উপজেলা নির্বাচন- প্রথম ধাপ: একটি সমীক্ষা by এম সাখাওয়াত হোসেন

Monday, February 24, 2014

গত ১৯ ফেব্রুয়ারি চতুর্থ উপজেলা নির্বাচনের প্রথম ধাপের ৯৭টির মধ্যে ৯৬টির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তিনটি উপজেলায় বিএনপিসহ আওয়ামী লীগের তথাকথিত বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিভিন্ন কারণে ভোট গ্রহণের দুই ঘণ্টার মধ্যে কারচুপির অজুহাতে নির্বাচন বর্জন করা এবং কয়েকটি কেন্দ্রে অনিয়মের অভিযোগ ছাড়া প্রথম ধাপের নির্বাচন মোটামুটি শান্তিপূর্ণ হয়েছে।
আলোচিত নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে ইতিমধ্যেই নানা তথ্য বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম ধাপের নির্বাচন ২০০৯ সালে অনুষ্ঠিত তৃতীয় উপজেলা নির্বাচনে একই উপজেলার নির্বাচনী ফলাফলের সঙ্গে তুলনা করলে কয়েকটি বিষয় ধর্তব্যের মধ্যে পড়বে। প্রথমত, নানা ধরনের প্রতিকূলতা এবং পরবর্তী সময়ে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জনকারী দল বিএনপি এবং এর প্রধান সহযোগী দলের চমকপ্রদ উত্থান। দ্বিতীয়ত, মামলাসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা, নেতাদের ব্যাপক গ্রেপ্তার, যুদ্ধাপরাধের দায়ে শীর্ষস্থানীয় নেতাদের দণ্ডপ্রাপ্ত হওয়া এবং ব্যাপক নেতিবাচক প্রচার সত্ত্বেও জামায়াতে ইসলামীর আশ্চর্যজনক প্রাপ্তি। তৃতীয়ত, এযাবৎ বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম দল জাতীয় পার্টির তৃণমূল পর্যায়ে প্রায় নিশ্চিহ্ন হওয়ার উপক্রম। চতুর্থত, মহাজোটের অন্যান্য শরিক দলে জামানত হারানোর মতো পরিস্থিতি এবং আশাতীত ভোটার সমাগম না হওয়া।

প্রথম ধাপের ভোট এবং ফলাফলের পর এসব বিষয়ে কিছু বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে। তবে পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন করতে হলে ঘোষিত ৪৪৬টি উপজেলার ভোট গ্রহণের পর ফলাফল প্রকাশ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তথাপি প্রথম ধাপের নির্বাচনে যে গতিধারা দৃশ্যমান হয়েছে, তা শেষ পর্যন্ত বজায় থাকাটাই স্বাভাবিক। অন্যথায় নতুনভাবে বিশ্লেষণ হবে ব্যতিক্রম গতিধারা নিয়ে।
বিএনপি দল হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর থেকে তিন দশকের মধ্যে এমন সাংগঠনিক সংকটে পড়েনি। সাংগঠনিক সংকটই নয়, নেতাদের ব্যাপক ধরপাকড় ও মামলা ইত্যাদির কারণে কেন্দ্রে এবং তৃণমূল পর্যায়ে প্রায় নেতৃত্বশূন্য অবস্থায় রয়েছে। উপজেলা থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত বহু নেতা-কর্মী গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে আত্মগোপনে ছিলেন এবং রয়েছেন। তদুপরি ৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায়, সূত্রমতে, তৃণমূল পর্যায়ে হতাশা রয়েছে বলে প্রচারিত। এমতাবস্থায় অনুষ্ঠিত উপজেলা নির্বাচনে ওই দলের উল্লেখযোগ্য হারে শীর্ষে এগিয়ে থাকার বহুবিধ কারণ রয়েছে। এর মূলে রয়েছে সরকারি দলের অব্যাহত জনসমর্থন হ্রাস। যদিও বিভিন্ন জরিপে এ ধরনের তথ্য ইতিপূর্বে প্রকাশিত হলেও ধারাবাহিকভাবে সরকারে অধিষ্ঠিত দল বা জোট এসব ফলাফল ধর্তব্যের মধ্য না নিয়ে একধরনের আত্মপ্রবঞ্চনায় লিপ্ত ছিল। মূল কারণ খতিয়ে না দেখে তাৎক্ষণিক প্রত্যাখ্যান জনমনে আস্থা ফেরাতে পারেনি। সরকারি দল বা জোট দেয়াললিখন পড়লেও তা বিশ্বাস না করার প্রবণতায় রত ছিল।
বিএনপির এগিয়ে থাকার আরেকটি কারণ, সিংহভাগ সময় অনবরত সরকারি দল এবং দলের সমর্থকদের তৎকালীন বিরোধী দলের বিরুদ্ধে কারণে-অকারণে নানা ধরনের অপ্রিয় বক্তব্য, ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং অনেক ভিত্তিহীন অভিযোগ উত্থাপনে জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।
প্রথম ধাপের নির্বাচনে ভোটের যে প্রতিফলন ঘটেছে, তার বেশির ভাগ সরকারি জোটের নেতিবাচক ভোটের সংখ্যাই বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীদের বাক্সে জমা পড়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ৫ জানুয়ারির ১৫৩ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হওয়া এবং পরে সামগ্রিক নির্বাচন চিত্র, যেখানে প্রায় সাত কোটি ভোটার ভোট দিতে পারেননি, তার মর্মব্যথা। এ বিষয়টি হালকাভাবে দেখার উপায় নেই। ভোটারদের মনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করতে পারার যে হতাশা ছিল, তাও প্রতীয়মান হয়েছে প্রথম ধাপের উপজেলা নির্বাচনের মাধ্যমে। বিভিন্ন জরিপে তথ্য ছিল যে, এ দেশের সিংহভাগ ভোটার একটি নিরপেক্ষ ব্যবস্থায় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পক্ষে ছিল।
প্রথম ধাপের নির্বাচনে চারটি দলের সমর্থকদের মধ্যেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে, যদিও উভয় দল ঘোষিত তথাকথিত কিছু কিছু বিদ্রোহী প্রার্থীরও উপস্থিতি ছিল। চারটি দলের মধ্যে জাতীয় পার্টি না থাকার মতো, সরকারের শরিক আর কোনো দলের অস্তিত্বই ছিল না। অথচ বেশ কিছু দলের মন্ত্রীরা রয়েছেন এবং ছিলেন অতীত ও বর্তমান সরকারের মন্ত্রিসভায়। বড় দলের ছত্রচ্ছায়ায় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হলেও তৃণমূল পর্যায়ে এসব দল মোটেও বিকশিত হতে পারেনি। লক্ষণীয় যে, এসব দলের বিচরণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বহু দশকের। প্রাক্-নির্বাচনী জোটবদ্ধ হওয়া এবং নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রেখে নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার কারণে এসব দল তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠিত হতে পারেনি বলে বিশ্বাস। বহুদলীয় গণতন্ত্রের জন্য এমতাবস্থা কোনোভাবেই সহায়ক নয়।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো নীতিগতভাবে নির্দলীয় নির্বাচন হওয়ার কথা, তবে রাজনীতিবিবর্জিত নয়। হালে নির্বাচনগুলোকে অধিক রাজনৈতিকীকরণ করার ফলে দলের প্রত্যক্ষ মনোনয়ন প্রদান, মনোনয়নের বাইরের প্রার্থীদের ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী আখ্যায়িত করার কারণে এসব নির্বাচন কার্যত দলীয় রূপ ধারণ করেছে। বিগত কয়েকটি সিটি করপোরেশন নির্বাচন থেকে এ ধরনের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব নির্বাচন উন্মুক্ত এবং স্থানীয় পর্যায়ের প্রার্থীকে ঘিরেই অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। ভোটারদের ধর্তব্যের মধ্যে স্থানীয় পর্যায়ের প্রার্থীর পরিচয় এবং স্থানীয় চাওয়া-পাওয়ার ওপর ভিত্তি করে প্রার্থী নির্বাচিত হয়ে থাকেন। উপজেলা নির্বাচনের এই পর্যায়ে এমনটি থাকেনি। ভবিষ্যতেও এমনটি হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। এ ধরনের অলিখিত ব্যবস্থার ইতিবাচক এবং নেতিবাচক দিক রয়েছে। এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট নেতিবাচক দিকই প্রতীয়মান হয়েছে। উপরিউক্ত বাস্তবতার আঙ্গিকে বিশ্লেষণে দেখা যায়, এবারের নির্বাচনে দলের প্রভাবের কারণে একদিকে যেমন স্থানীয়ভাবে বহু জনপ্রিয় দলীয় ব্যক্তিরা বিভিন্ন স্তরের পৃষ্ঠপোষকতা না পাওয়ার কারণে প্রার্থী হতে পারেননি, তেমনি দলের নির্দেশনাও অনেকেই ধর্তব্যের মধ্যে আনেননি। এ কারণেই স্থানীয় প্রভাবের চেয়ে জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক প্রভাবে নির্বাচন আচ্ছন্ন ছিল। তদুপরি ছিল ক্ষমতাসীনদের স্থানীয় পর্যায়ের নিজস্ব বলয় তৈরি করার অতি উৎসাহ। এসব কারণে বিএনপি বা জামায়াতে ইসলামীর চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। বাকি নির্বাচনগুলোতে হয়তো একই ধারা বজায় থাকবে।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, প্রথম ধাপের নির্বাচনে শত প্রতিকূলতার মধ্যেও জামায়াতে ইসলামীর কল্পনাতীত সাফল্য। জামায়াত ১৩টি চেয়ারম্যান, ২৪টি পুরুষ এবং ১০টি মহিলা ভাইস চেয়ারম্যানের পদে বিজয়ী হতে সক্ষম হয়েছে। চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান পদগুলো যে শুধু জামায়াত প্রভাবিত অঞ্চলেই হয়েছে, তেমনটি নয়। এ সত্য ভাইস চেয়ারম্যান পদের বিশ্লেষণ করলেই দৃশ্যমান হবে। বিএনপি প্রভাবিত কয়েকটি উপজেলায় জামায়াতের প্রার্থী বিএনপির প্রার্থীদের পরাজিত করে জয়ী হয়েছেন। প্রসঙ্গত, বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য থেকে পাওয়া যায়, ২০০৯ সালে বর্তমানের প্রথম ধাপের নির্বাচনের উপজেলাগুলোতে জামায়াত মাত্র ছয়টিতে চেয়ারম্যান পদে জয়ী হয়েছিল। এবার তার দ্বিগুণ স্থানে জয়ী হয়েছে। বিভিন্ন সূত্রে প্রকাশ, জামায়াত-সমর্থিত প্রার্থীদের নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে কোনো বিতর্ক ছিল না। ছিল না কোনো ধরনের সাধারণ অথবা আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ। অনেকে মনে করেন, জামায়াতের প্রার্থীরা গ্রামাঞ্চলের সাধারণ ভোটারদের সহানুভূতিও পেয়েছেন। অবশ্যই ধর্মীয় অনুভূতিও এ ক্ষেত্রে সহায়ক হয়েছে বলে বিশ্বাস। যা হোক, জামায়াতের পুনরুজ্জীবিত হওয়ার বিষয়টি আরও গভীর বিশ্লেষণের দাবি রাখে। তবে এ ধারা ভবিষ্যতে বজায় থাকে কি না, তা হবে লক্ষণীয় বিষয়।
এই নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বর্তমানে সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি। তৃতীয় বৃহৎ দল বলে পরিচিত পার্টিটি প্রায় নিশ্চিহ্ন হওয়ার পর্যায়ে। বিগত ২০০৯ সালের নির্বাচনেও এমনটি হয়নি। এই দলের ওপর অবশ্যই জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের জের যে পড়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বর্তমানে জাতীয় পার্টির দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের অবস্থান পরিষ্কার নয়। সরকারেও যোগ দিয়েছে, আবার বিরোধী দল হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত থাকার প্রয়াস জনমনে আস্থার অভাব ঘটিয়েছে। তদুপরি জাতীয় পার্টির নেতৃত্ব নিয়েও রয়েছে ধোঁয়াশা। এরশাদ জাতীয় পার্টির মূল চালিকাশক্তি থেকে বিচ্যুৎ অবস্থায় রয়েছেন। অপরদিকে রওশন এরশাদের নেতৃত্ব নিয়ে পার্টির অভ্যন্তরে রয়েছে দ্ব্যর্থকতা। জাতীয় পার্টি থেকে বহুদিনের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য বর্ষীয়ান নেতা এবং জাতীয় পার্টির শাসনকালের প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর সদলবলে এরশাদকে পরিত্যাগ করায় জাতীয় পার্টির যে ক্ষতি হয়েছে, তার নেতিবাচক প্রভাবও যোগ হয়েছে তৃণমূল পর্যায়ের সমর্থনে। সংক্ষেপে বলা যায় যে এরশাদবিহীন জাতীয় পার্টির সমর্থন এবং জাতীয় পর্যায়ে পার্টির অবস্থান আগের অবস্থানে নেই। ভবিষ্যতে জাতীয় পার্টির অস্তিত্বই সংকটের মুখে পড়তে পারে।
যেমনটা আগেই বলেছি, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নীতিগতভাবে নির্দলীয় হওয়ার কথা থাকলেও সে আবরণ আর থাকছে না। কারণ, সব দলের এই আবরণ অপসারণের কারণে। যেহেতু জাতীয় পর্যায়ে আমাদের দেশের রাজনীতি অতিরিক্ত মাত্রায় সাংঘর্ষিক হয়ে উঠেছে, মূলত সে কারণে স্থানীয় নির্বাচনকে বিভিন্ন দল জাতীয় পর্যায়ে দলের অবস্থানের মাপকাঠি হিসেবে দেখার প্রবণতা ক্রমেই বৃদ্ধি পেয়েছে। এমতাবস্থায় স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনে জাতীয় পর্যায়ের নীতি এবং অবস্থানের প্রতিফলন ঘটছে। এসব কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও সংগঠন। কোন্দল মাথাচাড়া দিচ্ছে তৃণমূল পর্যায়ে। স্থানীয় সমস্যাগুলো ধামাচাপা পড়ছে। এমতাবস্থায় দল এবং প্রার্থীর অবস্থান নিয়েও ভোটাদের বিভ্রান্তির মধ্য পড়তে হচ্ছে।
ধারণা করা হয়েছিল যে ৫ জানুয়ারির জাতীয় সংসদে সিংহভাগ ভোটার ভোট প্রয়োগে বঞ্চিত হওয়ার কারণে ভোটের হার বেশি হবে, তেমনটি হয়নি। ইডব্লিউজি-১-এর মতে, মাত্র ৫৯ শতাংশ ভোট প্রদান করা হয়েছে, যা তৃতীয় উপজেলা নির্বাচন থেকেও অনেক কম। নিম্নগামী ভোটের হারের দুটি প্রধান কারণ হতে পারে; প্রথমত, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালের রাজনৈতিক পরিস্থিতির জের এখনো কাটেনি, যার পরিপ্রেক্ষিতে জনমনে বিরূপ ভাব বিদ্যমান ছিল। হয়তো ভবিষ্যতে এই হারের বৃদ্ধি হতে পারে। দ্বিতীয়ত, বিগত সময়ে বিভিন্ন কারণে উপজেলা পরিষদ জনগণের কাছে তেমন আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারেনি। অনুমেয় যে, এই দুই প্রধান কারণেই ভোটের হার আশাতীত হয়নি।
পরিশেষে উপরিউক্ত পর্যালোচনা আংশিক নির্বাচনের ওপর ভিত্তি করে হলেও ভবিষ্যতে পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ উপজেলা নির্বাচন সমাপ্ত হওয়ার পরে আরও অর্থবহ হবে। অপেক্ষা করতে হবে পূর্ণাঙ্গ নির্বাচনের। দৃশ্যপটের পরিবর্তন হতে পারে।


এম সাখাওয়াত হোসেন: সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও কলাম লেখক।
hhintlbd@yahoo.com

ভারতের নির্বাচন- কংগ্রেস, বিজেপি না তৃতীয় জোট? by এম সাখাওয়াত হোসেন

Saturday, February 15, 2014

প্রায় দুই সপ্তাহ ভারতের দক্ষিণের তিনটি রাজ্য অন্ধ্র প্রদেশ, কর্ণাটক, তামিলনাড়ু এবং আমাদের পশ্চিম সীমান্তের রাজ্য পশ্চিম বাংলায় বেড়াতে গিয়েছিলাম। নিছক বেড়ানো হলেও চেষ্টা করেছিলাম ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনের হালহকিকত বুঝতে।
কারণ, ভারতের রাজনীতি এখন সরগরম, বিশেষ করে আসন্ন ১৬তম লোকসভার নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে। যদিও ভারতের রাজনৈতিক উত্তাপ এবং আসন্ন নির্বাচনের হাওয়া বড় বড় শহর ছাড়া তেমন উপলব্ধি করা যায় না, তথাপি ছোট শহরগুলোর দেয়াল আর লাইটপোস্টগুলোতে সাঁটানো এবং ঝুলন্ত পোস্টারগুলো মনে করিয়ে দেয় যে নির্বাচন আসন্ন। দক্ষিণের রাজ্যগুলোর সাধারণ মানুষের মধ্যে রাজনীতি নিয়ে মাতামাতি একেবারেই নেই। এমনকি ভোটারদের মধ্যেও আগ্রহ কম। বিগত কয়েক দশকে ভারতের সাধারণ নির্বাচনে গড় ভোটের হার ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ। প্রধান কারণ, ভারতের সাধারণ ভোটারদের কাছে দুই বৃহৎ জোট আকর্ষণ হারিয়ে ফেলেছে।

অনেকেই মনে করেন, এ কারণেই দিল্লির মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে ‘আম আদমি পার্টির মতো স্বল্পপরিচিত দল রাজ্য সরকার গঠন করতে পেরেছে। ‘আম আদমি পার্টিও (এএপি) তাদের সাফল্যের বিস্তৃতি ঘটাতে তৎপর। অপরদিকে হঠাৎ গর্জে ওঠা এই পার্টির বিস্তার ঠেকাতে উভয় জোট নানা ধরনের কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে বলে এএপি অভিযোগ তুলছে। এপিপির অভিযোগে বলা হচ্ছে যে বিজেপি দিল্লি সরকারকে উৎখাত করতে প্রায় ২০ কোটি রুপি খরচ করছে। শুধু এএপিই নয়, তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতার নেতৃত্বে সম্ভাব্য তৃতীয় জোট গঠনের আগেই বিজেপি বিরোধিতায় নেমেছে। তৃতীয় জোট গঠনে দক্ষিণের আঞ্চলিক দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় দল এআইএডিএমকে ঘিরে সম্ভাবনা গড়ে উঠছে কংগ্রেস এবং বিজেপি বিরোধী জোটের। এ জোটে হয়তোবা শামিল হতে পারে উত্তর প্রদেশের শাসক দল বহুজন সমাজ পার্টি। অপরদিকে পশ্চিম বাংলার তৃণমূল কংগ্রেসের দিকেও নজর রয়েছে সম্ভাব্য এই জোটের। তবে এই জোট নির্বাচন-পূর্ব, না পরবর্তী সময় গঠিত হবে, তা নিয়ে দক্ষিণের দলগুলোর মধ্যে প্রাথমিক আলোচনা চলছে বেশ কিছুদিন ধরে। যদিও বহুজন সমাজ পার্টি নেতা মুলায়ম সিং এবং তৃণমূল কংগ্রেস নেতা বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কোনো পক্ষেই প্রকাশ্যে কোনো বক্তব্য এখন পর্যন্ত দেননি। এই জোটের সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হতে পারেন জয়ললিতা, সে ক্ষেত্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা মুলায়ম সিং যাদব কতখানি উৎসাহ দেখাবেন, তা দেখার বিষয়। এই জোট যদি নির্বাচন-পূর্ব সময় গড়ে ওঠে, তা দুই বৃহৎ জোটের বৃহৎ শরিক বিজেপি ও কংগ্রেসের জন্য কত বড় চ্যালেঞ্জ হবে, তা হয়তো মাস খানেকের মাথায় দৃশ্যমান হবে।

দুই
আসন্ন নির্বাচন আগামী মে মাসে শুরু হওয়ার কথা থাকলেও ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে বৃহৎ দলগুলো এপ্রিল মাসে নির্বাচন করার জন্য নির্বাচন কমিশনকে অনুরোধ করেছে। এ বিষয়ে ভারতের নির্বাচন কমিশন মতামত দেয়নি। অঙ্কের হিসাবে আগামী লোকসভা নির্বাচনের কাউন্টডাউন শুরু হয়েছে। ক্রমেই আগাম নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা বেশ কিছুদিন থেকে মাঠে গড়িয়েছে বিভিন্ন রাজ্য ও শহরগুলোতে দুই বড় দল তথা জোটের সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী প্রার্থীদের বিশাল বিশাল জনসভার মাধ্যমে। এতে অগ্রগামী রয়েছেন বিজেপির নেতা গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং কংগ্রেসের রাহুল গান্ধী, যদিও রাহুল গান্ধী কংগ্রেসের প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী কি না, তা নিয়ে খোদ কংগ্রেসের মধ্যেই সন্দেহ রয়েছে। অপরদিকে বিজেপির তথা জোটের প্রধানমন্ত্রী পদে নরেন্দ্র মোদির সম্ভাবনা প্রায় নিশ্চিত। যতটুকু দৃশ্যমান তাতে মনে হয়, এযাবৎ বিজেপির পাল্লাই বেশ ভারী।
যদিও ১৯৯৪ সালে ভারতের গুজরাটের দাঙ্গায় নরেন্দ্র মোদি সরকারের সম্পৃক্ততা প্রমাণিত। বিষয়টি নিয়ে কংগ্রেসের অভিযোগের ও প্রচারণার জবাবে পুনর্জীবিত হয় ইন্দিরা গান্ধীর হত্যার পর ১৯৮৪ সালে শিখ সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সঙ্গে কংগ্রেসের সম্পৃক্ততার অভিযোগ। ১৯৮৪ সালে সবচেয়ে বড় দাঙ্গা হয় দিল্লির রাজনগরে। আগামী নির্বাচনে ওই দাঙ্গার বিষয়টি বেশ বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ভারতের গুরুত্বপূর্ণ মিডিয়াতে এই দাঙ্গা নিয়ে নতুন করে শুরু হয়েছে ব্যাপক বিতর্ক। এ বিতর্ক কংগ্রেসকে ক্রমেই কোণঠাসা করছে। এই বিতর্কে যোগ দিয়েছে দিল্লির এএপি সরকার। ইতিমধ্যে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী এবং কেবিনেট ১৯৮৪ সালের দাঙ্গার ওপরে স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম (এসআইটি) গঠনের সিদ্ধান্ত দিল্লির লে. গভর্নরের কাছে সুপারিশ আকারে পাঠিয়েছে। লে. গভর্নরের অনুমোদনের পর প্রায় এক বছর লাগবে তদন্ত সমাপ্তির। বিষয়টি এএপি এবং কংগ্রেসের মধ্যে দূরত্বের প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিজেপি শুধু পালে হাওয়া দেওয়ার পর্যায়ে রয়েছে। প্রসঙ্গত দাঙ্গা ঘটার ৩০ বছর পার হলেও বিচার হয়নি।
শুধু ১৯৮৪ সালের দাঙ্গাই নয়, কংগ্রেসকে নিয়ে নতুন করে বিতর্ক হচ্ছে ১৯৮৪ সালের ৩ থেকে ৮ জুন অমৃতসরের স্বর্ণমন্দির অভিযান ‘অপারেশন ব্লুস্টার’-এ অত্যধিক শক্তি ব্যবহারে ব্যাপক প্রাণহানি এবং ওই সামরিক অভিযানে ব্রিটেনের সম্পৃক্ততা নিয়েও স্মরণযোগ্য যে, ওই অভিযানের জের হিসেবেই ইন্দিরা গান্ধী ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় শিখ দেহরক্ষীদের হাতে নিহত হন। ব্রিটেন অবশ্য সক্রিয় সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করে শুধু পরামর্শের কথা বলে জানিয়েছে যে ভারত ব্রিটেনের পরামর্শ গ্রহণ না করে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করেছিল। বিষয়টি নিয়ে আলাদাভাবে আলোচনার আশা রাখি। এসব বিতর্ক কংগ্রেসকে যথেষ্ট বেকায়দায় ফেলেছে। তার ওপরে রয়েছে বিগত ১০ বছরের দুর্নীতি আর অব্যবস্থার। বিজেপি এসব বিষয়কেই তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহার করছে বলে অনেকেই মনে করেন।

তিন
বিজেপি এবার বেশ চাঙা অবস্থাতেই রয়েছে বলে মনে হয়। এরই প্রেক্ষাপটে নরেন্দ্র মোদি ক্রমেই আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছেন। নরেন্দ্র মোদি এখন বিজেপির সম্মুখ সিপাহসালার, যে কারণে মোদি সারা ভারত চষে বেড়াচ্ছেন বিভিন্ন রাজ্যের সমর্থন আদায়ের প্রয়াসে। নজর রয়েছে উত্তর প্রদেশ এবং পশ্চিম বাংলার দিকে। বিজেপির টার্গেট ২৭২ আসন অথবা ততধিক যে অঙ্কটি এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় না, আগামী নির্বাচনে ভারতের কেন্দ্রে একক দল হিসেবে কোনো দল সরকার গঠনের মতো সমর্থন পাবে। সে কারণেই কংগ্রেস ও বিজেপিকে আঞ্চলিক দলগুলোর সমর্থনের ওপর নির্ভর করতে হবে। এ কারণেই বিজেপির টার্গেট অন্যান্য রাজ্যের সঙ্গে লোকসভার ৪৪ আসনের পশ্চিম বাংলার দিকে।
৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি নির্বাচনের আগাম প্রচারণা হিসেবে কলকাতায় এক বিশাল জনসভায় ভাষণ দেন। বিভিন্ন মিডিয়া এবং তথ্য অনুযায়ী কলকাতার ব্রিগেড ময়দানে বিজেপির জনসভায় প্রায় ১ দশমিক ৫ লাখ (এক লাখ পঞ্চাশ হাজার) লোকের সমাগম ঘটে। ওই জনসভায় মোদি বামপন্থীদের ৩৪ বছরের শাসনের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, উন্নয়নধারাকে আরও জোরদার করতে হলে কেন্দ্রে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো বাংলা-দরদি লোকের প্রয়োজন। ওই সভায় মোদি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমালোচনা করেননি, যদিও এর আগে একই স্থানে অন্য এক জনসভায় মমতা মোদিকে ইশারা করে বলেছিলেন যে তিনি দিল্লিতে ‘দাঙ্গার মুখ’ দেখতে চাইবেন না। তথাপি মমতা মোদির ভাষণের প্রতিবাদ করেননি। মোদি তাঁর ভাষণে কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে পশ্চিম বাংলাকে অবহেলা করার অভিযোগ বারবার উত্থাপন করেন। এমনও অভিযোগ করেন যে বাংলার সবচেয়ে প্রবীণ রাজনীতিবিদকেও কংগ্রেস উপেক্ষা করেছে। তিনি বলেন যে ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর পর কংগ্রেসের বয়োজ্যেষ্ঠ নেতা হিসেবে বর্তমান রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির প্রধানমন্ত্রী হওয়ার যোগ্যতা থাকলেও ‘দাদা’কে ওই পদ না দিয়ে বাংলার প্রতি একধরনের অন্যায় করেছে। মোদি কেন্দ্রে সরকার গঠন করতে পারলে মমতাকে সব ধরনের সহায়তা প্রদান করে বাংলার চেহারা পাল্টানোর অঙ্গীকার ওই সভায় একাধিকবার করেছেন। এত তুষ্টির পরও তৃণমূল অথবা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।
অপরদিকে বিগত বাম সরকারের কঠোর সমালোচনা করাতে সিপিএম সহজে মোদিকে গ্রহণ করছে না। সিপিএমের মতে, মোদি-মমতার কোনো ধরনের সমঝোতা হলে তাতে মমতার ক্ষতিই হবে। কারণ পশ্চিম বাংলায় প্রায় ২৪ শতাংশ ভোট রয়েছে সংখ্যালঘু মুসলিমদের। মোদির ‘দাঙ্গা মুখ’ ওই ভোটারদের মমতাবিমুখ করতে পারে। সে ক্ষেত্রে সিপিএম মমতার বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকতার ধুয়া উঠতে পারে। অবশ্য, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে দিল্লির সমীকরণে এক বড় ফ্যাক্টর, তা সব জোট বা ভারতের বড় দলগুলোর ধর্তব্যের মধ্যে রয়েছে। বাংলায় মোদির গ্রহণযোগ্যতা এবং মমতা-মোদি নির্বাচন-পূর্ব বা পরবর্তী সমীকরণ কেন্দ্রে বিজেপি সরকার গঠনের জন্য এক বড় ফ্যাক্টর হয়ে থাকবে। আর যদি তৃতীয় জোট গঠিত হয় সেখানেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হয়ে উঠবেন অপরিহার্য। যেভাবেই হোক, পশ্চিম বাংলার তৃণমূল কংগ্রেস এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আগামী সরকার গঠনে বড় ফ্যাক্টর। তাই, মমতা রয়েছেন ফুরফুরে মেজাজে।

চার
ভারতের আসন্ন লোকসভার নির্বাচন যে কংগ্রেস ও বিজেপির কাছে কত গুরুত্বপূর্ণ, তার আলামত বিভিন্নভাবে প্রতীয়মান। তবে ওই নির্বাচনে কংগ্রেসের তথা শাসক জোটের অবস্থা যে তেমন ভালো নয়, তা বেশ দৃশ্যমান। এককভাবে না হলেও বিজেপি জোটবদ্ধভাবে ভারতের পরবর্তী শাসক জোট হতে যাচ্ছে, তেমনটাই প্রতীয়মান। নরেন্দ্র মোদিই যে ভারতের ভাবী প্রধানমন্ত্রী, তা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করেন না অনেকেই। মোদি তাই তাঁর অতীত ছবি পরিবর্তনে সংখ্যালঘুদের ভোট অর্জনের সব চেষ্টা করেছেন। ব্রিগেড ময়দানের ভাষণে মোদি তথাকথিত অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসীদের ভারত থেকে বিতাড়িত করবেন বলে যে মন্তব্য করেছেন, তা অবশ্যই আমাদের জন্য চিন্তার বিষয়।
মোদির এ দাবি বাস্তবায়ন করতে হলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থানে যে পরিবর্তন হবে, তাতে সন্দেহ নেই।
শুধু এ কারণেই নয়, বহুবিধ কারণে বাংলাদেশের কাছে ভারতের আগামী নির্বাচন যথেষ্ট তাৎপর্য বহন করে।

এম সাখাওয়াত হোসেন (অব.): অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও কলাম লেখক।
hhintlbd@yahoo.com

রাজনীতি ও নির্বাচন- আস্থা ফিরবে কীভাবে by এম সাখাওয়াত হোসেন

Monday, January 27, 2014

বহু নাটকের মধ্যে সমাপ্ত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কে কী পেল তার অঙ্ক অনেকে করছেন। নির্বাচন কমিশনের হিসাবমতে, দুই কোটির কম ভোটার ভোট দিয়েছেন। অবশ্য অনেকেই এই তথ্যের সঙ্গে একমত নন।
অনেকের ধারণা, ১০-১২ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছেন। কিছু কেন্দ্রে কোনো ভোটই পড়েনি। ফলে দেশের নির্বাচনব্যবস্থায় কিছুটা হলেও যে শৃঙ্খলা ফিরে এসেছিল, এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তা বহুলভাবে ব্যাহত হয়েছে। ভবিষ্যতে সুস্থ ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে যথেষ্ট বেগ পেতে হবে।

নির্বাচন নিয়ে যত বিতর্ক এবং পশ্চিমা দেশের কাছে যতই অগ্রহণযোগ্য হোক না কেন, বাস্তবতা হচ্ছে একটি নির্বাচন হয়েছে এবং তা সংবিধান ও আইনের দৃষ্টিতে বৈধ। ফলাফলের গেজেট প্রকাশ ও দশম জাতীয় সংসদের সদস্যদের শপথ গ্রহণ সম্পন্ন করার পর এক নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। ২৯ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা। নবম সংসদের মেয়াদকালেই দশম জাতীয় সংসদকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের বিষয়টি কতখানি সংবিধানসম্মত বা আইনানুগ, তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। নবম সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া এই সরকারকে অবৈধ আখ্যা দিয়েছেন। আর ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা, বিশিষ্ট নাগরিক ফজলে হাসান আবেদ বলেছেন, ‘এ সরকার অবৈধও নয়, বৈধও নয়’।
বর্তমান সরকার ‘জনপ্রিয়’ হিসেবে জোর গলায় দাবি করতে পারে তেমন নয়। কাজেই প্রধানমন্ত্রী যেখানে এই নির্বাচনকে সংবিধান ও নিয়মরক্ষার নির্বাচন বলেছেন, সেখানে সরকারের মেয়াদ নিয়ে অহেতুক অতি মন্তব্য জনগণের কাছে শ্রুতিমধুর হওয়ার কথা নয়। দলমত-নির্বিশেষে এসব ভোটার, বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মধ্যে একটা হতাশা বিরাজমান। কারণ, তাঁরা সংসদ ও সরকার গঠনে অংশ নিতে পারেননি। সিংহভাগ ভোটারের ভোটদানে বিরত থাকা বা ভোট দিতে না পারার মধ্য দিয়ে গঠিত সংসদ ও সরকার প্রকৃতপক্ষে জনসমর্থিত বলে বিবেচিত হয় না।
এ ধরনের সরকার আগাম নির্বাচনের মাধ্যমে আবার জনমত নিয়ে থাকে বা নেওয়া বাঞ্ছনীয় হয়ে পড়ে। নবগঠিত সরকার কখন এ ধরনের জনমত পুনর্যাচাইয়ে যাবে তা দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দুটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে বলে মনে হয়। সরকারের ওপর বিদেশের চাপ রয়েছে, তবে এটা ছাড়াও যে দুটি অভ্যন্তরীণ কারণে সরকার আগাম নির্বাচনে যেতে পারে, তার একটি রাজনৈতিক ও অপরটি নৈতিক। ২৮টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি। ভবিষ্যতে তাদের রাজনৈতিক চাপ কতখানি সরকারকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধ্য করবে, তা পরের বিষয়। রাজনৈতিক চাপ তেমন অনুভব না করলেও নৈতিক কারণেও সরকার আগাম বা মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাধ্যমে সুবিধামতো সময়ে, জনসমর্থন পুনর্যাচাই করতে পারে।
শুধু বিরোধী ১৮-দলীয়জোট নয়, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করেছে আরও প্রায় ডজন খানেক দল, যার মধ্যে রয়েছে এ অনেক পুরোনো দলও। এমন অনেক দলও রয়েছে, যেগুলো একটি আদর্শিক ভাবধারায় পরিচালিত। তবে বৃহত্তর দল হিসেবে সর্বাগ্রে রয়েছে তিনবার ক্ষমতায় থাকা বিএনপি, যার রয়েছে ব্যাপক জনসমর্থন ও অনুসারী। মূলত গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দাবিতে ১৮-দলীয় জোটের সঙ্গে কিছু কিছু বিষয়ে মতানৈক্য থাকলেও আদর্শভিত্তিক এবং অন্যান্য নির্বাচন বর্জনকারী দল একটি নিরপেক্ষ ব্যবস্থার তত্ত্বাবধানে স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দাবিতে নিজেদের অবস্থান থেকে বৃহত্তর বিরোধী দল বিএনপির সমমনা ছিল। লক্ষণীয় বিষয় হবে আগাম নির্বাচনের দাবিতে এসব দলের অবস্থান।
বিএনপি এ নির্বাচন শুধু বর্জনই করেনি, প্রতিহত করার ঘোষণাও দিয়েছিল। এ ঘোষণার পর ১৮-দলীয় জোটের অন্যতম শরিক দল জামায়াতে ইসলামীর সহিংস তৎপরতাও নির্বাচন প্রতিহত করতে পারেনি। তবে শুধু সহিংসতার মাধ্যমে অতীতেও যেমন এ ধরনের নির্বাচন বানচাল করা যায়নি, তেমনিভাবে এ নির্বাচনও বানচাল করা যায়নি। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, তাতে জনসম্পৃক্ততা যত কমই থাকুক না কেন। নির্বাচন কেমন হয়েছে তার সাক্ষী এ দেশের জনগণ। বিরোধী দলের আন্দোলনে জনসম্পৃক্ততা দৃশ্যত কম থাকলেও একাধিক কারণে ভোটার সমাগম হয়নি। তবে সর্বক্ষেত্রে সহিংসতা একমাত্র কারণ নয়। এর উদাহরণ ঢাকা শহর, যেখানে নির্বাচনের দিনের পরিস্থিতি দেশের যেকোনো স্থানের তুলনায় শান্তিপূর্ণ থাকলেও ভোটের বাক্সে আশাতীত ভোট পড়েনি। এর কারণ বিরোধী বিএনপিসহ সিংহভাগ দলের নির্বাচন বর্জনও বটে।
তাই বিরোধী দলের আন্দোলন যে একেবারেই ব্যর্থ হয়েছে এমনটা বলা যায় না। ১৪৭টি আসনে যেভাবে, যে পরিবেশে, ব্যাপক কারচুপির অভিযোগের এবং অব্যবস্থার মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে, তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে আমাদের দেশে ক্ষমতায় থেকে সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করার মতো পরিস্থিতি, পরিবেশ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি এখনো গড়ে ওঠেনি। কাজেই বিশ্বাসযোগ্য নিরপেক্ষ পরিবেশ না হলে ভবিষ্যতে ভোটারদের আস্থা ফেরানো কঠিন হবে।
বিরোধী জোট হয়তো সহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে এ নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পেরেছে কিন্তু বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে কাছে টানতে পারেনি। জনগণকে আন্দোলনে তেমনভাবে উদ্বুদ্ধ করতেও পারেনি। দেশের আপামর জনসাধারণ সহিংস নয় অহিংস আন্দোলন সমর্থন করতে পারে আর বিরোধী দল যদি সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে চায় তবে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে, তাদের উদ্বুদ্ধ করে আন্দোলন করতে হবে। আর আন্দোলন করতে হবে নিজস্ব ক্ষমতায়।
গত কয়েক মাসের আন্দোলন দমাতে সরকারের তরফ থেকে বলপ্রয়োগ করা হয়েছে যে মাত্রায়, সহিংসতাও ওই মাত্রায় হয়েছে। এ সহিংসতার শিকার শুধু রাজনৈতিক কর্মীই হননি, হয়েছে জনগণ, যাঁরা রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয় নন। মানুষ আগুনে পুড়েছে। ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে সাধারণ মানুষের জানমালের। দুঃখের বিষয়, এর দায়দায়িত্বের কথা উঠলে দোষারোপের বিতর্ক উঠে আসে। যেহেতু বিরোধী জোট সহিংস আন্দোলনে ছিল, তাই দৃশ্যত দায়দায়িত্বের সিংহভাগ তাদের ওপরই বর্তায়। অপরদিকে সরকারি দল বা জোট বিরোধী জোটকে দায়ী করেও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলছে কিন্তু প্রকৃত দোষী ব্যক্তিদের খুঁজে বের করতে এখনো সুষ্ঠু তদন্তের ব্যবস্থা করেনি।
তবে সবচেয়ে দুঃখজনক ও নিন্দনীয় হলো নির্বাচনোত্তর সহিংস কর্মকাণ্ড। নির্বাচনের বলি হতে হয়েছে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের। শুধু ভোট দেওয়া না-দেওয়ার অথবা নির্ধারিত ব্যক্তিকে ভোট দেওয়াসহ অন্যান্য কারণে গরিব শ্রেণীর এসব বাংলাদেশিকে এবং ভোটারের নিরাপত্তা বিধানে ব্যর্থ হয়েছে সরকার ও নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব ভোটারদের সুরক্ষা করা। শুধু ভোট দেওয়ার জন্য কাউকে নির্যাতন যাতে না করা হয়, তার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিশাল আয়োজন করা হয়। এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়। কেন এবারও এ ধরনের ঘটনা ঘটল তার সঠিক কারণ নিরূপণ করা জরুরি। এ ধরনের হামলা শুধু দোষারোপ অথবা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য ব্যবহার না করে একটি বিচার বিভাগীয় নিরপেক্ষ তদন্তের ব্যবস্থা করা হোক।
৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকার এবং নির্বাচনের বাইরে থাকা বৃহত্তর জনগোষ্ঠী ভবিষ্যতে কোন পথে হাঁটবে, তা হয়তো দু-এক মাসের মধ্যেই পরিষ্কার হবে । তবে এ কথা ঠিক যে দুই পক্ষই জনসম্পৃক্ততা হারিয়েছে এবং এ অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় হবে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ একটি নির্বাচন। এ জন্য দরকার জাতীয় সংলাপের, যার মাধ্যমে সুদূরপ্রসারী ব্যবস্থা গ্রহণ করা সময়ের দাবি। আর প্রয়োজন ভেঙে পড়া নির্বাচনব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। অন্যথায় জনগণ নির্বাচন-প্রক্রিয়ার ওপর ফের আস্থা হারিয়ে ফেলবে। নির্বাচন যেভাবেই হোক, একটি সরকার গঠিত হয়েছে এবং এ সরকারের অন্যান্য দায়িত্বের মধ্যে প্রধান দায়িত্ব হবে জনগণের মধ্যে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং নির্বাচন-প্রক্রিয়ায় আস্থা ফিরিয়ে আনা।

এম সাখাওয়াত হোসেন: সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও কলাম লেখক।
hhintlbd@yahoo.com

নির্বাচন- নির্বাচন কমিশন দায় এড়াতে পারে না by এম সাখাওয়াত হোসেন

Saturday, January 11, 2014

অবশেষে ব্যাপক সহিংসতার মধ্যে শেষ হলো দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বা ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচন।
এই নির্বাচনের, বিশেষ করে দলীয় সরকারের তত্ত্বাবধানে নির্বাচনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিএনপি ও শরিকেরা প্রায় দুই বছর সহিংস আন্দোলন করলেও তা মারাত্মক রূপ নেয় নির্বাচনের দুই রাত আগে থেকে। ১৫ থেকে ১৮ জনের প্রাণহানি হয়, যা দেশের নির্বাচনের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি রক্তপাতপূর্ণ নির্বাচন বলে বিবেচিত। অন্যদিকে, সহিংসতার বলি হয় ১১১টি বিদ্যাপীঠ। এ ধরনের অগ্নিকাণ্ড ও বিদ্যাপীঠের ধ্বংস অতীতে হয়নি। এমনকি ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে ৩৬ থেকে ৩৭টি প্রতিষ্ঠানের ধ্বংসের প্রায় তিন গুণ। দশম সংসদে ১৫৩ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত বলে বিবেচিত হয়েছেন, যার কারণে চার কোটি ৮০ লাখ ভোটার ভোটদান থেকে বঞ্চিত।

নির্বাচনটি প্রত্যাখ্যান করেছে বিরোধী জোট। বাতিলের দাবিতে কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে তারা। অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশন থেকে ঘোষণা করা হয়, ১৪৭টি আসনে ভোট পড়েছে শতকরা ৪০ শতাংশ। অথচ গণমাধ্যম ও অন্তত দুটি দেশীয় পর্যবেক্ষণ সংগঠন বলেছে আরও কম উপস্থিতির কথা। তাদের মতে, ভোট পড়েছে ৩০ শতাংশ। যদি সরকারি দলের ভাষ্যও ধরে নেওয়া যায়, তথাপি প্রায় সাড়ে নয় কোটি ভোটারের মধ্যে প্রায় দুই কোটির নিচে ভোটার ভোট দিতে পেরেছেন। সে ক্ষেত্রে প্রায় সাত কোটি ২০ লাখ ভোটার ভোট দেননি বা দিতে পারেননি। লক্ষণীয়, সেসব জায়গায় সরকারি দলের প্রতীক নিয়ে নির্বাচনের প্রার্থী হতে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর তফাত এত বেশি যে তা হতবাক করার মতো। অথচ অনেক জায়গায় একই জেলায় পাশাপাশি আসনে অন্য প্রতীকের জয়ী প্রার্থীর সঙ্গে তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর তফাতটাও যেমন কম, তেমন সমষ্টিগত ভোটের সংখ্যাও আগে উল্লিখিত প্রার্থীদের চেয়ে অনেক কম। এই নির্বাচনেও প্রায় ১৬ জন প্রার্থী কেন্দ্র দখল, জবরদস্তি সিল মারা এমনকি ফলাফল ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানোর মতো গুরুতর অভিযোগে নির্বাচন বর্জন করেন।

সরকার বলেছে, এটি সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার পরিপ্রেক্ষিতে নিয়মরক্ষার নির্বাচন। যেহেতু বিরোধী দল বা জোট নির্বাচনে আসতে রাজি হয়নি, সরকারের দাবি মোতাবেক অনেক ছাড় দেওয়া সত্ত্বেও, তাই সংবিধানের বাধ্যবাধকতা মোতাবেক নির্বাচন করতে হয়েছে। সরকারের একাধিক শীর্ষস্থানীয় নেতা এখন শর্ত সাপেক্ষে সত্বর ১১তম সংসদ নির্বাচনের কথাও বলছেন।

দশম সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণের আগ থেকেই অনেক ঘটনা ঘটেছে, যা পূর্বতন নির্বাচনগুলোয় দেখা যায়নি। নির্বাচনের পরের দিন পাঁচজনের প্রাণহানিসহ জয়ী ও পরাজিত প্রার্থীর অথবা দলের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে প্রশ্ন উঠেছে নিরাপত্তা পরিকল্পনার বিন্যাস ও কার্যকারিতা নিয়ে। প্রায় তিন লাখ নিরাপত্তাকর্মী, প্রায় ৫০ হাজার সামরিক সদস্যের উপস্থিতিতে এ ধরনের নাশকতা স্বভাবতই প্রশ্ন উঠতেই পারে সমন্বিত নিরাপত্তার পরিকল্পনা নিয়ে। প্রশ্ন থাকে যে ১১০টি ভোটকেন্দ্র কীভাবে ভস্মীভূত হলো? এমনটা হওয়ার আগাম ঘোষিত এবং নিশ্চয়ই গোয়েন্দা তথ্য ছিল। সে ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ বা অধিক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় এ ধরনের নাশকতা দুই দিন আগের রাতে হয়ে থাকলে সেসব কেন্দ্র দুই দিন আগেই নিরাপদ করার ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল।

স্মরণযোগ্য যে অর্ধেকেরও কম আসনে নির্বাচন হয়েছে। কাজেই, নিরাপত্তাকর্মীর সংখ্যাও আনুপাতিক হারে বেশি থাকার কথা। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের নির্বাচনী বাজেটের সিংহভাগ ব্যয় হয় নিরাপত্তা বিধানের জন্য। এবারের নির্বাচনে এ অর্থের পরিমাণ আরও বেড়েছে।

আরও স্মরণযোগ্য, নির্বাচনকালে নিরাপত্তার দায়দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের, অন্য কারও নয়। এমনকি সরকারেরও নয়। ১৯৯৬ সালে কোনো তদন্ত হয়নি। তবে এবার তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে। কেন এই নিরাপত্তার অভাব হলো? পরিকল্পনায় কমতি ছিল কি না? এসব প্রশ্নের উত্তরের প্রয়োজন ভবিষ্যতের জন্য। দৃশ্যত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্বাচনকালীন পরিচালনার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। দেশের তাবৎ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সব নির্বাচনে যথাযথ ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে এবারের প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্নতর, সহিংস। একই সঙ্গে নির্বাচনী বাজেট থেকেই ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা উচিত। এ সহিংসতায় একজন সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা এবং আনসার সদস্য নিহত হয়েছেন। যেকোনো মৃত্যুই দুঃখজনক। তবে নির্বাচনী কর্তব্য পালনকালে নিহত ব্যক্তিদের পরিবারকে আর্থিক সাহায্য দেওয়া কমিশনের নৈতিক দায়িত্ব। যদিও কোনো কিছুর বিনিময়ে মূল্যবান জীবনের ক্ষতিপূরণ হতে পারে না।

নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা রোধ করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের, অন্তত পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টা। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এ ধরনের সহিংসতার নজির বিরল নয়। ২০০৮ সালের নির্বাচনের নিরাপত্তা পরিকল্পনায় নির্বাচনোত্তর সহিংসতা ঠেকাতে অনেক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ২০০১ সালের নির্বাচন থেকে করণীয় নির্ধারণ করে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সংখ্যালঘু অঞ্চলে ব্যাপক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছিল অন্তত কয়েক দিনের জন্য। ওই নির্বাচনের পর সব ধরনের বিজয় মিছিলের ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। এবারে তেমন দেখা যায়নি। ছিল না বাড়তি নিরাপত্তা, যার কারণে কয়েক জায়গায় সংখ্যালঘুদের ওপর ন্যক্কারজনক হামলা হয়েছে।
ঘরবাড়ি পুড়েছে। হতাহত হয়েছে। উপাসনালয় পুড়েছে। এই নিরাপত্তা বিধানের দায়দায়িত্ব ছিল নির্বাচন কমিশনের। এ ধরনের ঘটনা নিন্দনীয় তো বটেই, নিরাপত্তার অভাবটা ছিল সুস্পষ্ট। এ ব্যর্থতা মেনে নেওয়া যায় না। এখানেও প্রয়োজন তদন্তের, যাতে ভবিষ্যতে করণীয় নির্ধারণ করা যায়।

এই নির্বাচনে আরও অনেক অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটেছে, যেগুলো নির্বাচন কমিশনের খতিয়ে দেখা উচিত। বাংলাদেশে তো বটেই, বিশ্বে এ রকম নজির বিরল; যেখানে ৩৮টি কেন্দ্রে কোনো ভোটই পড়েনি। এটি একটি আশ্চর্য ব্যাপার। এর মানে এই যে যেকোনো কারণেই হোক, ওই এলাকার মানুষ ভোট দিতে বিমুখ ছিলেন। বিষয়টি নির্বাচনের অঙ্গনে ভবিষ্যতে কী ধরনের প্রভাব রাখবে, তা অবশ্যই নির্ণয় করা প্রয়োজন।

যদিও নির্বাচনটি ছিল সম্পূর্ণ একপেশে, তথাপি অনেক ধরনের অভিযোগ, বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী ও সাংসদ প্রার্থীদের অনিয়মের, প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থীদের পক্ষ থেকে কমিশনে উত্থাপিত হয়েছিল, যার বিষয়ে কমিশনের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। প্রচুর অভিযোগ উঠেছে জাল ভোট প্রদানের, এমনকি পত্রপত্রিকায় ছবি ছাড়া তাৎ ক্ষণিকভাবে অনেক মিডিয়ায় প্রচারিত হয়েছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। ২০০৮ সাল এবং পরবর্তী নির্বাচনগুলোয় এমন চিত্র দেখা যায়নি। ওই সময়ে মনে করা হয়েছিল, আমরা এই অভিশাপ থেকে পরিত্রাণ পেয়েছি, কিন্তু এখন তা মনে হয় না। ব্যালট বাক্স ছিনতাই, নির্বাচনে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোনো কোনো জায়গায় আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ড ইত্যাদিকে কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেওয়া যায় না। এসব বিষয়ে নির্বাচন কমিশন কী ব্যবস্থা নিয়েছে, তা জানা যায়নি। তবে এ ধরনের গর্হিত কাজকে কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেওয়া যায় না।

এমনকি যশোরে একজন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী প্রার্থী অন্য আসনের প্রার্থীকে নির্বাচনে প্রকাশ্যে জাল ভোট প্রদানের যে ফর্মুলা দিয়েছেন বলে পত্রপত্রিকায় খবর বেরিয়েছে, তা গুরুতর অভিযোগ। আরপিওতে এ ধরনের অভিযোগের বিরুদ্ধে তাৎ ক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা কমিশনকে দেওয়া আছে। এ অভিযোগ খণ্ডিত হতেও শোনা যায়নি। তবে তথ্যে প্রকাশ, নির্বাচন কমিশন দুজনকে শোকজ করেছে এবং দুটি আসনের গেজেট প্রকাশ করা হয়নি। এটি আশার বিষয়। এ জন্য নির্বাচন কমিশন সাধুবাদ পেতেই পারে। এখনই এ ধরনের দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে নির্বাচনী ব্যবস্থাপনায় পুনরায় অব্যবস্থা ফিরে আসবে। কমিশন এসব বিষয়ে জিরো টলারেন্স দেখাতে কেন পারেনি, তার ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

কোনো নির্বাচনই শতভাগ স্বচ্ছ হয় না, তবে যাঁরা পরিচালনার দায়িত্বে থাকেন, তাঁদের প্রয়াস থাকে সুষ্ঠু ভোট গ্রহণের ব্যবস্থা করা। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অনেক অনিয়মের অভিযোগ, খবর ও খবরচিত্র প্রকাশিত হয়েছে। এমনকি ভোটারদের বঞ্চিত হতে হয়েছে

ভোট প্রদানের নিশ্চয়তা থেকে। এ ধরনের পরিস্থিতি কাম্য ছিল না। এই নির্বাচনের ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যাঁরা জড়িত ছিলেন তাঁদের, বিশেষ করে নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব ভবিষ্যতে সুষ্ঠুভাবে পালনের জন্য এসব বিষয়কে গুরুত্বসহ খতিয়ে দেখা। এ প্রয়াস অবশ্যই আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থাপনাকে সঠিকভাবে পরিচালনা করার ভবিষ্যৎ করণীয় বিষয়ে সাহায্য করবে। তবে এবারের দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

একটি সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ নির্বাচন অনুষ্ঠিত করাই নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব। এ দায়িত্ব প্রতিপালনের মাধ্যমে যেমনি প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হয়, তেমনি সমগ্র প্রক্রিয়ার ওপর জনগণের আস্থা বৃদ্ধি করে। অন্যথায় আস্থার সংকটের কারণে ভোটাররা ভোটদান থেকে বিমুখ হতে পারেন, কিন্তু সেটি সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য মোটেই কাম্য নয়। নির্বাচন কমিশনের শিথিলতায় ব্যবস্থাপনায় এ ধরনের বিচ্যুতি জয়ী প্রার্থীদের ভাবমূর্তির জন্য সহায়ক হতে পারে না।

অবশেষে এই নির্বাচনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন কর্তৃক একটি পর্যালোচনার প্রয়োজন ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানের ওপর জনগণের আস্থা অটুট রাখার বা আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য। একটি সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করার দায়-দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের, সরকারের নয়। সরকার সহায়ক ভূমিকা পালন করে মাত্র।

এম সাখাওয়াত হোসেন (অব.): অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও কলাম লেখক।
hhintlbd@yahoo.com

কী ভাবছে নাগরিক সমাজ : সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক- একাদশ সংসদই এখন লক্ষ্য by এম সাখাওয়াত হোসেন

Sunday, January 5, 2014

আমরা আশা করেছিলাম, যত জটিলতার মধ্য দিয়ে হোক নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন যে উৎসাহের মধ্য দিয়ে হয়েছে, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনও সে রকমই একটা পরিবেশে হবে।
কিন্তু যখন উচ্চ আদালতের নির্দেশনার আলোকে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী হলো, তখনই আমরা বেশির ভাগই নিশ্চিত ছিলাম যে সমস্যা হবে। বাংলাদেশে সংসদ রেখে নির্বাচন করা খুব কঠিন। তার পরই দুই দলের মধ্যে সংঘাত শুরু হয়ে গেল। অবরোধের বেলায় দুই ধরনের শক্তি সমান্তরালে কাজ করেছে। সহিংস শক্তি কাজ করেছে, যাদের শীর্ষভাগই জামায়াত ও শিবিরের, যাদের নেতাদের বিচার হচ্ছে, শাস্তি হচ্ছে। তাদের সহিংস কর্মকাণ্ডের সঙ্গে বিএনপির গণতান্ত্রিক আন্দোলন মিলে গিয়ে সহিংস আন্দোলনের চেহারা পেয়েছে। অপরদিকে সরকার যেভাবে দমনের প্রক্রিয়ায় গেছে, তাতেও পরিস্থিতির আরও অবনতি নিশ্চিত হয়।
এরই মধ্যে হঠাৎ করে নির্বাচন কমিশন নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করল। আমাদের সময়ও আমরা তিনবার নির্বাচনের তারিখ বদলিয়ে তৎকালীন বিরোধীদের নির্বাচনে আসার সুযোগ করে দিয়েছিলাম। এবারও যদি প্রয়োজনে তফসিল পরিবর্তন করে বিরোধী দলকে আরও স্পেস দেওয়া যেত, তাহলে হয়তো ফল অন্য রকম হতেও পারত। কিন্তু সেদিকে মোটেই সচেষ্ট হওয়া হলো না।
সরকারি দলও ধাক্কা খেল। তারা ভেবেছিল যেসব দল নির্বাচনে যোগ দেবে, এমনকি যে বামপন্থী দলগুলো আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ ছিল, তারাও নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াল। এমনকি জাতীয় পার্টি গত পাঁচ বছর মহাজোটে থেকেও নির্বাচনে রইল না। বিশাল প্রার্থী-সংকটের মধ্যে ১৫৩ জন বিনা প্রতিযোগিতায় নির্বাচিত হওয়া গণতন্ত্রের ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। আওয়ামী লীগের মতো একটি ঐতিহ্যবাহী দল এ রকম একটি ফলাফলের জন্য প্রস্তুত ছিল না। বিরোধী দলও কিছু ছাড় দিয়ে কিছু আদায় করে নির্বাচনে আসতে পারত, কিন্তু তারা আসেনি।
এখন নির্বাচনে যা-ই ভোট পড়ুক না কেন, তা এই ১৫৩ জনের নির্বাচিত হওয়ার কলঙ্কের পরিপূরণ ঘটাবে না। নির্বাচনে যখন সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়, তখন বিদেশি পর্যবেক্ষকেরাও আগ্রহ হারান। কত ভোট পড়বে, তা তাই বড় বিষয় নয়, এটা গণতন্ত্রের জন্য কতখানি সহায়ক হবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
এরপর কী হবে? সরকারও বলছে এটা নিয়মরক্ষার নির্বাচন। ২৪ জানুয়ারির পরে আরেকটি সংসদ গঠিত হওয়ার পর সরকার শিগগিরই সবাইকে নিয়ে নির্বাচন করার মনোবৃত্তি নিয়ে এগিয়ে আসে কি না, সেটা এখন দেখার বিষয়। সরকার যদি তা করতে পারে, তাহলে বর্তমানের প্রশ্নবিদ্ধ অবস্থা কাটিয়ে ওঠা যাবে। এর পরে সরকারের প্রধান কাজ হবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ব্যবস্থা করা, সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, বিরোধী দলকে নিয়ে আসার জন্য যা যা করা দরকার, তা করা। বিরোধী দলেরও দায়িত্ব রয়েছে ছাড় দিয়ে হলেও নির্বাচনে আসার। ১৯৯৬ সালে যেমন হয়েছিল, আরেকটি নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে সংহত করা না গেলে দেশে ও বাইরে আমরা খুবই চাপের মুখে পড়ব।
এম সাখাওয়াত হোসেন: সাবেক নির্বাচন কমিশনার।
 
Support : Dhumketo ধূমকেতু | NewsCtg.Com | KUTUBDIA @ কুতুবদিয়া | eBlog
Copyright © 2013. News 2 Blog 24 - All Rights Reserved
Template Created by Nejam Kutubi Published by Darianagar Publications
Proudly powered by Dhumketo ধূমকেতু