খালেদা, প্রণব এবং ওরা তিন জন by অমিত রহমান

Wednesday, February 12, 2014

খালেদা জিয়া জানার চেষ্টা করছেন। কেন তার ঘনিষ্ঠ ‘তিনজন’ প্রণব মুখার্জির সঙ্গে সাক্ষাতে বারণ করেছিলেন। কি ছিল তাদের উদ্দেশ্য। তারা কি দলের স্বার্থে না অন্যদের স্বার্থে খেলছিলেন তা-ও খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন।
সময় যত যাচ্ছে ততই তার মধ্যে সন্দেহ জাগছে, এটা হয়তো কোন ষড়যন্ত্রের অংশ হতে পারে। দলের লোক, দেশী-বিদেশী শুভার্থীরা বলছেন, এটা ছিল অশোভন, অগ্রহণযোগ্য। শিষ্টাচারবহির্ভূত। তাদের যুক্তি হচ্ছে, খালেদা ভারত সফরে গেলেন। সম্পর্ক উন্নয়নের নয়া দিগন্তের সূচনা হলো। নজিরবিহীন না হলেও অভূতপূর্ব সংবর্ধনা দেয়া হলো। খালেদা নিজেও বিস্মিত হলেন। ঘনিষ্ঠদের বললেন, তার ধারণার বাইরে সৌজন্য দেখালো ভারত। তিনি নিজেই ভারতের প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জিকে আমন্ত্রণ জানালেন ঢাকা সফরের জন্য। প্রণব এলেন। কিন্তু খালেদা নেই। অকার্যকর এক হরতালের অজুহাতে নির্ধারিত সৌজন্য বৈঠক বাতিল করলেন এক ই-মেইল বার্তা পাঠিয়ে। কি কারণ ছিল তা নিয়ে অনেকদিন গবেষণা করে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। ঝুঁটি বাঁধেন এমন দু’জন তাত্ত্বিক এবং একজন পেশাজীবী এক সকালে গিয়ে বললেন, ম্যাডাম সর্বনাশ হয়ে যাবে। প্রণব বাবুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাবেন না। গেলেই বিপদে পড়বেন। হরতালের মধ্যে অন্য কোন শক্তি হামলা চালিয়ে আপনার যাত্রাপথে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। প্রাণনাশের ঘটনাও ঘটে যেতে পারে। তাছাড়া ১৮ দলের শরিক জামায়াতের হরতালের মধ্যে আপনি যদি সোনারগাঁও হোটেলে যান তখন সরকার বলবে হরতাল ভঙ্গ করে আপনি ভারতের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। তাদের আরও যুক্তি, ভারত আপনাকে চায় না। এর পেছনে যে মানুষটি সক্রিয় ভূমিকায় তিনি হচ্ছেন প্রণব মুখার্জি। বাংলাদেশ বিষয়ে সব নীতি তিনিই গ্রহণ করেন। সুতরাং, তাকে বোঝানো উচিত বাংলাদেশ একচেটিয়া তার বা তাদের পক্ষে নয়। এখানেও ভিন্নমত রয়েছে। খালেদা গিলে ফেললেন প্রস্তাবটি। উল্লিখিত তিনজন এমনভাবে কথা বলেন, মনে হবে তারা ছাড়া বিএনপির পক্ষে আর কেউ নেই। যুক্তিতে তারা পারদর্শী। এর মধ্যে একজন তাত্ত্বিক। হালে চরম দক্ষিণপন্থি। নানা লেনদেনের সঙ্গেও জড়িত। টেলিভিশন টকশোর একটি মন্তব্য নিয়ে মাঝখানে তাকে নিয়ে শোরগোল তুললেন শাসক সমর্থিত নাগরিক সমাজের কেউ কেউ। গ্রেপ্তারের দাবিও তুললেন। কিন্তু এক রহস্যজনক কারণে তা থেমে গেল। হেফাজতের সমাবেশের আগে খালেদা জিয়ার আলটিমেটাম দেয়ার ক্ষেত্রেও এই ভদ্রলোকের অবদান ছিল। ভিন্ন এক বিশ্লেষণ দাঁড় করিয়ে খালেদাকে দিয়ে বাজিমাত করতে চেয়েছিলেন তিনি। বিএনপি মহলেই এ নিয়ে ভিন্ন মূল্যায়ন চালু আছে মেলাকাল থেকে। আরেক ভদ্রলোক অপেক্ষাকৃত তরুণ। বামপন্থি ছিলেন শুরুতে। এখন জাতীয়তাবাদী ভূমিকায়। চাঞ্চল্যকর সব খবর দেন ঘনিষ্ঠ মহলে। বলেন, তার সঙ্গে নাকি ‘উত্তরে’র ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। কাল হবে, পরশু হবে, দিন-তারিখও বলেন এমনভাবে শুনে যে কেউ চমকে উঠতে পারেন। খালেদা জিয়ার কাছেও মাঝেমধ্যে পৌঁছে যান। অথবা দূত মারফত এমন খবর দেন, দরকার নেই আন্দোলন বেগবান করার। এমনিতেই আন্দোলন গতি পেয়ে যাবে। শাসকেরা হাওয়ায় মিইয়ে যাবে। আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন দু’দিন কর্মীদের সহায়তা বন্ধ করেছিলেন খালেদা জিয়া। তাকে বলা হয়েছিল সময়ের ব্যাপার মাত্র। এখন খালেদা নিজেই ঘনিষ্ঠদের বলছেন, ওরা আসলে অনুপ্রবেশকারী। হেফাজতের সঙ্গেও ওরা যোগাযোগ স্থাপন করে ভিন্ন বার্তা দিয়েছে। যে কারণে দায়েরকৃত মামলা প্রত্যাহার আর মাদরাসার আর্থিক সহায়তার টোপ দিয়ে সরকার মাঝপথে থামিয়ে দেয় হেফাজতের কাফেলা। হেফাজত প্রধানের ছেলের ভূমিকাও বেশ রহস্যজনক। খালেদার তৃতীয় ব্যক্তি বেশ শক্তিশালী। চার দেয়ালে বন্দি থাকার পরও প্রভাব অনেক বেশি। তিনি কিছু বললে বারণ করতে পারেন না খালেদা। এমনকি নিজের স্বার্থও না। উল্লিখিত তিনজন কাদের পরামর্শে খালেদা জিয়াকে সোনারগাঁও হোটেলে না যেতে বলেছিলেন তা নিয়ে দলের মধ্যে নানারকম মুখরোচক খবর চালু আছে। পাঠকদের মনে রাখার কথা, যে সময়টায় প্রণব মুখার্জির সঙ্গে খালেদার সাক্ষাৎ করতে আসার কথা ছিল, প্রায় একই সময় হোটেলের উত্তর পাশে একটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটেছিল। যে খবর ভারতীয় মিডিয়া দ্রুত প্রচার করেছিল। এটা যে পূর্ব পরিকল্পিত ছিল এখন বিএনপি নেতারা বুঝলেও তখন আমলেই নেননি। এমন কি দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা শমসের মবিন চৌধুরীও কূটনৈতিক শিষ্টাচারের প্রশ্ন না তুলে ই-মেইল বার্তা টাইপ করেছিলেন। সম্পর্ক মেরামতে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ড. ওসমান ফারুকের নেতৃত্বে দুই সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল দিল্লি গিয়েছিল প্রণবকে বোঝাতে। দুঃখ প্রকাশও করা হয় তাদের পক্ষ থেকে। তখন পানি অনেক দূর গড়িয়ে গেছে। প্রণব বাবু সহজে নিলেও ভারতীয় নীতিনির্ধারকরা এটাকে অপমান বলেই দেখেছেন। ভারতীয় প্রেসিডেন্ট যখন দিল্লিগামী প্লেনে ওঠেন তখন সফরসঙ্গী ভারতীয় সাংবাদিকরা তাকে সরাসরি প্রশ্ন করেন। বলেন, প্রণব বাবুকে নয়- গোটা ভারতবাসীকে অপমান করলেন বিরোধী নেত্রী। ধীরস্থির প্রণব বাবু কূটনৈতিক জবাব দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেন। কিন্তু ভেতরে ভেতরে তিনি নিজেও উপলব্ধি করেন এটা এক অবিশ্বাস্য ঘটনা। ভারতের নীতিনির্ধারকদের একটি অংশ বরাবরই বিএনপির ঘোর বিরোধী। তারা সুযোগ খুঁজছিলেন। তাদের হাতে অস্ত্রটা তুলে দেন খালেদা নিজেই। জামায়াতের সঙ্গে প্রেম দেখাতে গিয়ে নিজেকে অসহায় করে তোলেন। তার ক্ষমতা দখলের স্বপ্ন হাতছাড়া হয়ে যায়। এরপরও সুযোগ এসেছিল। সময়মতো পদক্ষেপ নেননি। যে কারণে ভারত একতরফাভাবে আওয়ামী লীগের পক্ষে চলে যায়। অনেকে অবশ্য বলেন, খালেদা সাক্ষাৎ করলেও ক্ষমতা পেতেন না। নানা কারণে ভারত খালেদাকে আস্থায় নিতে পারে না। তারপরও সাধারণ ভদ্রতা বলে কথা। খালেদা সব সময় সিদ্ধান্ত নেন বিলম্বে। পেট্রল বোমা আর গানপাউডার দিয়ে মানুষ কতল করা হচ্ছে অথচ খালেদা নীরব। একবারও নিন্দা জানালেন না। পাগলও জানে কারা এগুলো করেছে। যখন বিএনপি মহাসচিব কথা বললেন, এটা তাদের কাজ নয়, তখন দুনিয়াব্যাপী চাউর হয়ে গেছে আন্দোলনের নামে মানুষ হত্যা করা হচ্ছে পরিকল্পিতভাবে। মনে রাখতে হবে এটা হাসিনার শাসন। তিনি ফুলটাইম রাজনীতি করেন। আর খালেদা করেন মাত্র চার ঘণ্টা। পৃথিবীতে অনেক বড় বড় কাজ হয়েছে সকাল আটটা থেকে বেলা ২টার মধ্যে। এই সময়টা ঘুমিয়ে কাটালে ফল যা পাওয়ার তা-ই পাওয়া যাবে। বাড়তি যা পাওয়ার তা বোনাস। মানুষ সরকারের ওপর বিরক্ত। শত ভুলের মধ্যেও মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে এখনও আকুতি করছে। তাছাড়া সবাইকে অবিশ্বাসের পাল্লায় তুলে বিচার করলে কোনকালেই ভাল কিছু পাওয়া যায় না। শেখ হাসিনা একদিন যাদের অবিশ্বাস করতেন, দল ও মন্ত্রিসভায় স্থান দেননি, তারা এখন মূল শক্তি। মতিয়া চৌধুরীরা দূরে বসে ভাবছেন এ কি হলো। এটাই তো রাজনীতির খেলা। ভারতও এক সময় সংস্কারপন্থিদের সমর্থন দিয়েছিল জরুরি জমানায়। পরিণতিতে শেখ হাসিনা বিরক্ত হয়ে সংস্কারপন্থিদের ক্ষমতার বাইরে রেখেছিলেন। প্রণব বাবু নিজে অন্তত তিনবার অনুরোধ করে হাসিনার মন গলাতে পারেননি। বিরোধীদের আন্দোলনে শেখ হাসিনার সাজানো সংসার যখন ভেঙে পড়ছিল তখন প্রণব বাবুর পরামর্শে চিহ্নিত সংস্কারপন্থি আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমদ, মোহাম্মদ নাসিম, আসাদুজ্জামান নূরকে দলে ফিরিয়ে নেন। এরাই এখন হাসিনার প্রথম সারির সৈনিক। আর খালেদা এখনও সন্দেহ আর অবিশ্বাস থেকে বের হতে পারেননি। রাজনীতি কি এতটাই সহজ!

ব্যর্থতা মানতে রাজি নন খালেদা

Monday, February 3, 2014

আন্দোলনে ব্যর্থতা মানতে রাজি নন বেগম খালেদা জিয়া। তিনি বলছেন আন্দোলনে সাফল্য অনেক। এক. নির্বাচন এক তামাশায় পরিণত হয়েছে।
দুই. দেশে-বিদেশে এই নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। তিন. গ্রামের মানুষও এই আন্দোলনে শরিক হয়েছেন। সর্বোপরি দলকে এক রাখা সম্ভব হয়েছে। পেশাজীবীসহ বিভিন্ন গোষ্ঠীর সঙ্গে মতবিনিময়কালে খালেদা জিয়া এমন মনোভাবই ব্যক্ত করেছেন। দলের সাংগঠনিক দুর্বলতার দিকও কবুল করেছেন। সরকারের কৌশলের সঙ্গে পেরে ওঠেননি- সরাসরি এমন মন্তব্য না করলেও বলছেন, আমাদের কল্পনার মধ্যে ছিল না সরকার নিজেই সহিংসতায় নেমে পড়বে। দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের আচরণে তিনি মোটেই সন্তুষ্ট নন তা বলছেন ঘনিষ্ঠজনদের। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের খেলা বিএনপিতে আগাগোড়াই ছিল। দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পর্যন্ত অবিশ্বাসের ছক থেকে বেরিয়ে আসতে পারেননি। অবশ্য,  আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন তার ভূমিকা ছিল অনেকটাই প্রশ্নবিদ্ধ, রহস্যে ভরা। অবশ্য দলনেত্রী তার পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। বলেছেন, তারই নির্দেশ ছিল গ্রেপ্তার এড়ানোর জন্য। কিন্তু দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান কিছুটা ভিন্নমত পোষণ করেছেন। তার মতে, আলমগীর জেলের বাইরে থেকে এমন কোন কাজ করেননি যাতে দলটি লাভবান হয়েছে। অথবা আন্দোলন বেগবান হয়েছে। বরং মোটরসাইকেলের পেছনে চড়ে আত্মগোপনে যাচ্ছেন এই চিত্র দেশবাসী দেখেছে মিডিয়ার কল্যাণে। আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন একটি ভিডিও ক্লিপ অনেককেই হতাশ করেছে। অবশ্য মির্জা আলমগীর বন্ধু-বান্ধবদের বলছেন, আমি যাবো কোথায়? ম্যাডাম আমাকে নির্দেশ দিলেন পুলিশের কাছে ধরা না দিতে। আমি তা-ই করলাম। এখন দেখছি ভুলই করেছি। তিনি স্বীকারও করছেন, বাইরে থেকে তেমন কোন কাজ করতে পারেননি দলের জন্য। একজন নেতাকে ভারমুক্ত না করাও কিন্তু সঠিক রাজনৈতিক কৌশল নয়। এতে অবিশ্বাস স্থায়ী রূপ নেয়। যা-ই হোক, অন্য নেতাদের অবস্থা কি? যারা জেলে ছিলেন তাদের নিয়ে কথা কম দলে। যারা বাইরে ছিলেন তারা ২৯শে ডিসেম্বর কোথায় ছিলেন? কেউ তো নয়া পল্টনমুখী হননি। ঢাকার প্রবেশপথে উঁকি মেরেও দেখেননি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কি করছে। নেতাদের ফোন বন্ধ ছিল এটা ঠিক, কিন্তু সব সিম কি অকার্যকর ছিল? কেউ কি কথা বলেননি? বলেছেন, তবে যথেষ্ট সতর্কতার সঙ্গে। কোন নেতাই দলের কর্মীদেরকে মাঠে নামতে বলেননি। বরং বলেছেন, ‘শোনা যাচ্ছে রাস্তায় নামলে নাকি  দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দেয়া হয়েছে।’ অন্যভাবেও ম্যানেজ হয়ে গিয়েছিলেন নেতারা - এ নিয়ে তো বিএনপি শিবিরেই এখন জোর আলোচনা চলছে। খালেদা জিয়ার কাছেও এসব অভিযোগ যাচ্ছে। তিনি যখন নিজ গৃহে বন্দি ছিলেন তখনও নানা মাধ্যমে তার কাছে খবর পৌঁছেছিল। অতিসমপ্রতি বেগম জিয়ার সঙ্গে দেখা করে এসেছেন এমন একজন পেশাজীবী নেতা বলেন, দলের সাংগঠনিক অবস্থা যে এতটা দুর্বল সে ধারণা ম্যাডামের ছিল না। তাছাড়া অতিমাত্রায় জামায়াত-শিবির নির্ভর হওয়াটাও ঠিক হয়নি। সরকার এই সুযোগ নিয়ে অন্য খেলা খেলেছে। আন্দোলনকে অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেয়ার জন্য তারা এমন সব সহিংসতা করেছে যাতে পশ্চিমা দুনিয়াসহ নানা মহলে পৌঁছেছে ভিন্ন বার্তা। ফলে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়নি, পাশাপাশি সহিংসতা বন্ধেরও তাগিদ এসেছে। আন্দোলন মাঝপথে ধাক্কা খেয়েছে। কৌশলগত ভুলের কথাও বলা হচ্ছে। ঢাকাকে আন্দোলনের বাইরে রেখে যারা কৌশল ঠিক করার পরামর্শ দিয়েছিলেন তারা এখন বলছেন, কৌশল ভুল ছিল এখন হয়তো বলা যাবে। তবে শুরুতে চিন্তা ছিল সারা দেশ অচল করে শেষ কর্মসূচি হিসেবে ‘চলো চলো ঢাকা চলো’ কর্মসূচি দেয়া হবে। পরবর্তীকালে এরই নাম ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ দেয়া হয়েছিল। এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে যে পদক্ষেপ নেয়া দরকার ছিল তা নেয়া হয়নি - এখন সে বিষয়টি তারা মূল্যায়ন করছেন। এটাও বলছেন, হেফাজতের ওপর দৃষ্টি রাখা দরকার ছিল। আগের দিন সরকারি প্রতিনিধি এক গুচ্ছ প্রস্তাব নিয়ে হেফাজত নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বলাবলি আছে এই বৈঠকের পরই হেফাজত আন্দোলনে শরিক না হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এটাও লক্ষণীয় যে হেফাজত ঢাকার মহাসমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করে তিন বার তারিখ পরিবর্তন করেছে। সরকার অবশ্য অনুমতি দেয়নি। অনুমতি ছাড়াই  সমাবেশ হবে এমন ঘোষণা দিয়ে হেফাজত নেতারা কেন হঠাৎ চুপসে গেলেন তা নিয়ে নানা পর্যালোচনা চলছে খোদ হেফাজতের ভেতরেই। ঢাকায় একজন হেফাজত নেতা বলেন, গোটা বিষয়টি ধোঁয়াশায় ভরা। ‘সিগন্যাল’ শব্দটি নিয়ে বিরোধী শিবিরে বহুলভাবে আলোচিত হচ্ছে। কি সে সিগন্যাল? কারও ওপর নির্ভর করে কি এমন আন্দোলনের ছক তৈরি করা হয়েছিল?  একজন বিএনপি নেতা বললেন, এটা রটনা। জনগণ আমাদের সঙ্গে ছিল এবং আছে। এরচেয়ে বড় আন্দোলন বাংলাদেশে এর আগে কখনও কি হয়েছে? বাংলাদেশ ভেঙে পড়েছিল - এটা তো নতুন করে বলার কিছু নেই। তারপরও নির্বাচন কেন ঠেকানো যায়নি এ নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। আওয়ামী লীগ-ও তো ১৫ই ফেব্রুয়ারি নির্বাচন ঠেকাতে পারেনি। ২০০৬-এর আন্দোলনে আওয়ামী লীগ বা তার মিত্ররা কি সফল হয়েছিল? ওয়ান-ইলেভেন না হলে এখন যে অবস্থা হয়েছে তখনও সেরকম অবস্থাই হতো। বরং আরও  খারাপ হতে পারতো। বিএনপি নেতারা বলছেন, এটাও তো দেখতে হবে সরকারের পেছনে এমন এক শক্তি ছিল যারা সারা বিশ্বকে চ্যালেঞ্জ করেছে। আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছে এমন সরলীকরণ খুব সহজ। সংবিধান সংশোধন করার পেছনে তো সুনির্দিষ্ট এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছিল। সে পরিকল্পনায় বিএনপিকে নির্বাচনী দৌড়ের বাইরে রাখাই ছিল অন্যতম উদ্দেশ্য। যা পুরোপুরি সফল না হলেও অনেকটাই হয়েছে।  শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যেতে রাজি হলে নির্বাচন হতো কিনা সে প্রশ্নও তুললেন একজন স্থায়ী কমিটির সদস্য। বললেন, বেগম জিয়া যে এই বিকল্প নিয়ে ভাবেননি তা নয় কিন্তু। তখন সব খবরাখবরই এসেছিল নেতিবাচক। বেগম জিয়ার কাছে খবর ছিল,  সরকার এমন খেলা খেলবে যাতে নির্বাচনই হবে না। তখন সবাই বলতো বেগম জিয়ার কারণে অন্য শাসন এসেছে। খেলাটা ছিল সূক্ষ্ম। অঙ্ক মেলানো সহজ ছিল না। বিএনপির এই স্থায়ী কমিটির সদস্য বলেন, আজ হোক কাল হোক সবার অংশগ্রহণে একটি স্বচ্ছ নির্বাচন হোক- তখন দেখবেন সবাই বলবে বেগম জিয়া ভুল করেননি। ’৮৬ সালেও তো একই রকম হয়েছিল। ’৯০ সালে সবাই বলছেন বেগম জিয়াই সঠিক ছিলেন। ’৯১-এর নির্বাচনের ফলাফলের মধ্য দিয়ে এটা প্রমাণিত হয়েছে। রাজনৈতিক পণ্ডিতরা অবশ্য বলছেন, ১৯৯০ আর ২০১৪ কি এক? বুড়িগঙ্গায় অনেক পানি গড়িয়েছে।

সপ্তাহের হালচাল- ব্যাকফুটে বিএনপি by আব্দুল কাইয়ুম

Wednesday, January 22, 2014

সোমবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গণসমাবেশে জামায়াত-শিবিরকে ব্যানার নিয়ে দৃশ্যমানভাবে উপস্থিত থাকতে না দেওয়ায় এটা পরিষ্কার যে বিএনপি এখন ‘ব্যাকফুটে’ খেলতে চাচ্ছে।
তা-ই যদি না চাইত, তাহলে জামায়াতকে ঠেকিয়ে রাখবে কার সাধ্য। যদিও বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে বলছে না যে তাদের কোনো নিষেধ ছিল। ওদের ব্যাখ্যা হলো, সেদিন নাকি ১৮ দলের সমাবেশ ছিল না, ছিল বিএনপির সমাবেশ। কিন্তু এসব কথা বলে জামায়াতের অনুপস্থিতির সাফাই গাওয়া যাবে না। এই মুহূর্তে জামায়াতকে একটু দূরে দূরে রাখার কৌশলের পেছনে দুটি কারণ রয়েছে। একটি হলো বিদেশি বন্ধুদের পরামর্শ। অন্যটি জামায়াতকে সঙ্গে রাখার বিপদ।

বিদেশি বন্ধুরা জামায়াত-হেফাজতের সঙ্গে সুস্পষ্ট দূরত্ব রাখা, সোজা কথায় তাদের সঙ্গ ছাড়ার জন্য পরামর্শ দেওয়ার পর বিএনপির পক্ষে আগের মতো করে চলা কঠিন। তাই অনেকটা ‘ব্যাকফুটে’ খেলার কৌশল নিতে হয়েছে। পাকা খেলোয়াড়েরা সব সময় পিটিয়ে খেলেন না। বিশেষত শতরান পূর্ণ করার বাস্তব সম্ভাবনা সৃষ্টি হলে কিছুটা ধীরে, দেখেশুনে খেলার কৌশল নিলে দলের হতাশ হওয়ার কিছু থাকে না। বরং সবাই উত্সাহিত হয়। বিএনপি ২৯ জানুয়ারি হরতাল না ডেকে কালো পতাকা মিছিলের কর্মসূচি নিয়ে রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছে। আরও ভালো করেছে, অন্তত ছয় মাস শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির বাইরে কিছু না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে।
যদি শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করতে হয়, তাহলে জামায়াতকে সামনে রাখা বিপজ্জনক। যেমন সেদিন যদি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জামায়াতের দলীয়ভাবে যোগদানের সুযোগ থাকত, তাহলে মাঠের চিত্রটা একটু চিন্তা করুন। জামায়াতের টার্গেট হলো মঞ্চের সামনের পুরো জায়গাটা ব্যানার-মিছিল নিয়ে আগে থেকেই দখল করে রাখা। এটা সব সময় দেখা গেছে। বিএনপির সমাবেশে গেলে তো তাদের মহা সওয়াবের কাজ হয়। কারণ, কিছু একটা ছলছুতায় ককটেল ফুটিয়ে দোষটা সরকারের এজেন্সির ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায়। এই মুহূর্তে, যখন বিদেশি বন্ধুরা জামায়াতের ব্যাপারে সন্দিহান, তখন তাদের ঢাকঢোল পিটিয়ে সমাবেশে আনা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। বিএনপি সেই বাস্তব বুদ্ধির পরিচয় দিয়েছে।
বিএনপি শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের কথা বলেছে বটে, কিন্তু সেটাই কি যথেষ্ট? বিএনপি কি তাদের আগের অনুসৃত রাজনৈতিক অবস্থানের পর্যালোচনা করবে না? যদি না করে, তাহলে আর লাভ কী হলো। চুলচেরা বিশ্লেষণ করে দেখতে হবে, তাদের দলের প্রতি মানুষের এত বড় সমর্থন থাকা সত্ত্বেও কেন এখন কপাল চাপড়াতে হচ্ছে? নির্বাচনের ১০-১২ দিন আগেও তাদের দলের মধ্যে এমন একটা ধারণা দেওয়া হয়েছিল যে দিন সাতেকের মধ্যে সরকার পড়ে যাবে, নির্বাচন ভেসে যাবে। কে ভাসিয়ে দেবে নির্বাচন? সাধারণ মানুষ, নাকি কর্মীরা? নাকি জামায়াত-শিবিরই তাদের একমাত্র ভরসা ছিল? যেটাই হোক না কেন, তাদের হিসাব যে মেলেনি, বিরাট গরমিল ছিল, সেটা না বুঝতে চাইলে দলের আরও বড় ক্ষতি হতে পারে।
আওয়ামী লীগ নির্বাচন করে ফেলেছে ঠিকই, কিন্তু তাকে আদৌ নির্বাচন বলা যায় কি না সেটা বোধ হয় আওয়ামী লীগও বোঝে। একতরফা নির্বাচন এবং নির্বাচনের আগেই ১৫৩ জনের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে পড়ায় আওয়ামী লীগের অনেক নেতার লজ্জায় মাথা কাটা গেছে, এটাও ঠিক। মধ্যবর্তী নির্বাচনের সম্ভাবনা আওয়ামী লীগ উড়িয়ে দেয়নি। যদিও শর্ত দিয়েছে, বিএনপিকে জামায়াত ছাড়তে হবে, তারপর আলোচনার মাধ্যমে নির্বাচনের বিষয়ে সমঝোতা! তার মানে এই নির্বাচন নির্বাচন না, আরও নির্বাচন আছে।
এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে স্বাভাবিক আন্তরাষ্ট্র সম্পর্ক অব্যাহত রাখা এবং আগের মতোই ব্যবসা-বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়ার কথা বলার পর বিএনপির পক্ষে সরকারের বৈধতার প্রশ্ন তুলে কঠোর লাইনে চলাও কঠিন। তাদের বিবেচনায় এটা আছে নিশ্চয়, না হলে কেন তারা বলবে যে জামায়াতের সঙ্গে তাদের ঐক্য স্থায়ী কিছু নয়, কৌশলগত। আবার আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংলাপের কথাও তো তারা বলেছে।
এ অবস্থায় জোট-ছুট যেন না হতে হয়, সে জন্য জামায়াত বিএনপির ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। ওরা না থাকলে যে বিএনপির আগামী দিনের আন্দোলনে বর্শাফলক হিসেবে কাজ করার কেউ থাকবে না, এ রকম একটা কিছু তারা দেখাতে চাইবে। এখন বিএনপিকে ঠিক করতে হবে, পেট্রলবোমা ও ককটেল মারার লোকের জন্য তারা জামায়াত-শিবিরের কাছে ধরনা দেবে কি না। পুলিশ ও সাধারণ নাগরিক হত্যার জন্য মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত দলের লোকজনকে তারা রাজনৈতিক ছাড়পত্র দেবে কি না। এসব সিদ্ধান্তের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে।
জামায়াত-শিবিরকে দূরে ঠেলে দেওয়ার সুস্পষ্ট অবস্থান না নিয়ে বিএনপি যে সেই আগের সুরে আলোচনার মাধ্যমে ‘নির্দলীয় সরকারের অধীনে’ দ্রুত আরেকটি নির্বাচনের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়ে চলেছে, তা তো কোনো ফল দেবে না। ‘ব্যাকফুটে’ খেলতে হলে কিছু কৌশল তো বদলাতে হবে। না হলে আবার হরতাল-অবরোধের পথে কি তারা যেতে চায়?
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্তত তিনটি দেশে এখন নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সংকট চলছে। শ্রীলঙ্কায় ক্ষমতাসীন দল নির্বাচন এমন নগ্নভাবে প্রভাবিত করে যে কল্পনাও করা যায় না। সেদিন বাংলাদেশের একজন প্রথিতযশা বিশেষজ্ঞ উত্তর প্রাদেশিক কাউন্সিল নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করে এসে বললেন, ওরে সর্বনাশ, বল প্রয়োগ কাকে বলে, ভোট জালিয়াতি নিয়ে কারও টুঁ শব্দটি করার উপায় নেই! এ অবস্থার মধ্যে নির্বাচন হয়ে যাচ্ছে, বিদেশি পর্যবেক্ষকেরাও যাচ্ছেন।
থাইল্যান্ডে বিরোধী দলের আন্দোলনের মুখে সরকার ২ ফেব্রুয়ারি যে মধ্যবর্তী নির্বাচন দিয়েছে, বিরোধী দল তা বর্জন করে একটি অনির্বাচিত ‘পিপলস কাউন্সিল’-এর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করার দাবি করছে। প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রা হাসিমুখে নির্বাচনের দিকে এগিয়ে চলেছেন। বিরোধী পক্ষের আন্দোলন-অবরোধ সত্ত্বেও তিনি অবিচল। বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয় বিরোধীরা দখল করে নিলে সরকার তাদের মন্ত্রণালয় অন্য ভবনে স্থানান্তর করে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। বিরোধীদের বিক্ষোভ দমনে কোনো রকম বল প্রয়োগ না করার জন্য প্রধানমন্ত্রী পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন। আন্দোলন-বর্জন নিয়ে তাঁর মাথাব্যথা নেই। গত রোববার থাই প্রধানমন্ত্রী ইংলাক বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ায় অভিনন্দনবার্তা পাঠিয়েছেন।
কম্বোডিয়ার অবস্থা আরও খারাপ। সেখানে ১৯৭৯ সাল থেকে প্রধানমন্ত্রী হুনসেন ক্ষমতায় রয়েছেন। গত বছর জুলাই মাসের নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ রয়েছে হুনসেনের বিরুদ্ধে। কিন্তু হুনসেন নির্বিকার। নির্বাচন হয়, কিন্তু বিরোধী দল সুবিধা করতে পারে না। কারণ, হুনসেনের সরকার ক্ষমতায় এসেছিল পূর্ববর্তী পলপটের খুনি সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে। ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ সালের মধ্যে পলপট সরকার অন্তত ২০ লাখ কম্বোডীয় নাগরিককে নির্মমভাবে হত্যা করে। ‘সমাজতন্ত্রের’ নামে তারা ভিয়েতনামি, মুসলিম ও বিশেষভাবে ‘বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীদের’ নির্মূল করার অভিযান চালায়। যার চোখে চশমা, তাকেই বুদ্ধিজীবী বলে চিহ্নিত করে হত্যা করা হয়। একপর্যায়ে ভিয়েতনামের বাহিনী অভিযান চালিয়ে পলপট চক্রকে উত্খাত করে। হুনসেন সরকার ক্ষমতায় আসে। সেই থেকে ওই সরকার চলছে।
গত মাসে কম্বোডিয়ার বিরোধী দল আন্দোলন শুরু করলে বল প্রয়োগে দমন করা হয়। পোশাককর্মীদের বেতন বৃদ্ধির আন্দোলনকে সামনে রেখে বিরোধী দল আন্দোলন করছিল। পোশাককর্মীরা মজুরি দ্বিগুণ করে ১৬০ ডলার দাবি করছিল। এরপর আন্দোলন দমন করা হয়। তখন বিরোধীদলীয় শ্রমিক ইউনিয়নগুলো গার্মেন্টস শ্রমিকদের ধর্মঘট ও মিছিল বন্ধ করে কাজে যোগদানের আহ্বান জানায়। অবস্থা এখন ঠান্ডা।
আপাতত সেখানে বিরোধী দল ‘ব্যাকফুটে’ খেলছে। কারণ, বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে হাজারো অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও, তাদের একটা প্লাস পয়েন্ট। তারা পলপট আমলের বিভীষিকাময় অধ্যায়ের অবসানে সামনের সারিতে ছিল।
বাংলাদেশে বিরোধী দল বিএনপি এখন ‘ব্যাকফুটে’ খেলে কতটা সাফল্য ছিনিয়ে আনতে পারবে, তা নির্ভর করবে তাদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞার ওপর। জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে সংস্রব ত্যাগ এবং হরতাল-অবরোধ-সহিংসতা বন্ধ রেখে শান্তিপূর্ণ যৌক্তিক আন্দোলনই হবে তাদের উত্কৃষ্ট দাওয়াই। এর মধ্য দিয়ে আলোচনা ও আগামী নির্বাচনের পথ প্রশস্ত হতে পারে।
আব্দুল কাইয়ুম: সাংবাদিক।

অস্ত্রের জোরে ক্ষমতায় থাকা যাবে না: খালেদা জিয়া

Monday, January 20, 2014

বর্তমান সরকার জনগণের সরকার নয় দাবি করে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, তারা জনগণের সরকার নয় বলেই দেশের মানুষের ওপর নির্বিচারে অত্যাচার নির্যাতন চালাচ্ছে।
এই সরকার একটি দুর্নীতিবাজ সরকার। গত পাঁচ বছরে তারা জনগণের সম্পদ লুট করেছে। তিনি বলেন, সরকারের ক্ষমতার মেয়াদ অতি অল্প দিনের। অল্প দিনেই তাদের বিদায় নিতে হবে। অস্ত্রের জোরে ক্ষমতায় থাকা যাবে না। বিকালে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিএনপি আয়োজিত গণসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

খালেদা জিয়া বলেন, এই দুর্নীতিবাজ সরকার দেশের কল্যাণ করতে পারবে না। তারা সবচেয়ে বেশি ভয় পায় দেশের জনগণকে। ২৯শে ডিসেম্বর মার্চ ফর ডেমোক্রেসি আহবান করেছিলাম। জাতীয় পতাকা নিয়ে মানুষ আসবে। কিন্তু দুই দিন আগে আমাকে গৃহবন্দি করেছে। সারা দেশে তারা অবরোধ করেছে। এই হল সরকার। যদি জনগণের সরকার হতো তাহলে তারা তা করতে পারতো না। আমরা ক্ষমতায় ছিলাম। আমরা যখন ক্ষমতায় ছিলাম তখন কোন দিন এভাবে কর্মসূচিতে বাধা দেইনি। তিনি বলেন, জনগণ আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অনাস্থা দিয়েছে। তারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়নি। তারা সম্পূর্ণ অবৈধ সরকার। খালেদা জিয়া বলেন, অস্ত্রের জোরে ক্ষমতায় থাকা যায় না। বেশি দিন থাকা যাবে না।
সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার কথা উল্লেখ করে খালেদা জিয়া বলেন, কারা হামলা করছে সরকার তা বের করতে পারছে না। কিন্তু দায় চাপাচ্ছে বিরোধী দলের ওপর। সরকার মানুষের নিরাপত্তা দিতে পারছে না। এর দায় সরকারকেই নিতে হবে।
সাতক্ষীরায় সরকারি বাহিনী সাধারণ মানুষের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, সেখানে এমন অত্যাচার নির্যাতন চালাচ্ছে যে মানুষের বিশ্বাস হচ্ছে না দেশের আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এতো নির্মম কাজ করছে। এ নিয়ে মানুষের মধ্যে সন্দেহ আছে। তিনি বলেন, স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম। স্বাধীনতার ৪২বছর পর আবার আমরা স্বাধীনতা হারাতে যাচ্ছি। তাই আবার আমাদের দেশ রক্ষার জন্য যুদ্ধ করতে হবে। খালেদা জিয়া বলেন, মানুষ নির্বাচনে সরকারকে প্রত্যাখ্যান করেছে। মানুষ ভোট দিতে যায়নি। এটি কোন নির্বাচন নয়। অবিলম্বে নির্বাচন দিন। জনপ্রিয়তা যাচাই করুন।
সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, মনে করে থাকেন গায়ের জোরে ক্ষমতায় থাকবেন এটা হবে না। অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা চাই না। শান্তি চাই। অবিলম্বে নির্বাচনের জন্য আলোচনার পরিবেশ তৈরি করুন। আমরা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি সারা দেশে চালিয়ে যেতে চাই।
পেশাজীবীদের ওপর অত্যাচার নির্যাতন হচ্ছে উল্লেখ করে খালেদা জিয়া বলেন, আইনজীবীদের ওপর হামলা হচ্ছে। তাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। সাংবাদিকদের ওপর হত্যা নির্যাতন চালানো হচ্ছে। জেলে নেয়া হচ্ছে। এভাবে গুন্ডা বাহিনী দিয়ে শেষ রক্ষা হবে না। এই সরকার সন্ত্রাসীদের ছেড়ে দিচ্ছে উল্লেখ করে তিনি একটি পত্রিকার কপি তুলে ধরে বলেন, এই সরকার সন্ত্রাসীদের সরকার।
তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন আজ্ঞাবহ ও মেরুদণ্ডহীন নির্বাচন কমিশন। এই কমিশন দিয়ে কোন নির্বাচন স্ষ্টুুভাবে করা যাবে না। সরকারের বাইরে তারা যেতে পারে না। কথা বলার কোন সাহস রাখে না। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে ভোট পড়েনি। কিন্তু ফল ঘোষণার জন্য তিন দিন সময় নিয়ে নির্লজ্জভাবে ৪০ ভাগ ভোট দেখিয়েছে।
বেলা দুইটা থেকে শুরু হওয়া সমাবেশে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বিএনপি ও ১৮ দলের কেন্দ্রীয় নেতারা বক্তব্য রাখেন।

আজ-কাল-পরশু- বিএনপি এখন কী করবে by মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর

খালেদা জিয়াকে ধন্যবাদ, তিনি তাঁর আন্দোলনের কৌশল পরিবর্তন করেছেন। আন্দোলনের পাশাপাশি সংলাপ চালিয়ে যাওয়ার যে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন, সেটাও প্রশংসাযোগ্য।
দেখা যাক নতুন কৌশল নিয়ে তিনি কত দূর এগোতে পারেন। আশা করি খালেদা জিয়া, বিএনপি বা ১৮-দলীয় জোট এখন উপলব্ধি করতে পারছে যে ৫ জানুয়ারি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগকে মোকাবিলা করা আরও কঠিন কাজ হবে। নির্বাচন যতই প্রশ্নবিদ্ধ ও প্রহসনের হোক না কেন, বাস্তব সত্য হলো: একটা নির্বাচন হয়েছে। ১৪-দলীয় জোট নতুন সরকার গঠন করেছে। এটা বাস্তব। এই বাস্তবতাকে মেনে নিয়েই বিএনপিকে নতুন আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। বর্তমান সরকারকে অবৈধ বলা যাবে না, জনসমর্থিতও বলা যাবে না। এটা নিয়ম রক্ষার প্রশ্নবিদ্ধ সরকার।

বিএনপি বাংলাদেশের একটি বড় দল। তবে গত এক বছরে প্রমাণিত হয়েছে বিএনপি লড়াকু দল নয়। বিএনপির সামনে এখন বড় সংকট। জানি না বিএনপি এই সংকট কীভাবে মোকাবিলা করবে। লেখার শুরুতেই বিএনপির কিছু সাফল্যের কথা তুলে ধরতে চাই। সাম্প্র্রতিককালে টিভি টক শো ও সংবাদপত্রে বিএনপির নানা সমালোচনা হচ্ছে, যা সব সময় পুরোপুরি ন্যায্য নয়। সমালোচকেরা আংশিক বর্ণনা করেন, যা অনুচিত। যেসব কথা মিডিয়ায় সে রকমভাবে আসেনি। তা হলো—১. ঢাকায় ব্যর্থ হলেও বিভিন্ন জেলা শহরে বিএনপি ও ১৮-দলীয় জোট ভালোভাবেই আন্দোলন করেছে। হরতাল ও অবরোধ প্রায় সব জেলায়ই সফল হয়েছে। ২. আওয়ামী লীগের সরকার নানা চেষ্টা করার পরও ৩০০ আসনের একটিতেও বিএনপির কাউকে দিয়ে নির্বাচন করাতে পারেনি। সারা দেশে বিএনপির নেতা-কর্মীরা দলের সিদ্ধান্তের প্রতি বিশ্বস্ত ছিলেন। এটা একটা দলের জন্য কম কৃতিত্ব নয়। ৩. নির্বাচন কমিশন চক্রান্ত করে ‘বিএনএফ’ নামে একটি ভুয়া দল সৃষ্টি করলেও বিএনপির একজন নেতাও ওই দলে যোগ দেননি। সরকারের ‘বিএনএফ’ পরিকল্পনা ভন্ডুল হয়েছে। ৪. ১৮-দলীয় জোটের আন্দোলনের ফলেই সরকার একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন করতে পারেনি। সরকার যদি আগামী পাঁচ বছরও ক্ষমতায় থাকে, তবু এক দিনের জন্যও এই কলঙ্ক মোচন হবে না। ৫. সরকার প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন করে এবার ভালোভাবে প্রমাণ করেছে দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন বাংলাদেশে সম্ভব নয়। এটাও বিএনপির বিজয়।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত সময়কে আন্দোলনের একটা অধ্যায় বিবেচনা করতে হবে। দ্বিতীয় অধ্যায়ে যাওয়ার আগে বিএনপির প্রথম কাজ হবে আত্মসমালোচনা করা (যা কেউ করতে চায় না)। আত্মসমালোচনা না করলে বিএনপি তার ভুলগুলো চিহ্নিত করতে পারবে না। বলাবাহুল্য, বিএনপি গত আন্দোলনে প্রচুর ভুল করেছে। প্রথমে ভুলগুলো স্বীকার করতে হবে। ভুল স্বীকার করলেই পরবর্তী পদক্ষেপগুলো মোটামুটি ঠিকভাবে নিতে পারবে। ভুলগুলো প্রচারের জন্য নয়। নিজেদের অবস্থান বোঝার জন্য খুব জরুরি।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক হিসেবে আমরা বিএনপির কী কী ভুল দেখেছি? ১. বিএনপি ঢাকা শহরে তার শক্তি সম্পর্কে সচেতন ছিল না। ঢাকায় বিএনপির অন্তত পাঁচ হাজার লড়াকু কর্মী নেই। ২. দলের শীর্ষস্থানীয় ১০ জন নেতা গ্রেপ্তার হওয়ার পর দলটি কাবু হয়ে গেছে। ৩. কারারুদ্ধ সাদেক হোসেন খোকা ছাড়া ঢাকায় আন্দোলন সংগঠিত করার মতো আর যোগ্য নেতা নেই। ৪. কেন্দ্রের বেশির ভাগ নেতাই আন্দোলনমুখী নন, মিডিয়ামুখী। বেশির ভাগই বুদ্ধিজীবী টাইপের নেতা। একটি বড় দলে অন্তত ৫০ জন আন্দোলনমুখী নেতা ও পাঁচ হাজার আন্দোলনমুখী কর্মী থাকতে হয়, যাঁরা জান বাজি রেখে দলের কর্মসূচি রাজপথে বাস্তবায়ন করতে পারেন। গত তিন মাসের আন্দোলনে দেখা গেছে বিএনপিতে সেই রকম নেতা ও কর্মী খুব কম। নয়াপল্টনের জনসভায় যোগ দেওয়া, মিছিল করা, সেমিনার করা আর জান বাজি রেখে রাজপথে আন্দোলন করা এক কথা নয়। ৫. বিএনপি একটি পেটিবুর্জোয়া সনাতন রাজনৈতিক দল। বিপ্লবী দল নয়। কাজেই বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা গ্রেপ্তারের ভয়ে পালিয়ে বেড়াবেন, তা সমর্থনযোগ্য নয়। দলের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সরকারের হাতে গ্রেপ্তার হবেন, এটাই স্বাভাবিক। গ্রেপ্তার হলে তো বড় নেতা হওয়া যায়। রাজনৈতিক কারণে গ্রেপ্তার হওয়া রাজনৈতিক নেতার একটা শর্ত। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব পাকিস্তান আমলে বারবার গ্রেপ্তার না হলে এত বড় নেতা হতে পারতেন কি? ৬. নির্বাচন একবার করে ফেলতে পারলে আওয়ামী লীগকে টলানো কঠিন হবে। নির্বাচন প্রতিহত (বানচাল) করার মতো শক্তি বিএনপির নেই। নির্বাচন সম্পন্ন করার জন্য ঢাকায় ও অন্যত্র আইনানুগভাবে সেনাবাহিনী, বিজিবি, র‌্যাব ও পুলিশ থাকবে। তাদের পরাস্ত করে নির্বাচন প্রতিহত করতে হবে। এটা কত বড় লড়াই তা বিএনপির হাইকমান্ড অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছে। ৭. গত তিন মাসের আন্দোলনে বিএনপি তার নেতা ও কর্মীর বাইরে (সব নেতা ও কর্মীও রাজপথে ছিলেন না) সাধারণ জনগণকে সম্পৃক্ত করতে পারেনি। কোথায় ছিল তাদের যুবদল ও ছাত্রদল? (কয়েকজন অবশ্য গ্রেপ্তার হয়েছিলেন আগেই) বেশির ভাগ নেতাই স্লোগান, মিছিল ও জনসভার লোক। আন্দোলনের লোক খুব কম। অনেক নেতাই সুবিধাবাদী। সুসময়ের বন্ধু। এটা এবার প্রমাণিত হয়েছে। তবে একটা কথা সবার বুঝতে হবে, আন্দোলনে জনসম্পৃক্ততা এখন খুব সহজ কাজ নয়। ’৬৮-৬৯-এর গণ-আন্দোলন, ’৭১-এর স্বাধীনতার আন্দোলন বা ’৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মতো ব্যাপক জনসম্পৃক্ততা এখন প্রায় অসম্ভব। তবু এখনো কিছুটা সম্ভব হতে পারে মুক্তিযুদ্ধের কোনো ইস্যু হলে বা ধর্মবিষয়ক কোনো ইস্যু হলে। ৮. ১৮-দলীয় জোটের আন্দোলনে যে ব্যাপক সন্ত্রাস ও সহিংসতা হয়েছে, তা সাধারণ মানুষ সমর্থন করেননি। এসব হিংসাত্মক ঘটনায় ও সাধারণ মানুষের প্রাণহানিতে অনেকে ক্ষুব্ধ হয়েছেন। এতে লাভ হয়েছে আওয়ামী লীগের। জনগণের ক্ষোভ ও সমালোচনাকে তারা ক্যাশ করেছে। ব্যাপকভাবে প্রচার করেছে। খালেদা জিয়া যতই বলুন, ‘সহিংসতা বিএনপি করেনি’, তা বাস্তবতার ধোপে টেকেনি। সন্ত্রাস ও সহিংসতা দিয়ে নির্বাচন প্রতিহত করা সম্ভব হয়নি, উল্টো বিএনপির বদনাম হয়েছে। আন্দোলনে সন্ত্রাস ও সহিংসতা পুরো আন্দোলন সম্পর্কেই দেশে-বিদেশে একটা নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করবে, তা বিএনপি আগে বুঝতে পারেনি।
এগুলো আমাদের প্রধান পর্যবেক্ষণ। এর বাইরে হয়তো আরও অনেক বিষয় থাকতে পারে। বিএনপির নিজস্ব কিছু পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতাও থাকতে পারে। নিঃসন্দেহে তা হবে খুব মূল্যবান।
আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্বে বিএনপি কী করবে, কী কৌশল নেবে, তা আমরা বিস্তারিত জানি না। তবে সরকার তথা আওয়ামী লীগ এখন অনেক শক্তিশালী। প্রহসনের নির্বাচনের কলঙ্ককে তারা গায়ে মাখছে না। আমাদের ধারণা, সরকার সংলাপের নাটক করবে কিন্তু অর্থবহ সংলাপ করবে না। সংলাপ করলেও আওয়ামী লীগ ‘নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ মানবে না। আওয়ামী লীগ এমন কোনো পদক্ষেপ নেবে না, যার মাধ্যমে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে ও জয়লাভ করার সুযোগ পাবে। নির্বাচন থেকে যেকোনোভাবে বিএনপিকে দূরে রাখাই আওয়ামী লীগের লক্ষ্য। আমাদের ধারণা ভুল প্রমাণিত হলে আমরা খুশি হব। তবে এই ধারণাগুলো বিএনপিকে মনে রাখতে অনুরোধ জানাই।
২০১৪ সালটা বিএনপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই বছরেই যা কিছু করার বিএনপিকে করতে হবে। শান্তিপূর্ণ আন্দোলন, দেশি-বিদেশি চাপ সৃষ্টি করে সরকারকে নির্বাচন দিতে বাধ্য করা। এই বছরটি যদি সরকার নানা টালবাহানায় পার করে দিতে পারে, আমাদের ধারণা, পরিস্থিতি আর বিএনপির অনুকূলে না-ও থাকতে পারে।
বিএনপিকে জামায়াতের সঙ্গ ছাড়ার জন্য বিভিন্ন মহল থেকে বলা হচ্ছে। এমনও শোনা যাচ্ছে, আইনি প্রক্রিয়ায় জামায়াত নিষিদ্ধও হয়ে যেতে পারে। ভোটের কিছু শেয়ার ছাড়া বিএনপির জন্য জামায়াত তেমন প্রয়োজনীয় দল নয়। তা ছাড়া জামায়াতের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ, ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার, সন্ত্রাসী দল ইত্যাদি অভিযোগও রয়েছে। এ রকম বিতর্কিত একটি দলকে সঙ্গে না রাখলে বিএনপির কি খুব বড় রকম ক্ষতি হবে? আমাদের ধারণা, না, তেমন বড় কোনো ক্ষতি হবে না। জামায়াতকে ছাড়লেও জামায়াতের ভোট বিএনপিই পাবে। জামায়াতকে বাদ দিলে বিএনপি আরও অন্তত তিন-চারটি দলকে আন্দোলনে পাশে পাবে, যারা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকাও রাখতে পারবে। নতুন কয়েকটি দল ছাড়াও ব্যাপকসংখ্যক প্রগতিশীল মানুষও বিএনপিকে সমর্থন দিতে পারে, এমনকি ভোটের অধিকার ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলনে রাজপথেও নামতে পারে। জামায়াতমুক্ত বিএনপি নতুন তিন-চারটি দলের সহায়তায় ‘তত্ত্বাবধায়ক’ ইস্যুতে একটা বড় গণ-আন্দোলন গড়ে তুলতে পারবে। বিএনপিকে বুঝতে হবে, জামায়াতের সহায়তায় যে সহিংস আন্দোলন সমপ্রতি হয়েছে, তাতে দলের লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। বরং বিএনপি ব্যাপকভাবে নিন্দিত হয়েছে। জামায়াতের সঙ্গ ছেড়ে জিয়াউর রহমানের বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে পাথেয় করে একটা বড় আন্দোলন গড়ে তুলতে পারে। দ্বিতীয় পর্যায়ে আন্দোলন শুরু করার আগে বিএনপিকে তার মিত্র, জোট, কৌশল, আন্দোলনের চরিত্র, কর্মসূচি ইত্যাদি সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে হবে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে যদি বিএনপি সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে বিএনপির জন্য করুণ পরিণতি অপেক্ষা করছে। বিএনপি ও খালেদা জিয়া নিশ্চয়ই সেটি চান না।
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর: মিডিয়া ও উন্নয়নকর্মী।

সংলাপ-সমঝোতার বিকল্প নেই- শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের ডাক

Friday, January 17, 2014

১৮-দলীয় জোটের প্রধান নেতা ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আর কোনো হরতাল-অবরোধের কর্মসূচি ঘোষণা করেননি। এ জন্য তাঁকে ধন্যবাদ দিতে হয়। কারণ, কয়েক মাস ধরে এই নেতিবাচক কর্মসূচির ফলে বাংলাদেশের জনগণ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে; আন্দোলনের নামে মানুষের প্রাণহানি, ধ্বংসযজ্ঞ, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অচলাবস্থা ও জনজীবনে নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টির এই ধারা আর চলতে দেওয়া উচিত নয়।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের নয় দিন পর গত বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে খালেদা জিয়া নতুন সরকারকে ‘অবৈধ সরকার’ আখ্যা দিলেও এ সরকারের সঙ্গে সংলাপ ও সমঝোতার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন—এটাকেও আমরা ইতিবাচক হিসেবে বিবেচনা করতে চাই। কারণ, সংলাপ-সমঝোতা ছাড়া চলমান রাজনৈতিক সমস্যা থেকে উত্তরণের কোনো বিকল্প নেই। সরকারের ‘বৈধতা’র প্রশ্নটির থেকে এখন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দুই পক্ষের মধ্যে কার্যকর রাজনৈতিক সম্পর্কের সূচনা ঘটানো। শুধু সংলাপের মাধ্যমেই সেটির সূচনা ঘটানো সম্ভব, যেখানে সমঝোতার মানসিকতা অপরিহার্য।
হরতাল-অবরোধের মতো সহিংস কর্মসূচির উল্লেখ না করে খালেদা জিয়া ‘গণতন্ত্রের জন্য শান্তিপূর্ণ আন্দোলন অব্যাহত’ রাখার যে ঘোষণা দিয়েছেন, তাতে আমাদের পরিপূর্ণ স্বস্তি বোধ হয় না। কারণ, তাঁর ভাষায় যে ‘শান্তিপূর্ণ আন্দোলন’ এত দিন চলে এসেছে, তা ‘অব্যাহত’ রাখা হলে জনজীবনে শান্তি ফিরে আসবে না। সবকিছুর আগে এই সহিংস ও ধ্বংসাত্মক আন্দোলনের ধারা বন্ধ করতে হবে। মুখে ‘শান্তিপূর্ণ’ আন্দোলনের কথা বলা আর কার্যত জবরদস্তিমূলক, সহিংস, আতঙ্ক সৃষ্টিকারী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়ে জনজীবনে অচলাবস্থা সৃষ্টি করা স্ববিরোধিতা। বিরোধী জোটের কর্মসূচিগুলোতে যেসব সহিংসতা ঘটেছে, সেগুলোর দায়দায়িত্ব সরকারের ওপর চাপিয়ে বিরোধী জোট দায়মুক্ত থাকতে পারে না। উপর্যুপরি সহিংস কর্মসূচির মধ্য দিয়ে জনসাধারণের সঙ্গে বিরোধী জোটের যে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি হয়েছে, তা দূর করতে বিরোধী জোটের এযাবৎকালের আন্দোলনের ধারা ‘অব্যাহত’ রাখার ভাবনাটি বাদ দিয়ে ‘শান্তিপূর্ণ আন্দোলন’ কথাটির প্রতি আন্তরিকতার প্রকাশ ঘটাতে হবে বাস্তব ক্ষেত্রে।
সরকারকেও দমন-পীড়নের কৌশল পরিত্যাগ করে বিরোধী দলগুলোর সংবিধানপ্রদত্ত অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার অজুহাতে বিরোধী জোটকে গণতান্ত্রিক অধিকারগুলো থেকে বঞ্চিত করা এবং তাদেরকে সম্পূর্ণ কোণঠাসা করে রাখার কৌশল বজায় রেখে সরকার সুষ্ঠুভাবে দেশ পরিচালনা করতে পারবে না। অর্ধেকের বেশি আসনে একেবারেই ভোট না হওয়া এবং অবশিষ্ট আসনগুলোতে প্রধান বিরোধী দলের অংশগ্রহণ না থাকায় নতুন সরকারের রাজনৈতিক বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তি দুর্বল। এই প্রেক্ষাপট স্বীকার করে নিয়ে সরকারকে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক সদাচরণের নীতি গ্রহণ করে সামগ্রিক সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রয়াস নিতে হবে; সর্বোপরি সমঝোতার মানসিকতা নিয়ে সংলাপ শুরু করতে হবে। বিরোধী জোটকে রাজনৈতিক আন্দোলনে বাধা না দিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে তা পালনে সহযোগিতা করা সরকারের দায়িত্ব বৈকি।

সরল গরল- খালেদা জিয়ার ভ্রান্তিবিলাস by মিজানুর রহমান খান

Thursday, January 16, 2014

খালেদা জিয়ার গতকালের বক্তব্যের নতুন ইঙ্গিত হচ্ছে বিদ্যমান নির্বাচনী ও সংসদ গঠনব্যবস্থা পরিবর্তনের দিকে ইঙ্গিত করা।
বলেছেন, সংসদে বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার মানুষ আনবেন। তিনি নির্বাচনকালীন সরকার চান। তবে তিনি তাঁর প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংসদ ও নির্বাচনপদ্ধতির যুগোপযোগী সংস্কার নিয়ে আলোচনা চান না। মনে হচ্ছে, বিধ্বস্ত বিএনপির নেতা-কর্মীদের চাঙা রাখতে ভাষণটিকে একটি ক্ষমতামুখী মেজাজ দিতে চেষ্টা করেছেন তিনি। কিন্তু নিজেকে কিংবা দলকে বদলানোর ইঙ্গিত দিলেন না। তাঁর দলের গণতন্ত্র যে মৃত, তা তিনি দেখেননি। এই ভাষণ তাই ভীষণ হতাশ করেছে।

খালেদা জিয়া বলেছেন, ‘নির্বাচনের নামে গত ৫ জানুয়ারির আওয়ামী প্রহসন হাতে-কলমে প্রমাণ করেছে, নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি কতটা যৌক্তিক। প্রমাণ হয়েছে, দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ হতে পারে না।’ তাঁর এ বক্তব্যে নতুনত্ব নেই।
কুড়ি দফা সংক্ষিপ্ত রূপরেখা দিতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘সকলের অংশগ্রহণে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ পন্থায় ক্ষমতা হস্তান্তরের একটা অস্থায়ী রূপরেখা নির্ণয় করা হবে।’
আমরা জানতে চাই, এটা তিনি ক্ষমতায় গিয়ে করবেন, নাকি আগামী নির্বাচনে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকারের সঙ্গে ‘স্থায়ী রূপরেখা’ নিয়ে কথা বলবেন। যদি তিনি নিজে ক্ষমতায় গিয়ে ‘স্থায়ী রূপরেখা’ দিতে চান, তাহলে তাকে ‘অস্থায়ী রূপরেখা’ দিতে হবে। তবে স্থায়ী বা অস্থায়ী যে ধরনের রূপরেখাই হোক না কেন, তিনি মানবেন যে ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সমঝোতা হতেই হবে।
তাঁর সংক্ষিপ্ত রূপরেখার কিছু বিষয় তিন জোটের রূপরেখায় ছিল। লক্ষণীয় যে, তিনি এরশাদ ও গৃহপালিত বিরোধী দল সম্পর্কে টুঁ-শব্দটি উচ্চারণ করেননি। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের ‘ত্যাগ-তিতিক্ষা’র কবর তাঁরা দুজনে মিলে কীভাবে রচনা করেছেন, সেদিকে তিনি যাননি। তাঁর সুলিখিত ভাষণ সরকারে গিয়ে কী করবেন, তার একটি ফিরিস্তি মনে হয়েছে।
তাঁর ৫ নম্বর ঘোষণা: ‘নির্বাচনপদ্ধতির যুগোপযোগী এবং সংসদে শ্রেণী ও পেশার প্রতিনিধিত্ব এবং মেধাবী, যোগ্য ও দক্ষ নাগরিকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’ ৯ নম্বরে বলা হয়েছে, ‘দেশের সকল মতের কৃতী ও মেধাবী নাগরিকদের রাজনীতি, সরকার পরিচালনা ও জাতীয় ক্ষেত্রে অবদান রাখার সুযোগ সৃষ্টি ও এর জন্য উপযুক্ত কাঠামো গড়ে তোলা হবে।’
বিএনপির চেয়ারপারসন যদি এর মধ্য দিয়ে সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন, প্রত্যক্ষ ভোটে নারীদের সংসদে আনার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ, ‘টক শোওয়ালা’ কিংবা ‘সিঁধেল চোরদের’ সংসদের উভয় কক্ষে আনার দিকে ইঙ্গিত দিয়ে থাকেন, তাহলে তাকে স্বাগত জানাই। কিন্তু তিনি সম্ভবত ভুলে গেছেন, এই বাস্তবতা বাংলাদেশে এখন অনুপস্থিত যে শুধু এই কথায় চিঁড়ে ভিজবে। তিনি যখন রাজনীতিতে এসেছিলেন তখনকার তাঁর লিখিত বক্তৃতা খুঁজলেও পাওয়া যাবে ‘বিচার বিভাগ ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সুনিশ্চিত করা হবে কিংবা স্থানীয় সংবাদব্যবস্থাকে কার্যকর ও শক্তিশালী করা হবে।’
মনে হচ্ছে, তিনি প্রায় পাঁচ বছর ধরে নবম সংসদ বয়কট করে চলার পরে তাঁকে বাদ দিয়ে দশম সংসদ গঠনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার মতো বাংলাদেশের পরিবর্তিত বাস্তবতা তিনি বিবেচনায় নিতে বেশ খানিকটা অপারগ থেকেছেন।
তিনি আগের মতোই অলংকারবহুল বাণী, যাকে সস্তা রাজনৈতিক বুলি হিসেবে চিহ্নিত করা যায়, তেমন পরিভাষা ব্যবহার করার প্রবণতা পরিহার করতে পারেননি। যেমন বলেছেন, ‘নির্ভেজাল গণতন্ত্রই হবে আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতি।’
তিনি স্বীকার করবেন যে বর্তমান সরকারকে ‘সংবিধানের অপব্যাখ্যাকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করে তাঁর নিজের লোকসান হ্রাস করা যাবে না। যদি স্বীকার করতে হয় যে, ‘৫ জানুয়ারি বাংলাদেশে গণতন্ত্র আরেকবার নিহত হয়েছে। বাংলাদেশের গণতন্ত্র এখন মৃত।’ তাহলে তাঁকেও স্বীকার করতে হবে যে তাঁর ভন্ডুল হওয়া ‘গণতন্ত্রের অভিযাত্রা’ সফল হলেও তাতে আমাদের কাঙ্ক্ষিত ‘গণতন্ত্রের অভিযাত্রা’ ঘটত না।
আজকের বাংলাদেশে গণতন্ত্রের যে শবযাত্রা চলছে তার দায় কমবেশি প্রধানত উভয়কেই গ্রহণ করতে হবে। লন্ডনের দি ইকোনমিস্ট এবং ভারতের হিন্দুস্তান টাইমস উভয়ে বলেছে, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বাংলাদেশ হেরে গেছে। সেই অর্থে বাংলাদেশে গণতন্ত্র নিশ্চয় এখন মৃত কিংবা কোমায়। কিন্তু সেটা অবশ্যই খালেদা জিয়ার ব্যাখ্যা ও তাঁর সংকীর্ণ দর্শন অনুযায়ী নয়। তাঁর মন্তব্য, ‘এ দেশের মানুষ তাদের রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতি হিসেবে গণতন্ত্রকে বেছে নিলেও বারবার এখানে গণতন্ত্রকে হত্যা করা হয়েছে।’ তিনি এর ব্যাখ্যা দেননি। তবে আমরা বেশ বুঝতে পারি, এর মাধ্যমে তিনি বস্তুত চতুর্থ ও পঞ্চদশ সংশোধনীকে ইঙ্গিত করেছেন। গণতন্ত্রের চলতি শবযাত্রায় তাঁর নিজের বা তাঁর দলের কোনো দায় তিনি স্বীকার করেননি। এবং এ-ও বুঝতে পারি, বিএনপির কেউ এত বড় শোচনীয় পরাজয়ের পরও পদত্যাগ করবেন না। তাঁর পুরো লিখিত বক্তৃতা পাঠ এবং সেখানে ঢুকে পড়া দলীয় কর্মীদের করতালি মুখরিত সংবাদ সম্মেলনে তাঁর উৎফুল্ল উপস্থিতি মনে হয়েছে, তিনি নিজেকে অভ্রান্ত মনে করেন। কোনো কিছুর জন্যই যেন অনুশোচনা নেই।
২০০১ সালের নির্বাচনের পরও তিনি আভাস দিয়েছিলেন, তিনি অতীতের দিকে তাকাবেন না। রিকনসিলিয়েশন করবেন। সে চেষ্টাও তিনি করেননি। সুযোগ পেলে, সুযোগ সৃষ্টি করে তিনি বঙ্গবন্ধুর নিন্দা করেন, শ্রদ্ধা জানান না। প্রতিপক্ষের কাছে যেসব বিষয় সন্দেহাতীতভাবে স্পর্শকাতর, সেসব বিষয়ে তিনি সতর্ক হন না।
তাঁকে অবশ্যই ১৫ ও ২১ আগস্ট সম্পর্কে তাঁর দলের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে হবে। প্রতিপক্ষের জন্য কেবল নয়, নতুন প্রজন্মকে দূষণমুক্ত রাখতেও। তাঁর টুঙ্গিপাড়ায় যাওয়ার দিনে যে শিশু জন্মেছিল, সে ২৩ পেরিয়েছে। খালেদা জিয়া যথার্থ বলেছেন, ‘বিরোধী দলকে যথাযথ গুরুত্ব ও মর্যাদা দেওয়া হবে। ক্ষমা, ঔদার্য, মহানুভবতা, যুক্তিশীলতা দিয়ে নির্ধারিত হবে বিরোধী দলের প্রতি আচরণ। সমঝোতার ভিত্তিতে হানাহানি ও সংঘাতের রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির ধারা ফিরিয়ে আনা হবে।’ এসব কথা ভোট টানতেই কি? আওয়ামী লীগকে জয় করতে চাইলে ১০ জানুয়ারির আগের অবিসংবাদিত মহান নেতার প্রতি যথাশ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ ঘটানো পূর্বশর্ত। ২০ জানুয়ারি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ‘মহান স্বাধীনতার ঘোষকের’ জন্মদিনে অনুষ্ঠান করবেন। ভালো কথা। সেখানেই নির্বাচনোত্তর সংকল্প অনুযায়ী ক্ষমা, ঔদার্য, মহানুভবতা, যুক্তিশীলতার প্রথম নজির স্থাপন করুন।
মসনদে গিয়েই কেবল আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঔদার্য ও মহানুভবতা দেখাবেন, সেটা কেবল প্রধানমন্ত্রীর পদে থেকেই সম্ভব, এই বিভ্রান্তিমূলক চটকদার কথাবার্তা আর কাম্য নয়। তাঁকে ও তাঁর দলকে এখনই প্রমাণ দিতে হবে, আওয়ামী লীগের সঙ্গে তিনি আগে কী করেছেন আর কী করবেন।
সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার বিষয়ে তিনি এবারই প্রথম একটি নতুন মাত্রা যুক্ত করেছেন। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে হামলার সঙ্গে জড়িত প্রকৃত অপরাধীদের শাস্তি এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ প্রদানের দাবি জানিয়েছেন। বলেছেন, ‘এখন যদি এসব পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে আগামীতে বিচার বিভাগীয় তদন্ত এবং প্রয়োজনবোধে জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থাকে সম্পৃক্ত করে উপযুক্ত তদন্তের মাধ্যমে সকল অপরাধীকে চিহ্নিতকরণ ও শাস্তি প্রদানের ব্যবস্থা করা হবে।’ এটা যদি তাঁর সত্যিকারের অবস্থান হয়ে থাকে তাহলে বর্তমান নিয়মরক্ষার সরকারকে বলব, খালেদা জিয়ার এ মডেল এখনই গ্রহণ করতে। ২০০১ সালে নির্বাচনের পরে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক হামলার ক্ষেত্রেও জাতিসংঘের ওই মডেল প্রয়োগ করুন।
বর্তমান সরকার খালেদা জিয়ার কথায় বিপজ্জনক সরকার। কিন্তু তাঁকে এটাও মানতে হবে, গণতন্ত্রের জন্য বিএনপিও বিপজ্জনক। ‘৫ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশ আবার পিছিয়ে পড়ল। পুরোপুরি গণতন্ত্রহীন হয়ে পড়ল।’ এই কথা যদি সত্যি হয় তাহলে তিনি নিশ্চয় মনে করবেন যে, ৫ জানুয়ারির আগ পর্যন্ত বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছিল। আর সেই অগ্রসরমাণ বাংলাদেশে তাঁর ভূমিকাও জানা জরুরি। কেন তিনি জনগণের নির্বাচিত সংসদকে বয়কট করেছিলেন?
বাস্তবতা হলো দুই দল ও তার নেতা-নেত্রীরা আইনের শাসন ও সুশাসন দিতে পদ্ধতিগতভাবে জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নির্বাচন নির্বাচন খেলা খেলছিলেন। সেই খেলায় বিএনপি এবার যোগ দিতে না পারার পরিণতি হলো বাংলাদেশের পুরোপুরি গণতন্ত্রহীন হয়ে পড়া। অনেকেই মানবেন, ‘একটি অবৈধ সরকারের কোনো দায়িত্ববোধ থাকে না জনগণের প্রতি। এমন একটি সরকার দীর্ঘায়িত হওয়া খুবই বিপজ্জনক।’ কিন্তু অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের চর্চাবিমুখ বিরোধী দলের অস্তিত্ব দীর্ঘায়িত হওয়াটাও কম বিপজ্জনক নয়। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম নির্বাচনসর্বস্ব দেখাটা এক বিরাট ভ্রান্তিবিলাস।

মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com

খালেদা জিয়ার পুরো বক্তব্য @১৫ জানুয়ারি ২০১৪

Wednesday, January 15, 2014

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
প্রিয় সাংবাদিকবৃন্দ,
আসসালামু আলাইকুম।

শীতের এই পড়ন্ত বিকেলে আমি আপনাদের স্বাগত: জানাচ্ছি।
ইংরেজি ২০১৪ সালের সূচনায় গত ৫ জানুয়ারি আমাদের দেশে গণতন্ত্র আরেকবার নিহত হয়েছে। বাংলাদেশে গণতন্ত্র এখন মৃত। এদেশের মানুষ তাদের রাষ্ট্রপরিচালনার পদ্ধতি হিসেবে গণতন্ত্রকে বেছে নিলেও বারবার এখানে গণতন্ত্রকে হত্যা করা হয়েছে। জনগণ আবার সম্মিলিত লড়াই-সংগ্রামে গণতন্ত্রকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছে। কিন্তু ৫ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশ আবার পিছিয়ে পড়লো। পুরোপুরি গণতন্ত্রহীন হয়ে পড়লো। তাই আবার নতুন করে শুরু হয়েছে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রাম।
এই সংগ্রামে বাংলাদেশের জনগণের পরাজয়ের ইতিহাস নেই। তাই অনিবার্যভাবে গণতন্ত্র আবারো পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে। মানুষ আবারো ফিরে পাবে তাদের ভোটের অধিকার। কারসাজি, সন্ত্রাস, অন্তর্ঘাত ও অপপ্রচার Ñ এই চার অস্ত্রে গণতন্ত্রকে হত্যা করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে প্রলম্বিত করা হয়েছে। এগুলো শিগগিরই অকার্যকর হয়ে পড়বে। জনগণের ভোটে জনগণের সরকার কায়েম হবে ইনশাআল্লাহ্।
ক্ষমা, মহত্ব, ঔদার্য, সংযম, যুক্তিবাদিতা ও সমঝোতার জন্য আমরা বারবার আহ্বান জানিয়েছি। রাজনীতিকে সুন্দর ও গণতন্ত্রকে সুরক্ষার মাধ্যমে বৈচিত্রের মধ্যে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার কথা বলেছি। একদলীয় স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠার অপপ্রয়াসের কাছে আমাদের সে আহ্বান সাড়া জাগাতে পারেনি। এখনো শুনতে হচ্ছে বিনাভোটের সরকারের নির্লজ্জ দম্ভোক্তি।
কারসাজির মাধ্যমে জনগণের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়ে ক্ষমতাকে প্রলম্বিত করার এই প্রহসনকে বাংলাদেশ ও সারা দুনিয়ার গণতন্ত্রকামী মানুষ মেনে নেয়নি। তারা জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা ও মতামতের প্রতিফলন ঘটে এমন একটি নির্বাচন আয়োজনের কথা বারবার বলছেন। তার জবাবে বলা হচ্ছে, কারো কাছে মাথা নত করবো না। এই উক্তি স্পর্ধার। এই উক্তি হঠকারি স্বৈরশাসকের। ইতিহাস সাক্ষী, এ ধরণের উক্তির ফলাফল ও পরিণাম কখনো শুভ হয় না।
কেবল বিএনপি’র নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট নয়। শাসক দল ও তাদের মুষ্টিমেয় দোসরদের বাইরে উল্লেখযোগ্য কোনো রাজনৈতিক দলই নির্বাচনের নামে আওয়ামী প্রহসনে শরিক হয়নি। দেশের মানুষও এই প্রহসনকে বর্জন করেছে। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে কোথাও ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে যায়নি। গড়ে সারাদেশে শতকরা ৫ শতাংশ ভোটও পড়েনি।
অথচ আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশন মারফত প্রায় ৪০ শতাংশ ভোট পড়ার ঘোষণা দেয়ানো হয়েছে। সকলের চোখের সামনে এতোবড় জালিয়াতি করেও তারা এখনো চড়া গলায় কথা বলছে।  প্রতারণা করে, সন্ত্রাস চালিয়ে জনগণের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়ে প্রহসনের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতাকে যারা প্রলম্বিত করেছে, তারা বেশি দিন গায়ের জোরে ক্ষমতায় থাকতে পারবে না। জনগণ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ও জনগণের দ্বারা পুরোপুরি বর্জিত হয়ে এখন তাদের আচরণ ও ভাষা সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক, অশালীন ও বেসামাল হয়ে পড়েছে। গণতন্ত্র হত্যা করেই তারা ক্ষান্ত হয়নি। তারা এখন রাজনীতিকেও সম্পূর্ণ কলুষিত করে ফেলছে।
সাংবাদিক বন্ধুগণ,
নির্বাচনের নামে গত ৫ জানুয়ারির আওয়ামী প্রহসন হাতে-কলমে প্রমাণ করেছে, নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি কতটা যৌক্তিক। প্রমাণ হয়েছে, দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ হতে পারে না।
প্রমাণ হয়েছে, আওয়ামী লীগ তরুণ নতুন ভোটারসহ সারা দেশের মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েছে। প্রমাণ হয়েছে, বর্তমান নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ণ অযোগ্য, ব্যর্থ ও আজ্ঞাবহ। প্রমাণ হয়েছে, কারসাজির এই নির্বাচনী প্রহসন দেশে-বিদেশে কারো কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। সর্বোপরি বাংলাদেশের জনগণ প্রমাণ করেছে যে, তারা এই সরকারকে চান না। তারা নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের পছন্দের প্রতিনিধিদের নির্বাচিত করতে চান। এজন্য আমি আমার প্রিয় দেশবাসীকে আবারো অকুণ্ঠ ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানাই। তারা অন্যায়, অবিচার, ভোটাধিকার হরণ ও গণতন্ত্র হত্যাকারী সরকারের বিরুদ্ধে গত ৫ জানুয়ারি নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছেন। এরজন্য বাংলাদেশের মানুষকে আগামী ২০ জানুয়ারি সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানাবো আমরা। জনগণকে ধন্যবাদ জানাবার জন্য  ওই দিন সারাদেশে বিভাগ, জেলা ও উপজেলা সদরে গণসমাবেশ ও শোভাযাত্রা হবে। ঢাকায় কেন্দ্রীয় সমাবেশ হবে  সোহরাওরার্দী উদ্যানে। এর আগে ১৮ জানুয়ারি শনিবার মহান স্বাধীনতার ঘোষক, বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠাতা, আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জন্মদিন পালিত হবে সারাদেশে। ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে হবে আলোচনা সভা। গণতন্ত্র হত্যা ও জনগণের ভোটাধিকার হরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে আগামী ২৯ জানুয়ারি বুধবার সারাদেশে বিক্ষোভ দিবস পালন করা হবে। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে ঐদিন কালো পতাকা মিছিল হবে।
আমাদের নেতৃবৃন্দ এবং আমি নিজেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চল সফর করবো।
প্রিয় সাংবাদিকবৃন্দ,
আমরা সহিংসতা, হানাহানিতে বিশ্বাস করি না। আমরা শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক ধারায় রাজনীতি করতে চাই।
সেই পথ বন্ধ করলে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তার দায় ক্ষমতাসীন ছাড়া আর কারো নয়। আমরা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক পন্থায় আমাদের আন্দোলন অব্যাহত রাখতে বদ্ধপরিকর। এ আন্দোলন ক্ষমতার জন্য নয়, গণতন্ত্রের জন্য। মানুষের ভোটের অধিকার ও অন্যান্য মৌলিক অধিকার ফিরিয়ে আনার জন্য। এ আন্দোলন নাগরিকদের স্বাধীনতা এবং সর্বস্তরে শান্তি ও সৌহার্দ্য ফিরিয়ে আনার জন্য। বাংলাদেশের এবং সারা দুনিয়ার গণতন্ত্রকামী মানুষ আমাদের সঙ্গে আছে। কাজেই আল্লাহ্র ওপর ভরসা রেখে আস্থার সঙ্গে বলতে চাই যে, ন্যায়, সত্য ও গণতন্ত্রের এ আন্দোলনের বিজয় অনিবার্য ও সময়ের ব্যাপার মাত্র।
ইতোমধ্যে জনগণের গণতান্ত্রিক আন্দোলন তার বিজয়ের প্রথম ধাপ অতিক্রম করেছে। ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতায় থেকে নির্বাচনের জেদ এক হাস্যকর প্রহসনে পর্যবসিত হয়েছে।
১৫৩ আসনে কোনো নির্বাচনই করতে পারেনি তারা। বাকী আসনগুলোতে ভোটারবর্জিত জঘণ্য কারসাজি ও জালিয়াতি চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে তারা কতটা জনবিচ্ছিন্ন। বাংলাদেশের জনগণ বহুমুখী শত অপপ্রচারেও বিভ্রান্ত হয়নি। তারা ওই প্রহসন বর্জন করে সরকারকে সম্পূর্ণ অবৈধ করে দিয়েছে। এখনকার সরকার অগণতান্ত্রিক, জনগণের অনুমোদনহীন এবং কারসাজি ও গায়ের জোরের এক অবৈধ সরকার। এটাই আমাদের আন্দোলনের এক বিরাট সাফল্য।
উপস্থিত সাংবাদিকবৃন্দ,
ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরশাসন-বিরোধী কোনো গণতান্ত্রিক আন্দোলনই ত্যাগ-তিতিক্ষা ছাড়া সফল হয়না। এ আন্দোলনেও জনগণ এবং রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা সীমাহীন ত্যাগ স্বীকার করেছেন।
নির্বাচনের নামে তামাশার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে ৫ জানুয়ারিতেই অন্তত: ২২ জন নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। প্রহসনের একতরফা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে প্রায় দু’শো মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। আন্দোলনে অন্তর্ঘাত সৃষ্টির উদ্দেশ্যে সরকারি এজেন্টদের পরিকল্পিত নাশকতায় আরো অনেক নিরীহ নিরপরাধ মানুষ জীবন দিয়েছেন। পাঁচ বছরে প্রায় ২২ হাজার মানুষকে খুন করা হয়েছে। গুম করা হয়েছে কয়েকশ’ রাজনৈতিক নেতা-কর্মীকে। চালানো হয়েছে সীমাহীন জুলুম-নির্যাতন। জনগণের ভোটের অধিকার রক্ষার দাবিতে আন্দোলন করার দায়ে বিরোধী দলের সিনিয়র নেতৃবৃন্দসহ হাজার হাজার নেতা-কর্মীকে মিথ্যা মামলায় আটক করে কারাগারগুলো ভরে ফেলা হয়েছে। অঘোষিতভাবে রাজনৈতিক তৎপরতা কার্যত: নিষিদ্ধ করে রাখা হয়েছে। সভা-সমাবেশ-মিছিল করতে গেলেও চালানো হচ্ছে গুলি। যৌথবাহিনীর অভিযানের নামে শাসকদলের সন্ত্রাসীদের সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন অঞ্চলে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের বাসস্থানে হামলা চালানো হচ্ছে। তাদের ঘর-বাড়ি ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে, মালামাল লুট করা হচ্ছে। আত্মীয়-স্বজন ও মহিলাদেরকেও ধরে নিয়ে যাচ্ছে। এখনো অনেককে গুম করা হচ্ছে। স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগ এভাবেই মানুষের উপর অত্যাচার করেছে। বিচার বিভাগ, সংবাদপত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ করেছে। জনগণের সমস্ত অধিকার কেড়ে নিয়ে একদলীয় শাসন চাপিয়ে দিয়েছে। গণতন্ত্র হত্যা করেছে। সব প্রতিবাদ অস্ত্রের ভাষায় স্তব্ধ করে দিয়েছে। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সর্বজন শ্রদ্ধেয় মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে পর্যন্ত গৃহবন্দী করতেও তারা কুণ্ঠিত হয়নি। আওয়ামী লীগ এবারো একই অপরাধ ও অপকর্ম করে যাচ্ছে একটু ভিন্ন পন্থায়। এবার তারা মুখে গণতন্ত্রের কথা বলে বিরোধী দলীয় নেতাকে কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই গৃহবন্দী করেছে।

প্রিয় সাংবাদিকবৃন্দ,
এতো কিছু সত্বেও আজ আমি আপনাদের মাধ্যমে দেশবাসীকে আবারো কথা দিচ্ছি, আমরা কখনো আওয়ামী লীগের এসব অপকর্মের পুনরাবৃত্তি বা অনুসরণ করবো না। আমি নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করি যে, বঞ্চিত ও উৎপীড়িত দেশবাসী অচিরেই তাদের ভোটাধিকার ফিরে পাবে। দেশে গণতন্ত্র ফিরে আসবে এবং ভোটের মাধ্যমে তারা তাদের সরকার প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবে।
সেই আস্থা থেকেই আমি আগামী দিনে আমাদের কর্মসূচির একটি সংক্ষিপ্ত রূপরেখা আজ আবারো তুলে ধরতে চাই :
*    বাংলাদেশের মুসলমান - হিন্দু - বৌদ্ধ - খৃষ্টান, পাহাড়ের মানুষ সমতলের মানুষ, ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সকলে মিলে আমরা গড়ে তুলবো জাতীয় ঐক্য, অখ- জাতীয় সত্ত্বা।
*    নির্ভেজাল গণতন্ত্রই হবে আমাদের রাষ্ট্রপরিচালনার পদ্ধতি। সকলের অংশগ্রহণে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ পন্থায় ক্ষমতা হস্তান্তরের একটা স্থায়ী রূপরেখা নির্ণয় করা হবে।
*    সন্ত্রাস, জঙ্গীবাদ, সাম্প্রদায়িকতা কঠোর হাতে দমন করা হবে।
*    দুর্নীতি, দলীয়করণ, স্বজনপ্রীতির ধারা সম্পূর্ণ বন্ধ করা হবে। মেধা ও যোগ্যতাই হবে মূল্যায়নের মাপকাঠি
*    নির্বাচন পদ্ধতির যুগোপযোগী সংস্কার এবং সংসদে শ্রেণী ও পেশার প্রতিনিধিত্ব এবং মেধাবী, যোগ্য ও দক্ষ নাগরিকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেয়া হবে।
*    বিরোধী দলকে যথাযথ গুরুত্ব ও মর্যাদা দেয়া হবে।
*    ক্ষমা, ঔদার্য, মহানুভবতা ও যুক্তিশীলতা দিয়ে নির্ধারিত হবে বিরোধী দলের প্রতি আচরণ।
*    সমঝোতার ভিত্তিতে হানাহানি ও সংঘাতের রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনা হবে।
*    দেশের সকল মতের কৃতি ও মেধাবী নাগরিকদের রাজনীতি, সরকার পরিচালনা ও জাতীয় ক্ষেত্রে অবদান রাখার সুযোগ সৃষ্টি ও এর জন্য উপযুক্ত কাঠামো গড়ে তোলা হবে।
*    সকল দেশের বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা ও বন্ধুত্ব আরো জোরদার করা হবে।
*    জাতীয় ও আঞ্চলিক শান্তি, স্থিতি ও নিরাপত্তা জোরদার করার নীতি ও কৌশল গ্রহণ করা হবে।
*    বিচার বিভাগ ও সংবাদ-মাধ্যমের স্বাধীনতা সুনিশ্চিত করা হবে।
*    জনপ্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসমূহকে দলীয়করণমুক্ত করে দক্ষ ও কার্যকর করা হবে।
*    সুশাসন  ও আইনের শাসন নিশ্চিত করা হবে।
*    স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে কার্যকর ও শক্তিশালী করা হবে।
*    পরিকল্পিত ও কর্মমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হবে।
*    নারী শিক্ষা, নারী অধিকার ও নারীর ক্ষমতায়নকে আরো প্রসারিত করা হবে।
*   ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম জোরদার করা হবে। গ্রামীণ ব্যাংকের স্বাধীনতা নিশ্চিত থাকবে। একমাত্র নোবেল বিজয়ী বাংলাদেশী প্রফেসর ড. মুহম্মদ ইউনূসকে যথাযথ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করা হবে।
*    সকলের মিলিত চেষ্টায়, তরুণদের কর্মশক্তিকে কাজে লাগিয়ে দারিদ্র ও বেকারত্ব হ্রাস করে গড়ে তোলা হবে একটি কর্মমুখর সমাজ।
*    বিদ্যুৎ, জ্বালানি, খনিজ সম্পদ, প্রতিরক্ষা, অর্থনীতি, শিল্প-বাণিজ্য, সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে আমাদের সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা আগামীতে আমরা নির্বাচনী ইশতেহারে বিশদভাবে তুলে ধরবো।
প্রিয় সাংবাদিকবৃন্দ,
বাংলাদেশে আমরা কেবল গণতন্ত্রই হারাইনি। সব দিক দিয়েই অনেক পিছিয়ে পড়েছি। জাতীয় প্রবৃদ্ধির হার আমাদের সময়ের তুলনায় কমে গেছে। মানুষ আরো গরীব হয়েছে। দুর্নীতি, লুণ্ঠন, চাঁদাবাজির কারণে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ শূন্যের কোঠায়। ব্যাংকগুলো লুঠপাট হয়েছে। শেয়ারবাজার লুণ্ঠন করে হাতিয়ে নেয়া হয়েছে প্রায় প্রায় লক্ষ কোটি টাকা। জিনিষপত্রের দাম নাগরিকদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা, শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং শিল্পায়ন ও উন্নয়নের ধারা বজায় রাখতে তারা ব্যর্থ হয়েছে। ঘৃণায়, বিদ্বেষে, বিভেদে, হানাহানিতে সারা দেশ আজ অশান্ত ও অস্থির। সাধারণ মানুষ, ধর্মপ্রাণ মানুষ, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী কেউ আজ শান্তিতে স্বস্তিতে নেই। তবুও কেবলই চলছে একতরফা প্রচার ও অত্যাচার। এই অবস্থা থেকে দেশকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হবে। শান্তি, স্বস্তি, সহঅবস্থান এবং সুস্থ প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। সকলের আগে প্রয়োজন, দুর্বল জনগোষ্ঠী বিশেষ করে সংখ্যালঘুদের নিশ্চয়তা ও নিরাপত্তা বিধান।
প্রহসনের নির্বাচন থেকে জনগণ ও বিশ্ববাসীর দৃষ্টি ফেরাতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ধর্মীয় সংখ্যালঘু, বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর সন্ত্রাসী হামলা শুরু করা হয়েছে। আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাই। এ ব্যাপারে আমরা আগে থেকেই বারবার সতর্ক করে আসছিলাম। কিন্তু সরকারের ইঙ্গিতে প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নির্বিকার ভূমিকায় ইতিমধ্যে অনেক জায়গায় নির্মম ও ন্যক্কারজনক হামলার ঘটনা ঘটে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে বিরোধী দলকে দায়ী করে অপপ্রচার শুরু এবং নিরপরাধ নেতা-কর্মীদের ওপর অত্যাচারের মাত্রা বাড়ানো হয়েছে।  অথচ আক্রান্তদের বক্তব্য ও সংবাদ-মাধ্যমে প্রচারিত তথ্য থেকেই জানা যাচ্ছে যে, শাসকদলের লোকজনই এসব হামলায় জড়িত। আমি সংখ্যালঘু অধ্যুষিত প্রতিটি এলাকায় আমাদের নেতা-কর্মী ও নাগরিকদের এই ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িক হামলার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানাচ্ছি। এই সব জঘণ্য ও সুপরিকল্পিত হামলার ঘটনাকে পুঁজি করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের অপচেষ্টা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানাচ্ছি। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে হামলার সঙ্গে জড়িত প্রকৃত অপরাধীদের শাস্তি, ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ এবং এ ধরণের ন্যক্কারজনক ঘটনার পুনরাবৃত্তি ও বিস্তার রোধে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি করছি। এখন যদি এসব পদক্ষেপ নেয়া না হয়, তাহলে আগামীতে বিচার বিভাগীয় তদন্ত এবং প্রয়োজনবোধে জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থাকে সম্পৃক্ত করে উপযুক্ত তদন্তের মাধ্যমে সকল অপরাধীকে চিহ্নিতকরণ ও শাস্তি প্রদানের ব্যবস্থা করা হবে। সকলে মিলেমিশে শান্তিতে বসবাস এবং অসাম্প্রদায়িকতার ঐতিহ্য আমাদের গৌরব। একে আমরা ভুলুণ্ঠিত হতে দেব না।
সাংবাদিক ভাই-বোনেরা,
বাংলাদেশের মানুষ গণতন্ত্রের জন্য, ভোটের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করছে। এই সংগ্রামের পাশাপাশি আলোচনার মাধ্যমে সংকট নিরসনে আমাদের আহ্বান অব্যাহত রয়েছে।
নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সকলের অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই।
এ ছাড়া দেশে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। আমি আজ আবারো অবিলম্বে সেই লক্ষ্যে সংলাপের উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।
সংলাপ ও সমাঝোতার পরিবেশ সৃষ্টির জন্য অবিলম্বে:
*   সকল রাজনৈতিক নেতা-কর্মীর মুক্তি ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার,
*    গ্রেফতার, নির্যাতন, হামলা, মামলা বন্ধ,
*    বিএনপি সদর দফতরসহ বিরোধী দলের সকল অফিস খুলে দিয়ে স্বাভাবিক তৎপরতার সুযোগ দেয়া,
*    শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির ওপর থেকে অলিখিত বিধিনিষেধ তুলে নিয়ে সভা-সমাবেশ, মিছিল-শোভাযাত্রা ও প্রচারাভিযানে হামলা, হুমকি, বাধা দেয়া বন্ধ করা,     এবং
*    সকল বন্ধ গণমাধ্যমে খুলে দিয়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানাচ্ছি।
প্রিয় সাংবাদিকবৃন্দ,
বর্তমান সংসদ জনপ্রতিনিধিত্বহীন এবং দেশ পরিচালনার ব্যাপারে সরকারের পেছনে জনগণের কোনো অনুমোদন নেই। যে সংবিধানের দোহাই দিয়ে এবং ক্ষমতার স্বার্থে সংবিধানের অপব্যাখ্যা ও অপব্যবহার করে এই নির্বাচনী প্রহসন আওয়ামী লীগ করেছে, তারা নিজেরাই প্রতিপদক্ষেপে সেই সংবিধান লঙ্ঘন করে চলেছে।
কাজেই এ সরকার বৈধ সরকার নয়। একটি অবৈধ সরকারের কোনো দায়িত্ববোধ থাকে না জনগণের প্রতি। এমন একটি সরকার দীর্ঘায়িত হওয়া খুবই বিপজ্জনক।
তাই অনতিবিলম্বে এই বিপজ্জনক সরকারকে সরিয়ে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটিয়ে একটি জনগণের সরকার, একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে পুনরায় সমঝোতা ও সংলাপের আহ্বান জানিয়ে আমার বক্তব্য আজকের মতো এখানেই শেষ করছি।
আপনাদের সকলকে ধন্যবাদ।
আল্লাহ্ হাফেজ, বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।

কালের পুরাণ- হেরে গেছেন খালেদা জিয়া by সোহরাব হাসান

Saturday, January 11, 2014

রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি এই মুহূর্তে যে বড় সংকটে পড়েছে, ১৯৮২ সালের পর কখনোই তাকে সে পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়নি।
১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ এরশাদ বন্দুকের জোরে ক্ষমতায় আসার আগেই শামসুল হুদা চৌধুরী ও আবদুল মতিনের নেতৃত্বে দলের একটি অংশ তাঁর সঙ্গে আঁতাত করেছিল। পরবর্তী সময়ে মওদুদ আহমদসহ অনেক অভিজ্ঞ নেতা সামরিক সরকারে যোগ দিলেও বিএনপি তেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।

বরং সামরিক স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে খালেদা জিয়ার আপসহীন ভাবমূর্তি ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জয়ী হতে সহায়ক হয়েছিল। কিন্তু এবার দলের উপজেলা পর্যায়ের একজন নেতাকেও আওয়ামী লীগ সরকার ভাগিয়ে নিতে না পারলেও বিএনপি দল হিসেবে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে।

অনেকেই মনে করেন, বিএনপির আন্দোলনই কেবল ভুল পথে পরিচালিত হয়নি, রাজনীতির মূলধারা থেকেও দলটি ছিটকে পড়ার উপক্রম হয়েছে। কেন এমনটি হলো?

ডান দিকে ঝুঁকে পড়া মধ্যপন্থী হিসেবে বিএনপির যে অবস্থান ছিল, তা অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছে। এখন বিএনপিকে মানুষ জামায়াত-হেফাজতের সহযোগী হিসেবে মনে করে। গত পাঁচ বছরে জনগণের সমস্যা নিয়ে তারা যেমন রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম গড়ে তুলতে পারেনি, তেমনি সরকারের ভুলত্রুটিগুলো জাতীয় সংসদে তুলে ধরে দায়িত্বশীল বিরোধী দল হিসেবে নিজেকে প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হয়েছে। সংসদ নিয়ে কথা বলার চেয়ে সংসদ বর্জন করাকেই দলটি রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে নিয়েছিল, যা সংসদীয় ব্যবস্থায় সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।

আর রাজনীতির মাঠে আওয়ামী লীগের বাইরে থাকা মধ্যপন্থী ও গণতান্ত্রিক জনগোষ্ঠীর সমর্থন আদায়ের চেষ্টা না করে বিএনপির নেতৃত্ব উগ্রবাদী জামায়াতে ইসলামী ও গোঁড়াপন্থী হেফাজতে ইসলামের ওপর ভরসা রেখেই আন্দোলনকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যেতে চেষ্টা করেছে, যা শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। নিজস্ব শক্তি-সামর্থ্য নয়, দুই চরম প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির কাঁধে ভর করে বিএনপির গণ-অভ্যুত্থানের এই প্রয়াস ছিল মারাত্মক ভুল।

গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিতে শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ গড়ে উঠলে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব তাদের ‘নাস্তিক’ বলে দূরে ঠেলে দেয়, যদিও দলের অনেক নেতা-কর্মী তা পছন্দ করেননি। দ্বিতীয়ত, তারা হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা কর্মসূচির সঙ্গে সংহতি ঘোষণার পাশাপাশি ৫ মে ঢাকায় সংগঠনটির সহিংস তাণ্ডবের প্রতি সমর্থন জানালে বিএনপির অনেক শুভানুধ্যায়ীই বিস্মিত হন। ফলে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবির প্রতি দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সমর্থন থাকা সত্ত্বেও তারা রাজপথে বিএনপির সহযাত্রী হননি। যুদ্ধাপরাধের বিচার বন্ধে জামায়াতের সহিংস কর্মকাণ্ড মানুষকে আরও বেশি আন্দোলনবিমুখ করে। জামায়াতের প্রতি বিএনপির অতিশয় নির্ভরতায় দলের অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা অস্বস্তি বোধ করলেও প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পাননি। এখনো পাচ্ছেন না।

জনসমর্থন বিএনপির পক্ষে থাকায় ক্ষমতাসীনেরা শুরু থেকেই বিরোধী দলকে বাইরে রেখে নির্বাচন করার যে প্রয়াস চালাচ্ছিল, বিএনপি নেতৃত্ব শেষ পর্যন্ত সেই ফাঁদে পা দেয় জামায়াত ও হেফাজতের ভরসায়। ৪ মে মতিঝিলে খালেদা জিয়ার সমাবেশে আলটিমেটামের পর দুই দলের মধ্যে সমঝোতার পথ ক্রমশ সংকুচিত হতে থাকে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে সামনে রেখে বিরোধী দলের লাগাতার অবরোধ-হরতালের কর্মসূচি এবং সরকারের দমন-পীড়নের মুখে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের আত্মগোপনে চলে যাওয়ার নীতিও ছিল আত্মঘাতী। সারা দেশে তো বটেই, খোদ রাজধানীতে বিএনপির নেতা-কর্মীদের অনুপস্থিতির সুযোগে আন্দোলনের নিয়ন্ত্রণ পুরোটাই জামায়াত-শিবিরের হাতে চলে যায় এবং বোমা ও আগুনে মানুষ খুন আর সরকারি সম্পদ ধ্বংসই হয়ে ওঠে তাদের প্রধান হাতিয়ার।

এর পাশাপাশি ঢাকা ও লন্ডনে বিএনপির নেতৃত্বের দুটি আলাদা ভরকেন্দ্রও দলের নেতা-কর্মীদের বিভ্রান্তিতে ফেলে। দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনে বসে দলের নেতৃত্ব ও আন্দোলনের কর্মসূচি ঠিক করে দেওয়ায় সামনে থাকা দলের অনেক নেতাই পেছনে চলে যান; আবার পেছনের কেউ কেউ সামনে চলে আসেন। নানা কারণে খালেদা জিয়ার সঙ্গে দলের বেশির ভাগ কেন্দ্রীয় নেতার দূরত্ব সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে তিনি লন্ডনপ্রবাসী পুত্র তারেক রহমান ছাড়া কারও ওপরই ভরসা রাখতে পারেননি।

সম্প্রতি বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরীর সঙ্গে তারেক রহমানের যে কথোপকথন প্রকাশিত হয়েছে, তাতে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের প্রতি তাঁর (তারেক) অবিশ্বাস ও অনাস্থা—দুটোই প্রকাশিত হয়েছে। অথচ বর্তমান সরকারের আমলে এই নেতাই সবচেয়ে বেশি নিগৃহীত হয়েছেন।

৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে ও পরে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের বক্তৃতা-বিবৃতির মধ্যেও বেশ পার্থক্য লক্ষ করা যায়। তারেক রহমান লন্ডনে বসে শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণা করেই ক্ষান্ত হননি, বায়াত্তর সালে প্রণীত সংবিধানকেই জন-আকাঙ্ক্ষার বিরোধী বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর এই মূল্যায়ন যদি প্রধানমন্ত্রীর একক ক্ষমতার (যা তাঁর মা খালেদা জিয়া দুবার ভোগ করেছেন) বিরুদ্ধে হতো, জনগণের সমর্থন পেত। কিন্তু তিনি এই বিবৃতির মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম মূল লক্ষ্য রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রকেই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন এবং ৫ জানুয়ারি নির্বাচনকে অবৈধ ঘোষণা করে সরকারের প্রতি প্রকাশ্যে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন।

বিএনপির চেয়ারপারসন এখনো ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে আলোচনার দরজাটি খোলা রাখতে চান বলে আমাদের ধারণা। সম্প্রতি বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎ কারে তিনি বলেছেন, ‘আমরা আলোচনার জন্য প্রস্তুত আছি। কিন্তু প্রথমে তাদের (সরকার) আলোচনার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। সব জ্যেষ্ঠ নেতা কারাগারে আছেন। আমার বহু কর্মী জেলখানায়। অন্যরা আত্মগোপনে আছেন। তাদেরই আলোচনার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।’

এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা প্রসঙ্গে বলেছেন, তাঁকে (খালেদা জিয়া) সহিংসতা ও জামায়াতে ইসলামীকে ছেড়ে আসতে হবে। সোমবার নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎ কারে খালেদা জিয়া প্রথমবারের মতো স্বীকার করেছেন, ‘তাঁর দল জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে স্থায়ী জোট করেনি।’ জামায়াতকে ছাড়বেন কি না, জানতে চাইলে তিনি আরও বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমি পারি না, কিন্তু যখন সময় আসবে, তখন দেখা যাবে।’

সরকারের সঙ্গে আলোচনার শর্ত হিসেবেই নয়, পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যেও জামায়াত সম্পর্কে সংশয়ের কথা বিএনপির নেতাদের অজানা নয়। কিন্তু তারা এই যুুক্তিতে দলটি নিষিদ্ধ করার বিরুদ্ধে যে তাতে তারা আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যাবে এবং আরও সহিংস হয়ে উঠবে।

বিএনপির নেতৃত্বের প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস ছিল যে নানা কারণে মানুষ যেহেতু সরকারের প্রতি ক্ষুব্ধ, সেহেতু তারা ডাক দিলেই লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় বেরিয়ে এসে উনসত্তর বা নব্বইয়ের মতো গণ-অভ্যুত্থান ঘটিয়ে দেবে। কিন্তু এখানে তারা যে ভুলটি করেছে তা হলো, জোটের প্রধান সহযোগী জামায়াতে ইসলামীর আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল ভিন্ন। হাইকোর্টের আদেশে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল এবং শীর্ষ নেতারা যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ও দণ্ডিত হওয়ার পর দলটি নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য গোটা রাষ্ট্রযন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ করছে। বিএনপির নেতৃত্ব জামায়াতের সন্ত্রাসী ও সহিংস আন্দোলনের ওপর ভরসা না করে যদি আন্দোলনের অংশ হিসেবে নির্বাচনে যেত, তাহলে জয়ের সম্ভাবনা ছিল। সরকার সে রকম একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে কারচুপি করার সাহস পেত না। এর পরও সরকার জবরদস্তি করে নির্বাচনী ফল উল্টে দিতে চাইলে সাধারণ মানুষ তখন বিএনপির পক্ষেই রাস্তায় নেমে আসত।

রণাঙ্গনের যুদ্ধে অস্ত্রশক্তি প্রধান হাতিয়ার হলেও রাজনৈতিক যুদ্ধে কৌশল ও মিত্রের বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেই কৌশলে বিএনপির নেতৃত্ব এ যাত্রায় জয়ী হতে পারেনি। যার সুফল তাঁর প্রতিপক্ষ শেখ হাসিনা পেয়েছেন। এর আরেকটি কারণ, ১৯৯৫-৯৬ সালে শেখ হাসিনা বিএনপি ছাড়া সবাইকে এবং ২০০৬ সালে তাদের সঙ্গে জামায়াত থাকলেও বিএনপির একসময়ের মিত্র বি. চৌধুরী, অলি আহমদকে কাছে নিতে পেরেছিলেন। কিন্তু এবার খালেদা জিয়া শেখ হাসিনাবিরোধী সবাইকে কাছে টানতে পারেননি। এমনকি জামায়াতের কারণে বি. চৌধুরী, আ স ম আবদুর রব, কাদের সিদ্দিকী জোটভুক্ত হননি। এর পাশাপাশি দলটির ভারতনীতিও পরস্পরবিরোধী উপাদানে আকীর্ণ। দলের একাংশ ভারতের আস্থা অর্জনে আন্তরিক চেষ্টা করলেও অন্য অংশ যুদ্ধ জারি রাখাকেই শ্রেয় মনে করছে। বাসার সামনে খালেদা জিয়ার ক্ষুব্ধ বক্তব্য কিংবা তারেক রহমানের দ্বিতীয় বিবৃতিতে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার আহ্বান তারই প্রমাণ।

আপাতত বিএনপি আন্দোলন ও নির্বাচনবিরোধী রণকৌশলে হেরে গেছে, এটা স্বীকার করেই তাকে নতুন পথচলার কথা ভাবতে হবে। অবরোধ-হরতালের নামে গাড়ি পোড়ানো কিংবা মানুষ মারার আন্দোলন করে যে জনসমর্থন পাওয়া যায় না, সে কথা বিএনপির নেতৃত্ব যত দ্রুত অনুধাবন করবে, ততই দেশের মঙ্গল। এমনকি বিএনপিরও।

সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net

ভয়েস অব আমেরিকাকে খালেদা- ‘জামায়াতের সঙ্গে জোট কৌশলগত’: বেগম খালেদা জিয়া

Friday, January 10, 2014

বিরোধী দলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন মানুষ প্রত্যাখ্যান করেছে। সুতরাং একাদশ সংসদ নিয়ে আলোচনা পরের বিষয়। জামায়াতের সঙ্গে জোট বা ঐক্যর বিষয়টি শুধুই কৌশলগত ব্যাপার বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।
শন্তি, উন্নয়ন, দারিদ্র বিমোচন চায় বলেই তরুণরা এই সরকারকে প্রত্যাখ্যান করেছে বলেও তিনি দাবি করেন। গতকাল ভয়েস অব আমেরিকাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন খালেদা জিয়া। ভয়েস অব আমেরিকার ওয়াশিংটন স্টুডিও থেকে তাঁর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন সরকার কবীরূদ্দীন। এ সাক্ষাৎকারে বিএনপির দলীয় অবস্থান ও আঠারো দলের পরবর্তী ভাবনা তুলে ধরেছেন খালেদা জিয়া। নির্বাচন হয়ে গেল। এখন কি কর্মসূচি নিয়ে এগোবেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রথম কথা আমি বলব যে, দেশে কোন নির্বাচন হয়নি। যেটা হয়েছে তা কারও কাছেই গ্রহণযোগ্য নয়। দেশের মানুষ সরকারকে সম্পূর্ণভাবে রিজেক্ট করেছে। আপনি নিজেই দেখেন যেখানে ১৫৩টা সিটে কেউ পার্টিসিপেট করেনি। কন্টেস্ট করেনি। কেউ আগ্রহীই নয় নির্বাচন করতে। সেখানে শুধু একদলীয় নির্বাচন ১৫৩টা সিটে হয়েছে। কোন প্রতিযোগিতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়নি। দ্বিতীয়ত যে ১৪৭টা সিটে ৫ই জানুয়ারি নির্বাচনের কথা ছিল। সেখানেও দেশের ও বিদেশের মিডিয়া কর্মীরা দেখেছে, ভোটিং সেন্টারে মানুষই নেই। প্রিজাইডিং অফিসার কোনো কোনো যায়গায় ঘুমাচ্ছে। কোনো কোনো যায়গায় নিজেরাই ভোট দিচ্ছেন। ৪৭/৪৮টা ভোট কেন্দ্রে কোন ভোটার ভোট দেয়নি। তারপরে অনেক কেন্দ্র বন্ধ। তারপরও যেটা হল তাতে ৫%ও হবে না। তো এতে কি হল। মানুষের এটাইকি রায়? জনগণের মতামতের কোনও প্রতিফলন এখানে হয়নি। কাজেই এটাকে কোনও ইলেকশন আমি বলব না। এটা ভাগাভাগির নির্বাচন বলতে পারেন। তারা নিজেরা সিট ভাগাভাগি এবং ক্ষমতার ভাগাভাগি হয়েছে। বাংলাদেশের জনগণ সত্যিকারের একটা অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দেখতে চায়। যেখানে সকল দলের অংশগ্রহণ থাকবে। সেরকম একটি নির্বাচন দেখতে চায়। সেই নির্বাচনটা হতে হবে একটা নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে। মানুষ এখন আরও পরিষ্কার ৫ই জানুয়ারির পরে যে আওয়ামী লীগের অধীনে কোনও সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হতে পারে না। এবং নির্বাচন কমিশন যে একটা মেরুদণ্ডহীন বা দলীয় সরকারের মতো কাজ করেছে, এটা একদম পরিস্কার। যেখানে ৫%ও ভোট পড়েনি। সেখানে কেমন করে ৪০%ভোট বলে? এটা একটা নির্লজ্জ মিথ্যা কথা বলছে। এবং এজন্য তার দু’দিন সময় লেগেছে। সব ঠিকঠাক করে, গুছিয়ে কিভাবে বলবে তা ঠিক ঠাক করে। কাজেই এটা পরিস্কার। এবং জাতী এটাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। একাদশ সংসদ নিয়ে আলোচনার আহ্বান প্রশ্নে তিনি বলেন, দশম নির্বাচনই তো মানুষ রিজেক্ট করেছে। একাদশের কথা পরে হবে। আমরা গণিতান্ত্রিক দল। আমি অনেক আগে থেকেই গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করছি। আমরা সত্যিকারই গণতন্ত্র চাই। জনগণের ভোটের অধিকার, ভাতের অধিকার, মানবাধিকার রক্ষার জন্য চাই। শন্তি চাই, উন্নয়ন চাই, দারিদ্র বিমোচন চাই, লেখাপাড়া চাই। তরুণরা এই সরকারকে প্রত্যাখ্যান করেছে।
জামায়াতের সঙ্গে যোগাযোগ, জোট বা ঐক্য বা আঁতাত কৌশলগত কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জামায়াতের সঙ্গে আতাত বলেন, জোট বলেন বা ঐক্য বলেন তা আওয়ামী লীগই আগে করেছে। এরশাদের আমলে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম কেউ নির্বচানে যাব না। তারপর মাঝ রাতে এরশাদের সঙ্গে আতাত করে নির্বাচনে গেল আওয়ামী লীগ। জামায়াতের সঙ্গে কথা বলে তাদেরকে নিয়ে গেল। নিরপেক্ষ সরকারের দাবিটা আওয়ামী লীগ এবং জামায়াতের। সে জন্য তখন আওয়ামী লীগ অনেক নাশকতা করেছে। আওয়ামী লীগ এখনও জামায়াতের সঙ্গে সেই যোগাযোগ রক্ষা করে চলছে। বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের এই জোট সমূর্ণভাবে কৌশলগত। বিদেশীদের হস্তক্ষেপ প্রসঙ্গে খালেদা জিয়া বলেন, আমরা স্বাীধন দেশ। এদেশের মানুষই সিদ্ধান্ত নেবে। বিদেশীরা আমাদের ডেভেলপমেন্ট পার্টনার হিসাবে সাহায্য সহযোগিতা করেন। তারা বিভিন্ন বিষয়ে কথাবার্তা বলতে পারেন। কিন্তু তারা স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের উপর হস্তক্ষেপ করলে মানুষ তা সহ্য করবে না। সাম্প্রতিক সময়ে অচলাবস্থা, হত্যা, নাশকতা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, এ সবকিছুর দায় বর্তায় গভর্নমেন্টের উপর। তাদের একগুয়েমি, জেদের উপর। এজন্য সরকার দায়ী। দলীয় লোকজনই এসব ঘটনা ঘটিয়েছে। সংখ্যালঘুদের বাড়ি ঘর তারা পোড়াচ্ছে। অতীতেও তারা হিন্দুদের বাড়িঘর, ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান দখল করেছে। সংখ্যালঘুদের সবসময় তারা খারাপ আরচণ করছে। পুলিশের চোখের সামনে এগুলো ঘটলেও তারা কিছু বলছে না। কারন তাদেরকে নির্দেশনা দেয়া আছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিষয়ে তিনি বলেন, গণতন্ত্র, জনগণের অধিকার, মানবাধিকার, স্বাধীন দেশের আভ্যন্তরীন ব্যাপারে কারও হস্তক্ষেপ নয় এটাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। এগুলো আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপি চেয়াপারসন অভিযোগ করেন, দেশের পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত খারাপ। অত্যন্ত ভয়াবহ। সারাজীবন ক্ষমতায় থাকার জন্য হত্যা, গুম করছে আওয়ামী লীগ। যারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলে তাদের বিরুদ্ধেই নির্যাতন চালানো হচ্ছে। আজ জেলখানাগুলো বিএনপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের কর্মীদের দিয়ে ভরে ফেলা হয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

সরকারের কথায় ও কাজে মিল থাকতে হবে- খালেদা জিয়া কি অন্তরীণ?

Friday, January 3, 2014

বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে অন্তরীণ রাখা হয়েছে কি না, সেই বিষয়ে সরকারের কাছ থেকে একটি আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা প্রত্যাশিত।
সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধীদলীয় নেতাকে ছায়া প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখা হয় এবং তাঁকে সেভাবেই দেখতে হবে। কোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পরিস্থিতি এমন হতে পারে না যে গণতন্ত্র বাঁচাতে ছায়া প্রধানমন্ত্রীকে অঘোষিতভাবে অন্তরীণ করে রাখতে হবে। সরকারের নীতিনির্ধারকেরা অহর্নিশ আপ্তবাক্য উচ্চারণ করেন যে আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নন। কিন্তু তাঁরা ভুলে যান, এর প্রবক্তাদের জন্যও কথাটি পুরোপুরি সত্য।

যদি যুক্তি দেওয়া হয় যে বিনা অনুমতিতে আয়োজিত সমাবেশে যোগদানের অধিকার বিরোধী দলের নেতার ছিল না, তাহলেও এটা জনগণের চোখে প্রতীয়মান হতে হবে যে তাঁর প্রতি কেবল আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা তা নয়। গত ২৯ ডিসেম্বর থেকে বিরোধীদলীয় নেতার আইনগত অবস্থান কী, তা প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। এটা পরিহাসমূলক যে তাঁর অবস্থান প্রশ্নে উপযুক্ত সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ব্যাখ্যা না এলেও ক্ষমতাসীন দলের নেতা কিংবা মন্ত্রীদের কাছ থেকে সময়ে সময়ে অসামঞ্জস্যপূর্ণ মন্তব্য করা হচ্ছে।

বিএনপির তরফ থেকে খালেদা জিয়াকে গৃহবন্দী উল্লেখ করা হলেও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেছেন, তিনি গৃহবন্দী নন। তাঁর যুক্তি: ‘গৃহবন্দী করতে হলে প্রজ্ঞাপন জারি করতে হয়। এ ধরনের কিছু হয়নি।’ তাঁর কথায় মনে হবে, এই রাষ্ট্রে আইনের বাইরে কিছু ঘটে না। আবার পরিবেশ ও বনমন্ত্রী বলেছেন, খালেদা জিয়া নিজেই নিজেকে অন্তরীণ করে রেখেছেন। দুই মন্ত্রীর মন্তব্যে ফারাক আছে। যেকোনো নাগরিক তাঁর বাসায় স্বেচ্ছায় অবস্থান করলে তাঁকে কেউ নিজেকে অন্তরীণ রাখা বলে না। এ ক্ষেত্রে তথ্যমন্ত্রীর দাবি সত্য বলে মনে করা যেত, যদি বিরোধীদলীয় নেতার বাসার প্রধান ফটকের দুই পাশে বালুভর্তি ট্রাক নববর্ষের প্রথম দিনটিতেও না থাকত। উপরন্তু তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের পর বিএনপির নেতাদের আটকের ঘটনাও অভাবনীয়।
বিরোধী দলের নেতাকে কথিত শান্তি ও স্থিতির প্রতি হুমকি বিবেচনা করেই আইন এড়িয়ে বলপ্রয়োগ চলছে। তিনি কবে বাসা থেকে বের হতে পারেন, এমন প্রশ্নের জবাবে পুলিশের দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন কর্মকর্তা বলেছেন, সেটা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানেন। আবার এ কথাও সত্য, খালেদা জিয়া এমন ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছেন, যে কারণে তাঁর বর্তমান অবস্থান নিয়ে জল্পনা-কল্পনা সৃষ্টি হওয়ার মতো সুযোগও তৈরি করে রাখা হয়েছে। গৃহবন্দী অবস্থাটি সংগঠনের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতেও দাবি করা হয়নি।

চার দিন পরে গতকাল অবশ্য স্পিকারের হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়েছে। আজ দেখা করা হবে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে। স্পিকার স্বতঃপ্রণোদিত হয়েও এ বিষয়ে খোঁজ নিতে পারতেন, কিন্তু তিনি নেননি, এটাই বাস্তবতা। তবে খালেদা জিয়া অন্তরীণ নন, সেটা সরকারকে শুধু কথায় নয়, কাজেও প্রমাণ দিতে হবে।

খালেদা বাড়িতে এরশাদ হাসপাতালে by অমিত রহমান

Wednesday, January 1, 2014

বাড়িতে বন্দি খালেদা। এরশাদ বন্দি হাসপাতালে। হাজার হাজার বিরোধী রাজনৈতিক কর্মী কারাগারে। দেশের সর্বোচ্চ আদালত কলঙ্কিত।
ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের ভাষায় জানাজা পাঠ হয়ে গেছে। সাংবাদিকদের মিলনস্থল জাতীয় প্রেস ক্লাবের গায়ে কলঙ্ক লেপে দেয়া হয়েছে। সেখানে জঙ্গিরা আছেন সে খবর নাকি পুলিশ কমিশনারের কাছে পৌঁছেছে গোয়েন্দা রিপোর্টে। প্রেস ক্লাব কর্তৃপক্ষকে অবশ্য আরও সজাগ ও একপেশে রাজনীতি থেকে দূরে থাকা জরুরি বলে মনে করছি। প্রেস ক্লাবকে রাখা উচিত রাজনীতির ঊর্ধ্বে। বাংলাদেশের বিদেশী বন্ধুরা হঠাৎ চুপ হয়ে গেছেন। বড়দিন আর নববর্ষের কারণে ছুটি- এটাই কি প্রধান কারণ, নাকি তারা বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। বৃটিশ হাইকমিশনার রবার্ট গিবসনের হঠাৎ দৌড়ঝাঁপ কিছুটা আশারও সঞ্চার করেছে। যদিও তার সঙ্গে কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে বিএনপি নেতা শমসের মবিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে অবশ্য ছেড়ে দেয়া হয় আন্তর্জাতিক চাপে। খালেদার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজিনা জানিয়েছেন তার উদ্বেগের কথা। এখন বড় এক চ্যালেঞ্জ খালেদার সামনে। দলকে এক রাখতে সক্ষম হয়েছেন শত প্রলোভনের মুখে- এটাকে তার সাফল্য হিসেবে দেখা যেতে পারে। কিন্তু নীতিকৌশল প্রণয়নে মুন্সিয়ানায় যে ঘাটতি ছিল তাতে কোন সন্দেহ নেই। তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করার মধ্যে বড় ধরনের রাজনৈতিক কৌশল ছিল। এখনই তা হয়তো খোলাসা করে বলা ঠিক হবে না। সময়েই তা পরিষ্কার হয়ে যাবে। বিএনপি যাতে কখনও নির্বাচনমুখী না হয় সেটা ছিল সরকারি কৌশল। কেননা, সরকার জানে বিএনপি যেনতেন ব্যবস্থায় নির্বাচনে গেলেও জয় পেয়ে যাবে। মানুষ পরিবর্তন চায়। পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষায় তারা ভোট দেয়ার জন্য উদগ্রীব। এর মধ্যে পাঁচ পাঁচটি সিটি করপোরেশন নির্বাচন খালেদার ভাগ্য বিপর্যয় ঘটায়। শাসকরা তখন নিশ্চিত হয়ে যান নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার অর্থ হচ্ছে পরাজয় মেনে নেয়া। নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মারার শামিল। তাই তারা এমন এক কৌশল নেন তাতে বিএনপির নির্বাচনে অংশ নেয়ার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। খালেদা টের পেয়ে পথ খুঁজছিলেন। প্রেসিডেন্টের কাছেও গিয়েছিলেন। হাসিনাকে বাদ দিয়ে শাসক দলের যে কাউকে অন্তর্বর্তী সরকারে নেয়া হলে সে নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিতো। অন্তত বিদেশী কূটনীতিকদের কাছে বিএনপি এই আগ্রহের কথা জানিয়েছিল একাধিকবার। সে চেষ্টাও ব্যর্থ হয় শেখ হাসিনার কড়া মনোভাবের কারণে। তিনি নিজে প্রেসিডেন্টের কাছে গিয়ে বলে এসেছেন এমন কোন তৎপরতায় যেন লিপ্ত না হন। যদিও একপর্যায়ে প্রেসিডেন্ট যাতে বিএনপির সঙ্গে সমঝোতার একটি উদ্যোগ নেন সে জন্য অন্যপক্ষের মাধ্যমে বার্তা পাঠিয়েছিলেন। সর্বজনশ্রদ্ধেয় বর্ষীয়ান সাংবাদিক এবিএম মূসার কাছে যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরকে পাঠিয়েছিলেন। ওবায়দুল কাদের যখন প্রস্তাবটি নিয়ে এবিএম মূসার কাছে যান তখন তিনি জানতে চেয়েছিলেন এটা কি তার প্রস্তাব, নাকি প্রধানমন্ত্রীর? কাদের তখন বলেন, আমাকে নেত্রী পাঠিয়েছেন। সড়ক ভবনে অনুষ্ঠিত বৈঠক থেকে বের হয়ে এবিএম মূসা সরাসরি প্রেসিডেন্ট হাউসে ফোন করে সময় চান। তাৎক্ষণিকভাবে তাকে সময় দেয়া হয়। প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে পুরো বিষয়টি তাকে অবহিত করেন। এর আগে তিনি বিএনপির সঙ্গে কথা বলেন। মির্জা ফখরুল বলেন, তারা রাজি। বলাবলি আছে প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে সবুজ সঙ্কেত পাওয়ার পর খালেদা জিয়া তার ১৮ দলের সঙ্গীদের নিয়ে বঙ্গভবনে যান। এই যখন অবস্থা তখন প্রধানমন্ত্রী তার সিদ্ধান্ত স্থগিত করে নয়া কৌশল নেন। মাঝখানেই থেমে যায় আবদুল হামিদের সমঝোতা প্রচেষ্টা। শোনা কথা, বিএনপি যদি প্রেসিডেন্টের আন্ডারে কোন নির্বাচনে রাজি হয়ে যায় তখন সর্বনাশ হয়ে যাবে এমন যুক্তিতেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হয়। এর কয়েকদিন পর প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে প্রধানমন্ত্রী ভিন্ন এক প্রস্তাব দেন। এতে প্রেসিডেন্ট সায় দেননি। তখন সরকার একদম মরিয়া। যেনতেন প্রকারে নির্বাচন করতে হবে। তাদের কাছে খবর ছিল খালেদা নির্বাচনমুখী নন। এরশাদও দোটানায়। একপর্যায়ে এরশাদকে রাজি করানো হলো। তবে সংশয় ছিল গোড়া থেকেই। এরশাদ যে কোন সময় বেঁকে বসতে পারেন। হঠাৎ করেই এরশাদ বদলে যান। নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। এরপর এরশাদকে নানাভাবে চাপ দেয়া হয়। এরশাদ সিদ্ধান্তে অনড় থাকলে তাকে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসার নামে কেবিনবন্দি করা হয়। শীর্ষস্থানীয় একজন চিকিৎসকের অধীনে এরশাদকে মানসিক রোগের চিকিৎসার জন্য রেফার করা হয়। রাখা হয় কম গুরুত্বপূর্ণ এক কেবিনে। কিন্তু এরশাদ কৌশল আঁটতে থাকেন। একদিন তিনি কর্তব্যরতদের রাজি করিয়ে গলফ খেলতে চলে যান। এ থেকে জাতির সামনে এই বার্তাই দেন যে, তিনি সুস্থ মানুষ। খালি খালি তাকে আটকে রাখা হয়েছে। এরশাদ এতটা সাহস কিভাবে করলেন তা নিয়ে অনেকেই অনেক অঙ্ক মেলাচ্ছেন। ওদিকে তার দলকে তিন টুকরো করে আরেক দফা চাপ সৃষ্টি করা হয়। কিন্তু এরশাদ তার সিদ্ধান্তে অনড়। বিভিন্নভাবে বার্তা পাঠিয়ে বলছেন, জেলে ছিলাম। আবার যাবো। তবুও সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করবো না। এরশাদ মনে করেন, ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন এক তামাশা। এই নির্বাচন বাংলাদেশকে, গণতন্ত্রকে কলঙ্কিত করবে। গৃহবন্দি খালেদা কি করবেন? দলের সক্রিয় নেতারা জেলখানায়। একের পর এক অবরোধ-হরতাল দিয়ে কাজ হচ্ছে না। সরকার টলছে না। তারা যেভাবেই হোক ক্ষমতায় থাকতে চায়। দেশের অর্থনীতি পঙ্গু। বিনিয়োগ বন্ধ। প্রায় ৫শ’ গার্মেন্ট কারখানায় তালা। জনদুর্ভোগ চরমে। অবরোধে সরকারের নড়া তো দূরের কথা, তারা নিজেরাই অবরোধ পরিস্থিতি তৈরি করে দুর্ভোগ আরও বাড়িয়েছে। ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির এ এক বীভৎস রূপ। আদালত প্রাঙ্গণের ঘটনা থেকে এটা বোধকরি কারও বুঝতে অসুবিধা থাকার কথা নয়। একজন মহিলা আইনজীবীর ওপর যেভাবে লাল ঘোড়া দাবড়ানোর মতো লাঠি পড়েছে, তাতে বাংলাদেশ কেন, বিশ্ববাসী চমকে উঠেছেন। ১৩৭টি দেশে এই ছবিটি ছাপা হয়েছে বার্তা সংস্থাগুলোর বদৌলতে। লাখ লাখ অনলাইনে এটা স্থান পেয়েছে শীর্ষ ছবি হিসেবে। ধীরস্থির খালেদা এখন হঠাৎ করেই মেজাজ খারাপ করছেন। এটা তার চরিত্রের সঙ্গে একদম বেমানান। বন্দিদশায় মিডিয়ার মুখোমুখি হয়ে একটি জেলার প্রতি তার রাগ দেখানোটা ঠিক হয়নি। এটা সবাই জানেন, বিশেষ জেলার প্রতি বর্তমান শাসকদের বড্ড বেশি টান। মনে হয় অন্য কোন জেলার লোকজনের প্রতি তেমন আস্থা রাখতে পারছেন না। এটা ভাল না মন্দ আখেরেই তা প্রমাণিত হবে। খালেদাকে উত্ত্যক্ত করা হয়েছিল এতে কোন সন্দেহ নেই। এতে তিনি উত্তেজিত হবেন কেন? যা-ই হোক, বাংলাদেশের রাজনীতি এখন অন্য পথে। আমরা সবাই জানি নৈরাজ্য আর রাজনৈতিক শূন্যতা থেকে দেশে দেশে একনায়কতন্ত্রের জন্ম হয়েছে। বাংলাদেশ সে পথে অনেক আগে থেকেই হাঁটতে শুরু করেছে। সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে একপক্ষীয় শাসনের যাত্রা চূড়ান্ত করা হয়েছিল। কিন্তু এরশাদ কি বুঝে হিসাব নিকাশ পাল্টে দিয়েছেন। এরপর কি? এখনও স্পষ্ট নয়। তবে সামনে যে ঘোর অন্ধকার তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন হয়ে গেলে অন্য এক বাংলাদেশ আমরা দেখতে পাবো। অন্য এক মডেলের গণতন্ত্র উকিঝুঁকি মারছে। যে গণতন্ত্রে ভিন্নমতের স্থান হয়তো হবে না। হলেও তা হবে একদম নিয়ন্ত্রিত। আর স্বাধীন গণমাধ্যম! তা নিয়ে পরে আলোচনা করবো। যদি সুযোগ থাকে।

দেখবো কতোদিন আটকে রাখতে পারেন - বেগম খালেদা জিয়া

Sunday, December 29, 2013

বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের খুন এবং তাকে বাধা দেয়ার পরিণত শুভ হবে না বলে হুশিয়ারী উচ্চারণ করেছেন বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ্যে করে তিনি বলেছেন, আপনার পিতাও ৩০ হাজার মানুষ হত্যা করেছিল। তার পরিণতি ভালো হয়নি। এবারও পরিণতি ভালো হবেনা। এসবের পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ ও কঠিন। শেখ হাসিনা রক্তগঙ্গা বইয়ে দিচ্ছেন। রক্তের সাগর পাড়ি দিয়ে নৌকা গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে না। নিজ বাসার সামনে খালেদা জিয়া সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, দেখি কতদিন আটকিয়ে রাখতে পারেন। যতদিন এরকম করবেন ততদিন কর্মসূচি চলবে। শেখ হাসিনা রক্তের গঙ্গা বইয়ে দিচ্ছেন। এই রক্তের গঙ্গার ওপর দিয়ে তিনি তার নৌকা দিয়ে ক্ষমতায় যাবেন। এই ক্ষমতা দুরাশা। সেটা ভুলে যেতে বলেন। ক্ষমতা। দেখবো কতোদিন আটকে রাখতে পারেন। কর্মসূচি চলবে যতোদিন এরকম করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেন, ভুলে যাননি সেই দিনগুলোর কথা। আজকে সারা দেশকে কি অবস্থা করে রেখেছেন। সাহস থাকলে ছেড়ে দিতেন। দেখতেন যে কিভাবে জনগণ রাস্তায় নেমে আসে। মা-বোন, ভাই, কৃষক শ্রমিক মেহনতি জনতা রাস্তায় নামতো। আপনারা জাতীয় পতাকার অবমাননা করেছেন। দেশের প্রতিটি মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করেছেন। আজকে আমি রাজ পথে যেতে চাই। কিন্তু কেন বাধা দেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, তাদেরতো রাজপথে নামার সাহস নেই। দুনিয়ার সিকিউরিটি নিয়ে চলেন, আর মানুষ মারেন। মানুষ গুম করেন। মানুষ খুন করেন। সারা দুনিয়া জেনে গেছে যে হাসিনা কতো মানুষ খুন করেছে। কতো মানুষ গুম করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এই পুলিশ বাহিনী, র‌্যাব বাহিনী। আর কতো মানুষ মারবেন? তাও দেখবো। এর আগেওতো মেরেছেন। তার পিতা ক্ষমতায় থেকে ৩৫ হাজার লোক মেরেছেন। আর এখন আরও মারছেন। মারেন। এর পরিণতিযে শুভ হবে না তা তারা জেনে গেছেন। এর পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ ও কঠিন। জবাবদিহী করার জন্য প্রস্তুুত থাকেন। সরকারের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আপনারা আইনজীবীদের ওপর আক্রমন করেন, গ্রেপ্তার করেন, সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছেন, মা-বোনদের ওপর নির্যাতন করছেন। আপনারা (প্রধানমন্ত্রী) মহিলা। আপনাদের মহিলাদের প্রতি এতোটুকু সম্মান নেই।

কার্যালয়ে খালেদার একাকী একঘণ্টা

Thursday, December 26, 2013

পুলিশী বাধার কারণে নেতাকর্মীদের অনুপস্থিতিতে গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে ঘণ্টাব্যাপী একাকী সময় কেটেছে বিরোধী দলীয় নেতা খালেদা জিয়ার। গতরাতে এমন ঘটনা ঘটেছে।
রাত ৯টার দিকে গুলশানের বাসভবন থেকে বেরিয়ে নিজের রাজনৈতিক কার্যালয়ে যান বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া। আগে থেকেই সেখানে পুলিশ ছিল সতর্ক অবস্থানে। কার্যালয়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের ঢুকতে দেয়নি পুলিশ। খালেদার বাড়ি থেকে তার সঙ্গে থাকা মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক শিরীন সুলতানাই কেবল ঢোকার সুযোগ পান কার্যালয়ে। ফলে নিজ কার্যালয়ে একাকী বসেছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন। এর মধ্যেই রাত ১০টার দিকে গুলশানের ওই কার্যালয়ে যান সাংবাদিক নেতারা। কার্যালয়ের সামনে অবস্থানরত পুলিশ সদস্যরা তাদের প্রথমে আটকালেও সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে ভেতরে ঢুকতে দেয়। ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের একাংশের সভাপতি রুহুল আমিন গাজীর নেতৃত্বে বিএনপি চেয়ারপারসনের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া সাংবাদিকদের মধ্যে ছিলেন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমেদ, ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের যুগ্ম মহাসচিব এম আবদুল্লাহ, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াস খান, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সদস্য খোরশেদ আলম ও বাসির জামাল। পরে রাত ১২টার দিকে তিনি কার্যালয় থেকে গুলশানের বাসায় ফিরে যান। এর আগে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় অভিযাত্রা কর্মসূচি ঘোষণার পর বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশানের বাসভবন ও রাজনৈতিক কার্যালয়ের সামনে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানো হয়। এক পর্যায়ে দুই ভবনের ফটকের সামনে বেষ্টনি তৈরি করে পুলিশ। এরপর থেকে দুই ভবনে বিএনপি নেতাকর্মীদের ঢুকতে বাধা দেয়ার পাশাপাশি গ্রেপ্তার করা হয় বেশ কয়েকজনকে। এমন কি দলের কয়েকজন প্রবীণ নেতাকে আটকের পর বাসায় পৌছে দেয়া হয়। তারই ধারাবাহিকতায় দ্বিতীয়দিনের মতো গতকালও কড়াকড়ি বজায় রাখে পুলিশ। বিএনপি চেয়ারপারসন কার্যালয়ে যাওয়ার পর সেখানে যান দলের ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান ও ঢাকা মহানগর মহিলা দলের সভাপতি সুলতানা আহমেদ। তারা কার্যালয়ে ঢুকতে চাইলে বাধা দেয় পুলিশ। এমনকি অফিসকর্মীদেরও যাতায়াতে বাধা দেয়া হয়। তখন তারা সেখানে অবস্থান নিতে চাইলে পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, আপনারা চলে যান অন্যথায় আমরা আপনাদের গ্রেপ্তার করতে বাধ্য হবো। পরে তারা চলে যায়। এদিকে বার্তা সংস্থা এএফপি’কে এক সাক্ষাৎকারে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী অভিযোগ করে বলেছেন, বিরোধী দল বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কার্যত গৃহবন্দি। এখন বিরোধী দলের কোন নেতাকর্মীকে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে দেয়া হচ্ছে না। আগামী মাসের জাতীয় সংসদ নির্বাচন বানচালের জন্য তিনি যে আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন তার প্রেক্ষিতে তাকে কার্যত গৃহবন্দি করা হয়েছে। পুলিশের বক্তব্য, বিএনপি চেয়ারপারসনের নিরাপত্তার স্বার্থেই পাহারা জোরদার করা হয়েছে।

খালেদা জিয়ার পুরো বক্তব্য @২৪ ডিসেম্বর ২০১৩

Tuesday, December 24, 2013

বিস্মিল্লাহির রাহ্মানির রাহিম
প্রিয় সাংবাদিকবৃন্দ,
আসসালামু আলাইকুম।

ভয়ংকর রাষ্ট্রীয়-সন্ত্রাস কবলিত দেশ। প্রতিদিন রক্ত ঝরছে। বিনাবিচারে নাগরিকদের জীবন কেড়ে নেয়া হচ্ছে। ঘরে ঘরে কান্নার রোল। শহরের সীমানা ছাড়িয়ে নিভৃত পল্লীতেও ছড়িয়ে পড়েছে আতংক। সকলের চোখে অনিশ্চয়তার ছায়া। নির্বিকার শুধু সরকার। তাদের লক্ষ্য একটাই, যে-কোনো মূল্যে ক্ষমতাকে কুক্ষিগত রাখা। তাই তারা ভিনদেশী হানাদারদের মতো ‘পোড়ামাটি নীতি’ অবলম্বন করে চলেছে। এমন পরিস্থিতি আমরা কখনো চাইনি। এই দেশের প্রতি আমাদের অঙ্গীকার আছে। এ দেশের জনগণের প্রতি আমাদের মমতা আছে। তাই আমরা বরাবর সমঝোতার কথা বলেছি। শুধু মুখে বলা নয়, আমরা সমঝোতার জন্য সব রকমের চেষ্টা করছি। সকল দলের অংশগ্রহনে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে আমরা প্রস্তাব দিয়েছি। সে প্রস্তাব আমাদের পক্ষ থেকে পার্লামেন্টেও পেশ করা হয়েছে। আমরা বলেছি, আসুন, এই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করে একটা ঐক্যমতে পৌঁছাই।  সরকার তাতেও রাজি হয়নি। তারা অনড় অবস্থান নিলেন। ক্ষমতায় থেকে, পার্লামেন্ট বহাল রেখেই তারা নির্বাচন করবেন। আমরা চাইলে তাদের সরকারে কয়েকজন মন্ত্রী দিতে পারবো শুধু। এই প্রস্তাবে রাজি হয়ে একটি দল কীÑধরনের বিব্রতকর পরিস্থিতির শিকার হয়েছে, তা আজ দেশবাসীর সামনে পরিস্কার। আমরা একটা সমঝোতার উদ্যোগ নেয়ার জন্য রাষ্ট্রপতিকেও অনুরোধ জানিয়েছিলাম। রাষ্ট্রপতির পক্ষে তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়া সম্ভব হয়নি। তবে দেশবাসী এর মাধ্যমে সমঝোতার ব্যাপারে আমাদের আগ্রহ ও আন্তরিকতার প্রমাণ পেয়েছে।  জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি-মুনের বিশেষ দূত অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো এসে সরকারের সঙ্গে বিরোধী দলের বৈঠকের উদ্যোগ নেন। আমরা তাতেও সাড়া দিয়েছি। যদিও মিথ্যা মামলায় কারাগারে আটক আমাদের নেতা-কর্মীদের মুক্তি দেয়া হয়নি। বিরোধী দলের ওপর নির্যাতন বন্ধ হয়নি। এমনকি, একতরফা নির্বাচনের ঘোষিত তফসিল পর্যন্ত স্থগিত করা হয়নি। অর্থাৎ, আলোচনার একট সুষ্ঠু পরিবেশ সরকারের তরফ থেকে সৃষ্টি করা হয়নি। তা সত্ত্বেও আলোচনার মাধ্যমে সংকট সুরাহা করার ব্যাপারে আন্তরিকতার সর্বোচ্চ প্রমাণ আমরা দিয়েছি। দু:খের বিষয়, তিন দফা আলোচনা সত্ত্বেও সরকারের অনড় মনোভাবের কারণে কোনো সমঝোতায় পৌঁছা সম্ভব হয়নি। তারা সকল দলের অংশগ্রহণে সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচন চায়নি। ক্ষমতায় থেকে নির্বাচনের নামে কী-ধরণের প্রহসন করা তাদের উদ্দেশ্য, তা সকলের সামনে এর মধেই স্পষ্ট হয়ে গেছে।  আসলে কেবল লোক দেখানোর জন্য তারা আলোচনায় এসেছিলেন। এটা ছিল সময় ক্ষেপণে তাদের এক প্রতারণাপূর্ণ কৌশল। এর আড়ালে তারা তাদের অসৎ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের পথেই এগিয়ে গেছে। আপনারা জানেন, তৃতীয় দফা বৈঠকে আমাদের দেয়া প্রস্তাব নিয়ে সরকারী দল তাদের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনা করে আবার ফিরে আসার অঙ্গীকার করেছিল। তারা সে কথাও রাখেনি। আমাদেরকে আর কিছু জানানোও হয়নি। সংবাদ-মাধ্যম থেকে আমরা জেনেছি যে, তারা বলেছে, দশম সংসদ নির্বাচন নিয়ে আলোচনার আর কোনো অবকাশ নেই। নির্বাচনের নামে একতরফা এক নজীরবিহীন প্রহসনের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে তারা।

উপস্থিত সাংবাদিক বন্ধুগণ,
সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন প্রশ্নে ১৯৯৫-৯৬ সালে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় পার্টিকে সঙ্গী করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের দাবিতে আন্দোলনের নামে দেশজুড়ে এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল আওয়ামী লীগ। হত্যাকান্ড, ধ্বংসযজ্ঞ ও অর্থনৈতিক বিনাশই ছিল তাদের আন্দোলনের পন্থা। গান পাউডার দিয়ে যানবাহন জ্বালিয়ে তারা নিরপরাধ নাগরিকদের হত্যা করেছে। চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর তারা দীর্ঘদিন অচল করে রেখেছে। সে সময় বিএনপি সরকার দেশ পরিচালনা করছিল। আমরা বিভিন্ন প্রস্তাব দিয়ে সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করেছিলাম। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বন্ধুরাও মধ্যস্থতার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু আওয়ামী লীগের অনমনীয়তা ও সন্ত্রাস-আশ্রয়ী কার্যকলাপের কারণে কোনো উদ্যোগই সফল হয়নি।  আমরা প্রথম দিকে তাদের দাবির সঙ্গে একমত ছিলাম না। কিন্তু সকলের অংশগ্রহনে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের স্বার্থে আমরা তাদের দাবি পূরণে সম্মত হই। তবে তার আগেই আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতের সব সদস্য জাতীয় সংসদ থেকে পদত্যাগ করে। তখন সংবিধান সংশোধন করার মতো দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা বিএনপি’র ছিলনা। তাই কেবলমাত্র সংবিধান সংশোধনের জন্য পার্লামেন্ট ভেঙ্গে দিয়ে একটি স্বল্পমেয়াদী জাতীয় সংসদ গঠনের জন্য আমরা নতুন নির্বাচন দিই। আমরা ঘোষনা করি, এটি একটি নিয়ম-রক্ষার নির্বাচন এবং এই নির্বাচনে জিতলে আমরা দেশ পরিচালনা করবো না। আমরা সে কথা রেখেছিলাম। সংবিধান সংশোধন করে জাতীয় নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের পর আমরা সংসদ ভেঙ্গে দিই এবং সরকার পদত্যাগ করে। সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা তুলে দিয়ে, ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন করার হীন উদ্দেশ্যে আওয়ামী লীগ একতরফাভাবে সংবিধানের বিতর্কিত পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করেছে। সে কারণেই আজকের সংকটের সূত্রপাত ঘটেছে। এই হঠকারিতার কারণে দেশে যা-কিছু ঘটছে, তার দায়-দায়িত্ব আওয়ামী লীগের নেতাদেরকেই বহন করতে হবে। আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা হচ্ছে, দুই প্রধান রাজনৈতিক পক্ষের মধ্যে একটি ঐক্যমত ও সমঝোতা ছাড়া শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর এবং সকলের অংশগ্রহনে একটি সুষ্ঠ, অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব নয়। এটা জানা সত্ত্বেও, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থেকে, প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে, তাদের ক্ষমতাকে প্রলম্বিত করার যে কূটকৌশল গ্রহন করেছে, তার বিষময় কুফল আজ দেশবাসী পাচ্ছে।

সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা,
আওয়ামী লীগের সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায়ই বলে থাকেন যে, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তিনি জনগণের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করেছেন। কিন্তু সংবিধানের এই বিতর্কিত সংশোধনীর আওতায় তিনি আজ নির্বাচনের নামে যে প্রহসন পরিচালনা করছেন তাতে জনগণের ভোট ছাড়াই ১৫৪ জন এমপি হয়ে যাচ্ছেন। অর্থাৎ সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য তাদের জনগণের ভোটের কোনো প্রয়োজন হয়নি। দেশের মোট ভোটারের শতকরা প্রায় ৫৩ জনের ভোটের অধিকার এই প্রক্রিয়ায় কেড়ে নেয়া হয়েছে। বাকী আসনগুলোতেও যারা প্রার্থী আছেন তাদেরও কোনো উপযুক্ত ও যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। সেখানেও ভোটাররা বঞ্চিত হচ্ছেন তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে। কারণ শুধু বিএনপি নয়, দেশের উল্লেখযোগ্য সকল বিরোধী দলই এই নির্বাচনী প্রহসন বর্জন করেছে। শুধু আওয়ামী লীগ এবং তাদের জোটের একাংশ এই একতরফা প্রহসনে শামিল হয়েছে। এই নির্বাচনী তামাশা কোনো ইলেকশন নয়, এটা নির্লজ্জ সিলেকশন। জনগণের  ভোটাধিকার হরণের এমন জঘণ্য প্রহসন আমাদের জাতীয় ইতিহাসে এক ঘৃণ্য কলঙ্কের অধ্যায় হয়ে থাকবে। শাসকদলের এই অপকৌশলের কথা আমরা বিগত কয়েক বছর ধরেই বারবার বলে আসছিলাম। দেশ পরিচালনায় সম্পূর্ণ ব্যর্থ এই চরম অত্যাচারী ও অযোগ্য সরকার জনগণ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। তাই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ কোনো নির্বাচনে জনগণের ভোটে নিজেদের জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের সাহস তাদের নেই।  নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের জন্য আমাদের দাবি গণদাবি ও জাতীয় আকাঙ্খায় পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা গেছে শতকরা ৮০ জনেরও বেশি মানুষ নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন করার পক্ষে। যখন সারাদেশে লক্ষ লক্ষ মানুষ আমাদের সঙ্গে রাজপথে নেমে শান্তিপূর্ণভাবে এই দাবির সঙ্গে একাত্মতা ঘোষনা করছিলেন, তখন সরকার শান্তিপূর্ণ সমাবেশের সকল অধিকার কেড়ে নিয়েছে। দুনিয়ার সব গণতান্ত্রিক দেশে জনগণের ও বিরোধী দলের রাজপথে নেমে শান্তিপূর্ণ পন্থায় তাদের দাবি তুলে ধরার অধিকার থাকলেও বাংলাদেশে তা নেই। এখানে কেবল সরকারের সমর্থকরা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ছত্রছায়ায় রাজপথে সশস্ত্র মহড়া দিতে পারে। অথচ আমাদের সংবিধানে সকলকেই শান্তিপূর্ণ সমাবেশ অনুষ্ঠানের অধিকারের নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে। বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের দিয়ে কারাগারগুলো ভরে ফেলা হয়েছে। আমাদের সদর দফতর ও শাখা কার্যালয়গুলো অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। নির্বিচারে  চলছে হত্যা, গুম, নির্যাতন, গুলি, কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ, লাঠিচার্জ, গ্রেফতার ও অপহরণ। সুপরিকল্পিতভাবে এই সন্ত্রাসী পরিবেশ তৈরি করে দেশের জনগণ ও বিরোধী দলকে আতংকিত ও পলায়নপর রেখে সরকার তাদের নির্বাচনী প্রহসনের নীল-নক্শার বাস্তবায়ন শুরু করেছে।

প্রিয় বন্ধুরা,
এই পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুটি গুরুতর কথা বলেছেন।
এক. সমঝোতার মাধ্যমে আসনগুলো ভাগাভাগি করেছেন তারা। ফলে ১৫৪ আসন ভোট ছাড়াই তারা পেয়ে গেছেন। বিএনপি অংশ নিলে এভাবেই আমাদেরকেও আসন দেয়া হতো।
দুই. বিরোধী দল নির্বাচনে অংশ না নেয়ায় একদিক থেকে ভালোই হয়েছে। জনগণকে আর বিরোধী দলকে ভোট দিতে হলো না। এতে জাতি অভিশাপমুক্ত হয়েছে।
তার কথাতেই পরিস্কার হয়েছে, নির্বাচন নয়, জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে আসন ভাগাভাগির প্রহসনই তিনি চেয়েছেন এবং এটাও প্রমাণিত হয়েছে যে, যদি বিরোধীদল এতে অংশ নিতো তবুও তিনি একই রকম প্রহসনের চেষ্টাই করতেন।
দ্বিতীয়ত: বিরোধীদলহীন নির্বাচনই তাঁর কাম্য। একদলীয় ব্যবস্থাতেই তিনি বিশ্বাসী। সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি এমন ব্যবস্থা করেছেন, যাতে জনগণ বিরোধী দলকে ভোট দেয়ার কোনো সুযোগ না পায়। এতে তিনি পরিতৃপ্তিবোধ করছেন।
আমি প্রধানমন্ত্রীকে বলতে চাই যে, আসন ভাগাভাগি করার আপনি কেউ নন। এটা জনগণের অধিকার। তারাই ভোট দিয়ে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করবে। সেই অধিকার আপনি কেড়ে নিয়েছেন। আমরা সকলেই জানি যে, কোনো রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তি নয়, জনগণই প্রজাতন্ত্রের মালিক এবং সার্বভৌম ক্ষমতার উৎস। তারা একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ, বিশ্বাসযোগ্য, সুষ্ঠু নির্বাচনে ভোট দিয়ে পছন্দের প্রার্থীদের তাদের প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত করেন। সেই প্রতিনিধিদের সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তে সরকার গঠন ও রাষ্ট্র পরিচালনার অধিকার অর্জিত হয়।   এটাই গণতন্ত্রের বিধান। এই বিধানের অন্যথা হলে গণতন্ত্র থাকেনা। সেটা হয়ে দাঁড়ায় অবৈধ  স্বৈরাচার। আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রের পথ ছেড়ে সেই অবৈধ স্বৈরাচারের পথেই পা দিয়েছে। ইতিহাসের অমোঘ বিধানে এই পা চোরাবালিতে আটকে যেতে বাধ্য। আমরা পরিস্কার ভাষায় বলতে চাই, ভোট ও কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়া ১৫৪ জন এবং কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়া বাকী যাদেরকেই আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশন সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত ঘোষণা করবে, তারা কেউই বৈধ জনপ্রতিনিধি হবে না। কেননা, জনগণ তাদেরকে ভোট দিয়ে কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনে প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত করছে না। কাজেই তাদের সমর্থনে গঠিত সরকার হবে সম্পূর্ণ অবৈধ, অগণতান্ত্রিক ও জনপ্রতিনিধিত্বহীন। তেমন একটি অবৈধ সরকারের আদেশ নির্দেশ মান্য করতে প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং জনগণের  কোনো বাধ্যবাধকতা থাকেনা। নৈতিক ও জনসমর্থনের দিক বিবেচনায় নিলে এবং বারবার সংবিধানের বেপরোয়া লঙ্ঘণের কারণে এই সরকার অনেক আগেই দেশ পরিচালনার অধিকার ও বৈধতা হারিয়েছে। তবুও সাংবিধানিক সংকট ও শূণ্যতা চাইনি বলেই এখনো সরকারের কর্তৃত্ব ও অস্তিত্বের প্রতি আমাদের স্বীকৃতি অব্যহত রয়েছে। সংসদ বহাল রেখে নির্বাচনী প্রহসন করতে গিয়ে তারা নজীরবিহীন এক চরম জটিলতা সৃষ্টি করেছে। যে আসন শূণ্য হয়নি, সেখানে নতুন করে  জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের প্রশ্ন অবান্তর। বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্যের এক নিকৃষ্ট নজীর সৃষ্টি করেছে প্রতিটি আসনে এই দ্বৈত প্রতিনিধিত্ব। এই পরিস্থিতি যারা সৃষ্টি করেছে তাদেরকেই এর নিরসনের দায়িত্ব নিতে হবে।

সাংবাদিক বন্ধুগণ,
১৯৭৫ সালে এই আওয়ামী লীগ গণতন্ত্র হত্যা করেছিল। নিজেদের লুন্ঠন ও শাসন-ক্ষমতা পাকাপোক্ত রাখতে সমাজতন্ত্রের নামে একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিল। সব দল নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। সংবাদপত্র ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং জনগণের সকল মৌলিক ও মানবিক অধিকার কেড়ে নিয়েছিল। বিনা ভোটে সরকারের মেয়াদ বাড়িয়ে দিয়েছিল। নির্বাচন ছাড়াই তাদের নেতাকে রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত করে ঘোষণা করেছিল: ‘যেন তিনি নির্বাচিত।’ প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগণের সম্মতি ছাড়াই এই অগণতান্ত্রিক পদক্ষেপগুলো তারা গ্রহন করেছিল পার্লামেন্টারী ক্যু’র মাধ্যমে। রাষ্ট্রশক্তির নিপীড়ন চালিয়ে এবং পেশীশক্তির প্রয়োগে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে জনগণের সকল প্রতিবাদ-বিক্ষোভকে স্তব্ধ করে দেয়া হয়েছিল। আজ আবারো আওয়ামী লীগ সেই কলঙ্কিত ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে একটু ভিন্ন আদলে। জনগণের অধিকার হরণকারী চতুর্থ সংশোধনীর মতো এবারের বিতর্কিত পঞ্চদশ সংশোধনী তারা একতরফাভাবে ব্রুট মেজরিটির জোরে সংসদে পাস করেছে। এরপর তারা ধাপে ধাপে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে গণতন্ত্র হত্যার পথে। প্রহসন ও কারসাজির মাধ্যমে  নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে ধ্বংস করার ক্ষেত্রে সর্বশেষ উদ্যোগের মাধ্যমে তারা গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকছে। বর্তমান অবস্থায় প্রাচীন একটি ফরাসী প্রবাদের অনুকরণে আমি আজ দেশবাসীর উদ্দেশ্যে একটি বাক্য উচ্চারণ করতে চাই: ‘ডেমোক্রেসি ইজ ডেড, লং লিভ ডেমোক্রেসি।’

সমবেত সাংবাদিকবৃন্দ,
দেশে এখন নির্বাচনের নামে সরকারের ক্ষমতার মেয়াদ বাড়িয়ে নেয়ার উদ্দেশ্যে ন্যক্কারজনক যে তামাশা চলছে তাতে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বৃটিশ সাময়িকী ‘ইকোনমিস্ট’ তাদের প্রতিবেদনের শিরোনাম করেছে, ‘শাসকেরা জিতবে, হারবে বাংলাদেশ’। শুধু শাসক দল আওয়ামী লীগ জিতলে কথা ছিলনা। যে বিজয়ের অর্থই হচ্ছে দেশের পরাজয়, বাংলাদেশের হেরে যাওয়া, সেটি আমরা মেনে নিতে পারি না। এদেশের জনগণ জীবন দিয়ে, রক্ত দিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধ করে যে-দেশ সৃষ্টি করেছে, তারা সেই দেশের পরাজয় মেনে নেবে না। অনেক ত্যাগের বিনিময়ে এদেশের মানুষ যে গণতন্ত্র এনেছে, সেই গণতন্ত্রকেও তারা কেড়ে নিতে, পরাজিত হতে দিবে না। এদেশের মানুষ তাদের ভোটের অধিকার আদায় করবেই। বাংলাদেশের জনগণ শান্তি, নিরাপত্তা, নিশ্চয়তা ও সুুষ্ঠু অর্থনৈতিক তৎপরতার উপযোগী পরিবেশ চান। দীর্ঘ মেয়াদে যাতে বাংলাদেশ অশান্ত, অনিরাপদ ও অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ছেয়ে না যায়, তার জন্যই গ্রামে গঞ্জে, শহরে বন্দরে, পাড়ায় মহল্লায় মানুষ আজ লড়াইয়ে নেমেছে। এ লড়াই গণতন্ত্র রক্ষার, অধিকার প্রতিষ্ঠার, জীবন রক্ষার, দেশ বাঁচাবার, শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনবার। জনগণের বিজয় অর্জন পর্যন্ত এই লড়াই চলতে থাকবে এবং আমরা জনগণের সঙ্গেই থাকবো ইনশাআল্লাহ্।
গণবিচ্ছিন্ন, সন্ত্রাসী, গণহত্যাকারী ও মহালুটেরা সরকার জানতো, তাদের এই কারসাজির বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে উঠবেই। তাই তারা খুবই সুকৌশলে পরিকল্পিত পন্থায় প্রহসনের নির্বাচনের প্রক্রিয়া এবং মানবতাবিরোধী ট্রাইব্যুনালের বিচারের রায়ের বাস্তবায়নকে একই সময়সীমায় এনে দাঁড় করিয়েছে। জনগণের শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অন্তর্ঘাত সৃষ্টির মাধ্যমে নিরীহ নিরপরাধ মানুষকে সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করে, আগুনে ঝলসিয়ে দিয়ে তারা এর দায় বিরোধী দলের ওপর চাপাতে চাইছে। ২০০৬ সালে যারা প্রকাশ্য রাজপথে লগি-বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে বহু মানুষকে হত্যা করে মৃতদেহের উপর পৈশাচিক উল্লাস করেছে সেই আওয়ামী লীগ আজ মানবতা ও শান্তির বাণী শোনাচ্ছে। অপরদিকে জনগণের ভোটাধিকার রক্ষার গণতান্ত্রিক আন্দোলনের উদ্দেশ্য নিয়ে চালাচ্ছে অপপ্রচার। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে সংঘঠিত হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজের বিচার আমরাও চাই। তবে বিএনপি বারবার মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের সঙ্গে না জড়িয়ে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় আইনগত মানদন্ড বজায় রেখে পরিচালনার পক্ষে অবস্থান ব্যক্ত করেছে। আমাদের পরামর্শ মেনে সরকার যদি বিষয়টিকে নিয়ে অতি-রাজনীতি না করতো, তাহলে আজ দেশে-বিদেশে এ নিয়ে এতো সংশয় সৃষ্টি ও প্রশ্ন উত্থাপিত হতো না। বাংলাদেশের অনেক বন্ধু রাষ্ট্র, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, এমনকি জাতিসংঘ পর্যন্ত বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও মান নিয়ে যে আপত্তি তুলছে, তাতে আমাদের অনেক বেশী সতর্ক ও সচেতন হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। তবে এ বিষয়ে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ যে-প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে, তা স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে আমাদেরকে মর্মাহত করেছে। পাকিস্তানের ভেতরই দায়িত্বশীল মহল থেকে এর প্রতিবাদ করা হচ্ছে। বিএনপির তরফ থেকে এ বিষয়ে আগেই আমাদের প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। আজ আমি আবারো বলছি, ১৯৭১ সালে আমরা যুদ্ধ করে স্বাধীনতা এনেছি। পাকিস্তান এখন সহ¯্র মাইল দূরবর্তী এক পৃথক রাষ্ট্র। ১৯৭৪ সালে আওয়ামী লীগের সরকারই ত্রিদেশীয় চুক্তি সই করেছিল।  সেই চুক্তিতে পাকিস্তানী যুদ্ধ অপরাধীদের বিচার না করার এবং অতীত তিক্ততা ভুলে সামনে অগ্রসর হবার অঙ্গীকার তারাই করেছিলো। এরপর কোনো ইস্যু নিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি হলে তা কূটনৈতিকভাবেই নিরসন করা উচিত। কূটনৈতিকভাবে ব্যর্থ হয়ে সরকার এই প্রসঙ্গকে পুঁজি করে দেশের ভেতরে নোংরা রাজনীতি করার চেষ্টা করছে। এই রাজনৈতিক খেলা বন্ধ করুন।

সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা,
জনগণের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চলছে। আমি বারবার বলেছি, আজ আবারো বলছি, নির্দোষ সাধারণ মানুষের জানমালের যেন কোনো ক্ষতি না হয় সে দিকে সকলের সচেতন দৃষ্টি রাখতে হবে। একদিকে হত্যা, নির্যাতন, গুম অপরদিকে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে অন্তর্ঘাত সৃষ্টির অপকৌশল সরকার নিয়েছে। বিচারপতির বাড়িতে বোমা হামলা ও হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়ি পুড়িয়ে দেয়ার সময় শাসক দলের লোকেরা ধরা পড়লেও বিচার হচ্ছে না। দোষ দেয়া হচ্ছে বিরোধী দলের ওপর। কাজেই সকলকে খুব বেশি সজাগ ও সচেতন থাকতে হবে। বাংলাদেশের জনগণই আমাদের শক্তির উৎস। তাদের জন্য এবং তাদেরকে নিয়েই আমাদের সংগ্রাম। প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের জীবন ও সম্পদের উপর হামলার প্রকাশ্য উস্কানি দিয়েছেন। জনপ্রতিরোধ গড়ে তুলেই এ ধরনের হামলার মোকাবিলা করতে হবে। সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে গণপ্রহরার ব্যবস্থা করতে হবে। বাংলাদেশের জনগণের অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্য ক্ষুন্ন হতে দেয়া যাবে না। এ প্রসঙ্গে আমি গত ২১ অক্টোবর সংবাদ সম্মেলনে দেয়া আমার বক্তব্যের পুনরুল্লেখ করে বলতে চাই কোন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষ হামলার শিকার হলে আগামীতে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে অপরাধীদের চিহ্নিত ও শাস্তিবিধান নিশ্চিত করা হবে। দেশব্যাপী সন্ত্রাস, নাশকতা, হানাহানি উস্কে দিয়ে, অন্তর্ঘাত সৃষ্টি করে সরকার প্রহসনের নির্বাচনকে আড়াল করার যে অপকৌশল নিয়েছে এবং স্বাধীনতার চেতনা বাস্তবায়নের নামে তারা তাদের অপশাসন ও নিষ্ঠুর লুন্ঠনকে দীর্ঘায়িত করার যে নীল-নক্শা প্রনয়ণ করেছে, তা ব্যর্থ করে দিতে হবে জনগণের সম্মিলিত প্রতিরোধ সৃষ্টি করে। দেশে আজ ভয়ংকর অনিশ্চিত এক নৈরাজ্যকর অবস্থা সৃষ্টি করেছে সরকার। বিরোধী দলের নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষকে রাজপথে গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে। এখন শুরু হয়েছে ঘরে ঢুকে হত্যা। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার নামে যৌথবাহিনী গঠন করে তাদেরকে চরমভাবে অপব্যবহার করছে সরকার। তালিকা করে বেছে বেছে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের হত্যা, গ্রেফতার, অপহরণ, নির্যাতন করা হচ্ছে। জনগণের বিরুদ্ধে পরিচালিত এই বেআইনী ও নৃশংস অভিযানে দেশের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের নিয়োজিত করার অপচেষ্টাও শুরু হয়েছে। পিলখানা হত্যাযজ্ঞ ও শাপলা চত্ত্বরে রক্তপাতের খলনায়কেরা দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীকে দেশবাসীর মুখোমুখি দাঁড় করাবার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। জনগণের সম্পদ দেশপ্রেমিক সশস্ত্র বাহিনীকে প্রহসনের নির্বাচনে জড়িত করে বিতর্কিত না করার জন্য আমি সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। সরকারের নির্দেশে যৌথবাহিনীর অভিযানে শাসকদলের সশস্ত্র ক্যাডাররাও অংশ নিচ্ছে। তারা বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের পরিবারের সদস্য, আত্মীয়-স্বজন ও মহিলাদের পর্যন্ত আটক করে নিয়ে গিয়ে অমানুষিক নির্যাতন চালাচ্ছে। অনেকের হত্যার পর লাশ গুম করা হচ্ছে। তাদের ঘর-বাড়ি লুটপাট, বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়া এবং আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। সেই সঙ্গে চলছে গুপ্তহত্যা ও গুম করা। এ ধরণের  পৈশাচিকতার তুলনা কেবল ভিনদেশী হানাদার বাহিনীর বর্বরতার সঙ্গেই করা চলে। আজ লক্ষীপুর, মেহেরপুর, সিরাজগঞ্জ, নীলফামারী, বগুড়া, জয়পুরহাট, সীতাকুন্ড, বাগেরহাট, সাতক্ষীরাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলছে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের তান্ডব। প্রধানমন্ত্রী ও শাসক দলের প্রকাশ্য হুমকির পর তা’ আরো বিস্তৃত ও নৃশংস হয়ে উঠেছে। এর দায়-দায়িত্ব উস্কানি ও নির্দেশদাতা সরকার ও নির্বাচন কমিশনকেই নিতে হবে। আমি আইন ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘণ করে দেশের নাগরিকদের ওপর এই নির্মম দমন-অভিযানের প্রতি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা সমূহের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। এই হত্যাযজ্ঞ ও নিপীড়ন বন্ধে সকলকে সোচ্চার হবার এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহবান জানাচ্ছি। বাংলাদেশের বিরাজমান সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ ও নিরসনের উদ্যোগ গ্রহণের জন্য আমি জাতিসংঘকে আবারো ধন্যবাদ জানাই। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার, সংসদ, রাজনৈতিক দল, বিশিষ্ট নাগরিকবৃন্দ, সংবাদ মাধ্যম, মানবাধিকার সংস্থা সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে ন্যায় প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের অধিকার সুরক্ষায় যেভাবে সোচ্চার হয়ে উঠেছেন, তার জন্য আমি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও অভিনন্দন জানাচ্ছি।
আমি আশা করি, বাংলাদেশে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, শান্তি-স্থিতি, আইনের শাসন ও জনগণের অধিকার রক্ষায় তারা আরো কার্যকর ভূমিকা রাখবেন এবং পরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শিকার জনগণের পক্ষে বলিষ্ঠভাবে দাঁড়াবেন। দেশের একমাত্র নোবেল বিজয়ী ব্যক্তিত্ব প্রফেসর ড. মুহম্মদ ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংক নারীর ক্ষমতায়ন ও ক্ষুদ্রঋণ আন্দোলনের মাধ্যমে দারিদ্রমোচনের ক্ষেত্রে  অর্জিত অগ্রগতিকে রক্ষার জন্য লড়াই করে যাচ্ছেন। আমি এই আন্দোলনকেও জনগণের অধিকার রক্ষার গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অংশ বলেই মনে করি।       আমি তাদের ধন্যবাদ জানাই। দেশের প্রায় সকল রাজনৈতিক দল প্রহসনের নির্বাচনকে বর্জন করে মানুষের ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র রক্ষার দাবিতে আজ অটল ভূমিকা পালন করছে। আমি তাদেরকে ধন্যবাদ জানাই। সকলের প্রতি আমার আহবান, নিজ নিজ রাজনৈতিক বিশ্বাস, কর্মসূচি ও আদর্শ অক্ষুন্ন রেখেই আসুন, দেশ বাঁচাতে, মানুষ বাঁচাতে, মানবাধিকার ও গণতন্ত্র রক্ষায়, বহুদলীয় গণতন্ত্র থেকে একদলীয় স্বৈরশাসনের দিকে যাত্রাকে রুখে দিতে আমরা এক হয়ে লড়াই করি। এই সংগ্রামে বিজয়ের পর আমরা সকলে মিলে গড়ে তুলবো অখন্ড জাতীয় সত্ত্বা। দূর করবো হানাহানির অন্ধকার। কায়েম করবো সুশাসন। ফিরিয়ে আনবো আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার। সমঝোতার ভিত্তিতে প্রধান জাতীয় সমস্যা ও বিরোধীয় ইস্যুগুলোর নিষ্পত্তি করবো। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী করবো। বাংলাদেশকে উৎপাদন ও কর্মমুখর করে সামনের দিকে এগিয়ে  নেবো। দেশের সিভিল সমাজ ও ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার সংগঠনকে আমি ধন্যবাদ জানাই শান্তি, সমঝোতা ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতির পক্ষে সোচ্চার হবার জন্য। আমি সাংবাদিক বন্ধুদেরকেও ধন্যবাদ জানাই। গণমাধ্যম আজ শৃঙ্খলিত ও রাষ্ট্রীয় ভীতির শিকার। এর মধ্যেও আপনারা সাহস করে অনেক সত্য তুলে ধরছেন। দেশবাসী সংবাদ-মাধ্যম থেকেই জানতে পেরেছেন কী সীমাহীন লুন্ঠন ও দুর্নীতি করে শাসকদলের নেতা-মন্ত্রী-এমপি ও তাদের নিকটজনেরা অঢেল সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। তাদের নিজেদের দেয়া হিসেব থেকেই জানা গেছে যে, গত পাঁচ বছরে তাদের সম্পদের পরিমাণ সোয়া দুই হাজার গুণ পর্যন্ত বেড়েছে। শেয়ারবাজার ও রাষ্ট্রয়াত্ত্ব ব্যাংকগুলো তারা নির্মমভাবে লুটে নিয়েছে। কারসাজি ও অত্যাচার চালিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকার ব্যাপারে তাদের যে উদগ্র বাসনা, তার অন্যতম কারণ হচ্ছে, লুটপাটের এই অবারিত সুযোগ। এ সুযোগ তারা যে কোনো মূল্যে অব্যাহত রাখতে চায়। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত বাহিনীর সদস্যদের প্রতি আমি আবারো আহবান জানাচ্ছি, সরকার কিংবা দলবাজ কিছু মুষ্টিমেয় কর্মকর্তার নির্দেশে আপনারা বেআইনি ও অন্যায় কোনো তৎপরতায় লিপ্ত হবেন না। আপনারা বিরোধীদল বা জনগণের প্রতিপক্ষ নন। সরকারি দলের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল এবং হত্যা, গুম, নির্যাতন চালাবার হাতিয়ার হিসেবে আপনারা ব্যবহৃত হতে পারেন না। মনে রাখবেন, আপনারা সরকারের নন, জনগণের কর্মচারি। এখন সময় এসে গেছে, আপনাদেরকে জনগণের পক্ষেই দাঁড়াতে হবে। এই স্বৈরশাসনের সময় ফুরিয়ে এসেছে। কাজেই তাদের ক্রীড়নক হয়ে নিজ নিজ বাহিনীর সুনাম ও ঐতিহ্য ক্ষুন্নকারী তৎপরতা থেকে আপনারা বিরত থাকবেন, এ আমার আহবান। সরকারকে বলবো, নিজেরা জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন। এখন বাংলাদেশকে সারা দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে বিপদে ফেলবেন না। এই দেশ, এ দেশের মানুষ আপনাদেরকে অনেক দিয়েছে। তাদের প্রতি প্রতিশোধপ্রবণ হয়ে দেশটাকে ধ্বংস করে ফেলবেন না। অনমনীয়তা ও হঠকারিতা পরিহার করে বাস্তবের দিকে ফিরে তাকান।  প্রধানমন্ত্রী এখনো প্রহসনের নির্বাচন করার ব্যাপারে অনড়। তিনি বলেছেন, দশম সংসদ নিয়ে কোনো আলোচনা নয়। পরে একাদশ সংসদ নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এটা যুক্তির নয়, জেদের কথা। এটা বাস্তবসম্মত নয়, অপকৌশলের কথা। আমি তাকে অনুরোধ করি, একগুঁয়েমি পরিহার করুন। গণতান্ত্রিক রাজনীতি হচ্ছে ‘আর্ট অব কমপ্রোমাইজ’। সমঝোতা স্থাপন করলে কেউ ছোট হয়ে যায়না। ১৯৯৬ সালে আমরা আপনাদের দাবি মেনে নিয়ে সমঝোতা স্থাপন করেছিলাম। এখন আপনারা ক্ষমতায় আছেন। জনগণের দাবি মেনে নিয়ে সমঝোতায় আসুন। এখনো সময় শেষ হয়ে যায়নি। প্রহসনের নির্বাচনের তফসিল বাতিল করুন। আলোচনা শুরু করুন। আমরাও আলোচনায় বসতে রাজি আছি। জনগণের অর্থের অপচয় করে ভোটবিহীন, প্রার্থীবিহীন, প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন একটা অর্থহীন প্রহসনের নির্বাচন করার প্রয়োজন নেই। এতে শুধু আপনারাই কলংকিত হবেন না, গণতন্ত্রও ধ্বংস হবে। আওয়ামী লীগের ভেতরে বিবেকবান, গণতন্ত্রমনা ও দেশপ্রেমিক মানুষ যারা আছেন তাদের প্রতিও আমার আহ্বান, এই দেশ এবং এ দেশের মানুষের বিরুদ্ধে দাঁড়াবেন না। স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ, জনগণের প্রত্যাশা ও তাদের গণতান্ত্রিক অধিকারের পক্ষে আপনারাও অবস্থান নিন। স্বৈরশাসন ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হোন। জনগণের আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করুন। নানা বাধাবিঘœ পেরিয়ে ১৯৯১ সাল থেকে এদেশে গণতান্ত্রিক যে বিধি-ব্যবস্থা চলে আসছিলো, এবার আওয়ামী লীগের হাতে তার অপমৃত্যু ঘটতে যাচ্ছে। এই গণতন্ত্র বিনাশের ক্ষেত্রে দোসর হয়েছে মেরুদন্ডহীন ও আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশন। সংবিধানের দোহাই দিয়ে ভোট, ভোটার ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন এক কারসাজির মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে বিজয়ী এবং গণতন্ত্রকে পরাজিত ও জনগণের ভোটাধিকার হরণের ঘৃন্য প্রক্রিয়া তারা চালাচ্ছে।  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর কথা প্রায়ই বলেন। এবার দেশের মানুষ তার ন্যক্কারজনক প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছে। এটা ইলেকশন নয়, সিলেকশন। এখানে জনগণ ও প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এই নির্বাচন ও এর মাধ্যমে গঠিত সরকার ‘বাই দ্য পিপল, ফর দ্য পিপল, অফ দ্য পিপল’ হবে না। এটা হবে : ‘বাই দ্য ইলেকশন কমিশন, ফর দ্য আওয়ামী লীগ, অফ দ্য আওয়ামী লীগ’। এই গণবিরোধী প্রক্রিয়া বন্ধ করার সাধ্য না থাকলে ইলেকশন কমিশনের অন্তত: পদত্যাগ করা উচিত। ইতিমধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কমনওয়েলথ ও যুক্তরাষ্ট্র এই প্রহসনে পর্যবেক্ষক না পাঠাবার কথা জানিয়েছে। অন্যরাও জনগণের অধিকার হরণের এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হবার বদলে গণতন্ত্র ও বাংলাদেশের মানুষের ভোটাধিকারের পক্ষে অবস্থান নেয়ার ইংগিত দিয়েছে। অর্থাৎ শুধু দেশে নয়, বিশ্বসমাজও এই নির্বাচনী প্রহসনকে বৈধতা দিতে রাজি নয়।  বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র এবং জনগণের ভোটাধিকারের পক্ষে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এই দৃঢ় অবস্থানকে আমি সাধুবাদ জানাই। এই প্রহসন ঘৃনাভরে বর্জনের জন্য আমি বাংলাদেশের নাগরিক ও ভোটারদের প্রতি আহবান জানাই। যে প্রহসনকে সারা দুনিয়ার কেউ বৈধতা দিতে রাজি নয়, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যাতে শামিল হচ্ছে না, সেই প্রক্রিয়ায় জড়িত না হবার জন্যও আমি সংশ্লিষ্ট সকলকে অনুরোধ করছি।

প্রিয় সাংবাদিকবৃন্দ,
গণতান্ত্রিক আন্দোলনে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও আওয়ামী সন্ত্রাসীদের গুলিতে এবং শাসক দলের পরিকল্পিত অন্তর্ঘাত ও নাশকতায় যারা জীবন দিয়েছেন, আমি তাদের রুহের মাগফিরাত কামনা করি। তাদের শোকার্ত স্বজনদের প্রতি সমবেদনা জানাই। যারা নির্যাতিত, ক্ষতিগ্রস্ত ও পঙ্গু হয়েছেন তাদের প্রতিও জানাচ্ছি গভীর সহানুভূতি। সারা দেশের জনগণ যেভাবে এই আন্দোলনে একাত্ম হয়ে নিভৃত পল্লীতে পর্যন্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন, সে জন্য তাদেরকে অভিনন্দন জানাই। আমাদের এই আন্দোলন সফল হবেই ইনশাআল্লাহ্। জনগণের বিজয় অনিবার্য।
আমি এখন চলমান আন্দোলনে চার দফা করণীয় ও নীতি-কৌশল তুলে ধরছি:
১। ভোটাধিকার হরণকারী ও মানবাধিকার লঙ্ঘণকারী সরকারের বিরুদ্ধে প্রাণক্ষয়ী লড়াইয়ে যারা শরিক আছেন এবং হচ্ছেন তাদের মধ্যে সমন্বয়, সমঝোতা ও ঐক্য গড়ে তুলুন।
২। বিভক্তি ও বিভাজনের বিষাক্ত রাজনীতির চিরঅবসান ঘটানোর জন্য জনগণের ইচ্ছা ও অভিপ্রায়কে মূল্য দিন। জাতীয় ক্ষেত্রে বিতর্কিত বিষয়সমূহ অবাধ ও শান্তিপূর্ণভাবে আলাপ আলোচনা এবং গণভোটের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক পন্থায় মীমাংসার রাজনৈতিক সংকল্পকে জোরদার করুন। সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষ যা চায় না দেশের সংবিধানে তা থাকতে পারে না।
৩। ভোটকেন্দ্র ভিত্তিক সংগ্রাম কমিটিগুলোর পাশাপাশি দেশ ও গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলনরত সকল পক্ষকে নিয়ে অবিলম্বে জেলা, উপজেলা ও শহরে ‘সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষা সংগ্রাম কমিটি’ গঠন করে পাঁচ জানুয়ারি নির্বাচনী তামাশা প্রতিহত করুন। প্রতিটি জেলার প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখুন এবং জনগণের জান, মাল ও জীবীকার নিরাপত্তা বিধানের ক্ষেত্রে স্ব স্ব নাগরিক দায়িত্ব পালন করুন।
৪। গণতন্ত্রের এই সংগ্রামে সংখ্যালঘু ধর্মাবলম্বী, সম্প্রদায় ও জাতিগোষ্ঠির মানুষদের যুক্ত করার পাশাপাশি তাদের জান-মালের নিরাপত্তা লংঘণের সরকারি ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রাখুন, সজাগ থাকুন। কোন প্রকার সাম্প্রদায়িকতাকে বরদাশত করবেন না।
এই আন্দোলনকে আরো বিস্তৃত, ব্যাপক ও পরবর্তী ধাপে উন্নীত করার লক্ষ্যে আমি আগামী ২৯ ডিসেম্বর  রোজ  রোববার সারা দেশ থেকে দলমত, শ্রেণী-পেশা, ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সক্ষম নাগরিকদেরকে রাজধানী ঢাকা অভিমুখে অভিযাত্রা করার আহবান জানাচ্ছি। এই অভিযাত্রা হবে নির্বাচনী প্রহসনকে ‘না’ বলতে, গণতন্ত্রকে ‘হ্যাঁ’ বলতে। এই অভিযাত্রা হবে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অর্থবহ নির্বাচনের দাবিতে। এই অভিযাত্রা হবে শান্তি, গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকারের পক্ষে। এই অভিযাত্রা হবে ঐতিহাসিক। আমরা এই অভিযাত্রার নাম দিয়েছি: ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’, গণতন্ত্রের অভিযাত্রা।
আমার আহবান, বিজয়ের মাসে লাল-সবুজের জাতীয় পতাকা হাতে সকলেই ঢাকায় আসুন। ঢাকায় এসে সকলে পল্টনে বিএনপি’র কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে মিলিত হবেন।
আমার আহ্বান এই অভিযাত্রায় ব্যবসায়ীরা আসুন, সিভিল সমাজ আসুন, ছাত্র-যুবকেরাও দলে দলে যোগ দাও।
মা-বোনেরা আসুন, কৃষক-শ্রমিক ভাই-বোনেরা আসুন, কর্মজীবী-পেশাজীবীরা আসুন, আলেমরা আসুন, সব ধর্মের নাগরিকেরা আসুন, পাহাড়ের মানুষেরাও আসুন। যে যেভাবে পারেন, বাসে, ট্রেনে, লঞ্চে, অন্যান্য যানবাহনে করে ঢাকায় আসুন। রাজধানী অভিমুখী জন¯্রােতে শামিল হোন।
একই সঙ্গে যারা রাজধানীতে আছেন, তাদের প্রতিও আমার আহ্বান, আপনারাও সেদিন পথে নামুন। যারা গণতন্ত্র চান, ভোটাধিকার রক্ষা করতে চান, যারা শান্তি চান, যারা গত পাঁচ বছরে নানাভাবে নির্যাতিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, শেয়ারবাজারে ফতুর হয়েছেন সকলেই পথে নামুন।
জনতার এ অভিযাত্রায় কোনো বাঁধা না দেয়ার জন্য আমি সরকারকে আহবান জানাচ্ছি। যানবাহন, হোটেল-রেস্তোরাঁ বন্ধ করবেন না। নির্যাতন, গ্রেফতার, হয়রানির অপচেষ্টা করবেন না। প্রজাতন্ত্রের সংবিধান নাগরিকদের শান্তিপূর্ণভাবে সমবেত হবার অধিকার দিয়েছে। সেই সংবিধান রক্ষার শপথ আপনারা নিয়েছেন। কাজেই সংবিধান ও শপথ লঙ্ঘণ করবেন না।
শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালনে বাঁধা এলে জনগণ তা মোকাবিলা করবে। পরবর্তীতে কঠোর কর্মসূচি দেয়া ছাড়া আর কোনো পথ খোলা থাকবে না।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে বলছি, দেশবাসীর এই শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি সফল করতে প্রয়োজনীয় সহায়তা আপনারা দেবেন।
এই কর্মসূচির সাফল্যের জন্য আমি পরম করুণাময় আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের সাহায্য কামনা করি।
আজ এ পর্যন্তই। আপনাদের সকলকে ধন্যবাদ।

আল্লাহ হাফেজ। বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।

 
Support : Dhumketo ধূমকেতু | NewsCtg.Com | KUTUBDIA @ কুতুবদিয়া | eBlog
Copyright © 2013. News 2 Blog 24 - All Rights Reserved
Template Created by Nejam Kutubi Published by Darianagar Publications
Proudly powered by Dhumketo ধূমকেতু