আলতো এক গুঁতোয় যদি সব সমাধান হতো ... by ওবায়দুল কবির

Monday, June 13, 2011

৭ এপ্রিল, রবিবার। সকাল সাড়ে সাতটায় স্ত্রীকে নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে যাই। সাংবাদিক হিসেবে কোন রকম সুযোগ-সুবিধা না নিয়ে স্ত্রীকে মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসকের কৰের সামনে লাইনে দাঁড় করিয়ে কিছু দূরে বসে থাকি। অনেকৰণ লাইনে দাঁড়ানোর পর চিকিৎসকের দরজার সামনে পেঁৗছে যান আমার স্ত্রী।

তিনজন রোগীর পেছনে তাঁর অবস্থান। এমন অবস্থায় এক কর্মচারী আমার স্ত্রীকে নিজের লাইন থেকে সরিয়ে অন্য আরেকটি লম্বা লাইনের পেছনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। অন্য লাইনে যেতে অস্বীকৃতি জানালে স্ত্রীকে অশালীন ভাষায় লাইন থেকে বের হয়ে যেতে বলা হয়। ততৰণে দৃশ্যটি আমার নজরে পড়ে। স্ত্রীকে তার নিজের লাইনে রাখার অনুরোধ করলে ওই কর্মচারিটি আমাকে ধমক দিয়ে বের হয়ে যেতে বলেন। দ্বিতীয়বারের মতো লাইন থেকে বের হয়ে যেতে অস্বীকৃতি জানালে প্রথমে তিন/চার কর্মচারী আমার ওপর চড়াও হয়। টেনেহিঁচড়ে আমাকে অন্য স্থানে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। তাদের সঙ্গে আরও ৬/৭ কর্মচারী যোগ দেয়। কর্মচারীদের কয়েকজন আমাকে লাথি ও কিলঘুষি দিতে থাকে। ওই স্থানে দাঁড়ানো আনসার সদস্য ও সাধারণ লোকজন আমাকে কর্মচারীদের আক্রমণ থেকে রৰা করেন। পরে হাসপাতালের অন্য কর্মচারীদের সহায়তায় আমি হামলাকারীদের মধ্যে হাবিব, বাবু ও মাসুম নামে তিন কর্মচারীকে শনাক্ত করতে পেরেছি।
এ অবস্থার রেশ না কাটতেই আমার কানে এলো প্রতিদিনের রম্নটিন মাফিক বিএসএমএমইউ-এর পরিচালক (হাসপাতাল) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল মজিদ ভূঁইঞা আইটডোর পরিদর্শনে আসছেন। এ খবর শুনে মনে মনে স্বস্তি বোধ করছি। ভাবছি তিনি এলে আমার কথা শুনে এবং পরিচয় পেয়ে নিশ্চয়ই এমন কিছু উদ্যোগ নেবেন যাতে কিছুৰণ আগে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ৰিত ঘটনার লজ্জা থেকে কিছুটা হলেও রেহাই পাব। তিনি সেনাবাহিনীর একজন অফিসার হওয়ায় এ বিশ্বাস জন্মেছে আরও বেশি। তিনি ঘটনা স্থলে আসার দেরি দেখে আমি নিজেই এগিয়ে গিয়ে পরিচয় দিয়ে সব কিছু খুলে বললাম। তিনি মুখে কোন কথা বললেন না। সামনের দিকে হাঁটতে থাকলেন। আমি তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করলাম। ঘটনার যে নায়ক তার কাছে আসতেই জোরেশোরে গলা বাগিয়ে দেখিয়ে দিলাম। তিনি তাঁর হাতে থাকা ছোট্ট স্টিকটি দিকে ওর পেটে একটি আলতো গুঁতো দিয়ে শুধু বললেন: ডিউটি চেঞ্জ করে দেব কিন্তু। এই শেষ। আমি আবার তাঁর পিছু হাঁটছি। শেষে যখন চলে যাবেন তখন বললাম, স্যার আমার করণীয় কি? আমি কি লিখিত অভিযোগ জমা দেব। তিনি শুধু বললেন, দেন।
লজ্জা ও অপমানের হাত থেকে বাঁচতে আমার চীফ রিপোর্টার ওবায়েদ ভাইকে বিষয়টি ফোনে জানালাম। তিনি স্বাস্থ্য বিটের সাংবাদিক নিখিল মানখিন দাদাকে জানাতে বললেন। তারপর নিখিল দাদা আমাকে অপেৰা করতে বলে মহাখালী থেকে রওনা দিলেন হাসপাতালের দিকে। ঘটনা জানালাম রংপুর বিভাগ সাংবাদিক সমিতির সভাপতি জাকারিয়া মুক্তা ভাইকে। এরপর অপেৰা করতে লাগলাম। কিভাবে যেন খবর পেয়ে একে একে হাসপাতালে হাজির হলেন সাংবাদিক রাজন ভট্টাচার্য দাদা, মিথুন কামাল ভাই, পবন আহমেদ ভাই, মশিউর রহমান ভাই, আতিকুর রহমান ভাই, হাবিবুর রহমান হাবিব, উমর ফারম্নকসহ অনেক সাংবাদিক। সম্মিলিতভাবে তাঁরা প্রতিবাদ জানাতে থাকেন। দীর্ঘৰণ ধরে তাঁরা উপাচার্যের কার্যালয়ে অবস্থান করেন। ঘটনার সুষ্ঠু তদনত্ম ও জড়িতদের দৃষ্টানত্মমূলক শাসত্মি দাবি করে তাঁরা হাসপাতালের পরিচালক বরাবর একটি আবেদনপত্র জমা দেন। পরিচালক(উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. আবু নাসার রিজভী ও পরিচালক( হাসপাতাল) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল মজিদ ভূঁইঞা বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা নিয়ম-কানুনের কথা বলে কালৰেপণ করেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. প্রাণ গোপাল দত্তের আনত্মরিক হসত্মৰেপে অভিযুক্তদের তিন জনকে সাময়িক বরখাসত্ম ও তদনত্ম কমিটি গঠন করতে বাধ্য হয় সংশিস্নষ্টরা। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলে মিথ্যা তথ্য দিয়ে ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকদের ফিরিয়ে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপৰের বিরম্নদ্ধে। তবে ৩ দিনের মধ্যে তদনত্ম রিপোর্ট জমা দেয়ার কথা থাকলেও প্রায় এক মাস পেরিয়ে যাচ্ছে কোন খবর পাইনি এখনও।
এ সময় পরিচালক মহোদয় নির্লজ্জভাবে অধ্যাপক প্রাণ গোপাল দত্ত স্যারকে জানান, ঘটনার তো ওখানেই বিচার হয়েছে। আমি তাঁর কথার প্রতিবাদ করলে তিনি বলেন_ কেন আমি ওর পেটে গুঁতো দিলাম না।
তখন আমার বার বার মনে হয়েছিল আপনাকে লাথি দিলে আমার বস যদি আমার পেটে আলতো গুঁতো দেন তা হলে বিষয়টি মিটে যাবে? কিন্তু বলতে পারিনি। শুধু ভেবেছি, এ রকম গুঁতোর মাধ্যমে যদি সব কিছু ঝামেলা শেষ হয়ে যেত তা হলে দেশটি সোনার বাংলা না হওয়ার কোন উপায় ছিল না। আশার কথা হলো, এখনও এদেশে ভূঁইয়াদের বিপরীতে প্রাণ গোপাল দত্তের মতো মানুষও আছে।
হামিদ-উজ-জামান মামুন

বারানসির শেষ বিকেলে
৮ মে, রবিবার । দিলস্নী সফর শেষ। সকাল থেকে মনটা বেশ খারাপ। অনেক সময় এমনিতেই আমার মন খারাপ হয়ে যায়। মন খারাপের কারণ খুঁজে বের করতে নিজেরই বেশ সময় লাগে। খুব ছোটখাটো কারণ। প্রত্যাশা অনুযায়ী সব কিছু না ঘটলে আমার মন খারাপ হয়। মন খারাপ হলে চেহারা দেখে বোঝা যায়। সফরসঙ্গী কয়েকজনই মন খারাপের কারণ জানতে চাচ্ছেন। আমার কাছে কোন জবাব নেই। কিছু সময় চিনত্মা করলাম কেন মন খারাপ হলো। যে কারণ খুঁজে পেলাম তাতে নিজেরই হাসি পেল। তবুও মন খারাপ গেল না। রওনা হই বারানসির উদ্দেশ্যে।
কিংফিশার এয়ারের ফ্লাইট সকাল দশটায়। ভোর সাড়ে ৬টায় হোটেল থেকে রওনা হওয়ার কথা থাকলেও প্রায় পৌনে ৮টা বেজে গেল। দিলস্নী ইন্দিরা গান্ধী বিমানবন্দরে পেঁৗছে বোর্ডিং কার্ড সংগ্রহ করতে কিছুটা তাড়াহুড়াই লেগে গেল। এর মধ্যে আনিস আলমগীরের বোর্ডিং বাতিল করা হয় হ্যান্ড লাগেজে ছুরি রাখার অপরাধে। দ্বিতীয় দফা তাকে বোর্ডিং পাস নিতে হলো। যথাসময় বিমান আকাশে উড়ে বারানসিতে পেঁৗছে ঠিক ১১টায়। বারানসি ভারতের উত্তর প্রদেশের একটি জেলা শহর। উত্তর প্রদেশ হলেও এটি বিহারসংলগ্ন। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের তীর্থস্থান কাশীর রাষ্ট্রীয় নাম আগে ছিল বেনারসি। পরবর্তীতে নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় বারানসি। সুন্দর ছিমছাম বিমানবন্দর। লালবাহাদুর শাস্ত্রীর নামে বিমানবন্দরের নামকরণ করা হয়েছে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই আমাদের লাগেজ পেয়ে যাই। বিমানবন্দরে আমাদের স্বাগত জানান জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নিজে। ভারত সরকারের অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার এই কর্মকর্তা আমাদের গাড়িতে উঠিয়ে দিয়ে তিনি বিদায় নিলেন। ভারত সফরে আমাদের কার্যসূচীতে বারানসি যুক্ত হওয়াতে আমি খুবই উৎফুলস্ন হয়েছিলাম। ওখানে হিন্দু ইউনিভার্সিটিতে আমার কন্যা লোটাস লেখাপড়া করেছে। সময়ের অভাবে অবশ্য তার ইউনিভার্সিটি দেখা হয়নি। লোটাস এখন কানাডার স্থায়ী বাসিন্দা। ওখান থেকে ফোনে তার সঙ্গে কথা বলেছি।
জেলা শহরে আমরা ভিআইপি অতিথি। সামনে-পেছনে পুলিশের গাড়ি। সাইরেন বাজাতে বাজাতে আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো হোটেলে। তারকা খচিত বিশাল হোটেল। আগে ছিল হোটেল তাজ। দিলস্নী তাজ হোটেলে জঙ্গী হামলার পর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়েছে হোটেল গেটওয়ে। ৭০ একর জায়গার ওপর দু'টি হোটেল। মফস্বল শহরে অবস্থানের কারণে খুব একটা জৌলুস নেই। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। হোটেলের অধিকাংশ কর্মচারীই বাঙালী। খড়রোদের কারণে বাইরে প্রচ- গরম। দুপুরে খাওয়ার পর হাল্কা বিশ্রাম নিয়ে আমরা যাই সরনাথ জাদুঘর দেখতে। সঙ্গে প্রটোকল কর্মকর্তা ছাড়াও এক ইন্সপেক্টরের নেতৃত্বে একদল পুলিশ। ৫টায় জাদুঘর বন্ধ হয়ে যায়। আমরা পেঁৗছতেই ৫টা বেজে যায়। তবুও খোলা রাখা হয়েছে আমাদের জন্য। একজন স্মার্ট বয়স্ক গাইড আমাদের জাদুঘরে রৰিত প্রত্নতত্ত্বগুলো বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন। যিশুর জন্মের এক হাজার বছর আগের একটি বৌদ্ধ মূর্তি দেখিয়ে গাইড বলছেন, এটি বুদ্ধের আসল মূর্তি। এর দিকে মনোযোগ দিলে দেখতে পাবেন মহামতী বুদ্ধ আপনার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছেন। আপনি কিছু প্রার্থনা করলে দেখবেন তাঁর চোখ থেকে আশীর্বাদ বর্ষিত হচ্ছে। আশীর্বাদ বর্ষিত হয় কিনা জানিনা, তবে মূর্তিটি সত্যিই মোনালিসা ছবির মতো মৃদুহাস্য। জাদুঘরের পাশেই রাজা অশোকের দুর্গ। এখনও দুর্গের ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। গাইড আমাদের দেখালেন বিখ্যাত অশোক সত্মম্ভ। পাশে একটি বৌদ্ধ মন্দির। কিছু ছবি তুলে ফেরার সময় গাইড খাঁটি বাংলায় বললেন, আপনারা বাংলাদেশের সাংবাদিক? আমরা অবাক হয়ে তার দিকে কিছু সময় তাকিয়ে থাকি। প্রশ্ন করলাম, আপনি বাঙালী। মৃদু্যহাস্যে তিনি জবাব দিলেন, খাঁটি বাঙালী। হুগলীতে আমার জন্ম। এতৰণ ইংরেজী বললেন যে- তিনি বললেন, গাইডের কাজ ইংরেজীতেই ভাল হয়। বাঙালী কায়দায় তাঁর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসি হোটেলে। সন্ধ্যায় বের হই গঙ্গা ঘাটের 'আরতি' দেখতে। প্রতিদিন সন্ধ্যা সাতটায় শুরম্ন হয় আরতি। গঙ্গার কয়েকটি ঘাটেই আরতি হয়। সবচেয়ে বড়টির নাম ডা. রাজেন্দ্র কুমার ঘাট। স্রোতের মতো ঘাটের দিকে চলছে হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ মানুষ। আমরা যখন ঘাটের কাছাকাছি পৌঁছি তখন মসজিদের মাইকে মাগরিবের নামাজের আজান দিচ্ছে। একদিকে মসজিদের আজান, অন্যদিকে গঙ্গা ঘাটমুখী মানুষের স্রোত_ উলুধ্বনি। হিন্দু-মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের অপূর্ব সহাবস্থান। আমাদের ড্রাইভার মুসলিম। নাম জাকির। জানাল, কাশিতে তিন ভাগের একভাগ লোকই মুসলমান। শুধু হিন্দু-মুসলিম নয়, অনেক বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী লোকও রয়েছে এখানে। তিন ধর্মের লোকদের সহাবস্থানে কখনও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হয় না। পুলিশের গাড়ি সাইরেন বাজাতে বাজাতে আমাদের পেঁৗছে দিল ঘাটে। স্রোতের মতো ঘাটমুখী ধর্মপ্রাণ লোকগুলো বিরক্ত হলেও কিছু করার নেই। আমরা যে রাষ্ট্রীয় অতিথি। আমাদের নিয়ে বসানো হলো ঘাটের এক পাশে বাঁধানো একটি টিলার ওপর। লাল গালিচার ওপর চেয়ার পাতা। আমরা ছাড়াও ভিআইপি রয়েছেন সেখানে। এটি বারানসি প্রশাসনের স্থায়ী ব্যবস্থা। প্রায়ই ভিআইপিরা আসেন আরতি দেখতে। তাদের জন্যই এই ব্যবস্থা করা হয়েছে। ওখানে বসে ঘাটের সবটাই দেখা যায়। শুধু ঘাটের ওপর নয়, নদীতেও কয়েক শ' নৌকায় হাজার হাজার ভক্ত বসে আরতি দেখছে। ঘণ্টাখানেক ওখানে বসার পর আমরা ফিরে আসার সিদ্ধানত্ম নেই। সফরসঙ্গী তিন মেয়ে মুন্নী, সুপ্রীতি এবং কঙ্কা বেঁকে বসেন। তাঁরা আসবেন না। আরও বসবেন। আমাদের সঙ্গে চট্টগ্রামের রফিকুল বাহার ধূপের গন্ধে প্রায় অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। আমরা সিদ্ধানত্ম নিলাম কেউ কেউ ওখানে থাকবে এবং আমরা কয়েকজন হোটেলে চলে যাব। পুলিশ ইন্সপেক্টর কিছুতেই দল ভাঙ্গতে রাজি নন। তিনি বলেন, দল ভাঙ্গলে আমি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারব না। শেষ পর্যনত্ম তাঁকে অনেক বুঝিয়ে আমরা ক'জন হোটেলে ফিরে আসি। অল্প সময় পরেই আমি এবং সালাম ভাই বের হয়ে যাই বেনারসি শাড়ির সন্ধানে। ড্রাইভার জাকির আমাদের নিয়ে যায় একটি শাড়ির ফ্যাক্টরিতে। তিওয়ারী ইন্টারন্যাশনাল। মালিক কিষান তিওয়ারী। ঠিকানা ১০/৪৮ হুকুলগঞ্জ এমএ রোড। দু'টি খাঁটি বেনারসি সিল্ক শাড়ি কিনে হোটেলে ফিরতে অনেক রাত হয়ে যায়। হোটেলে ফিরে দেখি সবাই যার যার মতো করে সিল্ক ফ্যাক্টরিতে গেছেন এবং একাধিক শাড়ি কিনেছেন।

একই গগনের দুই জ্যোতিষ্ক by নিয়ামত হোসেন

ঠাৎই যেন চলে গেলেন মোহাম্মদ কিবরিয়া। শিল্পী কিবরিয়া। দেশের শিল্প ও সংস্কৃতি ভুবনের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ছিলেন তিনি। চারুকলা ৰেত্রের একজন দিকপাল। অগণিত ভক্ত, ছাত্র ও অনুরাগীরই শুধু নয়, আমাদের দেশের একজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন তিনি। বয়স যাই হোক, এভাবে তিনি চলে যাবেন সেটা কেউ আশা করেনি। সেজন্যই তাঁর চলে যাওয়ার খবর যিনিই শুনেছেন, তিনি চমকে ওঠেছেন।
যেন হঠাৎ করেই চলে গেলেন বিশিষ্ট এই চিত্রশিল্পী। এ দেশে আধুনিক বিমূর্ত চিত্ররীতির অন্যতম প্রবর্তক তিনি। এই ৰেত্রে তাঁর অবদান বিরাট। দেশে শিল্পীমহলে তিনি এর স্বীকৃতি পেয়েছেন। একই সঙ্গে আর যেসব শিল্পী এই ধারা প্রবর্তনে ভূমিকা রেখেছেন তাঁরাও আজ দেশে খ্যাতিমান। আজ দেশের শিল্পকলার ৰেত্রে যে অগ্রগতি এসেছে তার পেছনে অবদান রয়েছে অনেকেরই। শিল্পী কিবরিয়া তাঁদেরই অন্যতম। আমাদের চিত্রকলা আজ অনেক দূর এগিয়েছে। একটা সময় ছিল যখন চিত্রকলা ছিল না বলা যাবে না, ছিল, কিন্তু আধুনিক চিত্রকলা ছিল না। বেশ কয়েকজন নিবেদিতপ্রাণ শিল্পীর হাত ধরে আমাদের চিত্রকলা এগিয়ে এসেছে। এর মধ্যে এসেছে আধুনিক রীতি। এদেশে সে রীতির অন্যতম প্রবর্তক মোহাম্মদ কিবরিয়া। এদেশে চিত্রশিল্পের এগিয়ে যাওয়ার প্রাথমিক পর্যায়ে যাঁরা অক্লানত্ম পরিশ্রম করেছেন তাঁদের মধ্যে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, পটুয়া কামরুল হাসান, শফিউদ্দিন আহমদ প্রমুখের পরবর্তী ধাপেই আছেন মোহাম্মদ কিবরিয়া। এদেশে আধুনিক শিল্পকলার অন্যতম প্রবর্তক হিসেবে তাঁর অবদান বিরাট। এই ধারারই শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, আমিনুল ইসলাম, আবদুর রাজ্জাক প্রমুখ। এঁরা সকলেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে খ্যাতিমান। এদেশে আধুনিক চিত্রকলার প্রবর্তন ও প্রসারের ৰেত্রে এঁদের প্রত্যেকের অবদান অনস্বীকার্য।
বিমূর্ত চিত্রকলা বোঝেন না এ কথা অনেকে বলেন। কথাটি পুরোপুরি ঠিক নয়। শিল্পী কিবরিয়ার মৃতু্যর পর এক স্মরণসভায় বিশিষ্ট শিল্পী হাসেম খান তাঁর স্মৃতিচারণে ঠিক এই বিষয়টি নিয়ে স্মৃতিচারণ করে নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন।
মোহাম্মদ কিবরিয়ার চিত্র প্রদর্শনী চলছে। বহু লোক দেখতে আসছে। একদিন এল বোরকাপরা এক বধূ ও তাঁর স্বামী এক রিকশাচালক। ওই মহিলা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে একটি ছবি খুব আগ্রহ নিয়ে দেখছেন। একবার সামনে একবার পাশে এভাবে কয়েকবার দেখার পর স্বামীকে ডেকে ছবিটা দেখে বললেন, দেখো দেখো এটা সরষে খেত না? ছবিটি বুঝতে পেরে আনন্দিত এই মহিলা। শিল্পীর স্বার্থকতা এখানেই। দর্শকদের মনোযোগ আকৃষ্ট করছেন এবং বিশেষ ধরন বা ভঙ্গিতে উপস্থাপন করছেন তাঁর বিষয়বস্তু।
অমায়িক মানুষ ছিলেন শিল্পী কিবরিয়া। রুচিবান মানুষ। অনেকটা নিভৃতচারী। তাঁর একটা বিশেষ গুণ ছিল বাংলা সাহিত্যের প্রচ- ভক্ত ছিলেন তিনি। এদেশের এবং পশ্চিমবঙ্গের খ্যাতিমান লেখকদের গল্প উপন্যাস তিনি নিয়মিত পড়তেন। সাহিত্যের সঙ্গে ছিল তাঁর আজীবন সখ্য। চিত্রকলা এবং সাহিত্যের অবস্থান দূরে নয়, নিকটে। সাহিত্য যেমন একটা মাধ্যম তেমনি চিত্রকলাও একটি গুরম্নত্বপূর্ণ মাধ্যম যার মাধ্যমে প্রকাশ করা যায় মনের ভাব বা অনুভূতি। দুটির রূপ ভিন্ন হলেও তাদের অবস্থান পরস্পরের কাছাকাছি। সঙ্গীতও তাই। তাই বলা যায়, এগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক দূরের নয়, নৈকট্যের। কবি গুরুকে তাই দেখা যায়, কবিতা, গল্প, উপন্যাস এবং তার সঙ্গে সঙ্গীতচর্চার এক পর্যায়ে কবি চলে আসেন চিত্রকলায়।
আমাদের দেশে অনেক শিল্পীই সাহিত্যের অনুরাগী, কবি-সাহিত্যিকদের সঙ্গে তাঁদের হৃদতাপূর্ণ সম্পর্ক। লেখকদের বইয়ের ছবি বা প্রচ্ছদ অাঁকার ৰেত্রেই নয়, সামগ্রিকভাবে শিল্পীরা সাহিত্য অঙ্গনের সঙ্গে নানাভাবে যুক্ত। কোন কোন শিল্পী সাহিত্য রচনার সঙ্গেও সংশিস্নষ্ট। শিল্পী কিবরিয়া ছিলেন সাহিত্য অনত্মপ্রাণ মানুষ। বাংলা সাহিত্যের প্রচ- অনুরাগী ছিলেন। তাঁর শিল্পপ্রেম এবং সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ মিশে গিয়েছিল একাকার হয়ে। বিদগ্ধ এই মানুষটি তাঁর ছাত্রদের মধ্যে একাধারে শিল্পের প্রতি অনুরাগ এবং সাহিত্যের প্রতি ভালবাসা যেমন জাগিয়ে তুলেছিলেন, তেমনি তাদের মধ্যে জাগিয়ে তুলেছেন দেশপ্রেমও। আমাদের আধুনিক চিত্রশিল্পী তাঁকে মনে রাখবে। তিনি আমাদের শিল্পকলার ইতিহাসে বেঁচে থাকবেন, বেঁচে থাকবেন তাঁর অগণিত সহকর্মী, ছাত্র ও অনুরাগীর মধ্যে।
শিল্পী কিবরিয়ার চলে যাওয়ার অর্থ বাংলাদেশের শিল্প গগন থেকে এক উজ্জ্বল নৰত্রের বিদায়।
প্রতিবেশী ভারতের শিল্প গগনের এক নৰত্রের চলে যাওয়ার সংবাদ পাওয়া গেল এ সময়েই। তিনি শিল্পী হুসেন। পুরো নাম মকবুল ফিদা হুসেন। তবে হুসেন নামেই পরিচিত তাঁর দেশব্যাপী এবং একই সঙ্গে বিশ্বব্যাপীও। আপাদমসত্মক শিল্পী তিনি। তাঁর চালচলন জীবনযাপন সবই একজন প্রকৃত শিল্পীর মতো। কোন ভনিতা নেই, সহজ-সরল সুন্দর জীবন। বিলাসিতার ধার ধারেন না। শিল্পী হুসেন বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে পক্বকেশ ও শ্মশ্রম্নম-িত এক সরল মানুষের চেহারা। বিলাসিতা দূরের কথা অনেক সময় তিনি পায়ে জুতা স্যান্ডেলও ব্যবহার করতেন না।
দেশ-বিদেশে তাঁর নাম। অগণিত ভক্ত। ছবির দামও অনেক। এক নিলাম ঘরে তাঁর একটা ছবির দাম উঠেছিল ২০ লাখ ডলার পর্যনত্ম। সহজ-সরল এই মানুষটি থাকতেন সাদাসিদ্ধাভাবে। পশ্চিমা দেশের এক ম্যাগাজিনে তাঁকে বলা হয় 'ভারতের পিকাসো।' আসলে বড় মাপের মহৎ সব শিল্পী নিজ নিজ ৰেত্রে অনন্য। কারও সঙ্গে কারও তুলনা হয় না। সবাই নিজ নিজ ৰেত্রে অনন্য। পিকাসো পিকাসোই। তাঁর সঙ্গে কারও তুলনা চলে না। হুসেন হুসেনই। তাঁর সঙ্গেও তুলনা চলে না কারও।
হুসেনের বিষয়ে সর্বপ্রথম যে কথাটি বলা যায়, সেটি হচ্ছে হুসেন স্বশিৰিত শিল্পী। কোনদিন কোন একাডেমী বা স্কুল থেকে চিত্রকলায় শিৰা নেননি। নিজের ভেতরেই ছিল শিল্প। নিজেই সেটাকে বিকশিত করে জগদ্বিখ্যাত হন।
নিজ দেশে ছিলেন খুবই জনপ্রিয় একজন মানুষ। পথে ঘাটে শহরে নগরে ঘুরে বেড়িয়েছেন। শিল্পীর চোখে দেখেছেন মানুষ ও পরিপাশর্্ব। ছবি অাঁকতেন যেখানে সেখানে। কাগজ পেন্সিল কলম তুলি একটা হলেই হলো। সাবলীল দৰতায় একের পর এক হয়ে যেত স্কেচ। সকল পর্যায়ে মানুষ তাঁর ছবি ভালবাসত। তাঁর ছবি বুঝত সাধারণ মানুষও। ভারতের অনেক সম্মান তিনি পেয়েছেন। পেয়েছেন পদ্মশ্রী ১৯৫৫ সালে। তারপর পেয়েছেন পদ্মভূষণ, পদ্মবিভূষণও পেয়েছেন।
জন্ম তাঁর ভারতের মহারাষ্ট্রে। সেই মহারাষ্ট্রের মুম্বাইতে সিনেমার বিশাল বিশাল ছবি অাঁকার মধ্য দিয়ে তাঁর কর্মজীবন শুরম্ন। সিনেমার ব্যানার বা পোস্টার ইত্যাদি অাঁকার মাধ্যমে বাসত্মব শিল্পী জীবনের সূচনা তাঁর। পাশাপাশি চলে নিজের ছবি অাঁকা। ১৯৫২ সালে তাঁর প্রথম একক চিত্র প্রদর্শনী হয় সুইজারল্যান্ডে। সেই থেকে তিনি পান আনত্মর্জাতিক খ্যাতি।
চলচ্চিত্রের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন শিল্পী হুসেন। মাধুরী দীৰিতকে নায়িকা করে তিনি তৈরি করেন একটি চলচ্চিত্র। তার নাম 'গজগামিনী।' এরপর আরেকটি চিত্র নির্মাণ করেন টাবুকে নিয়ে। প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাণে হাত দেন ১৯৬৭ সালে। তাঁর প্রথম ছবি 'থ্রম্ন দ্য আইজ অব এ পেইন্টার।' ছবিটি বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয় এবং সেখানে 'গোল্ডেন বিয়ার'-এ সম্মানিত হয়।
ভারতজুড়ে খ্যাতিমান শিল্পী হুসেন হিন্দুদের দেবী সরস্বতীর একটা ছবি অাঁকায় হিন্দু উগ্রবাদী কট্টরপন্থীদের রোষানলে পড়েন। তাঁর বাড়িতে উগ্রপন্থী একদল লোক হামলা চালিয়ে তাঁর অনেক ছবি নষ্ট করে দেয়। তাঁরা তাঁকে হত্যার হুমকিও দেয়। উগ্রপন্থীরা এই মহান শিল্পীর অাঁকা ঐ ছবির ব্যাপারে নগ্নতার অভিযোগ তোলে।
শিল্পী হুসেন ২০১০ সালে স্বেচ্ছানির্বাসনে চলে যান কাতারের নাগরিকত্ব নিয়ে। তিনি বাস করতে থাকেন লন্ডনে। সেখানেই তাঁর জীবনাবসান ঘটে। ভারতের এই বিখ্যাত শিল্পী ছিলেন সে দেশের কোটি কোটি মানুষের প্রিয় শিল্পী, ভারত সরকারও তাঁকে দিয়েছে উচ্চতর সব সম্মান ও মর্যাদা। অথচ ধর্মান্ধ মৌলবাদী উগ্র সাম্প্রদায়িক হিন্দুদের একটি গ্রম্নপ তাঁর বিরম্নদ্ধাচরণ করে অসম্মান করে তাঁকে। শিল্পী হুসেন বেঁচে থাকবেন তাঁর দেশ ভারতের শিল্পকলার ইতিহাসে। বেঁচে থাকবেন বিশ্বের আধুনিক চিত্রকলার ইতিহাসেও।
লেখক শিল্পীদের জন্ম হয় কোন না কোন দেশে। কিন্তু তাঁরা কোন একটি দেশের সম্পদ নন। তাঁদের কাজ বিশ্বের সকল দেশের সকল মানুষের। সাহিত্যই হোক চিত্রকলাই হোক এবং যে কোন দেশেই সেগুলো রচিত বা অঙ্কিত হোক, সেগুলো বিশ্ব শিল্প ভুবনের অংশ। শিল্পীদের তাই নিজস্ব দেশ থাকলেও তাঁরা সব ধরনের গ-ির উর্ধে, সকল দেশের তাঁরা। শিল্পী কিবরিয়া যেমন আমাদের তেমনি সবার, শিল্পী হুসেন যেমন ভারতের, তেমনি তিনি আমাদেরও। এই দুই শিল্পীর মৃতু্য তাই শুধু বাংলাদেশ ও ভারতেরই ৰতি নয়, ক্ষতি বিশ্ব শিল্প ভুবনেরও।
এই দুই মহান শিল্পীর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা।

বাজেটের পর বাজার

দ্রব্যমূল্য নিয়ে প্রতিদিনই সংবাদমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের খবর প্রকাশিত হয়। সর্বশেষ খবরটি হচ্ছে 'বাজেট ঘোষণার পর আরেক দফা বেড়েছে জিনিসপত্রের দাম।' ভুক্তভোগীদের কাছে এ খবর সঙ্গত কারণেই অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এমনিতেই উচ্চ দ্রব্যমূল্যের যাঁতাকলে পড়ে লোকজনের ভোগানত্মি বেড়েছে তার ওপর বিভিন্ন ছল ছুঁতোয় যদি জিনিসপত্রের দাম বাড়তেই থাকে তাহলে তারা যাবে কোথায়? বাজেট এলেই একটি প্রবণতা দেখা যায় কোন কোন ব্যবসায়ীর মধ্যে।

বাজেটের আগে ও পরে দুই দফায় জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দেয় তারা। বাজেটে দাম কমুক বা বাড়ুক সেদিকে কোন ভ্রূৰেপ নেই। সবচেয়ে দুঃখজনক হচ্ছে বাজেটে দাম বাড়েনি এমন পণ্যের দামও বাড়িয়ে দেয় ব্যবসায়ীরা এবং তা বাজেটের উছিলায়। বাজেটে কোন জিনিসের দাম বাড়লে তাৎৰণিকভাবে তা বাড়িয়ে দেয়া হয় কিন্তু কমলে সেটি কার্যকর হয় অত্যন্ত ধীর গতিতে।
ঘোষিত বাজেটে ভোজ্যতেলের দামের ওপর কোন কর বাড়ানো না হলেও বাজেট ঘোষণার পর পরই দুই থেকে পাঁচ টাকা লিটারপ্রতি দাম বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যেই বাজারে ভোজ্যতেলের সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে সিন্ডিকেট চক্র। ফলে দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এমনিতেই এ বছর দফায় দফায় ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। এমনকি মাত্র এক সপ্তাহ আগেও কোম্পানিগুলো সব ধরনের সয়াবিন তেলের দাম বাড়িয়েছে। কিন্তু এক সপ্তাহ না যেতেই বাজেট ঘোষণার পর আবারও তেলের দাম বাড়ানো হয়। এক লিটারের সয়াবিনের বোতল ১১৬ টাকার স্থলে ১২০ টাকা এবং দুই লিটার ২৩৪ টাকার স্থলে ২৪০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। কোম্পানি ভেদে দামের তারতম্য রয়েছে। সে ৰেত্রে দাম আরও বাড়িয়ে দেয়া হয়।
এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় ২০১০ জুলাই থেকে ২০১১-এর ২৫ মে পর্যন্ত পরিশোধিত ও অপরিশোধিত ভোজ্যতেল আমদানি হয়েছে ১০ লাখ ৫২ হাজার ৫১৮ মেট্রিক টন। যা চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট। অথচ ব্যবসায়ীরা বলছেন সরবরাহ কমে যাওয়ার কথা।
ব্যবসায়ীরা যখন এই ধরনের দাবি তুলছেন তখন আনত্মর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমে আসছে। কিন্তু স্থানীয় বাজারে উল্টো তেলের দাম বাড়ছে। দেখা যায়, আন্তর্জাতিক বাজারে কোন জিনিসের দাম বাড়লে সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় বাজারেও তা বাড়িয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু দাম কমলে তার প্রভাব পড়তে অনেক সময় লাগে।
ব্যবসায়ীদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দ্রব্যমূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখান আহ্বান জানিয়েছেন। ব্যবসায়ীরাও প্রধানমন্ত্রীকে এ ব্যাপারে আশ্বস্ত করেছেন। বিশেষ করে আসন্ন রমজানে যাতে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল থাকে সেটি নিশ্চিত করার কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। ব্যবসায়ীরা এ ব্যাপারে আশ্বাস দিয়েছেন ঠিকই কিন্তু বাজারে তো এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। তাহলে বাজেট ঘোষণার পরপরই জিনিসপত্রের দাম বাড়ল কেন? আনত্মর্জাতিক বাজারে যেখানে ভোজ্যতেলের দাম কমছে সেখানে স্থানীয় বাজারে ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। এটা তো সদিচ্ছার লৰণ নয়। এখন থেকেই দ্রব্যমূল্যের পাগলা ঘোড়াকে টেনে ধরতে না পারলে রমজানে কি তাকে বাগে আনা যাবে?
মানুষজন বিশ্বাস করতে চায় দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীকে দেয়া ব্যবসায়ীদের আশ্বাস কেবল কথার কথা নয়, এজন্য বাজারে এর প্রতিফলন দেখতে চান ভুক্তভোগীরা।

সমঝোতার মাধ্যমে নির্বাচন

বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের বিদায়ী রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টি সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন, 'সরকার ও বিরোধী দলকে সমঝোতার মধ্য দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতির বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজে বের করতে হবে।' তাঁর কথার মধ্য দিয়ে সমকালীন গণতান্ত্রিক বিশ্বের বাস্তবতাই প্রতিফলিত হয়েছে। কারণ প্রতিবেশী ভারতসহ পৃথিবীর অনেক দেশে নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

সরকারের পাশাপাশি বিরোধী দলগুলোর উচিত নির্বাচন কমিশনকে আরও স্বাধীন ও শক্তিশালী করার লৰ্যে ভূমিকা রাখা। বিএনপি দ্রব্যমূল্যের উর্ধগতি, গ্যাস, পানি ও বিদু্যতের সঙ্কটসহ অন্য যেসব সমস্যা সমাধানের দাবি জানিয়েছে তা মূলত জাতীয় সমস্যা। এসব সমস্যা সমাধানের জন্য জাতীয় ভিত্তিতে উদ্যোগ নিতে হবে। হরতালের মাধ্যমে এসব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী রবিবার সকাল ছয়টা থেকে সোমবার সন্ধ্যা ছয়টা পর্যনত্ম ৩৬ ঘণ্টা একটানা হরতাল আহ্বান করেছে। দল দুটির নেতৃবৃন্দ বলেছেন, জোটগতভাবে নয়; তাঁরা যুগপৎ আন্দোলনের অংশ হিসেবে নিজ নিজ অবস্থানে থেকে হরতাল পালন করছেন। তারা মূলত সরকারের তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিলের সিদ্ধানত্মের প্রতিবাদে এবং সেই সঙ্গে অন্য বেশ কয়েকটি দাবিতে এ হরতাল ডেকেছেন। উলেস্নখ্য, বিএনপি ৰমতায় থাকাকালে সর্বদা হরতালের বিরোধিতা করে। সম্প্রতি বর্তমান সরকারের দ্বিতীয় বাজেট উপস্থাপিত হয়েছে। সমাজের সর্বসত্মরে বাজেট নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। ঠিক এমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিস্থিতিতে দেশব্যাপী হরতাল আহ্বানের কোন যৌক্তিকতা আছে কি? দেশের ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ ও দায়িত্বশীল নাগরিক ইতোমধ্যে এ হরতালের নিন্দা করেছেন। তারা বলেছেন, এর ফলে দেশের অর্থনৈতিক কর্মতৎপরতা মারাত্মকভাবে বিঘি্নত হবে। অফিস, আদালত, কল-কারখানায় স্বাভাবিক কাজকর্ম বাধাগ্রসত্ম হওয়ায় দেশের সাধারণ মানুষ দুর্ভোগের স্বীকার হবেন।
যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে মতবিরোধের সৃষ্টি হয়েছে; আলাপ আলোচনার মাধ্যমে তার সহজ সমাধান সম্ভব ছিল। ৩৬ ঘণ্টার হরতাল আহ্বান করে দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে বিপর্যসত্ম করে লাভ করোরই হবে না; বরং সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
তাই স্বভাবতই প্রশ্ন উঠেছে, ৩৬ ঘণ্টার হরতাল আহ্বানের আসল উদ্দেশ্য কি? এতে কার লাভ? এ ধরনের হরতালে জাতীয় অর্থনীতি আরও বেশি বিপর্যস্ত হবে।
 
Support : Dhumketo ধূমকেতু | NewsCtg.Com | KUTUBDIA @ কুতুবদিয়া | eBlog
Copyright © 2013. News 2 Blog 24 - All Rights Reserved
Template Created by Nejam Kutubi Published by Darianagar Publications
Proudly powered by Dhumketo ধূমকেতু