কাঁদছে সোনাবরুর গ্রাম by সোহেল হাফিজ

Saturday, September 24, 2011

দারিদ্র্য মানতে না পেরে শিশু সোনাবরু আত্মহত্যা করায় এখন বিবেকের দংশনে পুড়ছেন তার স্কুলের শিক্ষক ও গ্রামবাসী। বরগুনার কেওড়াবুনিয়া ইউনিয়নের জাকিরতবক গ্রামের সর্বত্র এখন শোকের আবহ। ছোট্ট সোনাবরুর (১০) ছোট্ট স্কুল জাকিরতবক প্রাইমারি স্কুলে গতকাল শনিবার গিয়ে দেখা যায়, কাঁদছে ছাত্র-শিক্ষক সবাই। চোখ মুছতে মুছতে প্রধান শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, 'সবাই যখন বলে, তোমরা থাকতে কী করে অতটুকু মেয়েটা ক্ষুধার জ্বালায় আত্মহত্যা করল? তখন কোনো উত্তর দিতে পারি না। যদি জানতাম ওর মধ্যে এত অভিমান কাজ করছে তবে ওকে আমি আমার ছেলেমেয়েদের সঙ্গে আমার বাড়িতে রেখে পড়াতাম।'

গত বুধবার ১০ টাকা দিয়ে একটি কেক কিনে সহপাঠীদের সঙ্গে নিজের জন্মদিন পালন করে সোনাবরু। স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে হাঁড়িতে ভাত না পেয়ে আত্মহত্যা করে সে। তার সহপাঠী সৌজিয়া ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। সে কালের কণ্ঠকে বলে, 'কিছুদিন পরেই আমার জন্মদিন। সোনাবরু বলেছিল, এরপরের জন্মদিনগুলো আরো সুন্দর করে পালন করব। নিজেরা কম খাব। স্যারদের জন্য বেশি কেক রাখব।'
আদরের ছোট বোন: সোনাবরুর ১৩ বছর বয়সী ভাই ফেরদৌস অভাবের তাড়নায় ঢাকায় চলে গিয়েছিল মাস দুয়েক আগে। কচুক্ষেত এলাকার একটি স্টুডিওতে ফাই ফরমাস খাটার কাজ করে ৫০০ টাকা বেতন পেয়েছিল সে। একটি স্কুল ব্যাগ কিনে আনতে সোনাবরুর আবদার রক্ষায় গত ঈদে বাড়ি ফেরার সময় সে বেতনের ২০০ টাকা খরচ করে ফেলে। ভাইয়ের ব্যাগ হাতে নিয়ে সোনাবরু বলেছিল, 'দেখিস দাদা, যদি বেঁচে থাকি তবে কোনোদিনই পরীক্ষায় দ্বিতীয় হব না।' পিঠেপিঠি ভাই ফেরদৌস এখন সবাইকে সেই ব্যাগ দেখিয়ে শুধুই কাঁদছে।
মা আকলিমার জানান, রাতে বিছানায় তাঁর পাশে শুয়ে সোনাবরু প্রায়ই জিজ্ঞেস করত, 'মা, আমরা এত গরিব কেন?' কখনো কখনো প্রশ্ন করত, 'মা, আমার বাবা নেই কেন?' সোনাবরুর ওড়না হাতে কেঁদে তিনি বলেন, 'আমার মাইয়ার কতার জবাব আমি দেতে পারি নায়। পারি নায় ওর লইগগা দুফারের ভাত রানতেও।'
গ্রামবাসীর হাহাকার: সানাবরুর স্কুলের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি আবদুল্লাহ আল মামুন কালের কণ্ঠকে জানান, 'বিষয়টি একটি অপমৃত্যু হলেও একে ছোট হিসেবে দেখা উচিত নয়। কারণ সোনাবরুর মতো আমাদের গ্রামাঞ্চলে হাজার হাজার শিশু প্রতিনিয়ত চরম দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়ছে। তাই এমন প্রবণতা যদি সেই সব শিশুর মাঝেও ছড়িয়ে পড়ে তবে তা হবে অনেক বেশি ভয়ংকর।' গ্রামবাসী আলম সিকদার (৫০) বলেন, 'আমাগো রাজনৈতিক নেতারা গ্রামে আয় খালি ভোটের কালে। ভোট অইয়া গেলে আর কেউ গ্রামের খোঁজ লয় না। কেডা খাইয়া মরলে, আর কেডা না খাইয়া মরলে হ্যা দ্যাহনের সময় নাই হ্যাগো।'
বরগুনার তরুণ আইনজীবী হাসান তারেক পলাশ বলেন, 'এমন মর্মান্তিক একটি ঘটনায় বরগুনার সব রাজনৈতিক নেতার সোনাবরুর মায়ের পাশে এসে সমবেদনা জানানো উচিত ছিল। শুধু সমবেদনা নয়, তাঁদের উচিত বিষয়টি খতিয়ে দেখা। যদি দারিদ্র্যের কারণেই সোনাবরু আত্মহত্যার আশ্রয় নেয় তবে বুঝতে হবে বরগুনায় আমাদের বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠনগুলো (এনজিও) ঠিকভাবে কাজ করছে না। তারা শুধু আমাদের দারিদ্র্যকে পুঁজি করে কিংবা সোনাবরুদের নাম ভাঙিয়ে বিদেশি দাতা সংস্থার কাছ থেকে শুধু টাকাই আনছে, যথাযথভাবে তা খরচ হচ্ছে না।'

লিচু চাষ করে গাড়ি বাড়ির মালিক

Monday, June 13, 2011

মেধা, শ্রম আর কাজের প্রতি আন্তরিকতা থাকলে যে কোন কাজেই সফল হওয়া যায়। সেটা প্রমাণ করেছেন ঝিনাইদহ কালীগঞ্জের এক সময়ের দিনমজুর আবুল হোসেন। তিনি আজ থেকে ১৮ বছর আগে দিনমজুরের কাজ শেষে বিকেলে নানা রকম মৌসুমি ফল কিনে কালীগঞ্জ শহরের রাস্তার পাশে বসে বিক্রি করতেন। তখন থেকে তার আশা ছিল জীবনে সুযোগ পেলে নিজে একটা লিচুর বাগান করবেন।

তিনি করেছেনও তাই। আবুল হোসেন প্রথমে অন্যের ও পরে নিজের জমিতে ১৮ বছর ধরে লিচু চাষ করে অভাবনীয় সফলতা অর্জন করে এখন হয়েছেন গাড়ি-বাড়ির মালিক। তার অতীতের অভাব অনটনের দিনগুলোর কথা বলতে গিয়ে ৫০ ঊর্ধ্ব বয়সী আবুল হোসেন জানান, ৫ ভাইবোনের অভাবের সংসারে তিনি সবার বড়। তাই অনেক অল্প বয়সেই তার ওপর সংসারের ভার এসে পড়ে। তাছাড়া ভূমিহীন বাবার পরিবারে অর্থ সংকটের কারণে কোন দিন স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। দরিদ্র পরিবারের মা-বাবাসহ ভাইবোনদের মুখে হাসি ফোটানোর মহাদায়িত্ব কাঁধে নিয়ে দিনের পর দিন তিনি পরের জমিতে কামলার কাজ করে সংসারের খরচ জুগিয়েছেন। সঙ্গে সঙ্গে বিকেলে আশপাশের গ্রাম থেকে লিচুসহ বিভিন্ন ধরনের মৌসুমি ফল কিনে কালীগঞ্জ শহরে রাস্তার পাশে বসে বিক্রি করতেন। এ ব্যবসায় ভালো লাভ পেয়ে দিনমজুরি ছেড়ে শুধু ফলের ব্যবসা করার চিন্তা মাথায় আসে তার। অল্পদিনের মধ্যে মায়ের একটি ছাগল বিক্রি করে কিছু পুঁজি জোগাড় করেন তিনি। উপজেলার ষাইটবাড়িয়া, মথনপুর, সাতগাছিয়া, অনুপমপুরসহ প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ঝুড়িভর্তি লিচু কিনে মাথায় করে কালীগঞ্জ শহরে হাটচাঁদনির পাশে রাস্তায় বসে বিক্রি করতেন। সঙ্গে সঙ্গে নিজের কোন জায়গা জমি না থাকলেও সবসময় ভাবতেন কিভাবে নিজে একটি লিচু বাগানের মালিক হবেন। প্রায় ৪-৫ বছর এভাবে ব্যবসা করে কিছু টাকার জোগাড় করে তার গ্রামের আবদুল লতিফের কাছ থেকে মোট ১৩ হাজার টাকা দিয়ে ১ একর ৩৭ শতক জমি বন্ধক রাখেন। পরে ২ বছর এ জমিতে অন্য ফসলের চাষ করে কিছু আয় করেন এবং ব্যবসা থেকে রোজগারের টাকা দিয়ে ১৯৯২ সালে ৭০ হাজার টাকা দিয়ে ওই জমিটিই কিনে নেন। এরপর ১৯৯৩ সালে জমিটিতে মোট ৯৯টি লিচুর চারা রোপণ করেন। ২ বছর পরই তার বাগানে লিচু ধরা শুরু হয়। ১৯৯৫ সালে তিনি চারা গাছ থেকেই খরচ বাদে ১১ হাজার টাকার লিচু বিক্রি করেন। পরের বছর ১৯৯৬ সালে লিচু বাগান থেকে লাভ আসে ১ লাখ ৩৬ হাজার টাকা। ১৯৯৭ সালে খরচ বাদে লাভ পান ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। এভাবে প্রতিবছর ক্রমে বাড়তে থাকে তার লাভের পরিমাণ। লিচু চাষের পাশাপাশি লাভের টাকা দিয়ে বড় ছেলে বাবুল আক্তারকে সঙ্গে নিয়ে কালীগঞ্জ শহরে কাঁচাবাজারে শুরু করেন আড়তদারি ব্যবসা। আবার প্রতিবছর লিচু বাগান থেকে আসতে থাকে বাড়তি টাকা। তিনি গত বছরেও প্রায় ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকার লিচু বিক্রি করেছিলেন। এ বছর ইতোমধ্যে ১ লাখ ৯৫ হাজার টাকার লিচু বিক্রি করেছেন। গাছে এখনো তার অনুমান মতে প্রায় ৩ লাখ টাকার লিচু আছে। মাত্র ১৮ বছরের ব্যবধানে তিনি মাঠে ৯ বিঘা জমি, ২টি ট্রাক ও একটি সুন্দর বাড়ি করেছেন।
লিচু চাষে সফলতা অর্জনকারী আবুল হোসেন জানান, তিনি নতুন করে আরও ৩৭ শতক জমিতে লিচুর চারা এবং ৫১ শতক জমিতে আমের চারা রোপণ করেছেন।
লিচু চাষ সম্পর্কে কালীগঞ্জ কৃষি কর্মকর্তা আলীমুজ্জামান জানান, এ উপজেলায় যোগদানের পর লিচু চাষ করে সফলতা অর্জনকারী আবুল হোসেনের গল্প তিনি শুনেছেন। তিনি দিনমজুর থেকে লিচু চাষ করে এখন হয়েছেন গাড়ি-বাড়ির মালিক। লাভজনক লিচু চাষের মাধ্যমে তার সফলতা দেখে অনেকে এখন ঝুঁকে পড়ছেন এ চাষে।

কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় দারিদ্র্য বিমোচন হচ্ছে না

Wednesday, January 19, 2011

দেশের দারিদ্র্য বিমোচন কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় হচ্ছে না। বর্তমান এ ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে দারিদ্র্য কমার পরিবর্তে আরো বাড়বে। এই লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে সরকারকে এখনি কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

বেসরকারি সংস্থা উন্নয়ন অন্বেষণের নিয়মিত মাসিক অর্থনৈতিক পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, স্বাধীনতার পর থেকে দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশ কিছুটা অগ্রগতি লাভ করলেও এখনও দেশের প্রায় অর্ধেক জনগণ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। ভিশন-২০২১ এর লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ২০২১ সালের মধ্যে দারিদ্রতার এ হার ২০০৫ সালে শতকরা ৪০ দশমিক ৪০ ভাগ থেকে কমিয়ে শতকরা ১৫ ভাগে নামিয়ে আনার কথা। কিন্তু তথ্য উপাত্ত বিশেস্নষণে দেখা যায় যে, লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে দারিদ্রতার এ হার যে ভাবে কমার কথা ঠিক সেভাবে কমছে না। কারণ হিসেবে উন্নয়নের ধীর গতি, বিনিয়োগে মন্দাভাব, মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের অভাব অনেকটা দায়ী। বিগত বছরগুলোতে (১৯৯০-২০০৫) দারিদ্র্যেতার হার বছরে শতকরা শূন্য দশমিক ৭৮ ভাগ করে কমলেও লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে যথেষ্ট অপ্রতুল। যদি কোন রেডিক্যাল কর্মসূচী না নেওয়া হয় এবং হ্রাসের বর্তমান হার অব্যাহত থাকলে নির্দিষ্ট সময় সীমা (২০২১) শেষে এটি শতকরা ২৭ দশমিক ৯ ভাগে দাঁড়াতে পারে, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১২.৯ ভাগ বেশী।

পরিসংখ্যান বিশেস্নষণে দেখা যায় যে, বাংলাদেশ সব লক্ষ্যমাত্রায় পোঁছানোর জন্য সঠিক পথে না থাকলেও অগ্রগতি একেবারে অসন্তোষজনক নয়। যদিও কাগজে কলমে অনেক পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়, কিন্তু বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান দেশকে অগ্রগতির পথে এগিয়ে নেবার এ সরকারের এখনও তিন বছর সময় আছে। এই লক্ষ্যমাত্রায় পেঁৗছাতে সরকারকে অবশ্যই তার কৌশল, নীতি ও বাস্তবায়ন পর্যালোচনা করতে হবে। সরকারকে সৃষ্টিশীল হতে হবে, কার্যকরী কৌশল গ্রহণের ক্ষেত্রে এবং তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
 
Support : Dhumketo ধূমকেতু | NewsCtg.Com | KUTUBDIA @ কুতুবদিয়া | eBlog
Copyright © 2013. News 2 Blog 24 - All Rights Reserved
Template Created by Nejam Kutubi Published by Darianagar Publications
Proudly powered by Dhumketo ধূমকেতু