গৃহশ্রমিক সমস্যায় কর্মজীবী নারী by তানজিনা হোসেন

Wednesday, September 28, 2011

রোজেনার স্বপ্ন ছিল দেশের একজন সেরা আইনজীবী হওয়ার। মানবাধিকার নিয়ে কাজ করার। সে জন্যই বিশ্ববিদ্যালয়ে বেছে নিয়েছিলেন আইন বিষয়টি। পরীক্ষায় চমৎকার ফল করে ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন দেশের একজন খ্যাতনামা আইনজীবীর ফার্মে। জীবনসঙ্গী হিসেবে পেয়েছিলেন নিজেরই সহপাঠী বন্ধুকে, যিনি বেছে নিয়েছিলেন বিচারকের পেশা। দুজনের ক্যারিয়ারই এগোচ্ছিল ভালো, বছর দেড়েকের মাথায় ঘরজুড়ে এল শিশু।

সরকারি চাকরিজীবী স্বামী বেশির ভাগ সময় ঢাকার বাইরে থাকেন, ওদিকে ঢাকা শহরে নেই রোজেনার কোনো আত্মীয়স্বজনও। সন্ধ্যা অবধি স্যারের চেম্বারে বসে মামলামোকদ্দমা নিয়ে পড়াশোনা বা মক্কেল সামলানোর সময় তাঁর মন পড়ে থাকে বাড়িতে, শিশুটিকে যে রেখে এসেছেন মাত্র ১৩ বছরের আরেক শিশুর কাছে—শিশু অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে তাঁরই বাড়িতে, আর তিনি কিনা মানবাধিকার নিয়ে বড় বড় বুলি কপচাচ্ছেন! দিনমান মনে অশান্তি, কী হচ্ছে বাড়িতে, মুহূর্তে মুহূর্তে টেলিফোন, অমনোযোগের কারণে স্যারের বকুনি, গুরুত্বপূর্ণ নোট নিতেও ভুল হয়ে যায়। দিনের পর দিন নিজের সঙ্গে এভাবে যুদ্ধ করতে করতে একসময় রোজেনা হার মানলেন। ছেড়ে দিলেন নিজের ক্যারিয়ার। সে আজ সাত বছর হতে চলল। সাত বছর আগের সিদ্ধান্তটার কথা বলতে গিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন তিনি। এই সাত বছরে তাঁর স্বামী ও অন্য পুরুষ সহকর্মীরা নির্বিঘ্নে তরতরিয়ে উঠে গেছেন ক্যারিয়ারের শিখরে আর তিনি বাড়িতে বসে দীর্ঘশ্বাস ফেলেছেন শুধু। এর মধ্যে সন্তান হয়েছে আরেকটি। শুরু হয়েছে ওদের লেখাপড়া, স্কুলে যাওয়া—আরও বেড়েছে দায়িত্ব। সেই সব দায়িত্ব পালন করতে করতে রোজেনা মাঝেমধ্যে এখনো দীর্ঘশ্বাস ফেলেন—শুধু যদি একজন কেউ পাশে থাকত! এমন কেউ, যার কাছে সন্তান দুটি রেখে আসা যেত নিশ্চিন্তে।
রোজেনার মতো মালিহার ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্নও ধূলিসাৎ হয়ে যায় সেদিন, যেদিন তাঁর মা পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে বিছানায় পড়ে গেলেন। এত দিন মা-ই তাঁর সন্তানকে দেখাশোনা করতেন, স্কুলে নিয়ে যেতেন ও আনতেন। কেননা, যে বিদেশি সংস্থায় তাঁর চাকরি, তাতে প্রতি সপ্তাহেই দু-একবার ঢাকার বাইরে যেতে হয়, থাকতে হয়। সন্তানের মুখ চেয়ে স্বামীকে অনেক বলে-কয়ে, অনেক অনুরোধে রাজি করিয়ে তবেই না মায়ের বাড়িতে একসঙ্গে বসবাসের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু মা অসুস্থ হয়ে পড়ায় দ্বিমুখী এক সংকটে পড়ে গেলেন মালিহা—সন্তানের প্রতি মা হিসেবে তাঁর কর্তব্য এবং সন্তান হিসেবে মায়ের প্রতি তাঁর নিজের কর্তব্য বিষয়ে। বেশ কয়েকবার গৃহকর্মী, আয়া ইত্যাদি পাল্টেও মনমতো পাওয়া গেল না কাউকে। চরম অযত্ন আর অবহেলায় ক্রমাগত আরও অসুস্থ হয়ে পড়তে লাগলেন মা, সন্তানের অবস্থাও ছাড়া বাছুরের মতো। এই সংকটে আর কী করার ছিল মালিহার—এত দিনের পুরোনো চাকরি ছেড়ে দেওয়া ছাড়া! কদিন বাদেই একটা জুতসই পদোন্নতি হওয়ার কথা থাকলেও। মালিহাও তাই ভাবেন, যৌথ পরিবারের বিকল্প কিছু গড়ে না উঠলে তাঁর মতো নারীরা কীভাবে সব দিক সামলাবেন?

যত সব পিছুটান
একই মেধা, একই প্রতিভা, একই রকম উজ্জ্বল ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়ে ক্যারিয়ার শুরু করা দুজন নারী-পুরুষের মধ্যে নারীকে কদিন পরেই পিছু হটে আসতে হয় প্রধানত যেসব বাধার মুখে, সেই সব বাধাবিপত্তি আজকের নারীরা অনেকাংশেই সামলে নিয়েছেন। পরিবারে তাঁদের ক্যারিয়ার বিষয়ে অসহযোগিতামূলক মনোভাব অনেকটাই এখন আর নেই, স্বামীরাও স্ত্রীর কর্মজীবন নিয়ে যথেষ্টই সহানুভূতিশীল। কর্মক্ষেত্রে নারীর কর্মদক্ষতার স্বীকৃতিও এখন ইতিবাচক। এতগুলো ইতিবাচকতার ভিড়ে এখনো প্রকটভাবে নেতিবাচক হলো কর্মজীবী নারীর গৃহের নিরাপত্তার জায়গাটি। একুশ শতকের নগরায়ণে যৌথ পরিবার ভেঙে তৈরি হয়েছে ছোট ছোট ইউনিট। এই পরিবারে শিশুরাই আজ সবচেয়ে অসহায় ও একা। অনিরাপদও বটে। আর শিশুর এই নিরাপত্তাহীনতা বা অসহায়ত্বের ঝুঁকি নারীকে বাধ্য করে পিছু হটে আসতে। নারীর ক্ষমতায়ন তত দিন অসম্ভব, যত দিন না তাঁর অনুপস্থিতিতে গৃহ ও সন্তানের নিরাপত্তা বা সুষ্ঠুভাবে বেড়ে ওঠা নিশ্চিত হয়। বাড়িতে রেখে আসা সন্তানের অবস্থা প্রতিনিয়ত তাঁকে পিছু টানতে থাকলে তাঁর পক্ষে আর এগোনো অসম্ভব হয়ে পড়ে। মেয়েরা অফিসে এসেও কেবল বাড়ি বাড়ি করে—এই অপরাধে কত যে কথা শুনতে হয় কর্মদাতাদের কাছে, তা কর্মজীবী নারী মাত্রই জানেন। এতই যখন সংসার আর বাচ্চাকাচ্চার চিন্তা, তবে আর চাকরি করা কেন!

তবু তো তুমি আছো
ঠিক এই জায়গাতে শহরে কর্মজীবী নারীর জীবনে অত্যাবশ্যক উপাদান হিসেবে যুক্ত হয় গৃহকর্মীরা, যাদের কাছে সংসার ও সন্তান রেখে বেরোতে বাধ্য হন তাঁরা। এই গৃহকর্মী কারা? বেশির ভাগ ক্ষেত্রে লেখাপড়া না জানা, বাড়ির দারোয়ান বা পাশের বাড়ির গৃহকর্মী কর্তৃক গ্রামের বাড়ি থেকে আনীত, কোনো রকম পূর্বপ্রস্তুতি বা প্রশিক্ষণবিহীন, সাধারণ মাইনে আর ভাত-কাপড়ের বিনিময়ে আগত অসহায় কোনো কিশোরী বা নারী। তার কাছে গৃহিণীর চাহিদা আকাশ সমান—মেয়েটি বা নারীটি পূরণ করবে মায়ের শূন্যস্থান, নিখুঁতভাবে পালন করবে মায়ের দায়িত্ব, নিশ্চিন্ত রাখবে তাঁকে তাঁর কাজের সময়টিতে। আর গৃহকর্মীর অভিযোগগুলোও কম নয়—এই দুরন্ত বাচ্চাগুলোর জন্য এত করেও তো বেগম সাহেবার মন পাওয়া যায় না, প্রতি পদে ভুল আর ভুল। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টার ডিউটিতে কোনো বিশ্রাম নেই, বিনোদন নেই, ছুটি নেই; তবু পাওনাটা কি যথাযথ হয়? শেষে উভয় পক্ষই দাঁড়িয়ে যায় পরস্পরের বিপরীতে। যে দুজন নারী শিশুকে ঘিরে এক গভীর ও গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কে যুক্ত, সেই সম্পর্ক গড়ে ওঠে সন্দেহ, অবিশ্বাস আর অনাস্থার ওপর ভর করে। ফল যা হওয়ার তাই হয়। মানসিক টানাপোড়েন বাড়ে, অশান্তি বাড়ে, কখনো এক পক্ষ নির্যাতিত হয়। কখনো অপর পক্ষ ব্ল্যাকমেইলিংয়ের শিকার হয়। গৃহিণীর আর কোনো উপায় নেই। কেননা, তবু তো মেয়েটা আছে আর তার জন্য অফিসে যেতে পারছেন; ও না থাকলে অফিস কামাই দিতে হয়। আর গৃহকর্মীরও কোনো উপায় নেই। কেননা, এই চাকরিটা ছাড়লেও তো আরেক বাসায় চাকরি নিতে হবে। সবাই কমবেশি এক রকম। এরই মধ্যে বিপদ কখনো ঘটে বটে। সেই সব আমরা খবরের কাগজে পড়ি এবং শিউরে উঠি।

সমাধান কোথায়
ছয় বছর আগে যখন সাজিয়া উচ্চশিক্ষার্থে ইউরোপে ছিলেন, তখন ছুটিছাঁটায় বাড়তি উপার্জনের জন্য বেবি সিটিং বা বাচ্চা রাখার কাজ করতেন। এর জন্য তাঁকে একটি বিশেষ ট্রেনিং নিতে হয়েছিল। এখন দেশে ফিরে যখন তিনি নিজের সন্তানকে গৃহকর্মীর কাছে রেখে অফিসে যাচ্ছেন, তখন এই পেশার প্রয়োজনীয়তাটা খুব বেশি করে অনুভব করছেন। তাঁর মতে, বিদেশে যেখানে শিক্ষিত নারীরাও স্বচ্ছন্দে এই কাজ করেন এবং ভালোই আয় করে থাকেন, তবে এ দেশে নয় কেন? আমাদের দেশে এখন কর্মজীবী নারীর সংখ্যা অনেক, আর সন্তানের নিরাপত্তার জন্য বেতনের বড় একটা অংশ খরচ করতে আপত্তি নেই বেশির ভাগের। তাহলে আমাদের এখানে প্রশিক্ষিত বেবি সিটার বা গৃহকর্মী গড়ে উঠছে না কেন? প্রতিবছর এত যে এসএসসি বা জেএসসি পাস করে বোরোচ্ছে অনেক মেয়ে, বেকার বসে থেকে বিয়ের দিন গুনছে, তাদের অনেকেই তো ট্রেনিং নিয়ে এই কাজ করতে পারে। দুস্থ নারীদের সেলাই বা পারলারের কাজ শেখানোর পাশাপাশি শিশু পালনের ট্রেনিং দিয়ে পুনর্বাসিত করা যায়!
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মাহবুবা নাসরিন বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরেই গৃহকর্মকে একটি শ্রম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার চেষ্টা চলছে, কিন্তু হচ্ছে না। কেননা, সমস্যাটা দৃষ্টিভঙ্গিতে। গৃহকর্মীর কাজের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টানো দরকার। কাজের মেয়ে হিসেবে আচরণ না করে তার প্রতি পরিবারের সদস্যের মতো আচরণ করা, তাদের সম্বোধনে সহানুভূতিশীল হওয়া, বিপদে-অসুখে সাহায্য করা—মোটকথা তাদের সামাজিক অবস্থানটাকে স্বীকৃতি না দিলে আমরা শিক্ষিত বা প্রশিক্ষিত গৃহকর্মী পাব না। এ ক্ষেত্রে কোনো প্রতিষ্ঠান, এজেন্সি বা এনজিও এগিয়ে আসতে পারে, যারা দুই পক্ষের অধিকার সংরক্ষণ করবে, নিয়মনীতি চালু করবে, চাকরির ন্যায্য-অন্যায্য নির্ধারণ করবে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। আইন-কানুনের বাইরে কিছু করলে উভয় পক্ষেরই বিচার চাওয়ার জায়গা থাকবে এবং জবাবদিহি থাকবে। অর্থাৎ গোটা শ্রমটার একটা প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি থাকলে এর ভেতরকার নিরাপত্তাহীনতা ও অনাস্থা অনেকটাই কমে আসবে।’ মাহবুবা আরও মনে করেন, যত বেশি মেয়ে নানা ধরনের কাজে এগিয়ে যাবেন, শিক্ষিত হয়ে উঠবেন, ততই তাঁরা নিজেদের প্রয়োজনেই গৃহকর্মীদের প্রতি সহূদয় ও সহানুভূতিশীল হয়ে উঠতে থাকবেন, তাদের প্রাপ্য মর্যাদা দিতে আগ্রহী হবেন।

চাই নির্ভাবনা ও নিশ্চিন্তি
একেবারে প্রাথমিকভাবে হলেও বাংলাদেশে ইদানীং গৃহকর্মী সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে শুরু করেছে। এমনই একটি প্রতিষ্ঠান জেএস মিডিয়া লিমিটেডের আলীমুজ্জামান বলেন, ‘আমরা গৃহকর্মী ও ক্লায়েন্টের মধ্যে একটা চুক্তিপত্র সম্পাদন করি। এতে কাজের ধরন, বেতন-ভাতা, ছুটিছাটা ইত্যাদি বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকে। ছবি, পূর্ণ ঠিকানা ও জাতীয় পরিচয়পত্র সংরক্ষণ করি। দুই পক্ষ সম্পর্কেই ভালো করে খোঁজখবর নিতে চেষ্টা করি। কিন্তু এগুলোর আসলে তেমন কোনো আইনি ভিত্তি নেই। কেননা, সত্যিকারের নিয়ম-কানুন ও আইনবিধি তৈরি করতে সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে। গৃহশ্রমের বাজার একটি বৃহৎ বাজার এবং এর চাহিদা ব্যাপক। আমরা মনে করি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত এগিয়ে আসা উচিত।’
আমরা রোজেনা, মালিহা বা সাজিয়ার মতো মেধাবী কর্মজীবী নারীকে আর হারাতে চাই না। এ দেশে তাঁদের মেধা ও দক্ষতার প্রয়োজন আছে। কিন্তু তার আগে চাই এমন ব্যবস্থা ও পরিবেশ, যাতে তাঁরা নিশ্চিন্তে ও নির্ভাবনায় নিজেদের কাজে নিয়োজিত হতে পারেন। তাই সময় এসেছে প্রশিক্ষিত ও আইনানুগ গৃহশ্রমিক নিয়োগ নিশ্চিত করার।

সর্বোচ্চ আদালতে বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা

Friday, March 11, 2011

বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা। তিনি বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ইতিহাসে প্রথম নারী বিচারপতি হলেন। হাইকোর্টেও অবশ্য তিনিই প্রথম নারী। আজকের এই অবস্থানে আসতে তাঁকে পার করতে হয়েছে নানা প্রতিকূলতা, বাধা-বিপত্তি। তবে সবকিছু জয় করে তিনি এখন দেশের ও বিচার বিভাগের ইতিহাসের অংশ।
মেয়েরা আবার ‘উকিল’ হয় নাকি!
নাজমুন আরা সুলতানার কর্মজীবনের শুরু আইনজীবী হিসেবে। ১৯৭২ সালের জুলাই মাসে ময়মনসিংহ জেলা আদালতে। তখন লোকে বলত, মেয়েরা আবার ‘উকিল’ হয় নাকি! এই মেয়ে কী ওকালতি করবে? লোকের এসব ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ আর তাচ্ছিল্য পাশ কাটিয়ে তিনি সামনে এগিয়েছেন।
বেড়ে ওঠার গল্প
১৯৫০ সালের ৮ জুলাই মৌলভীবাজারের আবুল কাশেম মঈনুদ্দীন ও রশীদা সুলতানা দম্পতির ঘরে জন্ম নেন নাজমুন আরা সুলতানা। তাঁরা তিন বোন ও দুই ভাই। বাকি চার ভাইবোনের সঙ্গে শৈশব-কৈশোরের সময়টা কেটেছে ময়মনসিংহে। এই শহরের বিদ্যাময়ী সরকারি উচ্চবিদ্যালয় থেকে ১৯৬৫ সালে তিনি এসএসসি পাস করেন; ১৯৬৭ সালে মুমিনুন্নেসা উইমেন্স কলেজ থেকে এইচএসসি এবং আনন্দ মোহন কলেজ থেকে ১৯৬৯ সালে বিএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন।
মায়ের উৎসাহে বাবার স্বপ্নপূরণ
মাত্র ১১ বছর বয়সে বাবাকে হারান নাজমুন আরা সুলতানা। তবে তিনি তাঁর বাবার স্বপ্নকে হারাতে চাননি। বাবার ইচ্ছা ছিল, তাঁর সন্তানদের কেউ একজন আইনজীবী হবে। বাবার স্বপ্নপূরণে এগিয়ে আসেন তিনি। বিএসসি পাসের পর তিনি মোমেনশাহী ল কলেজে ভর্তি হন। তবে ওই সময় ব্যাপারটা এত সহজ ছিল না। আইন কলেজে রাতে ক্লাস করতে হতো। রাতের বেলা একজন অবিবাহিত মেয়ে ক্লাস করতে যাবে—এটা আশপাশের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। এ সময় পাশে এসে দাঁড়ান তাঁর মা রশীদা সুলতানা। তিনি ছিলেন ময়মনসিংহের রাধাসুন্দরী গার্লস হাইস্কুলের শিক্ষিকা। প্রতিকূলতা জয় করে সামনে এগিয়ে যেতে মেয়েকে উৎসাহ আর সমর্থন দেন তিনি। বাবার স্বপ্ন আর সেই স্বপ্ন পূরণে মায়ের সমর্থন পেয়ে ১৯৭২ সালে তিনি এলএলবি পাস করেন।
বিচারক হতে বাধা
আইনজীবী হয়ে বাবার স্বপ্ন পূরণ তো হলো! এবার নিজের স্বপ্নের পাখাটা মেলে ধরার ইচ্ছে জাগল মনে। স্বপ্ন—এবার তিনি বিচারক হবেন। কিন্তু আবার বাধা। আর এই বাধাটা তৈরি করে রেখেছিল রাষ্ট্র নিজেই। রাষ্ট্রের কাছে মনে হয়েছে, নারী বিচারক হওয়ার যোগ্য নয়। এই পদটা নারীর জন্য নয়। তবে ১৯৭৪ সালে এই অদ্ভুত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। স্বপ্নপূরণের পথটা সুগম হয় নাজমুন আরা সুলতানার জন্য। বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে পরের বছর ১৯৭৫ সালের ২০ ডিসেম্বর তিনি মুনসেফ হিসেবে বিচার বিভাগে যোগ দেন।
ভিড় ঠেকাতে পুলিশ ফোর্স
বাংলাদেশের প্রথম নারী বিচারক হিসেবে নাজমুন আরা সুলতানা যখন খুলনায় দায়িত্ব পালন করতে যান, তখন মুখোমুখি হন এক ভিন্ন অভিজ্ঞতার। আশপাশের লোকজন দল বেঁধে তাঁকে দেখত আসত। সেই ভিড় সামাল দিতে প্রথম দিকে মাঝেমধ্যে পুলিশ ফোর্সও রাখা হতো।
নিম্ন আদালত থেকে উচ্চ আদালতে
মুনসেফ হিসেবে নাজমুন আরা সুলতানা খুলনা, নারায়ণগঞ্জ ও টাঙ্গাইলে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮২ সালে সাবজজ হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে তিনি টাঙ্গাইল ও ফরিদপুরে পাঁচ বছর কাজ করেন। কয়েক দফা পদোন্নতির পর ১৯৯১ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জেলা জজ হিসেবে যোগ দেন। কোনো নারীর জেলা জজ হওয়ার ঘটনা সেটাই প্রথম। ২০০০ সালের ২৮ মে তিনি হাইকোর্টে অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান। এর দুই বছর পর হাইকোর্টের স্থায়ী বিচারপতি হন তিনি। সর্বশেষ ২০১১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি তিনি আপিল বিভাগের প্রথম নারী বিচারপতি হিসেবে শপথ নেন।
ফতোয়া অবৈধ
হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে নাজমুন আরা সুলতানা অনেক রায় দিয়েছেন। তবে ফতোয়া অবৈধ ঘোষণা করে দেওয়া রায় অনেক বেশি আলোচিত ও প্রশংসিত হয়েছিল। ২০০১ সালের ১ জানুয়ারি বিচারপতি গোলাম রাব্বানী ও বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ফতোয়াকে অবৈধ ও আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করে রায় দেন।
এ ছাড়া গত বছরের ১৩ অক্টোবর বিএনপির চেয়ারপারসন ও বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়ার সেনানিবাসের বাড়ি নিয়ে রায়, জোট আমলে বাদ পড়া ১০ জন বিচারপতিকে স্থায়ী নিয়োগের নির্দেশ দিয়ে ২০০৮ সালের ১৭ জুলাই দেওয়া রায় আছে তাঁর দেওয়া উল্লেখযোগ্য রায়ের তালিকায়।
কাজের স্বীকৃতি, নারীর ক্ষমতায়ন
আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে শপথ নেওয়ার পর বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা সাংবাদিকদের বলেন, ‘অনুভূতি অনেক ভালো। আমি আমার কাজের স্বীকৃতি পেয়েছি। প্রথম নারী বিচারক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলাম। হাইকোর্টেও প্রথম বিচারপতি হিসেবে এসেছিলাম। এবারও আপিল বিভাগে প্রথম বিচারপতি হিসেবে এলাম।’ তিনি মনে করেন, তাঁর এই নিয়োগ দেশে নারীর ক্ষমতায়নে অবদান রাখবে।
স্বামী-সন্তানের অকুণ্ঠ সমর্থন
বিয়ের আগে মায়ের উৎসাহ ও প্রেরণা। বিয়ের পরে সেই দলে নাম লেখান নাজমুন আরা সুলতানার স্বামী কাজী নুরুল হক। স্ত্রীর বদলির চাকরি। এক বছর এই জেলায় তো পরের বছর অন্য জেলায়। কিন্তু এতে বিরক্ত হননি কাজী নুরুল হক, স্ত্রীকে ফেলেননি চাকরি বনাম সংসারের দ্বন্দ্বে, বরং স্ত্রীকে তাঁর দায়িত্ব পালনে পূর্ণ সহযোগিতা করেছেন। একসময় এই দম্পতির ঘর আলো করে আসে দুই ছেলে উপল ও সূর্য। তাদের পড়াশোনা, দেখভাল করা—এর বেশির ভাগটাই সামাল দিয়েছেন কাজী নুরুল হক। ছেলেরাও বড় হতে হতে বুঝেছেন তাঁদের মায়ের কাজের ধরন আর সম্মানের বিষয়টি। তারাও কখনো এটা-সেটা নিয়ে অন্যায় আবদার করেননি। স্ত্রীর এই অর্জনে স্বভাবতই অনেক খুশি ও গর্বিত কাজী নুরুল হক। সম্প্রতি তিনি বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশনের সচিব পদ থেকে অবসরে গেছেন। দুই ছেলেই প্রকৌশলী হয়েছেন। বড় ছেলে কাজী সানাউল হক উপল অস্ট্রেলিয়ায় থাকেন। ছোট ছেলে কাজী এহসানুল হক সূর্য দেশেই কাজ করছেন।
প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা আর সাহসিকতা
‘অল্প কথায় বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা সম্পর্কে বলা মুশকিল। তিনি অসম্ভব প্রজ্ঞাবান, দূরদর্শী ও সাহসী। তাঁর এই গুণগুলোই তাঁকে আজকের এই অবস্থানে নিয়ে এসেছে।’ বলছিলেন বাংলাদেশ মহিলা জজ অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব শারমিন নিগার। বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা ছিলেন এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। সংগঠনটি গড়ে তোলার সময়কার কথা স্মরণ করে শারমিন নিগার বলেন, ওই সময় নারী বিচারকদের নিয়ে আলাদা একটি সংগঠন গড়ে তোলা সহজ কাজ ছিল না। পদে পদে বাধা এসেছে। কিন্তু অসম্ভব দৃঢ়তা, সাহস ও ধৈর্য নিয়ে সেসব বাধা পার করেছেন তিনি। এ ছাড়া বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা আন্তর্জাতিক মহিলা জজ অ্যাসোসিয়েশনের অন্যতম ডাইরেক্টর।

কেমন আছেন রিতা-মিতা

Wednesday, February 2, 2011

বাড়িটা এখনো ভূতের বাড়ি বলে পরিচিত। সেই বাড়িতে থাকেন রহস্যময় দুই বোন। মনে আছে তাঁদের কথা? মনে পড়ে যাওয়ারই কথা। যদিও মাঝে পাঁচ বছর কেটে গেছে। কেমন আছেন সেই দুই বোন রিতা-মিতা? তাঁদের কথা জানতে প্রথমে যোগাযোগ করা হয় আইনজীবী এলিনা খানের সঙ্গে। তিনি বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী হিসেবে বর্তমানে কর্মরত। ২০০৫ সালের ৭ জুলাই দীর্ঘ ১৬ ঘণ্টা চেষ্টার পর মিরপুরের সেই বাড়ি থেকে দুই বোনকে প্রথমে বের করে আনেন তিনি।
এলিনা খানই জানান, দুই বছর হলো তাঁদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ নেই। তবে আগের বাড়িতেই আছেন। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি এলিনা খান ও তাঁর দুই সহকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে হাজির হলাম রিতা-মিতার বাড়ির সামনে। এলিনা খান দেখিয়ে দিলেন কোন দোকান থেকে তাঁরা প্রতি মাসে ভাড়া পান। উডল্যান্ড ফার্নিচারের সেই দোকানের স্বত্বাধিকারীকে দোকানে না পেয়ে টেলিফোনে কথা হয়। দোকানের স্বত্বাধিকারী পনু বললেন, ‘প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা দোকানভাড়া নিয়ে যান রিতা। মিতা কখনো আসেন না। মাঝেমধ্যে সকাল ছয়টা-আটটার দিকে হাঁটতে বের হন দুই বোন। মেয়েকে সকালে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার সময় দেখি তাঁদের। পাউরুটি, দুধই তাঁরা এখন খেয়ে থাকেন। আমার মনে হয়েছে, মিতা বেশ অসুস্থ। তাঁর চিকিৎসা দরকার।’ মিরপুরের সেই বাড়ির সামনে চিকিৎসক আইনুন নাহার রিতার একটি সাইনবোর্ড লাগানো। বাড়ির গেটে আর্বজনার স্তূপ। ভেতর থেকে বড় তালা ঝোলানো। পাশের নির্মাণাধীন বাড়ির দারোয়ান বললেন, ‘আমি বের হতে দেখি না। বড় বোন বের হয়। তাও সপ্তাহে একদিন। তখন শুধু তরল দুধের প্যাকেট আর পাউরুটি কিনতে দেখি। রাতে ১১টার পরে বের হয়।’ এলিনা খান বললেন, ‘এটি খুবই দুশ্চিন্তার বিষয়। প্রথম দিকে যখন ওরা মানসিকভাবে বেশি অসুস্থ ছিল, তখন দুধ, পাউরুটি খেয়ে থাকত। সুস্থ হওয়ার পর স্বাভাবিক সব খাবারই খেয়েছে।’ গেটে ধাক্কা দিয়ে ভেতর থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যাচ্ছিল না। পরিত্যক্ত বাড়ির মতো লাগছে। ঝোপঝাড়, চারপাশে আর্বজনা, পোকামাকড়ের বসতি যেন। দেয়াল টপকে গেলেন সঙ্গে থাকা আলোকচিত্রী। অনবরত জানালায় শব্দ করে, ডাকাডাকি করেও কোনো সাড়া আসছিল না ভেতর থেকে। সব চেষ্টা যখন ব্যর্থ, হঠাৎ ঘরের মধ্য থেকে বের হলেন একজন। এলিনা খান ও তাঁর সহকর্মী মাহমুদাকে দেখেই বারান্দার গ্রিলের ওপাশ থেকে রিতা রাগে গজগজ করতে থাকেন। রিতা বলেন, ‘আল্লাহর গজব নাজিল হবে। শান্তিতে থাকতে দিতে চাও না। আবার সম্পত্তির লোভে আসছ?’ বলেই ভেতরে ঢুকে যান। পরে আর বের হননি দুই বোনের কেউই। পরে এলিনা খান বললেন, ‘আমাকে দেখলে ভাবেন, বোধহয় বাসা থেকে বের করে নিয়ে যাব। আইনুন নাহার রিতা সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নেন। আর মিতা বুয়েট থেকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে বিদেশে গিয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নেন। তাঁদের বাবা মারা যাওয়ার পর সম্পত্তি নিয়ে নানা ধরনের ঝামেলা হয়। সেখান থেকেই সমস্যাটার শুরু হয়। তাঁদের মা প্রায় ১০ বছর স্বাভাবিক জীবন যাপন করেননি। জানা যায়, তিনিও সিজোফ্রেনিয়ার রোগী ছিলেন। রিতা-মিতাও সেই রোগে আক্রান্ত। তাঁরা অপুষ্টি আর নানা রোগে আক্রান্ত ছিলেন। অনেক চেষ্টা করে বের করে এনেছিলাম। ২০০৮ সালে দ্বিতীয়বার বের করি। অনেক নাটক করতে হয়। তাঁদের আরেক বোন আছেন, যাঁর সঙ্গে অনেক যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু পাইনি। তাঁদের সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করার ব্যবস্থা করতে হবে। এ ছাড়া যেকোনো কাজে মনটাকে ব্যস্ত রাখলে হয়তো তাঁরা আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন। সবচেয়ে বেশি ভয় লাগে, তাঁরা যদি খুব অসুস্থ হন কিংবা মৃতপ্রায় অবস্থা হলেও তো কেউ জানবে না।’
২০০৫ সালে যখন নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত, তখন তাঁদের প্রথমে ঢাকার ধানমন্ডি ক্লিনিকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে নিয়ে যাওয়া হয় সেন্ট্রাল হাসপাতালে। সেখানে চিকিৎসক সেহেরীন এফ সিদ্দিকা, খাজা নাজিমুদ্দিন ও মোহিত কামাল দুই বোনের চিকিৎসার দায়িত্ব নেন। বর্তমানে হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজের গাইনি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সেহেরীন এফ সিদ্দিকার সঙ্গে কথা হয় তাঁদের নিয়ে। তিনি বলেন, ‘আমরা তিন চিকিৎসক মিলেই ওদের চিকিৎসা দিয়েছিলাম। ওদের মেয়েলি কিছু রোগ ছিল। তার চিকিৎসা দিয়েছিলাম। সেরেও ছিল। ফলোআপের জন্য পরেও এসেছিল বেশ কয়েকবার।’ রিতার চিকিৎসক বন্ধুদের কাছে খোঁজখবর করেছিলাম। পরে তাঁরাও আর কিছু বলতে পারেনি।
 
Support : Dhumketo ধূমকেতু | NewsCtg.Com | KUTUBDIA @ কুতুবদিয়া | eBlog
Copyright © 2013. News 2 Blog 24 - All Rights Reserved
Template Created by Nejam Kutubi Published by Darianagar Publications
Proudly powered by Dhumketo ধূমকেতু