গোলাগুলি শুরু হয় আমি আর আমার বোন গ্রেনেড ছুড়ি

Thursday, February 17, 2011

রাজনৈতিক পরিবারে আমার জন্ম। আমার নানা মরহুম উকিল সেকান্দার মিয়া নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। মামা শাহাব উদ্দিন ইস্কান্দার কচি এমসিএ ছিলেন। মামীও এমপি হয়েছিলেন। আমার বাবা ছিলেন সরকারি চাকরিজীবী। দেশের বিভিন্ন স্থানে থাকতে হয়েছে আমাকে।
১৯৬৫ সালে মেট্রিক পাস করার পর নোয়াখালী কলেজে ভর্তি হই। তখন থেকেই ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ি। '৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটির সদস্য হই। '৬৯-এর আন্দোলনের সময় প্রতিটি মিছিল-মিটিংয়ে আমাদের উপস্থিতি ছিল। প্রতি মিটিংয়েই আমাদের বলা হতো যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে। তখন থেকেই যুদ্ধের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিই। '৭০-এর নির্বাচনে সক্রিয় ছিলাম।
১৯৭১-এর ফেব্রুয়ারিতে ছাত্রলীগের উদ্যোগে আমাদের ট্রেনিং করানো হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমনেসিয়ামে। দুজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা আমাদের অস্ত্র প্রশিক্ষণ দিতেন। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শোনার জন্য রোকেয়া হল থেকে দল বেঁধে রেসকোর্সে ছুটে যাই। সে ভাষণ শুনে প্রতিটি মানুষের মতো আমরাও উজ্জীবিত হই।
আমরা রোকেয়া হলে থাকতাম। মমতাজ আপা এবং আমার ওপর নির্দেশ ছিল যেন রোকেয়া হল না ছাড়ি। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি আর্মিরা যখন হল আক্রমণ করল, আমরা দৌড়ে গিয়ে আশ্রয় নিলাম হাউস টিউটরের বাসায়। ওই বাসার একটা স্টোররুমে সাত-আটজন মেয়ে সারা রাত ছিলাম। ২৬ মার্চ মেহেরুন্নেসা আপা আমাকে আর মমতাজ আপাকে শায়রা আপার বাসায় পেঁৗছে দেন। ২৭ মার্চ কিছু সময়ের জন্য কারফিউ তুলে নিলে খালেদ মোহাম্মদ আলী, একরামুল হকসহ অন্য নেতারা রোকেয়া হলে যান। তাঁদের ধারণা ছিল, আমরা আর বেঁচে নেই। কিন্তু পথেই তাঁদের সঙ্গে দেখা হয়। তাঁরা আমাকে ওয়ারীতে ফুপা খান বাহাদুর নুরুল আমিনের বাসায় পেঁৗছে দেন। পরে রাজশাহী থেকে বাবাও আসেন।
১ এপ্রিল বাবার সঙ্গে নোয়াখালী রওনা হই। অনেক কষ্টে দুদিন পর মাইজদীতে নানাবাড়ি পেঁৗছাই। সেখানে যাওয়ার পর স্থানীয় আওয়ামী লীগ এবং ছাত্রলীগের নেতাদের সঙ্গে সংগঠনের কাজ শুরু করি। মুক্তিযোদ্ধাদের ভারতে ট্রেনিংয়ে পাঠানোর কাজ করতাম। তাঁদের জন্য টাকা-পয়সা, কাপড়-চোপড় সংগ্রহ ও তাঁদের উৎসাহ দিতাম। তখনো পাকিস্তানি বাহিনী মাইজদী ঢোকেনি। এপ্রিলের শেষে ওরা মাইজদী আসে। প্রথমেই আমার নানাবাড়ি পুড়িয়ে দেয়। সেখানে থাকতে না পেরে নানার গ্রামের বাড়ি কাদিরপুরে চলে যাই। ওই বাড়িটি ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটি। আমার কাজ ছিল খবরাখবর আদান-প্রদান করা। পাকিস্তানি আর্মিরা মামাকে মেরে ফেলে। এরপর রাজাকারদের অত্যাচারে আর সেখানে থাকতে পারিনি। চলে যাই মামির বাবার বাড়ি মনিনগরে।
সেখানে থাকার সময়ই শেখ ফজলুল হক মনি, আ স ম রব ভাইয়ের চিঠি পাই_আমি যেন ভারতে চলে যাই। সঙ্গে সঙ্গে ছোট বোন শিরিন জাহান দিলরুবা, ছোট ভাই তাহের জামিলকে নিয়ে রওনা হই। তাহের তখন ক্লাস এইটে পড়ত। ফেনীর বিলোনিয়া হয়ে জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহে আগরতলা পেঁৗছাই। সেখানে আমাদের আটজন মেয়েকে আলাদা করে একটা বাড়িতে রাখার ব্যবস্থা করা হয়। আমাদের দেখাশোনা করতেন অ্যাডভোকেট আমিনুল হক। জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহ থেকে লেম্বুছড়া ক্যাম্পে আমাদের সশস্ত্র ট্রেনিং শুরু হয়। ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর কে বি সিং এবং মেজর শর্মা আমাদের ট্রেনিং দিতেন। দেড় মাস ট্রেনিং নিই। অস্ত্র চালানো, গ্রেনেড ছোড়া, গোয়েন্দাগিরিসহ সব ধরনের ট্রেনিং আমাদের দেওয়া হয়েছিল।
ট্রেনিং শেষে মুক্তিযোদ্ধারা কোনো অপারেশনে গেলে আমাদের তাঁদের সঙ্গে পাঠানো হতো। আমাদের কাজ ছিল রেকি করা। রেকি করে খবর নিতাম। এসব তথ্য মুক্তিযোদ্ধাদের দিতাম।
এর পর সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিই আগস্টের শেষের দিকে। আমরা সেনবাগের দিতে যাচ্ছিলাম। ঠিক সন্ধ্যায় সেনবাগের কাছাকাছি আসার পর আমরা পাকিস্তানি সেনাদের মুখোমুখি পড়ে যাই। তারাই আমাদের ওপর প্রথম গুলি ছোড়ে। আমরা সবাই মাটিতে শুয়ে পড়ি। গোলাগুলি শুরু হয়। আমি আর আমার বোন গ্রেনেড ছুড়ে ছুড়ে মারি। ওই যুদ্ধে সাতজন পাকিস্তানি আর্মি ও চারজন রাজাকার মারা পড়েছিল। বাকিরা পালিয়ে যায়। তাদের ফেলে যাওয়া অস্ত্রগুলো আমরা নিয়েছি। এরপর আমাকে আর বাংলাদেশে ঢুকতে দেয়নি। সিদ্ধান্ত হয়েছিল মিত্রবাহিনী ঢুকবে।
মনে আছে, ট্রেনিং শেষ করে মুক্তিযোদ্ধারা যখন বাংলাদেশে ঢুকতেন, তখন রাস্তার আশপাশের বাড়ির নারীরা দাঁড়িয়ে থাকতেন। চোখের জল মুছতেন অনেকে। প্রায় সবার হাতেই থাকত একটা পোঁটলা। তাতে কিছু না কিছু থাকতই। এগুলো তাঁরা গুঁজে দিতেন মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে। এ দৃশ্য এখনো মনে পড়ে।
৭ ডিসেম্বর নোয়াখালী মুক্ত হলে আমরা বাংলাদেশে চলে আসি। আমার ভাই যুদ্ধ করেছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে। যুদ্ধ শেষ হওয়ার তিন মাস পর সে দেশে আসে। আমরা ভেবেছিলাম, সে হয়তো মারা গেছে।
আমরা যে লক্ষ্য নিয়ে যুদ্ধ করেছিলাম, সে লক্ষ্য আংশিক পূরণ হয়েছে। পুরোপুরি হয়নি। যে বাংলাদেশ গড়তে চেয়েছিলাম, সে বাংলাদেশ গড়তে পারিনি। কিছু কিছু মুক্তিযোদ্ধাও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ বিসর্জন দিয়ে দেশের সঙ্গে, স্বাধীনতার সঙ্গে বেইমানি করেছে। আর এ দেশে নারী মুক্তিযোদ্ধাদের অবদানকে তেমনভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি কখনোই। এখনো পুরোপুরি দেওয়া হচ্ছে না।
পরিচিতি : ফরিদা খানম সাকীর জন্ম ১৯৪৯ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর বরগুনায়। মা লুৎফুন নাহার বেগম, বাবা আবদুল আলীম। বর্তমানে তিনি জাতীয় মহিলা সংস্থার পরিচালনা পরিষদের ও মহিলা সমিতির কার্যকরী পরিষদের সদস্য। এ ছাড়া নারী মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে গড়ে তুলেছেন বাংলাদেশ মহিলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ। এ সংসদের যুগ্ম সম্পাদক তিনি। মুক্তিযোদ্ধা সনদ নেওয়ার কথা তেমন ভাবেননি। সম্প্রতি নোয়াখালী জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ড তাঁদের তিন ভাইবোনের মুক্তিযোদ্ধা সনদ তুলে দেন। ফরিদা খানম সাকীর মুক্তিযোদ্ধা সনদ নম্বর ১২৭৬৯১।
অনুলিখন: ওবায়দুর রহমান মাসুম।

কিশোরী মেয়েটা কখন যে সৈনিক হয়ে গেলাম! by তারামন বিবি বীরপ্রতীক

Monday, February 7, 2011

ইংরেজি তারিখ জানি না। তখন চৈত্র মাস। চারদিকে খালি গুলির শব্দ পাই। সাত ভাইবোন নিয়ে আমাদের অভাবী সংসার। বাবা মারা গেছেন অনেক আগে। আমার বয়স কত হবে? ১৩ কি ১৪। মানুষের বাড়িতে কাজ করি। কাজ জুটলে খাবার জোটে। না হলে উপোস। কিন্তু কাজ নেই গ্রামে। মিলিটারির ভয়ে পালাচ্ছে সবাই।

সেদিন সোমবার হবে, কাজের সন্ধানে বেরিয়েছি। কাজ পাইনি। বাধ্য হয়ে জঙ্গলে মুখিকচু তোলার চেষ্টা করছি। সেখানে উপস্থিত হন দুজন মানুষ। তাঁদের একজন পরিচিত। তাঁর নাম আজিজ মাস্টার, অপরজনকে চিনি না। আজিজ মাস্টার পরিচয় করিয়ে দেন তাঁর সঙ্গের মানুষটি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একজন মুক্তিযোদ্ধা, নাম হাবিলদার মুহিব। তিনি তাঁর ক্যাম্পে একজন রান্না করার জন্য লোক খুঁজছেন। আমি রাজি হই না। তখন তিনি আমাকে আমার মায়ের কাছে নিয়ে যান। ক্যাম্পে কাজ করার কথা শুনে মা প্রথমে আমাকে যেতে দেন না। এরপর অনেক কথাবার্তার মাঝে মুহিব সাহেব ধর্ম মেয়ে হিসেবে গ্রহণ করার কথা জানালে মা অনিচ্ছা সত্ত্বেও রাজি হন। পরদিন আমি চলে যাই দশঘরিয়া মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে। সেখানে রান্নার কাজ করতে থাকি। এরই ফাঁকে একদিন আমাকে এসএমজি ফায়ার করা শেখালেন আমার ধর্ম পিতা মুহিব হাবিলদার। টার্গেট প্র্যাকটিস করার জন্য গাছের উঁচু ডালে একটা ঘুঘু পাখিকে দেখিয়ে ফায়ার করার নির্দেশ দিলেন। প্রথম দিনেই সফল হলাম।
যেভাবে মুক্তিযোদ্ধা : ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিকদের সঙ্গে কাজ করতে করতে ১৪ বছরের কিশোরী তারামন কখন যে সৈনিক হয়ে গেল, তা জানতে পারিনি। জানলাম সেদিন, যেদিন পাকিস্তানি বাহিনী গানবোটে এসে আমাদের ক্যাম্প আক্রমণ করল।
শ্রাবণের দুপুর, প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছিল। ক্যাম্পের সবাই ভাত খাচ্ছিলাম। এমন সময় মুক্তিযোদ্ধা আজিজ মাস্টার আমাকে একটা ভেজা সুপারির গাছে উঠে পাকিস্তানি বাহিনীর কোথাও অবস্থান আছে কিনা, তা দেখার জন্য বললেন। আমি সেই গাছে উঠে দুরবিন দিয়ে নদীর দিকে দেখলাম। ইতিউতি দুরবিন ঘোরাতেই নজর আটকে যায় একটি লঞ্চের দিকে। একটু একটু করে আরো পরিষ্কার নজর এলে বুঝতে পারি এটা শত্রুর গানবোট। এই গানবোটে পাকিস্তানি বাহিনী এগিয়ে আসছে আমাদের ক্যাম্পের দিকে।
সর্বনাশ! চিৎকার করে উঠি_সাবধান পাকিস্তানিরা আসছে...। সবাই ভাত খাওয়া ছেড়ে অস্ত্র হাতে পজিশন নিল। দ্রুত গাছ থেকে নেমেই তাঁদের সঙ্গে আমিও চায়নিজ এসএমজি নিয়ে পজিশনে শুয়ে পড়লাম। শুরু হলো প্রচণ্ড লড়াই। গুলি চালাচ্ছি। ওদের গুলি এসে আমাদের পাশের গাছে লাগছে। গাছের ছোট ছোট ডাল আর পাতা আমার গায়ের ওপড় পড়ছে। আমার ছোড়া একটি গুলি লাগল এক পাকিস্তানি হানাদারের গায়ে। আরো উৎসাহে ম্যাগাজিন লোড করি। ব্রাশফায়ার করি। কাপড় ছেঁড়ার শব্দের মতো গুলি অবিরাম বের হতে থাকে। মাঝে মধ্যে কলজে কাঁপানো হেভি মেশিনগানের আওয়াজ কানে আসছে। এভাবে সন্ধ্যা পর্যন্ত লড়াই চলার পর পাকিস্তানি বাহিনী ফিরে যায়। বিজয়ের উল্লাস আর জয়বাংলা ধ্বনিতে প্রকম্পিত হয় আমাদের ক্যাম্প এলাকা।
আমার আমিকে সেদিন আবিষ্কার করলাম, কাজের মেয়ে থেকে একজন সৈনিক হিসেবে।
এরপর আমরা আর এখানে ক্যাম্প রাখা নিরাপদ মনে করলাম না। দশঘরিয়া থেকে চলে এলাম কেতনটারীতে। সেখানে আসার পর শুরু হলো পাকিস্তানিদের বিমান হামলা। ১০-১২টি করে বোমা ফেলে চলে যায় বিমানগুলো। গোটা গ্রাম প্রায় পুড়ে শেষ। মারা যায় অনেক মানুষ। নির্দেশ দেওয়া হলো বাংকার খোঁড়ার। এক রাতেই ১৫ বাই ১২ ফুট কেটে ফেললাম আমরা। বিমানের শব্দ পেলেই আমরা বাংকারে অবস্থান নিই। সুযোগ পেলেই বিমান লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ি। শুরু হয় এক অন্যজীবন।
আমার দুচোখে তখন স্বপ্ন বাসা বাঁধে। দেশ শত্রুমুক্ত হবে, স্বাধীন হবে। আমরা আমাদের সব ভাইবোনসহ গোটা পরিবার পেটপুরে ভাত খেতে পারব।
একদিন দুপুরের দিকে একটা জঙ্গি বিমান এল। এই বিমানটা আগের বিমানগুলোর মতো নয়। এটা থেকে কোনো বোমা ফেলা হলো না। শুধু একটা চক্কর দিয়ে যখন ফিরে যাচ্ছিল তখন আমরা গুলি ছুড়তে চাই। কিন্তু বাধা দেন আজিজ মাস্টার। ক্যাম্প থেকে আমাদের জানানো হলো তাঁদের কাছে খবর এসেছে দেশ স্বাধীন হয়েছে। পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছে। আনন্দে আমার দুচোখ দিয়ে পানি আসতে শুরু করল। ক্যাম্পে মুহুর্মুহু স্লোগান উঠছে জয় বাংলা। কণ্ঠ মেলাই আমি...।
আরেক জীবন : অনেক স্বপ্ন নিয়ে দেশ স্বাধীন হলো। শুরু হলো আরেক জীবন। রাজীবপুর ফিরে এলাম। আম্মা ভাইবোনদের ফিরে পেলাম। অভাব আবার আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলল। কাজ নিলাম অন্যের বাড়িতে। আমার বড় বোনটার বিয়ে হচ্ছিল না। কারণ আমি ক্যাম্পে ছিলাম বলে। সবাই বলে আমি ভালো মেয়ে নই। একদিন এই গ্রামেরই আবদুল মজিদ নামে একজন আমাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দেন। ১৯৭৫ সাল। ১০১ টাকা দেনমোহরে বিয়ে হয় মজিদের সঙ্গে। অভাব আর নদীভাঙনের শিকার হই বারবার। জীবন যেন আর চলে না। এরই মধ্যে যক্ষ্মা আমার শরীরে বাসা বাঁধে। ওষুধ কেনার টাকা নেই।
শেষ হয় দুঃখের দিন : ১৯৯৫ সাল। এভাবেই কষ্টের জীবন চলার ফাঁকে একদিন ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজের প্রভাষক বিমল কান্তি দে এসে আমার খবর নেন। আমাকে অনেক প্রশ্ন করার ফাঁকে জানতে পারি, আমি একজন বীরপ্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। এরপর ভোরের কাগজে ছাপা হয় আমাকে খুঁজে পাওয়ার রিপোর্ট। ঢাকায় নিয়ে যায় উবিনীগ নামের একটি এনজিও। সংবর্ধনা দেয় তারা। ভোরের কাগজ তহবিল গঠন করে আমার জন্য। তারা আমাকে একটি বাড়ি করার জন্য জায়গা ও আবাদি জমি কিনে দেয়। এ জমিতে আরডিআরএস নামের একটি সংস্থা গড়ে দেয় বাড়ি। এরপর একের পর এক আমাকে সংবর্ধনা দেয় বিভিন্ন সংগঠন। সরকার কুড়িগ্রাম শহরের উপকণ্ঠে আরাজী পলাশবাড়ীতে জমি দেয়। ২০০৭ সালে সেখানে একটি আধাপাকা বাড়ি তৈরি করেন কুড়িগ্রাম বিডিআরের তৎকালীন কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল সুমন বড়ুয়া।
স্বপ্নই থেকে যায় : এখন অভাব আমাকে আর ছুঁতে পায় না ঠিকই, কিন্তু যেভাবে দেশটিকে দেখতে চেয়েছিলাম সেভাবে এখনো দেশটিকে পাইনি। অনেক রক্ত আর আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত পতাকা যখন রাজাকারের গাড়িতে ওড়ে তখন আক্রোশ আর অপমানে ক্ষুব্ধ হই। এখনো মুক্তিযোদ্ধারা অনাহারে থাকেন। বিনা চিকিৎসায় মারা যান। আমি এই বাংলাদেশ দেখতে চাইনি। চেয়েছিলাম শত্রুমুক্ত সুন্দর একটি বাংলাদেশ। যেখানে সবাই সুখে থাকবে।
পরিচিতি : তারামন বিবির জন্ম ১৯৫৭ সালে কুড়িগ্রামের রাজীবপুর উপজেলার কোদালকাটি ইউনিয়নের শংকর মাধবপুর গ্রামে। স্বামী আবদুল মজিদ, পেশায় কৃষক। বাবা মৃত আবদুস সোবাহান, মা কুলসুম বেওয়া। তাঁর এক ছেলে এক মেয়ে।
তারামন বিবি বর্তমানে রাজীবপুর সদরের কাচারিপাড়ায় বাস করছেন। এই বাড়ির ভিটে ও আবাদি জমিসহ প্রায় এক একর জমি ভোরের কাগজ কিনে দেয়। তারপর সেখানে বেসরকারি সংস্থা আরডিআরএস বাড়ি তৈরি করে দেয়। এ ছাড়া কুড়িগ্রাম শহরের উপকণ্ঠে সরকার তাঁকে একটি জমি দান করে। এই জমির ওপর কুড়িগ্রাম বিডিআরের তৎকালীন কমান্ডিং অফিসার সুমন বডুয়া একটি আধাপাকা বাড়ি তৈরি করে দেন।
তারামন বিবি বীরপ্রতীক বর্তমানে অসুস্থ। শ্বাসকষ্টে ভুগছেন। প্রতিদিনই তাঁকে ডাক্তারের কাছে যেতে হয়।

অনুলিখন : পরিমল মজুমদার।

গুলি চালানো শিখতে লেগেছিল মাত্র আধঘণ্টাঃ শিরিন বানু মিতিল

Sunday, January 23, 2011

মি তখন পাবনা জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সভানেত্রী। আমার মা সেলিনা বানু বামপন্থী আন্দোলনের প্রথম সারির নেত্রী ছিলেন। আমার নানার বাড়ি ছিল এককালে বামপন্থীদের শক্ত ঘাঁটি। সুতরাং এই বাড়ির সবাই আমরা রাজনৈতিকভাবে বিশেষ সচেতন ছিলাম।

একাত্তরের মার্চের সেই দিনগুলোতে রাজনৈতিক উত্তাপে বাইরের অঙ্গন ও আমাদের গৃহের প্রাঙ্গণ এক হয়ে গিয়েছিল। পাবনার প্রাথমিক প্রতিরোধ পর্ব হয় একাত্তরের ২৫ মার্চ থেকেই। চলে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনারা পাবনা শহরে ঢোকে। জারি হয় কারফিউ। ২৬ মার্চ তারা রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেপ্তার শুরু করে। সাধারণ মানুষের ওপরও নেমে আসে অত্যাচার। জেলা প্রশাসন সিদ্ধান্ত নেয় পাল্টা আঘাত হানার। ২৭ মার্চ রাতে পুলিশ লাইনের যুদ্ধ শুরু হয়। সেই যুদ্ধ রূপ নেয় জনযুদ্ধে। ঘরে ঘরে মেয়েরাও যুদ্ধে নামার কথা ভাবতে শুরু করে। তাদের অস্ত্র ছিল গরম পানি, এসিড বাল্ব, বঁটি ও দা। আমাদের মানসিকতা ছিল 'মেরে মরো'। পুরুষরা বঙ্গবন্ধুর আহ্বান অনুযায়ী যার যা কিছু আছে_দা, বল্লম, মাছ মারার কোচ, মাছ কাটার বঁটি, লাঙলের ফলা এসব নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। পরে আমাদের হাতেও অস্ত্র চলে আসে।
আমার মনে পড়ে, মাত্র আধাঘণ্টা লেগেছিল গুলি চালানো শিখতে। সে ছিল এক অদ্ভুত দিন। আমার দুই কাজিন জিন্দান ও জিঞ্জির যুদ্ধের ময়দানে রওনা হয় তাদের মায়ের নির্দেশে। এই মায়ের কথা না বললেই নয়। তিনি তাঁর ছেলেদের বলতেন, 'তোমাদের কি মানুষ করেছি ঘরে থেকে অসহায়ভাবে মরার জন্য? মরতে হলে যুদ্ধ করতে করতে মরো।' তিনি ছিলেন পাবনা মহিলা পরিষদের আহ্বায়ক কমিটির সভানেত্রী রাকিবা বেগম। এমন পরিস্থিতিতে আমার ঘরে থাকাটা কষ্টকরই ছিল।
আমার ভাই জিঞ্জির বলল, 'বুজি, প্রীতিলতার মতো তুমিও পারো ছেলেদের পোশাক পরে যুদ্ধে যেতে।' ওর এই কথাটা আমাকে উদ্বুদ্ধ করে। আমার বড় খালা রাফিয়া বানুর কাছে আমি থাকতাম। তিনি আমাকে শার্ট-প্যান্ট পরা দেখে বললেন, 'হ্যাঁ, এখন তুমি নিশ্চিন্তে যুদ্ধে যেতে পারো।'
২৮ মার্চ শহরের জেল রোডে টেলিফোন একচেঞ্জ ভবনে দখলদার ৩৬ জন পাকিস্তানি সেনার সঙ্গে আমাদের যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে ওরা সবাই মারা পড়ে। আমাদের দুজন শহীদ হয়। এভাবে খণ্ড খণ্ড যুদ্ধ চলতেই থাকে। ৩০ মার্চ পাবনা শহর স্বাধীন হয়।
তখন যুদ্ধ চলছিল নগরবাড়ী ঘাট, আতাইকুলা ও কাশীনাথপুরে। পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণ শুরু হয় আকাশপথে। পাশের জেলা কুষ্টিয়ার প্রতিরোধ ভেঙে পড়ছে। তাদের বিভিন্ন দল পিছিয়ে যাচ্ছে চুয়াডাঙ্গার দিকে।
পাবনার ছাত্রনেতা ইকবালের দল একটি গাড়িতে করে কুষ্টিয়া হয়ে চুয়াডাঙ্গার দিকে রওনা হলো। গাড়িতে স্থান সংকুলান না হওয়ায় আমি ও আমার এক ভাই থেকে যাই কুষ্টিয়ায়। কুষ্টিয়ার ক্যাম্পে দেখা হয় পাবনার পুলিশ ইনচার্জ ও রাজনৈতিক নেতা আমিনুল ইসলাম বাদশার সঙ্গে। ভারতীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে তাঁদের জিপে করে আমরা চুয়াডাঙ্গার ক্যাম্পে যাই। তখন গোলাবারুদের অভাবে প্রাথমিক প্রতিরোধ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এক দলকে পাঠানো হলো গোলাবারুদ সংগ্রহের জন্য। সেই দলের সদস্য হয়ে আমিও মুক্তিযুদ্ধ সহায়ক কমিটিতে পেঁৗছাই। সেখানে দেখা হলো আবদুল কুদ্দুস মাখন ও নূরে আলম সিদ্দিকীর সঙ্গে। এখানে এসে জানতে পারি, পাবনায় যে সাংবাদিকের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল, তিনি আমার ছবিসহ সাক্ষাৎকার ছেপে দিয়েছেন বিভিন্ন পত্রিকায়। ছেলে সেজে যুদ্ধ করার যে সুযোগ ছিল, তা আর আমি পেলাম না।
আমার সঙ্গীদের বিভিন্ন ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। আমি চলে গেলাম কলকাতার উপকণ্ঠে গোবরা ক্যাম্পে আরো প্রশিক্ষণের জন্য। সেখানে আমাকে আশ্রয় দিলেন নাচোল বিদ্রোহের নেত্রী ইলা মিত্র। তাঁর স্বামী রমেন মিত্র আমার বাবা খন্দকার শাহজাহান মোহাম্মদকে চিনতেন ট্রেড ইউনিয়নের নেতা হিসেবে। এখান থেকে আমি যোগাযোগ করি আমাদের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে। তিনি আশ্বাস দিলেন মেয়েদের নিয়ে আলাদা মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প গঠনের।
প্রথমে কয়েকজন নারী বিভিন্ন আশ্রয় ক্যাম্পে ঘুরে ঘুরে মেয়েদের সঙ্গে যোগাযোগ করে দল গঠন শুরু করেন। আমি তাঁদের সঙ্গে যোগ দিই। পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে কলকাতায় বিভিন্ন সভা-সমাবেশে বক্তব্য দিতে থাকি। আমাদের প্রচেষ্টা ও বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতায় অবশেষে ৩৬ জন নারী নিয়ে আমাদের ক্যাম্প শুরু হয়। এ ক্ষেত্রে বিভা সরকারের কথা বলতেই হয়। তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কমার্সের ছাত্রী তিনি। তিনিসহ পাঁচজনের একটি সাংগঠনিক কমিটি গঠন করা হয়। জিন্নাত আরা, লায়লা, লীনা চক্রবর্তী, কৃষ্ণা ও আমি ছিলাম ওই কমিটিতে। আমাদের কাজ ছিল ক্যাম্পে ক্যাম্পে ঘুরে আগ্রহী মেয়েদের সংগ্রহ করা। তাদের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা গড়ে তোলা। ক্যাম্পের দেখাশোনার জন্য বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে সাজেদা চৌধুরীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি প্রতিদিন আমাদের ক্যাম্পে আসতেন। আমাদের অস্ত্র ও অন্যান্য প্রশিক্ষণের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন স্থানে যোগাযোগ শুরু করেন খুলনার হাসিনা শিরিন। আস্তে আস্তে সদস্যসংখ্যা বেড়ে যায়। আমরা যখন ক্যাম্প ছাড়ি তখন সদস্যসংখ্যা ছিল ২৪০-এর ওপরে। অস্ত্রের অভাব থাকায় মহিলা গ্রুপের হাতে অস্ত্র সরবরাহ করা সম্ভব ছিল না। আমাদের প্রথম দলের একটি অংশ আগরতলায় যায় মেডিক্যাল কোরের সদস্য হিসেবে। বাকিরা মেজর জলিলের সঙ্গে যোগাযোগ করি তাঁর দলে কাজ করার জন্য। তিনি রাজি হন, কিন্তু সমস্যা ছিল অস্ত্রের অভাব। তবু যুদ্ধ থেমে থাকেনি আমাদের।
বিজয়ের পর আসে দেশে ফেরার পালা। সেই ক্যাম্পের সহযোদ্ধাদের অনেকের সঙ্গে আর দেখা হয়নি। জানি না কোথায় আছে বিভা সরকার, তুষার কন্যা, নাজমা মাজেদা কিংবা লায়লা। মনে পড়ে একেকটি নাম_তৃপ্তি, সন্ধ্যা, গীতা, শাহীন, মুক্তি, ইরা, গীতা (২) ও সালমা। এখনো মনে পড়ে জোবেদা, মিরা, কমলা, জিনাত, যুথিকা, মণিকা, ভক্তিসহ অনেকের কথা। নাম না জানা অনেকের ছবি ভাসে চোখে। এখনো কান পাতলে শুনি সেই সমবেত সংগীত_'মোরা একটি ফুলকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি...'।
মাঝেমধ্যে ভাবি কুষ্টিয়ার পথে রাতে দেখা হওয়া সেই ভাইদের কথা। আর সেই বৃদ্ধ পিতার কথা, যিনি আমাকে ছেলের পোশাক পরা মেয়েযোদ্ধা জেনে মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করে বলেছিলেন, 'আর আমাদের ভয় নেই। আমাদের মেয়েরা যেখানে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করতে নেমেছে, আমাদের আর কেউই দমাতে পারবে না।'
এখনো ভাবি, বাংলাদেশের মানুষের আছে অশেষ প্রাণশক্তি, যাকে জাগিয়ে তুলতে পারলে কোনো সমস্যাই আর থাকে না। প্রয়োজন শুধু সেই মুক্তিযুদ্ধের সময়কে ফিরিয়ে এনে প্রাণের আবাহন করা।
পরিচিতি: পাবনা শহরের দিলালপুর মহল্লার খান বাহাদুর লজ-এ ১৯৫০ সালের ২ সেপ্টেম্বর শিরিন বানু মিতিল জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মা প্রখ্যাত বামনেত্রী সেলিনা বানু ও বাবা খন্দকার শাহজাহান মোহাম্মদ। ৭ নম্বর সেক্টরে তিনি সশস্ত্র যুদ্ধে অংশ নেন। যুদ্ধের পর তিনি মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট বা সনদের জন্য কোনো আবেদন না করায় তাঁর কোনো সনদ নেই।
 
Support : Dhumketo ধূমকেতু | NewsCtg.Com | KUTUBDIA @ কুতুবদিয়া | eBlog
Copyright © 2013. News 2 Blog 24 - All Rights Reserved
Template Created by Nejam Kutubi Published by Darianagar Publications
Proudly powered by Dhumketo ধূমকেতু