দুর্নীতি দমন- চাই দুদকের দৃপ্ত পদচারণ by আলী ইমাম মজুমদার

Tuesday, February 11, 2014

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইনে তাদের ক্ষমতায় কিছু সীমাবদ্ধতা এনে একটি সংশোধনী বিল সংসদে যায় বছর তিনেক আগে।
দুদকের ক্ষমতা সীমিতকরণ-সংক্রান্ত প্রস্তাবটিতে দেশের সুশীল সমাজ ব্যাপক আপত্তি জানায়। আপত্তি জানায় দুদক। তদানীন্তন দুদক চেয়ারম্যান বলেছিলেন, এ সংশোধনী আনা হলে সংস্থাটি একটি নখ, দন্তহীন ব্যাঘ্রে পরিণত হবে। আইনটি দীর্ঘকাল পড়ে ছিল সংসদে। দুদকের নখ, দাঁত ছিল অক্ষত। কিন্তু সেগুলো কতটুকু, কীভাবে প্রয়োগ হয়েছে, দেশবাসীর তা জানা। হঠাৎ করে গত নভেম্বরে সংশোধনী বিলটি পাস হয়ে যায়। দুদক আইনে নতুন সংযোজিত ৩২ ধারায় বিধান করা হয়, এ আইনে কোনো জজ, ম্যাজিস্ট্রেট বা পাবলিক সার্ভেন্টকে অভিযুক্ত করতে হলে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯৭ ধারা অনুসরণ করতে হবে। সে বিধি অনুসারে আবশ্যক রয়েছে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন। এতে দুদকের স্বাধীন সত্তা সীমিত হয়। কার্যকারিতা কমে যাবে বলে আশঙ্কা করেন অনেকেই। সুশীল সমাজ এবারও তীব্র আপত্তি করতে থাকে।

শেষ পর্যন্ত এ বছরের জানুয়ারি মাসে এক জনস্বার্থ মামলার রিটে হাইকোর্ট বিভাগ বিধানটি বেআইনি ও বৈষম্যমূলক বলে বাতিল করে দিয়েছেন। সে ক্ষেত্রে তাদের নখ আর দাঁত অক্ষতই রইল। দেশবাসী আশা করতে পারে, এ নখ আর দাঁতের ব্যবহার তারা করবে মনুষ্য রূপধারী হিংস্র কিছু দানবের প্রতি। যে দানবেরা ঘুষ, জালিয়াতি, চাঁদাবাজি আর ক্ষমতার অপপ্রয়োগের মাধ্যমে জনস্বার্থ বিপন্ন করে নিজেরা লাভবান হচ্ছে।
এখানে স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন গঠনের পটভূমিকা কিছুটা আলোচনার দাবি রাখে।
আমরা অনেক চড়া মূল্যে এ দেশের স্বাধীনতা অর্জন করেছি। স্বাধীনতাযুদ্ধের চেতনাগুলোর মধ্যে ছিল আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে সমতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। স্বাধীনতার ৪৩ বছর পর আমাদের অর্জন ও ব্যর্থতার হিসাব-নিকাশ করলে দেখা যাবে, শাসনব্যবস্থা কার্যকর হলে অর্জন আরও বেশি হতো। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার আমাদের শাসনব্যবস্থার অংশ হয়ে পড়েছে—এমনটাই দেখা যায়। এ বিষয়ে আমাদের প্রচলিত আইন ও বিধিবিধান অকার্যকর বলেই প্রতিপন্ন হয়। দাবি ওঠে একটি স্বাধীন, শক্তিশালী দুর্নীতি দমন কমিশন প্রতিষ্ঠার। দাবি ওঠায় সুশীল সমাজ। পাশাপাশি দাবিটির প্রতি সমর্থন দেয় উন্নয়ন সহযোগী দেশ ও সংস্থাগুলো। এর মাঝে বাংলাদেশ জাতিসংঘের দুর্নীতি দমন কনভেনশন অনুসমর্থন করে। এসব কিছুর ফলে ২০০৪ সালে সংসদে গৃহীত হয় স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন আইন।
আইন প্রণয়নের পর কয়েক দফায় কমিশন গঠন-পুনর্গঠন হয়েছে। চারদলীয় জোট সরকারের সময়কার প্রথম কমিশন তো নিজদের মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি করে দিব্যি দুই বছর কাটিয়ে দিয়েছিল। নিষ্ফলা ছিল সে কমিশনটি। ২০০৭ সালে রাজনৈতিক পালাবদলের পর নতুনভাবে আরেকটি কমিশন গঠিত হয়। এটার ওপর আবার তখনকার সরকারের একটি অংশের প্রবল নিয়ন্ত্রণ ছিল। ফলে অতি সক্রিয় ছিল সে সময়কার কমিশন।
অভিযোগ আছে পক্ষপাতিত্বসহ আরও অনেক কিছুর। কিছু অভিযোগের সত্যতা থাকতেও পারে। তবে দুর্নীতি করলে কোনো না কোনো সময় আইনের আওতায় আসতে হবে—এ চরম বার্তাটি সে কমিশন সব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও সাফল্যের সঙ্গে দেশবাসীকে দেয়। দুর্ভাগ্যজনক হলো, তবে বিভিন্ন কারণে তাদের সে প্রয়াস স্থায়ী রূপ পায়নি। বরং ২০০৯ সালে ক্ষমতার পালাবদলের পর একশ্রেণীর লোক দলবল নিয়ে নেমে পড়লেন দুর্নীতির মহোৎসবে। এটাই আমরা দেখলাম। আগেকার জোট সরকার থেকে ভিন্ন কিছু ঘটল—এমন দেখা গেল না। ফলে পাঁচ বছরের ব্যবধানে তাঁদের কারও কারও সম্পদের নিট স্ফীতি ক্ষেত্রবিশেষে কয়েক সহস্র গুণ হওয়ার অবিশ্বাস্য ঘটনা আমাদের সামনে এল। আর তা এল নির্বাচন কমিশনে ২০০৮ ও ২০১৩ সালে তাঁদের দাখিল করা সম্পদ বিবরণী পর্যালোচনা করেই।
প্রথমত, দুদক এ বিষয়ে তাদের কিছু করার নেই বলে এড়িয়ে যেতে চাইল। পরে তীব্র সমালোচনার মুখে জানাল, তারা এই জনপ্রতিনিধিদের সম্পদের উৎস নিয়ে তদন্ত করবে। দু-একটি ক্ষেত্রে তা শুরু হয়েছে বলেও মনে হয়। তবে এ ‘কৃষ্ণগহ্বর’ থেকে দুদক উল্লেখযোগ্য কিছু বের করতে পারবে—এমনটা বিশ্বাস করতে ভরসা হয় না। তাদের বরাবরের মতো সরকারের সন্তুষ্টি বিধান করেই চলতে হবে। অন্তত নিকট অতীতের ঐতিহ্য তারা ভাঙতে সক্ষম হবে—এমন মনে হয় না। এ আশঙ্কা করলে আমাদের সংশয়বাদী বলে গাল দিতে পারে। কিন্তু কঠোর বাস্তবতা সামনে চোখ রাঙাচ্ছে।
২০০৯ সালে ক্ষমতার পালাবদলের পর প্রথমত আগের চেয়ারম্যান পদত্যাগ করেন। নিযুক্ত হন নতুন চেয়ারম্যান। মেয়াদ সম্পন্ন হলে কমিশনার দুজনও নতুনদের দ্বারা স্থলাভিষিক্ত হলেন। এ নতুন কমিশন সরকারের বিরুদ্ধে যাঁরা আছেন, তাঁদের মামলাগুলো গুরুত্ব দিয়ে করার চেষ্টা করছে। এর বেশি কিছু নয়। ২৭০ কোটি ডলারের পদ্মা সেতু প্রকল্পটি আটকে যায় মূলত দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগে। এ অভিযোগের ক্ষেত্রে শুরু থেকেই দুদক জাতির কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা পালন করেনি। বরং দেখা গেছে, বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ প্রসঙ্গে সরকারের যে বক্তব্য, তার আগ বাড়িয়ে আরও জোরালো বক্তব্য দিচ্ছেন তদানীন্তন দুদক চেয়ারম্যান। কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিকে অকারণে ফাঁসিয়ে দিতে কেউ বলবে না। তবে সম্ভাব্য সন্দেহের ক্ষেত্রে অনুসন্ধান, মামলা দায়ের আর তদন্ত দোষের কিছু নয়। বিষয়টি নিয়ে কানাডার আদালতে কিন্তু একটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
পদ্মা সেতু নিশ্চয়ই একদিন হবে। স্বাভাবিকভাবেই এর ব্যয় বৃদ্ধি পাবে দুই-তিন গুণ। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে অবশিষ্টাংশের সঙ্গে সংযুক্ত করার প্রয়াসও পিছিয়ে গেল। এখানে মূল দায় যাদেরই হোক, স্বাধীন সংস্থা হিসেবে দুদকের কাছে একটি বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত দেশবাসীর কাম্য ছিল। এমন আশা করছিল উন্নয়ন সহযোগীরাও। এতে ঋণ চুক্তিটি হয়তো বা রক্ষা পেত। আইন ও অবয়বে ভিন্ন রূপ নিলেও কাজেকর্মে দুদক কিন্তু তার পূর্বসূরি ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানগুলোর ছায়াই অনুসরণ করে চলছে। অথচ কমিশনারদের নিয়োগ-প্রক্রিয়া অনেক মর্যাদাসম্পন্ন। তাঁদের অপসারণও সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের মতো একটি জটিল প্রক্রিয়াসাপেক্ষ। দায়িত্ব পালনে তাঁদের কারও কাছে জবাবদিহি করতে হয় না। সামান্য সময়ের জন্য যেটুকু আইনি জটিলতা সৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল, তা-ও অপসারিত। তা সত্ত্বেও সংস্থাটি তার স্বাধীন ও নিরপেক্ষতার ছাপ রাখতে কিছুমাত্র সক্ষম হয়েছে—এমন দাবি করা যাবে না।
আমাদের দেশে এ-জাতীয় অবস্থা শুধু দুদকেই, তা নয়। অনেক প্রতিষ্ঠানেই এ ব্যাধি ছড়িয়ে পড়েছে। সরকার কিসে তুষ্ট হবে, সেটা বিবেচনায় নিয়ে কাজ করতে চায় অনেকে। এতে অনেক প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা ভেঙে পড়েছে। জাতীয় প্রয়োজনে তারা সাড়া দিতে সক্ষম হচ্ছে না। দুদক প্রসঙ্গ এখানে বারবার আসবে। দুর্নীতির ব্যাধি আজ গোটা জাতিকে গ্রাস করে ফেলছে। সংবর্ধনা সভায় সরকারের উচ্চ পদাধিকারী ‘ঠাট্টা করে’ আজ মাইক্রোফোনে ক্রেস্টের পরিবর্তে ক্যাশ চাইছেন। এ ধরনের ‘ঠাট্টা’ ক্ষমতার অপব্যবহার তথা দুর্নীতির পর্যায়ে পড়ে কি না, তা দুদকেরই দেখার কথা। তারা কিছুটা সক্রিয় হলে এর আংশিক নিরাময়ও সম্ভব। আইনি সমর্থন, অবকাঠামো ও লোকবল সবই আছে তাদের। কোথাও অপূর্ণতা থাকলে এটা মেটাতে দাবি জানাতে পারেন। একটু নড়েচড়ে উঠলেই সতর্ক হতে শুরু করবেন দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তিরা।
তবে জানা যায়, দুদকের নিম্নপদস্থ ব্যক্তিদের হাতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনাবশ্যক হয়রানির শিকার হয় কিছু ‘পাবলিক সার্ভেন্ট’। প্রতিষ্ঠানটির সর্বোচ্চ পর্যায়ে এ বিষয়ে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা ও নিবিড় তদারকির ব্যবস্থা থাকলে এ-জাতীয় অবস্থার অবসান ঘটাতে সহায়ক হবে। আর যেসব ‘পাবলিক সার্ভেন্ট’ দুর্নীতি করে না, তারা কোনো স্বার্থান্বেষী ব্যক্তির দ্বারা সাময়িক হয়রানি হলেও ভয় পাওয়ার কিছু নেই। কমিশনের অনুমোদন ব্যতীত এ আইনে কোনো মামলা রুজু করার কোনো আইনি সুযোগ নেই। তবে নিজে লোভের বশীভূত হয়ে বা অন্যের চাপে বেআইনি কাজ করলে যথাযথ ফল ভোগ করতেই হবে।
পরিশেষে থাকছে, প্রতিষ্ঠানটিকে সবাই স্বাধীন ও সক্রিয় দেখতে চায়। আশা করে, সব জড়তা কাটিয়ে এরা আইনের বাতাবরণে এ-জাতীয় দায়িত্ব পালনে তৎপর হবে। এখন কিন্তু নখ, দাঁত সবই রয়ে গেল তাদের। তাই অক্ষমতার কোনো অজুহাত দেওয়া যাবে না। অবশ্য নখ-দন্তধারী কিছু হিংস্র প্রাণীও পোষা থাকতেই পছন্দ করে। দুদক অন্তত নিজেদের এ ধরনের সন্দিহান অবস্থা থেকে বাইরে আনতে সচেষ্ট হবে—এ প্রত্যাশা রইল।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

টেন্ডারবাজি: বগুড়ায় ঠিকাদার খুন, লক্ষ্মীপুরে বাক্স ছিনতাই বরিশালে যুবলীগ নেতাকে পেটালো ছাত্রলীগ

Tuesday, January 21, 2014

লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে টেন্ডার বাক্স ছিনতাই ও বরিশালে টেন্ডার ভাগাভাগি নিয়ে যুবলীগ নেতাকে পিটিয়েছে ছাত্রলীগ। লক্ষ্মীপুরে টেন্ডার বাক্স ছিনতাইয়ের ঘটনায় জড়িত ৩ যুবলীগ নেতাকে বহিষ্কার ও কমিটি বাতিল করা হয়েছে।
ঘটনাটি ঘটে গতকাল উপজেলা এলজিইডি কার্যালয়ে। এ ঘটনায় মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে উপজেলা প্রশাসন। ওদিকে রাত সোয়া নয়টায় বগুড়া জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ভেতরে সন্ত্রাসীদের ছুরিকাঘাতে নিহত হয়েছেন আবদুল মজিদ নামে এক ঠিকাদার। দিনব্যাপী টেন্ডারবাজি নিয়ে উত্তেজনার পর রাতে এ ঘটনা ঘটে।

লক্ষ্মীপুর/রায়পুর প্রতিনিধি জানান, রায়পুরে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের ২টি প্যাকেজে ৩টি বিদ্যালয়ের প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ টাকার দরপত্রের টেন্ডার বাক্স ছিনতাই করে নিয়ে যান যুবলীগের নেতাকর্মীরা। পরে উপজেলা পরিষদের সামনে টেন্ডার বাক্সটি ভাঙচুর করে তারা। উপজেলা প্রকৌশল কার্যালয় ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রায়পুর উপজেলায় পিইডিপি-৩ প্রকল্পের আওতায় ২ প্যাকেজে ৩টি বিদ্যালয়ের প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ টাকার কাজের দরপত্র বিক্রি হয়। বিক্রির শেষ দিন সোমবার পর্যন্ত এ কার্যালয় থেকে ৩৩টি শিডিউল বিক্রি হয়। গতকাল জমা দেয়ার শেষ দিন ছিল। সে অনুযায়ী সকাল থেকে দরপত্র জমা দিতে থাকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো। দুপুর ১২টায় উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক কামরুল হাসান রাসেলের নেতৃত্বে দলীয় নেতাকর্মীরা উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয় ঢুকে টেন্ডার বাক্স ছিনিয়ে নেয়। পরে উপজেলা কার্যালয়ের সামনে টেন্ডার বাক্স ভাঙচুর করে জমা পড়া দরপত্রগুলো নিয়ে যায়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে। তবে এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত কাউকে পুলিশ আটক করতে পারেনি। রায়পুর উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক কামরুল হাসান রাসেল বলেন, এ ঘটনার সঙ্গে যুবলীগের কোন সম্পৃক্ততা নেই। যুবলীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছে তা সত্য নয়। রায়পুর উপজেলা প্রকৌশলী মো. আক্তার হোসেন ভূঁইয়া ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। টেন্ডার বাক্স ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছে। রায়পুর থানার ওসি তদন্ত নাছিরুজ্জামান বলেন, রায়পুর উপজেলা পরিষদে টেন্ডার নিয়ে কি সমস্যা হয়েছে এমন একটি খবর শুনেছি। তবে কারা এটার সঙ্গে জড়িত সে ব্যাপারে তদন্ত চলছে। তদন্তের পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এদিকে রায়পুরে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের ২টি প্যাকেজে ৩টি বিদ্যালয়ের প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ টাকার দরপত্রের টেন্ডার বাক্স ছিনতাইয়ের অভিযোগে রায়পুর উপজেলা ও পৌর যুবলীগের কমিটি বাতিল করেছে জেলা যুবলীগ। জেলা যুবলীগের আহ্বায়ক সৈয়দ আহমদ ও সদস্য সচিব সালাউদ্দিন টিপু মঙ্গলবার সন্ধ্যায় স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানান। অপরদিকে ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে রায়পুর উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক কামরুল হাসান রাসেল, যুগ্ম-আহ্বায়ক আরিফ হোসেন ও পৌর যুবলীগের আহ্বায়ক সামছুল ইসলাম বাবুলকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
স্টাফ রিপোর্টার, বরিশাল থেকে জানান, বরিশালে টেন্ডার বাগিয়ে নেয়াকে কেন্দ্র করে যুবলীগ নেতাকে পিটিয়ে জখম করেছে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। গতকাল দুপুর ২টার দিকে নগরীর জর্ডন রোড এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। হামলার শিকার সোহেব আলম সেজান (৩০)-কে উদ্ধার করে বরিশাল শেরেবাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় (শেবাচিম) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।  প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুপুর ২টার দিকে সেজান এবং বিএম কলেজ ছাত্রলীগের মঈন তুষার গ্রুপের মধ্যে টেন্ডার ভাগাভাগি নিয়ে বাগবিতণ্ডার ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে তুষার গ্রুপের নেতাকর্মীরা সেজানের ওপর চড়াও হয়। এতে সেজান গ্রুপ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠলে তাদের ওপর হামলা চালায় তুষার গ্রুপের জুবায়ের আলম, নুর আল সাঈদী, ফয়সাল আহম্মেদ মুন্নাসহ ৭-৮ জন। এ সময় যুবলীগ নেতা সেজানকে পিটিয়ে জখম করা হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বরিশাল ও ঝালকাঠিতে বিদ্যালয় ভবন নির্মাণের জন্য ১১টি গ্রুপের ৬ কোটি ৭১ লাখ টাকার দরপত্র আহ্বান করে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর। এর মধ্যে একটি গ্রুপের ৬১ লাখ টাকার কাজ নাহিদ এন্টারপ্রাইজের নামে বাগিয়ে নেয় তুষার গ্রুপ। এ নিয়ে তুষার এবং সেজান গ্রুপের সঙ্গে দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হয়। হামলার শিকার সেজান জানান, টেন্ডারবাজিতে বাধা দেয়ায় তুষার তার সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে তার ওপর হামলা চালিয়েছে। এ অভিযোগ অস্বীকার করে তুষার গ্রুপের নুর আল সাঈদী বলেন, বেলা ১২টার দিকে বিএম কলেজ ছাত্রলীগের কর্মী সোহেল, রাজু ও রিমন সিএসের জন্য ৯৮ হাজার টাকা জমা দিতে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের কার্যালয়ে যাওয়ার পথে সেজান তাদের বাধা দেয় এবং টাকা ছিনিয়ে নেয়। এসময় তাদের চিৎকারে স্থানীয়রা সেজানকে আটক করে গণধোলাই দিয়েছে।
স্টাফ রিপোর্টার, বগুড়া থেকে জানান, বগুড়ায় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ভেতরে ঠিকাদার আবদুল মজিদ (৩০)কে সন্ত্রাসীরা ছুরিকাঘাতে হত্যা করেছে। তিনি বগুড়া শহরের সুত্রাপুরের মুকুল হোসেনের ছেলে। ঘটনাটি ঘটেছে গত রাত সোয়া ৯ টায়। এলাকাকাসী জানান, একটি টেন্ডারের ঘটনা নিয়ে দিনভর সেখানে উত্তেজনা চলছিল। রাত সোয়া ৯ টায় আবদুল মজিদ জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ভিতরে গেলে তাকে প্রতিপক্ষ উপুর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে। পরে তাকে দ্রুত উদ্ধার করে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন। বগুড়ার সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নাজির উদ্দিন খান মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ভেতরে তাকে ছুরিকাঘাত করলে  হাসপাতালে নিয়ে আসার পর তার মৃত্যু হয়।

ফিরে দেখা ২০১৩- দুর্নীতির ছোবলে বিধ্বস্ত রাষ্ট্রকাঠামো by ইফতেখারুজ্জামান

Thursday, January 2, 2014

সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের মাপকাঠিতে বাংলাদেশের জন্য ২০১৩ সালটি ছিল বিনষ্ট সম্ভাবনার এক হতাশাব্যঞ্জক চিত্র। জনগণ, যারা দুর্নীতিকে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়েছে দেখতে চায়, তাদের জন্য বছরটি ছিল উদ্বেগজনক, আর সরকারের জন্য আত্মঘাতী।
দুর্নীতির অভিযোগকে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে অস্বীকার করার প্রবণতা দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের সম্ভাবনাকে পদদলিত করেছে। দুর্নীতির বোঝা জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। দুর্নীতি মানুষের মৃত্যু ঘটিয়েছে। নীতি ও শাসনকাঠামোতে দুর্নীতি-সহায়ক শক্তির প্রভাব ক্রমাগত বেড়েছে। বছরের শেষে ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধি ও মন্ত্রীদের প্রশ্নবিদ্ধ সম্পদ আহরণের নগ্ন চিত্র প্রকাশিত হয়েছে। ক্ষমতায় থাকার ফলে পর্বতসম মুনাফা এবং সম্পদ আহরণের এই সুযোগ যে বাস্তবে রাজনৈতিক অঙ্গনের ক্ষমতার লড়াইয়ের মূল প্রণোদনা, তা দিবালোকের মতো পরিষ্কার হয়েছে। সর্বোপরি রাষ্ট্রক্ষমতা একধরনের চৌর্যোন্মাদনার করাভূত হতে চলেছে।

নবম সংসদ নির্বাচনে মহাজোট সরকারের বিপুল জনসমর্থন অর্জনে যে কয়েকটি উপাদান শীর্ষ ভূমিকায় ছিল, তার অন্যতম ছিল দুর্নীতি প্রতিরোধের অঙ্গীকার। শুরুটা মন্দ ছিল না। অষ্টম সংসদে যেখানে সংসদীয় কমিটি গঠনে প্রায় দেড় বছর পার করা হয়েছিল, নবম সংসদে সে তুলনায় সংসদের প্রথম অধিবেশনেই সব কটি কমিটি গঠিত হয়। অনেক কমিটি মোটামুটি নিয়মিত সভা করেছে, যদিও স্বার্থের দ্বন্দ্বের কারণে কমিটিগুলো অকার্যকরই রয়ে গেছে। অন্যদিকে বিরোধী দলের সংসদ বর্জন জবাবদিহিমূলক গণতন্ত্রের অন্যতম এই প্রতিষ্ঠানকে প্রায় পঙ্গু করে দিয়েছে। পঞ্চম সংসদে তৎকালীন বিরোধী দল প্রথমবারের মতো এই বর্জনের সংস্কৃতি চালু করে অধিবেশনের প্রায় ৩৫ শতাংশ কার্যকাল অনুপস্থিত থেকেছিল। এর পর থেকে বজর্েনর হার নির্লজ্জভাবে বাড়তে থাকে, যা নবম সংসদের বিরোধী জোটের ক্ষেত্রে প্রায় ৯০ শতাংশে উন্নীত হয়।
সংসদের প্রথম অধিবেশনে তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ পাস হয়। পরবর্তী সময়ে তথ্যপ্রকাশ সুরক্ষা আইন, ২০১১ গৃহীত হয়। একইভাবে ইতিবাচক ছিল সরকারি অর্থে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের জন্য দুর্নীতি প্রতিরোধবিষয়ক প্রশিক্ষণ, সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে নাগরিক সনদ প্রণয়ন, স্থানীয় পর্যায়ে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর তথ্যসেবা কেন্দ্র সম্প্রসারণ, সীমাবদ্ধভাবে হলেও কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে ই-প্রকিউরমেন্ট ইত্যাদি।
জাতিসংঘের দুর্নীতিবিরোধী কনভেনশনের সদস্যরাষ্ট্র হিসেবে প্রদত্ত অঙ্গীকারের পরিপ্রেক্ষিতে অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইনের সংস্কার করা হয়েছে, যার কারণে বাংলাদেশ সম্প্রতি অ্যাগমন্ট গ্রুপের সদস্য হতে পেরেছে। এ ক্ষেত্রে প্রথম সাফল্যের দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে সিঙ্গাপুর থেকে পাচার করা অর্থের ফেরত আসার মাধ্যমে। জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল গৃহীত হয়েছে, যা জবাবদিহিমূলক সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হতে পারে।
তবে এসব ইতিবাচক পদক্ষেপ দুর্নীতি প্রতিরোধে উল্লেখযোগ্য বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারেনি। কারণ, সরকারের পুরো মেয়াদেই জবাবদিহিমূলক গণতান্ত্রিক কাঠামো এবং আইনের শাসনের মৌলিক প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থার ওপর নির্বাহী ও রাজনৈতিক প্রভাব অব্যাহত রয়েছে।
সরকারের মেয়াদের শেষ মুহূর্তে নির্বাচনী অঙ্গীকারকে পদদলিত করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইনে একটি অসাংবিধানিক ও বৈষম্যমূলক ধারা সংযুক্ত করে সরকারি কর্মকর্তা, জজ ও ম্যাজিস্ট্রেটদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের ক্ষেত্রে পদক্ষেপ গ্রহণে দুদকের জন্য সরকারের পূর্বানুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। হয়রানিমূলক বা রাজনৈতিক বিবেচনা ছাড়া এরূপ পূর্বানুমতিপ্রাপ্তি যে অকল্পনীয়, তা জেনেই এটি করা হয়েছে বলে ধারণা করা অযৌক্তিক নয়। দুদককে শক্তিশালী ও কার্যকর করা হবে, এরূপ সুস্পষ্ট নির্বাচনী অঙ্গীকার করে ক্ষমতায় এসে এ ধারাটিসহ একগুচ্ছ সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করে দুদককে মনস্তাত্ত্বিক চাপে রাখা হয়, যার ফলে প্রতিষ্ঠানটিকে অনেকটা সরকারের বি-টিমে পরিণত হতে দেখা যায়। সবশেষে আইনটির ওপর রাষ্ট্রপতির সম্মতি আদায় করে সরকার প্রমাণ করে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে তার নির্বাচনী অঙ্গীকার ফাঁকা বুলি ছাড়া তেমন কিছুই ছিল না।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল প্রকাশিত দুর্নীতির ধারণা সূচকের ০-১০০ স্কেলে ২০১৩ সালে বাংলাদেশ ২৭ পয়েন্ট পেয়েছে, যা বৈশ্বিক গড় ৪৩-এর তুলনায় অনেক কম। তদুপরি বিব্রতকরভাবে বাংলাদেশ এখনো দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। অন্যদিকে দেশের সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে দরিদ্র ও স্বল্প আয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য দুর্নীতির নেতিবাচক প্রভাব বেড়েই চলেছে। ডিসেম্বর ২০১২ সালে প্রকাশিত টিআইবি পরিচালিত মানুষের অভিজ্ঞতাভিত্তিক জাতীয় খানা জরিপ ২০১২-এর তথ্য অনুযায়ী দেশের ৬৩ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ সেবা খাতে দুর্নীতির শিকার হয়েছে। সেবা খাতে সেবাগ্রহীতার কাছ থেকে আদায় করা ঘুষের মোট প্রাক্কলিত অর্থের পরিমাণ জাতীয় আয়ের ২ দশমিক ৪ ও জাতীয় বাজেটের ১৩ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ২০১০ সালে যথাক্রমে ১ দশমিক ৪ ও ৮ দশমিক ৭ শতাংশ ছিল। খানাপ্রতি সার্বিকভাবে মোট বার্ষিক ব্যয়ের ৪ দশমিক ৮ শতাংশ ঘুষ বাবদ ব্যয়িত হয়েছে। উচ্চতর আয়ের খানার ক্ষেত্রে ঘুষ বাবদ ব্যয়ের হার যেখানে ১ দশমিক ৩ শতাংশ, নিম্নতর আয়ের বেলায় সেটি ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ দুর্নীতির বোঝা দরিদ্র জনগোষ্ঠীকেই বেশি বইতে হয়।
স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পুষ্টিসহ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য গৃহীত বিশেষায়িত নিরাপত্তাবেষ্টনী কার্যক্রমেও অনিয়ম প্রকট আকার ধারণ করেছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা প্রকল্পের সর্বনিম্ন থেকে বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ জনপ্রতিনিধিরা অংশীজনের ভূমিকায় থেকে লাভবান হয়েছেন। সরকারি খাতে চাকরিপ্রার্থীসহ সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতায় দলীয় রাজনৈতিক প্রভাব বা অবৈধ অর্থ প্রদানের সামর্থ্যই নিয়োগপ্রাপ্তির উপায়, মেধা বা যোগ্যতা আর তেমন কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়।
অন্যদিকে, ২৪ এপ্রিল ২০১৩ রানা প্লাজা ধসে এক হাজার ১০০ জনের বেশি নিরপরাধ শ্রমিক-কর্মীর নির্মম মৃত্যুর মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে, দুর্নীতির কারণে মানুষকে প্রাণ দিতে হয়। রানা প্লাজা ধসের পেছনে দুর্নীতির প্রভাব ছিল দিবালোকের মতো পরিষ্কার। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাসহ ক্ষমতাবানদের সঙ্গে যোগসাজশের মাধ্যমে বেআইনিভাবে দখল করা জমিতে অবৈধ প্রক্রিয়ায় আইন ও বিধিমালা অমান্য করে নির্মিত ভবনে অবৈধভাবে পরিচালিত পোশাক কারখানায় ঝুঁকি চিহ্নিত হওয়া সত্ত্বেও কাজে উপস্থিত থাকতে বাধ্য করে ত্বরিত মুনাফার লোভে শ্রমিকদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। এই ধ্বংসযজ্ঞের প্রতিটি স্তরে ছিল ক্ষমতার অপব্যবহার।
দুর্নীতির কারণে প্রাণহানির আরও দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে টেন্ডারবাজি, জমি-জলাশয় দখল, বাজার, সেতু ইত্যাদির ইজারাকে কেন্দ্র করে সরকারি দল ও অঙ্গসংগঠনের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং সহিংস কর্মকাণ্ডের পরিণতিতে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী এক বগুড়া জেলাতেই এরূপ সহিংসতায় প্রাণ হারান ৩০ জন।
ব্যাংক, বিমা, গণমাধ্যমসহ ব্যবসা-বাণিজ্যে লাইসেন্স-পারমিট ও সরকারি ক্রয় খাতে রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রাধান্য প্রায় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে। রাজনীতির সঙ্গে ব্যবসার যোগসূত্র উদ্বেগজনকভাবে বাড়ার কারণে ক্ষমতার অপব্যবহার অপ্রতিরোধ্য রয়ে গেছে। সংসদ সদস্যদের মধ্যে যাঁদের মূল পেশা ব্যবসা, তাঁদের অনুপাত স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ের ১৮ শতাংশ থেকে বেড়ে নবম সংসদে ৬০ শতাংশে উন্নীত হওয়া যেমন উদ্বেগজনক, একইভাবে হতাশাব্যঞ্জক ছিল সংবিধান ও সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারের পরিপন্থী অবস্থান নিয়ে জাতীয় বাজেটে কালোটাকা বৈধ করার অব্যাহত সুযোগ।
বছরের শেষে সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপ্রার্থী রাজনীতিবিদদের পর্বতসম সম্পদ আহরণের যে চিত্র প্রকাশিত হয়েছে, তার মাধ্যমে ক্ষমতার অবস্থানকে মুনাফা অর্জনের উপায় হিসেবে ব্যবহারের নির্লজ্জ প্রবণতার প্রতিফলন ঘটেছে। অন্যদিকে বৈধ আয়ের সঙ্গে সম্ভাব্য অসামঞ্জস্যের এ চিত্র প্রকাশের কারণে সংক্ষুব্ধ ক্ষমতাধরদের একাংশ যেমন নির্বাচন কমিশনের কাছে আবদার নিয়ে হাজির হন, তেমনিভাবে নির্বাচন কমিশনও এ তথ্য প্রকাশ বন্ধ করার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার ঘোষণা দেয়, যদিও নাগরিক সমাজের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরে আসতে বাধ্য হয়।
নির্বাচন কমিশনের মতো দুর্নীতি দমন কমিশনও পদক্ষেপ গ্রহণে অপারগতা প্রকাশ করে। সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রীরা ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় সম্পদ আহরণের এ প্রবণতাকে শুধু সমর্থনই করেননি, বরং বিষয়টিকে একটি সমস্যা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার মতো সাহসিকতা দেখাতেও ব্যর্থ হয়েছেন।
দুর্নীতির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ঢালাওভাবে এরূপ অস্বীকৃতির আত্মঘাতী প্রবণতাই বিশ্বব্যাংকের হাতে সুযোগ সৃষ্টি করে দেয় পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগে অর্থায়ন প্রত্যাহার করে একদিকে সরকারকে বিব্রত করতে এবং অন্যদিকে দেশবাসীকে স্বল্পঋণে দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে সর্ববৃহৎ প্রকল্প থেকে বঞ্চিত করতে।
একই অস্বীকৃতির প্রবণতার কারণে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি সোনালী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংকসহ সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংকে অনিয়মের ক্ষেত্রে বা শেয়ারবাজার বিপর্যয়ের জন্য দায়ী প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের ক্ষেত্রে। ডেমু ট্রেন ক্রয়ের ক্ষেত্রে পরিকল্পনা কমিশন চিহ্নিত অনিয়মের ক্ষেত্রেও সরকার কোনো দৃঢ়তা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে, যেমন নির্বিকার থেকেছে প্রতিরক্ষা খাতে বিশাল আকারের ক্রয়ে স্বচ্ছতার চাহিদার ক্ষেত্রে। সবকিছু ছাপিয়ে জনপ্রতিনিধি এবং অন্যভাবে ক্ষমতাবানদের ক্ষমতার অপব্যবহার করে সম্পদ আহরণের যে দৃষ্টান্ত স্থাপনের মাধ্যমে বছরটি শেষ হয়েছে এবং তাকে যেভাবে পরিপোষণের প্রচেষ্টা করা হয়েছে, তার ফলে রাষ্ট্রকাঠামো চৌর্যোন্মাদনার করাভূত হওয়ার সম্ভাবনায় শঙ্কিত হতে হয়।
ক্ষমতার রাজনীতির মূল উপাদান যে দুর্নীতি, তা নিয়েও সন্দেহের অবকাশ নেই। ক্ষমতায় থাকায় লাভবান হওয়ার সুযোগ যেমন পর্বতসম, ক্ষমতায় না থাকলে সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি জেল-জুলুমসহ বহুবিধ হয়রানি এমনকি গুম-হত্যার ঝুঁকিও ক্রমাগত বেড়েছে। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থতা শুধু আর্থসামাজিক উন্নয়নকেই ব্যাহত করছে না, রাজনৈতিক অঙ্গনে সহিংসতা এবং অস্থিতিশীলতার ব্যাপকতর বিস্তার ঘটিয়ে সুশাসন ও জবাবদিহিমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করার ঝুঁকির সৃষ্টি করেছে।

ইফতেখারুজ্জামান: নির্বাহী পরিচালক, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।

ঝুঁকিতে মেঘনা সেতু by আনোয়ার হোসেন

Saturday, September 24, 2011

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ওপর নির্মিত মেঘনা সেতু খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। সেতুর মাঝ বরাবর ছয়টি পিলারের (ভারবাহী স্তম্ভ) আশপাশে ৫২ থেকে ৬৫ ফুট পর্যন্ত জায়গার মাটি সরে গেছে। এ ছাড়া সেতুর অনেকগুলো সম্প্রসারণশীল সংযোগ ও বিয়ারিং অকেজো হয়ে পড়েছে।

যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের নিয়োগ করা বিশেষজ্ঞরা সরেজমিন জরিপ করে এ তথ্য দিয়েছেন। জরিপ করার জন্য গত বছর সওজ জেপিজেড-মালয়েশিয়া-এইচসিইএল নামের একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করে।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, পিলারের কাছের মাটি সরে যাওয়ায় এবং বিয়ারিং-সম্প্রসারণশীল সংযোগ (এক্সপানশন জয়েন্ট) ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে সেতুটির ভারবহন ক্ষমতা কমে গেছে। ফলে যানবাহন চলাচলের সময় পুরো সেতু কেঁপে ওঠে। এ জন্য যেকোনো সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক উপাচার্য এ এম এম সফিউল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, পিলারের কাছের মাটি সরে গেলে সেতুর শক্তি কমে যায়। সে ক্ষেত্রে ভূমিকম্প হলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে। এ ছাড়া অতিরিক্ত পণ্যবাহী যানবাহন চলাচল করলেও সেতুটির স্থায়িত্ব কমে যাবে। এটা মেরামতযোগ্য সমস্যা এবং দ্রুত মেরামত করাই একমাত্র সমাধান।
সরেজমিনে দেখা গেছে, মেঘনা সেতুর সম্প্রসারণশীল সংযোগগুলোর অধিকাংশের ওপরের অংশে নাট-বল্টু খুলে পড়ে গেছে। ওপরে রাবার ও স্টিলের আবরণ উঠে গেছে। ফলে যানবাহন চলাচলের সময় বিকট শব্দ হচ্ছে, সেতু কাঁপছে।
২০০৪ সাল থেকে পিলারের মাটি সরে যাওয়া শুরু হলেও মেরামতের উদ্যোগ নেয়নি কর্তৃপক্ষ। সওজের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (সেতু শাখা) সাইদুল হক প্রথম আলোকে বলেন, দুই-তিন বছর ধরে মাটি সরে যাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। যুক্তরাজ্যের বিশেষজ্ঞরা এটি মেরামতের পদ্ধতি জানিয়ে দিয়ে গেছেন। শিগগিরই মেরামত শুরু হবে। এভাবে মাটি সরে যাওয়া সেতুটির জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, সম্প্রসারণশীল সংযোগের নাট-বল্টু খুলে যাওয়ায় স্টিল ও রাবারের পাতগুলো কয়েক ইঞ্চি ফাঁকা হয়ে গেছে। অনেক স্থানে পাত নেই। যানবাহনের চাকার ঘর্ষণে কিছু কিছু পাত লাফিয়ে কয়েক ইঞ্চি ওপরে ওঠানামা করছে।
এই সেতু দিয়ে ট্রাক চালান আবুল বাশার। তিনি বলেন, সেতুর ওপরে খুব ধীরে ট্রাক চালাতে হয়। বিকট শব্দ হলে ভয় হয়। কখন না ভেঙে পড়ে। ঢাকা-কুমিল্লা পথে চলাচলকারী তিশা পরিবহনের চালক মহিউদ্দিন বলেন, এই সেতুতে দীর্ঘদিন ধরেই নাট-বল্টু খোলা দেখা গেছে।
মেঘনা সেতুর দুই প্রান্তেই সাইনবোর্ড টাঙিয়ে কর্তৃপক্ষ লিখে দিয়েছে, ‘মেরামতকাজ চলছে। যানবাহন চলাচলের সর্বোচ্চ গতিসীমা ২০ কিলোমিটার।’ তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এখন কোনো মেরামতকাজ চলছে না। ঝুঁকিপূর্ণ বলেই গতি কমানোর নির্দেশনা টাঙানো হয়েছে।
১৯৯১ সালে জাপান সরকারের অর্থায়নে সেতুটি নির্মিত হয়। সেতুর আয়ুষ্কাল ধরা হয় ১০০ বছর। কিন্তু ২০ বছর না যেতেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এতে ১২টি পিলার এবং ১৩টি সম্প্রসারণশীল সংযোগ রয়েছে।
যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন গত সোমবার প্রথম আলোকে বলেন, সেতুটি মেরামতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিশেষ বরাদ্দ চাওয়া হয়েছিল। অনুমোদনও পাওয়া গেছে। অর্থ পেলেই মেরামত শুরু হবে।
মূল সমস্যা: সেতুর পিলারের পাশে মাটি সরে যাওয়া শুরু হয় ২০০৪ সাল থেকেই। কিন্তু এ পর্যন্ত তা মেরামত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
জরিপে বলা হয়েছে, ১২টি পিলারের মধ্যে নদীর মাঝখানের তিনটি পিলারের পাশের মাটি সরে গিয়ে ৬৫ ফুট গভীর গর্ত হয়ে পড়েছে। মাঝামাঝি অন্য আরও তিনটি পিলারের পাশে মাটি সরে ৫২ ফুট গর্ত হয়েছে। মেঘনা সেতুর পিলার ১৩৩ থেকে ১৪৬ ফুট পর্যন্ত গভীর। অন্তত তিনটি পিলার যে গভীরে পাইল করা হয়েছে, তার গোড়ার অর্ধেক মাটি সরে গিয়ে গভীর গর্তের সৃষ্টি হয়েছে।
সম্প্রতি সওজের নারায়ণগঞ্জ কার্যালয় থেকে প্রধান দপ্তরে চিঠি পাঠিয়ে মেঘনা সেতুর দুরবস্থার কথা জানানো হয়। মাটি সরে যাওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়, সেতুর নিচ দিয়ে গড়ে তিন হাজার টন পণ্যবাহী নৌযান চলাচল করছে। কিন্তু ৫০০ টন পণ্যবাহী নৌযান চলবে—সে হিসাব করেই নকশা করা হয়েছিল। এ ছাড়া অবাধে বালু উত্তোলন চলছে। ফলে নদীর স্রোত, নৌযানের গতি ও কম্পনের ফলে পিলারের পাশের মাটি সরে যাচ্ছে।
চিঠিতে বলা হয়, সেতুর সম্প্রসারণশীল সংযোগ ও কল-কবজাগুলো দুই থেকে আড়াই ইঞ্চি পর্যন্ত ফাঁকা হয়ে গেছে। অনেক কল-কবজা স্থানচ্যুত হয়ে পড়ায় যান চলার সময় সেতুটি অস্বাভাবিকভাবে নড়ে। এখনই মেরামত করা না হলে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
সওজ সূত্র জানায়, গোমতী সেতুর সম্প্রসারণশীল সংযোগগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মেঘনা সেতুর তিন বছর পর গোমতী সেতু চালু হয়। এই দুটি সেতু খুব কাছাকাছি। দুটি সেতুর জন্য একসঙ্গেই টোল আদায় করা হয়। ২০০৮ সালে মেঘনা ও গোমতী সেতুর সম্প্রসারণশীল সংযোগ মেরামত করা হয় ছয় কোটি টাকা ব্যয়ে। কিন্তু তিন বছরও টেকেনি সেই মেরামত।
সওজ সূত্র জানায়, মেঘনা সেতু এখন মেরামত করতে গেলে ভূমিকম্পের সহনীয় মাত্রাও বাড়াতে হবে। কারণ ১৯৯১ সালে সেতুটি ত ৎকালীন বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) অনুযায়ী ভূমিকম্পের জন্য মান ধরা ছিল দশমিক শূন্য ৫ জি। বর্তমানে বিএনবিসি কোড অনুযায়ী ভূমিকম্পের মান ধরা হয়েছে দশমিক ১৫ জি।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সারসংক্ষেপ: সেতুটি মেরামতে ১৫০ কোটি টাকা বিশেষ বরাদ্দের জন্য সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি সারসংক্ষেপ পাঠানো হয়েছে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে। এতে বলা হয়, ক্ষতিগ্রস্ত সেতুটি পরিপূর্ণ মেরামত করতে হলে সম্ভাব্যতা যাচাই ও নতুন করে নকশা প্রণয়ন করতে হবে। এতে অন্তত দুই বছর সময় লাগবে। কিন্তু মেঘনা সেতুর বর্তমান অবস্থা বিবেচনা করে দুই বছর অপেক্ষা করা বাস্তবসম্মত হবে না।
প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠানো সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, মেঘনা সেতু কোনো কারণে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়লে বন্দরনগর চট্টগ্রামের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হুমকির সম্মুখীন হবে।
ওজন নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র অকেজো: বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে মেঘনা ও গোমতী সেতুর দুই প্রান্তে দুটি ওজন নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। প্রায় ছয় কোটি টাকা ব্যয়ে এই কেন্দ্র স্থাপন করা হলেও কখনোই তা ব্যবহার করা হয়নি। সওজের কর্মকর্তারা বলছেন, অতিরিক্ত মালবাহী যানবাহনও সেতুর জন্য ক্ষতিকর।
মেঘনা-গোমতী সেতুর টোল প্লাজা সূত্রে জানা গেছে, এই সেতু দিয়ে দৈনিক গড়ে ১৬ হাজার যানবাহন চলে। এর মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশই বাণিজ্যিক অর্থা ৎ মালবাহী যান।

পুলিশের ঈদ চাঁদাবাজি by আবু হেনা রাসেল ও এস এম আজাদ

Thursday, August 11, 2011

ঢাকার মিরপুর ১ নম্বরের শপিং কমপ্লেক্সে সামনে ফুটপাতের কাছে গত শনিবার মোটরসাইকেলে করে এসে দাঁড়ালেন শাহ আলী থানার এসআই তরিকুল ইসলাম। ফুটপাতের এক দোকানদারকে লক্ষ্য করে তিনি বললেন, 'তাড়াতাড়ি সরা। দুই দিন তো মালপানি দিস না।' দোকানি বললেন, 'স্যার, যে বৃষ্টি, দোকানই তো সাজাইতে পারি না! আপনাগো কী দিমু?' পরে নিজের দোকান গুটানোর সময় সিদ্দিক মিয়া নামের ওই হকার বললেন, "ভাই, পুলিশকে প্রতিদিন ২৭০ থেকে ৩০০ টাকা করে দিতে হয়। একে বলে 'পুলিশের কাবজাব'। টাকা না দিলে ওরা আমগো ধইরা মাজারের পাশে নিয়া আটকাইয়া রাইখা টাকা আদায় করে।"
নিউমার্কেট এলাকায় ঢাকা কলেজের বিপরীত দিকের গ্লোব শপিং কমপ্লেক্সে সামনে ফুটপাতের গেঞ্জি বিক্রেতা সেলিম বললেন, 'ঈদের সময় বেচাকেনা না অইলেও ট্যাকা বাড়াইয়া দিতে অইতাছে। ওগো ঠিকমতো ট্যাকা না দিলেই বিপদ। কিছুই কওয়ার নাই। কিছু কইলেই রোজার দিনে ইফতারির বদলে লাথি আর লাঠি জুটব কপালে। ঘাড় ধইরা উঠাইয়া দিব।'
সরকারি রাস্তার ওপর ৪০ ইঞ্চি ও ৫২ ইঞ্চি প্রশস্ত দুটি চৌকি-দোকানের জন্য সেলিমকে এখন প্রতিদিন চাঁদা দিতে হয় ৫০০ টাকা করে। পুলিশের হয়ে এই টাকা তুলছে 'লাইনম্যান' রফিক ও আকবর।
রমজানের আগে চাঁদা ছিল ২০০ টাকা, ঈদ উপলক্ষে ৩০০ টাকা বেড়েছে।
গত সোমবার বিভিন্ন সূত্রে এসব তথ্য সংগ্রহের সময় কালের কণ্ঠকে সেলিম বললেন, 'ভাই, আমি সামান্য হকার। উল্টা-পাল্টা কিছু লেইখেন না। আমি কারো বিরুদ্ধে বলতে চাই না।'
সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, পেশাদার চাঁদাবাজদের পাশাপাশি পুলিশের চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন রাজধানীর ফুটপাত ব্যবসায়ীরা। শুধু চাঁদাবাজিই নয়, ঈদকে সামনে রেখে নিউমার্কেটের এসব ফুটপাতও ব্যবসায়ীদের কাছে রীতিমতো বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। হকার-ব্যবসায়ীদের কাছে এটার নাম 'পজিশন বাণিজ্য'। ৪০ ইঞ্চি ফুটপাতের পজিশন শুধু চলতি মাসের জন্য বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকায়। ঈদের কারণে দৈনিক চাঁদার হারও তারা বাড়িয়ে দিয়েছে। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, ফুটপাতে ব্যবসা করতে গেলে স্থানীয় ক্ষমতাসীন দলের নেতা, ছাত্রনেতা, পেশাদার সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজসহ অনেককেই টাকা দিতে হয়। আর পুলিশকে টাকা না দিয়ে দোকান বসানোর তো প্রশ্নই ওঠে না।
নিউমার্কেটের আটটি ফুটপাত-মার্কেটসহ রাজধানীর প্রধান প্রধান ফুটপাত-বাজারগুলো ঘুরে পুলিশের চাঁদাবাজির ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে। জানা গেল, মিরপুর রোডের নেওয়াজ পাম্পের সামনে থেকে নিউমার্কেট ফুট ওভারব্রিজ পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে পুলিশের হয়ে টাকা ওঠায় লাইনম্যান রফিক ও আকবর। রফিক নিজেকে হকার্স লীগের নেতা বলেও পরিচয় দেয়।
বাংলাদেশ জাতীয় হকার্স ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক কামাল সিদ্দিকী কালের কণ্ঠকে বলেন, 'হকাররা এখন চলে গেছে পুলিশের লাইনম্যানের নিয়ন্ত্রণে। এরা মূলত পুলিশের দালাল। ওদের ভয়ে হকাররা প্রতিবাদও করতে পারে না।'
রাজধানীতে সবচেয়ে বেশি হকার বসে নিউমার্কেট ও গুলিস্তান এলাকায়। ছিন্নমূল হকার্স সমিতির তথ্য অনুযায়ী, গুলিস্তান এলাকায় হকারের সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার। নিউমার্কেট এলাকায় প্রায় ৪০ হাজার। এর পরই হকারের সংখ্যাধিক্য সায়েদাবাদ-যাত্রাবাড়ী, তারপর ফার্মগেট-কারওয়ান বাজার এলাকায়।
পুরানা পল্টনের ৬২/২ নম্বর ভবনের সামনের ফুটপাতের টুপি বিক্রেতা আবুল বাশার বললেন, 'এত দিন ৩০ ট্যাকা কইরা দিয়া আসতাছি। হুনলাম আজ থাইক্যা ২০ ট্যাকা বাড়াইয়া ৫০ করছে। অহনো দেই নাই। তয় দিতে অইব।' তিনি আরো জানান, দৈনিক বাংলা মোড় থেকে পল্টন মোড় পর্যন্ত পুরো ফুটপাতে পুলিশের হয়ে চাঁদা আদায় করে লাইনম্যান নূর মিয়া ওরফে কাইল্যা নূর, শাহজালাল, কামরুল ও গোলাপ।
সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, বায়তুল মোকাররমের মোড় থেকে গুলিস্তানের সব ফুটপাতেই দোকানপ্রতি এখন প্রতিদিন ১০০ থেকে ২০০ টাকা করে চাঁদা দিতে হয় পুলিশকে। কিছুদিন আগেও এ হার ছিল ৩০ টাকা। গুলিস্তানের ২২টি ফুটপাতই নিয়ন্ত্রণ করছে আবদুস সালাম নামে পুলিশের এক লাইনম্যান। সালাম নিজেকে যুবলীগ নেতা পরিচয় দিয়ে থাকে। তবে জানা গেছে, গত সরকারের আমলেও সালাম ওই এলাকায় লাইনম্যান হিসেবে কাজ করেছে।
বায়তুল মোকাররমের পশ্চিম পাশ হয়ে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের ফুটপাতে পুলিশের হয়ে চাঁদা তোলে লাইনম্যান কোটন। বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের আশপাশে আকতার হোসেন এবং আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে ফুটপাতে দোকানপ্রতি ১০০ টাকা করে চাঁদা নেয় লাইনম্যান আবুল হোসেন। ভাষানী হকি স্টেডিয়ামের সামনে ও বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামের ২ নম্বর গেটে দীর্ঘদিন ধরেই পুরনো এবং চোরাই ইলেকট্রনিঙ্ পণ্যের ফুটপাত-বাজার চলছে। এই এলাকায় টাকা তুলছে পল্টন থানার লাইনম্যান আলী। সে নিজেকে ৩৬ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের নেতা পরিচয় দেয়। তার সহযোগীরা হচ্ছে জুনিয়র লাইনম্যান সোহেল, পায়েল, আনোয়ার ও কবির। বায়তুল মোকাররম মসজিদের ২ নম্বর গেট এলাকার লাইনম্যানগিরি করে পটল আর মসজিদের সামনে কাদির। রমনা ভবনের পাশে ফুটপাত থেকে দোকানপ্রতি ১০০ টাকা করে চাঁদা তুলছে লাইনম্যান রানা। পাশের রাস্তা দখল করে গড়ে উঠেছে ফল বাজার। দোকানদাররা জানান, থানার জন্য চাঁদার টাকা ওঠায় লাইনম্যানরা। আর প্রতিদিন টহল পুলিশ নিজেরাই এসে নিয়ে যায় দোকানপ্রতি ২০ টাকা করে। পুলিশের ভাষায় এটা চাঁদা না, 'চা খরচা'।
বঙ্গবন্ধু হকার্স মার্কেটের পাশে ফুটপাতের দোকানগুলোতে চাঁদা আদায় করছে লাইনম্যান দুলাল ও মনির, গোলাপশাহ মাজার থেকে ঢাকা ট্রেড সেন্টার পর্যন্ত দেড় শ টাকা করে চাঁদা তুলছে লাইনম্যান বিমল বাবু। জাতীয় গ্রন্থাগারের পাশে বাবুল ও শহীদ, সুন্দরবন স্কয়ার মার্কেটের আশপাশে জজ মিয়া, জিপিওর সামনে কবির, আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের পেছন দিকে সালাম, হিন্দু বাবুল ও বিমল বাবু, গুলিস্তান হল মার্কেটের সামনে স্বেচ্ছাবেক লীগ নেতা পরিচয়ধারী বাবুল এবং জুতাপট্টিতে মঙ্গল নামে আরেক যুবলীগ নেতা পুলিশের হয়ে টাকা তোলে। গুলিস্তান ট্রেড সেন্টারের পাশে আহাদ, পুলিশ বঙ্ জুতাপট্টিতে ওয়ার্ড ছাত্রলীগ সেক্রেটারি রাহাত এবং ট্রেড সেন্টারের পাশ থেকে নিউ রাজধানী পর্যন্ত ৫৬ নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নাছির পুলিশের লাইনম্যান। তাদেরকে চৌকিপ্রতি প্রতিদিন ১০০ ও সপ্তাহে আলাদাভাবে ২০০ টাকা করে দিতে হয় ব্যবসায়ীদের। মহানগর নাট্যমঞ্চের সামনে থেকে গুলিস্তান আন্ডারপাস পর্যন্ত টাকা তোলে লাইনম্যান হারুন, গুলিস্তান গার্ডেনের সামনে আল মুনসুর থেকে হল মার্কেট পর্যন্ত বড় মিয়া এবং উল্টো পাশের ফুটপাত দেখে হাসান ও সুলতান। কাজী বসিরউদ্দিন নাট্যমঞ্চের পেছনে টাকা ওঠায় রিপন।
এদিকে ধানমণ্ডি হকার্স মার্কেটের সামনে থেকে গ্লোব শপিং সেন্টার পর্যন্ত হকার্স লীগ নেতা রফিক, ৫২ নং ওয়ার্ড যুবলীগ নেতা ইসমাইল, হোসেন ও আকবর দোকানপ্রতি ৫০ থেকে ২৫০ টাকা করে চাঁদা তুলছে। প্রিয়াঙ্গন শপিং সেন্টারের সামনে থেকে সানমুন টেইলার্সের কোনা পর্যন্ত ৫২ নং ওয়ার্ড ছাত্রলীগ সভাপতি ফরিদ ও সাধারণ সম্পাদক মিজানের নামে লাইনম্যান বাচ্চু; গাউছিয়া মার্কেট এলাকায় বাংলাদেশ হকার্স সমিতির সভাপতি হোসেন মোল্লা ও ধানমণ্ডি থানা ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি আমির হোসেন এবং নিউমার্কেট ৪ নম্বর গেট থেকে ২ নম্বর গেট পর্যন্ত চাঁদা তোলে নিউমার্কেট থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি সাত্তার মোল্লা। জানা গেছে, নিউমার্কেটের দুটি ফুটপাত ঢাকা সিটি করপোরেশন থেকে ইজারা নেন ৫২ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মুখলেছুর রহমান ও ৫২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর। এ নিয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা মামলাও করেন। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। এ দুটি ফুটপাতে তাঁরা দোকান বরাদ্দ দিয়েছেন ২৮০টি। এখন দুই ফুটপাতে পজিশন বিক্রি করে ও টাকা তোলে লাইনম্যান সাত্তার মোল্লা। রাফিন প্লাজার সামনে স্থানীয় যুবলীগের মাইনুল ইসলাম, আনন্দ বেকারির পাশ থেকে নিউমার্কেট কাঁচাবাজার পর্যন্ত আবদুল জলিল, চন্দ্রিমা সুপার মার্কেটের সামনের ফুটপাতে মনির, ঢাকা কলেজের সামনের ফুটপাতে বিভিন্ন দোকান থেকে ঢাকা কলেজের ছাত্রলীগ নেতা পরিচয়ে চাঁদা আদায় করে কয়েকজন। পুলিশও নিয়মিত ১০ টাকা করে নিয়ে যায়।
যাত্রাবাড়ী এলাকায় শহীদ ফারুক সড়কসহ আশপাশে চাঁদা তুলছে লাইনম্যান মান্নান, মনির, সোনা মিয়া, অনু ও তোরাব আলী। প্রতিদিন লাইম্যানরা এই টাকা বুঝিয়ে দেয় যাত্রাবাড়ী থানার এসআই হোসেনের হাতে।
এ ছাড়া মতিঝিলের জনতা ব্যাংক ভবনসংলগ্ন ফুটপাতে বড় হারুন, লিটন ও চুইলা বাবু, ফার্মগেট এলাকায় চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করে যুবলীগ নেতা শাহআলম ও বিএনপি নেতা দুলাল আর ফুটপাতে টাকা তোলে লাইনম্যান হায়দার, বরিশাইল্লা হারুন, চুন্নু, আলমগীর, ঘড়ি সাইদ, সাইদ, মোবারক, শামসু, তোয়ালে কামাল, তৌহিদ, কাজল ও মোফাজ্জল। কারওয়ান বাজার এফডিসিসংলগ্ন রেলক্রসিং এলাকায় কমিউনিটি পুলিশ নেতা সিরাজ ও জিআরপির কনস্টেবল নুরু টাকা তোলে। পুলিশের হয়ে পুরো কারওয়ান বাজার নিয়ন্ত্রণ করে আনোয়ার হোসেন, এল রহমান এবং সাহেব আলী নামের তিন প্রভাবশালী ব্যক্তি। চেয়ারম্যানবাড়ী থেকে কাকলী ব্রিজ পর্যন্ত আবদুল ও মাসুম, মহাখালী ফ্লাইওভারের নিচে বাদল, খলিল ও আকরাম আর বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় জিআরপির এসআই নজরুল নিজেই হকারদের কাছ থেকে টাকা আদায় করেন।
বাংলাদেশ হকার্স লীগের সভাপতি এম এ কাশেম কালের কণ্ঠকে বলেন, 'এই চাঁদাবাজরা আসলে পুলিশের লাইনম্যান ও দালাল। পুলিশ নিজেরা চাঁদা তুলতে পারে না বলে এদের ব্যবহার করছে। এসব বিষয়ে সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলে জানিয়েও প্রতিকার মিলছে না। কারণ, এই চক্রে সব সময়ই সরকারি দলের নেতারা জড়িত থাকেন।'
ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে গুলিস্তানের সার্জেন্ট আহাদ পুলিশ বক্সের দায়িত্বরত টিএসআই শাহাবুদ্দিন বলেন, 'এখানে ফুটপাতে দোকান বসতে দেওয়া হয় না। চাঁদা কারা নেয় তা ভালো করে খোঁজ নিলেই জানতে পারবেন। বক্স পুলিশ এসবের সঙ্গে জড়িত না।'
চাঁদাবাজির অভিযোগ সম্পর্কে জানতে আবদুস সালামের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তাঁর ভাই পরিচয় দিয়ে এক ব্যক্তি বলেন, 'এই এলাকায় সালাম একা চাঁদা নেয় না। মূলত সে প্রশাসনের দিকটা দেখে।'
পল্টন থানার ওসি শহীদুল হক ফুটপাত থেকে চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে বলেন, 'থানা পুলিশের মাঠপর্যায়ের কেউ কেউ এ কাজ করতে পারে, তবে তিনি বা তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ বিষয়ে জানেন না। আসলে পুলিশ নয়, রাজনৈতিক দলের নেতারাই নিয়ন্ত্রণ করে ফুটপাত। বিভিন্ন সংগঠনের নামে চাঁদা তোলা হয়। ফুটপাত হকারমুক্ত করতে গিয়ে গত বছর পুলিশের ওপর হামলা হয়েছিল। মানবিক কারণে হকারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায় না।'
অথচ মিরপুর এক নম্বরের ফুটপাতের কয়েকজন হকার জানান, এই এলাকায় পুলিশ নিজেরাই সরাসরি মাঠে নেমেছে। শাহআলী থানার সিভিল টিমের এসআই বাবু কৃষ্ণ সাহা ও লতিফ কাঁচাবাজার, মুক্তিযোদ্ধা মার্কেটসহ আশপাশের প্রতিটি দোকান থেকে মাসে চার হাজার টাকা ওঠান। সঙ্গে থাকে সাঈদ নামে তাঁদের লাইনম্যান। কো-অপারেটিভ মার্কেটে তৈরি পোশাক বিক্রেতা শামছু ও মিজান জানান, প্রতিদিন দোকানপ্রতি থানা পুলিশকে দিতে হয় ১৫০ টাকা। কালু মিয়া নামে শাহআলী থানার ওসির এক লাইনম্যান কাঁচাবাজার থেকে প্রতি মাসের জন্য ছয় হাজার করে টাকা তোলে। গাবতলী টার্মিনাল ও দারুস সালামে পেট্রোল ইন্সপেক্টর (পিআই) তৈয়বুর রহমান নিজেই টাকা তোলেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। দিয়াবাড়ী এলাকায় পুলিশের লাইনম্যান কালাম টাকা ওঠায় দারুস সালাম থানার ওসি আবদুল মালেক ও অপারেশন অফিসার আবদুস সালামের নামে। ব্যবসায়ীরা এই অভিযোগ করলেও কালের কণ্ঠের কাছে ওই দুই পুলিশ কর্মকর্তা অভিযোগ অস্বীকার করেন।
মতিঝিলের আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের পাশে হকাররা গড়ে তুলেছে ফুটপাত মার্কেট। স্থানীয় লোকজনের কাছে এটি লেডিস মার্কেট নামে পরিচিত। এখানকার ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, শাহজাহানপুর পুলিশ ফাঁড়ি ও মতিঝিল থানা তাঁদের কাছ থেকে লাইনম্যানদের মাধ্যমে প্রতিদিনই টাকা নেয়। সাইফুল ও ফল বেপারি নামে পরিচিত এক লাইনম্যান এসব চাঁদা তুলে থাকে।
এই অভিযোগের ব্যাপারে মতিঝিল থানার ওসি তোফাজ্জল হোসেন বলেন, 'শুক্রবারে রাস্তায় বসে হকাররা। আর অন্য দিন ফুটপাতে। পুলিশের নামে চাঁদাবাজির অভিযোগ বহু আগে থেকেই শুনে আসছি। এর কোনো ভিত্তি আছে বলে মনে করি না।'

নৈরাজ্যের অচলায়তন by রাশেদ মেহেদী

Monday, June 13, 2011

রাজধানীতে বাস সংকটে পরিবহন মালিকদের, নেতাদের লাভ-ক্ষতি নেই। ক্ষতি হবে সরকারের এবং রাজধানীর এমপিদের। সামনের নির্বাচনে এই বাস সংকটের জন্যই হয়তো তাদের অনেক বড় মূল্য দিতে হবে। গণপরিবহন নিয়ে দুর্ভোগ সরকারের নীরব রক্তক্ষরণ। জরুরি ভিত্তিতে এই রক্তক্ষরণ বন্ধ হতে পারে মধ্যবর্তী দূরত্বের শত শত যাত্রীর জন্য বিআরটিসির সার্কুলার বাস চালু হলে।

রাজধানীর গণপরিবহনে বর্তমানে চলা চরম নৈরাজ্য বন্ধে এই মুহূর্তে এর বিকল্প আছে বলে মনে হয় না ভালো বাস আমদানির কথা উঠলেই এখনকার প্রভাবশালী পরিবহন নেতারা হায় হায় করে ওঠেন। কী বলেন! উন্নত, ভালো বাস নিয়ে আসতে গেলে বাসপ্রতি দেড়-দুই কোটি টাকা দাম পড়বে। সেক্ষেত্রে মতিঝিল-উত্তরার ভাড়া নিতে হবে দেড়শ' টাকা। এটা কি সম্ভব? পরিবহন নেতাদের এই যুক্তি আরও একটি বড় প্রতারণা। কারণ বড় বড় পরিবহন নেতারা ঢাকার রাস্তায় উন্নত বাস সার্ভিস চান না। এ কারণে কম দামের উন্নত বাস সার্ভিস হাতের কাছে থাকলেও তাদের চোখে পড়ে না। গণপরিবহনের জন্য এশিয়ার অধিকাংশ দেশসহ নিউজিল্যান্ড, ইউরোপের ফ্রান্স, চেক, অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও আমদানি করা হয় জাপানের উন্নতমানের রিকন্ডিশন্ড গাড়ি। এই গাড়িগুলো জাপানের রাস্তায় দশ বছর চলার পরও কমপক্ষে ত্রিশ বছর চলার নিশ্চয়তা থাকে। আরামদায়ক, উন্নতমানের এই গাড়িগুলো এখনও সর্বোচ্চ দাম গড়ে ২৫-৩০ লাখ টাকায় পাওয়া সম্ভব। যদি ২৫ লাখ টাকা দিয়ে নিম্নমানের নতুন বাস কিনে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ২৫ টাকা ভাড়া হয়, তাহলে জাপানের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত উন্নতমানের বাস ২৫ লাখ টাকায় আমদানি করলে সেই ২৫ টাকা ভাড়াতেই পোষাবে। চীনের নিম্নমানের নতুন বাসের যেখানে একশ' বছর সুস্থভাবে চলার নিশ্চয়তা নেই, সেখানে জাপানি রিকন্ডিশন্ড শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস ৩০ বছর পর্যন্ত চলার নিশ্চয়তা আছে। তাহলে এসব বাস গণপরিবহনের জন্য আমদানি করতে বাধা কোথায়? এক সময় কিন্তু ঢাকার রাস্তায় রিকন্ডিশন্ড উন্নতমানের গাড়ি চলত। নিরাপদ এবং রোড স্টার সার্ভিসের কথা অনেকেরই মনে আছে। ১৯৯৮ সালে ঢাকায় নেমেছিল প্রিমিয়াম বাস, ২০০০ সালে নিরাপদ এবং ২০০২ সালে রোড স্টার। এর পাশাপাশি বিআরটিসির ভলভো দোতলা বাস। মানুষ এসব বাসে অনেক নিরাপদে এবং স্বাচ্ছন্দ্যে চলতে পারত। এসব উন্নত বাস চলার সময় মূল সমস্যা দেখা দেয় তথাকথিত প্রভাবশালী শ্রমিক নেতাদের। নামে শ্রমিক নেতা হলেও তারা রীতিমতো বড় বড় মালিক। পুরনো গাড়ি দফায় দফায় ৮-১০ লাখ টাকার মধ্যে হাত বদল করে ভালোই চালাচ্ছেন তারা। এই নেতাদের মূল ব্যবসা অবশ্য চাঁদাবাজি। উন্নত বাসের মালিকরা চাঁদা দিতে চান না, আবার উন্নত বাস চলার কারণে লোকাল বাস, সিটিং বাস এবং অন্যান্য কাউন্টার সার্ভিসের বাসে যাত্রী পাওয়ার জন্য প্রতিযোগিতা করতে হয়। ইচ্ছামতো ভাড়া বাড়ানো সহজ হয় না। এই নেতাদের ইশারাতেই বিআরটিএ নিরাপদ পরিবহন ও প্রিমিয়াম সার্ভিসের রুট পারমিট নবায়ন করেনি।
রাজধানীতে ভাড়া নিয়ে নৈরাজ্য শুরু হয় কিন্তু এ বছরের জানুয়ারি মাসে। এ সময় গুলিস্তান-গাজীপুর রুটের মুড়ির টিন বলাকাসহ উত্তরা, মোহাম্মদপুর, মিরপুর রুটের সব ঝরঝরা লোকাল বাস সিটিং সার্ভিস হয়ে যায়। দশ টাকার নিচে ভাড়া নেওয়া হয় না তখন থেকেই। মুড়ির টিনের মতো এসব বাসে ত্রিশ আসনের জায়গায় বিয়ালি্লশ আসন বসিয়ে গরু-ছাগলের মতো যাত্রীদের বসানো হয়। তখন থেকেই রাস্তায় বাস সংকটেরও সৃষ্টি হয়। পত্রপত্রিকায় ছোটখাটো সংবাদ হয়েছে। বিষয়টি খুব বেশি গুরুত্ব দিয়ে কেউ দেখেনি। সমস্যাটা কোথায় হচ্ছে কর্তা-ব্যক্তিরা সেটা কোনোমতেই বুঝতে চাচ্ছেন না। গণহারে ডাইরেক্ট আর সিটিং হওয়ার কারণে বিপাকে পড়ছেন রাজধানীর মধ্যবর্তী অঞ্চলে বাস করা মানুষ। যে যাত্রী ফার্মগেট থেকে শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া কিংবা মোহাম্মদপুর যাবেন কিংবা মহাখালী থেকে এমইএস, বিশ্বরোড, খিলক্ষেত কিংবা উত্তরা যাবেন, তারাই বিপদে পড়ছেন। তাদের জন্য এখন কোনো বাস নেই। মগবাজার থেকে মহাখালী যাওয়ার বাস কিংবা অন্য কোনো যানবাহন নেই। এসব জায়গার যাত্রীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকেন। তারপর অসংখ্য গাড়িতে উঠতে গিয়ে তথাকথিত সিটিং সার্ভিসের কন্ডাক্টর-হেলপারের গলাধাক্কা খান। সরকারের চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করে মন্ত্রীদের গালাগাল করেন। শেষ পর্যন্ত ৭ টাকার ভাড়া ১৫-২০ টাকা দিয়ে যেতে বাধ্য হন। কখনও কখনও মহাখালী থেকে বিশ্বরোড যেতে হচ্ছে ৩০ টাকাতেও। অথচ বাস সেই মুড়ির টিন। এই মধ্যবর্তী যাত্রীদের জন্য বিআরটিসি কি পারে না সার্কুলার বাস চালু করতে? কিছু বাস তো শাহবাগ থেকে ফার্মগেট হয়ে মিরপুর-১০ পর্যন্ত চলতেই পারে। কিংবা কিছু বাস তো মগবাজার থেকে মহাখালী হয়ে উত্তরা পর্যন্ত চলতেই পারে। এসব বাসে ৫ টাকা এবং ১০ টাকার দু'ধরনের টিকিট থাকবে। যেমন শাহবাগ থেকে ফার্মগেট ৫ টাকা, শাহবাগ থেকে মিরপুর-১০ পর্যন্ত ১০ টাকা। মগবাজার থেকে বনানী ৫ টাকা, উত্তরা পর্যন্ত ১০ টাকা_ এই ভাড়াতেই কিন্তু দিব্যি সার্কুলার বাস চলতে পারে অফিস সময় এবং বিকেলে অফিস ছুটির পর। না পোষালে আরও ৫ টাকা ভাড়া বেশি নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু মানুষকে অফিসে যাওয়ার সময় এবং ঘরে ফেরার সময় বাস পাওয়ার নিশ্চয়তা দিতে হবে। অথচ বিআরটিসির বাসও বেসরকারি পরিবহন মালিকদের মতো করেই চালানো হচ্ছে। যাত্রীদের দুর্ভোগ কমাতে যদি বিআরটিসির ভূমিকা না থাকে তাহলে সরকারি মালিকানাধীন এই পরিবহন সার্ভিসের গুরুত্ব কোথায়? ২০০৪ সালে কিন্তু ঢাকার বিআরটিসির বেশ কিছু এ ধরনের সার্কুলার বাস চালু হয়েছিল। দুই-তিন মাস চলার পর সেই বেসরকারি পরিবহন মালিকদের চাপেই এসব বাস বন্ধ করা হয়। কারণ তাদের কম দূরত্বে বেশি ভাড়া নেওয়ার কৌশল মার খায়। রাজধানীতে বাস সংকটে পরিবহন মালিকদের, নেতাদের লাভ-ক্ষতি নেই। ক্ষতি হবে সরকারের এবং রাজধানীর এমপিদের। সামনের নির্বাচনে এই বাস সংকটের জন্যই হয়তো তাদের অনেক বড় মূল্য দিতে হবে। গণপরিবহন নিয়ে দুর্ভোগ সরকারের নীরব রক্তক্ষরণ। জরুরি ভিত্তিতে এই রক্তক্ষরণ বন্ধ হতে পারে মধ্যবর্তী দূরত্বের শত শত যাত্রীর জন্য বিআরটিসির সার্কুলার বাস চালু হলে। রাজধানীর গণপরিবহনে বর্তমানে চলা চরম নৈরাজ্য বন্ধে এই মুহূর্তে এর বিকল্প আছে বলে মনে হয় না।
ঢাকার বাস সার্ভিসকে উন্নত করার জন্য বিআরটিসিকে কাজে লাগাতে পারে সরকার। ঢাকার প্রধান দশ-বারোটি রুটের পুরো দায়িত্ব বিআরটিসিকে দিলে কেমন হয়? এক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের পাশাপাশি পরিবহন নেতাদেরও বিআরটিসির পরিচালনা পর্ষদে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। বিআরটিসি দশ-বারোটি রুটে তিন ধরনের বাস সার্ভিস রাখবে। একটি হবে ডবল ডেকার লোকাল সার্ভিস স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য, একটি হবে মধ্যআয়ের মানুষের জন্য নন-এসি কাউন্টার সার্ভিস এবং আর একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সার্ভিস। নির্দিষ্ট মডেলের বাস নির্দিষ্ট রুটে চলবে। বেসরকারি মালিকরা বিআরটিসি অনুমোদিত মডেলের বাস কিনে বিআরটিসির মাধ্যমে চালাতে পারবেন। বিআরটিসি তাদের লাভ বুঝে দেবে। বেসরকারি কোনো কর্তৃপক্ষের পরিচালনায় কোনো বাস সার্ভিস প্রধান দশ-বারোটি রুটে চলবে না। বিআরটিসির চুরি বন্ধে একটি শক্তিশালী মনিটরিং টিম থাকবে, প্রয়োজনে গোপন টিম রাখা হোক। এর ফলে সরকার অনেক ঝামেলা থেকে বেঁচে যাবে। একই মডেলের বাস একটি কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে চলার কারণে যানজট কমবে। পরিবহনে শ্রমিক সংগঠন, মালিক সংগঠন এবং পুলিশ, বিআরটিএর চাঁদাবাজি বন্ধ হবে। যখন-তখন পরিবহন মালিকরা ভাড়া নৈরাজ্য সৃষ্টি করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে পারবে না। একই কর্তৃপক্ষের বাস হওয়ার কারণে বেপরোয়া বাস চালানো, রাস্তার মাঝখানে যাত্রী ওঠানামা বন্ধ হবে, ফলে দূর্ঘটনাও কমবে। সবচেয়ে বড় কথা, রাজধানীর সাধারণ মানুষ কম খরচে উন্নত বাসসেবা পাবে। সিএনজির দাম বাড়ানোর পর বাস ভাড়া নিয়ে বেসরকারি মালিকরা যে নৈরাজ্য এবং ভাড়ার নামে গণডাকাতির নজির স্থাপন করেছেন, তাতে আজ না হলেও অদূর ভবিষ্যতে প্রধান দশ-বারোটি রুটে সরকারের একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বিকল্প থাকবে না।

শীর্ষ পদে আত্মস্বীকৃত দুর্নীতিবাজেরা!

Monday, February 21, 2011

দুর্নীতি করার কথা স্বীকার করে সত্য ও জবাবদিহিতা কমিশনে (ট্রুথ কমিশন) অর্থদণ্ড দেওয়া কর্মকর্তাদের যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর পদসহ শীর্ষস্থানীয় অন্তত পাঁচটি পদে বসানো হয়েছে। পদ্মা সেতুর মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এক-এগারোর পর ঘুষের টাকা লেনদেনের সময় হাতেনাতে আটক কর্মকর্তাকে।

রেলওয়ের মহাপরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এমন একজনকে, যাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে একটি মামলা চলছে এবং আরও দুটি দুর্নীতির অভিযোগের অনুসন্ধান চলছে।
গুরুত্বপূর্ণ পদে বিতর্কিত এসব কর্মকর্তাকে বসানোর কারণে প্রতিষ্ঠানের অন্য কর্মকর্তারা হতাশ হয়ে পড়েছেন। এ কারণে সেখানে কাজের গতি কমে গেছে বলে মনে করছেন মন্ত্রণালয়েরই অনেক কর্মকর্তা। যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়ার পেছনে এই পরিস্থিতি অন্যতম কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রধান প্রকৌশলী: ট্রুথ কমিশনে স্বেচ্ছায় দুর্নীতির দায় স্বীকার করা মো. শাহাবুদ্দিনকে গত ২৭ জানুয়ারি সওজের প্রধান প্রকৌশলী করা হয়। তাঁকে গত ২৪ জানুয়ারি অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি দিয়ে প্রধান প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের করা তদন্তে শাহাবুদ্দিনসহ ৪১ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঢাকা বাইপাস সড়ক নির্মাণের কাজে দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যায়। তাঁদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ারও সুপারিশ করেছিল তদন্ত কমিটি। কিন্তু এখন তাঁরা শাস্তির বদলে সুবিধাজনক উচ্চ পদে বদলি ও পদোন্নতি নিয়ে পুরো বিভাগে জেঁকে বসেছেন।
এর আগে বিভিন্ন সময়ে শাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে চারটি বিভাগীয় মামলা হলেও কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। শুধু তিরস্কার করে তাঁকে বিভাগীয় মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত বিধিমালা (পিপিআর) অনুসরণ না করা এবং মেঘনা-গোমতী সেতুর টোল প্লাজার অর্থ আত্মসাৎ ও অবৈধভাবে বিদেশ সফরের অভিযোগে বিভাগীয় মামলাগুলো করা হয় তাঁর বিরুদ্ধে।
জানা গেছে, শাহাবুদ্দিন ২০০৯ সালের নভেম্বর মাসে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্বে থাকা অবস্থায় অবসর প্রস্তুতিকালীন ছুটিতে (এলপিআর) যান। সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের চাকরির মেয়াদ দুই বছর বাড়ালে তিনি পুনরায় যোগ দেন ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। তবে তাঁর মুক্তিযোদ্ধার সনদ অবৈধ দাবি করে হাইকোর্টে রিট করেন বাহারউদ্দিন নামের এক মুক্তিযোদ্ধা। ওই মামলা বিচারাধীন থাকা অবস্থায় শাহাবুদ্দিনকে পদোন্নতি দেওয়া হয়।
শাহাবুদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, মামলার বিষয়ে তিনি খবর রাখেন না। সংসদীয় কমিটি তাঁর বিরুদ্ধে ভুল বুঝে কথা বলেছে। ট্রুথ কমিশনে যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সত্যটা আমি জানি। কী বলেছি আর করেছি, আমি ভালো করেই জানি।’
যোগাযোগ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, শাহাবুদ্দিনের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ফিরে আসেন তাঁর ব্যাচমেট মোস্তাক হোসেন, আরিফুর রহমান ও আবদুল অদুদ। এই তিনজনের মধ্যে মোস্তাক হোসেন ও আরিফুর রহমান ট্রুথ কমিশনে দুর্নীতির দায় স্বীকার করেছিলেন। এঁরা এখন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্বে আছেন। এই পদে নিয়মিত হওয়ার জন্য তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা।
ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন প্রকল্পের পরিচালক: আরিফুর রহমানকে সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার প্রকল্প ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন প্রকল্পের পরিচালক করা হয়েছে। দায়িত্ব নিয়ে গত বছরের জানুয়ারি মাসে ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়ার পরও প্রকল্পটির কাজ পুরোদমে শুরু হয়নি। সূত্র জানায়, দরপত্রের শর্তানুযায়ী চার লেন প্রকল্প অনুমোদনের পর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের খানাখন্দ নির্বাচিত ঠিকাদারদেরই করার কথা। কিন্তু এখন বলা হচ্ছে, ঠিকাদারেরা তা করবেন না। এ জন্য মহাসড়কের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মিরসরাই থেকে চট্টগ্রাম গেট পর্যন্ত অন্য প্রকল্পের মাধ্যমে করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এতে সরকারের বাড়তি ব্যয় হবে। সারা দেশে সড়ক মেরামতের জন্য এক হাজার ৪০০ কোটি টাকার একটি বিশেষ প্রকল্প শিগগিরই একনেকে অনুমোদন হবে বলে যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন জানিয়েছেন। এই প্রকল্পে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক মেরামতও রয়েছে।
এ বিষয়ে আরিফুর রহমান বলেন, সে সময় সওজের ঢাকায় কর্মরত সব কর্মকর্তাকে জোর করে ট্রুথ কমিশনে নেওয়া হয়েছে। ঢাকার বাইরে যারা আছেন, সে সময় তাঁরা ঢাকায় থাকলে কেউ বাদ যেতেন না। তিনি দাবি করেন, তাঁর পদোন্নতিতে সওজে কোনো অস্বস্তি নেই।
পরিকল্পনা বিভাগের প্রধান: ট্রুথ কমিশনে দুর্নীতির দায় স্বীকার করা আরেক প্রকৌশলী মোস্তাক হোসেনকে করা হয়েছে সওজের পরিকল্পনা বিভাগের প্রধান। সওজের কোন প্রকল্প নেওয়া হবে, কোনটি অগ্রাধিকার পাবে, কোনটিতে কত অর্থায়ন হবে, তা নির্ধারণ করা পরিকল্পনা বিভাগের কাজ।
মোস্তাক হোসেন দাবি করেন, তাঁদের ট্রুথ কমিশনে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে কিছু লোক খারাপ প্রচার চালাচ্ছে। তাঁরা দায়িত্ব নেওয়ায় সওজের কাজ দ্রুতগতিতে হচ্ছে। অন্য কর্মকর্তাদের মধ্যে কোনো অস্বস্তি নেই।
প্রশাসন ও সংস্থাপন বিভাগের প্রধান: স্বেচ্ছায় দুর্নীতির কথা স্বীকার করা আবদুল আজিম জোয়ার্দারকে বর্তমান সরকার পদোন্নতি দিয়ে সওজের প্রশাসন ও সংস্থাপন বিভাগের প্রধান করেছে। গত বছরের আগস্ট মাসে ঈদুল ফিতরের আগে একসঙ্গে সওজের ৪৪ জনকে বদলি করা হয়। সে সময় ‘বদলি বাণিজ্য’ আলোচনায় আসে। সম্প্রতি সওজের প্রকৌশলীদের সমিতির নির্বাচনে পরাজিত হন জোয়ার্দার। এই পরাজয়ের পেছনে সেই বদলি বাণিজ্যের একটা প্রভাব আছে বলে মন্তব্য করেন কয়েকজন প্রকৌশলী।
এসব বিষয়ে আবদুল আজিম জোয়ার্দারকে বক্তব্য জানার জন্য ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কথা বলতে রাজি হননি। শুধু বললেন, ‘আমি অফিসের কাজে বাইরে আছি।’ তিনি পরে তাঁর কার্যালয়ে গিয়ে দেখা করার পরামর্শ দেন।
আরও যাঁরা বড় দায়িত্ব পেয়েছেন: আরেক কর্মকর্তা সোহরাব উদ্দিন মিয়াকেও অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর পদমর্যাদায় বেশ কয়েকটি সড়ক নির্মাণ ও মেরামতসংক্রান্ত প্রকল্পের পরিচালক করা হয়েছে।
সোহরাব উদ্দিন মিয়া জানান, তিনি অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্বে আছেন। ট্রুথ কমিশনে যাওয়ার বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি।
এভাবে গত দুই বছরে সওজের দুর্নীতিতে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে বসিয়েছে মন্ত্রণালয়।
সেতু বিভাগ: যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের আরেক বিভাগ সেতু বিভাগ। সরকারের সর্বাধিক অগ্রাধিকার ও বড় প্রকল্প পদ্মা সেতু বাস্তবায়নের দায়িত্বে আছে সেতু বিভাগ। এই প্রকল্পের পরিচালক করা হয়েছে সওজের অবসরপ্রাপ্ত প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামকে। তিনি এক দিনের জন্য সওজের প্রধান প্রকৌশলীও হয়েছিলেন। অভিযোগ আছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ধানমন্ডির এক রেস্তোরাঁয় ঠিকাদারদের কাছ থেকে নেওয়া কমিশনের টাকা ভাগাভাগির সময় তাঁকেসহ আরও সাত প্রকৌশলীকে গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা হাতেনাতে ধরে ফেলেন। পদ্মা সেতুর নকশার কাজ চূড়ান্ত না হওয়ার আগেই পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে চুক্তির পুরো প্রায় ১১৬ কোটি টাকা দিয়ে দেওয়ার অভিযোগ আছে তাঁর বিরুদ্ধে।
রেলওয়ের মহাপরিচালক: এই পদে নিয়োগ নিয়েও বিতর্ক আছে। বর্তমান মহাপরিচালক টি এ চৌধুরীর বিরুদ্ধে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি দুর্নীতির অভিযোগ এনেছিল। তাঁকে মহাপরিচালক এবং শাহাবুদ্দিনকে সওজের প্রধান প্রকৌশলী না করার জন্য যোগাযোগমন্ত্রীর কাছে সুপারিশ পাঠিয়েছিল কমিটি। এর পরও টি এ চৌধুরীকে মহাপরিচালক করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে একটি গোয়েন্দা সংস্থা প্রতিবেদন দিয়েছে, তিনি রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক হিসেবে ইঞ্জিন ও কোচের যন্ত্রপাতি কেনার ক্ষেত্রে একই প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে পাঁচ লাখ টাকার মালামাল ৫৩ লাখ টাকায় ক্রয় এবং নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ তদন্ত করছে দুদক। দুদক তাদের অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য গত ১২ জানুয়ারি সংস্থাপন মন্ত্রণলয়ে পাঠিয়েছে বলে জানা গেছে।
টি এ চৌধুরীসহ রেলওয়ের পাঁচ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে রেলওয়ের চট্টগ্রামের সরঞ্জাম শাখার কেনাকাটায় দুর্নীতির তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র দিয়েছিল দুদক। গত বছরের ৩০ মার্চ শাহবাগ থানায় এ বিষয়ে একটি মামলাও করে দুদক।
জানেত চাইলে টি এ চৌধুরী গতকাল প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, ‘এগুলো সব পুরোনো অভিযোগ। আমাকে এসব অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।’
বিআরটিএ: যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের আরেক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) গুরুত্বপূর্ণ পদেও আত্মস্বীকৃত দুর্নীতিবাজেরা আসীন। ২০০৭ সালে মোটরযানের কর ও ফি বাবদ গ্রাহকদের অর্থ আত্মসাতের দায়ে বরখাস্ত হওয়া সহকারী পরিচালক কাজী মাহবুবুর রহমান বর্তমান সরকারের সময়ে দিনাজপুর কার্যালয়ের প্রধান হন। এখন তিনি বিআরটিএর টাঙ্গাইল কার্যালয়ের প্রধান।
২০০৭ সালে বিআরটিএর এক তদন্ত কমিটি কাজী মাহবুবুর রহমানের বিরুদ্ধে এক কোটি ৮৪ লাখ টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পায় এবং সেই টাকা তাঁর কাছ থেকে উদ্ধারেরও সুপারিশ করে। সে সময় দুর্নীতি দমন কমিশনে মামলাও হয় তাঁর বিরুদ্ধে। তিনি ট্রুথ কমিশনে দুর্নীতির কথা স্বীকার করেন।
এ ছাড়া ট্রুথ কমিশনে দুর্নীতির দায় স্বীকার করা সহকারী পরিচালক আমিনুল হক সরকারকে ঢাকার পরই গুরুত্বপূর্ণ নারায়ণগঞ্জ কার্যালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ রকম ৪১ জন কর্মকর্তা ট্রুথ কমিশনে হাজির হয়ে দুর্নীতির কথা স্বীকার করলেও এখন সরকারি চাকরি করছেন। তাঁদের অনেকে পদোন্নতি পেয়েছেন, অনেকে সুবিধাজনক স্থানে বদলিও হয়েছেন।
যোগাযোগ মন্ত্রণালয় তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা বললেও বাস্তব পরিস্থিতি উল্টো।
বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শেষ দিকে ট্রুথ কমিশন গঠন করা হলে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ৪৫২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী স্বেচ্ছায় গিয়ে নিজেদের দুর্নীতির কথা স্বীকার করেন এবং অনেকে অর্থদণ্ড দেন।
যোগাযোগ খাতে অব্যবস্থার মূলে: মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা পদোন্নতি পেয়ে কাউকেই পাত্তা দেন না। তাঁদের কোনো কাজে তাগিদ দেওয়ারও সাহস পান না মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। কারণ তাঁরা প্রকাশ্যে বলে বেড়ান, প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর ও যোগাযোগমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁদের সরাসরি যোগাযোগ। কেউ তাঁদের কিছু করতে পারবে না।
আরেক কর্মকর্তা বলেন, দেশের রাস্তাঘাট উন্নয়ন করবে কে? সওজের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রায় সবাই দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, পদোন্নতির বিষয়টি সুপেরিয়র সিলেকশন বোর্ড (এসএসবি) দেখে। জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতেই পদোন্নতি হয়। দুর্নীতিবাজদের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘নিয়মের বাইরে কাউকে পদোন্নতি দেওয়া হয় না।’
যোগাযোগ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, রেলওয়ের মহাপরিচালক এবং সওজের বর্তমান প্রধান প্রকৌশলীর ব্যাপারে তদন্ত করতে মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করা হয়েছিল। তারা তদন্ত করে প্রতিবেদন দিয়েছে। তবে প্রতিবেদন নিয়ে এখনো আলোচনা হয়নি।
প্রথম আলোয় ২০১০ সালের ৬ মার্চ প্রকাশিত এক কলামে সত্য ও জবাবদিহিতা কমিশনের সদস্য মনজুর রশীদ খান লিখেছিলেন, ‘...আমরা সর্বমোট ৪৫২ জনের শুনানি করেছিলাম। এর বেশির ভাগই এসেছেন সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থা, ডেসা, দুটি গ্যাস কোম্পানি, সাব-রেজিস্ট্রার, ডাক বিভাগ, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও বিআরটিএ থেকে। কয়েকটি সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা স্বীকার করেন, তাঁদের দপ্তরগুলোতে পিসি (পার্সেনটেজ) নামের ছদ্মাবরণে ঘুষ নেওয়ার প্রথাকে কেউ দুর্নীতি মনে করেন না।...অনেক সংস্থায় বিশেষ করে প্রকৌশল সংস্থাগুলোতে পিসি নেওয়াটা একটা সাধারণ ব্যাপার। অর্থাৎ তাঁরা একে দুর্নীতি মনে করেন না। যিনি নেন না, তিনি চাকরির সিঁড়ির ধাপে বেশি দূর এগোতে পারেন না।’
বিলুপ্ত ট্রুথ কমিশনের একটি সূত্র জানিয়েছে, যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের যেসব কর্মকর্তা ট্রুথ কমিশনে গিয়েছিলেন, তাঁদের প্রায় সবাই অর্থদণ্ড দিয়েছেন। এঁদের মধ্যে কয়েকজন কয়েক কোটি টাকা করে জরিমানা দিয়েছেন। নির্দিষ্ট প্রকল্পে বা কাজে দুর্নীতির কারণে তাঁরা এই দণ্ড দিয়েছিলেন বলে সূত্র জানায়।

পিরামিড ভেঙে এখন পেটমোটা প্রশাসন

Monday, January 31, 2011

প্রশাসনের আদর্শ কাঠোমো ধরা হয় পিরামিড আকৃতিকে। এ দেশের প্রশাসনের মূল কাঠামোও এত দিন ছিল পিরামিড। কিন্তু বর্তমান সরকারের আমলে সেটা ভেঙে হয়ে গেছে ‘পেটমোটা প্রশাসন’। আর এ কারণে দেখা দিচ্ছে নানান ‘অসুস্থতা’। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বিকৃত চেহারার প্রশাসন আর চলতে পারছে না।
এর আশু নিরাময় দরকার। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নির্ধারিত পদের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণসংখ্যক কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়ায় ফুলে-ফেঁপে উঠেছে প্রশাসনিক কাঠামোর মাঝের দুই স্তর। আবার অর্ধেকের বেশি পদ খালি থাকায় নিচের দুই স্তর হয়ে গেছে সরু। ফলে মোটা পেট নিয়ে জনপ্রশাসন প্রায় অচল হয়ে পড়ায় একে গতিশীল করতে গত দুই বছরে সরকারের ওপর মহল থেকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে ১১টি বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয়নি। এমনকি, শূন্য পদ না থাকা সত্ত্বেও পদোন্নতি দেওয়ার সময় অডিটর জেনারেল অফিস থেকে আপত্তি তোলা হয়; কিন্তু সেটাও আমলে নেওয়া হয় না।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও সাবেক সংস্থাপনসচিব ড. এ এম এম শওকত আলী এ প্রসঙ্গে বলেন, প্রশাসনের স্বাভাবিক গতি অব্যাহত রাখার জন্য প্রথম কাজই হচ্ছে শূন্য পদের বিপরীতে পদোন্নতি দেওয়া। এর কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু শূন্য পদ না থাকার পরও অতিরিক্ত পদোন্নতির কারণে প্রশাসনের কাঠামো অস্বাভাবিক হয়ে পড়েছে। এতে কাজের স্বাভাবিক গতিও হারিয়ে গেছে। পাশাপাশি পদের চেয়ে কর্মকর্তা বেশি হওয়ায় পদায়নের জন্য তদবিরের মাত্রাও বেড়ে গেছে। পদায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে চলছে অসুস্থ প্রতিযোগিতা। সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট
কম মেধাবীরা তদবিরের মাধ্যমে ভালো পদে নিয়োগ পাচ্ছেন। আর মেধাবীরা অসহায় হয়ে পড়ছেন। ওএসডি হওয়ার আশঙ্কায় তাঁরাও একই পথ ধরেন। সব মিলিয়ে গোটা জনপ্রশাসন মেধাশূন্য হওয়ার উপক্রম হয়েছে। তাই জরুরি ভিত্তিতে প্রশাসন সংস্কারসহ প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ এখনই নেওয়া প্রয়োজন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. আকবর আলি খানও বলেন, প্রশাসনের মূল কাঠামো ভেঙে পড়ায় পদে পদে ফাইল আটকে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। তাই এ প্রশাসনের কাছ থেকে আর ভালো কিছু আশা করা যায় না। নির্ধারিত পদের বাইরে পদোন্নতি দেওয়ায় বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তাকে অহেতুক ওএসডি করে রাখতে হচ্ছে। এঁদের কাছ থেকে সার্ভিস পাওয়া না গেলেও তাঁদের পেছনে ব্যয় হচ্ছে সরকারের বড় অঙ্কের অর্থ। এসব কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা হতাশাগ্রস্ত হয়ে কাজের স্পৃহা হারিয়ে ফেলছেন। এ অবস্থা থেকে উদ্ধারের একমাত্র উপায় হচ্ছে গোটা প্রশাসনকে ঢেলে সাজানো। জরুরি হয়ে পড়েছে জনপ্রশাসন সংস্কার।
তবে সংস্থাপনসচিব ইকবাল মাহমুদের মুখে ভিন্ন সুর। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, প্রশাসন কাঠামোর তেমন কোনো বিকৃতি হয়নি। কাজের স্বাভাবিক গতি অব্যাহত আছে। বরং উপসচিব পর্যায়ের ডেস্ক থেকেই অনেক কাজ শুরু হয়। এতে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এক ধাপ কমে এসে কাজ দ্রুত সম্পন্ন হচ্ছে।’
‘পদ না থাকার পরও বিপুলসংখ্যাক কর্মকর্তাকে উপসচিব ও যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি কেন দেওয়া হয়েছে?’জানতে চাইলে সচিব সরাসরি কোনো জবাব না দিয়ে বলেন, ‘আমরা সুপার নিউমারি (নির্দিষ্ট মেয়াদে অস্থায়ী পদ) পদ সৃষ্টি করছি।’
উল্লেখ্য, যুগ্ম সচিব ও উপসচিবের জন্য নির্ধারিত পদের বাইরে এ মুহূর্তে ৭৮৯ জন অতিরিক্ত কর্মকর্তা থাকলেও সুপার নিউমারি পদ সৃষ্টি করা হয়েছে শুধু উপসচিবের জন্য, মাত্র ২৬০টি।
‘স্বাভাবিক থাকলে কাজের গতি বাড়ানোর কথা উল্লেখ করে কিছু দিন পর পর সরকার বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে নানা ধরনের নির্দেশনা পাঠাচ্ছে কেন?’জানতে চাইলে সংস্থাপনসচিব বলেন, এটি রুটিন ওয়ার্ক।
এক হিসাবে দেখা গেছে, পদের চেয়ে কর্মকর্তার সংখ্যা বেশি হওয়ায় ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, যাঁদের কোনো কাজ নেই) হয়ে আছেন ৪৯৩ জন। এ ছাড়া শূন্য পদের অভাবে পদায়ন না পাওয়া বিভিন্ন স্তরের প্রায় ৯০ জন কর্মকর্তাকে প্রেষণে প্রশাসনের বাইরে সরকারের অন্যান্য দপ্তরে নিয়োগ দিতে হয়েছে এবং তাঁদের মূল বেতনের ২০ শতাংশ প্রেষণ-ভাতা দিতে হচ্ছে। এতে করেও সরকারের মোটা অঙ্কের টাকা গচ্চা যাচ্ছে।
প্রশাসনের স্বাভাবিক গতি ফিরিয়ে আনতে গত দুই বছরে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে যে ১১টি বিশেষ নির্দেশ দেওয়া হয়, সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে২০০৯ সালের ১২ মার্চ খোদ প্রধানমন্ত্রীর উদ্বেগের কথা জানিয়ে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবদের চিঠি দেয় তাঁর কার্যালয়। যাঁদের কারণে প্রশাসন স্থবির হয়ে পড়েছে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয় ওই চিঠিতে। এ ছাড়া সচিবরা রুলস অব বিজনেসের বিভিন্ন ধারা লঙ্ঘন করে প্রশাসনে ফাইলজটের সৃষ্টি করছেন অভিযোগ এনে ওই বছরের ২৬ এপ্রিল অর্থসচিব ও ৭ মে মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবং পরের বছর ২৪ নভেম্বর আবার মন্ত্রিপরিষদ সচিব তিন দফা চিঠি ছাড়েন। ওদিকে তদবিরবাজদের চাপে মন্ত্রণালয়ের স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত হচ্ছে উল্লেখ করে ২০০৯ সালের ৪ মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক চিঠিতে সচিবালয়ের পাস ইস্যুর সংখ্যা সীমিত রাখাসংক্রান্ত সরকারের এক আদেশ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নজরে আনে।
এ ছাড়া ২০০৯ সালের ১ জুলাই সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবের উদ্দেশে একটি চিঠি দেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব মোল্লাহ ওয়াহেদুজ্জামান। এ চিঠিতে মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সর্বশেষ জারি করা প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষমতা অর্পণসংক্রান্ত আদেশের তথ্য, অনিষ্পন্ন পেনশন কেসের সংখ্যা ও নিষ্পত্তি না হওয়ার কারণ, অডিট আপত্তির সংখ্যা ও অর্থের পরিমাণসহ ১১টি বিষয়ে তথ্য দেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেখা গেছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ছাড়া অডিট আপত্তি নিষ্পত্তির ব্যাপারে অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের আগ্রহ সামান্যই। পেনশন নিষ্পত্তিতেও ঢিলেঢালা ভাবটাই চলছে। আর প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষমতা অর্পণের বিষয়টির বাস্তবায়ন নেই বললেই চলে। ফলে উপসচিব, যুগ্ম সচিব বা অতিরিক্ত সচিবের ডেস্ক থেকে যেসব নথি নিষ্পত্তি হওয়ার কথা, সেগুলো কোনো কারণ ছাড়াই সরাসরি সচিব বা মন্ত্রীর দপ্তরে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফলে সচিবালয় নির্দেশিকা অনুযায়ী নথি ছাড়ার সর্বোচ্চ সময়সীমা ৭২ ঘণ্টা কার্যকর হচ্ছে না।
বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ফাইল ছাড় করার ব্যাপারে নানা দিক চিন্তা করেন তাঁরা। নেতিবাচক মন্তব্য দিলে সরকারের নীতি-নির্ধারকদের বিরাগভাজন হয়ে ওএসডি হতে পারেনএমন আশঙ্কায় কোনো স্তরের কর্মকর্তাই ঝুঁকি নিতে চান না। আর পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তারা তো জুনিয়রদের অধীনে চলে যাওয়ায় এখন কাজের স্পৃহাই হারিয়ে ফেলেছেন।
এসব কারণেই মূলত বারবার নির্দেশ হাঁকার পরও তেমন ফল হচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তারা। উল্লেখ্য, বর্তমান সরকার এ পর্যন্ত প্রশাসনের উপসচিব, যুগ্ম সচিব ও অতিরিক্ত সচিব পদে ৯৫০ জনকে পদোন্নতি দিয়েছে। আর প্রয়োজনীয় যোগ্যতা থাকার পরও পদোন্নতিবঞ্চিত হয়েছেন ৬৯৭ জন।
বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের তিনজন সচিব, চারজন অতিরিক্ত সচিব ও তিনজন উপসচিব (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) প্রশাসনিক কাজের দীর্ঘসূত্রতার বিষয়ে একমত পোষণ করে বলেন, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে এডিপি বাস্তবায়নের হার ২৭ শতাংশ। একই সময় গত অর্থবছরে এ হার ছিল ২৯ শতাংশ।
তবে সংস্থাপনসচিব ইকবাল মাহমুদ আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, এ নিয়ে চিন্তার কোনো কারণ নেই। শেষ ছয় মাসে এডিপি বাস্তবায়নের লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছানো সম্ভব হবে।
সংস্থাপন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রশাসন কাঠামোর মাঝের দুই স্তরে যুগ্ম সচিবের জন্য নির্ধারিত ৪৩০টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৫৬৮ জন এবং উপসচিবের ৮৩০ পদের বিপরীতে আছেন এক হাজার ৪৮১ জন। অর্থাৎ এ দুই পদে অতিরিক্ত কর্মকর্তা আছেন ৭৮৯ জন। অন্যদিকে প্রশাসনের নিচের দুই স্তরসহকারী সচিবের জন্য নির্ধারিত পদ দুই হাজার ৯৪টি হলেও এ মুহূর্তে কর্মরত আছেন এক হাজার ৪৫০ জন ও সিনিয়র সহকারী সচিবের এক হাজার ৭৭৪টি পদের বিপরীতে আছেন ৭৭৩ জন। অর্থাৎ নিচের দুই স্তরে কর্মকর্তার ঘাটতি এক হাজার ৬৪৫ জন। পদ না থাকার পরও সিনিয়র সহকারী সচিব থেকে ৫৬৯ জনকে উপসচিব পদে পদোন্নতি দেওয়াতেই মূলত প্রশাসনিক কাঠামোর নিচের দিক সরু ও মাঝের স্তর মোটা হয়ে গেছে। আবার শূন্য পদের বিপরীতে পদোন্নতি না দিয়ে যুগ্ম সচিব পদে ২৪৯ জনকে পদোন্নতি দেওয়ায় মাঝের স্তর আরো মোটা হয়ে গেছে।
প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে কর্মরত ক্যাডার সার্ভিস কর্মকর্তাদের পদোন্নতির সুপারিশ করতে গঠিত সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের অন্যতম সদস্য ও সরকারের কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল আহমেদ আতাউল হাকিম কালের কণ্ঠকে বলেন, নির্ধারিত পদের বাইরে পদোন্নতি দেওয়ায় সরকারের বাজেটবহির্ভূত ব্যয় বেড়ে যায়, আর এটা আইন লঙ্ঘনের শামিল। কারণ একটি অর্থবছরের জন্য জাতীয় বাজেট হচ্ছে একধরনের আইন। যখন পদ না থাকার পরও পদোন্নতি দেওয়া হয়, তখন অডিটর জেনারেল অফিস থেকে আপত্তি দেওয়া হয়। তবে সরকার যদি বিশেষ প্রয়োজনে নির্ধারিত পদের বাইরে পদোন্নতি দেওয়া জরুরি মনে করে, সে ক্ষেত্রে সুপার নিউমারি পদ সৃষ্টি করে পদোন্নতি দিতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

নতুন বিমানবন্দর কেন

Saturday, January 29, 2011

দেশে বর্তমানে তিনটি আন্তর্জাতিক ও পাঁচটি অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর আছে। এসব বিমানবন্দরের কোনোটারই ধারণক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করা হয় না। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের বাইরে এখন কক্সবাজার বিমানবন্দরকেও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রূপান্তর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এর মধ্যে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি দেশের প্রধান বিমানবন্দর। বছরে ৮০ লাখ যাত্রী পরিচালনক্ষমতা রয়েছে এই বিমানবন্দরের। তবে এখন ক্ষমতার অর্ধেকসংখ্যক যাত্রী এ বিমানবন্দর দিয়ে আসা-যাওয়া করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ব্যস্ত সময়ে ঘণ্টায় গড়ে ৬০টির মতো বিমান ওঠানামা করলে সেটি স্বাভাবিক ক্ষমতাসম্পন্ন বলা যায়। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বর্তমানে ব্যস্ত সময়ে প্রতি ঘণ্টায় (পিক আওয়ারে) সর্বোচ্চ ১০টি বিমান ওঠানামা করে। এর মধ্যে বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমানের ওঠানামাও যুক্ত। অর্থাৎ ঢাকায় বর্তমানের পাঁচ গুণ বিমান ওঠানামা এবং যাত্রীর পরিমাণ দ্বিগুণ হলেও এর জন্য হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরই যথেষ্ট। তা ছাড়া আধুনিকায়নের মাধ্যমে এ বিমানবন্দরের ক্ষমতা-দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ তো রয়েছেই।
এ অবস্থায় সরকার আরেকটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। ফলে এ বিমানবন্দর করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে যেমন প্রশ্ন উঠেছে, তেমনি তার জন্য আড়িয়ল বিলের মতো স্থানকে নির্বাচন করা নিয়েও সমালোচনা আছে। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারেও এমন কোনো অগ্রাধিকার প্রকল্পের অঙ্গীকার ছিল না।
অবশ্য বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী জি এম কাদের প্রথম আলোকে বলেন, নতুন বিমানবন্দরটিকে সিঙ্গাপুর বা দুবাইয়ের মতো দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ায় বিমান চলাচলের পথে কেন্দ্রস্থলে (হাব) পরিণত করার চিন্তা আছে। এতে এ খাত থেকে দেশে প্রচুর রাজস্ব আসবে।
সরকারি নথিপত্র অনুযায়ী, প্রস্তাবিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কোনো ধরনের সম্ভাব্যতা যাচাই-সমীক্ষা করা হয়নি। এর সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৫০ হাজার কোটি টাকা। একই সঙ্গে সেখানে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সিটি’ নামের একটি উপশহর গড়ারও সিদ্ধান্ত রয়েছে সরকারের। প্রস্তাবিত এই বিমানবন্দর ও সিটির জন্য আড়িয়ল বিলের ২৫ হাজার একর জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
এই অধিগ্রহণের ফলে ঢাকা ও মুন্সিগঞ্জ জেলার তিন উপজেলায় বিস্তৃত মধ্যাঞ্চলের সবচেয়ে বড় জলাধারটির প্রায় পুরোটা শেষ হয়ে যাবে। এর ফলে পরিবেশ ও প্রতিবেশগত কী ক্ষতি হবে, তা নিয়েও কোনো সমীক্ষা হয়নি।
পরিবেশবিদদের মতে, মিঠাপানি ও জীববৈচিত্র্যের বড় আধার এই বিল ধ্বংস করা হলে পরিবেশগত ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ঢাকার আশপাশে বন্যার প্রকোপও বাড়বে।
জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণ সেলের প্রধান (যুগ্ম সচিব) জয়নাল আবেদীন তালুকদার প্রথম আলোকে বলেন, বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ হবে। প্রথম পর্যায়ে এখন ভূমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে। পরবর্তী পর্যায়ে প্রয়োজনীয় সব সমীক্ষা করা হবে।
নতুন বিমানবন্দরের সিদ্ধান্ত: সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ইচ্ছায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। গত বছরের ২৯ আগস্ট প্রস্তাবিত বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের ব্যাপারে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। ওই বৈঠক শেষে সংবাদ ব্রিফিংয়ে বলা হয়, প্রকল্পটি সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারির (পিপিপি) মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হবে। নতুন বিমানবন্দর নির্মাণের জন্য প্রাক-সম্ভাব্যতা কমিটি সাতটি স্থান সরেজমিনে পরিদর্শন করে তিনটি স্থানের নাম প্রস্তাব করে। এক. ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার ত্রিশাল, আমিরাবাড়ী, মোক্ষপুর ও মঠবাড়ী ইউনিয়ন। দুই. ত্রিশাল উপজেলার রামপাল, কানহর, কাঁঠাল ও বৈলর ইউনিয়ন। তিন. টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর। এই তিনের মধ্যে প্রথম প্রস্তাবের পক্ষে (ময়মনসিংহের ত্রিশাল) গত বছরের ৭ এপ্রিলের বেসরকারি বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সভায় সুপারিশ করা হয়।
এরপর কমিটি ১৫ নভেম্বর আবার বিমানবন্দরের স্থান নির্বাচনের জন্য ফরিদপুরের ভাঙ্গা, মাদারীপুরের শিবচর ও রাজৈর, শরীয়তপুরের জাজিরা এবং মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগরের আড়িয়ল বিল এলাকা পরিদর্শন করে। ৩০ নভেম্বর বিমান মন্ত্রণালয়ের সচিব সাংবাদিকদের জানান, বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের স্থান হিসেবে আড়িয়ল বিলকেই চূড়ান্ত করার সুপারিশ করেছে এ-সংক্রান্ত কমিটি।
গত ১২ ডিসেম্বর আড়িয়ল বিলে বিমানবন্দর এবং পাশেই বঙ্গবন্ধু সিটি নির্মাণের বিষয়ে নীতিগত অনুমোদন দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর আড়িয়ল বিলের ২৫ হাজার একর জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়।
নতুন বিমানবন্দরের পক্ষে যুক্তি: মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণ সেলের প্রধান (যুগ্ম সচিব) জয়নাল আবেদীন তালুকদার গত ৬ ডিসেম্বর স্থান নির্বাচন-সংক্রান্ত প্রতিবেদন পাঠান বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে। প্রতিবেদনে নতুন বিমানবন্দরের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বলা হয়, দেশে এখন ১৭টি বিমান সংস্থা ফ্লাইট পরিচালনা করছে। ঢাকায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান চলাচল বাড়ছে। ভবিষ্যতের চাহিদা মেটাতে এর বর্তমান অবকাঠামো যথেষ্ট নয়। ক্ষমতার ৮০ শতাংশ এখন ব্যবহূত হচ্ছে। এ বিমানবন্দরের একটি রানওয়ে এবং বছরে ৮০ লাখ যাত্রী পরিচালনক্ষমতা রয়েছে। ক্রমবর্ধমান বিমানযাত্রীর তুলনায় তা অপ্রতুল। এই বিমানবন্দরের চারদিকে আবাসিক এলাকা ও সেনানিবাস থাকায় ভবিষ্যতে সম্প্রসারণ করা সম্ভব নয়। এর যাত্রী টার্মিনাল ভবন অপ্রশস্ত এবং পাঁচ স্তরের আধুনিক নিরাপত্তাব্যবস্থার ধারণা বাস্তবায়নের যথেষ্ট সুযোগ নেই। এ ছাড়া বর্তমান বিমানবন্দরে সর্বশেষ প্রযুক্তির সুপরিসর উড়োজাহাজ এয়ারবাস এ-৩৮০ পরিচালনের ক্ষমতা নেই। এ অবস্থায় আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন নতুন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণ এবং এর সঙ্গে রাজধানীর সংযোগ সড়ক এক্সপ্রেসওয়ে জরুরি।
পাল্টা যুক্তি: সরকারের এসব যুক্তি সম্পর্কে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ বিমানের সাবেক এক শীর্ষ কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, এয়ারবাস কোম্পানির সর্বশেষ সংযোজন এ-৩৮০ উড়োজাহাজ এখন পর্যন্ত খুব কম এয়ারলাইনসই ব্যবহার করছে। ঢাকা থেকে যেসব গন্তব্যে সরাসরি ফ্লাইট আছে, তাতে উড্ডয়ন ঘণ্টা ও যাত্রীর চাপ বিবেচনায় এখানে এ-৩৮০ উড়োজাহাজ দিয়ে ফ্লাইট পরিচালনার সম্ভাবনা নেই। কারণ উড্ডয়ন ঘণ্টা বিবেচনা রেখে এয়ারলাইনসগুলো ফ্লাইট পরিকল্পনা করে। কম দূরত্বে সুপরিসর উড়োজাহাজ দিয়ে ফ্লাইট পরিচালনা করলে লাভ হয় না।
আধুনিক নিরাপত্তাব্যবস্থার ধারণা বাস্তবায়নের জন্য জরুরি প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ ও দক্ষ জনবল। এখানে বিশাল জায়গা বা অবকাঠামো মুখ্য নয়। ভবিষ্যতের প্রয়োজন মেটাতে টার্মিনাল ভবন আরও প্রশস্ত করা দরকার। সে জন্য বর্তমান বিমানবন্দরে পর্যাপ্ত জমি আছে বলে সিভিল এভিয়েশন-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়। এর পরও যদি স্থানসংকুলান না হয়, তাহলে বিমানবন্দরসংলগ্ন ১৩০ একর জমি কেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দেওয়া হলো, সে প্রশ্ন উঠছে। বিগত আওয়ামী লীগের আমলে এটা ইজারা দেওয়া হয়। পরে তা বাতিলও করা হয়। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার আবার তা ইজারা দেয় কান্ট্রি ক্লাব, গলফ ক্লাব, পাঁচ তারকা, তিন তারকা হোটেল ইত্যাদি করার নামে। কিন্তু গত ১০ বছরে কিছুই করা হয়নি। বর্তমান সরকারের সময় বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটি ওই জমির ইজারা চুক্তি বাতিল করার প্রস্তাব করে। বিমানমন্ত্রী জি এম কাদের ওই সব জমি ফেরত নেওয়ার উদ্যোগ নেন। কিন্তু পরে সংসদীয় কমিটি ইজারাদারের সঙ্গে সমঝোতার প্রস্তাব দেয়। তখন বিমানমন্ত্রী প্রথম আলোকে বলেছিলেন, সরকারি জমি ফেরত নিতে মন্ত্রণালয় আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছে। ভবিষ্যতে বিমানবন্দর সম্প্রসারণে এই জমি দরকার হবে। কিন্তু এখন নতুন বিমানবন্দরের জন্য আড়িয়ল বিলের জমি অধিগ্রহণ করতে যাচ্ছে সরকার।
আরেকজন বিশেষজ্ঞ বলেন, নতুন বিমানবন্দরকে এ অঞ্চলের বিমান চলাচলের কেন্দ্র করার কথা বলছে সরকার। কিন্তু কোন নিশ্চয়তা বা সমীক্ষার ভিত্তিতে এ সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে? দুবাই ও সিঙ্গাপুর হাব হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা দেশ দুটির বিমান সংস্থা এমিরেটস ও সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসের। এ দুটি এয়ারলাইনস এখন বিশ্বের শীর্ষপর্যায়ের বিমান সংস্থা এবং পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি দেশে ও গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনা করে। তারা প্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্যে বিমান চলাচলে নিজ দেশের বিমানবন্দরকে মূল কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করছে। দুবাই ও সিঙ্গাপুর এমনিতে বড় ব্যবসায়িক কেন্দ্র। তাদের রয়েছে আনুষঙ্গিক এমন সব সুবিধা, যা তাদের নগর পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত। ঢাকাকে দুবাই বা সিঙ্গাপুরের মতো বিমান চলাচলের আঞ্চলিক কেন্দ্র করতে হলে তার জন্য পুরো রাজধানীকে ওই রকম পরিকল্পিত নগর হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। ঢাকাকে ঘিরে সরকারের এখন পর্যন্ত তেমন চিন্তা-পরিকল্পনার কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি।
বিমান চলাচল বৃদ্ধির চিত্র: জানা গেছে, কুর্মিটোলায় বর্তমান বিমানবন্দরটির জমির পরিমাণ দুই হাজার একর এবং রানওয়ের দৈর্ঘ্য ১০ হাজার ৫০০ ফুট। রয়েছে পরিমিত প্রয়োজনীয় সুবিধাদি। সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের করা এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ঢাকার সঙ্গে আন্তর্জাতিক গন্তব্যে বিমান চলাচল বৃদ্ধির যে প্রবণতা, তাতে ২০২৫ সালে এখানে মোট ৫৭ হাজার ফ্লাইট পরিচালিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ২৫ হাজার। ২০১৫ সালে এটা ৩২ হাজার এবং ২০২০ সালে ৪২ হাজার হতে পারে। সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০১৫ সালে ব্যস্ত সময়ে ঘণ্টায় ঢাকায় বিমান ওঠানামা করবে ১৪টি। ২০২০ সালে তা ২০ ও ২০২৫ সালে ২৯টিতে উন্নীত হতে পারে।
এই সমীক্ষা অনুযায়ী আগামী ২০ বছরে যাত্রীসংখ্যা তিন গুণ হতে পারে। বর্তমান সুবিধাদি ও রানওয়ে দিয়ে ২০৩০ সাল পর্যন্ত চলবে। তবে কিছু আধুনিকায়ন ও দক্ষতা বৃদ্ধির দরকার হবে এবং তা বর্তমান বিমানবন্দরেই করা সম্ভব।
বিমানসচিবের যুক্তি: আরেকটি বিমানবন্দর নির্মাণ কেন দরকার, এ প্রশ্নের জবাবে বিমান মন্ত্রণালয়ের সচিব শফিক আলম মেহেদী প্রথম আলোকে বলেন, ‘শাহজালালে একটিমাত্র রানওয়ে, যদি কোনো কারণে কোনো প্লেন দুর্ঘটনায় পড়ে রানওয়েতে বসে পড়ে, সেটা সরানো না যায়, তখন তো পুরো বিমানবন্দর অচল হয়ে পড়বে। আর এখানে আগামী ১০ বছরে বিমান চলাচল ও কার্গো বহন দ্বিগুণ হয়ে পড়বে। তা ছাড়া আধুনিক নিরাপত্তাব্যবস্থাসহ অনেক সুযোগ-সুবিধা এখানে নেই।
তুলনামূলক পর্যালোচনা: দেশে-বিদেশে বিমান পরিবহন-বাণিজ্যে জড়িত একজন পরামর্শক একটি রানওয়ের কারণে নতুন বিমানবন্দর করার যৌক্তিকতার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন। তিনি জানান, যুক্তরাজ্যের গেটউইক বিমানবন্দরে একটি রানওয়ে ছিল। সম্প্রতি তারা দুটি করেছে। কিন্তু একটি রানওয়ে থাকা অবস্থায় সেখানে বছরে সাড়ে তিন কোটি যাত্রী পরিচালন করা হতো। আর ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দরের এখন পরিচালনক্ষমতা ৮০ লাখ, গত বছর প্রায় ৪০ লাখ যাত্রী এখানে আসা-যাওয়া করেছে। তাঁর মতে, এখানে ক্রমবর্ধমান যাত্রীর চাহিদা মেটাতে আরেকটি বিমানবন্দর বা রানওয়ে নির্মাণ সমাধান নয়। এখানে জরুরি এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল এবং এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট উন্নত করা দরকার। পাশাপাশি পরিকল্পিতভাবে টারমাক ও টার্মিনাল ভবন সম্প্রসারণ করতে হবে। এ জন্য পর্যাপ্ত জমি শাহজালালেই আছে।
সিভিল এভিয়েশনের একজন কর্মকর্তা জানান, শাহজালালে বর্তমান রানওয়ের ব্যবহারযোগ্য ক্ষমতার ৪০ শতাংশ ব্যবহূত হয়। জাপানের নারিতা বিমানবন্দরও একটি রানওয়ে দিয়ে চলছে। সেখানে ঢাকার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি বিমান ওঠানামা করে।
বিকল্প হিসেবে আরেকজন বিশেষজ্ঞ বলেন, তেজগাঁও পুরাতন বিমানবন্দরকে পুনরুদ্ধার করে অভ্যন্তরীণ গন্তব্যে এবং শাহজালাল বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক গন্তব্যে ওড়ানোর জন্য নির্দিষ্ট করে দেওয়া যেতে পারে।
সাবেক বিমান প্রতিমন্ত্রী আবদুল মান্নানের মতে, ‘প্রয়োজন হলে শাহজালাল বিমানবন্দরের ট্যাক্সিওয়েকে দ্বিতীয় রানওয়েতে পরিবর্তন করার (পরীক্ষা সাপেক্ষে) সুযোগ আছে। এ ছাড়া রানওয়ের পশ্চিম দিকে কিছু কিছু স্থাপনার যুক্তিসংগত পুনঃস্থাপনের মাধ্যমে দ্বিতীয় রানওয়েও নির্মাণ করা যেতে পারে।’ তিনি বলেন, বর্তমান রানওয়ের লাইটিং সিস্টেম, অ্যান্টিফগ লাইটিং সিস্টেম স্থাপন, এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের আধুনিকায়ন, হাইটেক যন্ত্রপাতি স্থাপন ও কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা নিলে ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।
আড়িয়ল বিলে কারিগরি ঝুঁকি: সিভিল এভিয়েশনের সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, বিমান উড্ডয়ন ও অবতরণ বাতাসের বিপরীতে করতে হয়। বাংলাদেশে বছরের ৭০ শতাংশ সময়কালে বায়ুপ্রবাহ দক্ষিণ থেকে উত্তরে বয়ে যায়। বাকি ৩০ শতাংশ সময়কালে উত্তর থেকে দক্ষিণে বয়ে থাকে। ফলে প্রায় ৭০ শতাংশ উড্ডয়ন ও অবতরণ হয় উত্তর-দক্ষিণ দিকনির্দেশনায়। বাকি সময় ৩০ শতাংশ দক্ষিণ-উত্তর দিকনির্দেশনায়। হজরত শাহজালাল বিমানবন্দরের রানওয়েও উত্তর-দক্ষিণমুখী।
কিন্তু আড়িয়ল বিলটি পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত। পশ্চিমে শেষ প্রান্তে পৌঁছে পশ্চিম-উত্তরে বেঁকে গেছে। তাই প্রস্তাবিত বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে পূর্ব-পশ্চিম হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। যদি তা হয়, তাহলে সারা বছর আড়াআড়ি বাতাসের (ক্রস-উইন্ডের) মধ্যে উড্ডয়ন ও অবতরণ করতে হবে। এটা এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলে জটিলতা বাড়াবে, খরচও বাড়বে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান শামসুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, আড়িয়ল বিলের মাটি মূলত পিটজাতীয় জৈব মাটি (গাছপালা পচে তৈরি হওয়া নরম মাটি)।
পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থার সাবেক মহাপরিচালক ম ইনামুল হক বলেন, বিলে বিমানবন্দর ও বঙ্গবন্ধু সিটি করতে পুরো এলাকা ২০-৩০ ফুট বালু দিয়ে ভরাট করতে হবে। কিন্তু এখানে গভীর জৈব মাটির (পিট সয়েল) স্তর থাকায় বিমানবন্দরসহ নির্মিত স্থাপনা দেবে যাওয়ার সার্বক্ষণিক ঝুঁকিতে থাকবে। ৪০০ থেকে ৮০০ মেট্রিক টন ওজনের বিমান ওঠানামার জন্য জৈব মাটি বড় কারিগরি ঝুঁকি হিসেবে দেখা দেবে।

ভর্তুকির সার যাচ্ছে রঙে by শফিকুল ইসলাম জুয়েল

মুড়ি তৈরিতে ইউরিয়া সার ব্যবহারের খবরটি পুরনো। এবার জানা গেল কাপড় ও সুতার রং টেকসই করার জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এখন এই সার ব্যবহার করছে। নাইট্রোজেন কাপড় ও সুতার রং পাকা করে। এই নাইট্রোজেনের প্রয়োজন মেটাতেই ব্যবহার করা হচ্ছে কৃষকের ইউরিয়া সার।

ফলে কৃষি খাতের জন্য বরাদ্দ হওয়া ভর্তুকি মূল্যের অন্তত তিন লাখ টন ইউরিয়া চলে যাচ্ছে শিল্পসহ অকৃষি খাতে। এতে সরকার বছরে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা গচ্চা দিচ্ছে। কৃষি ও শিল্প মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল ডাইং অ্যান্ড প্রিন্টিং ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তারা জানান, দেশের প্রায় সাড়ে সাত হাজার গার্মেন্ট (প্যান্ট, শার্ট, সোয়েটার) ও নিট শিল্পের (গেঞ্জি-জাতীয় কাপড়) চাহিদা মেটাতে তিন শতাধিক টেক্সটাইল ডাইং ও প্রিন্টিং কারখানা সুতা ও কাপড় প্রস্তুত করে। এসব কারখানায় নাইট্রোজেনের বিকল্প হিসেবে ব্যবহƒত হচ্ছে ইউরিয়া সার। কর্মকর্তাদের হিসাবে ডাইং ও প্রিন্টিং শিল্পের চাহিদা মেটাতে বছরে অন্তত তিন লাখ টন ইউরিয়া ব্যবহার করা হয়। তুলনামূলক বেশি কাপড় প্রস্তুতকারক একেকটি ডাইং ও প্রিন্টিং কারখানা মাসে এক টনেরও বেশি ইউরিয়া ব্যবহার করে থাকে।
সাভারে অবস্থিত মোশারফ ডাইং কারখানা ও রুবেল প্রিন্টিং কারখানার দুজন কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, কাপড়ের রং পাকা করতে তাঁরা ইউরিয়া সার ব্যবহার করে থাকেন। তাঁরা রঙের সঙ্গে মেশাতে ইউরিয়া সার প্রথমে পানিতে ভিজিয়ে গুলে নেন। এরপর রঙের সঙ্গে মেশানোর পর মেশিনের সাহায্যে কাপড়ে লাগানো হয়। কর্মচারীরা জানান, প্রতি কেজি রঙে অন্তত ১০০ গ্রাম ইউরিয়া মেশাতে হয়। সার কিভাবে সংগ্রহ করা হয় জানতে চাইলে একটি কারখানার কর্মচারী কোনো মন্তব্য করেননি। অন্য কারখানার কর্মচারীটি বলেন, ‘বাজার থেকেই সার কেনা হয়, এখনো তিন বস্তা সার মজুদ আছে স্টোর রুমে।’ পরে স্টোরকিপার ও মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও সম্ভব হয়নি।
গতকাল টেলিফোনে যোগাযোগ করা হলে মোশারফ ডাইং কারখানার মালিক মোশারফ হোসেন খন্দকার ভর্তুকির সার তাঁর কারখানায় ব্যবহারের কথা স্বীকার করেন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কাপড়ের রং পাকা করতে আমরা অল্প পরিমাণ ইউরিয়া সার ব্যবহার করি। কিছু টাকা বেশি দিয়ে বাজার থেকেই সার কিনে আনি।’ তিনি দাবি করেন, ‘শুধু আমরাই নই; দেশের প্রায় সব ডাইং কারখানায় আমাদের চেয়েও বেশি সার ব্যবহার করে।’
কৃষকের সার কিনে এনে কাপড় রং করার কথা স্বীকার করেছেন রুবেল প্রিন্টিং কারখানার স্বত্বাধিকারী আবদুস সালামও। গতকাল টেলিফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘বেশি সার ব্যবহারকারী বড় কারখানার মালিকরাই আমদানি করে না। সেখানে আমি তো ছোট ব্যবসায়ী; তাই আমদানির চিন্তা করি না।’ তিনি দাবি করেন, ‘বস্তাপ্রতি ৫০ থেকে ১৫০ টাকা বেশি দিলেই সার পাওয়া যায়।’
ভর্তুকি মূল্যের ইউরিয়া সার শুধু কৃষি ফসল ও কৃষকের জন্য বরাদ্দ। এর পরও শিল্পমালিকরা সংশ্লিষ্ট জেলা-উপজেলার কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আঁতাত করে ও উৎকোচের বিনিময়ে সংগ্রহ করে অকৃষি খাতে ব্যবহার করেন বলে জানা যায়। অথচ নির্দেশনা রয়েছে, শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে ইউরিয়া সার ব্যবহার করতে হলে শিল্প মন্ত্রণালয়ের লিখিত অনুমোদন সাপেক্ষে যে কেউ আমদানি করতে পারবে। ভর্তুকির সার ব্যবহার করা যাবে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংশ্লিষ্ট এক উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জানান, শিল্প খাতে সার দেওয়ার জন্য মন্ত্রী-এমপিসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সুপারিশ করেন। ফলে চাপে পড়ে এবং তাঁদের মন রক্ষায় সার দিতেই হয়। উৎকোচের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি নেই না।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, মাত্র কিছুদিন আগে স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধি সাভারের এক উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে ভর্তুকির সার এক কাপড় রং কারখানার মালিকের কাছে বিক্রির জন্য চাপ দেন। কর্মকর্তা দিতে অস্বীকার করেন এবং এর কিছুদিন পরই তাঁকে বদলি করে দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) ম্যানেজার (মার্কেটিং) মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কৃষির নামে বরাদ্দ হওয়া ভর্তুকির সার শিল্পসহ নানা খাতে যায়, এমন খবর আমরাও জানি। তবে আমাদের কিছুই করার নেই। কারণ, সার ডিলারদের নামে বরাদ্দ দেওয়ার পর আমাদের আর দায়িত্ব থাকে না। সেটা মনিটর করার কথা জেলা সার কমিটির।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে, দেশের কৃষি ফসলের জন্য ৬৪ জেলায় ২০১০-১১ অর্থবছরে সরকারের ইউরিয়া বরাদ্দ ২৮ লাখ ৩১ হাজার টন। এর মধ্যে বরাদ্দ রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক ৫০ হাজার টন ও আপৎকালীন ৫০ হাজার টন। এ ছাড়া মৎস্য খাতে বরাদ্দ রয়েছে ৩০ হাজার টন ও প্রাণিসম্পদ খাতে এক হাজার টন। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে, ডাইং-প্রিন্টিং শিল্পসহ তামাক, ইটখোলা, গো-খাদ্য, মুড়িসহ বিভিন্ন খাতে ব্যবহার করা হচ্ছে ইউরিয়া সার। যার চাহিদাও পূরণ হয় ভর্তুকি মূল্যের সার দিয়েই। এ ছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক বরাদ্দ ৫০ হাজার টন থাকলেও ব্যবহার করা হয় (চা বাগান, চিনি করপোরেশন, রাবার বাগানসহ সংশ্লিষ্ট খাতে) এক থেকে দেড় লাখ টন ইউরিয়া সার।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, দেশের অধিকাংশ শিল্প প্রতিষ্ঠানে নাইট্রোজেনের চাহিদা মেটাতে ইউরিয়া ব্যবহার করা হয় এবং তা নেওয়া হয় ভর্তুকির সার থেকেই। প্রতিষ্ঠানগুলো ইউরিয়া আমদানি করে না। তবে গত ছয় মাসে চারটি কম্পানি সার আমদানির অনুমতি নিয়েছে। এর মধ্যে গত আগস্ট মাসে বিআরবি কেব্ল্ ইন্ডাস্ট্রিজ আমদানি করেছে তিন হাজার টন ইউরিয়া সার।
কৃষি মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয় ও বিসিআইসির কর্মকর্তারা জানান, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে দেশের কারখানাগুলোতে ইউরিয়া উৎপাদন কমে গেছে। ফলে চলতি অর্থবছরে প্রায় ২০ লাখ টন ইউরিয়া আমদানি করতে হচ্ছে। বর্তমান বিশ্ববাজারের মূল্য অনুযায়ী (প্রতি টন ৩৮০ ডলার) ইউরিয়া আমদানি ও ডিলার পর্যায়ে বিক্রির পর প্রতি টনে সরকারের ভর্তুকি যাচ্ছে প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার টাকা। এ হিসাবে শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে যাওয়া তিন লাখ টনে প্রায় ৪৯৫ কোটি টাকা গচ্চা যাচ্ছে সরকারের।
কৃষিসচিব সি কিউ কে মুসতাক আহমদ কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক কোটার বাইরে অতিরিক্ত সারের প্রয়োজন হলে শিল্পমালিকরা স্বাধীনভাবে আমদানি করতে পারবেন। তবে কৃষকের ভর্তুকির সার কোনোভাবেই শিল্পে ব্যবহার করতে পারবেন না। কৃষি ফসলের চাহিদা অনুযায়ী সার আমদানি ও বরাদ্দ হয়। কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রসঙ্গে বলেন, সার বিতরণ ব্যবস্থাপনায় কঠোর মনিটরিং রয়েছে। এর পরও কেউ অনিয়ম করলে এবং সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান উপদেষ্টা কফিল উদ্দিন আহমেদ বলেন, অনেক সময় বরাদ্দ না থাকলেও শিল্পমালিকদের অব্যাহত চাহিদা ও তদবিরের মুখে বিপাকে পড়েন সার ডিলাররা। তবে রপ্তানিমুখী খাত শিল্পের চাহিদা বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

কোকোর দুর্নীতি জাতিসংঘ ও বিশ্বব্যাংকের হ্যান্ডবুকে

Sunday, January 23, 2011

জাতিসংঘ ও বিশ্বব্যাংকের একটি যৌথ প্রকাশনায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর কয়েক লাখ ডলার আত্মসাতের প্রসঙ্গ স্থান পেয়েছে।

জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তর (ইউএনওডিসি) এবং বিশ্বব্যাংকের সমন্বিত উদ্যোগ-স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি ইনিশিয়েটিভের প্রস্তুত করা একটি পুস্তিকায় সিমেন্স কম্পানির কাছ থেকে কোকোর ঘুষ গ্রহণের অভিযোগকে 'জাতীয় মুদ্রা সরানোর' উদাহরণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
'অ্যাসেট রিকভারি হ্যান্ডবুক_এ গাইড ফর প্র্যাকটিশনার্স' নামের পুস্তিকাটি গত ১৬ ডিসেম্বর ভিয়েনায় প্রকাশ করা হয়। ২৭০ পৃষ্ঠার পুস্তিকায় বলা হয়েছে_ঘুষ, অর্থ আত্মসাৎসহ বিভিন্ন দুর্নীতির কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলো প্রতিবছর দুই হাজার থেকে চার হাজার কোটি ডলারের ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। এর মধ্যে গত ১৫ বছরে মাত্র ৫০০ কোটি ডলার উদ্ধার করে ক্ষতিগ্রস্ত দেশে ফিরিয়ে দেওয়া গেছে। বেহাত হওয়া অর্থ উদ্ধার প্রচেষ্টা জোরদার করার বিভিন্ন উপায় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে ওই পুস্তিকায়।
পুস্তিকার ৩৬ ও ১৭৯ পৃষ্ঠায় বাংলাদেশে সিমেন্স কম্পানির সঙ্গে আরাফাত রহমান কোকোর অনৈতিক আর্থিক যোগসাজশের প্রসঙ্গ উল্লেখ করা হয়েছে। ৩৬ নম্বর পৃষ্ঠায় বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষ অনুসন্ধান করে দেখেছে, সিমেন্স বিভিন্ন দেশে সরকারি কাজ পেতে জনপ্রশাসন কর্মকর্তাদের ঘুষ দিয়েছে। বিভিন্ন সময়ে কনসালট্যান্টদের ঘুষ দেওয়া হতো। কনসালট্যান্টরা এর বিনিময়ে সরকারি কর্মকর্তা ও সিমেন্স কর্তৃপক্ষের মধ্যে সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করেছেন। আর্জেন্টিনা, বাংলাদেশ ও ভেনিজুয়েলায় এ ধরনের ব্যাপক দুর্নীতির দায়ে সিমেন্সকে শেষ পর্যন্ত ৪৫ কোটি ডলার জরিমানা করা হয়।
পুস্তিকার ১৭৯ পৃষ্ঠায় বলা হয়, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ছেলেকে ঘুষ হিসেবে বিদেশি একটি কম্পানির দেওয়া অর্থ ২০০৯ সালে বাজেয়াপ্ত করার পদক্ষেপ নেয় যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের যুক্তি ছিল, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আমেরিকান মুদ্রার বিনিময় কাজটি কেবল যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থরক্ষাকারী ব্যাংকের মাধ্যমেই হতে পারে। ঘুষ দেওয়া প্রতিষ্ঠানটি (সিমেন্স) বিদেশি হলেও সেটি নিউইয়র্ক স্টক এঙ্েেচঞ্জে নিবন্ধিত, আর তাই প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্রের আইনের ঊধর্ে্ব নয়।
এর আগে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ২০০৯ সালের ৮ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষ ৩০ লাখ ডলার পুনরুদ্ধারের জন্য আইনগত পদক্ষেপ নিয়েছে। কোকো এই অর্থ জার্মানির প্রতিষ্ঠান সিমেন্সের কাছ থেকে গ্রহণ করে সিঙ্গাপুরভিত্তিক একটি ব্যাংকে জমা রাখেন।
ঢাকার বিশেষ জজ আদালত গত ৩০ নভেম্বর কোকো ও সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী আকবর হোসেনের ছেলে ইসমাইল হোসেন সাইমনের বিরুদ্ধে অর্থ পাচার মামলায় অভিযোগ গঠন করেছেন। এর কয়েক দিনের মধ্যেই পুস্তিকাটি প্রকাশিত হলো। কোকো ও সাইমনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে ৯ লাখ ৩২ হাজার ৬৭২ ডলার ও সিঙ্গাপুরে ২৮ লাখ ৮৪ হাজার ৬০৪ ডলার পাচারের অভিযোগ এনে দুর্নীতি দমন কমিশন (এসিসি) গত বছরের ১৭ মার্চ কাফরুল থানায় মামলাটি দায়ের করে।
প্রসঙ্গত, চিকিৎসার জন্য প্যারোলে মুক্তি পেয়ে আরাফাত রহমান কোকো এখন থাইল্যান্ডে আছেন।

২০ কোটি টাকা আত্মসাৎ এর জবানবন্দি দিলেন আবদুস সালাম

Wednesday, January 12, 2011

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটি) সহকারী হিসাবরক্ষক কর্মকর্তা আবদুস সালাম খান প্রায় ২০ কোটি টাকা আত্মসাতের কথা স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

মহানগর হাকিম ইসমাইল হোসেন আজ বুধবার তাঁর খাসকামরায় ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আসামি সালামের জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করেন। আদালত জবানবন্দি গ্রহণ শেষে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
দুই দিনের রিমান্ড শেষে আজ তাঁকে আদালতে হাজির করা হলে আসামি আবদুস সালাম স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে চান। এ সময় তদন্ত কর্মকর্তা দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উপপরিচালক বেনজীর আহমেদ আসামির জবানবন্দির নেওয়ার আবেদন করেন।
র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) কর্মকর্তারা জানান, গত শুক্রবার র্যাব ও দুদক যৌথ অভিযান চালিয়ে রাজধানীর তোপখানা সড়ক থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে।
র্যাবের কর্মকর্তারা জানান, বিআইডব্লিউটিএর প্রাথমিক তদন্তে সালামের আত্মসাতের বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ার পর চাকরি থেকে তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এরপর তাঁর বিরুদ্ধে একটি প্রতারণা মামলা দায়ের করা হয় রমনা থানায়। পরে মামলাটি দুর্নীতি দমন কমিশনে স্থানান্তরিত করা হয়। এ মামলার আসামি হিসেবেই র্যাব ও দুর্নীতি দমন কমিশনের সদস্যরা তোপখানা রোডে তাঁর নিজের কার্যালয়ের একটি তালাবদ্ধ কক্ষ থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করেন। গ্রেপ্তারের পর তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য একটি দল গঠন করা হয়।
র্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে সালাম জানান, ১৯৭৬ সালে বিআইডব্লিউটিএতে টাইপিস্ট হিসেবে যোগ দেন। সেখান থেকে হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা হিসেবে পদোন্নতি পান। ২০০৭ সাল থেকে তিনি কর্মচারীদের ভবিষ্যত্ তহবিল দেখাশোনার দায়িত্ব পান।

টিআইবির তিন কর্মকর্তাকে সুপ্রিম কোর্টে আমন্ত্রণ

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) পাঠানো উত্তরসংবলিত প্রশ্নগুলো অনুধাবন ও মূল্যায়নের জন্য আলোচনা করতে চিঠি পাঠিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। চিঠিতে কাল বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে চারটায় জাজেস লাউঞ্জে টিআইবির চেয়ারম্যানসহ তিন শীর্ষ কর্মকর্তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
আজ বুধবার সুপ্রিম কোর্টের ডেপুটি রেজিস্ট্রার মো. বদরুল আলম ভূঞার স্বাক্ষর করা একটি চিঠি টিআইবির চেয়ারম্যান এম হাফিজউদ্দিন খান বরাবর পাঠানো হয়। এই চিঠির অনুলিপি টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ ও নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বরাবর পাঠানো হয়েছে।
কাল এই তিন শীর্ষ কর্মকর্তা যদি আসতে না পারেন, তবে কবে নাগাদ তাঁরা আসতে পারবেন তা জানাতে চিঠিতে অনুরোধ করা হয়েছে।
সেবা খাতে দুর্নীতিবিষয়ক টিআইবির জাতীয় খানা জরিপের উত্তরসংবলিত প্রশ্নমালার ছাপানো কপি (হার্ড কপি) সুপ্রিম কোর্টে ৯ জানুয়ারি পাঠানো হয়। খানা জরিপ ২০১০-এ প্রাপ্ত বিচার খাত-সম্পর্কিত উত্তরসংবলিত প্রশ্নমালার ৬৫০টি হার্ড কপি পাঠানো হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের ডেপুটি রেজিস্ট্রার মো. বদরুল আলম ভূঞা ৬ জানুয়ারি জরিপের হার্ড কপি চেয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বরাবরে চিঠি পাঠান।
জানা যায়, গত ২৩ ডিসেম্বর প্রকাশিত টিআইবির সেবা খাতে দুর্নীতিবিষয়ক জাতীয় খানা জরিপ ২০১০-এর ফলাফলে দেখা যায়, বিচারপ্রার্থীদের মধ্যে ৮৮ শতাংশ মানুষকেই ঘুষ দিতে হয় এবং তাদের নানা অনিয়মের শিকার হতে হয়। গত ২৮ ডিসেম্বর টিআইবির সাম্প্রতিক আলোচিত জরিপের প্রতিবেদন ও বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত চেয়ে দুর্নীতির নজরদারি করা সংস্থাটিকে সুপ্রিম কোর্টের পক্ষ থেকে প্রথম চিঠি পাঠানো হয়। টিআইবি ২৯ ডিসেম্বর ওই সব তথ্য ও প্রতিবেদন সুপ্রিম কোর্টে পাঠায়। ওই দিন টিআইবির জরিপের তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনার জন্য হাইকোর্ট বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞার নেতৃত্বে পাঁচ বিচারপতিকে নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়।
এরপর ২ জানুয়ারি স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বিচার বিভাগের দুর্নীতি সম্পর্কে টিআইবির করা প্রশ্ন এবং খানার দেওয়া উত্তর পাঠানোর জন্য সুপ্রিম কোর্ট টিআইবিকে চিঠি দেন। এতে বলা হয় বিচার বিভাগ-সম্পর্তিক দুর্নীতির খানা জরিপ, তথ্য-উপাত্তসংবলিত খানা জরিপ, ২০১০-এর বিচার বিভাগ-সংক্রান্ত দুর্নীতির ও হয়রানির প্রতিবেদনটি অস্পষ্ট ও অসম্পূর্ণ। এর পরিপ্রেক্ষিতে ৪ জানুয়ারি ‘সেবা খাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০১০’-এর প্রশ্নপত্রের একটি নমুনা কপি এবং বিচার বিভাগ সম্পর্কে উত্তরদাতা খানা (পরিবার) কর্তৃক প্রদত্ত উত্তর সমন্বিত একটি সিডি পাঠায় টিআইবি।
এরপর ৬ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্ট বিচার বিভাগের দুর্নীতি-সম্পর্কিত উত্তরসংবলিত প্রশ্নমালা (হার্ড কপি) ও উত্তর চেয়ে টিআইবিকে চিঠি দেন। সূত্র জানায়, ওই চিঠিতে বলা হয় কম্পিউটারে প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার না থাকায় সেই সিডি খোলা যায়নি। তাই ছাপা কপি চাওয়া হয়। একই সঙ্গে বিচার বিভাগের দুর্নীতি-সম্পর্কিত উত্তরসংবলিত প্রশ্নমালা (হার্ডকপি) এবং ওই অভিযোগ-সম্পর্কিত অন্য কোনো তথ্য প্রাসঙ্গিক মনে হলে তা-ও পাঠাতে অনুরোধ করা যাচ্ছে। বিষয়টি জরুরি হিসেবে বিবেচনা করার জন্যও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।

জিডিপির ২৪ শতাংশই কালো টাকা __টিআইবি

Monday, January 10, 2011

দেশের অর্থনীতিতে কালো টাকার পরিমাণ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১০ থেকে ৩৮ শতাংশ পর্যন্ত ওঠানামা করছে। মুদ্রা সরবরাহ মডেল অনুযায়ী ১৯৭৫ থেকে ২০০৮ সালে দেশে কালো টাকার (অদৃশ্য অর্থনীতি) গড় আকার ছিল জিডিপির ১০.১ শতাংশ।
এ ছাড়া জনপ্রিয় এমআইএমআইসি পদ্ধতি অনুসারে ১৯৯৬ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত কালো টাকার গড় আকার ছিল ৩৮.১ শতাংশ। পদ্ধতি দুটির গড় হিসাব অনুযায়ী, অর্থনীতিতে জিডিপির ২৪ শতাংশ কালো টাকা। এ হিসাবে ২০০৮ সালের শেষ পর্যন্ত দেশের অর্থনীতিতে কালো টাকার পরিমাণ প্রায় ৩৯ হাজার ২০০ কোটি টাকা।
গতকাল রবিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে এক আলোচনা সভায় ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এ তথ্য তুলে ধরে। ‘বাংলাদেশের অদৃশ্য অর্থনীতি : আকার প্রাক্কলন এবং নীতিসংক্রান্ত প্রভাব’ শিরোনামে এক গবেষণামূলক নিবন্ধে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। নিবন্ধ উপস্থাপন করেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ অরলিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের অর্থনীতি ও ফিন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক ড. এম কবির হাসান। তবে আলোচনা সভায় উপস্থিত বক্তারা টিআইবির এই গবেষণা পদ্ধতি নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলেছেন। সভাপতির বক্তব্যে টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান এম হাফিজউদ্দিন খান বলেন, ‘দেশে দুর্নীতি আছে। সরকারে ক্ষমতাসীন দলও তা মনে করে। দুর্নীতি কমানোর জন্য আমাদের কাজ করতে হবে।’
সভায় কয়েকজন বক্তা বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির ব্যাপক একটি অংশ রয়েছে অপ্রচলিত খাতে। এ রকম তাত্ত্বিক হিসাবের মাধ্যমে তা তুলে ধরা সম্ভব নয়। তাঁরা মনে করেন, অপ্রচলিত খাতের হিসাব করা সম্ভব হলে দেশের জিডিপির আকার আরো বড় হতে পারে।
এ প্রসঙ্গে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, নমুনাভিত্তিক জরিপের মাধ্যমে একটি ধারণা তুলে ধরা হয়েছে মাত্র। এ ছাড়া কোনো গবেষণার মাধ্যমেই কালো টাকার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা সম্ভব নয়।
সভায় সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী বলেন, ‘বাংলাদেশের মতো অন্যান্য দেশেও দুর্নীতি রয়েছে, বিশেষ করে পার্শ্ববর্তী ভারত ও চীনেও দুর্নীতি রয়েছে। তবে ওই সব দেশের গবেষক বা সাধারণ মানুষ দেশকে এত গালাগাল করে না, যতটা বাংলাদেশে করে। দেশ অনেক ক্ষেত্রেই এগিয়ে গেছে। রপ্তানি বাড়ছে। তবে সব ক্ষেত্রেই দুর্নীতি আছে। তা কমাতে হবে। এ জন্য সরকার, অফিস-আদালত, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সব পর্যায়ে ভালো নেতৃত্ব দরকার।’ টিআইবির উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘ভালো কিছু বলেন। দেশকে এত গালাগাল করবেন না।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাস উদ্দিন বলেন, টিআইবি সংবাদপত্র বা গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে জরিপ করে। এ ছাড়া সংস্থাটির সাক্ষাৎকারভিত্তিক জরিপও ব্যাপকভিত্তিক হয় না। ফলে অনেক সময় জরিপের ফলাফল প্রায় ১৬ কোটি মানুষের বাংলাদেশ সম্পর্কে বিশ্বে ভুল বার্তা পাঠায়। তিনি টিআইবিকে আরো সতর্কতার সঙ্গে এসব তথ্য প্রকাশের অনুরোধ করেন।
ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ইউআইইউ) অধ্যাপক ড. এ কে এনামুল হক বলেন, অর্থনীতিতে কালো টাকা থাকলে ক্ষতি নেই। কারণ টাকাগুলো কোনো না কোনো উপায়ে দেশে বিনিয়োগ হয়। তবে কালো টাকা যেন সাদা টাকাকে ক্ষতি না করে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
কবির হাসান জানান, গবেষণা প্রবন্ধে আয়কর ফাঁকির উদ্দেশে উৎপাদিত পণ্য ও সেবা থেকে প্রাপ্ত অপ্রকাশিত আয়কে কালো টাকা বা অদৃশ্য অর্থনীতি হিসেবে বোঝানো হয়েছে। তিনটি সমন্বিত গবেষণা পদ্ধতি এবং বাংলাদেশের আর্থিক ও অর্থনীতি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ২০২ জন ব্যক্তির ওপর পরিচালিত জরিপের তথ্য নিয়ে অদৃশ্য অর্থনীতির এ ধারণা তুলে ধরা হয়েছে। ২০১০ সালে ১০ জুন থেকে ১০ জুলাই সময় ধরে জরিপ চালানো হয়। জরিপে তথ্য দাতাদের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই অদৃশ্য অর্থনীতিকে দেশের জন্য ক্ষতিকর বলে মনে করেন।
কালো টাকা নিয়ন্ত্রণ করতে গবেষণা নিবন্ধে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মধ্যে অটোমেশন পদ্ধতির মাধ্যমে সমন্বয় সাধন, কালো টাকা সাদা করার সুযোগ প্রত্যাহার, কর আইন সহজীকরণ ও কর ফাঁকির জন্য কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা, নীতিনির্ধারকদের সম্পদের হিসাব জমা দেওয়াসহ ১১ দফা সুপারিশ করেছে টিআইবি।
 
Support : Dhumketo ধূমকেতু | NewsCtg.Com | KUTUBDIA @ কুতুবদিয়া | eBlog
Copyright © 2013. News 2 Blog 24 - All Rights Reserved
Template Created by Nejam Kutubi Published by Darianagar Publications
Proudly powered by Dhumketo ধূমকেতু