হতে আপনারা বুঝবেন যে এ সমাজ কোন একটি নির্দিষ্ট গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ নয় কিংবা এ কোন এক বিশেষ সামপ্রদায়িক উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য গঠিত হয়নি। সাহিত্য সৃষ্টি এর উদ্দেশ্য, আর সেই সাহিত্যে মুসলমানের প্রাণ ও জীবন ফুটিয়ে তোলাই ইহার অন্যতম উদ্দেশ্য।'

সত্যই তাই আবুল হুসেনের সম্পাদনায় 'শিখা' বাংলার তরুণদের মনে উদার মনোভাব সৃষ্টির জন্য নিরলস ভাবে কার্যকর ছিল। মুসলিম সাহিত্য সমাজের ব্যানারে শিখা গোষ্ঠীর কার্যক্রম উভয় বাংলার জ্ঞানী গুণীদের আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়েছিল। যার প্রমান মিলে- ১৯২৭ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত মুসলিম সাহিত্য সমাজের প্রথম বার্ষিক সাধারণ সম্মেলনে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, চারুচন্দ্র বন্দোপাধ্যায়, মোহিত লাল মজুমদার, ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার প্রমুখ হিন্দু মনীষার অংশ গ্রহণ। যা আবুল হুসেনসহ সমগ্র শিখা গোষ্ঠীর অসামপ্রদায়িক উদারমনা মানবতাবাদেরই পরিচয় বহন করে।

জ্ঞানের অনুরাগী আবুল হুসেন এদেশের সমাজ, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও আইনকে যুক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াসে আজীবন কাজ করেছেন। মানব কল্যাণে আবুল হুসেনের ভাবনা ছিল উপযোগবাদী। আবুল হুসেন নিজে একজন কমিউনিষ্ট না হলেও তৎকালীন রুশ সমাজতান্ত্রিক বিপস্নব দ্বারা ব্যাপক ভাবে প্রভাবিত হন। ঔপনিবেশিক ও সামন্তবাদী সমাজের নিপীড়িত কৃষকের অবস্থা সবিস্তারে বর্ণিত হয়েছে তাঁর 'বাংলার বলশী' পুস্তকে।

আবুল হুসেনের দর্শন ও কর্মের মূল্যায়ন

চিন্তাবিদ হিসাবে আবুল হুসেন ছিলেন মানবতাবাদী, সংস্কারপন্থী ও মুক্তচিন্তার পৃষ্ঠপোষক। জ্ঞান চর্চায় তিনি যুক্তি বুদ্ধিকেই প্রাধান্য দিয়েছেন সর্বাধিক। আর এই যুক্তি বুদ্ধি ও প্রজ্ঞা প্রীতির কারণেই তৎকালে তিনি লিখতে পেরেছিলেন, "অন্যান্য ধর্মের ন্যায় ইসলামও কতগুলি আদেশ ও নিষেধের সমষ্টি মাত্র। ইসলাম মানুষের জন্য, মানুষ ইসলামের জন্য নয়। কালের পরিবর্তনে ধর্মশাস্ত্রের কথা মানুষ পুরোপুরি পালন করতে পারে না। যেহেতু, সংসারের উন্নতির জন্যই মূলত ধর্ম বিধানের সৃষ্টি, সেহেতু, যুগের সাথে সংসারের উন্নতির জন্য ধর্ম বিধানও পরিবর্তনীয়। নবীজীর অমোঘ বাণী-যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলো এবং জ্ঞান অর্জনের জন্য প্রয়োজন হলে চীন দেশে যাও, আমরা ভুলতে বসেছি।

ইসলামের অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কার এবং স্বদেশ স্বজাতির উদ্দেশ্যে ইসলামের যুক্তিনিষ্ঠ স্বরূপ উপস্থাপন করে, 'আদেশের নিগ্রহ' নামের যে প্রবন্ধ আবুল হুসেন লিখেছেন; তৎকালীন রক্ষনশীল মুসলিম সমাজে তার ভয়াবহ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। তারা আবুল হুসেনকে ইসলামের শত্রুরূপে আখ্যায়িত করে। আহসান মঞ্জিলের এক সালিসিতে উপস্থিত হয়ে তাঁকে লিখিত ভাবে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করে। ইসলাম সবযুগের সব স্থানের সব মানুষের সব প্রয়োজন মিটাতে ও সব সমস্যার সমাধান দিতে পারে না বলে তিনি মনে করেন এবং বলেন, 'সে প্রয়োজন মিটাতে হবে আমাদের জ্ঞান বুদ্ধি খাটিয়ে'। তাঁর প্রবন্ধের এটাই ছিল সারমর্ম। আবুল হুসেন পরের দিন সাহিত্য সমাজের সম্পাদকের পদ এমনকি সদস্য পদও ত্যাগ করেন এবং পরিশেষে ঢাকা ত্যাগ করে কলিকাতায় গমন করেন।

আবুল হুসেন ছিলেন সাহসী মানুষ। স্বাধীন যুক্তিবাদী ও মুক্তচিন্তা চর্চা তখনো এদেশে সহজ ছিল না, এখনো নেই। এজন্য আহমদ শরীফ আবুল হুসেন সম্পর্কে বলেন, 'শিখা আন্দোলনের প্রাণ পুরুষ ছিলেন আবুল হুসেন। তিনি সংস্কারক বিবেকবান পুরুষ তাই তাঁর স্বল্পকালীন জীবন নিবেদিত ছিল স্বদেশের, স্বসমাজের ও স্বজাতির কল্যাণ চিন্তায় ও হিত সাধনে। দেশ, মানুষ, ধর্ম, ন্যায় ও কল্যাণ সম্বন্ধে তার চিন্তা চেতনায় কিছু কিছু অনন্যতা ছিল।'

পরিশেষে আহমদ শরীফের মূল্যায়ন দিয়েই শেষ করছি, 'আবুল হুসেন চিন্তা চেতনায় ছিলেন মানবতাবাদী। তাই তিনি অসামপ্রদায়িক, উদার, শ্রেয়োবাদী ও হিতবাদী এবং দৈশিক জীবনের সর্বক্ষেত্রে হিন্দু মুসলিম মিলনকামী ও গনহিতে মিলিত প্রয়াসকামী। নিরঙ্কশ প্রীতিই এ বন্ধনসূত্র ও মিলন সেতু।'

আর আমাদের লজ্জা হলো এমন তরো দর্শন অনুরাগী বুদ্ধির মুক্তির আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিকে কিনা শেষ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার চাকুরী ছেড়ে কোলিকাতায় যেতে বাধ্য করেছে। এটি অবশ্যই বাঙালির দর্শনের অপরিমেয় ক্ষতি।

শতাব্দীর ২য় দশকে দেশের অর্থনীতি যে পথে এগুবে by ড. শামসুল আলম

Tuesday, January 18, 2011

ত নির্বাচনে রূপকল্প ২০২১ জাতির সামনে পেশ করা ছিল আওয়ামী লীগের জন্য দূরদৃষ্টি সম্পন্ন ঐতিহাসিক এক পদক্ষেপ। বাংলাদেশ ২০২১ সাল নাগাদ কোথায় পেঁৗছুবে সেখানে ছিল সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের কথা।

জাতি সমৃদ্ধি অর্জনে এগিয়ে যেতে চায়, বর্তমান আর্থ-সামাজিক অবস্থা থেকে পরিবর্তন চায় এর প্রমাণ হল, যখনই আওয়ামী লীগ ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখালো, মধ্যম আয়ের উন্নত দেশ হবার কথা বললো, বিগত নির্বাচনে সত্তরের নির্বাচনের পুনরাবৃতি ঘটিয়ে বিজয়ী হল। বলা হয়ে থাকে নবীন ভোটাররা বিপুল সংখ্যায় গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছে। এ কথা সত্য যে, নবীন প্রজম্ম পরিবর্তনের জন্য উন্মুখ। তারা হতাশার কথা শুনতে চায় না, দ্বন্দ্ব দেখতে চায় না। আর এ জন্যই নেতিবাচক রাজনীতি করে কোন রাজনৈতিক দলের পক্ষেই এখন টিকে থাকা কঠিন হবে। যা হোক, পরিবর্তনের কথায় আসি। আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের প্রধান উৎস অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। সম্পদের বৃদ্ধি সাধন। জাতিগতভাবে সম্পদের বৃদ্ধিকে পরিমাপ করা হয় জাতীয় উৎপাদনের মাধ্যমে, যাকে অর্থনীতির পরিভাষায় বলা হয় জিডিপি বা গ্রস ডমেষ্টিক প্রডাক্ট। প্রবৃদ্ধির হার ছয় শতাংশ বৃদ্ধি পেলে, মোটামুটি মাথাপিছু আয় বাড়ে চার শতাংশ। দারিদ্র্যের সংখ্যা কমে যায় প্রায় আড়াই শতাংশ। রূপকল্পের ভিশন অনুযায়ী মধ্যম উন্নত দেশ হতে হলে ২০১৫ সালের মধ্যে জাতীয় প্রবৃদ্ধির হার হতে হবে অন্তত আট শতাংশ এবং তৎপরবর্তী কাল নাগাদ নয় শতাংশ এবং ২০২১ সালের পূর্বেই ১০ শতাংশ জাতীয় প্রবৃদ্ধি অর্জন।

একবিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকে সরকারের দু'টি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হবে। বাংলাদেশ মধ্যমেয়াদি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার পথ ছেড়েছে ২০০২ সালে এবং সেটা ছিল আওয়ামী লীগ সরকার প্রণীত পঞ্চম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা। ২০০২ জুলাই থেকে তিন বছর মেয়াদী দারিদ্র্য নিরসন কৌশলপত্র (পি,আর,এসপি) বাস্তবায়ন শুরু হয়েছিল। সংশোধিত দ্বিতীয় পি,আর,এসপি যা এখনো বাস্তবায়নাধীন আছে যার মেয়াদ শেষ হবে জুন ২০১১ তে। এই পি,আর,এসপি নামীয় কৌশলপত্রের মূল প্রেরণাদাতা হল বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ। খণ্ডিত এই পরিকল্পনা কৌশল ছেড়ে বর্তমান সরকার পুনরায় মধ্যমেয়াদী পরিকল্পনা ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং জুন ২০১১ এর পূর্বেই এই পরিকল্পনা দলিল চূড়ান্ত রূপ পাবে। এই সরকারের এটি তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত এই জন্য যে, এতে ২০১৫ সালের মধ্যে আর্থ-সামাজিক বিভিন্ন লক্ষ্যমাত্রা ও সেসব অর্জনের বাস্তবানুগ কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২১ সাল হবে বাংলাদেশে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী বছর এবং ভিশন ২০২১ এর আলোকে এই সরকার একটি প্রেক্ষিত পরিকল্পনা (২০১১-২০২১)-এর রূপরেখাও প্রণয়ন করেছে যা অনুমোদনের চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এই প্রেক্ষিত পরিকল্পনার রূপরেখার ভিত্তিতেই ষষ্ঠ ও সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী দু'টো পরিকল্পনা প্রণীত হবে। এই জন্যই একবিংশ শতকের এই দ্বিতীয় দশক হবে বাংলাদেশের জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা মাফিক লক্ষ্য অর্জনের অর্থনৈতিক সংগ্রাম। উলেস্নখযোগ্য হল যে, ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার মধ্যদিয়ে বাংলাদেশ কি অর্জন করতে চায় ২০২১ সাল নাগাদ, প্রেক্ষিত পরিকল্পনায় তা স্পষ্টায়ন করা হয়েছে। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় প্রেক্ষিত পরিকল্পনার ভিত্তিতে লক্ষ্যসমূহ নির্ধারণ ও কৌশল চিহ্নিত হয়েছে। এই দশকের উন্নয়ন কৌশলের প্রধান চালিকাশক্তি হবে বেসরকারি খাত। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য হল উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জন ও সর্বোচ্চ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং এর মধ্যদিয়েই ২০১৫ সাল নাগাদ দারিদ্র্যের হার ২৯ শতাংশ কিংবা এর নীচে নামিয়ে আনা। ২০২১ সাল নাগাদ দারিদ্র্যের হার ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশ্ব মন্দার সময়েই মহাজোট সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পায় এবং ২০০৮-০৯ বছরে প্রদ্ধির হার ছিল ৫.৭ ভাগ এবং ২০০৯-১০ সালে ৬.০ শতাংশ। বিশ্ব মন্দার প্রেক্ষাপটে এ প্রবৃদ্ধির হার সন্তোষজনকই বলতে হবে। তবে বর্তমান আর্থিক বছরে প্রবৃদ্ধির হার প্রাক্কলন করা হয়েছে ছয় দশমিক সাত শতাংশ। জাতীয় সম্পদ বৃদ্ধির মাধ্যম হল কৃষি, শিল্প, ম্যানুফেকচারিং ও সেবামূলক কাজে উৎপাদক ও ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা শ্রেণীর অংশগ্রহণ। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচী বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকারও সম্পদ ও পুঁজি সৃষ্টি করে থাকে। তবে সরকারের এ বিনিয়োগ মাত্র (বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচী) মোট জাতীয় আয়ের চার দশমিক এক শতাংশ। এ ছাড়াও সরকার বেতন-ভাতাদি খাতে ব্যয় করে থাকে, সে ব্যয়ও জাতীয় আয়ের প্রায় সাড়ে বার ভাগ। এটা বিনিয়োগ নয় বরং সরকারী ভোগ ব্যয়। মূল কথা হচ্ছে, জাতীয় সম্পদ সৃষ্টিতে আর যে ছিয়ানব্বই শতাংশ বিনিয়োগ সে সবটাই হচ্ছে বেসরকারী বা ব্যক্তি বিনিয়োগ। এখন অর্থনীতির ব্যাপক প্রবৃদ্ধি অর্জন চাইলে এই ছিয়ানব্বই ভাগ বিনিয়োগের দক্ষতা প্রসারতার উপরই বহুলাংশে নির্ভর করে জাতীয় প্রবৃদ্ধির হার। মূল কথা হচ্ছে বা বাস্তবতা হচ্ছে, বেসরকারী খাতই আমাদের প্রবৃদ্ধি অর্জনের মূল বা প্রায় একমাত্র চালিকাশক্তি। এই বেসরকারী খাত বিনিয়োগে কতটা এগিয়ে যেতে পারে বা কত বেশী বিনিয়োগ করতে পারবে, তা নির্ভর করে যোগাযোগসহ অবকাঠামো খাত কতটা দক্ষ এবং সুযোগ দিতে পারে। শিল্প-কারখানা প্রতিষ্ঠান চালানোর জন্য কতটা প্রয়োজনীয় জ্বালানি শক্তি পাওয়া যায় তার উপর। সড়ক জনপথ, কমিউনিকেশন বন্দরসহ শিল্প, বিদু্যৎ ও জ্বালানি খাতে অবকাঠামো গড়ে তোলাই হচ্ছে সরকারী বার্ষিক উন্নয়ন ব্যয়ের অন্যতম লক্ষ্য। সরকারী বিনিয়োগ এই কারণেই জাতীয় আয়ের অংশ হিসেবে কম হলেও গুরুত্বপূর্ণ। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচীতে যা বরাদ্দ প্রাক্কলন করা হোক, তার পুরোটা বাস্তবায়ন হয় না। গত আর্থিক বছরে সর্বোচ্চ ব্যয়িত হয়েছিল একানব্বই শতাংশ। সরকারী বিনিয়োগ ব্যয়ের দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কাজ না করেই কোটি টাকা ব্যয়ের নজীরও রয়েছে অতীতে এদেশে। সড়ক পাকা করার কয়েক মাসের মধ্যেই দেখা যায় খোয়া উঠে যাচ্ছে। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও দেখা যায় আমাদের দেশের সর্বোচ্চ বিনিয়োগ হচ্ছে না। এখন তার প্রধান কারণ হচ্ছে প্রয়োজনীয় বিদু্যৎ বা জ্বালানির অপ্রতুলতাসহ অপর্যাপ্ত ও অদক্ষ অবকাঠামো সুবিধা। আমাদের জাতীয় আয়ের বিনিয়োগ উপযোগী সঞ্চয়ের পরিমাণ হচ্ছে বত্রিশ শতাংশ, যা টাকার অংকে প্রায় দুই লক্ষ বিশ হাজার নয়শ' তিরাশি কোটি টাকা। বিনিয়োগ হচ্ছে জাতীয় আয়ের চবি্বশ শতাংশ মাত্র যা টাকার অংকে প্রায় এক লক্ষ পঁয়ষট্টি হাজার সাতশ' সাঁইত্রিশ কোটি টাকা। বিনিয়োগযোগ্য অব্যবহূত পঞ্চান্ন হাজার দুইশ' ছিচলিস্নশ কোটি টাকা যা জাতীয় আয়ের ছয় শতাংশ এবং মার্কিন ডলারে সাত দশমিক ঊননব্বই বিলিয়ন টাকা। আমরা গড় যা বার্ষিক বিদেশী ঋণ সহায়তা পেয়ে থাকি তা আমাদের জাতীয় স্থূল আয়ের মাত্র এক দশমিক চুরানব্বই শতাংশ, টাকার অংকে যা প্রায় তের হাজার তিনশ' সাতানব্বই কোটি টাকা। এ অংক থেকে এটা স্পষ্ট যে আমরা আমাদের বিনিয়োগ সামর্থ্যের পুরোটা কাজে লাগাতে পারলে, বৈদেশিক ঋণ সহায়তার দ্বারস্থ হতে হয় না এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে দাতাদের খবরদারিত্ব মেনে নিতে হয় না। বর্তমানে জাতীয় আয়ের চার শতাংশ বিনিয়োগে গেলে জাতীয় আয় বৃদ্ধি প্রায় এক শতাংশ। জাতীয় স্থূল আয়ের (জিডিপি'র), বর্তমান ২৪ শতাংশ বিনিয়োগে আমাদের প্রকৃত বার্ষিক প্রবৃদ্ধির গড় হার এখন ছয় শতাংশ। প্রতিবছর আট শতাংশ প্রবৃদ্ধি চাইলে জাতীয় আয়ের বত্রিশ শতাংশই বিনিয়োজিত হতে হবে। আট শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলে বছরে দারিদ্র্যের সংখ্যা কমে যাবে সাড়ে তিন শতাংশ হারে। ২০১১ সালের অর্থনীতির খাতে মূল চ্যালেঞ্জ হলো জাতীয় প্রবৃদ্ধির হার অন্তত সাত শতাংশে পেঁৗছানো, (সরকারী টার্গেট ছয় দশমিক সাত শতাংশ)। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জনগণকে যে স্বপ্নতাড়িত করেছে, তা অর্জনের প্রায় একমাত্র নিয়ামক হল এই প্রবৃদ্ধির হার শুধু ছয় শতাংশে ধরে রাখা নয়। ক্রমান্বয়ে তা সাত এবং পরবর্তীতে আট শতাংশে পেঁৗছানো। বেসরকারী বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়াতে হলে, দেশের মেধা-মননকে সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে চাইলে, জনগণের শক্তি বিকাশের সব ব্যবস্থা হাতে নিতে হবে। বাজার ব্যবস্থার উপর নির্ভর করেই ব্যক্তিখাতের সব অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালতি হয়ে থাকে। বাজার ব্যবস্থা হবে উন্মুক্ত, প্রতিযোগিতমূলক। বাজার সৃষ্টির প্রতিবন্ধকতা থাকলে (যেমন, যোগাযোগ ব্যবস্থার ত্রুটি থাকলে বাজার সৃষ্টি বাধাপ্রাপ্ত হয়), বাজরে প্রতিযোগিতা কোন কারণে ব্যাহত হলে, বাজারে পণ্যের গুণগত মান রক্ষিত না হলে, এসব বিষয়গুলো, বাজারের তত্ত্বাবধান হিসেবে সরকারকেই দেখতে হবে। সরাসরি সরকার ব্যবসায় নামবে না বা ব্যবসা করবে না। আজকের প্রেক্ষাপটে এটিই চরম বাস্তবতা। এই আলোকেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ১ জানুয়ারী বাণিজ্য মেলায় উদ্বোধনী বক্তব্যে উলেস্নখ করেছেন 'ব্যবসায়ীরাই ব্যবসা করবে, সরকার ব্যবসা করবে না'। কথাগুলো তিনি সহজভাবেই গুছিয়ে বলেছেন, যার নীতিগত মূল্য অপরিসীম। সরকার ব্যবসা করলে কি লণ্ডভণ্ড অবস্থা হয়, আদমজি পাটকল ধ্বংস হয়ে যাওয়াই এর প্রকৃত উদাহরণ ( যেখানে আশি হাজার শ্রমিকের জন্য ছুটা শ্রমিক রাখা হত চলিস্নশ হাজার)। এই বক্তব্যের আলোকেই সরকারের সব লোকসানী শিল্প-কারখানা থেকে হাত গুটিয়ে নেয়া উচিত। মুনাফাভিত্তিক ব্যক্তিখাত সুযোগ পেলেই, গলাকাটা মুনাফা কিংবা রক্তচোষায় পরিণত হতে পারে। সে কারণেই বাজার তদারকী এবং যথাসময়ে প্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ করে বাজারকে সঠিক ধারায় রাখার জন্য, প্রতিষ্ঠান হিসেবে সরকারকেও যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে উঠতে হয়।

দেশের জন্য এবং দেশের বাইরের জন্য যাতে প্রয়োজনীয় পণ্য বাজার গড়ে উঠে এবং যে পণ্য বাজার সৃষ্টি হয়েছে সেগুলো বিনা বাধায় যাতে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে, সার্বিকভাবে এই বিষয়গুলো দেখাই সরকারের মৌলিক ও প্রধান দায়িত্ব। সুযোগ পেলে, প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর সুবিধা পেলে, বেসরকারী খাত অসাধ্য সাধন করতে পারে। এই বেসরকারী হাত দিয়েই আমরা খাদ্য উৎপাদনে স্বাধীনতার পরে এক কোটি টন থেকে এখন তিন কোটি পঞ্চাশ লক্ষ টনে পেঁৗছিয়েছি। তিনশ' মিলিয়ন মার্কিন ডলারের রপ্তানি আয়কে ষোল দশমিক দুই বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করেছি। ব্যক্তিখাতের ওষুধ রপ্তানির আয় এখন প্রায় এক বিলিয়ন ডলারে পেঁৗছেছে। ব্যক্তিখাতের রেমিটেন্স আয় এখন দশ দশমিক বাহাত্তর বিলিয়ন মার্কিন ডলার। উন্নত প্রযুক্তির জাহাজ রপ্তানির সামথর্্যও অর্জন করেছে ব্যক্তিখাত। কাজেই ব্যক্তিখাতই হবে আমাদের উন্নয়নের চালিকাশক্তি। সেই চালিকাশক্তিকে আরো গতি দিতে সরকারকে মানবসম্পদ উন্নয়নে ব্যাপক প্রয়াস নিতে হবে। সড়ক, জনপথ, বন্দরের মত ভৌত অবকাঠামো, বিদু্যৎ উৎপাদন ও জ্বালানি অনুসন্ধানের সর্বোচ্চ ব্যয়ের পরিকল্পনা এবং সেই সংগে বাজার চাহিদা উপযোগী দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টিতে সরকারের জন্য এখন হবে শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ ব্যয়। আমাদের প্রতিবেশী চীনে প্রবৃদ্ধির হার বার থেকে তের শতাংশ, ভারতে নয়-দশ শতাংশের বিবেচনায় আমাদের প্রবৃদ্ধির হার এখনো অনেক পেছনে। একুশ শতকের দ্বিতীয় দশক বাংলাদেশের জন্য চিহ্নিত হতে হবে প্রবৃদ্ধির জন্য উলস্নম্ফনের দশক হিসেবে। উচ্চতর প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন এবং ডিজিটাল বাংলাদেশের যে স্বপ্ন স্বাধীনতার দল আওয়ামী লীগ জাগিয়েছে তা বাস্তবায়নে উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জন ছাড়া আর কোন বিকল্প নেই।

দেখা দিক শাশ্বত কল্যাণ by সাযযাদ কাদির

বিদায় ২০১০। স্বাগত ২০১১। ভালয় মন্দয় কেটেছে আমাদের গত একটি বছর। এর চেয়ে যেন ভাল কাটে নতুন বছরটি। আমাদের আশা এই একটিই। মার্কিন প্রবচনবিদ উইলিয়াম আথার ওয়ার্ড (১৯২১-১৯৯৪)-কে অনুসরণ করে এ দিনটিতে বলতে ইচ্ছা করে আহা আরও একটি বছর এলো জীবনে। মনে হয় বাঁচবো আরো একটি বছর।

তাই আর দুশ্চিন্তা নয়, ভয় আর সন্দেহ নয়। অন্তরের সব সাধ নিয়ে যথাসাধ্য করে যাবো এবার । এখন থেকে প্রতিটি দিন বাঁচবো হাসি-আনন্দে, সৃষ্টিতে-সাধনাতে থাকবো মনেপ্রাণে মগ্ন। আরো একটি বছর মানে আরো অনেক সুযোগ। সেসব সুযোগের সদ্ব্যবহার করে এবার শুদ্ধ করে নেবো সব ভুল, কাজ করে যাবো শান্তির জন্য। অন্তত একটি গাছের চারা লাগাবো পথের ধারে, আর আগের চেয়ে অনেক বেশি আনন্দে চলবো-বলবো-গাইবো!

গত বছরের অভিজ্ঞতা যা হোক, নতুন বছর শুরুর এই দিনগুলোতে নানা আশা জাগে আমাদের মনে, আমরা ভরসাও করি নানা কিছুতে। বিশেষ করে নিজেদের উদ্যমের ওপরই আস্থা রাখি বেশি। মনে পড়ে স্কুলজীবনে পাঠ্যপুস্তকে পড়া কবি আবদুল কাদির (১৯০৬-১৯৮৪)-এর "জয়যাত্রা" নামের কবিতাটির কয়েক পঙক্তিঃ

যাত্রা তব শুরু হোক হে নবীন, কর হানি' দ্বারে

নবযুগ ডাকিছে তোমারে।

তোমার উত্থান মাগি' ভবিষ্যৎ রহে প্রতীক্ষায়

রুদ্ধ বাতায়ন পাশে শঙ্কিত আলোক শিহরায়!

সুপ্তি ত্যাজি' বরি' লও তারে, লুপ্ত হোক অপমান,

দেখা দিক শাশ্বত কল্যাণ।

তবুও পুরনোকে ফেলে না দিয়ে, ভুলে না গিয়ে তার মূল্যায়ন-বিশেস্নষণ করে সেই অভিজ্ঞতার আলোকে সামনে এগিয়ে যাওয়া ভাল। এজন্যই প্রয়োজন ফিরে দেখা। সে দেখা একবার নয়, মাঝে-মধ্যেই দেখা দরকার। গত বছর কি চেয়েছিলাম, কি পেয়েছি আর কি হারিয়েছি তা নতুন বছরের শুরুর এই সময়টাতেই মনে পড়ে বেশি-বেশি। আমার ভাবনায় এই হারিয়ে যাওয়াদের অ্যালবামটাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে বারবার। এ বছর অনেক প্রিয়জনকে হারিয়েছি বলেই হয়তো এমন হয়। প্রথমেই বলতে হয় কবি ও বহুমাত্রিক লেখক আবদুল মান্নান সৈয়দের বিদায়ের কথা। এত আকস্মিক তাঁর বিদায় যে বেদনার্ত হওয়ার চেয়ে আমি বুঝি বিমূঢ়ই হয়েছি বেশি। আমার চেয়ে বয়সে ছিলেন কিছু বড়, সাহিত্যিক যাত্রাতেও ছিলেন একটু আগে তবে নানা দিক দিয়ে অত্যন্ত কাছাকাছি ছিলাম আমরা। বিভিন্ন বিষয়ে মতামত দিতে গিয়ে লক্ষ্য করেছি তাঁর সঙ্গে আমার অমিলের চেয়ে মিল-ই বেশি। আমাদের বাসাও কাছাকাছি। তাই দেখাও হতো মাঝে-মধ্যে। আর ফোনে তো কথা হতোই। মৃতু্যর মাত্র ক'দিন আগে কথা হয়েছিল একটি লেখার সূত্রে। তাঁকে যে প্রাবন্ধিক-গবেষক নয়, মূলত কবি হিসেবে আমি মূল্যায়ন করি তা তিনি জানতেন। তাঁর মৃতু্যর পর এক শোকনিবন্ধ লিখেছিলাম পত্রিকায়। সে লেখাটির শুরু ছিল এ রকম:

"আবদুল মান্নান সৈয়দকে প্রথম দেখি ১৯৬৪ সালের শেষদিকে। তখন তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়-জীবনের পাট শেষ। শরিফ মিয়ার ক্যান্টিনের সামনে খোলা ঘাসের চত্বরে বসেছিলেন তখনকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক স্যাড জেনারেশনের কবি-লেখকরা। স্যাড জেনারেশনের মুখপত্রে লেখেননি এমন ক'জন এবং বাইরের বন্ধু-বান্ধবও ছিলেন দু'-একজন। তাঁদের অনেকেই আজ আর নেই। যেমন: আফজাল চৌধুরী, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, ইউসুফ পাশা, ইনামুল কবির ব্র?হ্মা, মাহবুবুল আলম জিনু। এখনও আছেন রফিক আজাদ, বুলবুল খান মাহবুব, প্রশান্ত ঘোষাল, মুহম্মদ মোজাদ্দেদ, রণজিৎ পাল চৌধুরী। মান্নান এসেছিলেন সবার শেষে। সন্ধ্যা ঠেকিয়ে। পরনে খুব অাঁটোসাঁটো টেডি প্যান্ট, বেল্ট, ইন করা ফুলেল ফুল শার্ট। সেখানে ও রকম টেডি প্যান্ট পরা ছিলেন আরো দু'জন _ রফিক আজাদ ও ইউসুফ পাশা।"

এখানে উলিস্নখিত মুহম্মদ মোজাদ্দেদও বিদায় নিয়েছেন এ লেখার কিছুদিন পর, গত ২৬ নভেম্বর। তিনি পরিচিত ছিলেন 'দাদু' নামে। সম্ভবত আড্ডার সবার চেয়ে বয়সে বড়, কিছুটা গাম্ভীর্যমণ্ডিত ও স্বল্পভাষী ছিলেন বলে সম্বোধিত হতেন ওই রকম একটি নামে। ছাত্রজীবনে থাকতেন ঢাকা হলে। রুমমেট ছিলেন কবি আসাদ চৌধুরীর। ১৯৬৪ সালের প্রথমদিকে একবার দুপুর বারোটায় তাঁদের রুমে গিয়ে দু'জনকে দেখেছিলাম গভীর ঘুমে মগ্ন।

মুহম্মদ মোজাদ্দেদ কখনও কিছু লিখেছেন কিনা জানি না, তবে স্যাড-স্বাক্ষর গোষ্ঠীর আড্ডা ও অন্যান্য তৎপরতায় তিনি ছিলেন অপরিহার্য। সবখানেই তাঁর মতামতের ছিল বিশেষ গুরুত্ব। এছাড়া রবীন্দ্রনাথের ব্যাপারে আমরা বিশেষজ্ঞ মানতাম তাঁকে। ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত "স্বাক্ষর"-এর তৃতীয় সঙ্কলনের প্রকাশক ছিলেন তিনি। তখন তাঁর ঠিকানা ছিল "২৫৭ নং এলিফ্যান্ট রোড, সাউথ ধানমণ্ডী"।

১৯৯৫-২০০৪ সালে প্রায় সকালেই তাঁর সঙ্গে দেখা হতো আমার। অফিসের গাড়িতে তিনি যেতেন কর্মস্থল বাংলা একাডেমী, আমি যেতাম বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট। দেখা হওয়া মাত্র হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠতেন, হাত নাড়তেন। সেই হাসি, হাত নাড়া মনে আছে। মনে থাকবে।

তারপর গাড়ি করে অফিসে যাওয়া নেই ছ'-সাত বছর হলো। মুহম্মদ মুজাদ্দেদের সঙ্গেও দেখা নেই আর। হঠাৎ করে সেদিন বাসা থেকে বেরোতে গিয়ে এক কালো গাড়ির মুখে পড়ে যাই। দেখি বসে আছেন তিনি। বয়সের ছাপ সর্বাঙ্গে। ভাবি, আমাকে চিনবেন কিনা। কিন্তু 'দাদু' বলে যেই ডেকেছি অমনি সেই আগের মতোই উজ্জ্বল হয়ে ওঠেন হাসিতে। এর ক'দিন পরেই পত্রিকায় পড়ি তাঁর মৃতু্য সংবাদ। খোঁজ নিতে গিয়ে জানতে পারি, ষাট দশকের সুহূদ স্বজন অনেকেই জানতে পারেননি তাঁর বিদায়ের খবর। এ রকম নিঃশব্দে বিদায় নিয়েছেন নিভৃত স্বভাবের কবি,কথা-সাহিত্যিক আনোয়ারা রহমান এ্যানা। তিনি ছিলেন কবি-সমালোচক আতাউর রহমানের (১৯২৫-১৯৯৯) স্ত্রী। গত ১৬ ডিসেম্বর তাঁর মৃতু্যর খবর মাত্র একটি পত্রিকায় দেখেছি আমি। আনোয়ারা রহমান এ্যানার একমাত্র উপন্যাস "আমার বঁধুয়া" প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৬৪ সালে। এরপর কবিতা ও ছোটগল্পই লিখেছেন তিনি। তবে সেসব বই প্রকাশিত হয়েছে যৌথভাবে। কয়েকটি সঙ্কলন সম্পাদনাও করেছেন তিনি।

নাট্যকার সাঈদ আহমদকে আমরা হারিয়েছি গত বছরের শুরুতে_ ২১ জানুয়ারি। তাঁর সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলাম ১৯৭৭ সালে, কবি শামসুর রাহমানের মাধ্যমে। পরিচয় অবশ্য লেখালেখির সূত্রে। তাঁকে নিয়ে আমি লিখেছিলাম "বিচিত্রা"য়। ১৯৭৫ সালে নাটক বিভাগে বাংলা একাডেমীর সাহিত্য পুরস্কার পেলেও সাঈদ আহমদের জীবন ও কর্ম সম্পর্কে সম্ভবত সেটিই প্রথম কোনও লেখা। পরে তাঁর "প্রতিদিন একদিন" (১৯৭৫) নাটকটি আমি মঞ্চায়নের উদ্যোগ নেই বহুবচন নাট্যগোষ্ঠীর মাধ্যমে। পরে মজিব বিন হকের পরিচালনায় মঞ্চস্থ হয়েছিল নাটকটি। ১৯৯২ সালের অক্টোবরে সাঈদ আহমদের নেতৃত্বে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে যোগ দিয়েছিলাম ভারতে অনুষ্ঠিত প্রথম সার্ক সাংস্কৃতিক উৎসবে। ওই দলের সাহিত্য বিভাগে আরো ছিলেন আসাদ চৌধুরী ও সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। মনে পড়ে আমাদের কলকাতা, বেঙ্গালুরু, তিরুবানন্তপুরম্ ভ্রমণ ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার কথা।

সাঈদ আহমদের সঙ্গে আমার শেষ দেখা তাঁর মৃতু্যর মাত্র কয়েক মাস আগে। তিনি এসেছিলেন জাতীয় প্রেসক্লাবে_ ক্লাবের পক্ষ থেকে দেয়া লেখক-সাহিত্যিকদের সংবর্ধনা গ্রহণ করতে। বরাবরের মতো সেদিনও ছিলেন কৌতুকসি্নগ্ধ ঢাকাইয়া ভাষায় রস-রসিকতায় উজ্জ্বল। মনে পড়ছে, সুতলি কাবাব দিয়ে বাকরখানি খাওয়ার মজাটা আমাকে শিখিয়েছেন তিনিই।

আমার প্রিয় লেখকদের একজন আবু রুশদ আমাদের ছেড়ে গেছেন গত বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি। তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়নি কখনও, তবে তাঁর ভক্ত ছিলাম সেই ষাটের দশকের প্রথমদিক থেকে। ভক্তির শুরু তাঁর উপন্যাস "এলোমেলো" (কলকাতা, ১৯৪৬) পড়ে।

আবু রুশদ ১৯৬৩ সালে বাংলা একাডমীর সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন ছোটগল্প বিভাগে। রহস্যজনক কারণে সারাজীবন "আবু রুশদ" নামে লিখলেও ওই পুরস্কার তাঁকে দেয়া হয়েছে "সৈয়দ আবু রুশদ মতিনউদ্দিন" নামে। এখনও বাংলা একাডেমীর বিভিন্ন প্রকাশনায় তাঁর নাম উলেস্নখ করা হয় "আবু রুশদ মতিনউদ্দিন" হিসেবে। উলেস্নখ্য, ১৯৬০-'৬৭ সালে বাংলা একাডেমীর পরিচালক ছিলেন সৈয়দ আলী আহসান।

সাংবাদিক-ব্যক্তিত্ব আখ্তার-উল্-আলম মারা গেছেন গত ২৪ জুন। দৈনিক ইত্তেফাকে তাঁর দীর্ঘ উপ-সম্পাদকীয় এক সময় ছিল ব্যাপক আলোচিত। ওইসব উপ-সম্পাদকীয়তে প্রকাশিত মতামতের পক্ষে-বিপক্ষে তর্কও হতো খুব। আমিও অনেক বিষয়ে একমত হতে পারিনি তাঁর সঙ্গে, তবে একনিষ্ঠ পাঠক ছিলাম তাঁর তথ্যপূর্ণ লেখার। আখতার-উল-আলমের সঙ্গে আমার দেখা হয়নি কখনও। একবার ফোনে কথা হয়েছিল দীর্ঘক্ষণ। কথার শেষে তিনি আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের। কিন্তু সে আমন্ত্রণ রক্ষা করতে পারিনি কি এক ব্যস্ততায়। সেই না পারার দুঃখ আমার রয়ে গেছে এখনও।

সাংবাদিক প্রফুলস্ন কুমার ভক্তকে হারিয়েছি গত ৪ অক্টোবর। তিনি আমার সহকমর্ী ছিলেন দৈনিক সংবাদে। ১৯৮৪ সালে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) সম্পর্কে তাঁর কয়েকটি রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে এবং নিজস্ব অনুসন্ধানের মাধ্যমে একাধিক নিবন্ধ লিখেছিলাম সম্পাদকীয় স্তম্ভে। কিছু কাজ হয়েছিল তাতে। অন্তত আসন্ন বিলুপ্তি থেকে রক্ষা পেয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি।

রাজনীতিবিদ আবদুল মান্নান ভুঁইয়ার বিদায় অত্যন্ত দুঃখপূর্ণ হয়েছে আমাদের জন্য। একদিকে গুরুতর অসুস্থতা, অন্যদিকে রাজনৈতিক জীবনের ওলট-পালট বিপর্যয়ের মধ্যে এক ট্র্যাজিক পরিণতি বরণ করতে হয়েছে তাঁকে।

ষাটের দশকের উত্তাল ছাত্র-রাজনীতির সূত্রে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে, মান্নান ভুঁইয়ার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল আমার। পরিচয়ের সূত্র ছিলেন অবশ্য কবি-রাজনীতিক বুলবুল খান মাহবুব। তাঁরা ছিলেন ঘনিষ্ঠ বন্ধু। গণআন্দোলনের দিনগুলোতে তিনিও এক অগ্রজ বন্ধু হয়ে ওঠেন আমার। পরিচয়ের সূত্র ছিল অবশ্য আরো একটি। আমার পিতামহ দেলদুয়ারের পীরসাহেব শাহ সুফি মোহাম্মদ আবদুর রকিব জীবনের শেষ কয়েকটি বছর কাটিয়েছেন নরসিংদী, শিবপুর, ভবানীপুর অঞ্চলে। ওখানে অনেক মুরিদ ছিলেন তাঁর, এখনও আছেন অনেকে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মান্নান ভুঁইয়ার পরিবারের সদস্য ও অন্য আত্মীয়-স্বজনও। তিনি আদর্শবাদী রাজনীতিক ছিলেন কিন্তু নিক্ষিপ্ত হয়েছিলেন আদর্শহীন রাজনীতির মধ্যে। তা-ই ছিল তার জন্য বেশি দুঃখপূর্ণ। দু'-একবার ডেকেছিলেন, দু'-একবার নিজে থেকেও গেছি তাঁর ওখানে। তখন তাঁর আশপাশে দেখেছি একশ্রেণীর ট্যান্ডলদের ভিড়। ওই ভিড় ভাল লাগেনি আমার। তবে আদর্শবাদী রাজনীতিবিদদের মধ্যে যাঁরা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত স্বমহিমায় সমুজ্জ্বল থাকতে পেরেছেন তাঁদের একজন দেওয়ান ফরিদ গাজীকে আমরা হারিয়েছি গত বছর। মনে পড়ে ২০০২ সালে এক অনুষ্ঠানের সূত্রে সিলেটে গিয়ে একদিনের বেশিরভাগ সময় কাটাতে পেরেছিলাম তাঁর সানি্নধ্যে। তাঁর লামাবাজারের সাধারণ, ছিমছাম কিন্তু ঐতিহ্যমণ্ডিত বাড়িতে অনেক কথা হয়েছিল সেদিন। কথায় কথায় জেনেছিলাম, শিখেছিলাম কত কিছু। সেসব কথায় রাজনৈতিক বিষয়াদিই ছিল মুখ্য। তবে আমি টাঙ্গাইলের জেনে তিনি বিশেষভাবে কথা বলেন আবদুল মান্নান ও কাদের সিদ্দিকী সম্পর্কে। মুক্তিযুদ্ধে দু'জনের গুরুত্বপূর্ণ অবদান যে এখনও সেভাবে মূল্যায়িত হচ্ছে না তা তিনি বলেন দুঃখের সঙ্গে। নিজের সম্পর্কে বলেন, আমি সাধারণ মানুষ। সাধারণ মানুষের মধ্যেই মিশে থাকতে চাই। আমি আলাদা কোনও পরিচয় নিয়ে আলাদা হয়ে থাকতে চাই না। পরে একটি কবিতার কয়েকটি পঙক্তি উদ্ধৃত করে বলেন, আমার জীবনের প্রার্থনা এটাই। সেই থেকে ওই কবিতাটিও প্রার্থনা হয়ে আছে আমার।

আসুন, আজ এক বর্ষকে বিদায় জানিয়ে আরেক বর্ষকে স্বাগত জানানোর মুহূর্তে আমরা সকলে মিলে পাঠ করি শেখ ফজলুল করিম-এর "প্রার্থনা" নামের সেই কবিতাটি:

প্রভু, করো মোরে শস্যশ্যামল সমতল মাঠ

করিও না তুঙ্গশির গিরি;

ক্ষুধিত আমাতে যেন পায় গো আহার,

ক্ষুণ মনে নাহি যায় ফিরি'।

লবণ-সমুদ্র তুমি করিও না মোরে

করো দেব, সি্নগ্ধ প্রস্রবণ;

তৃষিত তাপিত যেন মোর কাছে আসি'

পিপাসার করে নিবারণ।

নির্মম বীরের করে করিও না মোরে

প্রিয়তম, তীক্ষ্ন তরবারি;

করো মোরে ক্ষুদ্র লাঠি, দুর্বলেরা যেন

চলাফেরা করে হাতে ধরি'।

বিলাসী সম্পদশালী করিও না মোরে

অনুক্ষণ মত্ত অহঙ্কারে

করো দীন, ত্যাগী দাস, সবারই যেন

সেবা আমি পারি করিবারে।

সমাপনী পরীক্ষা : প্রাথমিক শিক্ষার দর্পণ by মো. শহীদ উলল্লাহ

প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা শিক্ষা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। মাধ্যমিক শিক্ষা স্তরে দশম ও দ্বাদশ শ্রেণীর শেষে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে দুটি সার্টিফিকেট এবং উচ্চ শিক্ষা স্তরে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভের সুযোগ থাকলেও ইতিপূর্বে প্রাথমিক শিক্ষা সফল সমাপ্তির পর কোন সার্টিফিকেট লাভের সুযোগ ছিল না।

ফলে পূর্বে তিন স্তর বিশিষ্ট শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রাথমিক শিক্ষাকে একটি পূর্ণাঙ্গ স্তর বলে মনে হতো না। বরং এ স্তরকে শিক্ষার প্রস্তুতি কাল বলেই বেশি মনে হতো। প্রাথমিক শিক্ষা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রথম ও প্রধান স্তর হওয়া সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের কাছে তেমন গুরুত্ব পায়নি। সমাপনী পরীক্ষা এনে দিয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা স্তরের পূর্ণতা, বাড়িয়েছে এ শিক্ষা স্তরের গুরুত্ব।

গত বছর প্রথম অনুষ্ঠিত হয় প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা। এ পরীক্ষার মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষা ক্ষেত্রে এক বিরাট আলোড়ন সৃষ্টি হয়। সকল শ্রেণী পেশার মানুষের নজর কাড়ে এ পরীক্ষা। তখন থেকে শুরু হয় এ পরীক্ষাকে আরো ঢেলে সাজাবার প্রক্রিয়া। গত বছর প্রতিদিন ২টি করে ৩ দিনে ৬টি বিষয়ের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ায় শিক্ষাথর্ীদের উপর বাড়তি চাপ ছিল। কিন্তু এ বছর প্রতিদিন ১টি করে ৬ দিনে ৬টি বিষয়ে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ায় শিক্ষাথর্ীরা ছিল পূর্বের তুলনায় অনেকটা উৎফুলস্ন। এ বছর সমাপনী পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নেও নতুন কৌশল প্রয়োগ করা হয়েছে। পরীক্ষকগণ নির্ধারিত তারিখে উপজেলা সদরে এসে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা শিক্ষা অফিসারের তত্ত্বাবধানে উত্তরপত্র মূল্যায়ন করেছেন। এ ব্যবস্থায় শিক্ষকগণের একটু বেশি পরিশ্রম হলেও উত্তরপত্র মূল্যায়নে স্বচ্ছতা ও সমতা বজায় রাখা এবং মূল্যায়ন কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে।

সমাপনী পরীক্ষা প্রাথমিক শিক্ষা ক্ষেত্রে এক অসাধারণ সাফল্য। একটি সফলতা থেকে জন্ম নেয় আরো সফলতা লাভের অনুপ্রেরণা। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা আমাদেরকে অনুপ্রাণিত করেছে। আমাদের সাহস জোগিয়েছে আরো নতুন নতুন পদক্ষেপ নেয়ার। তারই পথ ধরে এ বছর প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার সাথে যুক্ত হয়েছে ইবতেদায়ী শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা। এতকাল সাধারণ শিক্ষার তুলনায় ইবতেদায়ী শিক্ষা অনেকটা পিছিয়ে ছিল। সমাপনী পরীক্ষা নিঃসন্দেহে ইবতেদায়ী শিক্ষার মানোন্নয়নের পথে মাইলফলক হয়ে থাকবে। প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার এ পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে মাধ্যমিক স্তরেও। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার আদলে এ বছর প্রথম অনুষ্ঠিত হলো ৮ম শ্রেণীর জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা। শিক্ষা ব্যবস্থায় এ পরিবর্তন যেন সরকারের দিন বদলের অঙ্গীকারেরই প্রতিফলন।

সমাপনী পরীক্ষাকে আরো যুগোপযোগী ও মানসম্মত করার জন্য কতিপয় বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। যেমন- জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমী (নেপ) কর্তৃক প্রণীত প্রশ্ন কাঠামো ও নম্বর বিভাজনের সাথে প্রশ্নপত্রের কিছুটা বৈসাদৃশ্য দেখা গেছে। শিক্ষকগণ নেপ থেকে প্রাপ্ত প্রশ্ন কাঠামো ও নম্বর বিভাজন অনুসারে শিক্ষাথর্ীদের প্রস্তুত করেছেন। প্রশ্নপত্রে কিছুটা বৈসাদৃশ্য থানায় শিক্ষাথর্ী ও অভিভাবকগণের মাঝে ক্ষোভ ও হতাশা সৃষ্টি হয়েছে। নেপ কর্তৃক প্রণীত উত্তরপত্র মূল্যায়ন নির্দেশমালার সাথে প্রশ্নপত্রের অসামঞ্জস্য থাকায় শিক্ষকগণকেও বিপাকে পড়তে হয়েছে। যেমন- ইংরেজী বিষয়ের প্রশ্নপত্রে কবিতা থেকে ৮ লাইন লিখতে বলা হয়েছে এবং উহার মান দেয়া হয়েছে -১০। অপর দিকে উত্তরপত্র মূল্যায়ন নির্দেশমালায় কবিতা থেকে ১০ লাইন নিভর্ুলভাবে লিখলে পূর্ণ ১০ নম্বর দিতে বলা হয়েছে। এ ত্রুটিগুলো ছোট করে দেখা সমীচীন নয়। প্রশ্নপত্র ও মূল্যায়ন নির্দেশমালা তৈরির ক্ষেত্রে আরো সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন (শারীরিক ও মানসিকভাবে পুরোপুরি সুস্থ নয় এমন) শিক্ষাথর্ীদের উত্তর লিখার জন্য বাড়তি সময় চেয়ে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নিকট অভিভাবকগণ আবেদন জানালেও নীতিমালায় এ ধরনের সুযোগ না থাকায় স্থানীয় কর্তৃপক্ষ সে সুযোগ দিতে পারেনি। বিষয়টি মানবিক দিক থেকে বিবেচনা করা দরকার। আরো একটি বিষয়ে দৃষ্টিপাত করা প্রয়োজন। বিষয়টি হচ্ছে- থানা হেফাজত থেকে প্রতিদিন পরীক্ষা কেন্দ্রে প্রশ্ন পরিবহন ও পরীক্ষা কেন্দ্র থেকে থানায় উত্তরপত্র পরিবহনের জন্য কাছে ও দূরের কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সমভাবে পরিবহন খরচ দেয়া হয়েছে। লক্ষণীয় যে, উপজেলা পরিষদের নিকটবতর্ী ও দূরবতর্ী কেন্দ্রে পরিবহন খরচ একরূপ নয়। এ ব্যবস্থায় কোন কোন কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি পরিবহন খরচ বাবদ বরাদ্দ পেয়েছেন। আবার কোন কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে ভর্তুকি দিতে হয়েছে। এক্ষেত্রে উপজেলার জন্য থোক বরাদ্দ দিয়ে উপজেলা কমিটিকে বরাদ্দকৃত অর্থ বিভাজনের দায়িত্ব দেয়া সমীচীন হবে।

সমাপনী পরীক্ষায় ছোট-খাটো ত্রুটি-বিচু্যতি থাকলেও সফলতা তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি। এসব ত্রুটি-বিদু্যতির কথা বিবেচনায় রেখে আগামী দিনে একটি সুষ্ঠু ও বাস্তবসম্মত নীতিমালা প্রণয়ন এবং সকল পরীক্ষাথর্ীর অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণসহ প্রশ্নপত্রের মান ও পরীক্ষা ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে কর্তৃপক্ষ কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে বলে আশা করি।

মুদ্রণ শিল্পের আঁতুড়ঘর মিসর

প্রেমিকের প্রতি প্রেমিকার আকুল আকুতি 'চিঠি দিও প্রতিদিন' অথবা 'চিঠি দিও, পত্র দিও, জানাইও ঠিকানা।' আক্ষেপ 'নাই টেলিফোন, নাইরে পিয়ন, নাইরে টেলিগ্রাম বন্ধুর কাছে মনের কথা কেমনে পৌঁছাইতাম?' হ্যঁযা, মনের ভাব প্রকাশ করবার সহজাত আকাঙ্ক্ষা মানুষের জীবনের একেবারে গোড়ার দিকের কথা।
তখনও ভাষায় উন্মেষ ঘটেনি। ভাষাকে লেখ্য রূপদানে সাংকেতিক চিহ্ন তথা বর্ণমালার আকার দেয়া সম্ভব হয়নি। কিন্তু পারস্পরিক মনের ভাব আদান-প্রদান তখনও থেমে থাকেনি। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নাড়াচাড়া, নানান শব্দ ও আওয়াজের মাধ্যমে মানুষ তার মনের ভাব প্রকাশ করেছে। আনন্দ-বেদনা, ভয়-সংশয়, বিদ্বেষ-বিস্ময় প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে প্রকাশভঙ্গি ছিল নিতান্তই ব্যক্তি পর্যায়ে। যা সার্বজনীন রূপ গেয়েছে আরো বহুকাল পরে। ঠিক কতদিন এমন চলেছে তার সঠিক হিসাব না থাকলেও ধারণা করা হয় অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে মনের ভাব প্রকাশের সময়কাল বেশ কয়েক হাজার বছর তো হবেই। দ্বিতীয় পর্যায়ের শুরু প্রতীকী ভাষা। তাও চলে বেশ কিছুকাল। বিপত্তি দেখা দিল এ ভাষার ব্যবহারের বেলায়ও। কারণ ভাবপ্রকাশের সীমাবদ্ধতা অগত্যা তৃতীয় ধারায় কণ্ঠস্বরের মাধ্যমে বার্তা প্রেরণের উপায় উদ্ভাবন। প্রতীকী ভাষার সীমাবদ্ধ এক্ষেত্রে অনেকাংশই কাটিয়ে ওঠা গেল। তৈরি হতে লাগলো নানা মাত্রার শব্দ। যার গাঁথুনিতে বাক্য এবং পরিশেষে খুব কাছে থেকে মনের ভাব প্রকাশ সহজ। কিন্তু দূরে অবস্থনরত কারো সঙ্গে ভাব প্রকাশ করা সম্ভব নয়। সম্ভব নয় প্রতিদিনকার লব্ধ অভিজ্ঞতা তথা জীবনের নানা বাঁকের আনন্দ-বেদনা-বিরহের কথা ধরে রাখা। স্থান-কাল-পাত্রের গন্ডি পেরিয়ে বের হওয়া আরো দুরূহ। সে দুরূহ কাজই কথ্য ভাষাকে লেখ্য রূপদান।

শুরুটা পাহাড়ের গুহায়, গাছের কোঠরে কিংবা মাটির জমিনে। সময়কাল নিয়ে রয়েছে বিস্তর মতপার্থক্য। তবে আদিম মানুষের গুহাচিত্র, ছবি অাঁকার কোশেশ, বিভিন্ন অাঁকিবুকি প্রধানত কয়লা, পাথর, গাছের পাতার নির্যাস দিয়েই হতো। অধিকাংশ গবেষক একে লিখন পদ্ধতির সূচনাপর্ব বলে উলেস্নখ করেছেন। তাদের ধারণা, কালের পরিক্রমায় আজ যে সার্বজনীন লিখন পদ্ধতি লিপিকলা অনুসরণ করা হচ্ছে, তার অাঁতুড়ঘর প্রাচীন গ্রীস। এ প্রশ্নে ভিন্নমতও রয়েছে। ভিন্নমতাবলম্বীরা বলেন, গ্রীসে লিপিকৌশল সূত্রপাত হলেও প্রাচীন মিসরীয়রাই লেখার আধুনিক পদ্ধতির সূচনা করে। সময়কাল গুহাচিত্র লিখনের প্রায় তিন হাজার বছর পর। শেষোক্ত দলের অভিমত, প্রাথমিক পর্যায়ে মিসরীয়দের আবিষ্কৃত লিখন পদ্ধতিতে ব্যবহূত হতো বেশকিছু চিহ্ন বা প্রতীক। থাকে বলা হতো 'হিয়োরো গিস্নফিকস্ বা পবিত্র লিখন'। গোড়ার দিকে এ ধরনের লিখন পদ্ধতি ব্যবহূত হতো তাঁবু, মন্দির ও স্মারকস্তম্ভে। কালক্রমে তা অন্যান্য ক্ষেত্রে স্থান করে নেয়। বিভিন্ন ভাষায়, লেখ্য ভাবপ্রকাশে সাংকেতিক চিহ্ন বা বর্ণমালার আবির্ভাব তার পথ ধরেই। কাগজ ও কালির অাঁচড়ে বর্ণমালায় নিয়মভিত্তিক উপস্থাপন আধুনিক লিখন পদ্ধতি। যার ওপর ভর করে শিল্প-সাহিত্য এবং সংস্কৃতির নানা বাহন তরতর করে এগিয়ে চলছে কালের স্রোতে। মলাটবদ্ধ পুস্তকের সেতু বেয়ে ক্যানভাসের দীঘল প্রান্ত ছুঁয়ে যে সভ্যতা আজকের সোপানে পেঁৗছেছে তার মূলে লিখন পদ্ধতি। ইতিহাস-ঐতিহ্যের ধারক-বাহক এ পদ্ধতির নানা শাখার একটি পত্র সাহিত্য। চিঠি বা পত্র মনের ভাব প্রকাশের তথা অক্ষরের ভাষার কথা বলার অন্যতম উপায়। ডাক পিয়নের আবিভাবেরও আগে মানুষ অক্ষরের ভাষায় পরস্পরের সঙ্গে ভাবে আদান-প্রদান করেছে। টেলিফোন আবিষ্কারের আগে, বলতে গেলে সেটাই ছিল একমাত্র ভরসা। আজ আধুনিক প্রযুক্তিতে লেখ্য রূপে মনের ভাব প্রকাশে না লাগে ডাক-পিয়ন, না লাগে কাগজ-কালি। সেলফোনের বাটন চেপে না বলা কথার মালা গেঁথে ইথারের মাধ্যমে 'এসএমএস' তরঙ্গ চিঠি পাঠানো কঠিন কাজ নয়। কলমের প্রয়োজনীয়তা আজ আর তেমন প্রবল নয়। অথচ আদিম মানুষের সম্বল ছিলো গুহার দেয়াল, গাছের পাতা, ডালপালা কিংবা সহজলভ্য এমন কোন বস্তু। হয়তো সেদিন আর বেশি দূরে নয়, কালি-কলম এবং বাটন চেপে লেখাও ইতিহাসে পরিণত হবে। কিন্তু স্বীকার করতেই হবে, এসবের হাতেঘড়ি আদিম মানুষের হাতেই। মুদ্রণ শিল্পের আজকের চরম উৎকর্ষের মূলে গ্রীক বা মিসরীয়দের অবদান সবচেয়ে বেশি। তাদের দেখানো পথেই হেঁটে চলছে আধুনিক মুদ্রণ শিল্প।

জাকিরুল ইসলাম

রাত যায় দিন আসে by আতিকুল হক চৌধুরী

সুপ্রিয় পাঠক! আপনাদের সবাইকে আজ ৩ জানুয়ারি ইংরেজী নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানাচ্ছি বলে আপনারা কী একটু অবাক হচ্ছেন এই কথা মনে করে যে ১ জানুয়ারি নতুন বছরের শুরু। এই দুই দিন পর আবারও "হ্যাপি নিউ ইয়ার" কেন? কিন্তু নয় কেন? আমি তো এই কথা বলছি না যে, হ্যাটি ফাস্ট জানুয়ারি।

বলছি হ্যাপি নিউ ইয়ার। নতুন বছরের সবে তো শুরু। ২/৩ দিন পরও নতুন বছরই তো থাকছে, না কী? না, ঈদে ৩/৪ দিন ছুটি বলে কয়েকদিন ধরেই ঈদ মোবারক বলা যায়? নববর্ষে তেমন ছুটির উপলক্ষ নেই বলেই কী আর শুভ নববর্ষ বলা যাবে না কয়েকদিন ধরে? "শুভ" কথাটা বার বার উচ্চারণ করলে ক্ষতি কী? সুপ্রিয় পাঠক।"হ্যাপি নিউ ইয়ার"। শুরু হল আর একটি নতুন বছর। প্রার্থনা করি নতুন বছর যেন শুধু কতগুলো দিন, হপ্তা আর মাসেরই বদল না হয়। দিন বদলের পালায় আমরা যেন সবসময় নেতিবাচক নয়, একটু ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গী নিয়েও যেন পথ চলতে পারি। পারি যেন একজন অপর একজনের হাত ধরাধরি করে চলতে। একা নয়, একজন নয়, দু'জনের একসঙ্গে পথ চলার আনন্দই যে আলাদা, একজনে একা হাঁটলে মনে হয় কত পথ যেন আরো বাকী। দু'জনে একসঙ্গে হাঁটলে মনে হয় কতদ্রুত যেন এগিয়ে গেলাম। আমরা একত্রে ওঠাবসা করি কিন্তু আমাদের মধ্যে একতা কম। এটাই দুঃখজনক। দুর্ভাগ্যজনক। কথায় আছে যার শেষ ভাল তার সব ভাল। ইংরেজী ২০১০ সালের শেষ দিনটি আমার খুব আনন্দে কেটেছে। বহুদিন পর আমার একমাত্র মেয়ে নেহার তার জামাতা মাহমুদসহ বিদেশ থেকে আমাদের বাসায় বেড়াতে এসেছে। আমার কাছে, আমার স্ত্রীর কাছে ঈদ ঈদ মনে হচ্ছে। উৎসবের দিন-রাত্রি যেন। মেয়েরা বয়সে যতই বড় হোক না কেন বাবা-মায়ের কাছে তারা আসলে ছোট্টটিই থেকে যায় রবীন্দ্রনাথের সেই কাবুলিওয়ালা গল্পের ছোট্ট মিনির মতো। কাবুলিওয়ালাদের বুক পকেটে সযতনে রক্ষিত ভূসা মাখানো কাগজে ছোট্ট হাতের ছোট্ট ছাপ কোনদিন আর বড় হয় না। মুছেও যায় না। রহমতদের "খোকীদের" খোশুবুর মধ্যে সত্যি খোদার এক রহমত ঝরে পড়ে। যা হোক বছরের শেষ দিনটিতে বেশকিছু ছোট্টমণিদের সাহচর্যে আসার সুযোগ হয়েছিল আমার। আনন্দ আলোর সম্পাদক নাট্যকার ও নাট্যনির্মাতা রেজানূরের আমন্ত্রণে জাতীয় গ্রন্থাগারে ছোট্টমণিদের এক চিত্রাংকন পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে। খুব ভাল লাগল। ভাল কাটলো দিনটি। ছোট্ট-মণিদের অাঁকা ছবিতে বাংলাদেশ যেন কথা বলছিল। ছবি গান গেয়েছিল, ছবি নেচেছিল ময়ূরের মতো পাখা মেলে। ছবিতে ফুটে উঠেছিল গ্রামবাংলার অপরূপ রূপ। একা নয়, সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে সবাইকে সাথে নিয়ে কিছু করার একটা আনন্দই আলাদা। এই আনন্দ ছোট্টমণিরা যতটা পায় বোঝে আমরা বড়রা ততটা পাই না। বুঝি না। একসঙ্গে বসে বড়রা ছবি অাঁকছে _এটা কী ভাবা যায়? অথচ বড়রা যদি ছোট্টমণিদের অনুকরণ করে একসঙ্গে একাগ্রচিত্তে কিছু করতে পারতো আমাদের এ দেশটা আরো এগিয়ে যেতো না সামনে? মেরিডিয়ান ও আনন্দ আলোকে ধন্যবাদ।

পৌষের অপরাহ্নে ৩১ ডিসেম্বরের মনোরম সন্ধ্যাটিকে আমার কাছে মনে হয়েছিল বসন্তের মন রাঙানো একটি সন্ধ্যা। মাছরাঙা নদীর বুকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিতে ভেজা রংধনুর প্রতিফলন যেন দেখে এলাম। চোখ জুড়ালো। মনও ভরে গেল। আনন্দ পেলাম। আলোও দেখলাম। ঘুরে এলাম একটি রংধনুর দেশ থেকে। পরদিন ১ জানুয়ারিও ছিল নিজের সত্যিকার সংস্কৃতিকে, গণমানুষের সংস্কৃতিকে গণসঙ্গীতকে আর একবার প্রাণ ভরে উপলব্ধি করার দিন। দেশের নন্দিত গণসঙ্গীত শিল্পী ফকির আলমগীর প্রতিষ্ঠিত ঋষিজ-এর ৩৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর একটি জ্বলজ্বলে দিন। উন্মাদনা নয়, উদ্দীপনাময় একটি সুমহান দিন। পতিত অন্ধকারের পথে সূর্যরশ্মির বর্শাফলক হাতে সাহসী অশ্বারোহীর ছুটে চলার দিন। অনুষ্ঠানটি উৎসর্গ করা হয়েছিল বাংলার বিশিষ্ট রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী কলিম শরাফীকে যিনি সারাটা জীবন আমাদের শুনিয়ে গেছেন বিশ্বমানবের চিরন্তনী সংগীত। আমাদের এক প্রিয় মানুষ আমাদের একা ফেলে আমাদের ঘর শূন্য করে চলে গেলেন। কলিম ভাইর নামের আগে প্রয়াত বা মরহুম কথাটা ইচ্ছে করেই সংযুক্ত করলাম না। শিল্পীর অবস্থান মানুষের হূদয়ের অতি কাছে। সত্যিকার শিল্পী কখনো মরহুম হন না। কোনদিন অবসরে যান না। এল.পি.আর-এও যান না। বছরের শুরুতে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত গানের সেই দুটো লাইন কলিম ভাইর দরাজ ভরাট গলায় শোনা সেই গান, বহু অনুষ্ঠানে বহুবার শোনা সেই পরিচিত গান কেন যেন আজ আর একবার শুনতে ইচ্ছে করছে 'আছে দুঃখ আছে মৃতু্য, বিরহ দহন লাগে, তবুও শান্তি তবু আনন্দ_তবু অনন্ত জাগেঃ"

তৈরি পোশাক শিল্পে নতুন সম্ভাবনা by বকুল আশরাফ

Monday, January 17, 2011

শ্রমিকদের মজুরী বৃদ্ধির আন্দোলন, ক্ষোভ এবং ত্রিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে শ্রমিকদের নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণা এবং বছরের শেষে এসে তার বাস্তবায়ন পোশাক তৈরী শিল্পের শ্রমিকদের মধ্যে এক ধরনের আস্থার জন্ম দিয়েছে। পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়ন কর্তৃক জিএসপির শর্ত শিথিল করায় এই খাতটি থেকে আরো অধিক রপ্তানি হবার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে।
এতে করে ভবিষ্যতে এই তৈরী পোশাক শিল্পখাতটির স্থিতিশীল অবস্থা যে বিরাজ করবে তার ইঙ্গিত বহন করে । বর্তমানে বাংলাদেশে পোশাক তৈরী শিল্প থেকে রপ্তানি আয় হচ্ছে প্রায় সাড়ে বার বিলিয়ন ডলার, যা উত্তর-উত্তর বৃদ্ধি পাবে।

জিএসপি এক ধরনের বাণিজ্যিক চুক্তি । ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশ সমূহে বিশ্বের অন্যান্য স্বল্পোন্নত বিভিন্ন দেশ (প্রায় ১৭৬টি দেশ) থেকে কোন দ্রব্য প্রবেশের সময় টেরিফের ক্ষেত্রে অধিকতর গুরুত্ব আরোপ বা এক ধরনের অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। এই জিএসপির প্রাথমিক লক্ষ্য হলো দারিদ্র্য হ্রাসকরণ, বিশ্বের উন্নয়নশীল বা উন্নত দেশসমূহের সাথে অনুন্নত দেশসমূহের বাণিজ্যের ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন সাধন এবং সুশাসনের লক্ষ্যে অনুন্নত দেশসমূহকে এক ধরনের অর্থনৈতিক সুবিধা দিয়ে একযোগে কাজ করার কৌশল। বা বলা যায় ইউরোপীয় বাজারে রপ্তানির ক্ষেত্রে পক্ষপাতমূলক শুল্ক হার এর ফলে অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশগুলোকে আন্তর্জাতিক বাজারে আরো বেশি অংশগ্রহণে ও অতিরিক্ত রপ্তানি রাজস্ব সৃষ্টির মাধ্যমে শিল্পের বিকাশ ও কর্মসংস্থাপনের উন্নয়ন এবং সর্বোপরি দারিদ্য্র হ্রাসে সচেষ্ট করা।

বাংলাদেশ এমন একটি অনুন্নত দেশ হিসেবে রপ্তানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সে সুবিধা পেয়ে থাকে। ১৯৭১ সালে গ্যাট চুক্তির আওতায় এই জিএসপি সুবিধা প্রবর্তন করা হয়। বাংলাদেশে যখন পোশাক তৈরী শিল্পের বিকাশ এবং রপ্তানি শুরু হয় তখন থেকেই বাংলাদেশও সেই সুবিধা পেয়ে আসছে। তখন জিএসপি সুবিধা পেতে হলে দ্রব্য প্রস্তুতের ক্ষেত্রে তিনটি ধাপের উৎস বা অরিজিন বাংলাদেশে হতে হতো। যেমন সূতা তৈরী, সূতা থেকে কাপড় তৈরী এবং কাপড় থেকে পোশাক তৈরী। পরবর্তীতে আরো শিথিল করে দুই ধাপে করা হয়। অর্থাৎ উপরোক্ত তিন ধাপের যে কোন দু'ইটি ধাপ যদি বাংলাদেশ সাধিত হয় তবে তা জিএসপির আওতায় পরবে এবং তার জন্য শুল্কহারের হ্রাসকৃত সুবিধা উপভোগ করবে।

ইউরোপীয় বাজারে স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের উৎপাদিত দ্রব্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশিকাধারের দাবী বহুদিনের। প্রায় ২০০৩ সাল থেকে এই দাবি আলোচিত হয়ে আসছে। ২০১০ সালের নভেম্বরের ২৩ তারিখে ইউরোপীয় ইউনিয়ন কমিশন রুলস অফ অরিজিনের ক্ষেত্রে সেই বহু আলোচিত জিএসপি সুবিধা বা শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের দাবিটি বিবেচনায় এনে ঘোষণা করে যে, মাত্র একটি ধাপ সম্পন্ন করলেই বাংলাদেশ জিএসপি সুবিধা পাবে। এবং তা কার্যকর হওয়ার কথা ছিল নতুন বছরের প্রথম দিন থেকে অর্থাৎ ২০১১ সালের জানুয়ারির ১ তারিখ থেকে। বাংলাদেশ থেকে যত তৈরী পোশাক রপ্তানি হবে সে সব দ্রব্যই ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে। এই জিএসপির শর্ত শিথিল করায় তৈরী পোশাক রপ্তানি বাড়ানোর ক্ষেত্রে এক বিশাল সম্ভাবনার দেখা দিয়েছে। অন্যভাবে বলা যায় যেহেতু বাংলাদেশে উৎপাদিত তৈরী পোশাক ইউরোপীয় বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে তাই ইউরোপীয় ক্রেতারা বাংলাদেশে থেকে পূর্বের চেয়ে আরো বেশী আমদানী করবে, শুধুমাত্র এই শুল্কমুক্ত সুবিধার সুযোগটি কাজে লাগানোর জন্য। কেননা স্বল্পোন্নত দেশ বা অনুন্নত দেশ বাংলাদেশকে দেয়া এই সুবিধা উন্নয়নশীল দেশ যেমন চীন, ভারতের জন্য প্রযোজ্য হবে না। সুতরাং বাংলাদেশ, চীন ও ভারতের চেয়ে জিএসপি সুবিধা নিয়ে এগিয়ে থাকবে।

অনেকেই ধারণা করছে এই সুবিধার কারণে বাংলাদেশের তৈরী পোশাক রপ্তানি আগামী বছরে বেড়ে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নতি হয়ে যাবে এবং ২০১৫ সালের মধ্যে তা প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নত করা সম্ভব। বাংলাদেশের মোট তৈরী পোশাক রপ্তানির প্রায় ৬৯ শতাংশ ইউরোপের বাজারে প্রবেশ করে যা ভবিষ্যতে বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হবার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। সুতরাং এই যে সুবিধা তা অবশ্যই পোশাক তৈরী শিল্পের মালিকদেরকে আরো বেশী সচেতন করে তুলবে।

জিএসপির সুবিধার কারণে সৃষ্ট অন্যান্য দিকগুলোকে ভাবতে হবে। যেমন (এক) বাংলাদেশের টেক্সটাইলস শিল্পে ঋণাত্মক প্রভাব পড়বে কেননা যে কোন দেশ থেকে আমদানী করা কাপড় বাংলাদেশে এনে তা শুধুমাত্র সেলাই করে রপ্তানি করলেই শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। সুতরাং বাংলাদেশের টেক্সটাইল মিলের উৎপাদিত কাপড়ের চাহিদা কমে যেতে পারে। যদি চাহিদা কমে যায় সরকারকে ভাবতে হবে টেক্সটাইল শিল্পের জন্য বিভিন্ন সুবিধাদি সম্বলিত নতুন নীতিমালা করতে হবে। আবার টেক্সটাইল মালিকদেরকেও আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকার জন্য আরো বেশী প্রতিযোগিতামূলক কি করে হওয়া যায় তা ভাবতে হবে।

(দুই) বাংলাদেশে যেন আরো পোশাক তৈরী শিল্প গড়ে উঠতে পারে সে জন্য অবকাঠামোগত সুবিধাদি গড়ে তুলতে হবে। তার মধ্যে উলেস্নখযোগ্য হলো গ্যাস ও বিদু্যতের জোগান দেয়া। মাল আমদানী ও রপ্তানির ক্ষেত্রে বন্দরের কাজগুলোকে ত্বরান্বিত করা এবং রাস্তাঘাট বৃদ্ধি করা। প্রয়োজনে ঢাকার বাইরে শুল্ক ছাড়সহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা। এতে উৎপাদন খরচ অনেক কম পড়বে।

(তিন) পোশাক তৈরী শিল্প যতই বৃদ্ধি পাবে ততোই দক্ষ শ্রমিকদের সংকোট ঘনীভূত হবে। শ্রমিক ধরে রাখা কষ্টকর হবে অনেক ক্ষুদ্র বা মাঝারি ধরনের শিল্প মালিকদের। এমনকি বড় বড় শিল্প মালিকদের মধ্যে আন্ত: প্রতিযোগিতা শুরু হবার সম্ভাবনা রয়েছে। কে কত বেশী সুবিধা প্রদান করে শ্রমিক ধরে রাখবেন বা নতুন গড়ে উঠা শিল্পে শ্রমিকে জোগান করবেন। এতে শ্রমিক সংকটের তীব্রতার কারণে অনেক শিল্প তার রপ্তানির জন্য প্রদেয় কমিটমেন্ট হারাতে পারেন। তখন সৃষ্ট হবে অন্য সব জটিলতা। সুতরাং বাংলাদেশে পোশাক তৈরী ও রপ্তানি সমিতির এখন থেকেই মনিটর করতে হবে এবং সরকারের যাথে যৌথভাবে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ইনষ্টিটিউট তৈরী করে শ্রমিকদের এখন থেকেই প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা শুরু করা। অন্যথায় এই জিএসপির সুবিধার সর্বোচ্চ ব্যবহার করা সম্ভব নাও হতে পারে।

বিপ্লবের প্রতীক বোয়াজিজি

Sunday, January 16, 2011

নগণের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনেই জাইন এল আবিদিন বেন আলীর পতন ঘটেছে। কোনো একক দল বা নেতা এই আন্দোলন গড়ে তোলেননি। ২৩ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা রাষ্ট্রনায়কের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামতে মানুষকে সাহস জুগিয়েছেন অখ্যাত যুবক মোহাম্মদ বোয়াজিজি।

নিজের জীবন দিয়ে তিনি জাইন এলের অপশাসনের চিত্র তুলে ধরেছেন দেশবাসীর সামনে। তাই সরকার পতনের পর বোয়াজিজি পাচ্ছেন জাতীয় বীরের মর্যাদা।
তিউনিসিয়ায় গণ-আন্দোলন শুরু হয় বোয়াজিজির প্রতিবাদের মাধ্যমেই। ২৬ বছর বয়সী এ যুবক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা নিয়েও চাকরি পাচ্ছিলেন না। নিরুপায় হয়ে রাস্তায় ফল বিক্রি শুরু করেন। কিন্তু সরকারের কাছ থেকে দোকানদারির অনুমতি নেননি বলে ১৭ ডিসেম্বর পুলিশ তাঁর ফলের ঝুড়ি ও টাকাপয়সা কেড়ে নেয় এবং নির্যাতন করে। স্থানীয় কর্মকর্তাদের কাছে গিয়ে বোয়াজিজি প্রতিবাদ জানালেও কেউ তাঁকে সহায়তা করেননি। ক্ষোভ-দুঃখ আর অপমানে ওই দিনই সিদি বোজিদ এলাকায় শত শত মানুষের সামনে গায়ে আগুন ধরিয়ে দেন তিনি। এ ঘটনার পরই বেকারত্ব দূর করার দাবিতে তিউনিসিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিক্ষোভ শুরু হয়। ধীরে ধীরে তা ছড়িয়ে পড়ে সব শ্রেণী-পেশার মানুষের মধ্যে। গত ৪ জানুয়ারি যখন হাসপাতালে বোয়াজিজির মৃত্যু হয়, তখন প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়েছে তিউনিসিয়ার অলি-গলিতে।
তিন সপ্তাহের আন্দোলনে তিউনিসিয়ায় ৬৬ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছে বলে দাবি করছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। এত মৃত্যুর মধ্যেও বোয়াজিজির আত্মাহুতির বিষয়টি বিশেষ মর্যাদা পাচ্ছে। মানুষকে রাস্তায় নামতে অনুপ্রাণিত করার জন্য তাঁর শরীরে আগুন লাগানোর ছবিটিই ব্যবহার করেছে বিক্ষোভকারীরা। বোয়াজিজির নামে ফেইসবুকে একটি পেইজ খোলা হয়েছে, যাতে তাঁর পরিচয় দিয়ে লেখা হয়েছে, 'তিউনিসিয়ার বিপ্লবের প্রতীক'। আর বোয়াজিজির মতো সাহসী ও প্রতিবাদী যুবকের অপেক্ষা করছে অন্যান্য আরব দেশের নিপীড়িত মানুষ। মিসরের মানবাধিকারকর্মী আবদেল হালিম কানদিল যেমন বলেছেন, 'বোয়াজিজির মতো একজন মানুষ দরকার আমাদের।' সূত্র : নিউইয়র্ক টাইমস।

সংস্কৃতির বিভিন্ন কণ্ঠের কোরাস by বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর

Saturday, January 15, 2011

থাটা ফ্রেড জেমিসনের: ইতিহাস তা-ই যা ব্যথা দেয়। ইতিহাস পপুলার মাইণ্ড থেকে গরহাজির, এই বিলাপ উচ্চতর একাডেমিগুলিতে, এই বিলাপ বুর্জোয়া রাজনীতিবিদদের এবং তাদের নির্মিত রাষ্ট্রে। ডান রাজনীতিতে এই বিলাপের শেষ নেই, বাম রাজনীতিতে আছে এই বিলাপের ধ্বনি।

এই অর্থে কি ইতিহাস ব্যথা দেয়? না বোধ হয়। বাংলাদেশে পপুলার সংস্কৃতি একদিকে ডান প্রভাবিত এবং বাম প্রভাবিত সংস্কৃতিকে চ্যালেঞ্জ করছে, অন্যদিকে প্রান্তিক সংস্কৃতিগুলো আত্মস্থ করে শক্তিশালী হচ্ছে। ডান সংস্কৃতি মধ্যপ্রাচ্য ও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি থেকে মতাদর্শিক সাহায্য পাচ্ছে এবং ধর্মজ বোধের মাধ্যমে এই সংস্কৃতি ছড়ানোর চেষ্টা করছে। রক্ষণশীলতা কিংবা নব্য রক্ষণশীলতা ধর্মজ আখ্যান দিয়ে দেশের অভিজ্ঞতা এবং সংস্কৃতিগুলির সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত হয়েছে। দেশের অভিজ্ঞতা হচ্ছে রাষ্ট্র হওয়ার অভিজ্ঞতা এবং সংস্কৃতিগুলি হচ্ছে বেঁচে থাকার লড়াইয়ের স্মৃতি : তেভাগা থেকে হাজং, নানকার থেকে জিরাটিয়াসহ বিভিন্ন কৃষক আন্দোলনের স্মৃতি। মুক্তিযুদ্ধ হচ্ছে একই সঙ্গে রাষ্ট্র হওয়ার অভিজ্ঞতা এবং কৃষক আন্দোলনের লড়াইয়ের ডকুমেন্টেশন। এ সকল অভিজ্ঞতাকে পেছনে ফেলার চেষ্টা করেছে ধর্মজ বোধের মাধ্যমে ধর্মজ আখ্যান দিয়ে নব্য রক্ষণশীলতা। মুক্তিযুদ্ধ কি ধর্মজ আখ্যান? মুক্তিযুদ্ধ কি সেকু্যলার সমাজতান্ত্রিক আখ্যান? মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দুই বিরোধী সমাজতান্ত্রিক আদর্শের যে-লড়াই হয়েছে (সোভিয়েত মতাদর্শ বনাম চিনা মতাদর্শ), তার স্থান কি যুদ্ধের মধ্যে এবং যুদ্ধপরবর্তী সময়ে পড়েনি? যেসব কৃষক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন, যারা ডানপক্ষভুক্ত নন কিংবা বামপক্ষভুক্ত নন, কিংবা বাম প্রভাবিত সোভিয়েতপন্থী অথবা চিনাপন্থী নন, যারা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার মধ্য দিয়ে নিজেদের শক্তি সম্বন্ধে সচেতন হয়েছেন, তাঁরা বর্িিভন্ন ধরনের পপুলার সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে সমাজ পরিব্রাজন করেছেন, তাঁরা কিন্তু ফর্মাল পলিটেক্সে অংশগ্রহণ করেননি। তাদের অংশগ্রহণ এক ধরনের টেক্স যুদ্ধ নামক অ-বিদ্যায়নিক টেক্সটের মধ্য দিয়ে তারা নিজেদের প্রকাশ করেছেন পূর্বপুরুষের লড়াইয়ের স্মৃতি এবং অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে। এসব স্মৃতি এবং অভিজ্ঞতা একদিকে পাকিস্তান কলোনিয়াল রাষ্ট্র অবদমিত করেছে, এবং অন্যদিকে যুদ্ধ নামক ফর্মাল পলিটিক্স ব্যক্তিগত এবং পাবলিক জীবনাচরণ সামনে আসতে দেয়নি। এভাবেই মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে শ্রেণী এবং সংস্কৃতি উদ্ভাসিত হয়েছে, গণসংস্কৃতি সম্পাদিত হয়েছে ফর্মাল পলিটিক্স একপাশে ঠেলে, এভাবেই ডানের সংস্কৃতি কোণঠাসা হয়েছে। সে জন্য মুক্তিযুদ্ধ, বিভিন্ন যোদ্ধার নিজস্ব জীবনচালিত, ফর্মাল পলিটিক্সের বাইরে প্রতিরোধের জটিল উৎস।

পপুলার সংস্কৃতির মধ্যে একটা ইউটোপিয়ান ডিমেনশন আছে। এই ডিমেনশন আছে বলেই পপুলার সংস্কৃতির পক্ষে সমকালীন ক্ষমতা সম্পর্কের ক্রিটিক করা সম্ভব। পপুলার সংস্কৃতি, এদিক থেকে, সমকালীন ক্ষমতা সম্পর্ক ছিঁড়েখুঁড়ে খায়, কংক্রিট আকার দেয় পলিটিক্সকে (যেমন, পোশাক শিল্পের শ্রমিকরা এই কাজটা করে চলেছেন সাহসের সঙ্গে)। এটাই হচ্ছে ঐতিহাসিক আখ্যান, ফর্মাল পলিটিক্সের বাইরে তারা ভবিষ্যতের ইতিহাস এবং রাজনীতি সফল করে চলেছেন।

একে কি অর্জিত ইউটোপিয়া বলা যাবে? অর্জিত বিপস্নব? আমার তো মনে হয় এভাবে আমরা ইউটোপিয়ার দিকে অগ্রসর হচ্ছি, এক পা দুই পা করে বিপস্নবের ভূমি দখল করে নিচ্ছি। এখানেই বামের অন্তদর্ৃষ্টি লুকানো, নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে সমাজতন্ত্রের দিকে অগ্রসর হওয়া। যে দেশ সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে (যেমন, রাশিয়া সমাজতন্ত্র বিট্রে করছে কিংবা চিন ধনতন্ত্রের দিকে অগ্রসর হচ্ছে), সে দেশ সমাজতন্ত্রের মনোপলি তৈরি করে সমাজতন্ত্র থেকে সরে আছে। পপুলার সংস্কৃতি এদিকটা সম্বন্ধে সজাগ।

পপুলার সংস্কৃতির ক্ষেত্রে, এভাবে প্রান্তিক সেনসিবিলিটি কাজ করে চলেছে। বাংলাদেশ হয়ে উঠেছে সংস্কৃতির বিভিন্ন কণ্ঠের কোরাস এবং সংস্কৃতিক সাহস পরীক্ষার ভূমি। বিভিন্ন কণ্ঠ এবং বিভিন্ন পরীক্ষা মানুষকে সহনশীল করে তুলেছে, যারা গতকাল প্রান্তিক ছিলেন, তারা আগামীকাল কেন্দ্রে এসে যাচ্ছেন। মার্জিনাল সংস্কৃতি এই প্রক্রিয়ায় পপুলার সংস্কৃতি হয়ে উঠেছে, স্টাবলিশমেন্টের রাজনীতি (বাম এবং ডান) ভয় পাচ্ছে। এই ভয় পাওয়া বৈধতা দিচ্ছে প্রান্তিক সেনসিবিলিটিকে, শক্তিশালী করে তুলছে প্রান্তিক মানুষগুলোর ক্ষমতাকে, (পোশাক শিল্পের কর্মীদের, ফুটপাতের ফেরিওয়ালাদের, নিঃস্ব কৃষকদের কিছুতেই হটানো যাচ্ছে না), তারা নির্যাতনের বিরুদ্ধে লড়াই করে চলেছেন, তারা ইতিহাসের দিক থেকে কমিউনিটির বীর। তাদের লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে কবর দেয়া, গ্রুপ আইডেন্টিটির আখ্যান প্রতিরোধের সংস্কৃতি ফিরে এসেছে। ধানের লড়াই, ভাতের লড়াই, বাসস্থানের লড়াই, ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া শেখার লড়াই_এ সবই পপুলার সংস্কৃতির ইতিহাস, বিভিন্ন কণ্ঠের কোরাস। সাধারণ মানুষ এভাবেই নিজেদের মবিলাইজ করছে বিপস্নবের জন্য।
 
Support : Dhumketo ধূমকেতু | NewsCtg.Com | KUTUBDIA @ কুতুবদিয়া | eBlog
Copyright © 2013. News 2 Blog 24 - All Rights Reserved
Template Created by Nejam Kutubi Published by Darianagar Publications
Proudly powered by Dhumketo ধূমকেতু