গদ্যকার্টুন- গম্ভীর ও অপ্রাপ্তবয়স্ক পাঠকের জন্য নয় by আনিসুল হক

Friday, January 31, 2014

কিছু কিছু মানুষ আছেন, সব সময় সিরিয়াস। তাঁরা হাস্যরস নিতে পারেন না। হাস্যকৌতুককে তাঁরা অগ্রহণীয় বলে মনে করেন।
এ ধরনের এক মানুষের কথা পড়েছিলাম একটা রুশ কৌতুক ম্যাগাজিনে।
অফিসের বস তিনি। তাঁর অফিসের একজন কর্মচারী বলল, ‘এই, আমি একটা কৌতুক বলব।’
সবাই বলল, ‘বলো বলো।’
কর্মচারীটি কৌতুক বলতে শুরু করল: ‘এক লোক একটা পার্টিতে ঢুকেছে। তার দু পায়ে বেড়ি করে ব্যান্ডেজ বাঁধা। সে ঠিকমতো হাঁটতেও পারছে না। সবাই বলল, তোমার পায়ে কী হয়েছে? লোকটা বলল, আমার পায়ে নয়, মাথায় হয়েছিল। আমার মাথা ফেটে গিয়েছিল। মাথা ফেটে গেছে? তাহলে তুমি পায়ে ব্যান্ডেজ বেঁধেছ কেন? আরে, আমি পায়ে ব্যান্ডেজ বেঁধেছি নাকি? ডাক্তারের কাছে গেছি। ডাক্তার আমার মাথায় ব্যান্ডেজ বেঁধে দিয়েছেন। এত ঢিলা করে ব্যান্ডেজটা বেঁধে দিয়েছেন যে গড়াতে গড়াতে পায়ে এসে পড়েছে।’
এই কৌতুক শুনে অফিসের সবাই হেসে উঠল। শুধু বস হাসতে পারলেন না। তাঁর মনে হতে লাগল, এটা কি সম্ভব?
মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা হলে সেটা কি পা পর্যন্ত নেমে যেতে পারে?
রাতের বেলায় তাঁর ঘুম ভেঙে গেল। তিনি তাঁর বউকে ঘুম থেকে জাগালেন। বললেন, ‘আচ্ছা বলো তো, একটা লোকের মাথা ফেটে গেছে বলে ডাক্তার তার মাথায় ব্যান্ডেজ বেঁধে দিয়েছেন। সেই ব্যান্ডেজটা কি পা পর্যন্ত নেমে যেতে পারে?’
রুশ কৌতুক ম্যাগাজিনটিতে বলা হয়েছে, এই বস আর কেউ নন, তিনি নিজেই একটা কৌতুক ম্যাগাজিনের সম্পাদক।

কৌতুককে কৌতুক হিসেবে নিতে পারতে হবে। কৌতুকে যুক্তি খোঁজা উচিত নয়।
ধরা যাক এই কৌতুকটা: সিংহের বিয়ে হবে, ভেড়া খুব লাফাচ্ছে। সিংহের বিয়ে, দাওয়াতে যেতে হবে। একজন বলল, ‘সিংহের বিয়ে তো তুই ভেড়া লাফাচ্ছিস কেন?’ ভেড়া বলল, ‘আরে, বিয়ের আগে আমিও তো সিংহ ছিলাম, বিয়ের পরে না ভেড়া হয়ে গেছি!’
এই কৌতুক শুনে যদি কেউ বলে, যাহ্, একটা সিংহ কীভাবে ভেড়া হয়ে যাবে? এটা সম্ভবই না, তাহলে কিন্তু চলবে না।

কিন্তু অনেক পাঠকই আছেন খুব সিরিয়াস। মিলান কুন্ডেরার একটা উপন্যাস আছে—ফেয়ারওয়েল পার্টি। ওই উপন্যাসে মিলান কুন্ডেরা একজন ডাক্তারের চরিত্র সৃষ্টি করেছেন। তাঁর নাম ডাক্তার স্ক্রেটা। ডাক্তার স্ক্রেটা বন্ধ্যা নারীদের চিকিৎসা করেন। তিনি নিজের স্পার্ম বন্ধ্যা নারীদের ইনজেক্ট করে দেন। তাদের অনেকেই সন্তান লাভ করে। উপন্যাসের একটা জায়গায় বর্ণনা আছে, ডাক্তার স্ক্রেটা পথ দিয়ে যাচ্ছেন, বাচ্চারা মাঠে খেলছে, তিনি তাকিয়ে দেখছেন, কয়টা বাচ্চা দেখতে তাঁর মতো হয়েছে।
মিলান কুন্ডেরা বলছেন, তিনি এই চরিত্র ও ঘটনা লিখেছেন একেবারেই হালকা চালে। কৌতুক করার জন্য। কিন্তু ব্যাপারটা কৌতুক রইল না। একদিন মেডিসিনের এক অধ্যাপক তাঁর কাছে এসে হাজির। অধ্যাপক বললেন, ‘আমি আপনার লেখার খুব সিরিয়াস পাঠক। আপনার প্রতিটা লাইন আমার মুখস্থ। আমি একটা সেমিনারের আয়োজন করছি। এটার বিষয় হলো “বন্ধ্যত্ব ও স্পার্ম ডোনেশন”। আপনার উপন্যাস ফেয়ারওয়েল পার্টিতে এই ব্যাপারটা আছে। এটা অত্যন্ত সিরিয়াস একটা বিষয়। এভাবে একটা কঠিন সমস্যার সমাধান হতে পারে। আপনি অবশ্যই আমার সেমিনারে আসবেন। আপনি বক্তব্য দেবেন।’
কুন্ডেরা বললেন, ‘আমার উপন্যাসকে সিরিয়াসলি নেওয়ার কিছু নেই। আমি এটা নিতান্তই কৌতুক করার জন্য লিখেছি।’
অধ্যাপক পরম বিস্ময়ে কুন্ডেরার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আপনার উপন্যাসকে আমরা সিরিয়াসলি নেব না? আপনি নিজে লেখক হয়ে এ কথা বলতে পারলেন? আপনার লেখাকে আমরা সিরিয়াসলি নেব না?’
কুন্ডেরা বললেন, ‘ভাই, লেখকদের সব কথা সিরিয়াসলি নেবেন না। আরেকটা কথা, ফিকশন লেখকেরা কিন্তু খুব বানিয়ে গল্প করে। গল্প লেখকদের জন্য উপদেশ প্রচলিত আছে, ডোন্ট রুইন ইয়োর স্টোরিজ উইথ ফ্যাক্টস। সত্য ঘটনা বলে তোমার গল্প নষ্ট কোরো না।’
ফেসবুকে একটা চমৎকার কৌতুক পেয়েছি। এটা যে কৌতুক, তা আগেই বলে রাখলাম। একজন কৃষি বিশেষজ্ঞ উপস্থাপক টেলিভিশনের ক্যামেরায় একজন ছাগলচাষির সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন।
উপস্থাপক: আপনি আপনার ছাগলকে কী খাওয়ান?
ছাগলচাষি: কোনটারে? কালোটা না সাদাটা?
উপস্থাপক: কালোটারে...
ছাগলচাষি: ঘাস।
উপস্থাপক: আর সাদাটারে?
ছাগলচাষি: ওইটারেও ঘাস খাওয়াই।
উপস্থাপক: ও আচ্ছা। আপনে ওইগুলানরে রাতে কই রাখেন?
ছাগলচাষি: কোনটারে? কালোটা না সাদাটা?
উপস্থাপক: কালোটারে?
ছাগলচাষি: ওইটারে বাইরের ঘরে বাইন্দা রাখি।
উপস্থাপক: আর সাদাটারে?
ছাগলচাষি: ওইটারেও বাইরের ঘরে বাইন্দা রাখি।
উপস্থাপক: আপনি ওগুলানরে কী দিয়া গোসল করান?
ছাগলচাষি: কোনটারে? কালোটা না সাদাটা?
উপস্থাপক: কালোটারে?
ছাগলচাষি: পানি দিয়া গোসল করাই।
উপস্থাপক: আর সাদাটারে?
ছাগলচাষি: ওইটারেও পানি দিয়া গোসল করাই।
উপস্থাপক: সবকিছু দুইটার বেলায় একই রকম করলে তুই বারবার কালোটারে সাদাটারে জিগাস কেন?
ছাগলচাষি: কারণ, কালো ছাগলটা আমার।
উপস্থাপক: আর সাদা ছাগলটা?
ছাগলচাষি: ওইটাও আমার।
আমার গল্প শেষ। এই গল্প পড়ে আমি হা হা করে হেসেছি। কিন্তু একজন-দুজনকে বলতে গেছি। শুনে তাঁরা হাসলেন না। জানি না, কেন হাসলেন না। হয়তো আমি কৌতুক বলতে পারি না বা সবাই হিউমার নিতে জানে না।
এখন কি ভয়ে ভয়ে একটা কথা বলতে পারি? আসলে এ দল, বি দল দুইটা একই রকম। দুইটাই আমাদেরই দেশের দল। তবু দুইটার কথা আলাদা আলাদাভাবেই বলতে হয়। এক নিঃশ্বাসে আমরা বলতে পারি না।
এর অনেক কারণ আছে। একটা নিশ্চয়ই যুদ্ধাপরাধী ও সাম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে গাটছড়া বাঁধা।
এই প্রশ্নটার একটা সমাধান যদি হয়ে যায়, তাহলে কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতির ৮০ শতাংশ সমস্যার সমাধান হয়।
আমি যদি এ রকম হালকা গল্প দিয়ে লেখা শেষ করি, আপনারা বলবেন, হালকা লেখক। শুক্রবারটাই মাটি। এবার একটা সিরিয়াস গল্প। গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের লেখা গল্প আমি ছোট করে বলি:
একজন ডিগ্রিহীন ডেনটিস্ট সকালবেলা তাঁর চেম্বার খুলে যন্ত্রপাতি পরিষ্কার করছেন। এ সময় ফোন বাজল, ডেনটিস্টের ছেলে ফোন ধরল। তারপর এসে ডেনটিস্টকে বলল, ‘বাবা, মেয়র ফোন করেছেন, তিনি জানতে চান তুমি কি চেম্বারে আছ?’
ডেনটিস্ট বললেন, ‘নাই। বলে দাও, নাই।’
ছেলেটা গেল এবং ফিরে এসে বলল, ‘মেয়র জিগ্যেস করছেন, তিনি কি এখন আসতে পারেন?’
‘বলে দাও, আমি নাই।’
‘তিনি তোমার সব কথা ফোনে শুনতে পাচ্ছেন।’
‘গিয়ে বলো, দেখা হবে না।’
একটু পরে ছেলে এসে বলল, ‘বাবা, উনি বলেছেন, তুমি যদি তাঁকে না দেখ, তিনি তোমাকে গুলি করে মারবেন।’
এবার ডেনটিস্ট তাঁর ছেলেকে বললেন, ‘তাঁকে আসতে বলো।’
মেয়র এলেন। ডেনটিস্টের চেয়ারে চিৎ হয়ে শুলেন। হা করলেন। ডেনটিস্ট দেখলেন, একটা আক্কেল দাঁতের অবস্থা খারাপ। বললেন, ‘দাঁতটা তুলে ফেলতে হবে।’
মেয়র বললেন, ‘তুলে ফেলুন।’
ডেনটিস্ট বললেন, ‘কিন্তু কোনো অ্যানেসথেসিয়া ব্যবহার করা যাবে না।’
‘কেন?’
‘কারণ, ওখানে পুঁজ হয়ে গেছে। রাজি?’
‘হ্যাঁ। তুলে ফেলুন।’
এবার ডেনটিস্ট মেয়রের পা বাঁধলেন। হাত বাঁধলেন। বললেন, ‘হা করুন।’ সাঁড়াশিটা হাতে নিয়ে বললেন, ‘আপনি আমাদের কুড়িজনকে হত্যা করেছেন গুলি করে। এবার তার মূল্য আপনাকে দিতে হবে।’ তিনি দাঁতটা টেনে তুলে ফেললেন।
মেয়রের চোখে পানি চলে এসেছে। ডেনটিস্ট তাঁকে একটা পরিষ্কার কাপড় দিয়ে বললেন, ‘চোখের পানি মুছে ফেলুন।’
যাওয়ার সময় মেয়র বললেন, ‘বিলটা পাঠিয়ে দেবেন।’
‘বিল কার নামে পাঠাব? আপনার ব্যক্তিগত নামে, না সিটি করপোরেশনের নামে?’
মেয়র বললেন, ‘দুইটা তো একই।’

আনিসুল হক: সাংবাদিক ও সাহিত্যিক।

গদ্যকার্টুন- গাছেরটাও খান, তলারটাও কুড়োন... by আনিসুল হক

Friday, January 17, 2014

আপনার অসুখ করেনি। কিন্তু আপনাকে দেওয়া হলো অভিজাত চিকিৎসাসেবা। আপনি ভোটে দাঁড়াননি। কিন্তু আপনি হয়ে গেলেন নির্বাচিত সাংসদ। আপনি অসুস্থ, কিন্তু আপনি খেলতে গেছেন গলফ। আপনার বউয়ের সঙ্গে আপনার বিরোধ।
আপনি এখন বিরোধীদলীয় নেত্রীর সম্মানিত ও গর্বিত স্বামী। আপনার অবস্থান সরকারবিরোধী, কিন্তু আপনি হলেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত। আপনি শপথ করেছিলেন, আপনি সুইসাইড করবেন, শেষে আপনি শপথ নিলেন সাংসদ হিসেবে। আপনি ছিলেন ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরাচারী, এখন দুই গণতান্ত্রিক দলের সবচেয়ে কাম্য ধন।

আপনিটা কে?
আপনারা জানেন এই ধাঁধার উত্তর।
এটা ছড়িয়েছে ফেসবুকে। কেউ একজন রচনা করেছেন। আদিতে কে করেছেন জানি না, তাই কৃতজ্ঞতা স্বীকার করতে পারলাম না।
আচ্ছা, আপনি কে? এই নিয়ে একটা কৌতুক প্রচলিত আছে। বুশ-সংক্রান্ত কৌতুক। এটা আগে বলে নিই।
বুশ গেলেন ব্রিটেনে। তিনি রানিকে জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা, ব্রিটেনে দেশ চালানো হয় কীভাবে?
রানি বললেন, বুদ্ধি দিয়ে।
কেমন?
আচ্ছা, এই যে টনি ব্লেয়ার। ওকে আমি জিজ্ঞেস করব একটা ধাঁধা। আচ্ছা টনি, বলো তো, একটা লোক, সে তোমার বাবার ছেলে, সে তোমার মায়ের ছেলে, তোমার আর কোনো ভাইবোন নেই। লোকটা?
টনি উত্তর দিল: আমি।
দেখলে, টনির কত বুদ্ধি? এভাবে টনি ব্লেয়ার বুদ্ধি দিয়ে দেশ চালায়।
বুশ আমেরিকায় ফিরে গেলেন। তাঁর মন্ত্রীদের ডেকে বললেন, বলো তো, একটা লোক, সে তোমার বাবার ছেলে, সে তোমার মায়ের ছেলে, তোমার আর কোনো ভাইবোন নেই, লোকটা কে?
পুরো মন্ত্রিসভা তখন নিশ্চুপ। কী কঠিন ধাঁধা রে বাবা!
তখন বুশ বললেন, পাওয়েল কই? পাওয়েল থাকলে নিশ্চয়ই এর উত্তর দিতে পারত। ডেকে আনা হলো পররাষ্ট্রমন্ত্রী কলিন পাওয়েলকে। তাঁকেও জিজ্ঞেস করা হলো একই প্রশ্ন: একটা লোক, সে তোমার বাবার ছেলে, সে তোমার মায়ের ছেলে, তোমার আর কোনো ভাইবোন নেই, লোকটা কে?
পাওয়েল বললেন, আমি।
বুশ বললেন, হয় নাই, গাধা! সঠিক উত্তর হবে, টনি ব্লেয়ার।
বুশের আরেকটা কৌতুক বলি।
বুশ গেছেন একটা স্কুল পরিদর্শন করতে।
একটা ছেলে বলল, আমার দুটো প্রশ্ন আছে। এক. আপনি কম ভোট পেয়েও কী করে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হলেন? দুই. ইরাকে কোনো ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র পাওয়া যায় নাই। এ সত্ত্বেও আপনি কেন ইরাকে হামলা করলেন? এতগুলো নারী-শিশুর মৃত্যুর কারণ হলেন?
ঢং করে ঘণ্টা বাজল। বুশ বললেন, এখন ১০ মিনিটের বিরতি। বিরতির পর আবার শুরু হবে।
এবার আরেকটা ছেলে দাঁড়াল।
সে বলল, আমার তিনটা প্রশ্ন আছে। এক. আপনি কম ভোট পেয়েও কী করে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হলেন? দুই. ইরাকে কোনো ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র পাওয়া যায় নাই। এ সত্ত্বেও আপনি কেন ইরাকে হামলা করলেন? এতগুলো নারী-শিশুর মৃত্যুর কারণ হলেন? তিন. বিরতির আগে দুটো প্রশ্ন করেছিল যে ছেলেটা, সে কোথায় গেল?
আমরাও কিন্তু একই প্রশ্ন করতে পারি।
একটা করতে পারি ম্যাডাম খালেদা জিয়াকে। আপনি যদি অবরোধ-হরতালের কর্মসূচি থেকে সরেই এলেন—সরে আসার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ—আর এখন সংলাপের কথা বলছেনই, সেই সরকারের সঙ্গে সংলাপ, যা আপনার ভাষায় অবৈধ, তাহলে কেন এই কাজ আগে করলেন না? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেদিন আপনার বেঁধে দেওয়া সময়ের আগেই আপনাকে কর্মসূচি স্থগিত করে সংলাপের জন্য আমন্ত্রণ জানালেন, সেদিন কেন আপনি হরতাল স্থগিত করে আলাপে গেলেন না? কী হতো গণভবনে গিয়ে এক কাপ চা খেলে? মধ্যখান থেকে এত যে মৃত্যু, এত যে অগ্নিদাহ, এগুলোর দায় কে নেবে?
আর শেখ হাসিনাকে প্রশ্ন করা যায়, আপনি ১৫৩টা আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়া সাংসদকে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত সাংসদ বলতে পারেন কি না?
আর এই কৌতুক-আলোচনার সূত্র ধরে ডা. দীপু মনি বলতে পারেন, ব্রিটেনের রানির ধাঁধার জবাবটা আমি দিতে পারব। আপনারা কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করছেন না কেন? আমি তো পারতাম।
আমি কয়েকজন সাধারণ মানুষ, রিকশাওয়ালা, আমাদের আত্মীয়স্বজনকে জিজ্ঞেস করলাম, বর্তমান পরিস্থিতিতে মানুষ কী বলছে?
তাঁরা সবাই নানা বাক্যে যা বলেছেন, তা হলো, মানুষ বলছে, ক্ষমতায় কে এল, কে গেল, আমাদের কিছু যায়-আসে না। আমরা শান্তি চাই। আমরা জানতে চাই, আমাদের পথ চলাচলের জন্য বাধাহীন হবে তো? বাড়ি থেকে বেরোলে আমি অক্ষত দেহে ফিরে আসতে পারবে তো? আমার গায়ে কেউ পেট্রলবোমা ছুড়ে মারবে না তো? আমি আমার দোকানপাট খুলতে পারব তো? আমার বাস-ট্রাক-অটোরিকশা নিয়ে আমি
যে রাস্তায় বেরোব, তাতে কেউ আগুন দেবে না তো? আমি যে সবজি বা দুধ উৎপাদন করছি, তা বিক্রি হবে তো? আপনারা থাকেন আপনাদের পলিটিকস নিয়ে, আমাদের বাঁচতে দিন। আমাদের কাজকর্ম করতে দিন। আমাদের শিশুদের স্কুলে যেতে দিন।
আমাদের প্রবৃদ্ধি এ বছর কমে যাবে, বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস। আমাদের এখন দরকার কাজ করা। দেশের মানুষ নিজের উদ্যোগে নিজের সৃজনশীলতা দিয়ে কাজ করে যাবে, যাচ্ছে। কিন্তু তাদের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় রাজনীতি।
গণতন্ত্র নামের বাইসাইকেলের দুটো চাকা।
একটা সরকারি দল, একটা বিরোধী দল।
আমাদের সরকারি চাকাটা আমরা দেখতে পাচ্ছি। তাতে অবশ্য জাতীয় পার্টি, জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টিরও স্পোক দেখা যাচ্ছে।
কিন্তু বিরোধী চাকা কোনটা? জাতীয় পার্টি?
জানি না। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এ ব্যাপারে ভালো বলতে পারবেন। গাছেরটাও খাবেন, তলারটাও কুড়াবেন...সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের বাচনভঙ্গিটা অননুকরণীয়। এটা কেউ নকল করতে পারবে বলে মনে হয় না। সে চেষ্টা না-হয় আমরা না-ই করলাম।
ওঁরা গাছেরটাও খান, তলারটাও কুড়োন, আমরা তো সেই খাবারের ভাগ চাইছি না। আমরা চাই, আমাদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলা পরিশ্রমের ফলটা নিয়ে যেন দারাপুত্রপরিবার মিলে একটু শান্তিতে দিন গুজরান করতে পারি।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

গদ্যকার্টুন- ভালা করি ঘর বানায়া কয় দিন? by আনিসুল হক

Friday, January 3, 2014

আচ্ছা, আপনাদেরও কি এই রকম হয়? ধরুন, একটা কাজ করতে হবে। ধরা যাক, আপনি কাউকে একট চিঠি লিখবেন, বা কোনো একটা বিল জমা দেবেন,
কোনো একটা কিছুর জন্য আবেদন করবেন। কাজটা করার জন্য আরও তিন মাস সময় হাতে আছে। আপনি প্রথমে ভাবলেন ঠিক আছে, দুই মাস সময় হাতে রেখেই কাজটা করে ফেলব। এক মাস যায়, দুই মাস যায়, তারপর যখন তিন মাস যায় যায়, তখন আপনার হুঁশ হয়, এবং একেবারে শেষের দিন গিয়ে কাজটা সারেন?
যদি আপনার এই রকম হয়ে থাকে, তাহলে বুঝবেন, আপনি আমারই দলে। এবং আমার ধারণা, বেশির ভাগ মানুষই আসলে কাজ ফেলে রাখে, এবং শেষ মুহূর্তের আগে কাজ শেষ করে না। আপনারা যাঁরা আমার মতোই শেষ দিনের আগে কাজ শেষ করেন না, তাঁদের জন্য নিউ ইয়ার রেজুলেশন, নতুন বছরের অঙ্গীকার:
নতুন বছরে আমি হব ভালো ছেলে
সময়ে সারব কাজ রাখব না ফেলে।
আপনার মূল্যবান সময় কি ফেসবুকে অপব্যয়িত হচ্ছে? তাহলে আসুন, নতুন বছরে এই প্রতিজ্ঞা করি:
নতুন বছরে আমি এই পণ করি
ফেসবুক না পড়ে যেন সত্যি বই পড়ি।
আমার ওজন বেড়ে যাচ্ছে। ভুঁড়ি সামলাতে পারছি না। জিমনেসিয়ামে যাবার জন্য বার্ষিক কার্ড করেছিলাম, টাকা ব্যয় হয়েছে, ক্যালরি খরচ হয় নাই। একটা মেশিন কিনেছি, ব্যায়ামের যন্ত্র, সেটা ঘরের একটা কোণে অযত্নে পড়ে আছে, প্রথম দুই-তিন দিনই যা শরীরচর্চা হয়েছে, তারপর বেমালুম ভুলে গেছি সেই যন্ত্রের কথা। আপনাদেরও কি এই রকম হয়?
তাহলে আসুন, প্রতিজ্ঞা করি:
নতুন বছরে আমি এই করি পণ
খাওয়া কম ব্যায়াম বেশি কমাব ওজন।
ইনশা আল্লাহ, আগামী নতুন বছর পর্যন্ত যদি বেঁচে থাকি, আগামী বছরেও এই প্রতিজ্ঞাগুলোই নতুনভাবে উচ্চারণ করতে পারব। মানুষ প্রতিজ্ঞা করে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করার জন্যই।
এই জন্যই তো লোকে বলে, সিগারেট ছাড়া খুব সোজা। আমি আমার এই ক্ষুদ্র জীবনে বহুবার সিগারেট ছেড়েছি।
আমি অবশ্য ধূমপান করি না। এই প্রতিজ্ঞা তাই আমাকে করতে হয় না, এই প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করবারও দরকার পড়ে না।
***

এই পর্যন্ত পড়ার পর অনেকেই ক্ষিপ্ত হয়ে উঠবেন। দেশের পরিস্থিতি ভয়াবহ। একতরফা একটা নির্বাচন সামনে। বিরোধী জোট সেই নির্বাচন বর্জন করেছে। অর্ধেকের বেশি আসনে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাই হয়নি। দেশে চলছে লাগাতার অবরোধ, লাগাতার হরতাল, লাগাতার বোমাবাজি, লাগাতার অগ্নিসংযোগ। দ্যাশ শ্যাষ। ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ, কৃষকদের কপাল পুড়ে ছাই, কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। প্রবৃদ্ধি ৫-এর নিচে নেমে যেতে বাধ্য। নেতাদের আছে শুধু ক্ষমতাপ্রীতি। কেউ দেশের কথা ভাবছে না। এই অবস্থায় আপনি রসিকতা করেন। এই অবস্থায় তুমি মিয়া ক্যালরি, কোলেস্টেরল, ফেসবুক নিয়া ঘ্যানর ঘ্যানর করো।
তিন বছর ধরে একই কথা বলছি। বলছি যে, একতরফা নির্বাচন চাই না, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চাই। বলছি, ভোটে জনমতের প্রকৃত প্রতিফলন চাই। কেউ আমার কথা শুনেছে?
গতকাল একজন সাবেক রাষ্ট্রদূত বললেন, বাংলাদেশে আছে আসল গণতন্ত্র। বকাওয়ালা বকে যাচ্ছে, লেখাওয়ালা লিখে যাচ্ছে, শোনাওয়ালা শুনে যাচ্ছে, করাওয়ালা নিজের মতো করে যাচ্ছে। এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি।
প্রথম আলো লিখেছে, হাল ছেড়ে দিয়েছে বিএনপি। আশ্চর্য একটা দল। জরিপ বলছে, তারা জনপ্রিয়। জরিপ বলছে, তাদের দাবি, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বেশির ভাগ মানুষই চায়। তার পরেও তাদের আন্দোলনে লোক হয় না। দেড় কোটি মানুষের শহরে দেড় লাখ না হোক, ১৫ হাজার লোক পথে নামবে না? নামবে কেন, কোনো নেতা নেমেছেন? নামবেন কী করে, সব নেতা তো কারাগারে। কথা কি সত্য? টিভি টক শোতে তো এখনো বিএনপির নেতাদের দেখি। কারণ হলো, বিএনপি সর্বহারাদের দল নয়। তাঁদের শরীরে মেদ আছে। নড়তে-চড়তে কষ্ট হয়।
শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকা কোনো গণতন্ত্রের জন্য বড় দুঃসংবাদ। আমরা এখন সেই দুঃসংবাদের মধ্যে আছি।
***

নতুন বছরে তাই আমরা কতগুলো রেজুলেশন নিতে পারি।
১. আগামী এক বছরে বাংলাদেশের সব জমি কিনে ফেলব।
২. আগামী এক বছরে বাংলাদেশের সব নদী ভরাট করে ফেলব।
৩. আগামী এক বছরে বাংলাদেশের সব গাছ কেটে ফেলব।
৪. আগামী এক বছরে প্রত্যেক সরকারি নেতার জন্য দুইটা করে টেলিভিশন চ্যানেল, পাঁচটা করে ব্যাংক, ছয়টা করে বিমা বরাদ্দ দেওয়ার ব্যবস্থা করব।
রসিকতা করছি। বুঝতেই পারছেন।
এবার একটা সিরিয়াস কথা। গত বছরের সবচেয়ে স্মরণীয় উক্তি হলো: ‘আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না।’
***

না না, রাজনৈতিক আলোচনা বাদ। এখানে রাজনৈতিক আলোচনা নিষিদ্ধ। যে প্যাঁচ আপনি-আমি লাগাই নাই, যে সুতার কোনো অংশ, না ডগা, না মাঝখানেরটা, আপনার আমার ধরাছোঁয়ার মধ্যে নাই, সেই প্যাঁচ আমরা খুলব কীভাবে। যারা প্যাঁচ লাগিয়েছেন, কেবল তাঁরাই খুলতে পারবেন।
বরং আসুন, আমরা গান-বাজনা করি। হাসন রাজার গানটা গাই।
লোকে বলে বলে রে ঘরবাড়ি ভালা না আমার।
কী ঘর বানামু আমি শূন্যেরও মাঝার।
ভালা করি ঘর বানায়া কয় দিন রমু আর,
আয়না দিয়া চায়া দেখি পাকনা চুল আমার।

আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

গদ্যকার্টুন- শঙ্কা আসে ধেয়ে by আনিসুল হক

Friday, December 27, 2013

পাঠকদের কাছে ক্ষমা চাই। কারণ, এই কলামে লিখেছিলাম, নির্বাচন নিয়ে দেশে কোনো অচলাবস্থা দেখা দেবে না, দিলেও সেটা ভয়ংকর কিছু হবে না। বাংলাদেশের মানুষের আছে সৃজনশীলতা, তারা এমন একটা উপায় বের করে নেবে, যা থেকে একটা সুন্দর নির্বাচন সম্পন্ন করা যাবে। আমার সেই ভবিষ্যদ্বাণী চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে, আমার আশা হয়ে গেছে গুড়ে বালি।

আমরা পড়েছি ভয়াবহ সংকটে। এত মৃত্যু, এত ধ্বংস, এত আগুন! জীবন ও জীবিকার ওপরে এমন নিষ্ঠুর আঘাত। প্রত্যেক মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে। কৃষি, শিল্প, ব্যবসা, শিক্ষা, চাকরি—প্রতিটা ক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে; এবং সবচেয়ে বড় কথা, সংকট থেকে উত্তরণের কোনো সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না, বরং সামনে আরও হানাহানি, আরও আগুন, আরও প্রাণহানি, আরও সম্পদহানির আশঙ্কা ধেয়ে আসছে। এবং রাজনৈতিকভাবে দেশ একটা কানাগলিতে ঢুকে পড়তে যাচ্ছে, যেখান থেকে বেরোনোর উপায় আমাদের জানা নেই।

সমস্যার মূলে অবশ্যই জেদ। এখন এ কথা সহজেই বলে ফেলা যায়, আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিল, বিএনপিকে তারা নির্বাচনের বাইরে রাখবে। আমরা বলেছিলাম, আওয়ামী লীগ চায় না বিএনপি নির্বাচনে আসুক। আওয়ামী লীগের চাওয়া পূরণ করার দায়িত্ব তো বিএনপির নয়। তাই বিএনপির উচিত নির্বাচনে আসা। নির্বাচনের হাওয়া বইতে শুরু করলে একটা পক্ষে জোয়ার চলে আসবে, সেই জোয়ারে কারচুপির চক্রান্ত খড়কুটার মতো ভেসে যাবে। অরণ্যে রোদন করলে তা কে শুনবে বনের পশু-পাখি-বৃক্ষলতা ছাড়া। কেউ শোনেনি। এখন এ কথাও বলে ফেলা যায় যে বিএনপির নেতৃত্বও আসলে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর চান না, তাঁরা চান ১৯৯৬ ও ২০০৭ সালে তাঁদের যেভাবে অপমানজনকভাবে ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছিল, সেই তেতো অভিজ্ঞতার স্বাদ শেখ হাসিনার সরকারকে পাইয়ে দেওয়া।

দুই পক্ষের মনের ভেতরে মীমাংসা না করার জেদ প্রবল, আপনি-আমি কথা বলে কী করতে পারব? আর উভয় পক্ষই শুধু নিজেরটাই বুঝছে, দেশের মানুষের জীবন, দেশের মানুষের নিরাপত্তা, দেশের ভবিষ্যতের কথা ঘুণাক্ষরেও কেউ ভাবছে কি? তার চেয়েও ভয়াবহ কথা হলো, উভয় পক্ষ আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করে যে তাদের ক্ষমতা গ্রহণ বা ক্ষমতা দখল করে রাখার মধ্যেই কেবল নিহিত রয়েছে দেশের মঙ্গল, এমনকি দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের রক্ষাকবচ। যদি উভয় পক্ষই এটা ভাবতে থাকে যে আমি ক্ষমতায় না থাকলে দেশ শেষ হয়ে যাবে, তখন আপনি কী করতে পারেন। আমরা শুধু উভয় পক্ষকে বলতে পারি, এই চিন্তার নাম ফ্যাসিবাদী চিন্তা।

আর আওয়ামী লীগ কেন অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনকে ভয় পেল? কার পরামর্শে? বছর দুই আগে যখন সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রথা তুলে দেওয়া হয়, তখন তো শাসকদের জনপ্রিয়তায় এতটা ধস নামেনি। বরং সরকার জনপ্রিয়তা হারিয়েছে বলে বিভিন্ন জরিপে যা বলা হচ্ছে, তার একটা অন্যতম কারণ মানুষের এক দিনের রাজা হওয়ার সুযোগটা রদ করে দেওয়া। শেয়ার মার্কেট কেলেঙ্কারি, পদ্মা সেতু কেলেঙ্কারি, দল ও সংগঠনের নেতা-কর্মীদের বাড়াবাড়ি—এসব তো আছেই। আছে সাংসদ-মন্ত্রী-নেতাদের অনেকের সম্পদ ফুলে-ফেঁপে ওঠা। যেটা এখন নির্বাচনী হলফনামায় দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। একজন নেতা জানান, তিনি প্রায় ১৫ কোটি টাকা আয় করেছেন মাছের চাষ করে। মানে বছরে তিন কোটি টাকা। প্রতি কেজি মাছে তাঁর ১০ টাকা লাভ হলে বছরে ৩০ লাখ কেজি মাছ তাঁকে উৎপাদন করতে হয়েছে। তার মানে প্রতিদিন দুই ট্রাক করে মাছ তাঁর খামার থেকে বাজারে এসেছে। তাই তো বলি, দেশে মাছের অভাব দূর হলো কীভাবে? সব ঢাকায় বসে থাকা মন্ত্রী-সাংসদেরা উৎপাদন করেছেন।

তবু আওয়ামী লীগ সরকার অনেক ভালো কাজও তো করেছিল। সেসবের কথা মানুষ যে বিবেচনা করবে, সেই অবকাশই তো তাকে দেওয়া হলো না। কল্পনা করুন, যদি উচ্চ আদালতের দেওয়া সুযোগ অনুসারে আরও দুই টার্ম তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রচলিত থাকত, তাহলে আজ বিএনপি আন্দোলন করত কী নিয়ে? আজ জামায়াতের আন্দোলন আর বিএনপির আন্দোলন একাকার হয়ে যেতে পারত না। এমনকি সরকার তো জাতীয় পার্টিকেও নির্বাচনে আনতে ব্যর্থ হয়েছে। শেখ হাসিনার একসময়ের মন্ত্রী আ স ম আবদুর রবও এখন বিএনপি জোটের আন্দোলনকে সমর্থন দিচ্ছেন। আওয়ামী লীগ তো ‘পলিটিকস’টাও ঠিকভাবে করতে পারছে না। এবং পর্যবেক্ষকদের কেউ কেউ মনে করেন, আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক চালেও ব্যর্থ হচ্ছে। কারণ, রাজনীতি রাজনীতিকদের হাতে নেই। অরাজনৈতিক গোষ্ঠী যখন রাজনীতি চালানোর চেষ্টা করে, তার ফল এ রকমই হয়ে থাকে।

১৮-দলীয় জোট খুবই কৌশলী একটা চাল দিয়েছে। দিনের পর দিন অবরোধে দেশের যখন নাভিশ্বাস উঠে গেছে, তখন তারা দিয়েছে ঢাকা চলো কর্মসূচি। এত দিন আমরা দেখলাম বিরোধী জোটের অবরোধ, এরপর দেখব, সরকারি অবরোধ। সরকার এবার ঢাকা আসার সব ধরনের পথ বন্ধ করে দেবে। আমাদের পরিত্রাণ নেই।

কী হবে ২৯ ডিসেম্বর? কী হবে এরপর? হানাহানি হতেই থাকবে। এই নির্বাচন তো আসলে ঠেকানোরও কিছু নেই, যে নির্বাচনে অর্ধেকের বেশি প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বী থাকেন না, তার তো কোনো মানেও নেই আসলে। সরকার ক্ষমতা ছাড়তে চাইবে না, ৫ জানুয়ারিটা পার হয়ে গেলে শপথ গ্রহণ করে নতুন সরকার চেপে বসতে চাইবে জুতমতো। আর বিরোধী জোটই বা তা মেনে নেবে কেন? তারাও খালেদা জিয়ার ভাষায় ‘প্রাণক্ষয়ী’ আন্দোলন চালিয়ে যাবে। সরকার দমন-নিপীড়ন বাড়িয়ে দিতে থাকবে। জুলুম বাড়বে, গণতান্ত্রিক অধিকারগুলো হরণ করা হতে থাকবে। উফ্, আমি কল্পনাও করতে পারছি না, সামনের দিনগুলোয় আমাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে?

যে আওয়ামী লীগ ১৯৪৯ সাল থেকে গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করে আসছে, তারা কি ক্ষমতায় থাকার জন্য বলপ্রয়োগকেই একমাত্র উপায় হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছে?

বলা হয়ে থাকে, আওয়ামী লীগ সরকার সামনের দিনগুলোয় অনেক ভালো কাজ করবে, জনপ্রিয়তা ফিরে পাবে, তখন নির্বাচন দেবে। জনপ্রিয়তা ফিরে পাবে কী করে? আরও আরও মৎস্য চাষ করে? ভালো কাজ করলে যদি জনপ্রিয়তা পাওয়া যায়, তাহলে গত পাঁচ বছর তারা তা না করে একপক্ষীয় নির্বাচনের পরে করার কথা কেন ভাবল? আচ্ছা, আওয়ামী লীগ জনপ্রিয়তা ফিরে পেল, নির্বাচন দিলেই তারা জয়লাভ করবে, তখন নির্বাচনটা হবে কোন পদ্ধতিতে? আবারও সেই বিষচক্র। তত্ত্বাবধায়ক ছাড়া অন্য কিছু বিরোধীরা কেন মানবে? আর কোনো একটা পক্ষ কোনো একটা ছাড় যদি দেয়ই, তাহলে তা তারা এখন দিচ্ছে না কেন? আর কতজন মারা গেলে আমরা বলব, মানুষ মারা গেছে? আর কজন পুড়লে আমরা বলব, এটা বর্বরতা ছাড়া আর কিছু নয়?

একটা জাতির ইতিহাসকে এক দিন, দুই দিন, এক বছর, দুই বছরের পাল্লায় মাপতে হয় না। তাই আমি আবারও বলব, আজ থেকে ২০ বছর পরের বাংলাদেশটা নিশ্চয়ই একটা উন্নত-আলোকিত স্বদেশই হবে। কিন্তু নিকট ভবিষ্যতের কথা যদি আমাকে বলতে বলেন, আমি ভালো কিছু দেখছি না। ‘এখন প্রকৃত আশাবাদীর পক্ষে আর কিছুই করার নেই, কেবল হতাশ হওয়া ছাড়া।’

অরণ্যে রোদন হলেও আমাদের কথা আমাদের বলে যেতেই হবে। সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন চাই। নির্বাচনে জনমতের প্রকৃত প্রতিফলন চাই। এবং নির্বাচন করতে হলে বিবদমান জোটগুলোর মধ্যে একটা ন্যূনতম মতৈক্য চাই, সমঝোতা চাই, মীমাংসা চাই। বাংলাদেশে তা-ই হয়, যা বিএনপি আর আওয়ামী লীগ একযোগে চায়। দেশে শান্তি আসুক, এটা বিএনপি আর আওয়ামী লীগকে একযোগে চাইতে হবে। তা না হলে আমাদের কারোরই স্বাভাবিক মৃত্যুর কোনো গ্যারান্টি থাকবে না। আমরা কতটা বর্বর হয়েছি যে কেবল মানুষ হত্যা করছি, তা নয়, আমরা বৃক্ষ নিধন করে চলেছি; আমরা কেবল মানুষ পুড়িয়ে মারছি, তা নয়, আমরা এখন গরু পোড়াতে শুরু করেছি। আমরা কি মানুষ পদবাচ্য নই?

আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

 
Support : Dhumketo ধূমকেতু | NewsCtg.Com | KUTUBDIA @ কুতুবদিয়া | eBlog
Copyright © 2013. News 2 Blog 24 - All Rights Reserved
Template Created by Nejam Kutubi Published by Darianagar Publications
Proudly powered by Dhumketo ধূমকেতু