বিশেষ সাক্ষাৎকার- আফগানিস্তানে তালেবানের প্রভাব আর নেই: নাজেস আফরোজ by মশিউল আলম ও এ কে এম জাকারিয়া

Tuesday, February 11, 2014

নাজেস আফরোজের জন্ম পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান শহরে, ১৯৫৮ সালে। কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে ১৯৭৯ সালে রসায়নশাস্ত্রে স্নাতক ডিগ্রি লাভের পর এক বছর কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েন। ১৯৮১ সালে কলকাতার দৈনিক আজকাল পত্রিকায় সাংবাদিকতা শুরু করেন।
১৯৯৮ সালে বিবিসি বাংলা বিভাগে প্রযোজক হিসেবে যোগ দেন। ২০০১ সালে বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে কাজ শুরু করেন প্রযোজক হিসেবে। ২০০৬ সালে বিবিসি ওয়ার্ল্ডের সাউথ এশিয়া ব্যুরোর এক্সিকিউটিভ এডিটর হন। ২০১১-১২-তে তিনি এডিটর ইন্টারন্যাশনাল অপারেশন্স-এর দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৩ সালে চাকরি ছেড়ে দিয়ে লেখালেখি শুরু করেন। নাজেস আফরোজ একজন আফগানিস্তান বিশেষজ্ঞ।

প্রথম আলো  আপনি তো দীর্ঘ সময় ধরে আফগানিস্তানে যাওয়া-আসা করেছেন এবং সাংবাদিক হিসেবে সে দেশের খোঁজখবর রাখেন। দেশটির অবস্থা এখন কেমন?
নাজেস আফরোজ  ২০০১ সালে তালেবানের পতনের পর আফগানিস্তানের যে চেহারা ছিল, এখন তার সঙ্গে আকাশ-পাতাল তফাত।
প্রথম আলো  ভালো না খারাপ?
নাজেস আফরোজ  অনেক ভালো। ২০০২ সালে গোটা কাবুল শহরের যে ভগ্নদশা ছিল, আজকে সেই জায়গাগুলো ঘুরেফিরে দেখলে শহরটাকে চেনাই যায় না। জমির দাম, বাড়িভাড়া অনেক বেড়েছে। অবশ্য এর একটা কারণ, অনেক আন্তর্জাতিক এনজিও সেখানে কাজ করছে, প্রচুর বিদেশি লোক থাকে। এসব কারণে একটা ফলস ইকোনমি তৈরি হয়েছে। কিন্তু সেটাকে যদি বাদও দিই, তবু কাবুলের অনেক উন্নতি হয়েছে। শুধু কাবুল নয়, আমি হেরাত, মাজারে শরিফ, জালালাবাদ, কান্দাহার—যেখানেই গেছি, সবখানেই অনেক উন্নতি চোখে পড়েছে।
কাবুল শহর থেকে ১৪ কিলোমিটার উত্তরে একটা ছোট্ট গঞ্জমতো আছে চারিকার নামে। চারিকার মানে চৌরাস্তা, চারটি প্রধান সড়ক সেখানে মিলিত হয়েছে। ২০০৩ সালে সেই চারিকারে দেখেছিলাম খুব দীন দশা, দু-চারটি দোকানপাট ছাড়া আর তেমন কিছু ছিল না। প্রায় ১০ বছর বাদে আমি আবার সেই চারিকারে গেলাম। দেখলাম, গমগম করছে প্রাণবন্ত একটা শহর। বোঝা গেল যে অর্থনীতির চাকা ঘুরছে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্য দেখতে পাবেন। চাষবাস হচ্ছে।
প্রথম আলো  নিরাপত্তা পরিস্থিতি কেমন?
নাজেস আফরোজ  নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে, এ কারণে যেকোনো জায়গায় যেকোনো সময় আক্রমণ হতে পারে। কিন্তু সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় সেটার প্রতিফলন একদমই চোখে পড়ে না। কারণ, তালেবান ও অন্যান্য বিদ্রোহী, জঙ্গিগোষ্ঠী আক্রমণ চালায় সরকারি লোকজন ও স্থাপনার ওপর এবং বিদেশিদের ওপর। সাধারণ মানুষ তাদের আক্রমণের শিকার হয় না। সেই কারণে নিরাপত্তার উদ্বেগটা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে দৃশ্যমান নয়।
প্রথম আলো  কিন্তু আমরা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে আফগানিস্তানের যে চিত্র পাই, সেটা তো একেবারেই উল্টো।
নাজেস আফরোজ  আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের হয়ে কাজ করতে যাঁরা আফগানিস্তানে যান, তাঁদের বেশির ভাগই ইউরোপ-আমেরিকার মানুষ। গায়ের রঙেই তাঁদের আলাদা করে চেনা যায়। তাঁদের যাতায়াতের ওপর অনেক বিধিনিষেধ থাকে, তাঁদের প্রতিষ্ঠানই সেটা তাঁদের নিরাপত্তার স্বার্থে করে। আমি নিজেও বিবিসিতে কাজ করার সময় সেটা দেখেছি। তাঁরা যদি রাস্তাঘাটে না বেরোন, গ্রামগঞ্জে না যান, তাহলে প্রকৃত চিত্রটা পাবেন কী করে? সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় যে নিরাপত্তাহীনতার প্রভাব পড়ছে না, সেটা তো তাঁদের দেখতে হবে। বছর দেড়েক আগে আমি আমার আফগান বন্ধু-সহকর্মীর বাড়িতে গিয়ে থেকেছি—মাজারে শরিফে। সেখান থেকে একটা ছোট্ট ভাঙা গাড়িতে করে বাল্ক শহর পর্যন্ত গেছি, সেখানে রাস্তার মধ্যে ছবি তুলেছি। আমার সহকর্মীরা গাড়িতে করে মাজারে শরিফ চলে যায়, ১২ ঘণ্টা লাগে। অবশ্য কান্দাহারের সড়কটা নিরাপদ নয়; এ রকম আরও কিছু রাস্তা আছে, যেগুলো নিরাপদ নয়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে আফগানিস্তান নিয়ে যাঁরা লেখেন, তাঁদের সিংহভাগই পশ্চিমা; সেখানে তাঁদের জীবনের নিরাপত্তার শঙ্কাটা খুব বেশি। সেই শঙ্কা তাঁদের লেখালেখিতে প্রতিফলিত হয়।
প্রথম আলো  আফগানিস্তান থেকে ন্যাটোর সেনাবাহিনী এ বছর চলে গেলে দেশটিতে আবার তালেবান ফিরে আসতে পারে বলে উদ্বেগের খবর আমরা পাই। আপনার কী মনে হয়?
নাজেস আফরোজ  তিন ধরনের সম্ভাবনা আছে। একটা হচ্ছে, এই সরকারের পতন ঘটবে, তালেবান ক্ষমতা নিয়ে নেবে। দুই নম্বর হচ্ছে, আলোচনা হবে এবং শান্তি প্রতিষ্ঠা হবে। আফগানিস্তানের পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে যাবে। তিন নম্বর হচ্ছে, একটা মাঝামাঝি অবস্থা থাকবে। অর্থাৎ, একটা সরকার থাকবে এবং মাঝারি থেকে নিম্ন মাত্রায় বিদ্রোহ চলতে থাকবে। আমার ধারণা, এই শেষের সম্ভাবনাটাই বেশি।
প্রথম আলো  সে অবস্থায় বাইরের শক্তিগুলোর ভূমিকা কেমন হতে পারে? বিশেষত পাকিস্তানের?
নাজেস আফরোজ  আফগানরা মনে করে, পাকিস্তানের ভূমিকা নেতিবাচক; তাদের কাছে পাকিস্তানের প্রভাব, তাদের উপস্থিতি কাম্য নয়। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে অভিজাত পর্যন্ত, গোত্রনির্বিশেষে আফগানিস্তানের সব মানুষ এটা মনে করে। আর পাকিস্তান যে আফগানিস্তানে প্রভাব রাখতে চায়, সেটা খুব পরিষ্কার। পাকিস্তান খোলাখুলি সেটা বলেছেও। পাকিস্তানের আশঙ্কা হচ্ছে, আফগানিস্তানে ভারতীয় প্রভাব খুব বেশি। ভারত খুব বুদ্ধি করে সেখানে প্রভাব বাড়িয়েছে। ভারত আফগানিস্তানের পঞ্চম বৃহত্তম দ্বিপক্ষীয় দাতাদেশ। ভারত আফগানিস্তানকে দুই বিলিয়ন ডলার দিয়েছে; রাস্তা, স্কুল, হাসপাতাল বানিয়েছে, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন বানিয়ে দিচ্ছে, চিশত শহরের কাছে একটা বড় হাইড্রোইলেকট্রিক বাঁধ তৈরি করছে। আফগান পার্লামেন্টের নতুন ভবন তৈরির পুরো ব্যয় দিয়েছে ভারতীয় সরকার। এখন আফগান সরকার ভারতের কাছে সামরিক সাহায্য চাইছে। এটা পাকিস্তানকে ভীষণভাবে উদ্বিগ্ন করেছে। আর পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতি ঠিক করে তার সেনাবাহিনী, যার অনেক বড় বড় অফিসার একাত্তর সালকে ভুলতে পারেননি। এমনিতেই পাকিস্তানের পূর্ব সীমান্তে ভারতের সঙ্গে উত্তেজনা আছে, কাশ্মীর নিয়ে তারা কিছু করতে পারেনি। এর ওপর আফগানিস্তানে যদি ভারতের প্রভাব বাড়ে এবং সামরিক সহযোগিতাও যুক্ত হয়—এটা নিয়ে তারা ভীষণ উদ্বিগ্ন।
প্রথম আলো  আমেরিকার ভূমিকাও তো নেতিবাচক হতে পারে। কারণ, আমরা দেখেছি, আফগান সরকারকে এড়িয়ে তারা তালেবানের সঙ্গে আলোচনা করেছে।
নাজেস আফরোজ  আমার ধারণা, আমেরিকানরা খুব ভেবেচিন্তে তালেবানের সঙ্গে কথা বলেছে, তা নয়। আফগানিস্তান বা ইরাকের যুদ্ধ আমেরিকার জনগণের কাছে ভীষণ অজনপ্রিয় হয়ে গেছে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের মতো অত সেনা মারা না গেলেও গত ১২ বছরে চার-পাঁচ হাজার সেনা মারা গেছে, আট-দশ হাজার আহত হয়েছে, প্রচুর টাকা ব্যয় হচ্ছে। এর মধ্যে ২০০৮ সাল থেকে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ ছিল। ফলে, এ প্রশ্ন আমেরিকার ভেতরেই উঠছে যে আমরা ওখানে কী করছি? আবার সব ছেড়েছুড়ে চলেও যেতে পারছে না, কারণ তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে আফগানিস্তানে তারা একটা স্থিতিশীল অবস্থা তৈরি করে দিয়ে যাবে। সে জন্য তারা সব পক্ষকে নিয়ে আলোচনা করে একটা শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চায়। সম্প্রতি তারা কাতারে তালেবানের সঙ্গে আলোচনা করেছে। আমেরিকানরা আশা করেছিল, তালেবান অন্তত তিনটি জিনিস করবে: আফগানিস্তানে যে সংবিধান তৈরি করা হয়েছে, সেটি মেনে নেবে, হামিদ কারজাইয়ের সরকারকে স্বীকৃতি দেবে এবং তালেবান বলবে যে আফগানিস্তানের ভূমিতে তারা কোনো সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীকে জায়গা দেবে না। কিন্তু তালেবান এই তিনটির কোনোটিতেই রাজি হয়নি। সে জন্য আমেরিকার সঙ্গে তালেবানের আলোচনা ভেঙে গেছে।
প্রথম আলো  সামাজিক দিক থেকে আফগানিস্তানে গত ১০-১২ বছরে আপনি কী ধরনের পরিবর্তন লক্ষ করেছেন?
নাজেস আফরোজ  পরিবর্তন হচ্ছে খুব ধীরে। কিন্তু পরিবর্তন হচ্ছে। যারা লেখাপড়া করছে, তাদের মধ্যে নতুন ভাবনাচিন্তা আছে। প্রায় ৫০ লাখ আফগান বহু বছর শরণার্থী হিসেবে অন্যান্য দেশে বাস করেছে, তারা এখন ফিরে আসছে। কিছু নতুন ভাবনা তারাও নিয়ে আসছে। কাবুল বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫০ হাজার ছাত্রছাত্রী পড়াশোনা করে, তাদের মধ্যে ৩০ শতাংশ মেয়ে। হেরাত খুবই ছোট শহর, সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী মেয়ে। আফগানিস্তানে আট-দশটা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ও আছে বেশ কয়েকটা। কাবুল শহরে কারদান ইউনিভার্সিটি নামে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে ১০ হাজার ছাত্রছাত্রী। তাদের অনেকে পেশাজীবী; সারা দিন কাজ করে, রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস করে। ফলে, সামাজিক দিক থেকেও পরিবর্তন আসছে।
প্রথম আলো  সমাজে, সাধারণ মানুষের মধ্যে তালেবানের প্রভাব কেমন?
নাজেস আফরোজ  ১৯৯৪ সালের দিকে তালেবান যখন আসে, যখন জনগণ তাদের সমর্থন করেছিল। কিন্তু আজকে তাদের প্রতি সমর্থন ১ শতাংশও নেই। যেসব জায়গা তারা এখনো নিয়ন্ত্রণ করে, সেগুলোতে তাদের অস্ত্র হচ্ছে ভীতি। ১৯৯৪ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তালেবান জনসাধারণের ওপর যে অকথ্য অত্যাচার-নির্যাতন চালিয়েছে, সেটা মানুষের মনে গভীর ছাপ ফেলেছে। এ কারণে একটা আতঙ্ক এখনো রয়ে গেছে। কিন্তু তালেবানের প্রভাব তেমন নেই। মানুষের মন থেকে ভীতিটা কেটে গেলে তালেবানের মিথ ভেঙে যাবে। গণতন্ত্র ও ক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা তৈরি হলে তালেবানের ভীতিটা দূর হবে। গজনি শহর ও উত্তরের কয়েকটা জায়গায় স্থানীয় জনগণ তালেবানের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছে; মেরে বের করে দিয়েছে। আফগানিস্তানের লোকসংখ্যা তিন কোটি, এর ১ শতাংশও যদি তালেবানের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়, তালেবানের কিছু করার থাকবে না।
প্রথম আলো  আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
নাজেস আফরোজ  ধন্যবাদ।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মশিউল আলম ও এ কে এম জাকারিয়া

ক্রিকেট ও ভারত- অতি লোভে তাঁতি নষ্ট হবে না তো! by এ কে এম জাকারিয়া

Friday, January 31, 2014

‘ক্রিকেট একটি ভারতীয় খেলা, যা ঘটনাচক্রে আবিষ্কৃত হয়েছে ইংল্যান্ডে। এটা অনেকটা মরিচের মতো, যা আবিষ্কৃত হয়েছিল দক্ষিণ আমেরিকায়, সেখান থেকে ভারতে এসেছিল মধ্যযুগে।
এখন ভারতীয় খাবারের অন্যতম অনুষঙ্গ এই মরিচ। ভারতে ক্রিকেটকে বিদেশি খেলা হিসেবে দেখতে পান শুধু ইতিহাসবিদ আর ভারতবিদ্যার বিশেষজ্ঞরা। অধিকাংশ ভারতীয়ের কাছে ক্রিকেট এখন ইংলিশদের চেয়েও বেশি ভারতীয়।’ ভারতীয় রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ববিদ ও সমাজতাত্ত্বিক আশিষ নন্দী এই মন্তব্য করেছিলেন তাঁর দ্য তাও অব ক্রিকেট বইয়ে। ভারতে এখন ক্রিকেট যে পরিমাণ জনপ্রিয় আর সেখানে এই খেলার ‘বাজার’ এতই বড় যে এমন দাবি এখন ভারতীয়রা করতেই পারে। কিন্তু ‘অধিকাংশ ভারতীয়’ কি এখন ক্রিকেটকে ইংলিশদের চেয়ে বেশি ভারতীয় ভেবেই খুশি থাকতে রাজি নয়? খেলাটির ওপর খবরদারি ও কর্তৃত্বের নেশাও কি এখন তাদের মনোজগতে চেপে বসেছে? বোর্ড অব কন্ট্রোল ফর ক্রিকেট ইন ইন্ডিয়ার (বিসিসিআই) প্রেসিডেন্ট এন শ্রীনিবাসনের মাথা থেকে বের হওয়া ন্যক্কারজনক প্রস্তাবের মধ্য দিয়ে কি এরই প্রতিফলন ঘটল?

ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া (সিএ) আর ইংল্যান্ড ও ওয়ালস ক্রিকেট বোর্ডের (ইসিবি) সঙ্গে মিলে বিসিসিআই বিশ্ব ক্রিকেটে নিজেদের ‘জমিদারি’ কায়েম করার যে চেষ্টা করেছিল, তা আপাতত ঠেকেছে। দুবাইয়ের প্রতিরোধপর্ব শেষ হওয়ার পর ৮ ফেব্রুয়ারি সিঙ্গাপুরে সমঝোতা পর্বের প্রত্যাশা করা হচ্ছে। কিন্তু ক্রিকেট বিশ্বের তিন শক্তিশালী দেশের যে মনোভাবের পরিচয় মিলল বিশ্ব ক্রিকেটের সর্বোচ্চ সংস্থা আইসিসির বোর্ড মিটিংকে কেন্দ্র করে, তার রেশ সহজেই মিটবে বলে মনে হয় না। কারণ, যে শ্রীনিবাসনের মাথা থেকে ক্রিকেটে তিন দেশের জমিদারি কায়েমের প্রস্তাব এসেছে, তিনিই হতে যাচ্ছেন আইসিসি বোর্ডের পরবর্তী চেয়ারম্যান।
‘আধুনিক’ ক্রিকেট বলতে আমরা যা বুঝি, তার বয়সই ২০০ ছাড়িয়েছে। তবে আধুনিক ক্রিকেটের দুই শতকের এই পথচলা ও অনেক পরিবর্তনের পরও কিছু বিষয় শুধু ক্রিকেটের জন্যই তোলা রয়েছে। কিছু ধ্রুপদি বাক্য এখনো আমরা শুধু ক্রিকেটকে নিয়েই ব্যবহার করে থাকি: ‘আপনি হারলেন কি জিতলেন, এটা বড় কথা নয়, খেলাটা কীভাবে খেললেন, সেটাই বড় কথা’ (It is not whether you win or lose, it is how you play the game) অথবা ‘এটা ক্রিকেট নয়’ (It is not cricket) অথবা ‘আম্পায়ারের কথাই চূড়ান্ত, কোনো প্রশ্ন করা যাবে না’ (The umpires word is final, not to be questioned)। এই কথাগুলো শুধুই ক্রিকেটের। ক্রিকেটের এই দীর্ঘ যাত্রার পর ২০১৪ সালে এসে ‘পজিশন পেপারের’ নামে তিন বোর্ড মিলেমিশে যে প্রস্তাব তৈরি করেছিল, সে প্রসঙ্গে যে কথা সবচেয়ে বেশি যায়, তা সম্ভবত; It is not cricket.
তিন দেশের পজিশন পেপারের মূল বিষয়টি তুলে ধরতে প্রথম আলোতে প্রকাশিত উৎপল শুভ্রের প্রতিবেদনের তথ্য ও মন্তব্যের ওপর ভর করছি। তিনি যা লিখেছেন, তা অনেকটা এ রকম: মূল প্রস্তাবগুলোর সব কটির একটাই লক্ষ্য, আইসিসিতে ওই তিন দেশের নিরঙ্কুশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা। যেটির প্রথমেই আছে, আইসিসির পূর্ণ সদস্যদেশগুলোর সম-অধিকার ক্ষুণ্ন করে এক্সপো নামে নতুন একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাব। এর স্থায়ী সদস্য হিসেবে থাকবে ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের ক্রিকেট বোর্ড। কমিটিতে বাকি সাতটি দেশের প্রতিনিধি হিসেবে থাকবে একটি দেশ। আইসিসির বাকি সব কমিটির ওপর এর কর্তৃত্ব থাকবে। অর্থাৎ, এটিই হবে বিশ্ব ক্রিকেটের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। তিনি আরও লিখেছেন, টাকার লোভের কাছে খেলার মূল চেতনা অনেক দিন ধরেই গৌণ হয়ে বসেছে। প্রস্তাবিত পজিশন পেপারে সেটি প্রকাশিত হয়েছে আরও উৎকট রূপে। কারণ, সেখানে সদস্যদেশগুলোর মধ্যে টাকার ভাগাভাগিটা আগের মতো সমান না থাকার প্রস্তাব করা হয়েছে।
পজিশন পেপারের সবচেয়ে আপত্তিকর প্রস্তাবটি ছিল টেস্টে উত্তরণ ও অবনমনের বিষয়। র‌্যাঙ্কিংয়ের ৯ ও ১০ নম্বর দল আইসিসির সহযোগী দেশগুলোর সঙ্গে ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ খেলবে ও জয়ী দল ৮ নম্বর দলের সঙ্গে প্লে অফ খেলে ওপরে ওঠার সুযোগ পাবে। সব দলের জন্য একই বিধান হলো না হয়, এমন একটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করা যায়, কিন্তু পয়েন্ট তালিকার শেষে থাকলেও ওই তিন দেশকে কখনো নামানো যাবে না—এমন একটি অগণতান্ত্রিক প্রস্তাবও করেছে তিন ‘গণতান্ত্রিক’ দেশের সর্বোচ্চ ক্রিকেট সংস্থা! ভারতের ইতিহাসবিদ ও বিশিষ্ট ক্রিকেট লেখক রামচন্দ্র গুহ টুইট করেছেন, ‘টেস্টের দ্বিস্তর লিগে অবনমনের ক্ষেত্রে ভারত, ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়াকে ছাড় দেওয়ার প্রস্তাবটি ন্যক্কারজনক, আশা করছি অন্য দেশগুলো তা প্রত্যাখ্যান করবে।’ এসব চরম অগণতান্ত্রিক প্রস্তাব ও বিধিবিধান কার্যকর করার চেষ্টা ছিল গোপনে। তিন দেশ তলে তলে পজিশন পেপার তৈরি করে কয়েকটি দেশের ক্রিকেট বোর্ডকে নানা আর্থিক সুবিধা ও প্রলোভন দেখিয়ে হাতও করে ফেলেছিল। কিন্তু পজিশন পেপারের বিষয়টি গোপন থাকেনি। দুবাই বৈঠকে আইসিসি প্রেসিডেন্ট নিউজিল্যান্ডের অ্যালান আইজ্যাক স্বীকার করলেন যে সমস্যাটি তৈরি হয়েছে তিন দেশের তৈরি পজিশন পেপার গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ায়। ভাগ্যিস বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল, তা না হলে দুবাইয়ের প্রতিরোধপর্ব যে মঞ্চস্থ হতো না!
২০১১ সালে বাংলাদেশে যখন বিশ্বকাপ ক্রিকেট অনুষ্ঠিত হয়, তখন একটি লেখা লিখেছিলাম ক্রিকেট ও গণতন্ত্র বিষয়ে। শিরোনাম ছিল ‘ক্রিকেট ও গণতন্ত্রের কাকতালীয় সম্পর্ক!’ লিখেছিলাম, ‘রাষ্ট্রের একটি সংবিধান লাগে, আবার রাষ্ট্র চালানোর জন্য নিয়মিত সংবিধান মেনে নতুন বিধিবিধান তৈরি করতে হয়। রাষ্ট্রের আইনসভা বা পার্লামেন্ট তা করে থাকে। ক্রিকেটের ক্ষেত্রেও বিষয়টি একইভাবে সত্য। খেলার নতুন নতুন বিধিবিধান তৈরি ও ক্রিকেট আইনের ব্যাখ্যা করার একক কর্তৃত্ব খাঁটি ব্রিটিশদের প্রতিষ্ঠান এমসিসির। তাদের করা ক্রিকেট আইনের সর্বশেষ সংস্করণ, যা “2000 Code 4th Edition 2010” নামে পরিচিত, তা ১ অক্টোবর ২০১০ সাল থেকে কার্যকর হয়েছে। তবে আইন কার্যকর করার একক ক্ষমতা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট পরিষদের (আইসিসি)। বিষয়টি অনেকটা আধুনিক রাষ্ট্রের আইনসভা ও নির্বাহী বিভাগের মতো। এ ক্ষেত্রে “আইনসভা” এমসিসি আর “নির্বাহী বিভাগ” হচ্ছে আইসিসি। তবে গঠনের দিক দিয়ে এই প্রতিষ্ঠান দুটির চরিত্র “আইনসভা” আর “নির্বাহী বিভাগের” প্রায় উল্টো। “নির্বাহী বিভাগ” হলেও আইসিসি বিভিন্ন ক্রিকেট খেলুড়ে দেশের সদস্যদের নিয়ে গঠিত, বলা যায় প্রতিনিধিত্বমূলক, গণতান্ত্রিক।...২০০৫ সালের আগ পর্যন্ত এমসিসি ও আইসিসি—দুটোরই মূল দরবার ছিল লন্ডনের লর্ডসের মাঠ। সে বছর আইসিসির সদর দপ্তর দুবাইয়ে সরে আসার পর ক্রিকেটের ওপর ইংল্যান্ডের আধিপত্য প্রতীকীভাবে হলেও কমছে।...২০০৬ সালে এসে অবশ্য “এমসিসি বিশ্ব ক্রিকেট কমিটি” নামে একটি নতুন কমিটি তৈরি হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বর্তমান ও সাবেক ক্রিকেটার ও আম্পায়ারদের নিয়ে গঠিত হয়েছে এই কমিটি। তাঁরা বছরে দুবার বসেন খেলাটির “prevalent issues” নিয়ে আলোচনার জন্য। এমসিসিও পরিবর্তন ও গণতন্ত্রায়ণের পথে হাঁটা শুরু করেছে বলে মনে হচ্ছে।’
২০১৪ সালে এসে কি তবে উল্টো পথে নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে আইসিসিকে? আর ব্রিটিশ আধিপত্য থেকে ক্রিকেটকে মুক্ত করা বা ক্রিকেটের আরও গণতন্ত্রায়ণের বদলে অতীতের দিকে যাত্রার এই আয়োজনে নেতৃত্ব দিচ্ছে ভারত! এশিয়ার সব কটি দেশকে বাদ দিয়ে ভারতের গাঁটছড়া এখন ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে। পাকিস্তান দলের সাবেক অধিনায়ক ইমরান খান টুইট করেন, ‘বড় তিনটি দেশের এই প্রস্তাব ক্রিকেট দুনিয়াকে বিভক্ত করবে। মনে আছে, আমি ১৯৯৩ সালে আইসিসিতে পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করেছিলাম। সেখানে ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার স্বৈর মনোভাব ভুলিনি।...আর এখন শুধু আর্থিক শক্তির জোরে ভারত ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে মিলেছে।’
বিশ্ব ক্রিকেটে মোড়লির আশায় এশীয় ক্রিকেটের সঙ্গে দূরত্বই তৈরি করে ফেলল ভারত। ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ভারতের এই গাঁটছড়া কি চিরস্থায়ী কোনো বিষয়? এই তিন দেশের মধ্যে কোনো ইস্যুতে ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া যদি এক থাকে, সেখানে তো একাই হয়ে পড়বে ভারত! ক্রিকেটে গণতন্ত্রায়ণের পথ বন্ধ করলে ভারতের বিপদে পড়ার আশঙ্কাই বেশি। অতি লোভেই তো তাঁতি নষ্ট হয়!

এ কে এম জাকারিয়া: সাংবাদিক।
akmzakaria@gmail.com

রাজনীতি- ‘অল্প’ নয়, আরও গণতন্ত্র by এ কে এম জাকারিয়া

Monday, January 27, 2014

নির্বাচন না হওয়ার চেয়ে কম অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনও ভালো—এ ধারণা বোস্টন গ্লোব-এর নিয়মিত কলাম লেখক ও মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক টম কিনের। একেবারেই মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও সিনেটের আগাম বিশেষ নির্বাচনে ভোটারদের কম অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে তিনি এ মন্তব্য করেছেন এক কলামে।
লিখেছেন, একেবারে গণতন্ত্র না পাওয়ার চেয়ে অল্প একটু গণতন্ত্র পাওয়াও ভালো। বাংলাদেশের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পক্ষে এটা একটা ভালো যুক্তি হতে পারে! নির্বাচন না হওয়ার চেয়ে তো অন্তত একটি নির্বাচন হয়েছে, গণতন্ত্র রক্ষা পেয়েছে। কিন্তু আমরা কি এখন ‘অল্প’ গণতন্ত্র নিয়েই খুশি থাকার অবস্থায় আছি, নাকি আমাদের চাওয়াটা বেড়েছে? ২০০৮ সালে সব পর্যায়ে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকার হিসেবে আওয়ামী লীগ গত মেয়াদের পাঁচ বছর পুরো করেছে। ২০১৪ সালের নির্বাচন আরও গ্রহণযোগ্য হবে বা এর মধ্য দিয়ে যে নতুন সরকার এসেছে তাদের কাছ থেকে তো আরও গণতন্ত্রই স্বাভাবিক চাওয়া! গণতন্ত্রের পথে এগোনো মানে ‘অল্প’ গণতন্ত্র নয়, আরও গণতন্ত্র, বেশি গণতন্ত্র।

কেনের মত হচ্ছে, একটি মন্দ নির্বাচনের বিকল্প নির্বাচন না-হওয়া হতে পারে না। সে দিক থেকে দেখলে নির্বাচন না-হওয়ার চেয়ে ৫ জানুয়ারি অন্তত একটি ‘মন্দ’ নির্বাচন হয়েছে। মানে মন্দের মধ্যে ভালো। কিন্তু এ ধরনের ‘বিতর্কিত’ বা ‘একতরফা’ মন্দ নির্বাচন সব সময়ই আগাম নির্বাচনের পরিস্থিতি তৈরি করে। নব্বইয়ের পর এ ধরনের একটি মন্দ নির্বাচনের নজির ছিল ’৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন। সেই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যে সরকার হয়েছিল, তা টিকে ছিল দুই মাসের কম।
ইতিহাসের কখনো হুবহু পুনরাবৃত্তি হয় না। এবারের ৫ জানুয়ারির মন্দ নির্বাচনের পর এই নির্বাচন বর্জন ও প্রতিরোধের ডাক দিয়েছিল যে দল ও জোটটি, তার নেতা বেগম খালেদা জিয়াও কার্যত এই সরকারকে ‘পুনরায় জাতীয় সংসদ নির্বাচন’ অনুষ্ঠানের জন্য এর চেয়ে বেশি সময় দিয়ে ফেলেছেন। ‘অতি দ্রুত সংলাপে বসে নির্দলীয় সরকারের অধীনে অতি দ্রুত নির্বাচন’ দেওয়ার যে আহ্বান তিনি ২০ জানুয়ারি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সমাবেশে জানিয়েছেন, তাতেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। খালেদা জিয়ার আহ্বানে সাড়া দিয়ে সরকার যদি আজই সংলাপ শুরু করে এবং ‘পুনরায় একটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন’ অনুষ্ঠানের উদ্যোগ নেয়, তার পরও মাস ছয়েক সময় লেগে যাওয়ার কথা। ২০১৪ সালের মন্দ নির্বাচন যে সরকার উপহার দিয়েছে তা যে ’৯৬-এর মন্দ নির্বাচনে ক্ষমতায় আসা সরকারের চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী হবে, তা নিশ্চিত করেই বলা যায়।
এবারের মন্দ নির্বাচনের আরও একটি দিক হচ্ছে, এই নির্বাচনের পর দেশে এখন একটি স্বস্তির পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ’৯৬-এর মন্দ নির্বাচনের পর পরিস্থিতি ছিল পুরো উল্টো। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সবগুলো প্রধান বিরোধী দলের হরতাল ও আন্দোলনের কর্মসূচিতে তখন দেশ কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল। এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। ২০১৪ সালের ‘বিতর্কিত’ ও ‘একতরফা’ নির্বাচনের পর আমরা দেখলাম বেগম খালেদা জিয়া পতন না-হওয়া পর্যন্ত বর্তমান ‘অবৈধ সরকারের’ বিরুদ্ধে ‘শান্তিপূর্ণ’ আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। দেশে আপাতত হরতাল বা অবরোধের মতো কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি নেই। নির্বাচন বর্জন বা প্রতিরোধে সহিংস ও নাশকতার কৌশল নিয়ে পুরো ব্যর্থ দলটির নেতা খালেদা জিয়ার সামনে অবশ্য এখন ‘শান্তিপূর্ণ’ কর্মসূচি না দেওয়ার কোনো বিকল্প আছে বলেও মনে হয় না।
তবে নির্বাচন-পরবর্তী এই যে স্বস্তির পরিস্থিতি, এটা নিয়ে নতুন সরকারের স্বস্তি বা আত্মতৃপ্তির কোনো সুযোগ নেই। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার নিয়ে দেশে যে ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করেছিল জামায়াত-শিবির ও হেফাজত, তার সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক বা নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮-দলীয় জোটের হরতাল-অবরোধ ও নাশকতার কর্মসূচি যুক্ত হওয়ায় দেশবাসী এক দমবন্ধ অবস্থার মধ্যে পড়ে গিয়েছিল। যেভাবেই হোক, এই অসহনীয় পরিস্থিতি থেকে মুক্তি চাইছিল জনগণ। একটি মন্দ নির্বাচন হলেও ৫ জানুয়ারির নির্বাচন সেই পরিস্থিতি থেকে দেশবাসীকে মুক্তি দিয়েছে। জনগণের মধ্যে স্বস্তির ভাবটি সে কারণেই।
কিন্তু এ ধরনের স্বস্তির পরিস্থিতি অনির্দিষ্ট সময় বা বর্তমান সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদ পর্যন্ত বজায় থাকবে—এমন আশা নির্বুদ্ধিতা ছাড়া আর কিছু নয়। ২০০৬ সালে বিএনপি সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে যে সহিংস পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, তাতে এক-এগারোর সরকারে স্বস্তি খুঁজে পেয়েছিল জনগণ। সেই স্বস্তি যে বেশি দিন থাকেনি, তা নিশ্চয়ই আমরা ভুলে যাইনি। সেনাসমর্থিত সেই সরকারের ভুল ও বাড়তি নানা পদক্ষেপ জনগণ মেনে নেয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সামান্য একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে সেই ক্ষোভের বিস্ফোরণ টের পেয়েছিল এক-এগারোর সরকার। সবকিছু থেকে সরে এসে সেই সরকারকে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দিকেই পুরো মনোযোগ দিতে হয়েছিল এবং তা অনুষ্ঠান করে মানে মানে সরে যেতে হয়েছিল।
তবে আবারও বলি, ইতিহাসের কখনো হুবহু পুনরাবৃত্তি হয় না আর বর্তমান সরকার এক-এগারোর সরকারের মতো অনির্বাচিত সরকারও নয়, একটি মন্দ নির্বাচনের মাধ্যমে হলেও নির্বাচিত সরকার। কিন্তু বর্তমান স্বস্তির পরিস্থিতি যে বেশি দিন থাকবে না, সেটা অনুমান করা যায়। আর দল হিসেবে বিএনপি বর্তমানে যে কোণঠাসা অবস্থায় আছে, সেই পরিস্থিতির আদৌ কোনো পরিবর্তন হবে না—এমন ভাবাটাও বোকামি হবে। বিএনপি নিশ্চয়ই ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবে। আগামী ১৯ ফেব্রুয়ারি দেশের ৯৭টি উপজেলায় যে নির্বাচন হতে যাচ্ছে, সেখানে বিএনপি জোরেশোরেই নামছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। এই স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলকে সক্রিয় করার চেষ্টা করবে বিএনপি, এই নির্বাচনের ফলাফলও একটি বড় প্রভাব ফেলবে সামনের দিনগুলোর রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশে। ৫ জানুয়ারির মন্দ নির্বাচন তাই যেকোনো সময়ে আগাম নির্বাচনের পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে।
আমরা মানি বা না মানি নির্বাচন বা দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বিষয়টি এখন আর কোনো অর্থেই ‘অভ্যন্তরীণ’ ব্যাপার নয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মুখে যতই ‘দেশটি ও দেশটির জনগণের নিজস্ব ব্যাপার’ ধরনের শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করুক, বাস্তবে বিষয়টি তা নয়। যদি সেটাই হতো, তবে বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এত দৌড়ঝাঁপের কোনো ব্যাপার ছিল না। আর আওয়ামী লীগও নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে বা এখন ভাবমূর্তি উদ্ধারে এত তত্পর হতো না অথবা ঘরে বসে কর্মসূচি ডেকে বিএনপি নির্বাচনের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মুখাপেক্ষী হয়ে বসে থাকত না।
বিশ্বের যেকোনো দেশের নির্বাচনেরই এখন একটি আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা লাগে। জিম্বাবুয়ে, তাজিকিস্তান বা ঘানা, টোগো বা মালির মতো দেশগুলো অবশ্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এসব গ্রহণযোগ্যতার ধার না ধেরেই টিকে আছে। কিন্তু এসব দেশ আন্তর্জাতিক মহলে আর যা-ই হোক, ‘গণতান্ত্রিক দেশ’ হিসেবে খুব একটা বিবেচিত হয় না। বাংলাদেশ কি এই দেশগুলোর কাতারে নাম লেখাতে চায়? এই দেশগুলোর নামের সঙ্গে বাংলাদেশের নাম উচ্চারিত হোক সেটাই কি আমাদের চাওয়া?
৫ জানুয়ারির মন্দ নির্বাচন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। নির্বাচন পর্যবেক্ষণের বিষয়টি সবাই এড়িয়ে গেছে। নির্বাচনের পর বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশ ও সংস্থাগুলো বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে তাদের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করে যাওয়ার প্রসঙ্গটি ছিল ঠিকই, কিন্তু নির্বাচন নিয়ে অসন্তুষ্টির বিষয়টিও ছিল পরিষ্কার। সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে দ্রুত সমঝোতায় আসা, জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন হয়, এমন একটি নির্বাচনের দ্রুত ব্যবস্থা করা—এটাই ছিল প্রতিক্রিয়াগুলোর মূল সুর। মানে ৫ জানুয়ারি যে নির্বাচন হয়েছে, তার বদলে একটি অংশগ্রহণমূলক ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাওয়া।
৫ জানুয়ারি যে নির্বাচন হয়েছে তা বাংলাদেশের একটি বাস্তবতা। নির্বাচন না হওয়ার চেয়ে হয়তো মন্দ নির্বাচন ভালো। আবার মন্দ নির্বাচন আগাম নির্বাচনের পরিস্থিতি তৈরি করে এবং সেটি একটি ভালো নির্বাচনের সম্ভাবনাকেই সামনে নিয়ে আসে। অল্প গণতন্ত্র নয়, আমাদের চাওয়া বেশি গণতন্ত্র। মন্দ নির্বাচন নয়, আমাদের চাওয়া ভালো নির্বাচন। আগামী নির্বাচন যখনই হোক, সেটি হতে হবে আরও গণতন্ত্রের নির্বাচন!
এ কে এম জাকারিয়া: সাংবাদিক।
akmzakaria@gmail.com
 
Support : Dhumketo ধূমকেতু | NewsCtg.Com | KUTUBDIA @ কুতুবদিয়া | eBlog
Copyright © 2013. News 2 Blog 24 - All Rights Reserved
Template Created by Nejam Kutubi Published by Darianagar Publications
Proudly powered by Dhumketo ধূমকেতু