লিচু চাষ করে গাড়ি বাড়ির মালিক

Monday, June 13, 2011

মেধা, শ্রম আর কাজের প্রতি আন্তরিকতা থাকলে যে কোন কাজেই সফল হওয়া যায়। সেটা প্রমাণ করেছেন ঝিনাইদহ কালীগঞ্জের এক সময়ের দিনমজুর আবুল হোসেন। তিনি আজ থেকে ১৮ বছর আগে দিনমজুরের কাজ শেষে বিকেলে নানা রকম মৌসুমি ফল কিনে কালীগঞ্জ শহরের রাস্তার পাশে বসে বিক্রি করতেন। তখন থেকে তার আশা ছিল জীবনে সুযোগ পেলে নিজে একটা লিচুর বাগান করবেন।

তিনি করেছেনও তাই। আবুল হোসেন প্রথমে অন্যের ও পরে নিজের জমিতে ১৮ বছর ধরে লিচু চাষ করে অভাবনীয় সফলতা অর্জন করে এখন হয়েছেন গাড়ি-বাড়ির মালিক। তার অতীতের অভাব অনটনের দিনগুলোর কথা বলতে গিয়ে ৫০ ঊর্ধ্ব বয়সী আবুল হোসেন জানান, ৫ ভাইবোনের অভাবের সংসারে তিনি সবার বড়। তাই অনেক অল্প বয়সেই তার ওপর সংসারের ভার এসে পড়ে। তাছাড়া ভূমিহীন বাবার পরিবারে অর্থ সংকটের কারণে কোন দিন স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। দরিদ্র পরিবারের মা-বাবাসহ ভাইবোনদের মুখে হাসি ফোটানোর মহাদায়িত্ব কাঁধে নিয়ে দিনের পর দিন তিনি পরের জমিতে কামলার কাজ করে সংসারের খরচ জুগিয়েছেন। সঙ্গে সঙ্গে বিকেলে আশপাশের গ্রাম থেকে লিচুসহ বিভিন্ন ধরনের মৌসুমি ফল কিনে কালীগঞ্জ শহরে রাস্তার পাশে বসে বিক্রি করতেন। এ ব্যবসায় ভালো লাভ পেয়ে দিনমজুরি ছেড়ে শুধু ফলের ব্যবসা করার চিন্তা মাথায় আসে তার। অল্পদিনের মধ্যে মায়ের একটি ছাগল বিক্রি করে কিছু পুঁজি জোগাড় করেন তিনি। উপজেলার ষাইটবাড়িয়া, মথনপুর, সাতগাছিয়া, অনুপমপুরসহ প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ঝুড়িভর্তি লিচু কিনে মাথায় করে কালীগঞ্জ শহরে হাটচাঁদনির পাশে রাস্তায় বসে বিক্রি করতেন। সঙ্গে সঙ্গে নিজের কোন জায়গা জমি না থাকলেও সবসময় ভাবতেন কিভাবে নিজে একটি লিচু বাগানের মালিক হবেন। প্রায় ৪-৫ বছর এভাবে ব্যবসা করে কিছু টাকার জোগাড় করে তার গ্রামের আবদুল লতিফের কাছ থেকে মোট ১৩ হাজার টাকা দিয়ে ১ একর ৩৭ শতক জমি বন্ধক রাখেন। পরে ২ বছর এ জমিতে অন্য ফসলের চাষ করে কিছু আয় করেন এবং ব্যবসা থেকে রোজগারের টাকা দিয়ে ১৯৯২ সালে ৭০ হাজার টাকা দিয়ে ওই জমিটিই কিনে নেন। এরপর ১৯৯৩ সালে জমিটিতে মোট ৯৯টি লিচুর চারা রোপণ করেন। ২ বছর পরই তার বাগানে লিচু ধরা শুরু হয়। ১৯৯৫ সালে তিনি চারা গাছ থেকেই খরচ বাদে ১১ হাজার টাকার লিচু বিক্রি করেন। পরের বছর ১৯৯৬ সালে লিচু বাগান থেকে লাভ আসে ১ লাখ ৩৬ হাজার টাকা। ১৯৯৭ সালে খরচ বাদে লাভ পান ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। এভাবে প্রতিবছর ক্রমে বাড়তে থাকে তার লাভের পরিমাণ। লিচু চাষের পাশাপাশি লাভের টাকা দিয়ে বড় ছেলে বাবুল আক্তারকে সঙ্গে নিয়ে কালীগঞ্জ শহরে কাঁচাবাজারে শুরু করেন আড়তদারি ব্যবসা। আবার প্রতিবছর লিচু বাগান থেকে আসতে থাকে বাড়তি টাকা। তিনি গত বছরেও প্রায় ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকার লিচু বিক্রি করেছিলেন। এ বছর ইতোমধ্যে ১ লাখ ৯৫ হাজার টাকার লিচু বিক্রি করেছেন। গাছে এখনো তার অনুমান মতে প্রায় ৩ লাখ টাকার লিচু আছে। মাত্র ১৮ বছরের ব্যবধানে তিনি মাঠে ৯ বিঘা জমি, ২টি ট্রাক ও একটি সুন্দর বাড়ি করেছেন।
লিচু চাষে সফলতা অর্জনকারী আবুল হোসেন জানান, তিনি নতুন করে আরও ৩৭ শতক জমিতে লিচুর চারা এবং ৫১ শতক জমিতে আমের চারা রোপণ করেছেন।
লিচু চাষ সম্পর্কে কালীগঞ্জ কৃষি কর্মকর্তা আলীমুজ্জামান জানান, এ উপজেলায় যোগদানের পর লিচু চাষ করে সফলতা অর্জনকারী আবুল হোসেনের গল্প তিনি শুনেছেন। তিনি দিনমজুর থেকে লিচু চাষ করে এখন হয়েছেন গাড়ি-বাড়ির মালিক। লাভজনক লিচু চাষের মাধ্যমে তার সফলতা দেখে অনেকে এখন ঝুঁকে পড়ছেন এ চাষে।

বিদ্যুৎ মেলে না, কম ডিজেলের জোগান, বিপাকে বোরো চাষিরা

Friday, February 11, 2011

'প্রতিদিন হামার ২০০ ট্যাকা করে বেশি খরচ করা লাগিচ্ছে। এডা পোষামু কেংকা করে, জানি না।' বাড়তি দর দিয়ে ডিজেল কিনে এভাবেই ক্ষোভ আর আশঙ্কার কথা বলছিলেন মির্জাপুরের সাদুবাড়ী গ্রামের কৃষক শহিদুল ইসলাম। দেশে ৫৮ শতাংশ ধানের চাহিদা পূরণ করে বোরো।

তবে এবার বোরো চাষের ভরা মৌসুমে বিদ্যুৎ অপ্রতুল। ডিজেলের সরবরাহও চাহিদার অর্ধেক। ফলে কৃষকরা সেচের পানির জন্য হিমশিম খাচ্ছেন। বোরো ধানে সেচ দিতে রাত ১১টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সংযোগ এবং সর্বত্র ডিজেল প্রাপ্তির নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসকদের ১ জানুয়ারি নির্দেশনা দিয়েছিল বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়। তবে বিদ্যুৎ সরবরাহ কম হওয়ায় তার বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না। এদিকে ৪৪ টাকার ডিজেলও কিনতে হচ্ছে ৬০ টাকায়। এ জন্য কৃষকরা দায়ী করছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীদের।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈরী আবহাওয়ায় আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে বৃষ্টি। নেমে গেছে পানির স্তর। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বিদ্যুৎ ও ডিজেল ঘাটতি। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বোরো চাষ মৌসুমে সেচ যাতে নির্বিঘ্ন হয়, তা নিশ্চিত করা আবশ্যক।
টেলিফোনে যোগাযোগ করা হলে কৃষিসচিব সি কিউ কে মুসতাক আহমেদ গত বৃহস্পতিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ফসলের চাষ ও উৎপাদন বাড়াতে সরকার সব ধরনের পদক্ষেপই নিয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে বিদ্যুৎ ও ডিজেল সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ডিজেল সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি প্রসঙ্গে সচিব বলেন, 'চোরাচালানের ভয়ে ডিজেলের সরবরাহে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কিছুটা ঘাটতি দিয়েছিল। তবে তা আর এখন থাকবে না। অন্যান্য সমস্যাও দ্রুত কেটে যাবে।' তিনি আরো বলেন, দাম ভালো পাওয়ায় কৃষক এবার ধান চাষে বেশি করে আগ্রহী হয়েছে।
বিদ্যুৎ সরবরাহের সার্বিক পরিস্থিতি জানতে চাইলে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে জানান, সেচে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে ২৬ ডিসেম্বর আন্তমন্ত্রণালয়ের বৈঠক হয়। এতে সেচের জন্য প্রতিদিন এক হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের সরবরাহ চাওয়া হয়। ওই বৈঠকে বিদ্যুৎ বোর্ড এক হাজার ৩৬৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু উৎপাদন কম হওয়ায় এখন প্রতিদিন সরবরাহ দিচ্ছে এক হাজার মেগাওয়াট।
ডিজেল আছে অর্ধেক : বোরো ধানে সেচের আনুমানিক ৭৫ শতাংশই পূরণ করে ডিজেলচালিত পাম্প। কিন্তু চলতি বছর এ ডিজেলের সরবরাহ কমে চাহিদার অর্ধেকে নেমেছে। তীব্র চাহিদার সুযোগ নিয়ে একশ্রেণীর ব্যবসায়ী মাঠ পর্যায়ের কৃষকদের কাছ থেকে সরকার নির্ধারিত ৪৪ টাকা লিটারের পরিবর্তে ৬০ টাকা আদায় করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বগুড়ার দুপচাঁচিয়ার কৃষক আবুল সরকার ও শেরপুরের বিশালপুর ইউনিয়নের দোয়ালসারা গ্রামের এনামুল হক টেলিফোনে কালের কণ্ঠকে জানান, ৪৪ টাকার ডিজেল তাঁদের কিনতে হচ্ছে ৫৮ থেকে ৬২ টাকায়। তাও সংগ্রহ করতে হচ্ছে তিন থেকে চার মাইল দূরের খোলা দোকান থেকে। ১০-১৫ দিন ধরে চলছে এ অবস্থা।
রাজশাহী বিভাগীয় পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের অভিযোগ, ডিপো থেকে পর্যাপ্ত তেল তাদের দেওয়া না হলেও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা ঠিকই সরবরাহ নিচ্ছে। পরে তারা লিটারপ্রতি ৮-১০ টাকা বেশি দামে খুচরা বিক্রি করছে। এতে করে উত্তরাঞ্চলের সাড়ে চার শ তেলের পাম্পে সংকট সৃষ্টি হয়েছে।
রাজশাহী বিভাগীয় পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এম এ মোমিন দুলাল অভিযোগ করেন, টাকা দিলেও চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ মিলছে অর্ধেক। তিনি জানান, উত্তরাঞ্চলে স্বাভাবিক সময়ে ডিজেলের চাহিদা দৈনিক ২২ লাখ ৫০ হাজার লিটার। এখন চাহিদা এর প্রায় দ্বিগুণ।
পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় মহাসচিব মিজানুর রহমান রতন জানান, বোরোর ভরা মৌসুমে সারা দেশের ডিজেলের মোট চাহিদার অর্ধেকেরও বেশি প্রয়োজন হয় উত্তরাঞ্চলে। অথচ এখন সরবরাহ কম বলে পাম্প মালিকদের চাহিদার অর্ধেক তেলও দেওয়া হচ্ছে না।
এদিকে বিপিসির বাঘাবাড়ী অয়েল ডিপো সূত্র জানায়, প্রায় ৬১ লাখ লিটার জ্বালানি তেল নিয়ে নদীতে (নাব্যতা সংকটের কারণে) আটকে আছে ১৭টি শ্যালো ড্রাফট ট্যাংকার।
উত্তরাঞ্চলীয় জ্বালানি তেল মনিটরিং সেলের এজিএম শাহীন রেজা খান কালের কণ্ঠকে গতকাল জানান, 'প্রতিদিনের চাহিদার বিপরীতে ৯০ শতাংশ বিতরণ করা হচ্ছে। তবে চাহিদার পুরোটা সরবরাহ করা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠছে।' তিনি কৃষক ও পাম্প অ্যাসোসিয়েশনের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, 'ডিপোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের যোগসাজশ কিংবা সম্পর্ক নেই। কেউ বেশি দামও আদায় করছে না। আর সব সমস্যারই দ্রুত সমাধান হবে।'
ডিজেলের দাম অস্বাভাবিক বাড়া সম্পর্কে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) পরিচালক (বিপণন) মুহাম্মাদ নূরুল আমিন কালের কণ্ঠকে বলেন, দেশে ডিজেলনির্ভর শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠায় ডিজেলের চাহিদা বেড়েছে। এ ছাড়া পার্শ্ববর্তী দেশের তুলনায় দাম কম হওয়ায় হয়তো পাচারও হচ্ছে। তিনি জানান, গত বছরের জানুয়ারি মাসে দেশে দুই লাখ ৫১ হাজার টন ডিজেল বিক্রি হলেও এবার (জানুয়ারি মাসে) হয়েছে প্রায় চার লাখ ২০ হাজার টন। অতিরিক্ত দাম আদায়ের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ঘাটতির সুযোগে এটা হয়ে থাকতে পারে। নূরুল আমিন দাবি করেন, জ্বালানি সরবরাহ বাড়াতে নির্দিষ্ট পরিমাণ ইঞ্জিন ও ওয়াগন দিতে ব্যর্থ হচ্ছে রেলওয়ে।
সেচকাজে ব্যবহৃত পাম্পের জন্য বোরো মৌসুমে ডিজেলের চাহিদা ধরা হয় ১৩ লাখ ৪৭ হাজার টন। আর ডিজেলের সরবরাহ ও বিতরণে সংকট সৃষ্টি হওয়ায় বিপিসির চেয়ারম্যানকে গত বুধবার সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
পানির জন্য নির্ঘুম প্রতীক্ষা : ডিসেম্বর থেকেই দেশজুড়ে শুরু হয়েছে বোরোর চাষ। শীত মৌসুম এখনো থাকলেও চলছে বিদ্যুৎ সংকট। সেচের চাহিদার ২৫ শতাংশ পূরণ করে বিদ্যুৎ। সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি না হলে গ্রীষ্মে বিদ্যুৎ সংকট প্রকট হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন কৃষি বিশেষজ্ঞ ও কৃষকরা।
জাতীয় বীজ বোর্ডের সদস্য ও কৃষক প্রতিনিধি যশোরের আলতাব হোসেন গত বৃহস্পতিবার টেলিফোনে কালের কণ্ঠকে বলেন, বোরো চাষের শুরুতেই চলছে বিদ্যুৎ সংকট। সেচের এ ভরা মৌসুমে প্রতিদিনই লোডশেডিং হচ্ছে। তিনি জানান, পানির অভাবে অনেক জমি এখনো চাষের আওতায় আসেনি।
নওগাঁর মান্দা উপজেলার ছোটমুল্লুক গ্রামের কৃষক ও বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের গভীর নলকূপের ম্যানেজার সাইফুদ্দিন প্রামাণিক বলেন, '২৪ ঘণ্টায় ৯ থেকে ১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যায়। এদিকে সেচের অভাবে এ নলকূপের আওতায় থাকা ২৪৪ বিঘা জমির মধ্যে প্রায় ১০০ বিঘা জমি এখনো চাষ করা যায়নি।' তিনি জানান, রাত জেগে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও সেচের পানি মিলছে না। এতে কৃষক ক্ষুব্ধ হচ্ছেন। তবে এবার ধানের দাম ভালো পাওয়ায় বিদ্যুৎ সংযোগের গভীর নলকূপের এলাকায় ব্যক্তিমালিকানাধীন এক ডজনেরও বেশি অগভীর নলকূপ অব্যাহতভাবে সেচের কাজ করছে।
ধুনট উপজেলার কৃষক আকবর মোল্লা টেলিফোনে জানান, 'লোডশেডিংয়ের কারণে গত বোরো মৌসুমে দুবার পানির পাম্পের মোটর নষ্ট হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। এবার মৌসুমের শুরুতেই দেখা দিয়েছে তীব্র বিদ্যুৎ সংকট। দিনরাতে ১৪-১৫ বার শোডশেডিং হচ্ছে। ফলে পানির জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুতের আশায় বসে থাকতে হচ্ছে।'
বরিশালের মুলাদির কৃষক মোশারফ হোসেন জানান, সাত দিন রাত জেগে তিনি তাঁর বোরো জমির মাত্র এক-তৃতীয়াংশে সেচ দিতে পেরেছেন। তিনি বলেন, দিনে দু-এক ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ থাকে না।
বরিশাল ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কম্পানির (ওজোপাডিকো) নিয়ন্ত্রণ কক্ষের হিসাবে, বরিশাল সিটি করপোরেশন, সদর উপজেলা, মুলাদি, মেহেন্দীগঞ্জ, বাবুগঞ্জ, বাকেরগঞ্জ, স্বরূপকাঠি, নলছিটি ও ঝালকাঠি সদর উপজেলায় বিদ্যুতের গড় চাহিদা দিনে ৪২ এবং রাতে ৬০ মেগাওয়াট। অথচ গত ৪ ফেব্রুয়ারি বরাদ্দ মেলে দিনে ৩০ এবং রাতে ৩২ মেগাওয়াট। তাঁরা জানান, গত বছর শুধু সেচের জন্য দুই মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বরাদ্দ করেছিল সরকার। এ বছর তাও নেই।
কৃষি অধিদপ্তর বরিশাল অঞ্চলের সহকারী পরিচালক মো. শাহ্ আলম কালের কণ্ঠকে জানান, এবার বরিশাল কৃষি অঞ্চলের ১১ জেলার ৩৫ লাখ এক হাজার ৪৬৬ হেক্টর জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এরই মধ্যে ২২ লাখ তিন হাজার ১১৪ হেক্টরে চাষ শেষ হয়েছে, যার শতকরা হারে ৬৩ দশমিক ৪৮ শতাংশ। দ্রুতই অবশিষ্ট জমি চাষ হয়ে যাবে।
বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) চেয়ারম্যান নূরুল ইসলাম ঠাণ্ডু কালের কণ্ঠকে বলেন, বর্তমানে বিএমডিএর ১২ হাজার ৬৯৭টি পাম্পের দৈনিক চাহিদা ৫৫০ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ মিলছে ৩৩০ থেকে ৩৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। তবে ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে মার্চ মাসে বিদ্যুৎ বিভ্রাট যাতে না হয়, সে ব্যবস্থা নিতে কৃষি মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
পিডিবি বগুড়ার নির্বাহী প্রকৌশলী ইস্কেন্দার আরিফ বলেন, বগুড়ায় বিদ্যুতের চাহিদা প্রতিদিন ১০৮ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ গড়ে মাত্র ৫২ মেগাওয়াট।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, এবারের বোরো মৌসুমে ৪৭ লাখ ৫০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ছয় লাখ ৫০ হেক্টরে হাইব্রিড, ৫০ হাজার হেক্টরে স্থানীয় জাত এবং অবশিষ্ট ৪০ লাখ ৫০ হাজার হেক্টরে দেশি উচ্চ ফলনশীল (উফশী) জাতের ধান চাষ হচ্ছে। তবে উৎপাদন চিত্র নিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান হিসাবের গরমিল করার কারণে এবারই প্রথমবারের মতো উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়নি।
পানির স্তর নামছেই : তিন বছর ধরে ক্রমেই বৃষ্টি কমছে। ফলে পানির স্তর নেমে যাচ্ছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সাম্প্রতিক করা গবেষণা তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে অধ্যাপক ড. গোলাম সাবি্বর সাত্তার তাপু বলেন, বৃষ্টির অভাবে উত্তরাঞ্চলে ভূমির আর্দ্রতা আশঙ্কাজনক হারে কমছে। পাউবোর সাবেক প্রকৌশলী তাজুল ইসলাম বলেন, ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে সংশ্লিষ্ট নদ-নদীগুলো বেশির ভাগ সময় শুষ্ক থাকছে। তিনি জানান, উত্তরাঞ্চলের বরেন্দ্রভূমিতে ১৯৯১ সালে পানির স্তর ছিল ভূগর্ভের ৬২ ফুটের মধ্যে। ২০০০ সালে তা ১১০ ফুটে নেমে যায়। এখন এ স্তর স্থানভেদে ১২০ থেকে ১৪০ ফুটের মধ্যে। বিষয়টি আতঙ্কজনক।

ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার খসড়া নিয়ে জাতীয় সংলাপ শুরু

Thursday, January 20, 2011

ষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন আলোচকরা। তাঁরা খাদ্যের আপদকালীন মজুদের পরিমাণ ১৫ লাখ টন থেকে বাড়িয়ে ২২ লাখ টন করা দরকার বলে মত দিয়েছেন। খাদ্য মজুদ বাড়াতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক গুদাম তৈরির পরামর্শ দিয়েছেন।

গতকাল শেরেবাংলা নগরের পরিকল্পনা কমিশনের এনইসি সম্মেলন কক্ষে ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (২০১১-১৫) দলিলের খসড়া নিয়ে জাতীয় সংলাপে অংশ নিয়ে বক্তারা খাদ্যের মজুদ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে আরো বলেন, 'উন্নত কৃষিবীজ উদ্ভাবন, কৃষি বিপণন, শস্যবীমা, সমন্বিত বালাই দমন ব্যবস্থাপনাকে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় গুরুত্বসহকারে তুলে ধরতে হবে।'
সভায় খাতভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রা ধরে তা বাস্তবায়ন কর্মসূচি গ্রহণের ওপর আলোচকরা গুরুত্ব দেন। তাঁরা লবণাক্ততা, খরা, বন্যা ও শীত সহিষ্ণু বিভিন্ন ফসলের জাত উদ্ভাবনের জন্য প্রয়োজনীয় গবেষণা পরিচালনার দিকনির্দেশনা রাখার মত দেন।
সংলাপে সভাপতির বক্তব্যে পরিকল্পনামন্ত্রী এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এ কে খন্দকার বলেন, 'ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাকে আরো বাস্তবায়নমুখী করতে বিশেষজ্ঞপর্যায়ে এ জাতীয় সংলাপের আয়োজন করা হয়েছে। আগামী মার্চের মধ্যে পাঁচ বছরের এ পরিকল্পনার চূড়ান্ত দলিল প্রণয়ন করা সম্ভব হবে।'
জাতীয় সংলাপে আলোচকরা জলবায়ু পরিবর্তন ও পানি ব্যবস্থাপনার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁরা জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, ভূমির ব্যবহার, নদী খনন, জলাশয় সংরক্ষণ, মৎস্যজীবী নিবন্ধন, সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকা ও চরাঞ্চলের জমির যথাযথ উন্নয়ন ও ব্যবহার, উন্নত পশু-পাখির জাত উদ্ভাবনের বিষয়গুলো গুরুত্বসহকারে পরিকল্পনায় তুলে ধরার পক্ষে মত দিয়েছেন। জাতীয় সংলাপে কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী, খাদ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক, পানিসম্পদ মন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন, ভূমিমন্ত্রী রেজাউল করিম হীরা, প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী আবদুল লতিফ বিশ্বাস বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। সংলাপে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সচিব, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, অর্থনীতিবিদ, বিশেষজ্ঞ ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

ভরা মৌসুমেও লবণের অর্ধেক মাঠ খালি

বণ উৎপাদনের মৌসুম শুরুর পর দেড় মাস পেরিয়ে গেছে। তবে লবণচাষিদের বেশির ভাগই এখনো হাত গুটিয়ে রয়েছে। অথচ প্রতিবছরই এই মৌসুমটা চাষিদের চরম ব্যস্ততায় কাটে। এ বছর এই ভিন্ন চিত্রের কারণ লবণের অতি নিম্নদাম।

চলতি মৌসুমে এ পর্যন্ত শুধ কুতুবদিয়া দ্বীপে দুই হাজার ২৪০ মেট্রিক টন লবণ উৎপাদিত হয়েছে। অথচ গত বছর এ সময় পর্যন্ত লবণ উৎপাদনের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪০ হাজার মেট্রিক টন।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুঠির শিল্প সংস্থা (বিসিক) ও চাষিদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, এ বছর মাঠপর্যায়ে প্রতি মণ কালো লবণ ৬০ টাকায় এবং সাদা লবণ ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ চাষিদের কালো লবণের ক্ষেত্রে মণপ্রতি চাষিদের ৯০ থেকে ১০০ টাকা এবং সাদা লবণের ক্ষেত্রে ১২০ থেকে ১২৫ টাকা খরচ পড়ে। লবণের দাম উৎপাদন খরচের চেয়েও অস্বাভাবিক কম হওয়ায় উৎপাদনকারীরা মাঠে নামছে না। তারা জানায়, জমি লাগিয়তসহ অন্য উৎপাদন খরচ মিটিয়ে উৎপাদনকারীরা কিছুতেই এবার পুষিয়ে উঠতে পারবে না।
গত মৌসুমে উৎপাদিত লবণ কিনে যারা মাঠে মজুদ করেছিল, এবার তাদের বিপুল অঙ্কের টাকা গচ্চা দিতে হচ্ছে। উৎপাদন খরচের তুলনায় মণপ্রতি লবণের বাজারে দাম অন্তত ৪০ টাকা কম। বাংলাদেশ লবণ উৎপাদনকারী সমিতির সাধারণ সম্পাদক কায়সার ইদ্রিস কালের কণ্ঠকে বলেন, 'প্রতিবছরের ডিসেম্বরে কঙ্বাজারের উপকূলীয় মাঠে লবণের উৎপাদন শুরু হয়। এবার উৎপাদিত লবণ নিয়ে অনিশ্চয়তার আশঙ্কায় চাষিরা মাঠে নামছে না। এবার দাম সর্বনিম্ন হওয়ায় চাষিরা হতাশ।'
কঙ্বাজারে বিসিকের লবণ প্রকল্প থেকে পাওয়া তথ্যমতে, কঙ্বাজারের কুতুবদিয়া দ্বীপ, মহেশখালী, পেকুয়া, চকরিয়া, কঙ্বাজার সদর, টেকনাফ ও চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার কিয়দংশসহ প্রায় ৭০ হাজার একর ব্যক্তিগত মালিকানাধীন জমি লবণ উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়। বিসিকের কঙ্বাজারে বিসিকের লবণ প্রকল্পে ভারপ্রাপ্ত জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) আবদুল বাসেত কালের কণ্ঠকে জানান, চলতি মৌসুমে এ পর্যন্ত শুধ কুতুবদিয়া দ্বীপে দুই হাজার ২৪০ মেট্রিক টন লবণ উৎপাদিত হয়েছে। কুতুবদিয়া দ্বীপ ছাড়া জেলার অন্যান্য স্থানে এখন পর্যন্ত উৎপাদন শুরুই হয়নি। অথচ গত বছর এ সময় পর্যন্ত লবণ উৎপাদনের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪০ হাজার মেট্রিক টন। গত মৌসুমে ৭০ হাজার একর জমিতে সরকারের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৩ লাখ ৭০ হাজার মেট্রিক টন লবণ। আর সে সময় উৎপাদন ১৭ লাখ মেট্রিক টনে পেঁৗছেছিল। বিসিকের তথ্যানুযায়ী, দেশে বার্ষিক ১৩ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন লবণের চাহিদা রয়েছে। এবার বিসিক ১৩ লাখ ৭০ হাজার মেট্রিক টন লবণের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। কিন্তু লবণের নায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত না হওয়ায় উৎপাদনকারীরা মাঠে না নামায় এবার অর্ধেকেরও বেশি পরিমাণ জমি অব্যবহৃত থেকে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। তা ছাড়া আগের মৌসুমের চাহিদার চেয়েও অতিরিক্ত চার লাখ মেট্রিক টন লবণ মাঠে উৎপাদনকারীদের কাছে মজুদ রয়েছে বলে লবণ উৎপাদনকারী সমিতির কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছ্।ে কঙ্বাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আবদুল শুক্কুর বলেন, 'ভারত থেকে বৈধ-অবৈধ পন্থায় বিপুল পরিমাণ লবণ দেশের বাজারে ঢুকে পড়ছে বলেই দেশীয় লবণ শিল্পে এমন বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।' তিনি উল্লেখ করেন, কেবল শিল্প-কারখানায় ব্যবহারের অজুহাতেই ভারতে উৎপাদিত লবণ দেদার ঢুকে পড়ছে দেশীয় বাজারে। তিনি বলেন, 'লবণের উৎপাদন, পরিবহন ও মজুদ থেকে শুরু করে এ শিল্পে কমপক্ষে অর্ধকোটি মানুষের ভাগ্য জড়িত।' এদিকে কঙ্বাজারের জেলা প্রশাসক মো. গিয়াস উদ্দিন আহমদ জানান, লবণ শিল্পের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। তিনি জানান, সরকার লবণ শিল্পের সমস্যা সমাধানের জন্য একটি নীতিমালা প্রণয়ন করতে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে মাঠপর্যায় থেকে বিসিক বা টিসিবির মাধ্যমে চাষিদের উৎপাদিত লবণ ক্রয় এবং আমদানির ক্ষেত্রে উচ্চ হারে করারোপসহ বেশ কিছু সুপারিশও করা হয়েছে। নীতিমালাগুলো বাস্তবায়নের শুরু হলেই সমস্যা কিছুটা কাটিয়ে ওঠা যাবে বলে তিনি মনে করেন।
অপরদিকে রাজধানী ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তৃণমূলের উৎপাদনকারীদের রক্ষার জন্য অবিলম্বে বিদেশ থেকে লবণ আমদানি সম্পূর্ণভাবে বন্ধের দাবি জানানো হয় গত শনিবার। কঙ্বাজার লবণ চাষি সমিতির সাধারণ সম্পাদক নুরুল আলম ও বাংলাদেশ লবণ চাষিকল্যাণ পরিষদের সভাপতি মোস্তফা কামাল চৌধুরী সংবাদ সম্মেলনে বলেন, 'আগের মৌসুমের উৎপাদিত কমপক্ষে আট লাখ মেট্রিক টন লবণ মাঠে মজুদ রয়েছে। চাষিরা লবণ বিক্রি করতে পারছে না। তারা সরকারের কাছে দাবি জানায়, নায্যমূল্যে যাতে উৎপাদনকারীদের কাছ থেকে সরকারিভাবে লবণ কেনার ব্যবস্থা নেওয়া হয়।' সেই সঙ্গে মাঠপর্যায়ের উৎপাদন এবং বিপণনের ক্ষেত্রে সরকারিভাবে তদারকির দাবিও জানান তাঁরা।

মসলা চাষে আশানুরূপ ঋণ বিতরণ হচ্ছে না

Wednesday, January 19, 2011

ডাল, মসলা এবং তেলবীজ জাতীয় ফসলে ঋণ বিতরণে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা আমলে নিচ্ছে না রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো। এসব খাতে ব্যাংকগুলোর জন্য সুদ ভতর্ুকির ব্যবস্থা থাকলেও ব্যাংকগুলো বিতরণে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। এ খাতে আশানুরূপ ঋণ বিতরণ না করায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক অসন্তোষ প্রকাশ করেছে।

সূত্র জানায়, রাষ্টায়ত্ত খাতের সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী এবং বিশেষায়িত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক ডাল, মসলা এবং তেলবীজ জাতীয় ফসলে যথেষ্ট কৃষি ঋণ বিতরণ করছে না। এই কারণে তাদের এই ফসল খাতে ঋণ বিতরণ বাড়ানোর উপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান রবিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের সেমিনার কক্ষে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের (এমডি) সাথে বৈঠকে এ বিষয়ে তাগাদা দেয়া হয়।

সূত্র জানায়, চার রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো ২৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার ১৬ কোটি ১৭ লাখ টাকা বিতরণ করেছে। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রা ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বিতরণ করা হয়েছে। মসলা খাতে ঋণ বিতরণে অসন্তোষ প্রকাশ করে গভর্নর বলেন, এ বছর (২০১০) রূপালী ব্যাংকের ১ কোটি ৪০ লাখ টাকাসহ এখাতে মোট ৯৬ কোটি ৫ লাখ টাকা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ঋণ বিতরণ আশানুরূপ হয়নি।

বৈঠকে গভর্নল এ খাতে শতভাগ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য তাগিদ দিয়ে আরো বলেন, এ ব্যাপারে কালক্ষেপনের সময় নেই। আপনাদের ক্লোজিং শেষ হয়েছে। এ খাতের ঋণ বিতরণ বাড়াতে নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করতে হবে।

'কৃষি ও পলস্নী ঋণ নীতিমালা ও কর্মসূচি' নীতিমালায় পেঁয়াজ, রসুন, আদাসহ বিভিন্ন মসলা চাষে কৃষককে উৎসাহিত করতে মাত্র ২ শতাংশ সুদে ঋণ প্রদান করার বিধান। এর জন্য ব্যাংকগুলোকে সরকারের পক্ষ থেকে ঋণের সুদের উপর ভতর্ুকি প্রদান করা হয়। অন্যদিকে কৃষকদের ১০ টাকার ব্যাংক হিসাবে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকার স্থিতির ওপর প্রযোজ্য আবগারী শুল্ক মুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সমপ্রতি এ সংক্রান্ত একটি সার্কূলার জারি করেছে সরকার।

আতিউর রহমান এ বিষয়ে বলেন, ৯০ লাখের অধিক কৃষক ব্যাংক হিসাব খুলতে পারা আর্থিক অন্তর্ভুক্তির একটি বিরাট অর্জন। এর মধ্য দিয়ে শুধু কৃষকদের কাছে ভর্তুকির টাকা পৌঁছে দিলে চলবে না। এসব হিসাবগুলোকে বিভিন্ন উপায়ে কাজে লাগাতে হবে। তাহলে কৃষকরা প্রকৃত সুফল পাবেন।

গভর্নর এমডিদের উদ্দেশ্যে বলেন, কৃষকদের এ হিসাব খুলতে উৎসাহিত করতে হবে। ছোট ছোট সঞ্চয় যেমন, যদি কোন কৃষক ১০০ টাকা জমা দিতে আসে তবে আপনারা তা ঝামেলা মনে করবেন না। বরং তাদের উদ্বুদ্ধ করবেন।

শিং মাছের বিপর্যয়ের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে

Monday, January 17, 2011

ত ১২ ও ১৯ ডিসেম্বর তারিখে দৈনিক ইত্তেফাকের মাটি ও মানুষের কৃষি পাতায় "বিপর্যয়ের মুখে শিং মাছের চাষ" বিষয়ক দু'পর্বে দুটি লেখা লিখেছিলাম।

মাছের রোগ সমাধানকল্পে গত ২৬ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য বিভাগের শিক্ষক মোহাম্মদ মামুন চৌধুরী কৃষি পাতায় আমার লেখাটির গুরুত্ব ও দেশের মৎস্য খামারিদের কথা চিন্তা করে কিছু পরামর্শ দিয়েছেন তার জন্য তাঁকে ধন্যবাদ জানাই। তবে মামুন চৌধুরী শিং মাছের এ রোগটিকে "ইএসসি" বা এন্টেরিক সেপটিসেমিয়া অফ ক্যাটফিস রোগ বলে শনাক্ত করেছেন যা এডওর্য়াডসিয়েলা ইকটালুরি নামক পরজীবী প্রোটোজোয়ার এর সংক্রমণে হয়ে থাকে বলে উলেস্নখ করেছেন। তিনি আরো লিখেছেন, এ রোগের জীবাণু ১৮০ থেকে ২৮০ সেন্টিগ্রেট তাপমাত্রায় অতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তিনি এ রোগটিকে যেভাবে বর্ণনা করেছেন বাস্তবে তারচেয়ে বেশি বলে মনে হয়েছে আমার কাছে যেমন-

১. যে তাপমাত্রায় এ রোগটির জীবাণু অতিদ্রুত বংশ বিস্তারের কথা উলেস্নখ করেছেন আমাদের দেশের পানির বা আবহাওয়ার তাপমাত্রা এর ধারের কাছেও নেই তারপরেও এটি অতিদ্রুত বংশ বিস্তার করছে। তাহলে কি আমরা ধরে নেব এটা পরিবর্তনশীল জীবাণু?

২. প্রাথমিক পর্যায়ে একধরনের পরজীবীর দ্বারা আক্রান্ত হয়ে এ রোগের সৃষ্টির কথা উলেস্নখ করেছেন। যদি পরজীবী দ্বারা আক্রান্ত হয়ে এ রোগের সৃষ্টি হয়ে থাকে তাহলে ওই নির্দিষ্ট পরজীবীর ঔষধ প্রয়োগ করে অভিমুখেই পরজীবী নিধন করে এ রোগ থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব কিন্তু বাস্তবে কোনো ঔষধেই এ রোগ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যায় না।

৩. আর এ রোগের চিকিৎসার জন্য বিভিন্নজাতের এন্টিবায়োটিক এর কথা উলেস্নখ করেছেন এবং এর প্রয়োগবিধি খাবারের সাথে মিশিয়ে প্রয়োগের কথা বলেছেন। এ প্রসঙ্গে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে চাই-কোনো মাছ যখন রোগাক্রান্ত হয় তখন স্বাভাবিক কারণে খাবারের প্রতি অনিহা দেখা দেয় আবার কখনো কখনো একবারেই খায় না। সে জন্য খাবারের সাথে এন্টিবায়োটিক প্রয়োগে কতটুকু কাজে লাগবে তা বলা কঠিন।

আমার এ কথাগুলো বলার অর্থ হল মামুন চৌধুরীর যে সব চিকিৎসার কথা উলেস্নখ করেছেন আমাদের দেশের শিং মাছ চাষিদের এ সব চিকিৎসা সব সময় করছেন কিন্তু কোনো ফল আসছে না।

আমি কয়েকটি পর্যবেক্ষণ এখানে উলেস্নখ করছি-

১. পর পর ২ বছর পুকুরে শিং মাছের চাষ করার পর তার পরের বছরে পুকুরের তলা ভাল করে শুকিয়ে যথারীতি চুন প্রয়োগ দিয়ে প্রায় ২ মাস পর শিং মাছের মজুদ করা হয় কিন্তু বাজারজাত করার ঠিক আগে প্রায় ৩ টন শিং মাছ মারা যায়।

২. সম্পূর্ণ নতুন করে খনন করা পুকুরে শিং মাছের পোনা মজুদ করা হয়। মজুদের ৪ মাস পর ৩ দিনের মধ্যেই সমস্ত মাছ মারা যায়। এ ক্ষেত্রে সব ধরনের চিকিৎসা করা হয়।

৩. কৈ এবং তেলাপিয়ার সাথে মিশ্রভাবে যদি শিং মাছের চাষ করা হয় এ ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু মাছ মারা গেলেও পরবতর্ীতে ভাল ফলাফল পাওয়া যায়।

মামুন চৌধুরীর পুকুর ব্যবস্থাপনার উপর যে বক্তব্য দিয়েছেন তা প্রত্যেক মৎস্য খামারির অনুসরণ করা উচিৎ। কেননা এ ব্যবস্থাপনায় দেশি মাগুর ও পাঙ্গাস চাষ খুব ভাল হয়ে থাকে। পরিশেষে বলতে চাই সামপ্রতিক সময়ে শিং মাছের এ রোগ নিয়ে সবাই একসঙ্গে কাজ করার এখনই সময় নইলে শিং মাছের এ বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষার কোনো উপায় থাকবে না ।

এ. কে. এম. নূরুল হক

সৌদি খেজুরের অর্থকরী ও পরিবেশগত দিক

মাদের দেশে যে খেজুর দেখা যায় তা বুনো বা পাতি খেজুর। বুনো খেজুরের বীজ থেকে সহজেই চারা গজায়। খোরমা খেজুরের বীজ থেকে সহজে চারা গজায় না বলে আমাদের দেশে খোরমা খেজুরের বিস্তৃৃতি হয়নি এবং খেজুর চাষ যে বহুমুখী অর্থকরী ফসল তা কখনো কেউ বিবেচনায় আনেনি।

সকলের একটি বদ্ধমূল ধারনা খেজুর মরুর দেশের ফসল। আসলে ধারনাটি সত্যি নয়, খেজুর উষ্ণ মণ্ডলীয় ফল এবং মরুর দেশের চাইতে আমাদের দেশে খেজুরের ফলন অধিক হবে পাশাপাশি ফলের মান হবে উন্নত। আর এর পেছনের কারণ হিসেবে কাজ করছে পানির প্রাপ্যতা। খেজুরই একমাত্র ফল যা স্বাভাবিকভাবে ৩ থেকে ৪ বছর সংরক্ষণ করা যায় আর তাই বিকল্প খাদ্য হিসেবে খেজুরের গুরুত্ব্ব অপরিসীম। চিনি: খেজুর ফলে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ চিনি থাকে তাই খেজুর পরিশোধন করে চিনি উৎপাদন করা যায়। রস: নারী-পুরুষ উভয় প্রকার খেজুর গাছ থেকে রস আহরণ করা যায়, যা থেকে সহজেই বিভিন্ন দ্রব্যাদি প্রস্তুত করা যায়- ক) রাব; খ) গুড়; গ) চিনি; ঘ) ডরহব; ঙ) অষপড়যড়ষ; চ) অপবঃরপ ধপরফ বা ভিনেগার (প্রাকৃতিক)। কাগজ: খেজুর গাছের পাতা বিভিন্ন প্রকার মণ্ড ও কাগজ তৈরির এক উত্তম উপকরণ। কারণ এতে রয়েছে উচ্চ মাত্রার আলফা সেলুলোস (৫০-৫০%) ও হেমিমেলুলোস (২৬-৩০%)। অাঁশের দৈর্ঘ্য ১.২৫ মিঃ থেকে ২.৫ মি. মি. পর্যন্ত হয়। তাই খেজুর পাতা দিয়ে কাগজ তৈরিতে কোনো প্রকার সিন্থেটিক পলিমার যোগ করার প্রয়োজন হয় না। এই কাগজ ১০০ ভাগ পরিবেশবান্ধব। মাটিক্ষয় রোধ: খেজুর গাছের রয়েছে প্রকাণ্ড মূলতন্ত্র যা সোজা ও আড়াআড়িভাবে প্রায় ৫০ ফুট এবং মাটির গভীরে যায় ৭০ ফুট। পাশাপাশি অনেক খেজুর গাছ থাকলে সেগুলোর মূল মাটির গভীরে পরস্পর আড়াআড়িভাবে এক ধরনের জাল সৃষ্টি করে যা মাটি ধরে রাখতে সহায়তা করে। ঝড় ও জলোচ্ছ্বাস প্রতিরোধ: বিশাল ও মজবুত মূলতন্ত্রের কারণে খেজুর গাছ তীব্র ঝড় প্রতিরোধ করতে পারে। ঝড়ের তীব্রতা কমাতে উপকূলীয় এলাকায় খেজুরের বনাঞ্চল সৃষ্টি করে সিডোর আইলা ইত্যাদির মত ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা অনেক কমিয়ে দেয়। সমপ্রতি যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ফ্লোরিডার উপর দিয়ে বয়ে গেছে ঘূর্ণিঝড় হারকেন এন্ড্রিউ। সেখানে তীব্র ঝড়ের পর যে ক'টি গাছ দাঁড়িয়েছিল তার প্রায় সবগুলোই ছিল পাম জাতীয় গাছ এবং তার অন্যতম ছিল খেজুর গাছ। মরুকরণ প্রতিরোধ: অন্য যেকোনো গাছের তুলনায় খেজুর গাছ মাটির গভীর থেকে অধিক পরিমাণে পানি শোষণ করে উপরে তুলে আনে বলে পানির স্তর নিচে নামতে পারে না।

তথ্যবিভ্রাটও চালের দাম বাড়ায় by আশরাফুল হক রাজীব

Sunday, January 16, 2011

চাল ও গম উৎপাদনের যে তথ্য কৃষি মন্ত্রণালয় ও পরিসংখ্যান ব্যুরো দেয়, তা আমলে নিলে দেশে কোনো খাদ্যঘাটতির কথা থাকে না; বরং ২৫ থেকে ৩৩ লাখ টন চাল উদ্বৃত্ত থাকে। কাজেই অর্থনীতির চিরায়ত সূত্র অনুযায়ী, বাজারে খাদ্য তথা চালের দাম না বেড়ে কমার কথা।

কিন্তু বাস্তবতা উল্টো। দেশে যে খাদ্য উদ্বৃত্ত নেই, বরং ঘাটতি রয়েছে, তার জলজ্যান্ত প্রমাণ হলো বাজার। এই ভরা মৌসুমেও বেশ কিছুদিন ধরে বাজারে চালের দাম বাড়ছেই। গত এক বছরে দাম বাড়ার এ হার ৪৯ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিভিন্ন দপ্তরের ভুল তথ্যের কারণে বাজারের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই সরকারের। কারণ খাদ্য মন্ত্রণালয় যেসব তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পরিকল্পনা করছে, তা সঠিক নয়। এ কারণে খাদ্যশস্য, বিশেষ করে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের কোনো পরিকল্পনাই কাজে আসছে না।
অর্থনীতির সূত্র অনুযায়ী, বাজারে খাদ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকলে দাম বাড়ার কথা নয়। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, খাদ্য উৎপাদনের যে বাম্পার ফলনের তথ্য সরকারের তরফ থেকে বলা হয়, তা আদৌ ঠিক কি না? অথবা চাহিদার যে হিসাব দেওয়া হচ্ছে, তা সঠিক কি না? কিংবা আরো যেসব জরুরি তথ্য রয়েছে, যেমনÑজনসংখ্যা, মাথাপিছু খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ ইত্যাদি, এগুলো সঠিক কি না, সে প্রশ্নও আছে। খাদ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করলে এ চিত্রই ফুটে ওঠে।
খাদ্যমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক গত শনিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘খাদ্য পরিকল্পনার বিভিন্ন উপাদান, যেমনÑজনসংখ্যা, মাথাপিছু খাদ্য গ্রহণের চাহিদা অথবা খাদ্য উৎপাদনের পরিসংখ্যানে গোলমাল রয়েছে। এ কারণে পরিকল্পনার সঙ্গে বাস্তবতার কিছুটা অমিল রয়েছে। সমস্যাটি সমাধানের চেষ্টা করছি। আশা করি, চলতি বছরের আদমশুমারিতে এর সমাধান বের হয়ে আসবে।’
তবে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী গতকাল রবিবার কালের কণ্ঠকে জোর দিয়ে বলেন, ‘কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যে কোনো গলদ নেই। মাঠপর্যায় থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। আবার তথ্য সংগ্রহে স্পারসোর সহায়তাও নেওয়া হয়। সমস্যা যদি জনসংখ্যায় হয়, তাহলে আমার কিছু বলার নেই। মাথাপিছু খাদ্য গ্রহণের হারেও সমস্যা থাকতে পারে। তার পরও অস্বীকার করি না, খাদ্য উৎপাদনের পরিসংখ্যানে কিছু সমস্যা আছে। তবে সেটা দিন দিন কমে আসছে। সামনের দিনগুলোতে আরো কমে যাবে।’
কৃষিমন্ত্রী আরো বলেন, পরিসংখ্যানের জটিলতা থাকুক বা না থাকুক, বাংলাদেশের খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে। এই তথ্য সরকারের নয়, এটা জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার। তারা বলেছে, গত দুই বছরে যে চার-পাঁচটি দেশের খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে, তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। সরকার কৃষিতে ভর্তুকি দিচ্ছে। ভরা মৌসুমে কৃষক ধানের দাম পাচ্ছে, যা আগে কখনো পায়নি। ঘূর্ণিঝড় আইলা এবং হওরে প্লাবন না হলে কৃষি উৎপাদন গত দুই বছরে কোথায় গিয়ে দাঁড়াত, তা মূল্যায়নের দায়িত্ব সাধারণ মানুষের ওপর ছেড়ে দিলাম।’
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর দেশে বোরো চালের উৎপাদন হয়েছে এক কোটি ৮৭ লাখ টন। আমন হয়েছে এক কোটি ৩৫ লাখ টন আর আউশ ২৫ লাখ টন। মোট উৎপাদন হয়েছে তিন কোটি ৪৭ লাখ টন চাল। এর মধ্যে ১২ ভাগ খাদ্যশস্য বীজ হিসেবে সংরক্ষণ এবং মাঠ থেকে আনা ও মাড়াই প্রক্রিয়ায় নষ্ট হয় বলে ধরা হয়। ফলে এ পরিমাণ খাদ্যশস্য বাজারে আসে না। এ অংশটুকু বাদ দিলে দেশে মোট খাদ্যশস্যের উৎপাদন তিন কোটি পাঁচ লাখ ৩৬ হাজার টন। এর সঙ্গে দেশে উৎপাদিত ১০ লাখ টন গম ও আমদানি করা ৩০ লাখ টন খাদ্যশস্য যোগ করলে মোট খাদ্যশস্যের পরিমাণ দাঁড়ায় তিন কোটি ৪৫ লাখ ৩৬ হাজার টন।
আর বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য মতে, গত অর্থবছরে (২০০৯-১০) বোরো চাল এক কোটি ৮৩ লাখ টন, আমন এক কোটি ২২ লাখ টন, আউশ ১৭ লাখ টন এবং গমের উৎপাদন ছিল ৯ লাখ ৬৯ হাজার টন। মোট খাদ্যশস্যের উৎপাদন ছিল তিন কোটি ৩১ লাখ ৬৯ হাজার টন।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ ২০০১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী দেশের জনসংখ্যা ১২ কোটি ৪৪ লাখ। তাদের গতকালের জনসংখ্যা-ঘড়ি অনুযায়ী দেশের বর্তমান জনসংখ্যা ১৪ কোটি ৯৮ লাখ ৭২ হাজার ৪৪৮ জন। অনেকের ধারণা, আসলে জনসংখ্যা হবে ১৬ কোটি। খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিটের হিসাব মতে প্রতিদিন মাথাপিছু খাদ্যশস্যের চাহিদা ৪৮৯ গ্রাম। অর্থনীতিবিদদের মতে, একজন মানুষের প্রতিদিনের খাদ্য চাহিদা ৫০০ গ্রাম। সেই হিসাবে ১৬ কোটি লোকের জন্য বছরে খাদ্য চাহিদার পরিমাণ দাঁড়ায় দুই কোটি ৯২ লাখ টন। এর মধ্যে প্রায় ২০ লাখ জনসংখ্যা রয়েছে, যাদের বয়স ছয় মাসের নিচে এবং যারা দানাদার খাদ্যশস্য গ্রহণ করে না। জনসংখ্যার এ অংশটুকু বাদ দিলে খাদ্য চাহিদার পরিমাণ দাঁড়ায় দুই কোটি ৮২ লাখ ৬৩০ টন।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের দেওয়া খাদ্যশস্যের উৎপাদনের হিসাব সঠিক হলে দেশে ৩৩ লাখ ৩৫ হাজার ৩৭০ টন খাদ্যশস্য উদ্বৃত্ত থাকার কথা। কাজেই আমদানি তো নয়ই বরং বাংলাদেশ খাদ্য রপ্তানি করতে পারে। আর বাজারে দাম বাড়ারও কারণ নেই।
ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক ও কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. মাহবুব হোসেন বলেন, ‘চাহিদার চেয়ে জোগান বেশি হলে চালের দাম বাড়ার কোনো কারণ নেই। জোগান কম হলেই দাম বাড়ে। তাই বলা যায়, সঠিক তথ্যের অভাবে সরকারের পরিকল্পনা যথাযথ হয় না। খাদ্যের মতো একটি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তথ্যবিভ্রাট কারোই কাম্য নয়। বিষয়টি সরকারকে আমিও জানিয়েছি। কৃষি মন্ত্রণালয় মাঠকর্মী ও স্পারসোর মাধ্যমে যে পরিসংখ্যান সংগ্রহ করে তা প্রশ্নাতীত নয়। পরিসংখ্যান ব্যুরো জনসংখ্যার যে হিসাব দিচ্ছে তা নিয়ে অনেকের সন্দেহ থাকে। আর খাদ্য মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিট মাথাপিছু খাদ্য চাহিদার যে তথ্য দিচ্ছে তাও শতভাগ ঠিক নয়। এ অবস্থা চলতে দেওয়া উচিত নয়।’
খাদ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, দেশে উৎপাদিত খাদ্য ও আমদানি করা চালের বাইরেও বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা বাংলাদেশকে খাদ্য সহায়তা দেয়, যা তারা বিভিন্ন এনজিওর মাধ্যমে বিতরণ করছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, কৃৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের গ্রাম পর্যায়ের অফিসগুলোর উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার (ব্লক সুপারভাইজার) মাধ্যমে সরকার খাদ্যশস্যের তথ্য সংগ্রহ করে। কৃষক কতটুকু জমিতে কী ফসল চাষ করছে, উৎপাদন কেমন হতে পারে এবং ফসল কাটার সময় প্রকৃত উৎপাদন কেমন হলোÑসে হিসাব দিয়ে থাকেন তাঁরা। অভিযোগ রয়েছে, এসব কর্মকর্তা কৃষকের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করেন না। জরিপের জন্য সর্বজনস্বীকৃত কোনো পন্থাও তাঁরা ব্যবহার করেন না। বড় একটি আবাদি মাঠের পাশে গিয়ে সেখানে কতটুকু জমি আছে লোকজনের কাছে শুনে এর ওপর ভিত্তি করে একটি আনুমানিক উৎপাদনের হিসাব দেন। অথবা আগে থেকে সংগ্রহ করা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে অফিসে বসেই একটি কাল্পনিক তথ্য সরকারকে দেন, যার ওপর ভিত্তি করে খাদ্য পরিকল্পনা করা হয়।
সাধারণত কৃষি মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যানের সঙ্গে পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যের মিল থাকে না। এ নিয়ে সব সরকারের সময়ই প্রশ্ন উঠেছে। গত চারদলীয় জোট সরকারের সময় অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান পরিসংখ্যানের অমিল দূর করার জন্য অনেক বৈঠক করেন। গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে পরিসংখ্যানগত অমিল দূর করার জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে কমিটি গঠন করা হয়। সেই কমিটিও তাদের রিপোর্টে বিভিন্ন পরিসংখ্যানগত অমিলের জন্য খাদ্যমূল্য সংকটসহ নানা সংকট সৃষ্টির কথা তুলে ধরে। মহাজোট সরকারের কৃষিমন্ত্রীও গত বছর পরিসংখ্যান ব্যুরোর কর্মকর্তাদের ভর্ৎসনা করেন।
একজন কৃষি অর্থনীতিবিদ জানান, কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাব মতে যদি বোরো মৌসুমে বাম্পার ফলনই হবে তাহলে চালের দাম চড়া থাকার কোনো কারণ নাই। কৃষক, ব্যবসায়ী বা মজুদদাররা যদি মজুদও করে থাকেন তা সাধারণত আমন মৌসুম পর্যন্ত ধরে রাখেন। অথচ এবার আমন মৌসুমে কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে উৎপাদন ভালো হওয়ার কথা জানানোর পরই চালের বাজার ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। এমন নজির খুব কম রয়েছে। অপরদিকে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের চালের বাজারের তেমন পার্থক্য নেই। তাই ভারত থেকে বৈধ বা অবৈধ কোনোভাবেই তেমন একটা চাল আসছে বা যাচ্ছে না। তাহলে বিপুল পরিমাণ উৎপাদিত খাদ্যশস্য কোথায় যাচ্ছে?

৪৫ হাজার চাষি এ বছর লবণ চাষ করছে না

Saturday, January 15, 2011

বণের দেশীয় উৎপাদন চাহিদার চেয়েও বেশি। তবুও ভারত থেকে আমদানি করে পথে বসানো হচ্ছে দেশীয় লবণচাষিদের! বছরের পর বছর ধরে লোকসান দিয়েও লবণচাষ টিকিয়ে রেখেছে চাষিরা। কিন্তু চলতি বছর তারা একেবারেই অসহায়।

ক্ষতির আশঙ্কায় দেশের উপকূলীয় জেলা কক্সবাজারের ৪৫ হাজার লবণচাষি এ বছর লবণ চাষ করছে না। গতকাল শনিবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে লবণচাষিরা এসব কথা জানায়। নিজেদের দুঃখ-দুর্দশার কথা তুলে ধরে তারা ভারত থেকে লবণ আমদানি বন্ধের দাবি করে। পাশাপাশি তারা কৃষকপর্যায়ে লবণের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করে দেওয়ার দাবিও জানায়। সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে কঙ্বাজারের লবণচাষি সমিতি।
লবণ শিল্পকে রক্ষার দাবিতে চাষিরা ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে। দাবি আদায়ের লক্ষ্যে তারা ২২ জানুয়ারি জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন ও শোভাযাত্রা করারও ঘোষণা দিয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, কক্সবাজারের ও বাঁশখালিতে কৃষকপর্যায়ে প্রতি কেজি লবণের দাম মাত্র এক টাকা। এই লবণ প্রক্রিয়াজাত করে কম্পানিগুলো ১৮-২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছে। এতে কম্পানির মালিকরা ফুলেফেঁপে উঠলেও চাষিরা নিঃস্ব হচ্ছে। উচ্চমুনাফার পরও কম্পানিগুলো আরো মুনাফার আশায় ভারত ও মিয়ানমার থেকে ৪৫ পয়সা কেজি দরে লবণ আমদানি করছে। এতে দেশের লবণ অবিক্রীত থাকছে। সংবাদ সম্মেলনে লবণ শিল্পের উন্নয়ন প্রকল্পের উপাত্ত তুলে ধরে বলা হয়, ২০০৫-০৬ অর্থবছর থেকেই বাংলাদেশ লবণ উৎপাদনে সাবলম্বী। গত অর্থবছরে দেশে লবণের চাহিদা ছিল ১৩ দশমিক ৩৩ লাখ টন। ওই বছর প্রকৃত উৎপাদন হয়েছে ১৭ দশমিক ৪০ লাখ টন। আমদানি উন্মুক্ত হওয়ায় গত বছর বিপুল লবণ অবিক্রীত থেকে গেছে। এ কারণে এই বছর লবণ মৌসুম শুরু হলেও প্রায় ৪৫ হাজার চাষি ক্ষতির আশঙ্কায় মাঠে নামছে না।
মূল রচনা উপস্থাপন করেন লবণ চাষি সমিতির সাধারণ সম্পাদক এফ এম নুরুল আলম। তিনি বলেন, 'ভারতে লবণের উৎপাদন খরচ খুবই কম। ভারতের কৃষকরা একরপ্রতি মাত্র ৯৫ রুপি খরচে লবণ উৎপাদন করতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশে এ খরচের পরিমান ১৭-১৮ হাজার টাকা।' তিনি বলেন, 'কৃষকের কাছে লবণের কেজি মাত্র এক টাকা। কিন্তু ভোক্তাদের কিনতে হচ্ছে ১৮-২০ টাকা দরে! পুরো মুনাফাই লুটে নিচ্ছে সিন্ডিকেট।'
যেকোনো অজুহাতে লবণ আমদানি বন্ধ ঘোষণা করা, চোরাইপথে লবণ আমদানির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া, মাঠপর্যায়ে মূল্যনির্ধারণ করে দেওয়া, লবণ বোর্ড গঠনসহ তিনি সরকারের কাছে লবণচাষিদের ১১টি দাবি উপস্থাপন করেন।
সমিতির সভাপতি এইচ এম শহিদ উল্লাহ চৌধুরী বলেন, 'ভারত এখন আমাদের কমদামে লবণ দিচ্ছে বাজার দখলের জন্য। দেশীয় বাজার ভারতের দখলে চলে গেলে এ দেশের লবণচাষ ধ্বংস হবে। এরপর ভারত দাম বাড়িয়ে দেবে_এটা নিশ্চিত।'
লবণচাষি শরীফ বাদশা বলেন, 'পার্শ্ববর্র্তী রাষ্ট্র ভারতের মতো লবণ শিল্প রক্ষায় প্রকৃত লবণ চাষিদের চিহ্নিত করে পরিচয়পত্র দেওয়া এবং লবণ চাষের উন্নয়নে উৎপাদন থেকে বিপণন পর্যন্ত যাবতীয় কর্মকাণ্ড সরকারের নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।' সংবাদ সম্মেলনের সঞ্চালনা করেন কোস্ট ট্রাস্টের মোস্তফা কামাল আখন্দ। এ ছাড়া লবণচাষি কল্যাণ পরিষদের সভাপতি মোস্তফা কামাল চৌধুরী, লবণচাষি ঐক্য পরিষদের সভাপতি শরীফ বাদশা, একই সংগঠনের সদস্য রহুল কাদের বাবুল, নাজেম উদ্দিন ও হারুনুর রশিদ সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।

পতিত জমিতে সবজি চাষে সুনিল-অলির চমক

সুনিল চন্দ্র সিকদার ও মো. অলি কারিগর। সুনিল পয়ষট্টিতে পেঁৗছেছেন। আর অলি ত্রিশ বছরের যুবক। বয়সের বাধা পেরিয়ে তাঁরা দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। গড়েছেন নতুন অধ্যায়। কঠোর পরিশ্রম দিয়ে পতিত জমিতে নজরকাড়া সবজি চাষ করে পটুয়াখালীতে হৈচৈ ফেলে দিয়েছেন।

উভয়েই কৃষক পরিবারের সন্তান। কিন্তু অভাবের তাড়নায় তাঁদের সে পরিচয় ফিকে হয়ে যাচ্ছিল। অভাবগ্রস্ত সুনিল ও অলি পৈতৃক কৃষি পেশার পুরনো ঐতিহ্যকে জেগে তুলেছেন সবজি চাষে। নানা জাতের সবজি চাষ করে এখন আদর্শ কৃষক হিসেবে নিজেদের পরিচয় নতুনভাবে গড়েছেন। সেই সবজি বিক্রি করে দুই হাতে আয় করছেন কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা। পতিত জমিতে তাঁদের দৃষ্টিনন্দন সবজি উৎপাদনের সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ায় অনেকেই এসে ঘুরে দেখছেন বাগান।
বরিশাল বিভাগীয় কৃষি সম্প্রসারণের অতিরিক্ত পরিচালক মো. শাহ আলম এবং পটুয়াখালী জেলা খামারবাড়ির উপপরিচালক নিখিল রঞ্জন মণ্ডল বলেন, পতিত জমির সবজি বাগান দেখে উচ্ছ্বসিত না হয়ে থাকা যায় না।
পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার কনকদিয়া ইউনিয়নের দ্বিপাশা গ্রামের আদি বাসিন্দা সুনিল এবং অলি। তাঁদের বাড়ি দ্বিপাশা-বীরপাশা রাস্তার মাঝামাঝি স্থানে। আর ওই রাস্তার দুই পাশজুড়ে পতিত জমিতে গড়ে তুলেছেন টমেটো, করলা, বেগুন, শালগম, শসা, লাউ, চিচিঙ্গা, ফুলকপি, বাঁধাকপি এবং মরিচসহ নানা জাতের সবজির বাগান। যেকোনো আগন্তুক ওই রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় ফলন্ত সবজিবাগান দেখে থমকে দাঁড়ান। কারণ ওই রাস্তার পাশের পতিত জমিগুলো বরাবরই ছিল অযত্নে-অনাবাদি। সেই জমিতে এখন শোভা পাচ্ছে নানা জাতের সবজির গাছ। আর গাছে ঝুলে আছে হরেক রকম সবজি। এমন দৃশ্য পথিককে থামিয়ে চোখ বোলাতে বাধ্য করে। শুধু রাস্তার পাশের পতিত জমিই নয়, চাষের আওতায় নেওয়া হয়েছে ধান ক্ষেতের আইল এবং আশপাশের সব পরিত্যক্ত ভিটে এবং পুকুরপাড়। দুজনে প্রায় সাড়ে ৪ একর পতিত জমিতে সবজি ফলিয়েছেন।
জানা যায়, স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর প্রান্তিক কৃষকসহ বেকার যুবকদের সবজি চাষে উদ্বুদ্ধকরণ প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৪০০ কৃষককে প্রশিক্ষণসহ পরামর্শ প্রদান করেন। এদের মধ্যে ১১০টি সবজি খামার গড়েছেন কৃষকরা। তবে তাঁরা সবাই চাষের জন্য বেছে নিয়েছেন আবাদি জমি। কিন্তু পতিত জমিতে ব্যতিক্রম এ উদ্যোগ নিয়ে সফল হয়েছেন সুনিল ও অলি। প্রতিদিন তাঁদের বাগানের সবজি যায় স্থানীয় বগা, বাহেরচর, কালিশুরী, কাছিপাড়া, নুরাইনপুর, কনকদিয়া, বীরপাশা, বাউফল, পাড়েরহাট, আয়লা ও বিলবিলাস বাজারে। এরই মধ্যে এসব বাগান থেকে সবজি বিক্রি করেছেন প্রায় এক লাখ টাকার। বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয় না হলে চলমান প্রকল্প থেকে আরো তিন লাখ টাকার অধিক সবজি বিক্রির সম্ভাবনার কথা জানান তাঁরা। অথচ ছয় মাস আগেও অভাবের সঙ্গে যুদ্ধ করে সংসার চালিয়েছেন সুনিল ও অলি। এখন তাঁরা বেশ খুশি। তবে অনুযোগও রয়েছে। সবজি চাষে অর্থের জোগান পেয়েছেন উচ্চ সুদে বিভিন্ন এনজিওর কাছ থেকে। এ কারণে লাভের একটা বড় অংশ দিয়ে পরিশোধ করতে হয় ঋণের টাকা। তাই এ উদ্যোগের ব্যাপক প্রতিফলনের জন্য সাধারণ কৃষককে সরকারি ব্যাংক থেকে জমির নিরাপত্তা ছাড়া স্বল্প সুদে ঋণের দাবি তাঁদের।
সুনিল চন্দ্র সিকদার বলেন, 'চিন্তাও করি নাই এত ভালো ফলন অইবে। বাবা, এহন বাগানের দিগে চাইলে পরানডা জুড়াইয়া যায়। সরকার যদি আমাগো মোত গরিবেরে কোম সুদে লোনের ব্যবস্থা কইর‌্যা দেতে, তাহেলে অনেক মানুষ সবজি ফলাইতে, অভাব কোমতে গ্রামের মাইনস্যের।'
মো. অলি কারিগর বলেন, 'আমাগো সবজি দেইক্যা সবাই আমাগো সুনাম কয়, ভালো টাহাও পাই বেইচ্যা, সংসারে অভাবও নাই, কিন্তু লোনের লইগ্যা সুদে লইয়া যায় ব্যামালা টাহা'।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, পটুয়াখালীর উপপরিচালক নিখিল রঞ্জন মণ্ডল কালের কণ্ঠকে বলেন, 'সাধারণ মানুষ এবং প্রান্তিক চাষিদের উদ্বুদ্ধকরণের মাধ্যমে অনাবাদি থাকা পতিত জমি চাষের আওতায় নেওয়া গেলে অনেকেই সুনিল এবং অলির মতো উদাহরণ সৃষ্টিকারী হতে পারত। গ্রামাঞ্চলে অভাবী মানুষের সংখ্যা কমে যেত। এ ছাড়া সবজির দামও সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে চলে আসত। সুনিল-অলি কৃষি সেক্টরে অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত'।
 
Support : Dhumketo ধূমকেতু | NewsCtg.Com | KUTUBDIA @ কুতুবদিয়া | eBlog
Copyright © 2013. News 2 Blog 24 - All Rights Reserved
Template Created by Nejam Kutubi Published by Darianagar Publications
Proudly powered by Dhumketo ধূমকেতু