শেয়ার বাজারের লুটপাট কাহিনী by আবুল খায়ের

Monday, February 7, 2011

শেয়ার বাজার দরপতনের নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার নেপথ্যে নায়করা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে রয়ে যাচ্ছে। তাদের স্পর্শ করার ক্ষমতা কারো নেই। নির্মম, নির্দয়ভাবে প্রায় ৪০ লাখ বিনিয়োগকারীদের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে বিলাসবহুল জীবনযাপন করছেন তারা।

৪০ লাখ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী ও তার পরিবারসহ প্রায় ২ কোটি মানুষ নিদারুণ আর্থিক কষ্টের শিকার। এই নির্দয় লুণ্ঠনকারীদের আলস্নাহ বিচার করবেন। গতকাল রবিবার নবমবারের মত শেয়ার বাজারে দরপতনে নিঃস্ব হওয়া ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের বেশ কয়েকজন কান্নাজড়িত কণ্ঠে এই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। অপরদিকে বিভিন্ন সংস্থা শেয়ার বাজারে দরপতনের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎকারীদের সনাক্ত এবং কিভাবে আত্মসাৎ করেছে তার বিস্তারিত তথ্য উলেস্নখ করে ইতিমধ্যে সরকারের শীর্ষ প্রশাসন ও কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করেছে। তারপরও শেয়ার বাজারে দরপতনের নামে কোটি কোটি টাকা লুটপাট বন্ধ হয়নি। সর্বশেষ গতকাল শেয়ার বাজারে দরপতন হয়েছে। পাশাপাশি বিক্ষোভ ও ভাংচুরের ঘটনা ঘটে। একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় শেয়ার বাজারে কোটি কোটি টাকা লুণ্ঠনকারী কিছুসংখ্যক অর্থলোভীকে নিয়ন্ত্রণ করা কিংবা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাচ্ছে না। এই নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা ও সমালোচনা চলছে। তাদের এত ক্ষমতার উৎস কি? অনুসন্ধান ও বিভিন্ন সংস্থা এবং বিনিয়োগকারীসহ ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে আলাপকালে জানা যায়, শেয়ার বাজারে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎকারীরা ক্ষমতাধর দুইটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সঙ্গে সরাসরি জড়িত এবং কেউ কেউ দলীয় নেতা। রাজনীতি নিয়ে উভয়ে পরস্পরের বিরুদ্ধে রাজপথে ও জনগণের সামনে কথা বলছে। দৃশ্যপট এমন যে, উভয়ের মধ্যে দা-কুমড়া সম্পর্ক। আসলে তা নয়, একশ্রেণীর নেতা উভয় দলের মধ্যে কোটি কোটি টাকা ভাগাভাগিতে একে অপরের জানিদোস্ত। কি মজার ব্যাপার শেয়ার বাজারের কোটি কোটি টাকা কেলেংকারির জন্য উভয় দল থেকে একে অপরকে দায়ী করে এবং সরকারের চরম ব্যর্থতার কথা উলেস্নখ করা হয়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, চারদলীয় জোট সরকারের আমলের এক ক্ষমতাধর মন্ত্রীর পুত্র, অসীম ক্ষমতাধর দুই এমপি ও তিন ব্যবসায়ী এবং বর্তমান আওয়ামী লীগসহ মহাজোট সরকারের দুই এমপি, দুই ক্ষমতাবান শিল্পপতি ব্যবসায়ীসহ উভয় দলের ১১ জন প্রত্যক্ষভাবে শেয়ার কেলেংকারিতে জড়িত। এছাড়া তাদের সঙ্গে আরো কয়েকজন জড়িত বলে জানা গেছে। গত ৮ ডিসেম্বর থেকে গতকাল পর্যন্ত নবম দফা শেয়ার বাজারের দরপতন ঘটিয়ে কোটি কোটি টাকা তারা হাতিয়ে নিয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, শেয়ার বাজার থেকে ৪৩ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়। একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা শেয়ার বাজারে বার বার দরপতন ঘটিয়ে কোটি কোটি টাকার কেলেংকারি ঘটনার দীর্ঘ তদন্ত করেছে। তদন্ত করে উভয় দলের ১১ জন রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী শেয়ার বাজার কেলেংকারির সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়েছে। বিষয়টি সরকারের শীর্ষ প্রশাসনকে অভিহিত করেছে।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, শেয়ার বাজারে কোটি কোটি টাকা লুটপাটে সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের কতিপয় কর্তা জড়িত। বাংলাদেশ ব্যাংক শেয়ার বাজার নিয়ন্ত্রণে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। বিধি অনুযায়ী বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহ তাদের মূলধনের ১০% এর বেশি শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করতে পারে না। কিন্তু অধিকাংশ বাণিজ্যিক ব্যাংক নীতিমালা লংঘন করে তাদের মূলধনের অধিকাংশই শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করার ফলে শেয়ারের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক এ নীতিমালা অনুসরণের জন্য আদেশ দেয়ায় এবং তদারকি করায় ব্যাংকসমূহ তাদের বিনিয়োগ প্রত্যাহার করায় শেয়ার বাজারে দরপতনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশ ব্যাংক ১০ ডিসেম্বর বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের অতিরিক্ত বিনিয়োগের দুই হাজার কোটি টাকা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এতে শেয়ার বাজারে দরপতন ঘটে যায় বলে সংস্থার তদন্তে উলেস্নখ করা হয়।

১৯৯৬ সালে উক্ত জড়িত ব্যবসায়ী ও নেতারা কৌশলে শেয়ার বাজারে বড় ধরনের পতন ঘটিয়ে কোটি কোটি টাকা লুটপাট করে নিয়ে যায়। সেই উভয় দলের নেতারা এবার শেয়ার বাজারে একই কেলেংকারি ঘটিয়েছেন। এছাড়া ১৯৯৬ সালে সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন শেয়ার বাজারে দরপতনের সঙ্গে ১৫টি কোম্পানি জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়ে মামলা দায়ের করে। সেই মামলা এখন হিমাগারে। এসব লুণ্ঠনকারী কোম্পানি শেয়ার বাজারে এখন তৎপর রয়েছে বলেও তদন্ত প্রতিবেদনে উলেস্নখ করা হয়।

লালনের ননী চুরি, গৌতম ঘোষের ছলচাতুরি by বিধান রিবেরু

যার মৃতু্য তারিখ একশো বছর পার করে ফেলে, বিশেষ উদ্যোগ না থাকলে তাঁর সম্পর্কে বিস্তারিত উদ্ধার করা কষ্টকর, আর তিনি যদি হন লালনের মতো দার্শনিক বাউল, প্রচারবিমুখ, তাহলে অনেক কাহিনীই কল্পনার সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।

সেটা হয়ে ওঠে মিথ। ১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর লালন ফকির মারা যাওয়ার ১৪দিন পর 'হিতকরী' পত্রিকায় তাঁর সম্পর্কে একটি প্রবন্ধ ছাপা হয়, সেখানে বলা হয়_'ইঁহার জীবনী লিখিবার কোন উপকরণ পাওয়া কঠিন। নিজে কিছুই বলিতেন না, শিষ্যেরা হয়ত তাঁহার নিষেধক্রমে, না হয় অজ্ঞতাবশতঃ কিছুই বলিতে পারে না।' (ভট্টাচার্য ১৯৫৩: ৬৭৪) যদিও এই পত্রিকায় 'সাধারণে প্রকাশ' দোহাই দিয়ে লালন ফকিরকে কায়স্থ বলে চালানোর চেষ্টা করেছে। তবে সেটা নিশ্চিত নয় বলেই তারা বলেছে 'সাধারণে প্রকাশ'। অতএব লালন হিন্দু ঘরের না মুসলমানের তা নির্দিষ্ট করে বলতে যাওয়ার মধ্যে একটা সামপ্রদায়িক গন্ধ যেমন থাকে তেমনি সেই তর্কে যাওয়া মূঢ়তারও প্রকাশ বৈকি।

অসামপ্রদায়িক মানসিকতার লালনকে নিয়ে তবুও টানাহেঁচড়া থামে না। সমপ্রতি লালনকে নিয়ে মুক্তি পাওয়া গৌতম ঘোষের চলচ্চিত্র 'মনের মানুষ'-এ সেই রকমই সামপ্রদায়িকতা ও মূঢ়তা চোখে পড়ে। এবং আমাদের পীড়া দেয়। লালনের জাতধর্মকে প্রতিষ্ঠা ব্যতিরেকে ছবিটি যদি করা হতো, তাহলে ছবির জাত কি চলে যেত?

চলচ্চিত্রে শুরুর দিকে আমরা দেখি কিশোর লালন কবিরাজকে গান শোনাচ্ছে, 'আর আমারে মারিস নে মা, ঃননী চুরি আর করবো না'। কবিরাজ ও তার পরিবারের সঙ্গে গঙ্গা স্নানে যাওয়ার আগে নিছক এই গানটি পরিবেশনার মাধ্যমে সনাতন ধর্মের একটা আবহ সৃষ্টির চেষ্টা এখানে দিবালোকের মতো স্পষ্ট। একদিকে পুণ্য অর্জনের জন্য যাত্রা, অন্যদিকে শ্রীকৃষ্ণের আকুতি। কিন্তু কেউ কি হলফ করে বলতে পারে, লালনের জলবসন্ত হওয়ার আগে এই গান রচিত হয়েছিলো। তাছাড়া তখন তো লালনের গান সংগ্রহ করে তেমন কেউ ছিলো না। যেহেতু বাউল হিসেবে তাঁর আত্মপ্রকাশ অসুস্থতা থেকে আরোগ্য লাভের পরই। যদি বলি, বাউল ধর্মকে গ্রহণ করার পর এই গানের সৃষ্টি? তাহলে কি বিশ্বাস করা যায়, শুধু কৃষ্ণের ক্ষমা প্রার্থনা রাষ্ট্র করার জন্যই এই গান বেঁধেছিলেন লালন? না।

আমরা মনে করি, লালনের এই গানে 'মা' পরমেশ্বরেরই একটা মেটাফোর। আর 'ননী' কামুক ভোগবিলাসি জীবনের এক অসাধারণ রূপান্তর। এই ভবে ভোগবিলাস যেমন আছে, তেমনি আছে পরমেশ্বরের সাধনা। শুদ্ধ ভোগবিলাসে ভাগ্যের রূপান্তরে পরমের মার খাওয়ার দৃশ্যকল্পই কি লালন এই গানে ধরতে চাননি? লালন গবেষকরা এই প্রশ্নের মীমাংসা করবেন। কিন্তু লালনের গানের শ্রোতা হিসেবে আমরা মনে করি, নেহায়েৎ কৃষ্ণ বন্দনার জন্য লালন এই গান রচনা করেননি। তাতে কি, সিনেমাটোগ্রাফার কাম পরিচালক গৌতম ঘোষ অবলীলায় ঐ 'ধর্মীয়' গানটি 'হিন্দু' লালনকে দিয়ে গাইয়ে নিয়েছেন।

বাউল ও লালন বিষয়ক পণ্ডিত অধ্যাপক উপেন্দ্রকিশোর ভট্টাচার্য বাউলদের 'মনের মানুষ' সম্পর্কে বলেন_

"মানব-দেহস্থিত পরমতত্ত্ব বা আত্মাকে বাউল 'মনের মানুষ' বলিয়া অভিহিত করিয়াছে। আত্মাকে 'মানুষ' বলার তাৎপর্য মনে হয় এই যে, আত্মা মানবদেহকে অবলম্বন করিয়া বাস করিতেছেন ও মানবদেহের সাধনার দ্বারাই তিনি লভ্য এবং এই মানবাকৃতি তাঁহারই রূপ মনে করিয়া বাউল তাঁহাকে 'মানুষ' বলিয়া অভিহিত করিয়াছে। এই মানুষ অলক্ষ্য অবস্থায় হূদয়ে বা মনে অবস্থান করিতেছেন, বোধহয় এই কল্পনা করিয়া তাহারা তাঁহাকে 'মনের মানুষ' বলিয়াছে। এই আত্মাকে তাহারা 'মানুষ', 'মনের মানুষ', 'সহজ মানুষ', 'অধর মানুষ', 'রসের মানুষ', 'ভাবের মানুষ', 'আলেখ মানুষ', 'সোনার মানুষ', 'সাঁই' প্রভৃতি নানা নামে অভিহিত করিয়াছে।" (ভট্টাচার্য ১৯৫৩: ৩৪০)

লালন যেমনটা বলেন:

"এই মানুষে আছে, রে মন,

যারে বলে মানুষ রতন, লালন বলে পেয়ে সে ধন

পারলাম না রে চিনিতে।।"

(ভট্টাচার্য ১৯৫৩: ৫৯৪)

দুঃখের বিষয় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাসকে ভিত্তি করে নির্মিত গৌতম ঘোষের চলচ্চিত্র 'মনের মানুষ'-এ সেরকম কোনো আত্মঅনুসন্ধানের হদিসই মেলে না। যা মেলে সে শুধু বিচ্ছিন্ন দ্বীপে বসবাস করা একদল কামুক নারী এবং 'পালের গোদা' লালন। অবশ্য বিচ্ছিন্ন জঙ্গলে আস্তানা গাড়ার আগে দেখানো হয় সিরাজ সাঁই লালনকে এক নারীর কাছে পাঠাচ্ছেন 'নারীসঙ্গ' পাওয়ার জন্য। সেই নারীর যে মুখভঙ্গি ও সংলাপ সেটাকে দর্শক কি বলবেন? 'অমাবস্যায় পূর্ণিমা' জাগানোর নারীর কামুক অনুরোধে বিবাহিত লালন সাড়া দেন। গৌতম ঘোষের ছবি অনুযায়ী লালন তখনো লালন হয়ে ওঠেননি। তবে 'হয়ে' ওঠার প্রক্রিয়া চলছে। প্রশ্ন হলো, গৌতম ঘোষের সিরাজ সাঁইয়ের কি আর কোনো তরিকা ছিলো না? বাউল ধর্মের গূহ্য ও গূঢ় বিষয়কে এভাবে যৌনতার মোড়কে আনা ব্যবসায়িক চাতুরি ছাড়া আর কি? বাউল ধর্মে অমাবস্যাকে দেখা হয় ঘোর অন্ধকার কামের সময় হিসেবে, আর পূর্ণিমাকে ধরা হয় প্রেমের মেটাফোর। "কামের স্বরূপকে বাউলরা নিরবচ্ছিন্ন দেহ-ভোগের অন্ধকারময় শক্তি বলিয়া বুঝিয়াছে। এই 'অমাবস্যা'র মধ্যেই তাহাদের 'পূর্ণচন্দ্র' উদিত হয়। এই পূর্ণচন্দ্র 'সহজ মানুষ' বা 'অধর মানুষ', ইনিই প্রেম-স্বরূপ।ঃ এই 'অধর মানুষ' বা পরমাত্মা সহস্রারে অটল-রূপে বিরাজিত। ইনি এই যোগের সময় রস-রূপে প্রকৃতি-দেহে ক্রীড়া করেন এবং পূর্ণভাবে মূলাধারে প্রকৃতির কারণ-বারিতে আবিভর্ূত হন। এই আবির্ভাবকে তারা পূর্ণিমার যোগ বলে। ইহাই বাউলদের 'অমাবস্যার পূর্ণচন্দ্র উদয়'। এই সময় তাহাদের 'অমাবস্যা-পূর্ণিমা'র একত্র যোগ। এই যোগের তৃতীয় দিন বা কোনো সমপ্রদায়ের মতে চতুর্থদিনে 'মানুষ ধরা'র প্রশস্ত দিন।" (ভট্টাচার্য ১৯৫৩: ৩৯১) এতো দীর্ঘ উদ্ধৃতি দেয়ার একটাই কারণ, আমরা বলতে চাই বাউল ধর্ম ও তার জীবনাচরণ সাধারণের চেয়ে ভিন্ন, তাদের রয়েছে গোপন দর্শন ও চর্চা। 'নারীসঙ্গ' ও 'অমাবস্যায় পূর্ণিমা'য় চোখেমুখে কামুকতা ও পোশাকে নগ্নতা এনে পরিচালক ঘোষ যে দোষ করেছেন তা স্খলন হবে কিনা তার জবাব প্রকৃত বাউলরাই দিতে পারবেন। আমরা তো সামান্য মাত্র! এই চলচ্চিত্রে নারীকে এমন 'ভোগ্যপণ্য' ও 'কামুক'রূপে আনা হয়েছে একাধিকবার।

ছবিতে কলমি নামের এক নারী চরিত্র রয়েছে। দেখা যায় আখড়ার প্রথম নারী সদস্য সে। এক মুসলমানকে বিয়ে করে সে পালিয়ে এসেছে। তার অভিযোগ লালনের গৌতম ঘোষ কথিত 'দোস্ত' কালুয়া তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে বলেই সে ঐ কাজ করেছে। কিন্তু এরও আগে সে একজন ব্রাহ্মণের স্ত্রী। গৌতম ঘোষের 'আনন্দবাজারে' এসে সেই নারী এমনই কাম তাড়নার শিকার হয় যে সে একবার কালুয়ার দিকে ঝোঁকে তো আরেকবার গভীর রাতে লালনের ঘরে প্রবেশ করে। লালনের যৌনাঙ্গ স্পর্শ করে বলে 'তোমার শরীর জেগে উঠেছে', 'আমার জ্বালা মিটাও গো সাঁই'। এই কলমিকেই আবার লালন পরামর্শ দেন কালুয়াকে 'নারীসঙ্গ' দেয়ার জন্য।

আরেক নারীকে দেখা যায়, বিধবা হওয়ায় যাকে 'সতীদাহ' প্রথায় জীবন্ত পোড়ানো হচ্ছিলো। সেই নারীকে লালন ও তাঁর শিষ্যরা রক্ষা করে এবং কথিত 'আনন্দবাজারে' ঠাঁই দেয়। সেই নারীকে আবার কলমি লালনের কাছে পাঠায়। 'সেবা' করার জন্য। লালন আবার সেই নারীকে সাধনসঙ্গিনী করে দেন তাঁরই শিষ্য দুন্দু শাহ-এর। আখড়ায় আরেক নারীর দেখা মেলে। ইনি গ্রামীণ চেকের জামা পরা নারী বাউল। প্রকৃত নাম বিবি রাসেল। উনার জীবনের এক ট্র্যাজেডির কথা পরিচালক বলেন, এবং সেখানেও যৌনতা, ট্র্যাজেডিটা হলো ব্রাহ্মণের দ্বারা এই নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছিলো। যে মুহূর্তে এই সত্যটা দর্শকের কাছে উন্মোচিত হয়, সেটি যে নিছক হাল্কা ও সস্তা হাততালির জন্য পরিচালক করেছেন তা পরিষ্কার। নয়তো, মোলস্না ও ব্রাহ্মণের সঙ্গে বাহাসে যখন লালন 'কুলিয়ে' উঠতে পারছিলেন না তখন সেই নারী-বাউল ধর্ষণের কথা বলে ব্রাহ্মণের চোখা মুখ ভোঁতা করে দেবে কেন? এরপর লাঠালাঠির দৃশ্যে মোলস্না ও ব্রাহ্মণের হাত ধরাধরি করে পুকুরে নেমে যাওয়ার দৃশ্যটি এতোটাই স্থূল কমেডি যে দেখলে বিরক্তি ধরে যায়।

কথা হচ্ছিলো নারী ও কাম নিয়ে। বাউল ধর্মের যে সাধনা সেটি বাইরের মানুষের পক্ষে বোঝা অতো সহজ নয়। কাম মানুষের প্রবৃত্তি। জীবনকে যুক্ত করে সাধনা করতে হলে, পরমের কাছে পেঁৗছুতে হলে কামকে বাদ দেয়া যায় না। তবে নারী সেই সাধনার 'বস্তু' নয়, 'সঙ্গী'। বাউলদের কাম সম্পর্কিত নানা বিষয় হুট করে বাইরের মানুষের কাছে প্রকাশ হলে ভুল বোঝার অবকাশ আছে। আর তাই, বাউলরা প্রায়ই বলেন, "আপন ভজন-কথা না কহিবে যথা-তথা, আপনাতে আপনি হইবে সাবধান।" এই গোপনীয়তা বাউলরা ধর্মাদেশের মতোই রক্ষা করেন। বাউল গবেষক ভট্টাচার্য আমাদের জানান, তিনি রাঢ়ের বাউলদের মুখে অনেকবার শুনেছেন: "যে জানে না উপাসনা, সে যেন পদ্মলোচনের পদ শোনে না।" (ভট্টাচার্য ১৯৫৩: ৩৬৯) দুঃখের বিষয়, না জেনে ও না বুঝে, উড়ে এসে জুড়ে বসে, 'পদ্মলোচনের পদ' নিজেরা শুদ্ধ শোনেননি, আমাদেরও শোনানো ও বোঝানোর কাজটি করতে চেয়েছেন সুনীল গাঙ্গুলী ও গৌতম ঘোষ। তাঁদের এই লালনকে শুনে এবং বুঝে ভারতের বুদ্ধিজীবী তপন রায়চৌধুরী তো বলেই ফেলেছেন "ছবিটি শ্রেষ্ঠ অর্থে ধর্মগ্রন্থ" হয়ে উঠেছে। (রায়চৌধুরী ২০১০: ৫৪)

'মনের মানুষ' চলচ্চিত্রে জমিদার ও ভূস্বামীদের মিত্র হিসেবে লালনকে প্রতিষ্ঠা করে নিজেদের শ্রেণীচরিত্রই শুধু নয়, আপন ছলচাতুরিকেও প্রকাশ করেছেন ঘোষ-গং। প্রান্তিক মানুষের সম্রাট লালনকে, সাধনার গোপনীয়তাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, যৌনতার মোড়কে যেভাবে তারা উপস্থাপন করেছেন, তাতে লালন পরিণত হয়েছেন পণ্যে, যেভাবে নারীরাও এখানে পণ্য হিসেবে উপস্থাপিত। সমাজে যে ভাষা-বলয় কর্তৃত্ব করছে, যাদের সংস্কৃতি আধিপত্য বিস্তার করে আছে তারই পুন:উৎপাদন এই চলচ্চিত্রে দৃশ্যমান। এখানে শত বছর আগের কুষ্টিয়া ছেউড়িয়ার লালন নাই। এখানে যিনি আছেন, তিনি কলকাতার জমিদার বাড়ির জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের লালন, তিনি বর্তমান সময়ের দুই বাংলার পুঁজিপতিদের লালন।

সহায় : ভট্টাচার্য, উপেন্দ্রনাথ (১৯৫৩), বাংলার বাউল ও বাউল গান, ওরিয়েন্ট বুক কোম্পানি (৩য় সংস্করণ), কলকাতা।

অসহায় : রায়চৌধুরী, তপন (২০১০), মনের মানুষ, দেশ পত্রিকা, ১৭ ডিসেম্বর ২০১০, ৭৮ বর্ষ ৪ সংখ্যা, কলকাতা।

স্মৃতিলেখায় সেলিম আল দীন স্মরণ উৎসব by জাহারাবী রিপন

ৎসব ফুরিয়ে গেলে সে উৎসবের আনন্দ কিংবা আমেজ কিছুই থাকে না। কেবল থাকে স্মৃতির স্নায়ুকোষে জমানো কিছু কথার চিত্রলেখা। কিন্তু তা কখনো আভাষিত আবার কখনো অদৃশ্য দৃশ্যচিত্রের অঙ্কনরেখায় নানা বোধের আবহ সৃজন করে মনে। মুকুরে প্রতিবিম্বিত যেন কোনো ছায়াচিত্র।

দেখা-অদেখার অম্বরে তারকাদলের আলোক বিচ্ছুরণে বিম্বিত করে স্মৃতিপুষ্পের স্বর্ণাভ ছবি। সেতারের সোনালি তারে লেগে থাকা যেন কোনো ধ্রুপদ সঙ্গীতের রেশ_ মনে আনে অপার আনন্দ। স্মরণে-বিস্মরণে স্মৃতিরেখায় তবে কোনো উৎসবের দৃশ্যচিত্র অঙ্কন করি।

ঢাকায় 'সেলিম আল দীন স্মরণ_২০১১'-এর আয়োজন। গত ১৪-১৬ জানুয়ারি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীতে অনুষ্ঠিত হলো। উৎসবে 'এই দোলনচাঁপা বোধের ভেতর থেকে ফুটবে ভোরের ফুল'_এ সেস্নাগান যেন আমাদেরও বোধ ও বুদ্ধিতে অদেখা অক্ষয় কোনো পারিজাতের ভোর সৃজন করে। নাট্যকার সেলিম আল দীনের লেখা থেকে নির্বাচিত হয়েছে এই সেস্নাগান। কেন? হয়তো আমরা তাঁর মতোই দোলনচাঁপা বোধে কোনো নান্দনিক প্রভাত দেখব বলে। লেখকের বা শিল্পীর দেখা ভোর আর আমাদের দেখা ভোরে তফাৎ খানিক তো থাকবেই। একদা সেলিম আল দীন 'গ্রন্থিকগণ কহে' নাটকে বলেন_ 'দাদা, যে দেখে সে লিখে'। মধ্যযুগের আরেক কবি কৃষ্ণরাম দাস বলেন_'যৎ দৃষ্টং তৎ লিখিতং'। কিন্তু এ দেখা তো কবির দেখা। আমাদের দেখা তো মাত্র তাকানো ভিন্ন কিছু নয়। কী বোধে ভোর দেখি_হয়তো দোলনচাঁপা নয়। তবুও ভোর দেখি_হূদয়ে অনুভব করার চেষ্টা করি ভোরের ফুল। এমনি এক ফুলগন্ধী ভোরে ১৪ জানুয়ারি, ২০১১ ঢাকার শ্যামলী বাসস্ট্যান্ড থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশে যাত্রা করি। কেন? নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের তৃতীয় প্রয়াণ দিবসে তাঁর সমাধিতে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন করতে। আমাদের এই যাত্রার ভেতরে যুদ্ধংদেহী কোনো অভিপ্রায়ের উন্মাদনা নেই_আছে কেবল নীরবে সমর্পণের অশ্রু ও পুষ্পাঞ্জলি। শোক এখানে শঙ্কা নয় বরং স্মরণে বোধে দোলনচাঁপা ভোর হয়ে ফোটে। শ্রদ্ধার্ঘ্য_নিবেদনের নয়নচাঁপা।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকে পেঁৗছে আমরা প্রবেশমুখে বাধাপ্রাপ্ত হই। কারণ সেদিন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী দিবসের বিশেষ আয়োজনে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর আগমন নির্ধারিত আছে। তার আগে তো সে সাজানো ফটক দিয়ে আমাদের প্রবেশের প্রশ্নই আসে না। বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উদ্যাপনের সংশিস্নষ্টজনদের তুলনায় আমরা খুব বেশি নই। কিন্তু কম_তাও বলা যাবে না। স্বপ্নদলের প্রায় পঞ্চাশ জন নাট্যকর্মী_তার প্রধান সম্পাদক জাহিদ রিপন এবং আমি। তবে সংখ্যার চেয়ে নিবেদনের উত্তাপে আমরা গণন সংখ্যার অধিক বলতে হবে। অনন্তরে প্রতিগামী পথ পরিত্যাগ করে আমরা অন্য ফটকের পথ ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে প্রবেশ করি। সেখানেও আরেক বাধা। আমাদের বাহন বাসের সম্মুখ দিয়ে স্কুলের ছোট্ট শিশুদের সারিবদ্ধ অভিগমনের পথযাত্রা প্রত্যক্ষ করি। কিন্তু তাতে অভিগমনের দৃশ্য ছাপিয়ে যেন শীত ভোরের কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস আর কুয়াশার শুভ্র সন্তরণ খানিক হলেও প্রকট হয়ে উঠেছে। তা শিশুদের উষ্ণ ধমনীর উদ্দামতাকে কোথাও কাবু করতে পারেনি। হয়তো অভিগমন পথের নির্দেশনাতে শিক্ষকের শাসনের রক্তচক্ষুকে মনে রেখেছে এই শিশুরা। আর তা তো রাখতেই হবে। ছেলেবেলা থেকেই দেখে আসছি_এ যেন নৈমিত্তিকতা। কোথাও কোনো বড় অতিথির আগমন ঘটলেই স্কুলের শিশুদের এমন শীত-গ্রীষ্ম পারায়ে যাবার আমন্ত্রণ আসে। সারিবদ্ধভাবে তাদের শৃঙ্খলা মানতে হয়। কী শীত_কী গ্রীষ্ম! শীতের কুঞ্চন কিংবা গ্রীষ্মের দাবদাহ শিশুদের যেন গায়ে লাগে না। তারা তো আমাদের মতো মানুষ নহে_শিশু!

সে যাই হোক, ক্যাম্পাসে অবতরণের খানিক পরে ডাক এলো_যেতে হবে সেলিম আল দীন সমাধি প্রাঙ্গণে। স্বপ্নদলের নাট্যকর্মী সুকর্নর দেখানো পথে পথে ড্রাইভার বাস নিয়ে সমাধি প্রাঙ্গণে পেঁৗছে গেল। আমরা বাস থেকে নামলাম। নেমেই দেখি_সবেমাত্র নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ, ঢাকা থিয়েটার এবং গ্রাম থিয়েটার পুষ্পাঞ্জলি পর্ব শেষ করে নীরবে স্মরণ পথে দাঁড়িয়ে গেছে। নাট্যবর নাসির উদ্দিন ইউসুফ, পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়, হুমায়ুন কবীর হিমুসহ ঢাকা থিয়েটার ও গ্রাম থিয়েটারের অনেকেই আছেন। আছেন সেলিম আল দীনের সহধর্মিণী পারুল ভাবিও। শোক স্মরণের নীরবতা ভঙ্গ করার দুঃসাহস না দেখিয়ে আমরা সহযাত্রীগণ সকলে সমাধিতে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন করলাম। অতঃপর আমাদেরও একই পরিণাম। খানিক দাঁড়িয়ে নীরব অশ্রুপাত। আর তো কিছু নয়। যিনি বিদেহী্ল_ সশরীরে কথা বলছেন না_তাঁকে নিবেদন ও স্মরণের এই তো পথ। হয়তো নীরবতাও কথা বলার এক বিস্ময়কর মাধ্যম বলতে হবে। আমার সে ভোরে তাই মনে হয়েছে।

প্রয়োজনের তাগিদে হঠাৎ নীরবতা ভঙ্গ করলেন জাহিদ রিপন। তিনি নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু ভাইয়ের কাছে সমাধি প্রাঙ্গণে নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন স্মরণে উৎসর্গীকৃত সঙ্গীত পরিবেশনার অনুমতি প্রার্থনা করলেন। সম্মতি এলো। সি্নগ্ধ বাদন আবহে শুরু হলো সঙ্গীত। প্রথমে 'পুণ্যশেস্নাক হে/ সেলিম আল দীন'_এই গান দিয়ে শুরু হলে মধ্যখানে 'মঙ্গল প্রদীপে পূজিব তোমারে/ আর তো কিছুই জানি না'_সুর-তালের শরণ্য আবাহন শুনতে পেলাম। এবং অবশেষে 'হে মানব ভুবনের মৃত অস্থিপুঞ্জ_ঘুমাও/ ধুলিধূম্র মৃত্তিকার দগ্ধ বক্ষে_নিঃসাড় ঘুমাও'_এই গানটির মধ্য দিয়ে জীবিতের উষ্ণ ধমনীতে মৃতের নিঃসাড় হিম স্মৃতিকণার স্পর্শ অনুভব করলাম। যে নেই তাঁর উদ্দেশে গানের গীতিকথার অমৃত উচ্চারণ_তিনি কি শুনছেন? না শুনলে_হায় এ কী এ ব্যর্থ প্রয়াস! তবুও গাইতে হবে_স্মৃতি ও শোকের অদ্বৈত সম্মিলনে_এই তো নিয়তি। সঙ্গীত পর্ব চুকিয়ে সরে এলাম সমাধি প্রাঙ্গণ থেকে_আবার ঢাকা_শিল্পকলা একাডেমী প্রাঙ্গনে। সেখানে নানা আকৃতির সেলিম আল দীন প্রতিকৃতিতে সাজানো হলো উৎসব প্রাঙ্গণ। প্যানাফ্লেক্সে নাট্যচার্যের প্রতিকৃতির পাশে তাঁরই লেখা নাটক থেকে সকল শোভন উদ্ধৃতি দৃশ্যমান। কোনো কোনো উদ্ধৃতি অন্তরের ভেতরে শরতের রৌপ্যশীর্ষ কাশবনের দোলা নিয়ে জেগে ওঠে_এই তো সেলিম আল দীন! আবার কোনোটি মাঘের হিম শীতে বহে আনা শীত ও দুঃখ-বাস্তবতার ছবি অঙ্কন করে মনে। বাস্তব বোধে জীবনবাস্তবতার চিত্র পৃথিবীর খুব কম শিল্পীর চারুলেখায় অঙ্কিত হয়েছে_এ সত্য তো আমাদের মানতেই হবে। যদি প্রশ্ন করি কালকে_তবে বলবে সে_মহাকাল কজনকে মনে রেখেছে! বলতে দ্বিধা নেই, সেলিম আল দীন মনে রাখার মতো কিছু শিল্পবাণী লিখে গেছেন_তারই স্বাক্ষর তো স্বপ্নদলের প্যানাফ্লেক্সে উদ্ধৃত এই লেখাগুলো। ভাবতে ভালোই লাগে।

সন্ধ্যা প্রায় সমাগত। জাতীয় নাট্যশালার উৎসব উদ্বোধনের স্থান পরিপাটি করে সাজানো হয়েছে। মঙ্গল প্রদীপ অপেক্ষমাণ। একটু পরেই জ্বলবে বাতি। অগি্নহীন পিলসুজের মতো দর্শকবৃন্দও অপেক্ষা করছেন। উৎসবের খানিক অগি্ন ও উত্তাপের আকাঙ্ক্ষায়। কখন অনুষ্ঠান শুরুর উদ্বোধন ঘোষণা হবে। দিবসের উপান্তে দিগন্তরেখার আরক্তিম আভা নিয়ে সন্ধ্যা এলো। রাঙা ভোরের ওপিঠ আলো করে। তখনই স্বপ্নদলের পঞ্চ নাট্যকন্যা_মিতা, লাবণী, পারুল, আলো ও সোনালি দশখানি মঙ্গল প্রদীপ হাতে নৃত্যছন্দে ধীর লয়ে গেয়ে উঠলেন_'পুণ্যশেস্নাক হে/ সেলিম আল দীন/ প্রাচ্যমঞ্চের পার্থ হে তুমি/ নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনঃ'। তাদের পরনে বাসন্তি বরণ শাড়িতে মরিচ পাড়ের সংযোজন_ফুলহাতা লাল বস্নাউজে যেন উৎসবের আবহ বহে এনেছে। প্রয়াণ উৎসবের আয়োজনে রঙের এই বৈপরীত্য যেন খানিক হলেও ভুলিয়ে দেয় বিয়োগ বেদনা। উদ্ধৃত গানের কথার সঙ্গে কৃষ্ণকাঠি, খঞ্জনি, ঢোল, মন্দিরা, করতাল, হারমোনিয়াম, জিপসি, মার্কাস প্রভৃতি সংগত করলো বাদকদল। গানে, বাদ্যে, নৃত্যে স্মরণের এক অভিনব সঙ্গীত যোজনা। ত্রয়ীর ঐক্যতানে পুরো আসর যেন অভিভূত_স্বপ্নদল এক মনোগ্রাহী সঙ্গীত-কোরিওগ্রাফি প্রদর্শন করল। উক্ত সঙ্গীত-কোরিওগ্রাফির মধ্য দিয়ে উদ্বোধক শিক্ষাবিদ ড. মুস্তাফা নূর-উল ইসলাম উৎসব আয়োজনের উদ্বোধন ঘোষণা করলেন। অতঃপর আসরে ও চারিধারে নাট্যকর্মী ও আমন্ত্রিক জনাদের হাতে হাতে শত মঙ্গল প্রদীপের প্রজ্জলন শোভাময় হয়ে উঠল। আনুষ্ঠানিকতা ও উৎসব পরিপূরক সত্তা যেন এক অদ্বৈতের সুতায় বাধা পড়ে গেল। তিনদিন চলবে এই উৎসব।

উদ্বোধনের পরে নাট্যবর নাসির উদ্দিন ইউসুফের আবাহনে মধ্য আসরে এলেন সেলিম আল দীনের সহধর্মিণী বেগমজাদী মেহেরুন্নেসা পারুল, অভিনেত্রী শিমুল ইউসুফ, অভিনেতা রাইসুল ইসলাম আসাদ, নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের সভাপতি ড. আমিনুল ইসলাম, কণ্ঠশিল্পী ফাহমিদা নবী প্রমুখ। কেন? এবার সেলিম আল দীন রচিত ও সুরারোপিত গানের এ্যালবাম 'আকাশ ও সমুদ্র অপার'-এর মোড়ক উন্মোচনের পালা। নাট্যকারের সহধর্মিণী বেগমজাদী মেহেরুন্নেসা পারুল যথারীতি মোড়ক উন্মোচন করলেন। শিল্পী ফাহমিদা নবী অনুষ্ঠান সঞ্চালক বাচ্চু ভাইয়ের অনুরোধে 'আমি যতবার উড়াল মেঘেদের ছুঁতে চাই'_ এ্যালবামের এই গানটি গেয়ে শোনালেন। দ্বিতীয়বার সঙ্গীত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে উৎসবে আরো খানিক আনন্দের মাত্রা যোগ হলো।

অতঃপর সেলিম আল দীনের দুটি নাটকের প্রদর্শনীর আয়োজন। জাতীয় নাট্যশালায় শিমুল ইউসুফের নির্দেশনা ও ঢাকা থিয়েটারের প্রযোজনায় 'ধাবমান' এবং পরীক্ষণ থিয়েটার হলে রিজোয়ান রাজনের নির্দেশনা ও চট্টগ্রামের প্যান্টোমাইম মুভমেন্টের প্রযোজনায় 'প্রাচ্য'-র নির্বাক প্রদর্শন সম্পন্ন হলো। 'ধাবমান' নাটকটি অনাকাক্ষিত মৃতু্য ও হত্যার বিরুদ্ধে এক তীব্র প্রতিবাদ। অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে নির্দেশক দুরন্ত গতি ও আবেগের অহংকারে নিত্য ধাবমান মৃতু্যকে মঞ্চে উপস্থাপনার প্রয়াস পেয়েছেন। উলেস্নখ্য যে, এ নাটকটি ইতঃপূর্বে বার কয়েক দেখার কারণে দ্বিতীয় নাটকটি দেখতে মনোনিবেশ করলাম। কী আশ্চর্য_ 'প্রাচ্য' নির্বাক নাটকেও কুশীলবদের ভাষাময় শারীরিক অভিব্যক্তিতে যেন সবাক দৃশ্যচিত্রের স্বাদ পাওয়া গেল। খুব সুন্দর নাট্যপ্রযোজনা। নাটকটির অন্তিম পর্বে এসে আমি এক নতুন বিষয়ের সংযোজন লক্ষ করলাম। নাট্যকার নাটকে প্রাচ্য মানবীয় বোধে অন্যায়কারীকে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখলেও নির্দেশকের অভিপ্রায়ে তা ভিন্ন বোধের বার্তা বয়ে এনেছে। তিনি এ নাট্য উপস্থাপনায় ক্ষমার চেয়েও প্রান্তিক মানবের অসহায়ত্ব ও শৃঙ্খলিত জীবনায়নের বিষয়কেই প্রাধান্য দিয়েছেন। এরূপ কর্ম-দৃষ্টান্তে মনে হয়_ নবীন নাট্যপ্রজন্ম সেলিম আল দীনকে নানা ব্যাখ্যা ও ভাঙনের মধ্য দিয়ে নবরূপে গ্রহণ করেছে। নাটক দেখে আশান্বিত হলাম।

উৎসবের দ্বিতীয় দিবসের অপরাহ্নে ছিল 'সেলিম আল দীনের নাটকে সংলাপ ও সঙ্গীতের দ্বৈতাদ্বৈতবাদিতা' শীর্ষক সেমিনারের আয়োজন। মূলে প্রবন্ধকার মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলামের উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে শুরু হয় সেমিনার। উক্ত সেমিনারের সভাপতি ও সঞ্চালকের ভূমিকায় ছিলেন নাসির উদ্দিন ইউসুফ। সেমিনারের বিষয়-দৃষ্টে প্রতীয়মান হয় যে, দ্বৈতাদ্বৈতবাদী লেখক হিসেবে সেলিম আল দীনকে অন্বেষণের প্রয়াস এই প্রবন্ধে অন্বিষ্ট হয়েছে।

অতঃপর সন্ধ্যার সমাগমে পরীক্ষণ থিয়েটার হলে মঞ্চস্থ হলো নাট্যকার সেলিম আল দীনের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকথা বিষয়ক প্রবন্ধ অবলম্বনে নাট্যপ্রযোজনা_ 'ফেস্টুনে লেখা স্মৃতি'। পরিবেশনায় স্বপ্নদল। সফল মঞ্চরূপকার জাহিদ রিপনের নিবিড় পরিচর্যায় নির্মিত এ নাট্যে নির্দেশনার দায়িত্ব পালন করেন সামাদ ভুঞা ও রওনক লাবণী। এ নাট্যপ্রযোজনার মধ্য দিয়ে নাট্যকার সেলিম আল দীনের আরেক পরিচয়_ মুক্তিযোদ্ধা এবং অনন্তরে তাঁর প্রবন্ধ থেকে নাট্যরূপের বিনির্মাণের সম্ভাবনায় যেন দ্বৈতাদ্বৈতবাদী আরেক সেলিম আল দীনকে আমরা আবিষ্কার করি। নাটক শেষে উক্ত নাটকের নাট্যরূপকার হিসেবে মঞ্চে আমার ডাক এলো। মঞ্চে আরো এলেন পারুল ভাবি এবং নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু ভাই। উলেস্নখ্য যে, এ নাট্য সেলিম আল দীনের আজীবন শিল্পসঙ্গী নাসির উদ্দিন ইউসুফকে উৎসর্গ করা হয়েছে। নাটক দেখে তিনি মঞ্চ-উপস্থাপনার পাশাপাশি দুই বন্ধুর মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ ও অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বললেন। সেও তবে আরেক স্মৃতিকথার গন্ধ বিলোপন করে মনে। দর্শকবৃন্দ তন্ময় হয়ে শ্রবণ করেন। অতঃপর বিরতি এবং তারপরে নির্দেশক জাহিদ রিপন স্বপ্নদলের পরিবেশনায় এদিন উৎসবে দ্বিতীয় নাট্যপ্রযোজনা 'হরগজ' দেখার আমন্ত্রণ জানান সকলকে।

'হরগজ' নাটকের কাহিনী-পটে প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিনাশী ভুবনকে বিশ্ব ভাঙনের সমান্তরালে উপস্থাপনের চেষ্টা করেন নাট্যকার। তরুণ নির্দেশক জাহিদ রিপন তা অত্যন্ত সতর্ক ও সহমর্মিতায় মঞ্চে আনতে সমর্থ হয়েছেন বলতে হবে।

সেদিন দ্যাশ বাংলা থিয়েটার স্টুডিও থিয়েটার হলে সেলিম আল দীন রচিত 'জুলান' নাটক মঞ্চায়ন করে। উলেস্নখ্য যে, দীর্ঘকাল পূর্বে রচিত হলেও দলটি প্রবীর গুহের নির্দেশনায় এই প্রথমবারের মতো নাটকটি মঞ্চে আনলেন। এজন্য অবশ্যই তাদের ধন্যবাদ প্রাপ্য।

উৎসবের তৃতীয় দিন সন্ধ্যায় স্টুডিও থিয়েটার হলে সেলিম আল দীনের রচনা থেকে চমৎকার পাঠ করে কথা আবৃত্তি চর্চা কেন্দ্রের সদস্যরা। এ দিনে সেলিম আল দীন রচিত দুটি নাটকের একটি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ এবং অপরটি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী মঞ্চায়ন করে। প্রথমোক্তটি 'কেরামতমঙ্গল' নাটকের নির্দেশক রেজা আরিফ এবং দ্বিতীয়টি 'পুত্র' নাটকের নির্দেশক মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন। দুজনই নবীন নির্দেশক। 'পুত্র' নাটক দরশনে বাঙালি প্রান্তিক দম্পতির পুত্র হারানোর বেদনা আমাকেও যেন সমান বেদনাবিদ্ধ করে। রচনা ও নির্দেশনার যুগল সম্মিলনেই হয়তো তা সম্ভব হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী ও নির্দেশককে অভিনন্দন। নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ এবং নির্দেশক রেজা আরিফকেও অভিনন্দন। কারণ 'কেরামতমঙ্গল'-এর মতো একটি বিশাল ক্যানভাসে রচিত নাটককে মঞ্চের সীমিত পরিসরে উপস্থাপনা তো কম কথা নয়।

এদিন উৎসবের উপান্তে এসে স্বপ্নদলের কথা আবারও বিশেষভাবে বলতে হয়। উৎসবের শুরুতে এবং শেষে তাদের সঙ্গীত পরিবেশনা মনে রাখার মতো। নাটক সমাপনান্তে স্বপ্নদল পরীক্ষণ থিয়েটার হলের লবিতে শুরু করে সঙ্গীত পরিবেশনা। কিছুক্ষণ। অতঃপর নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু ভাইয়ের আহ্বানে সাড়া দিয়ে লবি থেকে সঙ্গীত সহযোগে নিচে নেমে আসে। সেখানে আরো কিছুক্ষণ সঙ্গীত। এরপর বাচ্চু ভাই উৎসব সমাপ্তি ঘোষণার মধ্য দিয়ে পুনরায় স্বপ্নদলকে সঙ্গীত পরিবেশনে আবাহন করেন। স্বপ্নদল 'মঙ্গল প্রদীপে পূজিব তোমারে/ আর তো কিছুই জানি না'_ এই সঙ্গীত পরিবেশনার মাধ্যমে আবারও নাট্যগুরু সেলিম আল দীনকে স্মরণ করেন। স্বপ্নদলের বছরব্যাপী পরিকল্পিত উৎসবের সেস্নাগান 'স্মরণে নাট্যভাষে নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন' যেন আরো একবার আমাদের মনে অজ্ঞাতসারেই প্রবেশ করে।

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ, ঢাকা থিয়েটার এবং বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার-এর যৌথ আয়োজনের এই সফল উৎসবের স্মৃতিলেখা এখানেই শেষ করছি।

আত্মজীবনীর পাণ্ডুলিপি থেকে

মর একুশে গ্রন্থমেলা-২০১১তে প্রকাশিত হবে কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকের আত্মজীবনীর দ্বিতীয় অংশ 'উঁকি দিয়ে দিগন্ত'। বইটি প্রকাশ করেছে ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ। প্রচ্ছদ করেছেন সমর মজুমদার। বইটির দাম রাখা হয়েছে ২৪০ টাকা। ইত্তেফাক সাময়িকীর পাঠকদের জন্য এখানে বইটির চুম্বক অংশটুকু ছাপা হলো।

বলা আমাকে মাটিতে নামিয়েছে কি নামায়নি, ঝড়ের মতো দাশুমাস্টার এসে ঘরে ঢুকলেন। ঠিকমতো আলোগুলো জ্বালানো হয়নি। কোনো দিকে না চেয়ে দাশুমাস্টার বললেন, এই, তোরা দু-ভাই আমার সঙ্গে আয়। আর তোরা সব সোজা বাড়ি চলে যা।

আমাদের হারিকেনের বাতি একদম কমানো। মাস্টারমশাইয়ের পিছু পিছু আমরা দু-ভাই হাঁটছি। চাঁদ নেই, অন্ধকারটা চোখে সয়ে আসছে। কাত্যায়নী ঠাকরানির মাটির বাড়িটা এদিকের শেষ হিঁদুবাড়ি। ঠাকরানি বহুদিন দেশছাড়া, বাড়িটা ফাঁকা পড়ে আছে। ওই বাড়ির পরেই খোনা ফকিরের দোকানের পাশ দিয়ে শিবতলার দিকে যাওয়ার গলিরাস্তাটা, তার পরেই মোসলমানপাড়ার শুরু আর শুরুতেই আমাদের ফাঁকা নতুন বাড়ি। এই বাড়িটা বাবা কিনেছিলেন বিনোদবাবুর কাছ থেকে। সেজন্য এখনো ওটা বিনোদবাবুর বাড়ি। আমরা পুরনো বাড়িতেই থাকি। এ বাড়িটা পড়ে আছে খালি। একটা পেয়ারা গাছ, দু-কোণে দুটো ডুমুরগাছ। গাধাপুইনি, কাঁটানটে আর ঘাসেভরা বাড়িটা। কাছে আসতেই দেখি দেয়াল ঘেঁষে ঠিক কোণের কাছটায় অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। মানুষগুলোকে আবছা দেখা যাচ্ছে। কারা আছে, কে আছে বোঝার উপায় নেই। একজন একটু কাছে এগিয়ে এল, দেখলাম শ্রীধর কাকা, তার হাতে একটা পাঁঠা কাটার টাঙি। একবার যেন মনে হল, খোনা ফকিরের বড় ছেলে শঙ্করীদা আর বোধহয় আগুরিদের বেন্দাবনদাকে দেখলাম। সবারই হাতে কিছু-না-কিছু আছে, লাঠি, হুড়কো, বগি_এইসব।

একজন হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল, কে যায়, মোলস্নাদের ছেলে দুটি? দাশুমাস্টার কথা বলে উঠলেন। গলা নয় যেন শানানো ইস্পাত, খবরদার, আমার ছাত্তর ওরা। আমি ওদের বাড়িতে পেঁৗছে দিয়ে আসি।ঃএইখানেই ওদের ছেড়ে দাও মাস্টার, আর এগিয়ো না। মোচনরা সব ওদের আস্তানায় জড়ো হয়েছে।ঃসে আমি দেখছি, দাশুমাস্টার বললেন।

শুকনোর দিনে ধুলোভরা রাস্তায় পা ডুবে যাচ্ছে। এইটুকু রাস্তা, মনে হচ্ছে অনেক দূর। আস্তানায় এসে দেখি সারা মোসলমানপাড়ার মানুষ সেখানে জড়ো হয়েছে। একদিকে রাস্তার ইটের ভাঙা মিনার, তার মাথায় পাকুড়গাছের চারা আর একদিকে ফাঁকা উঠোনের মতো জায়গা। সেখানে আমরা হা-ডু-ডু, হিঙেডারি খেলি, মাদার মহররম সব সেখানেই শুরু হয়। জায়গাটা এখন মানুষে ভরা। সবার হাতেই বাঁশ, লাঠি, একটা-দুটো কিরিচ। লাঠিওয়ালারাই বেশি। মোসলমানপাড়ার বাকি নেই কেউ; শুধু বাবা, নাজিরবক্স চাচার বুড়ো বাপ_এরকম কয়েকজন নেই। এমনকি লতিফ চাচার মতো আধবয়েসি মানুষটাও কোঁচরভর্তি কি কি নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। দাশুমাস্টার একেবারে ভিড়ের মধ্যে ঢুকে বললেন, এই শোনো তোমরা, মোলস্নাবাড়ির ছেলে এই দুটি আমার কাছে পড়তে যায়। ওদের দিয়ে গেলাম। কেউ কোনো কথা বলল না। যা, এখানে দাঁড়াস না, বাড়ি চলে যা, এই বলে মাস্টারমশাই নিজের বাড়ির দিকে ফিরলেন। কেউ একটি কথাও বলল না। ধুলোভরা সাদা অাঁধারে দাশুমাস্টার একবারে মিলিয়ে গেলে একজন বলে উঠল, কপাল ভালো মাস্টারের, ভালোয় ভালোয় ফিরে গেল!

মনে হল, মোসলমানপাড়ার সবাই এসেছে। তবে মোটমাট ক-টাই বা লোক? সবসুদ্ধ এক শ' হয় কি না! লাঠি ঠুকতে ঠুকতে লাফিয়ে বেড়াচ্ছে মলিস্নকবাড়ির ফকির চাচা। তার ডান পায়ের বুড়ো আঙুলে খুব খারাপ একটা পচা ঘা। ওই ঘা বহুকাল ধরে শুকোয়নি। পানসে রক্ত গড়িয়ে পড়ে সেখান থেকে। হাড়-মাংস খসে পড়েছে, আঙুলটার আর সামান্যই বাকি। লোকে বলে কুঠ্ হয়েছে। খোঁড়াতে খোঁড়াতে কাছে এসে আমাকে দেখে বলল, কি বলব বাপ, আলস্না মেরে রেখেছে, নাইলে ওই কটা হিঁদু মালাউনকে এক লাপটেই সাবড়ে দেতম। লতিফ চাচা কোঁচড়ে কি নিয়ে যেন ঘুরছে, একজন বলল, বালি, সামনা সামনি হলেই হিঁদুগুনোর চোখে বালি ছুঁড়ে একদম কানা করে দেওয়া হবে, তারপর পিটিয়ে, ঠেঙিয়ে কিংবা কুপিয়ে কুপিয়ে মারো কেন আরাম করে। শুনলাম খবর দেওয়া হয়েছে সেই লেঠেলদের গাঁ ধারসোনায়, আসছে তারা সব। অবশ্যি হিঁদুরাও তাদের হিঁদু-গাঁ ক্ষীরগাঁয়ে খবর দিয়েছে। ভয়-পেদো হিঁদুরা আসবে কি-না কে জানে। মোসলমানপাড়া ঢোকার মোড়ে মোড়ে আড়াআড়ি করে গরু-মোষের গাড়ি রেখে দেওয়া হয়েছে। ওইসব পেরিয়ে আসতে আসতেই তাদের খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মারা হবে। ভারি মজা! গাঁয়ে শুধু হিঁদু আর মোসলমানরা আছে! ওহিদ চাচা, বঁ্যাক চাচা, ননু কাকা, ভুতো কাকা, মোবাই শেখ, মনবশ চাচা, ষষ্ঠীদা, পঞ্চাদা, পঞ্চা হাড়ি, চক্কোবত্তি মশাই, আশু ভশ্চায্যি, রাম সামন্ত_এরা কেউ নেই। কোনোদিন ছিলও না। শুধু হিঁদু আর মোসলমান আছে!

পণ্ডিতমশাই বলে গেলেন, আগে বাড়ি যা, কোথাও দাঁড়াবি না। এতক্ষণ আমরা দু-ভাই বোকার মতো ঘোরাঘুরি করছিলাম, শেখদের বাড়ির নাছ-দুয়োরের পাশের গলি দিয়ে বাড়ি যাব, শুনতে পেলাম, ও-বাড়ির একটা ঘর থেকে কে যেন চেঁচিয়ে মেদিনী ফাটাচ্ছে। দুয়োর খুলে দে, খুলে দে বলছি, এই মা, হারামজাদি, দুয়োর খোল্, মালাউনের বংশ রাখব না, একবার ছেড়ে দে খালি। খুলবি না? এই ভাঙলম দুয়োর! দুমদাম শব্দ আসতে লাগল। ঘরে কিবরিয়া আটক আছে। ও কেমন খেপা সবাই জানে, মহররম খেলতে গিয়ে মানুষ খুন করার জোগাড় করে, মাদার নাচাতে গিয়ে একেকটা বাড়ি লণ্ডভণ্ড করে দেয়। ও ছাড়া থাকলে এতক্ষণে রক্তগঙ্গা বয়ে যেত।

ভাত দেওয়ার সময় ফুফু একটি কথা বলেনি। আমরা সবাই মাথা নিচু করে খাচ্ছিলাম। রাত খুব তাড়াতাড়ি নিশুতি হয়ে যাচ্ছিল বলেই বোধহয় আস্তানা আর বিনোদবাবুর বাড়ির কোণ থেকে হলস্না-চিৎকার অনেক স্পষ্ট শুনতে পাওয়া যাচ্ছিল। এমনকি দু-চারটে কথাও শোনা যাচ্ছিল। ভাতঘর থেকে বেরিয়ে কোনো চাচাকেও দেখতে পেলাম না। জানি না কেউ কেউ আস্তানায় গিয়েছে কিনা।

ঘরে আজ অন্ধকার নীল ফোঁটাটা নেই। আলোই জ্বলছিল। বাবা বিছানার ওপর বসে। মা-ও ঘরে। দেয়ালে একনলা বন্দুকটা ঠেস দিয়ে রাখা, ফ্লুট বাঁশিটা একই জায়গায় রয়েছে, ভেসিলিন-মাখানো খাঁড়াটাও দেয়ালে টাঙানো। বাবা মাকেই বলছিলেন, সন্ধেবেলায় ওবেদ শেখ তার দলিজে বসে ছিল। মোসলমানপাড়া থেকে হিঁদুপাড়ার দিকে গরুর গাড়ি যাওয়ার রাস্তা সে বন্ধ করে দেবে। ওর গোয়ালের একদিকের কোণের দেয়াল গাড়ির চাকার ধাক্কা লেগে বারবার ভাঙছে বলে সে ওপথে গাড়িই যেতে দেবে না। দেয়ালের কোণে একটা খুঁটো পুঁতে দিলেই তো দেয়াল বাঁচে! ক-বার নাকি তেমন খুঁটো পুঁতেছিল, কারা উপড়ে দিয়েছে। সে তাই রাগ করে একটা খুঁটো দিয়েছে দেয়ালের কোণে আরেকটা রাস্তার ঠিক মাঝখানে। এটা সে করতে পারে না, সরকারি রাস্তা তো তুমি বন্ধ করতে পার না! এদিকে রামযুক্ত হাজরার গরুর গাড়ি আসছিল কয়লাটয়লা নিয়ে। হিঁদুপাড়ার রাস্তায় কাদা, সে মোসলমানপাড়া দিয়ে যাবে। রাস্তার খুঁটো দেখে তার মেজাজ খারাপ। ওবেদ তো বসেই ছিল দলিজে, রামযুক্তটা গোঁয়ার, সে তাকে কোনো কথা না বলে রাস্তার মাঝখানের খুঁটোটা উপড়ে ফেলল। বেশ, তাই কর্, খুঁটোটা উপড়ে ফেলে চলে যা, তা না, সে দেয়ালের কোণের খুঁটোটাও তুলে ফেলে দিল। ওবেদ নিজে উঠে এসে রামযুক্তর ঘাড় চেপে ধরল, রামযুক্ত, এই তোর গাড়ি আটকে দেলাম। দেখি তুই কেমন বাপের ব্যাটা, গাড়ি নিয়ে যা দেখি। বোধহয় কিবরিয়া আশেপাশে ছিল, সে এক ছুটে এসে রামযুক্তের গলা ধরে ঝুলে পড়েছে। লেগে গেল ঝটাপটি। রামযুক্ত আমার সঙ্গে যাত্রায় সং-এর পার্ট করত, আমি জানি তার গায়ে খুব বল। এক ঝটকায় কিবরিয়াকে ঝেড়ে ফেলে সে শুধু বললে, গাড়ি যেতে দিবি না? গাড়ি যেতে দিবি না? এই থাকল গাড়ি, যাচ্ছি আমি। শালার নেড়ের খুব বাড় বেড়েছে। শালাদের পাড়া জ্বালিয়ে দোব আজ। এই বলে গাড়ি ওইখানেই রেখে রামযুক্ত চলে গেল। এখন গাড়ি মাঝখানে_এদিকে মোসলমানরা, ওদিকে হিঁদুরা। আমি জানি একটা কিছু ঘটবেই। বাতাসভরা বিষ। নিঃশ্বাস সবাইকেই নিতে হচ্ছে। বিষ ঢুকবে না?

মোস্তফা নূরুজ্জামানের বই 'স্নেহ-প্রীতি-ভালোবাসার ডালি'

Monday, January 31, 2011

ব্যতিক্রমধর্মী ও ভিন্ন আমেজের কবিতার বই মোস্তফা নূরুজ্জামানের 'স্নেহ-প্রীতি-ভালোবাসার ডালি'। তিনি যা ভালোবেসেছেন, তাই ধরে রাখতে চেয়েছেন কাব্যিক আঙ্গিকে। অমর একুশে বইমেলা ২০০৯-এ প্রকাশিত হয়েছিল তার এই দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থটি।

চাকরি জীবন থেকে অবসর নিয়েছেন তিনি বছর পাঁচ আগে। ষাটোর্ধ এই তরুণ কবি নিজস্ব প্রাণ-বন্যায় ভাসেন এবং ভাসান সকলকে। বিয়ে-শাদী-জন্মদিন ও স্মরণীয় মুহূর্তকেন্দ্রিক তাঁর এই কবিতাগুলো উৎসব আনন্দের স্বভাবজ প্রকাশ। তিনি অনন্য তাঁর নাতি-নাতনি তথা শিশু-প্রীতিতে। বইটি উৎসর্গও করেছন তাঁর কাঁচা-পাকা নাতি-নাতনিদের। বিষয় ও বৈচিত্র্যের বিন্যাসে তাঁর কবিতার স্বাদ পাঠককে আমোদিত করবে। লেখক বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠানে সময়োপযোগী কাব্য, অনুকাব্য ইত্যাদি লিখে দিয়ে প্রয়োজনে তা ফ্রেমে বেঁধে উপহার দিয়েছেন তাঁর প্রিয়জনদের। এসব অনুকাব্য-কাব্য প্রশংসিত হতো সবার কাছে। কিন্তু প্রথমদিকে তিনি এসব কাব্য-অনুকাব্যের কপি নিজের কাছে রাখেননি। তাঁর বন্ধু-বান্ধব-সুহূদদের অনুরোধে সামপ্রতিককালে লেখকের কিছু কবিতা, প্যারোডি গান, ধামাইল গান, আশীর্বাদ বাণী ইত্যাদি নিয়ে প্রকাশ হয়েছে এ বইটি।

বইটির প্রথম কবিতাটি চন্দ্রঘোনাস্থ চম্পাকুঁড়ি খেলাঘর-এর সদস্যদের উদ্দেশ করে লিখেছেন_'তোমরা যারা চম্পাকুঁড়িরা / হয়েছো আজ জড় / দুদিন পরে তোমরাইতো/ হয়ে যাবে বড়।' স্নেহসিক্ত নাতির জন্মদিন উপলক্ষে কবি লিখেছেন_'পূর্ণ শশীর আলোতে যেমন ধরা ঝলমল, / তোমার ব্যক্তিত্ব হোক তেমনি সমুজ্জ্বল।' এরকমভাবে অনেক কবিতাই বিভিন্ন উৎসব-অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে লেখা। সুন্দর অলঙ্করণে ছাপানো এ কবিতার বইটি প্রকাশ করেছে উৎস প্রকাশনী, প্রচ্ছদ এঁকেছেন বিমান তালুকদার, বইটির দাম আশি টাকা।

ইত্তেফাক সাময়িকী ২১ জানুয়ারি সংখ্যার পাঠপ্রতিক্রিয়া

ত্তেফাক সাময়িকী ২১ জানুয়ারি সংখ্যার মূল আয়োজন ছিল নির্বাচিত দশ কবির বইমেলায় প্রকাশিতব্য কবিতার বই থেকে দশটি কবিতা। নির্বাচিত কবিরা হলেন_মুজিব মেহেদী, টোকন ঠাকুর, আশরাফ রোকন, মজনু শাহ, আপন মাহমুদ, মামুন খান, পিয়াস মজিদ, নওশাদ জামিল, বিজয় আহমেদ ও নির্লিপ্ত নয়ন।

এ বিভাগ সম্পর্কে 'আয়োজনটি সুন্দর' বলে প্রথম মন্তব্যটি করেন শামীম আজাদ। এরপরের মন্তব্য মোহাম্মদ নূরুল হকের। মজনু শাহ-এর কবিতা সম্পর্কে তার মূল্যায়নধমর্ী মন্তব্য, 'মৃতু্য' কবিতাটিতে ক্রমবিবর্তমান মানব আচরণ ও প্রাপঞ্চিক ধারণার পরিবর্তনীয় বিষয়ের স্বীকৃতি রয়েছে। এখানে কবি একই সাথে প্রপঞ্চের স্রষ্টা ও দ্রষ্টা। পিয়াস মজিদের কবিতা 'রূপনারাণ' সম্পর্কে তার মত, 'কবিতায় পঙক্তিকে প্রবচনীয় মর্যাদা দানের ক্ষেত্রে তার চেষ্টা মুগ্ধকর। ভাবনায় তাকে রবীন্দ্রনাথের মানসসঙ্গী বলেই ধরে নিয়েছি। প্রকাশে তার স্বাতন্ত্র্য আমাকে মুগ্ধ করেছে। এখানেই কবির বিশিষ্ট হয়ে ওঠার সোপান। এভাবেই কবি অগ্রজকে আত্মস্থ করে হয়ে ওঠেন নিজেও স্বতন্ত্রস্বর। আনোয়ার শাহাদাতের মন্তব্য, 'সাধারণ উদ্যোগ। তার চেয়েও অসাধারণ কবিতাগুলো।' এরপরের মন্তব্য প্রদানকারী সৈয়দা আমিনা ফারহিন। তার অনুভূতি, 'হাইরাজ ঘেঁষে আসা ফাটকা বাতাস যখন বীথিটার চুল নিয়ে খেলছিল, অদূরেই প্রান্তরে দাঁড়ানো একলা গাছের নিচে দেশলাইয়ে বিড়ি ধরাতে আমি প্রাণান্ত ছিলামঃ',_মুজিব মেহেদীর অাঁকা ছবিটা চোখে লেগে আছে। টোকন ঠাকুরের 'অসম্ভব সম্ভবত সম্ভব হয়ে ওঠার আগ পর্যন্তই অসম্ভব' লাইনটা পড়ে বিস্ময়ে চোখ ঠিকরে আসছে। আবার 'হতে পারে পাখি বা পালক ছিলাম/হঠাৎ খেয়াল করি, আমার কল্পিত ডানায় রোদ বৃষ্টি ধূলোরাই/ ভুল করে ৪১ না লিখে লিখে দিচ্ছে ১৪ বছর' অসাধারণ। মজনু শাহের 'কেনবা একটা করে বেড়াল বসে থাকতে দেখি সমস্ত অধ্যায় শেষে' গায়ে কাঁটা লাগিয়ে দিচ্ছে'। আশরাফ রোকনের 'পোকাদের সংসারে বোকা হয়ে আছি', পিয়াস মজিদের 'ফিরে ফিরে রোববার ঘণ্টা/ কনফেশন। এত হিমমেঘলা স্মৃতি সন্ধ্যা', বিজয় আহমেদের 'বোনরে আমি হারতে চাই নাই। নিমপাতা আনতে গিয়েই দেখা হলো তেঁতুল তলার ভুত্নীর সাথে', নওশাদ জামিলের 'প্রাচীন অক্ষরগুলো ভেসে ভেসে জানিয়ে দিয়েছ/ ভবিতব্যরেখা। জানি ডায়েরির শেষ পৃষ্ঠাটিই/ শেষ নয়, শুরু', লাইনগুলো উলেস্নখ করে ভাল লাগার কথা জানিয়েছেন। আবার নির্লিপ্ত নয়নের 'আমার ঘরটি গভীর হতে হতে একমুষ্টি রাত ঢুকে পড়লো' পড়ে বিষণ্নতায় ঘরটাই ভেসে যাচ্ছে বলে অনুভূতি ব্যক্ত করেন। মামুন খানের 'ঢেউ ছেড়ে জল-কাদা মল ছেড়ে/ হূদয়ের পাড়ে এসে যখন দাঁড়াও/ মনে হয়, এই প্রথম দেখছি- ভোরের পৃথিবী'কে বলেছেন বড় সি্নগ্ধ। আপন মাহমুদের 'অথচ তার মুখের দিকে/ তাকিয়ে কখনোই মনে হয়নি জীবনে একটাও প্রজাপতি তার/ খোঁপায় বসেছে' কে বড্ড গভীর বলে উলেস্নখ করেছেন। সে সঙ্গে আয়োজন সম্পর্কে অনুভূতি ব্যক্ত করেন অসাধারণ একটা কালেকশন বলে। আলতাফ হোসেন 'খুব ভালো উদ্যোগ' বলে তার অনুভূতি ব্যক্ত করেন।

'লিটল ম্যাগাজিন আর ব্যবসা এক সঙ্গে হয় না' শীর্ষক আব্দুলস্নাহ আবু সায়ীদের সাক্ষাৎকারের উপর প্রথম মন্তব্যটি মোহাম্মদ নূরুল হকের। তার মতে, আব্দুলস্নাহ আবু সায়ীদের সাক্ষাৎকারের উত্তরগুলো শতভাগ সত্য। সে সাথে এও সত্য, লিটলম্যাগ কখনো কোনো যুগের দাবি মেটায় না, নতুন যুগের সৃষ্টি করে। আব্দুলস্নাহ আবু সায়ীদ সম্পাদিত কণ্ঠস্বর যুগের দাবিতে সৃষ্ট একটি কাগজ। যে কাগজ বৈশ্বিক স্রোতের টানে স্বদেশেও একটি স্রোত সৃষ্টির স্বপ্ন দেখেছিল মাত্র। তাই তার কাগজ কোনো যুগ সৃষ্টিতে সমর্থ হয়নি। কথাগুলো তার মুখ থেকে শুনতে পারলেই তার সাহিত্যপ্রেম ও আন্তরিক সততার সাক্ষর পেতাম।' এরপর সাবরিনা আনাম উলেস্নখ করেন, 'সাক্ষাৎকারে তাঁর চিরায়ত পরিশীলিত রুচি ও আদর্শিক চেতনা নিয়ে হাজির হয়েছেন। লিটলম্যাগের বৈশিষ্ট্য সনাক্ত করতে গিয়ে পক্ষান্তরে তিনি লিটলম্যাগ সম্পাদক-লেখকদের জন্য পথ নির্দেশ করেছেন।' জালাদী রায়, 'বরাবরের মতো আব্দুলস্নাহ আবু সায়ীদ এখানেও হূদয়গ্রাহী' বলে নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করেন।'

একমাত্র গল্পের নাম 'যাপিত জীবন'। লেখক একরামুল হক শামীম। গল্পটি সম্পর্কে মোহাম্মদ নূরুল হক অনুভূতি ব্যক্ত করেন এভাবে, 'খুব সাধারণ ও প্রথাগত একটি গল্প। সংলাপ রচনায় দৌর্বল্য নবিশি গল্পকারদের প্রাথমিক প্রচেষ্টার কথা স্মরণ করিয়ে দিলেও চিরকালীন অনুভবকে সম্মান দেখানোর জন্য গল্পকারকে ধন্যবাদ দিতেই হয়।' ফাতেমা আবেদীন নাজলা, মোহাম্মদ নূরুল হককে উদ্দেশ করে বলেন, 'এই লেখাটা আমার খুব প্রিয় একটা লেখা। এই গল্পটি পড়তে গিয়ে কোথাও থামতে হয়নি। এটাই একটা গল্পের বড় যোগ্যতা হতে পারে।'

এ সংখ্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন ছিল মনির ইউসুফ রচিত 'পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতে : দ্বিতীয় দরিয়ানগর কবিতামেলা'। প্রতিবেদনটি সম্পর্কে প্রথম মন্তব্য পাওয়া যায় মোজাফফর হোসেনের। তিনি উলেস্নখ করেন, 'ভালো লাগলো। কবিতা মেলায় থাকতে পারলে আরো ভালো লাগতো।' এরপর মোহাম্মদ নূরুল হক সংশয়সূচক মন্তব্যটি করেন। তার মতে, 'এই উদ্যোগ ভালো। কিন্তু তিনশ কবির মিলনমেলা উলেস্নখ করায় খটকা লাগলো মনে। ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার মতো যদি ঘরে ঘরে কবিতার রচনা হিড়িক পড়ে তো কবির ভিড়ে পাঠকের শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মৃতু্যবরণ করার ঘটনা ঘটলেও অবাক হবার কিছু থাকবে না।' কবি মুহম্মদ নূরুল হুদার আপাতত সরল মন্তব্যের প্রতিউত্তরে মোহাম্মদ নূরুল হকের স্বরে ঝরে পড়ে কিছুটা বক্রোক্তি, 'ঝাঁকে ঝাঁকে পুঁটি থেকে রুই-কাতলা বের হতেতো কখনো শুনিনি। রুই-কাতলা ঝাঁকে ঝাঁকে চলে না, কবিরাও না। কবির প্রকৃত আরাধনা একার সন্ন্যাসে। প্রকৃত কবি মাত্রই নিভৃতচারী। হাত তুলে শপথ করা কবির কাজ নয়। কবি পাপপুণ্যে বিশ্বাসী নন, তাই তার শপথবাক্য উচ্চারণও অর্থহীন।' এ মন্তব্যের বিপরীতে মুহম্মদ নূরুল হুদার প্রতিউত্তর, 'এক পাতায় ১১জন কবির কবিতা ছেপেছে ইত্তেফাক সাময়িকী। সব কবিতাই আমার কাছে সুপাঠ্য বলে মনে হলো।' এরপর সৈয়দ সাইফুর রহমান সাকিব বলেন, 'এ মহতী উদ্যোগের প্রয়াস আরো ব্যাপক আকারে হওয়া উচিত'। ফেসবুকে এ মন্তব্য, প্রতিক্রিয়া চলে মঙ্গলবার বেলা ১১টা পর্যন্ত। এরপর মন্তব্য-প্রতিক্রিয়াগুলো গ্রন্থনা শুরু হয়। উলিস্নখিত বিভাগগুলো ছাড়াও প্রতিক্রিয়ার বিভাগ নিয়ে ইতিবাচক মন্তব্য করেন মোজাফফর হোসেন।

স্বপ্নভাষার অনুধাবন by মোবাশ্বির আলম মজুমদার

য়নরত মানুষের আবক্ষ শরীর দুই হাতে ধরা বই। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েন বই পড়তে পড়তে আর চলে যান স্বপ্নের দেশে। এভাবেই আয়ারল্যান্ডের শিল্পী এরিন কুইন তাঁর স্বপ্ন বিষয়কে উপস্থাপন করেছেন। নানান দেশের স্বপ্নবান শিল্পীরা তুলে ধরেছেন তাদের বিষয়গুলোকে এভাবে।

দৃক আর পাঠশালা ইনস্টিটিউট অব ফটোগ্রাফির আয়োজনে নগরীর সাতটি ভেনু্যতে এ প্রদর্শনী একযোগে চলছে। বিশ্বের ২৯টি দেশ এ আয়োজনে অংশ নিয়েছে। এবারের ছবি মেলার মূল প্রতিপাদ্য বিষয়_'স্বপ্ন'।

মানব মনের বিচিত্র ভাবনা, নানান দেশের মানুষের চেতনা, প্রকৃতি, পরিবেশ, সংগ্রাম, সাহসী মানুষের মুখ উঠে এসেছে এ প্রদর্শনীতে। বাংলাদেশ, মেক্সিকো আর নাইজেরিয়ার তিন আলোকচিত্রী প্রয়াত নাইবউদ্দিন আহমদ, পেদ্রো মেয়ার এবং জে ডি ওখাইওজেইকেরেকে আজীবন সম্মাননা প্রদানের মাধ্যমে প্রদর্শনীর যাত্রা শুরু হয়।

আয়ারল্যান্ডের শিল্পী এরিন কুইন তাঁর স্বপ্ন ভাবনাকে প্রকাশ করেছেন এভাবে_যখন কোনো ব্যক্তি বেঁচে আছেন কিন্তু ঘুমন্ত তখন তার স্বপ্ন বিছানায়_শান্ত হয়ে বিশ্রামরত। বাহুবন্দি হাতের নিচে তখন আপন স্বপ্ন তার জন্য অপেক্ষা করে। বিভিন্ন বয়সী মানুষের শয়নরত অবস্থানকে স্বাপি্নক একরঙা উপস্থাপনে শিল্পীর স্বপ্নের প্রকাশকে ব্যক্ত করে। আবছা আলোয় ঢেকে যায় শিশুমুখ। লরেন্স লেবলানক এসেছেন ফ্রান্স থেকে স্বপ্নকে এভাবে নিয়ে। স্বপ্ন বলতে ধূসরতা মনে হলেও তিনি ভেবেছেন প্রকৃতিতে মানুষের পাশাপাশি আকাশ, গাছ, মাটি, প্রকৃতির তাবৎ অনুষঙ্গও স্বপ্নে জড়িয়ে পড়ে। তাঁর দেশের প্রকৃতিকে সব সময়ই ভাবনায় রাখতে চান। স্বপ্ন নিয়ে তার ভাবনা একেবারেই অন্যরকম জীবন আর মৃতু্য দুয়ের স্বল্প পরিক্রমাকে তিনি উপলব্ধি করেন গভীরভাবে।

প্রদর্শনীতে বাংলাদেশের আলোকচিত্রী মুনেম ওয়াসিফ 'নোনা পানির আহাজারি', দেবাশীষ সোমের 'ঢাকা : আমার স্বপ্ন আমার বাস্তবতা' শীর্ষক ছবিগুলো পানিহীন নাগরিকের স্বপ্ন ও প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা, ঢাকার জনজীবনের দুর্ভোগ মুক্তির স্বপ্ন উঠে এসেছে নান্দনিকরূপে।

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী, দৃক গ্যালারি, অলিয়ঁস ফ্রাসেজ, চারুকলা ইনস্টিটিউট লিচুতলা, ব্রিটিশ কাউন্সিল, গ্যেটে ইনস্টিটিউট, এশিয়াটিক গ্যালারি অব ফাইন আর্টসে একযোগে শুরু হওয়া প্রদর্শনী চলবে আগামী ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।

সাহিত্যের প্রচলিত ছক, শাখা, ভাগ একটা গড় ব্যাপার

ত্তেফাক সাময়িকী : প্রথম গল্প লিখতে গিয়ে কি কখনো প্রশ্ন জাগেনি, কেন আপনাকে গল্পই লিখতে হবে? হাসান আজিজুল হক : আমি আজ পর্যন্ত কখনো বলিনি যে, প্রথম গল্প 'শকুন' লিখতে গিয়ে আমি ঠিক করে ফেলেছিলাম যে, আমাকে গল্পই লিখতে হবে।

বরং এর ঠিক উল্টো কথাই আমি বরাবর বলে এসেছি। সেটা তো তোমাদের খেয়াল করার কথা। আমি বলেছি, বড় লেখা_উপন্যাসই বলো, আর যাই বলো আমার বরাবরই প্রথম ইচ্ছা ছিল । যে গল্পটির কথা বলছো, তার আগেই অন্তত একটি অসমাপ্ত দীর্ঘ লেখা_ছাপলে প্রায় ১০০ পৃষ্ঠা হতে পারে_লিখেছিলাম। আর তার কিছুকাল পরে একটি পুরো ছোট উপন্যাসও লিখেছিলাম। টুকটাক গল্প বা কবিতাও কম লিখিনি। কাজেই প্রথম গল্প লেখার সময় আমি কখনো মনস্থ করিনি, আমাকে গল্পই লিখতে হবে। খুব ছোটবেলার একটা ঘটনার স্মৃতি মাথায় ছিল। সাঁঝের অাঁধারে রাতকানা এক শকুন এসে পড়েছিল খোলা খামারবাড়িতে। পথ-বিপথে ছোটা, এই বিভ্রান্ত শকুনটির পিছু নিয়েছিলাম আমরা। সেটার বর্ণনা দিয়েই গল্প শুরু হয়। গল্পের কলা-কৌশল, আঙ্গিক, কল-কব্জা কোনো কিছুরই ধারণা ছিল না। গল্পটি বের হওয়ার পর এ পর্যন্ত যত কথা শুনেছি, তা সবই পাঠকদের বিচার-বিশেস্নষণ এবং মন্তব্য। এ সমস্ত বিচার ও মন্তব্যের বৈচিত্র্যের মধ্যে আমার কথা ঘুরতে থাকে। বেশ বিভ্রান্ত ও হতবুদ্ধি হয়ে পড়ি। এই এতগুলো কথা হলো তোমার প্রশ্নের জবাব।

ইত্তেফাক সাময়িকী : সাহিত্যের প্রেক্ষাপটে গল্প ফর্মটিকে আলাদাভাবে কেন বিবেচনা করা দরকার?

হাসান আজিজুল হক : এ ব্যাপারে বলি, তুমি তো বরং বেশ উল্টো কথাই বলে ফেললে। আমি আগাগোড়া বলে এসেছি, সেদিনও একটি দীর্ঘ প্রবন্ধে বলেছি_সাহিত্যের প্রচলিত ছক, শাখা, ভাগ একটা গড় ব্যাপার। খুব নির্দিষ্ট কিছু নয়। তাহলে আমি কেন বলতে যাব, ছোটগল্প বলে খুব আলাদা একটা সাহিত্যের ফর্ম আছে?

ইত্তেফাক সাময়িকী : 'শকুন' আপনার লেখা পাঠক সাধারণের কাছে বহুল পঠিত প্রথম গল্প। এই গল্প লেখার আগেও আপনি বেশ কয়েকটি গল্প লিখেছেন বলে আমরা জানি। পূর্বের লেখা সেই গল্পগুলোকে ছাপিয়ে 'শকুন' গল্পটি পাঠক এত উৎসাহের সঙ্গে গ্রহণ করলো কেন?

হাসান আজিজুল হক : আগে সেই সব লেখালেখি সাধারণ পাঠকদের কাছে তো পেঁৗছায়নি। স্থানীয় কোনো মফস্বল-গঞ্জ থেকে প্রকাশিত ভুলেভরা পত্রপত্রিকা ক'জন পাঠকইবা পড়েছে? সেই সব গল্পের কথা আমার নিজেরও মনে নেই। মনে হয়, বেশি পাঠক পড়লেও নিশ্চয়ই মনে রাখার মতো কিছু সেখানে ছিল না। দু'একটি লেখা হয়তো কোনোদিন প্রকাশিতও হয়নি। কাজেই তোমার প্রশ্নের আর কি জবাব হতে পারে?

ইত্তেফাক সাময়িকী : এই গল্পটি প্রথম প্রকাশিত হয় সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত 'সমকাল' পত্রিকায় ১৯৬০ সালে। কীভাবে গল্পটি এই পত্রিকার দপ্তরে পেঁৗছেছিল? এই গল্পটি পেঁৗছানোর পেছনের গল্পটি একটু বলুন।

হাসান আজিজুল হক : এই পেছনের গল্পটাও আগে নানাভাবে বলেছি। আমার হাতের লেখা প্রায় প্রথম থেকেই দুষ্পাঠ্য_আজও তাই। কাজেই ওই গল্পটির মূল কপি একটা বাঁধানো খাতায় এখনো লেখা আছে। খাতায় গল্পটির মাথার পাশে গল্পটি লেখা শুরু করার তারিখটিও লেখা আছে। আমার বড় বোনের হাতের লেখা সুন্দর ছিল। তিনি গল্পটি কপি করে দিয়েছিলেন। রেজিস্ট্রি করে ডাকে পাঠিয়েছিলাম। ছাপা_অল্পদিন পরেই সমকালের মার্চ সংখ্যাতে বেরিয়েছিল। সমকালে নিজের লেখা চোখে দেখে রোমাঞ্চিত হয়েছিলাম_সন্দেহ নেই।

ইত্তেফাক সাময়িকী : শুধু একটি বিদঘুটে ও হিংস পাখি শকুনকে নিয়ে একটি গল্প তৈরি হতে পারে তা আপনার ভাবনা জগতে কীভাবে ধরা দিল?

হাসান আজিজুল হক : জবাব তো আগেই দিলাম। কোনো পরিকল্পনা-টরিকল্পনার ব্যাপার নেই। বরেন্দ্রের ঝাঁঝাঁ রোদের মধ্যে, ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে, চৌকিতে বুকের তলায় বালিশ দিয়ে শুয়ে, একটা সরু নিভওয়ালা শেফার্স কলম দিয়ে এলেবেলেভাবে গল্পটি লেখা শুরু করি। আলো এত কম ছিল, নিজের লেখা নিজেই দেখতে পাই না। এই তো ব্যাপার।

ইত্তেফাক সাময়িকী : ঝপ করে একটি শকুন খামারবাড়িতে নামার পরে গাঁয়ের ছেলেরা তাকে দেখতে পেল। কিন্তু তারা শকুনটিকে ঘিরে একটি দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করল। তার পিছু পিছু দৌড়াল এবং প্রায় সারা রাতে তারা মাঠে মাঠে শকুনটিকে তাড়িয়ে কাটালো। গল্পটির গল্পকার হিসেবে কেন এমন করেছেন বলে আপনি মনে করেন?

হাসান আজিজুল হক : কোনো কারণ নেই। ঘটনাটি ওরকমই ছিল। গল্প বেরিয়ে এসেছে লেখার পরে। আমি লিখতে লিখতে এটা-ওটা-সেটা ভেবে থাকতে পারি। কিছু মিশেল কর্মও করে থাকতে পারি। কিন্তু সেটা কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করে করেছিলাম বলে কোনোমতেই আমি মেনে নিতে পারবো না। কাজেই প্রশ্নের জবাব যদি পেতেই হয়, তাহলে গল্পটি পড়ে পাঠকরা নিজেরাই এই প্রশ্নের জবাব বের করে নেবেন।

ইত্তেফাক সাময়িকী : গল্পে কিশোরদের মুখের কথার ক্ষেত্রে আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার এবং বিভিন্ন শ্রেণী ও বিত্তের কিশোর ছেলেরা সংঘবদ্ধভাবে কেন একটি নির্দিষ্ট বিষয়কে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে বলে আপনি মনে করেন? বিশেষত শকুনের ওপর সেই কিশোর বালকরা নানাভাবে আনন্দমাখা অত্যাচার করতে উৎসাহী হয়ে উঠল কেন?

হাসান আজিজুল হক : সরল জবাব হচ্ছে, কোথাও কারো কোনো পরিকল্পনা ছিল না। সাধারণভাবে জিনিসটা নাও না! গাঁয়ের ছেলে-মেয়েরা দুষ্টুমি করে বেড়ায় না! মানুষের উপদ্রবও করে, ক্ষতিও করে ফেলে। এই কারো মাচা থেকে শসা চুরি করছে, কারো গাছ থেকে বাতাবিলেবু পেড়ে ফুটবল খেলছে। পাখির বাচ্চা কেউ পুষছে, কেউ মেরে ফেলছে। ধূসরিত, গরিব, ছন্নছাড়া ছেলেগুলোর স্বভাব নানারকম। সকলের অবস্থাও একরকম নয়। কেউ সচ্ছল। কেউ দুপুরের খাওয়ার পর আর কিছু খেতে পারেনি। কেউ গরু চড়ায়, কেউ স্কুলে যায়। সবারই পরনে নোংরা পোশাক, ধুলায় ধুলায় ধূসরিত এইসব বালক যদি দেখতে পায়, বিরাট এক শকুন তাদের নাগালের মধ্যে চলে এসেছে, তখন তাকে নিয়ে মজা করা, সারা প্রান্তর জুড়ে তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ানো, তার পালক খসিয়ে নেয়া_এসব তো করবেই। এটাই স্বাভাবিক। তাই-ই তারা করছে। আর আমি সেটা ফোটাতে গিয়েই অবিকল তাদের মুখের ভাষা ব্যবহার করেছি। আর তাদের কথা ও চিন্তার মধ্যে যেসব কথা লিখেছি সেসব কিছুটা আন্দাজ করেছি। যেমন_পাখিটাকে সুদখোর মহাজনের সঙ্গে তুলনা কিংবা গল্পের একেবারে শেষে অবৈধ, অসামাজিক যৌন সম্পর্ক, আর প্রায় পশু জীবন হয়তো যোগ করেছি। তখন ভাবিনি, এখন ভাবি_লেখা হয়তো এরকম করেই হয়।

ইত্তেফাক সাময়িকী : ৫০ বছর আগে 'শকুন' গল্পটি লিখেছেন আপনি। গল্পটি প্রকাশের ৫০ বছর পূর্তি হচ্ছে এ বছর। এখন যদি এই গল্পটির দিকে আবার ফিরে তাকান তাহলে কীভাবে এই গল্পের গল্পকার হিসেবে গল্পটি মূল্যায়ন করবেন?

হাসান আজিজুল হক : এর এক কথায় জবাব হচ্ছে, সাধারণত আমি আমার পুরানো দিনে ফেলে আসা লেখাগুলো আবার কখনোই পড়ি না। 'শকুন' যদি পড়ি, আবার কী মনে হবে সে জল্পনা-কল্পনা করতে চাই না।

ইত্তেফাক সাময়িকী : তাহলে আপনার গল্পের নন্দন ভুবনটি কোথায়?

হাসান আজিজুল হক : আমার গল্পের নন্দন ভুবনটি হচ্ছে, ঠিক এই_মাটির পৃথিবীর কোনো কোনো ভূ-খণ্ডের মানুষ আর তার মৌলিক বেঁচে থাকাটার মধ্যে।

ফেরি করে অবৈধ রক্ত বিক্রি by আবুল খায়ের

Monday, January 24, 2011

রাজধানীসহ সারাদেশে চলছে অবৈধভাবে রক্ত বেচাকেনা । এমনকি ফেরি করে রক্ত বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব রক্তে থাকছে হেপাটাইটিস বি,সি ও ই এবং এইচআইভি এইডসের ভাইরাস। পেশাদার রক্তদাতারা মরণব্যাধি ভাইরাসযুক্ত রক্ত বিক্রি করছে অবাধে।

এছাড়া নেশার উপকরণ ক্রয় করার জন্য মাদকাসক্তরা নিয়মিত রক্ত বেচাকেনা করছে। তাদের দেহে এসব ভাইরাস থাকার আশংকা একশত ভাগ বলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। সরকারি, বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক থেকে কমিশনের লোভে এক শ্রেণীর ডাক্তার বাইরের বস্নাড ব্যাংক থেকে রোগীর অভিভাবকদের রক্ত ক্রয় করে আনার পরামর্শ দেন। ডাক্তারের পছন্দের বস্নাড ব্যাংক থেকে রক্ত এনে রোগীর দেহে পুশ করা হয়। কিন্তু এসব প্রাইভেট বস্নাড ব্যাংকে পেশাদার রক্তদাতা ও মাদকাসক্তদের রক্ত ক্রয় করা হয়ে থাকে। সেই রক্তই রোগীর নিকট বিক্রি করা হচ্ছে। এছাড়া ফেরি করে রক্ত বেচাকেনার প্রমাণ পেয়েছে ভেজাল বিরোধী মোবাইল কোর্ট। এই রক্ত রোগীর জন্য অতি বিপজ্জনক বলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা সতর্ক করে দিয়েছেন।

ভাইরোলজি, লিভারব্যাধি, চর্ম ও যৌন রোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে পেশাদার রক্তদাতার (ডোনার) ২৯ ভাগের দেহে হেপাটাইটিস বি, সি ও ই রয়েছে। এছাড়া সিফিলিস ও গনোরিয়ার জীবাণু ৫০ ভাগের এবং মরণব্যাধি এইডসের জীবাণু রয়েছে বেশিরভাগের দেহে। ডোনারের রক্ত ক্রয় না করে স্বেচ্ছায় রক্তদানে উৎসাহিত করা উচিত। নিজেদের পরিবারের সুস্থ সদস্যের রক্ত নিলে কোন ধরনের ক্ষতি হয় না। এতে রোগী রোগমুক্ত নিরাপদ রক্ত পায় বলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণ অভিমত ব্যক্ত করেন।

স্বাস্থ্য অধিদফতর ও ভেজাল বিরোধী মোবাইল কোর্ট সূত্রে জানা যায়, রাজধানীসহ সারাদেশে বৈধ প্রাইভেট বস্নাড ব্যাংকের সংখ্যা প্রায় অর্ধশত। এর বাইরে অলিগলিতে শতাধিক অবৈধ বস্নাড ব্যাংক রয়েছে।

সাধারণত বস্নাড ব্যাংকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইড লাইন অনুযায়ী পাঁচটি ঘাতক ব্যাধি হেপাটাইটিস বি,সি, এইচআইভি/ এইডস, ম্যালেরিয়া ও সিফিলিস পরীক্ষার বিধান রয়েছে। পাশাপাশি বস্নাড ব্যাংকে থাকতে হবে রক্ত পরিসঞ্চালন বিশেষজ্ঞ, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ডাক্তার, প্রযুক্তিবিদ, টেকনিক্যাল সুপারভাইজার, রেজিস্টার্ড নার্স ও ল্যাব সহকারী। ঘাতক রোগের পরীক্ষার ব্যবস্থা ও যন্ত্রপাতিও থাকতে হবে বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইড লাইনে উলেস্নখ রয়েছে। এই সকল ব্যবস্থা থাকলেই কেবল প্রাইভেট বস্নাড ব্যাংক সরকারি অনুমোদন পেতে পারে। কিন্তু ৯৮ ভাগ বস্নাড ব্যাংকে এসব যন্ত্রপাতি ও জনবল নেই। শুধুমাত্র বস্নাড সংগ্রহ করা এবং কোন কোন বস্নাড ব্যাংকে সিফিলিস ও গনোরিয়া শনাক্তে রক্তের ভিডিআরএল পরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে।

গত বছর র্যাবের তত্ত্বাবধানে ভেজাল বিরোধী মোবাইল কোর্টের ম্যাজিস্ট্রেট এএইচএম আনোয়ারের নেতৃত্বে রাজধানীর ২১টি বস্নাড ব্যাংকে অভিযান চালিয়ে ৪২ জনকে ৩৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এদের মধ্যে ২৩ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। এসব বস্নাড ব্যাংকে কোন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই ডোনারের রক্ত সংগ্রহ করে দিনের পর দিন রোগীর নিকট বিক্রি করার প্রমাণ পায় মোবাইল কোর্ট। এদের নেই কোন যন্ত্রপাতি ও অভিজ্ঞ জনবল। তারা বিষয়টি ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে স্বীকারও করেছে।

সম্প্রতি যাত্রাবাড়ী এলাকায় পরীক্ষা ছাড়াই ডোনারের রক্ত রোগীর নিকট বিক্রি করার সময় একজন ডাক্তারকে মোবাইল কোর্ট হাতে-নাতে ধরে ফেলে। ডাক্তারকে কারাদণ্ড দিয়ে মোবাইল কোর্ট কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠিয়ে দেয়। মোবাইল কোর্টকে তারা আরও জানায় যে, পেশাদার ডোনারকে এক ব্যাগ রক্তের জন্য ৯০ থেকে ১২০ টাকা দেয়া হয়। মাদকসেবীরাও প্রতি ব্যাগ অনুরূপ মূল্য পায়। দালালের মাধ্যমে আসলে দালালকে প্রতিব্যাগের জন্য ৩০ থেকে ৫০ টাকা দেয়া হয়। প্রতিব্যাগ রক্ত নিম্নে ৫০০ থেকে ১২০০ টাকায় বিক্রি করে থাকে। এদের ডোনাররা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত এবং তারা ফুটপাতে কিংবা অলিগলিতে ও পার্কে ময়লা-আবর্জনার মধ্যে দিন-রাত অবস্থান করে। মাদকাসক্তদেরও একই অবস্থা। দিনের পর দিন গোসল করে না এবং কাপড়-চোপড় ময়লা ও দুর্গন্ধযুক্ত। হাসপাতাল কিংবা ক্লিনিক থেকে রোগীর জন্য রক্তের প্রয়োজন হলে ফোন করে। ঐ সময় একজন ডোনারকে ডেকে এনে গলির কোন একটি নির্ধারিত কক্ষে নিয়ে রক্ত সংগ্রহ করে সঙ্গে সঙ্গে রোগীর কাছে পাঠিয়ে দেয়া হয়। বর্তমানে ফেরি করেও রক্ত বিক্রি করা হয়ে থাকে। প্রতি ব্যাগ থেকে ডাক্তারকে কমিশন দেয়া হয়। মোবাইল কোর্ট রাজধানীতে অবৈধ রক্ত বেচাকেনার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে গেলে তারা ব্যবসার ধরন পরিবর্তন করে ফেলে। বর্তমানে রক্তের প্রয়োজনে তারা ক্রেতা ও ডোনারকে রক্তের গ্রুপ বি হলে 'চশমার ফ্রেম', এ হলে 'এঙ্গেল', ও হলে 'আলু' এবং এবি হলে 'ডাবল' সঙ্গে পজেটিভ ও নেগেটিভ বলে দেয়। এইভাবেই চলছে অবৈধ রক্ত বেচাকেনার বাণিজ্য।

চর্ম ও যৌন রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এমএন হুদা বলেছেন, এদেশে সরকারিভাবে এইচআইভি বাহক ও এইডসে আক্রান্তের সংখ্যা দুই সহস্রাধিক। কিন্তু বেসরকারিভাবে হাজার হাজার হবে। পেশাদার ডোনার ও মাদকাসক্তদের রক্তে ঘাতক ব্যাধি থাকার আশংকা একশত ভাগ। এই রক্ত দেয়া আর রোগীর দেহে বিষ ঢুকানো একই কথা বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন।

লিভার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মবিন খান বলেন, ২০ বছর আগে এক জরিপে দেখা যায়, পেশাদার রক্তদাতার ও মাদকাসক্তের মধ্যে ২৯ ভাগের দেহে হেপাটাইটিস বি ভাইরাস রয়েছে। বর্তমানে এইডসসহ অন্যান্য ঘাতকব্যাধির জীবাণু পেশাদার রক্তদাতা ও মাদকাসক্তদের শরীরে রয়েছে বেশি। পেশাদার ডোনারদের রক্ত পরিহার করে পরিবারের সদস্যদের রক্ত দানে উৎসাহিত করা উত্তম কাজ। বিশ্বে কোথাও এদেশের মত রক্ত বেচাকেনা হয় না। মরণব্যাধির হাত থেকে জাতিকে রক্ষা করত অবৈধ রক্ত বেচাকেনা বন্ধ করা জরুরি বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন। ভাইরোলজিস্ট ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম একই মতামত দিয়েছেন।

এদিকে ঢাকার বাইরেও অবৈধভাবে রক্ত বেচাকেনা চলছে প্রকাশ্যে। গ্রামাঞ্চলের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যরা স্বেচ্ছায় রক্ত দিতে রাজী হয় না। তাদেরকে দালালরা রক্ত দিলে মারা যাওয়াসহ নানা ধরনের কথা বলে ভয়ভীতি দেখায়। এ কারণে তারা ডোনারের রক্ত ক্রয় করতে বেশি উৎসাহী বলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানান।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. খন্দকার সিফায়েত উলস্নাহ বলেন, অবৈধভাবে রক্ত বেচাকেনা এবং পেশাদার ডোনার ও মাদকাসক্তের রক্ত সংগ্রহ বন্ধ করার ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। এই বিপজ্জনক বাণিজ্য করতে দেয়া হবে না বলে মহাপরিচালক জানান।

অটিস্টিক শিশুর চিকিৎসা অসম্ভব নয় by উম্মে কুলসুম কলি

শিশুর গা গরম হলে আমরা বলি জ্বর হয়েছে, থার্মোমিটারে তাপমাত্রা দেখে জ্বরের মাত্রা বুঝতে পারি। গভীর পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে বোঝা যায় টাইফয়েড, সাধারণ ঠাণ্ডাজনিত সমস্যা নাকি অন্যকিছু। ঠিক তেমনি শিশুর বিভিন্ন রকম আচরণ দেখে তার মানসিক রোগ, রোগের মাত্রা শনাক্ত করা হয়।

আচরণই মানসিক রোগ নির্ণয়ের নির্দেশক। হাসপাতালে কাজ করতে গিয়ে আমি দেখেছি, অসংখ্য শিশুর মা-বাবা উদগ্রীব হয়ে আসেন শিশুদের মানসিক সমস্যা নিয়ে। শিশুর শারীরিক জটিল সমস্যা হলে কেউ লজ্জাবোধ করে না। কিন্তু মানসিক কোন সমস্যা হলেই লজ্জা-ভয়ে সব কিছু লুকানোর চেষ্টা শুরু করে দেয়। লোকে কি বলবে, নিজের দুর্ভাগ্য, পাপের ফল মনে করে গোপনে প্রার্থনা করে। অপেক্ষার পর অপেক্ষা এবং এক সময় অদৃষ্টের উপর ছেড়ে দিয়ে 'গিফটেড চাইল্ড' বা 'স্পেশাল বেবী' ইত্যাদি নামে অভিভাবকরা সান্তু্বনা পেয়ে আসছেন। শুধু আমাদের দেশেই নয় আমেরিকা-ইউরোপ-ইংল্যান্ডের মত উন্নত বিশ্বেও দেখা গেছে একই চিত্র। অথচ শিশুর মানসিক সব ধরনের সমস্যাই নতুন গবেষণাপ্রসূত মনোবৈজ্ঞানিক চিকিৎসার মাধ্যমে সারিয়ে তোলা সম্ভব, এ তথ্যটি আমরা অনেকেই জানি না।

অটিস্টিক শিশুর লক্ষণ সমূহ :এই শিশুরা সাধারণত: দেখতে সুন্দর ও স্বাভাবিক হয়। এরা কারো চোখে চোখে তাকাতে পারে না (আই কন্টাক্ট করে না)। এদের নাম ধরে ডাকলে সাড়া দেয় না। সার্বক্ষণিক অন্যমনস্ক থাকে। একই কাজ বারবার করতে পছন্দ করে । নিজের হাত, হাতের আঙ্গুল নিয়ে নিবিষ্ট মনে অদ্ভুত ভঙ্গিতে নাড়াচাড়া করে। সমবয়সী বা ছোট-বড় কারো সাথে এরা মিশতে পারে না। কোন মানুষের প্রতি এরা আকর্ষণ বোধ করে না। অর্থহীন বস্তুর প্রতি এরা বেশি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। অনেকে মা-বাবাকে চিনতে পারে না।

এদের অনেকেই কথা বলতে পারে আবার কেউ কথা বলতে পারে না। প্রশিক্ষণ দিলে তারা যান্ত্রিকভাবে রোবটের মত করে কিছু কথা বলে। এরা একই কথা বা অর্থহীন শব্দ বারবার বলে, বলতেই থাকে। আবেগশূন্য এই শিশু সঠিকভাবে আবেগ প্রকাশ করতে পারে না। এদের মনোযোগ ও ধৈর্য মোটেই থাকে না বা খুব কম থাকে। এদের খেলা অথবা খেলনার প্রতি কোনই আগ্রহ থাকে না। অনেকে অপ্রয়োজনীয় কিছু একটা সার্বক্ষণিক হাতে ধরে রাখে এবং তা নিয়েই ব্যস্ত থাকে। এরা টিভি বিজ্ঞাপন, কার্টুন ও সিডির প্রতি বেশি আকৃষ্ট থাকে। অনেকে কোন কথা বলতে না পারলেও টিভি দেখে বিজ্ঞাপনের বিভিন্ন পণ্য, পণ্যের ব্রান্ড সব মুখস্থ করে ফেলে, গান বলে।

শিশুটি অটিস্টিক নাও হতে পারে? বহুবিধ প্রতিবন্ধিতা হতে পারে:শিশুর কোন ধরনের মানসিক সমস্যা হলেই তাকে অটিস্টিক বলে শনাক্ত করা ঠিক নয়। অটিস্টিক হওয়ার জন্য রোগীর মধ্যে অটিজমের অন্তত ৩/৪টি জোরালো ও যথাযথ লক্ষণ থাকা অত্যন্ত জরুরি। অটিজম না হলেও বুদ্ধি প্রতিবন্ধী, এডিএইচডি, নিওরোটিক, সাইকোটিক ও স্কিজোফ্রেনিয়া ইত্যাদি অন্য কোন মানসিক রোগ হতে পারে। এই রোগীদের রোগ নির্ণয় খুবই কঠিন ও জটিল বিষয়। মনে রাখত হবে, ডায়াগনোসিসে ভুল হলে সমগ্র ম্যানেজমেন্ট বা চিকিৎসায় ভুল হতে পারে। যা রোগীর জন্য আজীবন ক্ষতির কারণ হতে পারে।

শিক্ষণে অপারগতা :অটিজম আক্রান্ত শিশু স্বাভাবিক বুদ্ধিসম্পন্ন হতে পারে অথবা স্বল্পবুদ্ধিও হতে পারে। তার বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতা থাকলে তাকে কোন কিছু শেখানো খুবই কঠিন। অনেক সময় দিয়ে, কষ্ট করে, ধৈর্য ধরে শেখালেও তারা বারবার দেখে ও শুনে তেমন কিছু শিখতে বা মনে রাখতে পারে না। ফলে মা-বাবা হতাশ হয়ে পড়েন। অনেক যত্ন নিয়ে প্রশিক্ষণ দিলে এরা খুব সামান্য বিষয়ই শিখতে পারে। নিজস্ব ব্যক্তিগত কাজ শেখাতেই এদের পিছনে বেশ কয়েক বছর বা আরো বেশি সময় ব্যয় করতে হয়, এদের সব কাজ অন্যদের করে দিতে হয়। চিকিৎসাহীন এই বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী রোগীরা সাধারণত পরনির্ভরশীল জীবনযাপন করে থাকে।

বুঝবো কি করে আমার শিশু মানসিকভাবে সুস্থ কিনা:একটি শিশুর মধ্যে একাধিক মানসিক সমস্যা বা রোগ থাকতে পারে। নিম্নোক্ত প্রতিটি অসংলগ্ন আচরণই ভিন্ন ভিন্ন মানসিক রোগকে শনাক্ত করে। নিজেই নিজের শিশুর মানসিক রোগ সঠিকভাবে শনাক্ত করে নিন।

আচরণ সমস্যার লক্ষণসমূহ :আচরণ ও আবেগের দিক দিয়ে অপরিপক্ক, বয়সানুপাতে বুদ্ধি ও মানসিক বিকাশ যথাযথ নয়। পড়ালেখা ও স্কুল সংক্রান্ত কোন সমস্যা, পড়ালেখা করতে চায় না, পড়া মনে রাখতে পারে না। খেতে চায় না, জোর করে খাওয়াতে হয়। খাদ্য নয় এমন সব জিনিস, নোঙরা-ময়লা প্রভৃতি সবসময় মুখে দেয়। অস্থিরতা, বদমেজাজী, অতিরিক্ত জেদ, ভাংচুর করে, নিজেকে বা অন্যকে আঘাত করে, মারধর করে, কোন কিছুকে ভয় পায়, আরো অনেক রকম অস্বাভাবিক আচরণ করে। বিছানা ভিজায়, যেখানে-সেখানে প্রশ্রাব-পায়খানা করে। ঘুমের সমস্যা, নার্ভাসনেস, কোন বিষয়ে ভয় পায়, আত্মবিশ্বাসের অভাব। প্রচুর মিথ্যা বলে, যে কোন বদ-অভ্যাস, অপরাধ প্রবণতা প্রভৃতি। অকারণ হাসি-কান্না, নিজ মনে একা একা কথা বলে ইত্যাদি।

অটিজম কি সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য:আমার দীর্ঘ ১৬ বছরের গবেষণায় দেখা গেছে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী, অটিস্টিক, মানসিক রোগগ্রস্ত শিশুকে চিকিৎসার মাধ্যমে সারিয়ে তোলা সম্ভব। আউট পেশেন্ট হিসাবে অথবা ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটটে (আইসিইউ) শিশুর মানসিক রোগের চিকিৎসা দেয়া হয়_এ ধরনের সুবিধা সম্বলিত প্রতিষ্ঠান ঢাকায় রয়েছে, যেখানে রোগীকে কোনরূপ বিশেষ শিক্ষা কার্যক্রম ও প্রশিক্ষণ থেকে বিরত রাখা হয়। ফলে নিয়মতান্ত্রিক চিকিৎসার মাধ্যমে ধীরে ধীরে একটি একটি করে রোগ সেরে যেতে থাকে, রোগী তার 'যোগ্যতা' অনুযায়ী নিজে নিজেই সব কাজ শিখে নিতে পারে। হাতে ধরে তাকে কোন কিছু শেখানোর প্রয়োজনই হয় না।

সমস্যা লুকিয়ে না রেখে যত কম বয়সে চিকিৎসা শুরু করা যাবে, রোগী তত দ্রুত সুস্থ হবে। তাই সময় নষ্ট না করে, 'বড় হলে ঠিক হয়ে যাবে' এর জন্য অপেক্ষা না করে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করে দেয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

ওষুধবিহীন ফলপ্রসূ চিকিৎসা :এই চিকিৎসা-পদ্ধতি সম্পূর্ণ পাশর্্বপ্রতিক্রিয়াহীন। কোন রকম ওষুধ ব্যবহার ছাড়াই নতুন গবেষণাপ্রসূত সাইকোথেরাপির মাধ্যমে রোগীকে নিয়মিত বেশ কয়েক বছর পর্যন্ত একাধারে চিকিৎসা দিতে হয়।

পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা শেষে রোগী সামাজিক সব ধরনের আদান-প্রদান ও যোগাযোগ করতে পারে। সব কথা বলতে পারে। বুদ্ধি মোটামুটি ভাল থাকলে নিয়মিত নরমাল স্কুলের সাধারণ নিয়মেই লেখাপড়া করতে পারবে। বুদ্ধিগত প্রকট সমস্যা থাকলে হয়তো এরা খুব বেশি লেখাপড়া করতে পারবে না। তবে পরবর্তী জীবনে স্বাভাবিক মানুষের মতই বিয়ে, ঘর-সংসার করতে পারবে। যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি অথবা ব্যবসা করে স্বাধীন জীবনযাপন করতে পারবে বলে আশা করা যায়।

রৌদ্রছায়া:'সময়ের বয়ান' by মাকিদ হায়দার

মাদের স্কুলে নিচের ক্লাসের ক্ষিতিশ পণ্ডিত জোড়া বেত হাতে বিশুদ্ধ বাংলা, শুদ্ধ উচ্চারণ, কথন, পঠন শেখাতেন। লেখাতেনও। সেই সাথে শেখাতেন নীতিকথা। প্রাথমিক পর্যায়েই দিতেন নৈতিক শিক্ষা। নীতি কথাগুলো মনে আছে। মনে আছে মাঝে-মধ্যে ভুল উচ্চারণ এবং ভুল বাংলা লেখার দায়ে জোড়া বেতের ব্যবহারের কথা।

১. সদা সত্য কথা বলিবে, ২. চুরি করা মহাপাপ, ৩. অহংকার পতনের মূল ইত্যাকার নীতিকথা। আমাদের বাংলা অভিধানে 'সাবেক' শব্দটির অর্থ করা হয়েছে প্রাচীন পূর্বেকার, পুরাতন শব্দটির ব্যবহার বোধকরি সকলের জন্য প্রযোজ্য নয়, কবি-শিল্পী-সাহিত্যিকদের ক্ষেত্রে। নাট্যকার, গীতিকার, সেক্সপিয়র থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, আমার অভিধায় ওঁরা কেউ-ই সাবেক হননি। সম্রাট অশোকের আমল থেকে পঞ্চদশ শতকের কবি আবদুল হাকিম এখন অবধি সাবেক হননি। এমনকি বিষাদ সিন্ধুর নিষ্ঠুর এজিদ। তিনি সেই সময়ের একজন বিখ্যাত কবি ছিলেন [আরবী কবিতা, আবদুস সাত্তার অনূদিত] বাংলা অভিধানে নীতিকথা বলতে বলা হয়েছে ১. হিতোপদেশ, ২. ভালো-মন্দ বা কর্তব্য অকর্তব্য বিষয়ে বোধসম্পন্ন। নৈতিক সম্বন্ধে লেখা আছে ১. নৈতিক শক্তি, ২. নৈতিক অবনতি।

কিছুদিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের এক শিক্ষক ভুল বাংলা লিখে তিরস্কৃত হলেও সম্প্রতি তিনি 'ডঃ' শব্দটি নামের আগে লিখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেছেন। উক্ত ডক্টরেট শিক্ষককে বলতে শুনলাম 'সাবেক' শব্দটি শুধু সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। শিক্ষক, রাজনীতিবিদদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। প্রসঙ্গ পাল্টে জানালেন, শিক্ষার মান, শুদ্ধ বানান, লেখন, পঠন এবং কিছু নীতিকথা। কিছু নৈতিকতার কথা। অনেকেই জানি ঢাকা বিশ্বিবিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক, বিভিন্ন এনজিওতে কনসালটেন্সি থেকে শুরু করে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেসরকারি) খণ্ডকালীন ক্লাস নিয়ে থাকেন। তাঁর শব্দ উচ্চারণেই স্পষ্ট হয়ে গেলো তিনি শুদ্ধভাবে মাতৃভাষা বলতে পারেন না, আঞ্চলিকতার লক্ষণ স্পষ্ট।

আজ থেকে প্রায় ২৫০০ বছর আগে গ্রীসের দুইজন দার্শনিক পেস্নটো এবং এরিস্টটল তাদের দর্শন চিন্তায় বার বার জানিয়েছেন, সত্যিকারের সৎ ও নিষ্ঠাবান নাগরিক হতে হলে নৈতিক শিক্ষার প্রয়োজন আছে। অন্যতিবে পেস্নটোর 'রিপাবলিক' গ্রন্থে নৈতিকতার উপর যেমন জোর দেয়া হয়েছে ঠিক তেমনি ভাবেই বলা হয়েছে, ছাত্র-ছাত্রীদের লেখাপড়া শুধু জ্ঞানের জন্যই নয়, পড়ালেখা শিখে তারা ভালো মানুষ হয়ে উঠবে। ভালো মানুষই ভালো নাগরিক হতে পারেন। নৈতিকতার বিরুদ্ধে আমরা সকলেই, তবে এর মধ্যে দু'একজন আছেন তাদের নৈতিকতাকে এখনো বিসর্জন দেননি।

বৃটিশ শাসনামলে পূর্ব এবং পশ্চিমবঙ্গে দুটি স্কুলের অনুমোদন দিয়েছিলেন বৃটিশরা। তৎকালীন বাংলা সমাজে ধর্মনিরপেক্ষতা এবং নৈতিকতার উপর সর্বপ্রথম ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর গুরুত্ব দিয়েছিলেন; এমনকি নৈতিক শিক্ষাকে পাঠ্যক্রমে অন্তভর্ুক্ত করেছিলেন ঊনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে বিদ্যাসাগর। তিনি বিদেশী বইয়ের অনুবাদের মাধ্যমে শিশুদের জন্য রচনা করেছিলেন 'বোধোদয়' ও 'বর্ণপরিচয়' ১ম ও ২য় ভাগ। তিনি শিশু-কিশোরদের বইগুলোতে নৈতিক শিক্ষার দিকে দৃষ্টিও দিয়েছিলেন এবং একইসঙ্গে শিশু-কিশোররা যেন মাতৃভাষা পড়তে ও লিখতে শেখে সেদিকও ছিলো তাঁর প্রখর দৃষ্টি। নৈতিকতা নিয়ে অনেকেই দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগেন। নৈতিকতার বালাই নেই অনেক শিক্ষকের কর্মকাণ্ডেও।

নৈতিকতার অধঃপতন চারদিকে। আজকাল সদা-সর্বদা সত্যকথা না বলে, আমরা মিথ্যে বলাকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকি। তবু এই সমাজে দুই-একজন এখনো আছেন যারা সত্য বলতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। সম্প্রতি সাবেক সচিব মোহাম্মদ সিরাজুদ্দীনের 'সময়ের বয়ান' নামে আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থটিতে নির্দ্বিধায় স্বীকার করেছেন 'তাঁর পিতা মহিউদ্দিন ভুঁইয়া পশ্চিমবঙ্গের ২৪ পরগনায় বাটা সু কোম্পানিতে শ্রমিকের চাকরি করতেন। ১৯৪৪ সালের দিকে তাঁকে বাটানগর থেকে খিদিরপুরের ওয়াটগঞ্জ স্ট্রীটে অবস্থিত বাটা সু কোম্পানির জুতার দোকানে সেলসম্যান এবং নিকটস্থ মসজিদের ইমাম হিসেবে কলকাতায় তাকে বদলি করা হয়।' আমার মনে হয় নৈতিকতার জয় এখানেই। শুদ্ধ ভাষায় যিনি সত্য বলতে অভ্যস্ত তাঁর মুখে মিথ্যে আটকে যায়।

দিনে এক কাপ কফি এনে দিতে পারে দীর্ঘায়ু

দিনে মাত্র এক কাপ গরম কফিতে চুমুক দিয়েই সহজে অনেক বেশিদিন সুস্থ দেহে বেঁচে থাকা যায়। সম্প্রতি এক সমীক্ষায় জানা গেছে, কফি পানে হূদরোগের সম্ভাবনা অনেকটাই এড়ানো যায়। সমীক্ষাটি চালিয়েছে এথেন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক।

তারা দেখেছেন যে, দিনে এক কাপ গরম কফি পান করলে মানুষের হূদপিণ্ডের ধমনীর প্রসারণ ক্ষমতা অনেকটাই বেড়ে যায়। ফলে হূদরোগের প্রকোপ এড়ানো সম্ভবপর। ব্রিটিশ সংবাদপত্র 'ডেইলি মেইল ঐ সমীক্ষা রিপোর্ট উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, গবেষকরা উচ্চ রক্তচাপে ভোগা ৪৮৫ জন মানুষের ওপর পরীক্ষা করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। তারা প্রত্যেকেই দীর্ঘদিন গ্রিসের ইকেরিয়া দ্বীপপুঞ্জের বাসিন্দা, বয়স ৬৫ থেকে ১০০-র মধ্যে। ইকোরিয়া 'দীর্ঘজীবীর দেশ' বলে পরিচিত। স্থানীয় বাসিন্দাদের এক-তৃতীয়াংশের বয়সই নব্বইয়ের কোঠায়।

গবেষকদলের প্রধান ড. ক্রিস্টিনা ক্রাইসোহু জানিয়েছেন, কফি পানের উপযোগিতা সম্পর্কে অনেকেরই দ্বিমত ছিল। বিশেষত হূদরোগের ক্ষেত্রে কফি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে বলে অনেকে মনে করেন। কয়েকটি গবেষণায় দেখা গেছে, কফি পান করলে রক্তচাপ বেড়ে যায়। কিন্তু গ্রিক সমাজে, সংস্কৃতিতে কফি পানের প্রচলন খুবই বেশি। তাই ্এই অনুসন্ধানের প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। পরীক্ষা করে দেখা গেছে, দিনে এক বা দু'বার যারা কফি পান করেন (২৫-৫০ মিলিলিটার) তাদের প্রায় ৫৬ শতাংশের ধমনীর প্রসারণক্ষমতা অল্পবয়সীদের মতোই। একেবারেই যারা কফি পান করেন না তাদের ধমনী অনেক কমজোর। দিনে তিন অথবা তার চেয়ে বেশি বার কফি পান করেন তাদের প্রতি দশজনের একজনের ধমনীর প্রসারণক্ষমতা দুর্বল বলে রিপোর্টে জানানো হয়েছে। কফির উপাদান-ক্যাফিন ও অ্যান্টিঅক্সিড্যান্টস-নাইট্রিক অক্সাইড গ্রহণের মাত্রা বাড়িয়ে ধমনীর ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে বলে তিনি মনে করেন। এই রিপোর্টটি স্টকহোমের ইউরোপিয়ান সোসাইটি অব কার্ডিওলজিতে প্রকাশিত হয়েছে।

বিদেশে আশ্রয় চাইতে পারেন লিনা সেন

মাওবাদীদের সহযোগিতা করার অভিযোগে কারারুদ্ধ ভারতের মানবাধিকার কর্মী বিনায়ক সেনের স্ত্রী লিনা সেন বিদেশে রাজনৈতিক আশ্রয় চাইতে পারেন। স্বামীর সাজা হওয়ার পর তিনি ও পরিবারের সদস্যরা ভারতে নিরাপদ বোধ করছেন না বলে সোমবার তিনি জানান।

তিনি বলেন, এখন আমার একটাই পথ খোলা আছে। সেটা হলো উদার, গণতান্ত্রিক দেশগুলোর দূতাবাসে গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় চাওয়া। পুলিশ আমাদের ওপর সারাক্ষণ নজরদারি করছে। অনেক অজ্ঞাতনামা মেইল আসছে আমাদের কাছে এবং টেলিফোনে আমাদের হুমকি-ধমকি দেয়া হচ্ছে।

২৪ ডিসেম্বর মাওবাদীদের সঙ্গে সংশিস্নষ্টতার দায়ে বিনায়ক সেনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয় ভারতের ছত্তিশগড়ের একটি আদালত। তাকে আটক করা হয় ২০০৭ সালের মে মাসে। বানোয়াট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সেনকে সাজা দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে মানবাধিকার কর্মীরা। বিনায়ক সেনের বিচারে আন্তর্জাতিক মানদন্ড লংঘিত হয়েছে বলে দাবি করেছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।

মার্কিন লেখক নোয়াম চমস্কি, ভারতের ইতিহাসের অধ্যাপক রোমিলা থাপারসহ অনেক বিখ্যাত ভারতীয় শিক্ষাবিদ একটি বিবৃতিতে বিনায়ক সেনের সাজা হওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন। শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ বিনায়ক সেন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য একটি সাপ্তাহিক ক্লিনিক ও কমিউনিটি ভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পরিচালনা করতেন।

অবৈধভাবে ইয়েমেনে যাওয়ার পথে সমুদ্রে নিখোঁজ ৮০ জন

সুখের খোঁজে নৌকায় সাগর পাড়ি দিয়ে অবৈধভাবে ইয়েমেনে যাওয়ার পথে অন্তত ৮০ জন আফ্রিকান নাগরিক নিখোঁজ হয়েছেন।

দুটি নৌকার একটি সমুদ্র পাড়ি দিতে গিয়ে তলিয়ে যায়। অপরটির খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। নিখোঁজ নৌকাটিতে ৪০ জন ইথিওপিয়ান নাগরিক ছিলেন যারা উন্নত জীবনের খোঁজে অবৈধভাবে ইয়েমেনে যাচ্ছিলেন। ইয়েমেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে সোমবার জানানো হয়েছে, ৪৬ জন যাত্রী নিয়ে সাগরে ডুবে যাওয়া নৌকা থেকে সোমালিয়ার তিন নাগরিককে উদ্ধার করা হয়েছে এবং ৪০ জনকে নিয়ে অন্য একটি নৌকা সাগরে নিখোঁজ হয়েছে। ডুবে যাওয়া নৌকার বেশিরভাগ যাত্রীই ইথিওপিয়ার নাগরিক।

নারী ও শিশুসহ ৩৫ থেকে ৪০ জন যাত্রী নিয়ে নিখোঁজ হওয়া নৌকাটি সম্পর্কে ইয়েমেনের উপকূলরক্ষীদের উদ্ধৃতি দিয়ে ওয়েবসাইটটি জানিয়েছে, "বাতাসে নৌকাটি কোন্ দিকে যাবে এবং যাত্রীদের ভাগ্যে কি আছে তা আমাদের জানা নেই।" জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) জানিয়েছে, ৪৬ জন যাত্রী নিয়ে ডুবে যাওয়া নৌকাটির যাত্রীদের মধ্যে সোমালিয়ার ৫ জন নাগরিককে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তাদের কাছে জানা যায়, জিবুতি থেকে ছেড়ে আসার তিন ঘণ্টা পর নৌকাটির ইঞ্জিন জেলেদের একটি জালের সঙ্গে আটকে গেলে যাত্রীদের হুড়োহুড়িতে এ দুর্ঘটনা ঘটে। ইয়েমেন হয়ে পশ্চিমের ও মধ্যপ্রাচ্যের সমৃদ্ধ দেশগুলোতে উন্নত জীবন-জীবিকার খোঁজে প্রায়ই সাগর পাড়ি দেয়ার চেষ্টা চালায় আফ্রিকার দরিদ্র মানুষ। কিন্তু অনুপোযোগী নৌকায় যাত্রা করায় প্রায়ই অনেক আফ্রিকান সাগরে ডুবে প্রাণ হারায়।

উজবেকিস্তান কাজাখস্তান

তাসখন্দ এক সময় ছিল রাশিয়ায়। এখন উজবেকিস্তানের রাজধানী এই তাসখন্দ। আকাশ পথে লাদাখ উপত্যকা, হিন্দুকুশ পর্বত, কারাকোরাম পর্বতমালা পেরিয়ে এখানে যাওয়া যায়। পথে পড়ে বিরাট পর্বতমালা আর বরফাবৃত চূড়া। বিপুল সাহস আর ইচ্ছা নিয়ে সেই কতকাল আগে শাসক, পরিব্রাজকরা যুগে যুগে এই পথ পেরিয়েছে।

তাসখন্দ থেকে যাওয়া যায় ঐতিহাসিক শহর সমরখন্দ এবং বুখারার দিকে। সমরখন্দ ছিল তৈমুরলঙের রাজধানী। তারও আগে চেঙ্গিস খাঁ এখানে লুটপাট করেন। সমরখন্দ একটা পুরনো মরুদ্যান। এখানে অসংখ্য স্থাপত্য যা দেখতে দু'-তিনদিন লেগে যায়। সমরখন্দের একটা অংশ প্রাচীন রয়ে গেছে।

সমরখন্দ থেকে বুখারায় যাওয়া যায়। বুখারায় রয়ে গেছে অসংখ্য মসজিদ আর মাদ্রাসা। এরমধ্যে বিবিখানা মাদ্রাসা খুব বিখ্যাত। এখানকার স্থাপত্য দেখার জন্য একদিনের প্যাকেজ টু্যরের ব্যবস্থা আছে। বুখারাতে নানা জাতের, নানা ধর্মের লোকের বসবাস। বুখারার বাজার আর চায়খানা অপূর্ব। মোলস্না নাসিরুদ্দীনের জন্মস্থান এই বুখারা। এখানে তার একটা চমৎকার মূর্তি আছে, খচ্চরের পিঠে বসে আছেন তিনি। এই মূর্তির চারপাশে ছোট ছোট চায়খানা। দেখে মনে হবে, এরা সবাই যেন মোলস্না নাসিরুদ্দীনের গল্প বলছে। বুখারা-সমরখন্দের রাস্তায় রাস্তায় ধ্রুপদী সংগীত শোনা যায়। এই সব শিল্পী সারেঙ্গি-দোতারা ব্যবহার করেন। বুখারা হতে তাসখন্দের পথ প্রায় চারশো কি. মি.। এই রাস্তায় একদিকে রুক্ষ-মরু অঞ্চল, তাকে ঘিরে আছে তিয়েনশানের বরফ ঢাকা চূড়া, পামীর মালভূমি। অন্যদিকে মাইলের পর মাইল টিউলিপ ফুটে রয়েছে।

কাজাখস্তানে গেলে প্রথমেই চোখে পড়বে চিমিকেন্ট বলে একটা ছোট শহর। সেখান থেকে ফরঘনায় যাওয়া যায়। তাসখন্দ থেকে ফরঘনা যেতে প্রায় ১২ ঘন্টা সময় লাগে। আকাশ পথে আধঘন্টা। ফরঘনা সুলেমান পর্বত শ্রেণী, পামীর, তিয়েনশান পর্বতমালা দিয়ে ঘেরা। জানা যায়, ফরঘনা ছিল ফুলে ফুলে ভরা আশ্চর্য সুন্দর এক রাজ্য। এখানে বৃষ্টি হয় না। চারদিকের পর্বতের বরফগলা পানি মাটির তলা দিয়ে যাবার ব্যবস্থা ছিল বলে ফরঘনা এত সবুজ। ফরঘনায় আন্দিজান আর ওশ- এই দুটোই বড় শহর। আন্দিজান মোঘল সম্রাট বাবরের জন্মস্থান। এ শহরে সারা বছর ফুলে ভর্তি থাকে। রাস্তায় রাস্তায় গোলাপ ফুলের গাছ। সর্বত্র পানির ব্যবস্থা উন্নত। এই কৃত্রিম পানির ব্যবস্থা না থাকলে ফরঘনা মরুভূমি হয়ে যেতো।

কিরঘিজস্তান পুরোটাই পার্বত্য অঞ্চল। তিয়েনশান পর্বতমালা দিয়ে ঘেরা। এর একদিকে চীন, একদিকে উজবেকিস্তান, একদিকে কাজাখস্তান। কিরঘিজরা যাযাবর উপজাতি। এদের মধ্যে অনেকেই গরমকালে তাঁবুতে থাকে। এগুলোকে ইয়ুর্দ বলে। এখানের মানুষের মধ্যে অদ্ভুত সরলতা। বিসকেক এখানের উলেস্নখযোগ্য শহর। এখানের ওশ বাজার বিখ্যাত। বিসকেক থেকে ইসুকুল লেক ঘন্টা চারেকের পথ। সাড়ে সাত-আট হাজার ফিট ওপরে চলিস্নশ বর্গ কি. মি. জায়গা নিয়ে বিশাল এই ইসুকুল লেক। এর চারদিকে তিয়েনাশান পর্বতমালা। জেনেভা, কানাডার হ্রদ অঞ্চলের চেয়েও নাকি এটি সুন্দর। নোনা পানির হ্রদ। তাই শীতকালে চারদিকে বরফ থাকলেও এই হ্রদের পানি জমে না, আর পানির রঙও তেমনি একেবারে টলটলে নীল। হ্রদের চারপাশে ছোট ছোট কিরঘিজ গ্রাম। ইসুকুল হ্রদে সূর্যোদয়, সূর্যাস্তের দৃশ্যও অকল্পনীয়।

মহাদেশে মহাপস্নাবন

কল বিচারেই ভয়াবহ আকার ধারণ করিয়াছে অস্ট্রেলিয়ার বন্যা পরিস্থিতি। চরমে পেঁৗছিয়াছে বন্যাকবলিত হাজার হাজার মানুষের দুর্ভোগ। সংকটাপন্ন হইয়া পড়িয়াছে দেশটির অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ।

সেইসাথে ইহাও স্পষ্ট হইয়া গিয়াছে যে, গত কয়েক দশকের মধ্যে সর্বাপেক্ষা ভয়াবহ বলিয়া বিবেচিত এই বন্যার অভিঘাত শুধু অস্ট্রেলিয়ার অভ্যন্তরেই সীমাবদ্ধ থাকিবে না; বিশ্ব অর্থনীতিতেও ইহার নেতিবাচক প্রভাব অনিবার্যই বলা চলে। খাদ্যশস্য, বিশেষ করিয়া গমের বাজারে ইতিমধ্যে সেই আলামতও স্পষ্ট হইয়া উঠিয়াছে। কারণ বিশ্বের চতুর্থ বৃহৎ গম রফতানিকারী এই দেশটি আদৌ তাহাদের গম রফতানির প্রতিশ্রুতি পূরণ করিতে পারিবে কিনা তাহা লইয়া ব্যবসায়ীদের মধ্যে যথেষ্ট সংশয় রহিয়াছে। অস্ট্রেলিয়ার কয়লার উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল অর্থনৈতিক পরাশক্তি_জাপান, ভারত, ইউরোপ ও চীনসহ সংশিস্নষ্ট দেশগুলির উদ্বেগ আরও বেশি। কয়লা সরবরাহে বর্তমান অচলাবস্থা অব্যাহত থাকিলে ইহার প্রভাব সর্বব্যাপী হইতে বাধ্য। অতএব, এই উদ্বেগকে হালকা করিয়া দেখার কোনো অবকাশ নাই।

উলেস্নখ্য, ক্রিসমাসের ঠিক পূর্বক্ষণে শুরু হওয়া নজিরবিহীন এই বন্যায় ইতিমধ্যে ফ্রান্স ও জার্মানির আয়তনের সমপরিমাণ এলাকা তলাইয়া গিয়াছে। কৃষি খামার ও কয়লা খনিসমৃদ্ধ অস্ট্রেলিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য কুইন্সল্যান্ডের বিস্তীর্ণ এলাকা এখন পানির নীচে। সর্বাপেক্ষা উদ্বেগের বিষয় হইল, বন্যার তাণ্ডবে দেশটির সুবৃহৎ কয়লাশিল্পে উৎপাদন প্রায় বন্ধ হইয়া গিয়াছে। রেল ও সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হইয়া পড়ার কারণে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হইতেছে কয়লা ও খাদ্যশস্যসহ সামগ্রিক রফতানি বাণিজ্য। এমনকি দেশের অভ্যন্তরেও খাদ্যশস্য পরিবহন করা কঠিন হইয়া পড়িয়াছে। পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হইতে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত লাগিয়া যাইতে পারে বলিয়া সংশিস্নষ্ট কর্মকর্তারা মনে করেন। শুধু কৃষি খাতেই ক্ষতির পরিমাণ এক বিলিয়ন ডলার ছাড়াইয়া যাইতে পারে বলিয়া প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হইতেছে। অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির মাত্রাও কল্পনাকে হার মানাইতে পারে বলিয়া তাহাদের আশঙ্কা।

প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন যে, দীর্ঘদিন যাবৎ কারণে-অকারণে বাংলাদেশকে ঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও বন্যার দেশ বলিয়া পরিহাস করা হইত। অবস্থানগত কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগ যে আমাদের নিত্যসঙ্গী তাহাতে দ্বিমত করিবার কিছু নাই। তবে আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত দেশগুলিও যে অনুরূপ বা আরও ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হইতে পারে_ইলেকট্রনিক মিডিয়ার কল্যাণে ইতিমধ্যে তাহা বিশ্ববাসীর ভালোভাবেই জানা হইয়া গিয়াছে। অস্ট্রেলিয়া মহাদেশে এই মহাপস্নাবনের প্রধান শিক্ষাটি হইল, প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত হইতে কাহারও নিস্তার নাই। ধনী-গরিব এবং উন্নত-অনুন্নত কোনো দেশই দুর্যোগের ঝুঁকি হইতে মুক্ত নহে। আমেরিকায় উপর্যুপরি ঘূর্ণিঝড়ের ছোবল এবং সর্বশেষ অস্ট্রেলিয়ার বন্যার ভয়াবহতা বিশ্ববাসীকে তাহা আবারও মনে করাইয়া দিয়াছে মাত্র। দুর্যোগের চিত্র সর্বত্রই অভিন্ন। তফাত শুধু এইটুকু যে, দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি সামাল দেওয়ার জন্য উন্নত দেশগুলিকে কাহারও দ্বারস্থ হইতে হয় না। কারণ নিজেদের সমস্যা বা সংকট মোকাবিলার মতো সম্পদ ও প্রযুক্তি তাহাদের আছে। অস্ট্রেলিয়াও ব্যতিক্রম নহে। প্রধানত নিজেদের সম্পদ দিয়াই তাহারা বর্তমান বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলার উদ্যোগ গ্রহণ করিয়াছে। আমরা সেই উদ্যোগের সর্বাত্মক সফলতা কামনা করি। অস্ট্রেলিয়ার সরকার ও বন্যাদুর্গত জনগণের প্রতি রইল আমাদের গভীর সমবেদনা ও সহমর্মিতা।

পুলিশ সপ্তাহ ও পুলিশের সক্ষমতা

ত ৪ জানুয়ারী হইতে সারা দেশে পালিত হইতেছে পুলিশ সপ্তাহ ২০১১। পুলিশ বাহিনীর দক্ষতা ও গতিশীলতা বৃদ্ধিই ইহার মূল উদ্দেশ্য। এ উপলক্ষে ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ লাইন মাঠে উদ্বোধনী বক্তৃতাকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পুলিশ সদস্যদের ভয়-ভীতি ও অনুরাগ-বিরাগের বশবর্তী না হইয়া আন্তরিকভাবে কাজ করিয়া যাওয়ার আহ্বান জানাইয়াছেন।

আইনভঙ্গকারী সামাজিকভাবে যতই শক্তিশালী হউক, তাহাদের শাস্তি নিশ্চিত করার কথা বলিয়াছেন তিনি। প্রকৃতপক্ষে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা বিধানে পুলিশ বাহিনীর ভূমিকা সব সময়ই জরুরি ও অনস্বীকার্য।

বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম একটি জনবহুল দেশ। বেসরকারি হিসাবে এখানকার জনসংখ্যা ১৬ কোটি ছাড়াইয়া গিয়াছে। একেতো জনবহুল দেশ, তাহার উপর দারিদ্র্যপীড়িত। স্বাভাবিক কারণেই এখানকার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। অন্যদিকে, আধুনিক সমাজ জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দিক দিয়া যতই অগ্রসর হইতেছে, ততই অপরাধের গতি-প্রকৃতি বদলাইয়া যাইতেছে। কিন্তু সেই অনুযায়ী পুলিশ বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি না পাইলে তাহাদের নিকট হইতে কার্যকর ভূমিকা আশা করা যায় না। জানা মতে, পুলিশ বাহিনীর বর্তমান সদস্য সংখ্যা ১ লক্ষ ২৪ হাজারের অধিক। আর থানার সংখ্যা ছয় শতাধিক। সাম্প্রতিককালে পুলিশের কনস্টেবল হইতে শুরু করিয়া ইন্সপেক্টর পর্যন্ত ১৩ হাজার পদ সৃষ্টি করা হইয়াছে। তাহার পরও জনসংখ্যা অনুপাতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য সংখ্যা অনেক কম। প্রায় তেরশত মানুষের বিপরীতে রহিয়াছে একজন পুলিশ। এই অবস্থায় থানা ও পুলিশের সংখ্যা আরও বাড়ানো আবশ্যক। বিশেষত রাজধানীসহ বিভাগীয় শহরাঞ্চলে জনসংখ্যার অনুপাতে এরূপ সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনা করিয়া দেখা প্রয়োজন। কেহ কেহ মনে করেন, এখন ঢাকা শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডেই থানা স্থাপন করিতে হইবে।

পুলিশ বাহিনীর সক্ষমতা ও দক্ষতা বাড়ানোর কথা আমরা প্রায়শ বলিয়া থাকি। আসলে দক্ষতার বিষয়টি কেবল প্রশিক্ষণ, দৈহিক সামর্থ্য এবং বুদ্ধিমত্তার উপরই নির্ভর করে না। এজন্য আনুষঙ্গিক সরঞ্জামাদিও প্রয়োজন। আধুনিক বিশ্বে সমাজ ব্যবস্থা যেমন অনেক জটিল হইয়াছে, তেমনি যুদ্ধ-বিগ্রহ ও উত্তাপ-উত্তেজনায় অস্ত্র ব্যবসাও সম্প্রসারিত হইয়াছে। এখন একজন সাধারণ সন্ত্রাসীর কাছে যেই অস্ত্র আছে, তাহা অনেক সময় পুলিশের কাছেও থাকে না। আজকাল পৃথিবীর হতদরিদ্র ও পশ্চাৎপদ দেশেও পুলিশকে রাস্তায় দাঁড়াইয়া বা আইন অমান্যকারী গাড়ির পিছনে পিছনে দৌড়াইয়া দায়িত্ব পালন করিতে দেখা যায় না। অথচ ইহাই আমাদের এখানকার প্রাত্যহিক চিত্র। ইহা পুলিশের জীবনের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। গত এক দশকে দায়িত্ব পালন করিতে গিয়া সাড়ে তিনশতেরও বেশি পুলিশ নিহত হইয়াছেন যাহার ক্ষতি অপূরণীয়।

পুলিশের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ পৃথিবীর সব দেশেই আছে। তাহার পরও বাস্তবতা হইল, নানা আইনি সহায়তা ও নিরাপত্তার জন্য আমাদের পুলিশের কাছেই যাইতে হয়। আমাদের পুলিশ বাহিনী ১৮৬১ সালের পুরাতন আইন দ্বারা পরিচালিত হওয়ার কারণে নানা সমস্যাই হইতে পারে। ভারত ও পাকিস্তান ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের বিভিন্ন আইনের সংস্কার করিলেও এ ব্যাপারে আমরা এখনও দ্বিধান্বিত। প্রস্তাবিত পুলিশ অধ্যাদেশের প্রয়োজনীয় রদবদল শেষে নূতন আইন কার্যকর করা জরুরি। পুলিশের যানবাহন, আবাসন ও অন্যান্য ভৌত অবকাঠামো সংক্রান্ত সমস্যা দূর করিয়া সর্বপ্রকার লজেস্টিক সাপোর্ট বাড়াইতে হইবে। বাড়াইতে হইবে বেতন-ভাতাসহ নানা সুযোগ-সুবিধা। সেইসঙ্গে পুলিশ বাহিনীকে দায়িত্বশীল, অধিক সক্রিয় ও জনগণের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন হইতে হইবে।

আনওয়ার আহমদ স্মৃতিতে, শ্রদ্ধায় by মনি হায়দার

Saturday, January 22, 2011

তিনি ছিলেন কবি ও গল্পকার। কিন্তু সৃজনশীল এই দুটি মাধ্যমের মানুষ হয়েও আনওয়ার আহমদ এদেশের মানুষের অন্তরে বেঁচে আছেন সম্পাদক হিসেবে। কেনো তাঁর এই পরিচয়? এই পরিচয় তিনি তার কাজের ভেতর দিয়ে অর্জন করেছিলেন। বলতে দ্বিধা নেই_ সম্পাদক হওয়ার জন্যই তিনি জন্মেছিলেন এই বাংলায়।
আর একটু পরিষ্কার করে বললে বলতে হয়_ শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি লালনের জন্য আনওয়ার আহমদ সারা জীবন সাধনা করেছেন। শিল্পের মানুষদের বিপদে আপদে না ডাকলেও তিনি মমতার মন নিয়ে পাশে দাঁড়াতেন। না, বিনিময়ে তিনি কিছু কখনও চাইতেন না।। আমার ধারণা_ তিনি জানতেন_ এই সমাজের সবাই দুহাত পেতে নেয়, দিতে পারে না কিছুই। নেয়াটাই মোক্ষ। নেয়াটাই ধ্যান। নেয়াটাই যেন অধিকার। নিঃশেষে প্রাণ উজাড় করে দিতে পারে কম লোক। আনওয়ার আহমদ এই 'কম' দলের মানুষ ছিলেন আজীবন, আমৃতু্য।

১৯৬৫ সালে সম্পাদক হিসেবে তিনি সিনে পত্রিকা 'রূপম' প্রকাশ শুরু করলেন। ১৯৪১ সালে জন্ম নিলে তখন তাঁর কতইবা বয়স? চবি্বশ বছর মাত্র। চবি্বশ বছরের যুবকের সম্পাদক হওয়া, স্বপ্ন ও সাহিত্য ফেরি করে বেড়ানো_ সেকালের প্রাদেশিক রাজ্য পূর্ব বাংলায় ছিল সাহসী এবং ব্যতিক্রম। কালের পরিভ্রমণে বাংলাদেশে 'রূপম' হয়ে দাঁড়ালো গদ্যের বা গল্প বিষয়ক একমাত্র পত্রিকা। মৃতু্যর কয়েকদিন আগে শেষ সংখ্যাটি প্রকাশ করেছিলেন পেনশনের টাকায়। বগুড়া তাঁর জন্মস্থান। বগুড়ার তরুণ লেখকদের তিনি ছিলেন আশ্রয়স্থল। কেবল বগুড়া নয়_ঢাকার অনেক লেখক তাঁর বাসায় দিনের পর দিন আড্ডা দিয়েছেন। তাঁর অর্থে লালিত হয়েছেন। অনেক লেখকের প্রথম বই নিজের টাকায় প্রকাশ করেছেন তার 'রূপম' প্রকাশনী থেকে। সেই বই আবার নিজে জনে জনে বিলি করেছেন। পত্রিকা অফিসের সাহিত্য সম্পাদককে দিয়ে আলোচনা ছাপানোর ব্যবস্থা করেছেন।

আশির দশকের শুরুতে ঢাকা শহরের জাতক হলেও আনওয়ার আহমদ সম্পর্কে জানতে পারি আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে। কয়েকবার তাঁর ইস্কাটনের বাসায় গেলেও তাঁর সঙ্গে তখন অভিজ্ঞতাবোধের কারণে খাপ খাওয়াতে পারিনি। সে সময়ে তাঁর সঙ্গে আমার জমেনি। কিন্তু জমলো তাঁর জীবনের শেষ পাঁচ ছয় বছরে। আমার অফিস ছিল শাহবাগে, বেতারে। তিনি থাকতেন লালমাটিয়ায়। প্রায় প্রতিদিন দুপুরে আসতেন শাহবাগের আজিজ মার্কেটে। আমিও আসতাম। জমে উঠতো আড্ডা। তখনও আজিজ মার্কেটে হাল ফ্যাশনের পোশাকের আসর বসেনি। লেখক-শিল্পীদের পদভারে মুখরিত থাকতো। সেই জমানো আলাপে আড্ডায় দেখেছি_ তাঁর ভেতরে বাস করে এক আশ্চর্য অবোধ অভিমানী শিশুমন। তিনি কোলকাতায় কি একটা কাজে বেড়াতে যাবেন। আমাকে বরলেন_ কাউকে দিয়ে পাসপোর্টের ব্যবস্থা করতে। পাসপোর্টের কাজ করে এমন একজনকে পরিচয় করিয়ে দিলাম আনওয়ার ভাইয়ের সঙ্গে। তাকে টাকা পয়সাও দিলেন আনওয়ার ভাই। কিন্তু পাসপোর্ট পেতে দুদিন কি তিনদিন দেরি হলো। আনওয়ার ভাই আমার ওপর অসম্ভব চটে গেলেন। পাসপোর্ট নির্দিষ্ট সময়ে হাতে না পাওয়া যেন আমার অপরাধ। খুব কড়া কথা বললেন।

আমি মনে মনে ভাবলাম_এমন অবিবেচক মানুষের সঙ্গে আর সম্পর্ক রাখবো না। পাসপোর্ট হাতে পাওয়ার পর গণ প্রকাশনীর দোকানে আমার কাছে চিঠি লিখলেন দুঃখ প্রকাশ করে। আমাকে দুপুরে ভুড়িভোজ করালেন। আমাদের স্বল্পকালীন অভিমার পর্ব এখানেই সমাপ্তি ঘটে। অবশ্য এই রকম অভিমান পর্ব প্রায়ই ঘটতো_ যার কোনো প্রয়োজন থাকতো না। কিন্তু ওই যে তাঁর ভেতরে বাস করতো এক অবাক অভিমানী মন! আমি শুনেছি তাঁর অন্যতম সুহূদ বন্ধু আবদুল মান্নান সৈয়দের সঙ্গে প্রায়ই ঝগড়া লেগে থাকতো। দুমাস, ছয় মাস কথা বা যোগাযোগ বন্ধ থাকতো দুজনের মধ্যে। আবার একদিন মান ভুলে দু'জনে আড্ডায় মেতে উঠতেন। আমি অনেক লেখককে দেখেছি_ আনওয়ার ভাইকে দেখে পালিয়ে বেড়াতেন। কারণ_ সম্পাদক আনওয়ার আহমদ তাঁর গল্প পত্রিকা 'রূপম' অথবা কবিতা পত্রিকা 'কিচ্ছুধ্বনী'র জন্য লেখা চেয়েছেন। তিনি লেখা চেয়ে লেখা না পাওয়া পর্যন্ত লেখককে অতীষ্ঠ করে তুলতেন। তিনি যে লেখককে নির্দিষ্ট করতেন তার আগামী সংখ্যার লেখার জন্য, তার কাছ থেকে দুই পদ্ধতিতে লেখা আদায় করতেন। প্রায় দুদিন পর পর ছোট্ট কাগজে তাগাদা দিয়ে খামে চিঠি লিখতেন। নইলে বাসায় ফোন থাকলে_ সকালে দুপুরে বিকেলে রাতে ফোন করে করে লেখা আদায় করে তবে ক্ষান্ত হতেন।

আনওয়ার ভাই মাঝারি গড়নের প্রায় কালো রঙের মানুষ ছিলেন। মুখটা ছিল মায়াবি। চোখে থাকতো স্বপ্ন। সব সময়ে পড়তেন সাদা শার্ট আর প্যান্ট। এখন আমার মনে হয়_ সাদা পোশাক পরিধানের ভেতর দিয়ে তিনি তাঁর ভেতরের সাদা সত্তাকে প্রকাশ করতেন।

শেষ জীবনে একা থাকতেন লালমাটিয়ার ফ্ল্যাটে আনওয়ার আহমদ। চারপাশে তাঁর সবই ছিল, তারপরও কিছু ছিল না। প্রথম জীবনের মানুষগুলো তাঁর কাছ থেকে নানা কারণে দূরে ছিল। তবে তিনি কখনও একা থাকতেন না। সব সময় তাকে ঘিরে একটা আড্ডা গড়ে উঠতোই। আজিজ মার্কেটের নিচতলায় দুটো বইয়ের দোকান ছিল পাশাপাশি। একটা গণ প্রকাশ। অন্যটি পলল প্রকাশনী । এই দুটি দোকান ঘিরে আড্ডা জমতো। তবে বেশি জমতো গণ প্রকাশে। তার বন্ধুরা বা আড্ডার মানুষেরা সব সময়ে তাঁর বয়সের চেয়ে অনেক কম বয়সের থাকতো। তিনি আশ্চর্য দক্ষতায় ও মমতায় তরুণদের ভেতরে নিজেকে জারিত করতে পারতেন। পারতেন উজ্জীবিত করতে।

মনে পড়ে তাঁর মৃতু্যদিনের গল্প। হঁ্যা_ গল্পই। ২০০৩ সালের ২৩ ডিসেম্বর বিকালে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে একটি সাহিত্য সংগঠন বেশ কয়েকজনকে সংবর্ধনা দিয়েছিল। তার মধ্যে আনওয়ার ভাইও ছিলেন। যেহেতু আনওয়ার ভাই সংবর্ধিত ব্যক্তি, সেহেতু আমরাও সেখানে উপস্থিত হলাম। সংবর্ধনা শেষে আনওয়ার ভাই হঠাৎ ঘামতে শুরু করলেন। আমরা_ মানে আমি, কবি মিজান রহমান, খায়রুল আলম সবুজসহ আরও অনেকে। সবুজ ভাই তাঁকে বিশ্রাম নিতে বললেন। আনওয়ার ভাই একটা টেবিলের উপর শুয়ে পড়লেন। কে কোথা থেকে কি একটা ঔষধ এনে দিলে আনওয়ার ভাই মুখে দিলেন এবং আমাদের সঙ্গে আম গাছতলায় এসে আড্ডায় বসলেন। সবুজ ভাই তাঁকে যতো শুয়ে থাকতে বলেন তিনি কেয়ার করেন না। আসলে তিনি আড্ডা ছেড়ে শুয়ে আছেন ভাবাই যায় না। আড্ডা দিতে দিতে রাত নটার দিকে, তাও সবুজ ভাইয়ের ধমকে _ আমরা উঠতে বাধ্য হলাম। বাংলা মোটরেরর মোড়ে এসে একটা রিকশায় তুলে রিকশাঅলাকে বললাম_ রিকশাঅলা ভাই, এই বয়স্ক মানুষটাকে যত্নের সঙ্গে পৌঁছে দিও।

আনওয়ার ভাই প্রতিবাদ করে বললেন_ এই রিকশাঅলা, আমি না ওরাই বয়স্ক। আমি চির তরুণ। রিকশাঅলা সহ আমরা হাসলাম। রিকশা চলে গেলে আমরা যে যার বাসায় চলে গেলাম। পরের দিন সকাল সাড়ে নটার দিকে 'উষালোকে' সম্পাদক মোহাম্মদ শাকেরউলস্নাহ ফোন করে মর্মান্তিক খবরটা জানালেন। আনওয়ার ভাই ছোট ছোট গল্প লিখেছেন অনেক। প্রায় অণু গল্প। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে তাঁর একলা ঘরে তিনি নিজেই একটা অণুগল্প হয়ে গেলেন_ ২৪ ডিসেম্বর ২০০৩ এ রাতে পরম মৃতু্যকে আলিঙ্গন করে।

পরের দিন বিকেলে আজিজ মার্কেটে পলল প্রকাশনীতে তাৎক্ষণিক এক স্মরণসভার আয়োজন করেছিলাম। সেখানে অনেক মানুষের সমাবেশ হয়েছিল আনওয়ার ভাইকে মনে রেখে। শুধুমাত্র শিল্পের জন্য একজন মানুষ কতোবড় ত্যাগ করতে পারেন, তিনি তাঁর উজ্জ্বল উদাহরণ। তাঁর মৃতু্যর পর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে আয়োজিত এক স্মরণসভায় আবদুলস্নাহ আবু সায়ীদ বলেছিলেন_ 'আনওয়ার আহমদ শিল্পের শহীদ'। তিনি যথার্থই বলেছিলেন। বাংলা কথাসাহিত্যের পুরুষোত্তম আখতারুজ্জামান ইলিয়াস একটা লেখায় আনওয়ার আহমদকে সত্যিকারের সম্পাদক হিসেবে অভিহিত করেছিলেন , দুজনেরই জীবদ্দশায়। এই বাংলাদেশে তিনি তাঁর কাজের তেমন কোনো স্বীকৃতি পাননি। তাঁর ভেতরে দুঃখবোধ থাকলেও কখনও প্রকাশ করেননি।

আনওয়ার আহমদের প্রকাশিত কাব্যের সংখ্যা_পনেরোটি। বিখ্যাত কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ_ রিলকের গোলাপ, মানবসম্মত বিরোধ, নির্মাণে আছি, হঠাৎ চলে যাবো, শেষ সম্বল শেষ দান। গল্পের বই চারটি। আরও বেরিয়েছিল_ আনওয়ার আহমদের শ্রেষ্ঠ কবিতা, আনওয়ার আহমদের গল্প। এ ছাড়াও আর অনেক কাজ তিনি করেছেন, যা আমরা মনে রাখিনি।

আগেই বলেছি, এদেশে আনওয়ার আহমদ কোনো পুরস্কার পাননি। ট্রাজেডি হচ্ছে তাঁর মৃতু্যর সাত মাস পর কোলকাতার লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরী ও গবেষণা কেন্দ্র থেকে তাঁকে পুরস্কৃত করে চিঠি দিয়েছিল। সেই চিঠি ও পুরস্কার গ্রহণ করেছিলেন তাঁর পুত্র নাজিম আনওয়ার রূপম। এটাও একটা গল্প।

আনওয়ার ভাই, আপনার সপ্তম মৃতু্যদিবসে আপনাকে প্রণতি জানাই। মরণসাগর পাড়ে আপনি ভালো থাকুন। জানি_আমাদের যাবতীয় দীনতাকে ক্ষমা চাইবার আগেই ক্ষমা করে দিয়েছেন আপনি আপনার স্বভাব অনুসারে।

আবুল হুসেন 'বুদ্ধির মুক্তি' আন্দোলনের পথিকৃৎ

'জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব'_এই আপ্তবাক্য সামনে রেখে বিংশ শতাব্দীর প্রথিতযশা দার্শনিক আবুল হুসেন তাঁর 'বুদ্ধির মুক্তি' আন্দোলনের সূচনা করেন। বাঙালি মুসলমান সমাজের যুগ যুগান্তরের আড়ষ্ট বুদ্ধিকে মুক্ত করে জ্ঞান-পিপাসা জাগিয়ে তোলাই ছিল, তাঁর 'বুদ্ধির মুক্তি' আন্দোলনের লক্ষ্য।

তাঁর দর্শনের মূল নির্যাস ছিল মুক্তচিন্তার অনুশীলন। স্বাধীন মতপ্রকাশকে তিনি স্বজাতির আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক মুক্তির পূর্বশর্ত বলে মনে করতেন। বাঙালি মুসলমানদের আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার অনীহার সমালোচনা করে আবুল হুসেন বলেন, 'আমাদের শিক্ষাঙ্গনেই আমরা জ্ঞানের সঙ্গে বিরোধ করে আসছি। দর্শন, বিজ্ঞান ও আর্টকে আমাদের শিক্ষা কেন্দ্র হতে গলাধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছি, এই ভয়ে_পাছে আমাদের ধর্ম নষ্ট হয়। ধর্ম আমাদের এতই নাজুক!'

জন্ম পরিচিতি, শিক্ষা ও রচনাবলি

অবিভক্ত বাংলার প্রথিতযশা প্রাবন্ধিক, সমাজ সংস্কারক, চিন্তাবিদ ও দার্শনিক আবুল হুসেন ১৮৯৬ খ্রিষ্টাব্দের ৬ জানুয়ারি যশোর জেলার পানিসারা গ্রামে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস যশোরের কাউরিয়া গ্রামে। পিতা হাজী মোহাম্মদ মুসা ছিলেন একজন বিশিষ্ট আলেম।

শিক্ষা জীবনে ১৯১৪ খ্রীষ্টাব্দে আবুল হুসেন যশোর জেলা স্কুল হতে মেট্রিকুলেশন, কোলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ হতে আইএ ও বিএ এবং কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় হতে ১৯২০ সালে অর্থনীতিতে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯২২ সালে বিএল এবং ১৯৩১ সালে এমএল ডিগ্রি লাভ করেন।

পেশাগত জীবনে কোলকাতার হেয়ার স্কুলের শিক্ষকতা দিয়েই কর্মজীবন শুরু করেন। বছর খানেক পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি ও বাণিজ্য বিভাগের লেকচারের পদসহ মুসলিম হলের হাউস টিউটর নিযুক্ত হন ১৯২১ সালে। ১৯৩২ খৃষ্টাব্দে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকুরী ছেড়ে কোলকাতা হাইকোর্টে আইন পেশায় নিয়োজিত হন। অবিভক্ত বাংলার বিধান সভায় পাশকৃত ওয়াক্ফ আইনের খসড়া আবুল হুসেনই প্রস্তুত করেন।

মানবদরদী আবুল হুসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকুরী কালীন সময় হতেই 'শিক্ষা ও জ্ঞানের আলো' বিতরনের মাধ্যমে মানুষের মাঝে সচেতনতা আনায়নে কাজ শুরু করেন। কৃষি নির্ভর দেশ মাতৃকার কৃষক সমাজের দুঃখ দুর্দশার মুক্তির পথ নির্দেশনায় তিনি কৃষকের আর্তনাদ, কৃষকের দুর্দশা, কৃষি বিপস্নবের সূচনা নামক প্রবন্ধ রচনা করেন। ঢাকায় যে 'বুদ্ধির মুক্তি' আন্দোলনের সূত্রপাত হয়, যার মূলমন্ত্র ছিল- "জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব' তার নেতৃত্ব দেন অগ্রভাগে থেকেই। তিনি ঢাকায় মুসলিম সাহিত্য সমাজ গঠনের সাথে জড়িত ছিলেন এবং এর মুখপত্র 'শিখা' সম্পাদনা ও প্রকাশ করে এর আন্দোলনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন। কাজী আবদুল ওদুদ, কাজী মোতাহার হোসেন, ডঃ মুহাম্মদ শহীদুলস্নাহ্ ও আবুল ফজল তাঁকে এ কাজে সহযোগিতা করেন।

অন্ধভাবে ধর্ম ও সমাজবিধি পালন নয়; মুক্তবুদ্ধি ও যুক্তি দ্বারা ধর্ম ও প্রথাকে যাচাই করার পক্ষে তিনি জোড়ালো মতামত উপস্থাপন করেন। এতে ঢাকার রক্ষনশীল মুসলিম সমাজ ক্ষিপ্ত হয়ে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলে। যার ফলশ্রুতিতে ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দে আবুল হুসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকুিরতে ইস্তফা দিয়ে কোলকাতায় চলে যেতে বাধ্য হন। সেখানে তিনি আইন ব্যবসা শুরু করেন।

মাত্র ৪৩ বছর বেঁছে ছিলেন এই বাঙালি মনীষা। ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ১৯৩৮ সালের ১৫ অক্টোবর কোলকাতায় মৃতু্যবরণ করেন। এই ছোট্ট জীবনকালে তিনি 'মুসলমানদের শিক্ষা সমস্যা, মুসলিম কালচার, বাঙলার নদী সমস্যা, শতকরা পঁয়তালিস্নশের জের, সুদ রিবা ও রেওয়াজ, নিষেধের বিড়ম্বনা, ঐবষড়ঃ্থং ড়ভ ইবহমধষ, জবষরমরড়হ ড়ভ ঐবষড়ঃং ড়ভ ইবহমধষ, উবাবষড়ঢ়সবহঃ ড়ভ গঁংষরস ষধ িরহ ইৎরঃরংয ওহফরধ নামক গ্রন্থসমূহ রচনা করেন। তাঁর রচনায় মুক্তবুদ্ধি, উদার চিন্তা ও অসামপ্রদায়িক সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার প্রতিফলন ঘটেছিল।

আবুল হুসেনের দর্শন, বুদ্ধির মুক্তি

১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারিতে ঢাকায় ড. মুহাম্মদ শহীদুলস্নাহ্র নেতৃত্বে 'মুসলিম সাহিত্য সমাজ' গঠিত হয়। এই সংগঠনের মূল লক্ষ্য ছিল সাহিত্য চর্চার মাধ্যমে বাঙালি মুসলমানদের সমাজ সচেতন করে তোলা। নানারূপ অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার হতে মুক্ত করা। এই সংগঠনটির নাম মুসলিম সাহিত্য সমাজ হলেও এর কর্মকান্ড আবর্তিত হত হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে সকল বাঙালির জন্য। এই সংগঠনের মুখপত্র ছিল 'শিখা' সে সূত্রে এর সঙ্গে যারা যুক্ত ছিলেন তাঁরা 'শিখা গোষ্ঠীর' লেখকরূপে পরিচিত হন। মুসলিম সাহিত্য সমাজের মূলমন্ত্র ছিল বুদ্ধির মুক্তি। আর এই শিখার সম্পাদক-প্রকাশক হিসাবে আবুল হুসেন ছিলেন 'বুদ্ধির মুক্তি' আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিদের অন্যতম। শিখা গোষ্ঠীর অন্যান্য লেখকদের মধ্যে কাজী আবদুল অদুদ, (১৮৮৭-১৯৪৮) কাজী মোতাহার হোসেন (১৮৯৭-১৯৮১), কাজী আনোয়ারুল কাদির (১৮৮৭-১৯৪৮) মোতাহের হোসেন চৌধুরী (১৯০৩-৫৬) আবুল ফজল এবং আবদুল কাদির (১৮৮৭-১৯৪৮) এর নাম উলেস্নখযোগ্য। মুসলিম সাহিত্য সমাজের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্বন্ধে আবুল হুসেন বলেন, 'বাঙালি মুসলমান সমাজের যুগ-যুগান্তরের আড়ষ্ট বুদ্ধিকে মুক্ত করে জ্ঞানের অদম্য পিপাসা জাগিয়ে তোলা।'

আবুল হুসেনের দর্শনের মূল নির্যাস ছিল মুক্তচিন্তার অনুশীলন। স্বাধীন মত প্রকাশকে তিনি স্বদেশের স্বজাতির আর্থ সামাজিক ও রাজনৈতিক মুক্তির পূর্বশর্ত বলে মনে করতেন। বাঙালি মুসলমানদের আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চার অনীহার সমালোচনা করে আবুল হুসেন বলেন- আমাদের শিক্ষাঙ্গনেই আমরা জ্ঞানের সঙ্গে বহুদিন হতে বিরোধ করে আসছি। দর্শন, বিজ্ঞান ও আর্টকে আমাদের শিক্ষা কেন্দ্র হতে গলাধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছি, এই ভয়ে- পাছে আমাদের ধর্ম নষ্ট হয়। ধর্ম আমাদের এতই নাজুক।

"ব্রিটিশের সঙ্গে ইউরোপের জ্ঞানদীপ্ত মন যখন এ দেশে আসলো এবং আমাদের আড়ষ্ট মনকে আঘাত করল, তখন হিন্দু সমাজ সে আঘাতে জেগে উঠলো এবং জ্ঞানদীপ্ত মনকে বরণ করে নিল। আর আমরা মুসলমানরা সে আঘাতে জাগতে তো চাই-ই নি বরং চোখ রাঙিয়ে সে মনকে দূরে সরিয়ে দিয়েছি। ইয়োরোপের জ্ঞানকে আমরা প্রত্যাখ্যান করেছি। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, আজ পর্যন্ত আমরা আমাদের সে নিদারুণ ভুলের সংশোধনের চেষ্টা করি নাই। বরং সে ভুলকে বর্তমানে আরো জোর করে আঁকড়ে ধরেছি।"

জ্ঞান সাধনাই ছিল জ্ঞান তাপস আবুল হুসেনের জীবন দর্শন। তাই তো তিনি তাঁর প্রথম পেশা হিসাবে শিক্ষাকতাকেই বেছে নিয়েছিলেন। থাকতে চেয়েছেন শিক্ষকতায় মনে প্রাণে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় যোগ দেবার পাশাপাশি নিজের সাহিত্য সাধনা ও সমাজ সংস্কারমূলক কর্মকান্ডের মাধ্যমে এদেশের সাধারণ মানুষকে জ্ঞানের পথে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছেন। বাঙালির মধ্যে জ্ঞানস্পৃহা জাগরণে আবুল হুসেনের বাংলার বলশী (১৩৩২ বঙ্গাব্দ) এবং বাঙালি মুসলমানের শিক্ষা সমস্যা (১৩৩৫) অসমান্য অবদান রেখেছে। আবুল হুসেনের দর্শনের মূল কথা ছিল 'জ্ঞানেই মুক্তি' আর বুদ্ধির মুক্ত চর্চা ছাড়া জ্ঞানের ফল সার্বিকতা পায় না। তাই তিনি মুসলিম সাহিত্য সমাজের মুখপত্র 'শিখা' সম্পাদনার মধ্য দিয়ে "জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব"। এই শেস্নাগানের মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে বুদ্ধির মুক্তির জন্য কাজ করেন।

আবুল হুসেন এর দর্শনে মানবতাবাদ ও অসামপ্রদায়িকতা

বাঙালি মানবতাবাদী দার্শনিক হিসাবে আবুল হুসেন মানসে লালন করতেন অসামপ্রদায়িক মানবতাবাদের আদর্শ। যার প্রমাণ আবুল হুসেন এর নিজের লেখনিতেই পাওয়া যায়। মুসলিম সাহিত্য সমাজের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য প্রসঙ্গে লিখিত নিবন্ধে তিনি লিখেন, 'কেহ হয়ত মনে করবেন এ সমাজের নাম 'মুসলিম সাহিত্য সমাজ' হওয়ায় হিন্দু সাহিত্যিকগণের কোন সম্পর্ক এতে নেই। কিন্তু এই বার্ষিক রিপোর্ট হতে আপনারা বুঝবেন যে এ সমাজ কোন একটি নির্দিষ্ট গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ নয় কিংবা এ কোন এক বিশেষ সামপ্রদায়িক উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য গঠিত হয়নি। সাহিত্য সৃষ্টি এর উদ্দেশ্য, আর সেই সাহিত্যে মুসলমানের প্রাণ ও জীবন ফুটিয়ে তোলাই ইহার অন্যতম উদ্দেশ্য।'

সত্যই তাই আবুল হুসেনের সম্পাদনায় 'শিখা' বাংলার তরুণদের মনে উদার মনোভাব সৃষ্টির জন্য নিরলস ভাবে কার্যকর ছিল। মুসলিম সাহিত্য সমাজের ব্যানারে শিখা গোষ্ঠীর কার্যক্রম উভয় বাংলার জ্ঞানী গুণীদের আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়েছিল। যার প্রমান মিলে- ১৯২৭ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত মুসলিম সাহিত্য সমাজের প্রথম বার্ষিক সাধারণ সম্মেলনে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, চারুচন্দ্র বন্দোপাধ্যায়, মোহিত লাল মজুমদার, ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার প্রমুখ হিন্দু মনীষার অংশ গ্রহণ। যা আবুল হুসেনসহ সমগ্র শিখা গোষ্ঠীর অসামপ্রদায়িক উদারমনা মানবতাবাদেরই পরিচয় বহন করে।

জ্ঞানের অনুরাগী আবুল হুসেন এদেশের সমাজ, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও আইনকে যুক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াসে আজীবন কাজ করেছেন। মানব কল্যাণে আবুল হুসেনের ভাবনা ছিল উপযোগবাদী। আবুল হুসেন নিজে একজন কমিউনিষ্ট না হলেও তৎকালীন রুশ সমাজতান্ত্রিক বিপস্নব দ্বারা ব্যাপক ভাবে প্রভাবিত হন। ঔপনিবেশিক ও সামন্তবাদী সমাজের নিপীড়িত কৃষকের অবস্থা সবিস্তারে বর্ণিত হয়েছে তাঁর 'বাংলার বলশী' পুস্তকে।

আবুল হুসেনের দর্শন ও কর্মের মূল্যায়ন

চিন্তাবিদ হিসাবে আবুল হুসেন ছিলেন মানবতাবাদী, সংস্কারপন্থী ও মুক্তচিন্তার পৃষ্ঠপোষক। জ্ঞান চর্চায় তিনি যুক্তি বুদ্ধিকেই প্রাধান্য দিয়েছেন সর্বাধিক। আর এই যুক্তি বুদ্ধি ও প্রজ্ঞা প্রীতির কারণেই তৎকালে তিনি লিখতে পেরেছিলেন, "অন্যান্য ধর্মের ন্যায় ইসলামও কতগুলি আদেশ ও নিষেধের সমষ্টি মাত্র। ইসলাম মানুষের জন্য, মানুষ ইসলামের জন্য নয়। কালের পরিবর্তনে ধর্মশাস্ত্রের কথা মানুষ পুরোপুরি পালন করতে পারে না। যেহেতু, সংসারের উন্নতির জন্যই মূলত ধর্ম বিধানের সৃষ্টি, সেহেতু, যুগের সাথে সংসারের উন্নতির জন্য ধর্ম বিধানও পরিবর্তনীয়। নবীজীর অমোঘ বাণী-যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলো এবং জ্ঞান অর্জনের জন্য প্রয়োজন হলে চীন দেশে যাও, আমরা ভুলতে বসেছি।

ইসলামের অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কার এবং স্বদেশ স্বজাতির উদ্দেশ্যে ইসলামের যুক্তিনিষ্ঠ স্বরূপ উপস্থাপন করে, 'আদেশের নিগ্রহ' নামের যে প্রবন্ধ আবুল হুসেন লিখেছেন; তৎকালীন রক্ষনশীল মুসলিম সমাজে তার ভয়াবহ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। তারা আবুল হুসেনকে ইসলামের শত্রুরূপে আখ্যায়িত করে। আহসান মঞ্জিলের এক সালিসিতে উপস্থিত হয়ে তাঁকে লিখিত ভাবে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করে। ইসলাম সবযুগের সব স্থানের সব মানুষের সব প্রয়োজন মিটাতে ও সব সমস্যার সমাধান দিতে পারে না বলে তিনি মনে করেন এবং বলেন, 'সে প্রয়োজন মিটাতে হবে আমাদের জ্ঞান বুদ্ধি খাটিয়ে'। তাঁর প্রবন্ধের এটাই ছিল সারমর্ম। আবুল হুসেন পরের দিন সাহিত্য সমাজের সম্পাদকের পদ এমনকি সদস্য পদও ত্যাগ করেন এবং পরিশেষে ঢাকা ত্যাগ করে কলিকাতায় গমন করেন।

আবুল হুসেন ছিলেন সাহসী মানুষ। স্বাধীন যুক্তিবাদী ও মুক্তচিন্তা চর্চা তখনো এদেশে সহজ ছিল না, এখনো নেই। এজন্য আহমদ শরীফ আবুল হুসেন সম্পর্কে বলেন, 'শিখা আন্দোলনের প্রাণ পুরুষ ছিলেন আবুল হুসেন। তিনি সংস্কারক বিবেকবান পুরুষ তাই তাঁর স্বল্পকালীন জীবন নিবেদিত ছিল স্বদেশের, স্বসমাজের ও স্বজাতির কল্যাণ চিন্তায় ও হিত সাধনে। দেশ, মানুষ, ধর্ম, ন্যায় ও কল্যাণ সম্বন্ধে তার চিন্তা চেতনায় কিছু কিছু অনন্যতা ছিল।'

পরিশেষে আহমদ শরীফের মূল্যায়ন দিয়েই শেষ করছি, 'আবুল হুসেন চিন্তা চেতনায় ছিলেন মানবতাবাদী। তাই তিনি অসামপ্রদায়িক, উদার, শ্রেয়োবাদী ও হিতবাদী এবং দৈশিক জীবনের সর্বক্ষেত্রে হিন্দু মুসলিম মিলনকামী ও গনহিতে মিলিত প্রয়াসকামী। নিরঙ্কশ প্রীতিই এ বন্ধনসূত্র ও মিলন সেতু।'

আর আমাদের লজ্জা হলো এমন তরো দর্শন অনুরাগী বুদ্ধির মুক্তির আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিকে কিনা শেষ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার চাকুরী ছেড়ে কোলিকাতায় যেতে বাধ্য করেছে। এটি অবশ্যই বাঙালির দর্শনের অপরিমেয় ক্ষতি।

ফরিদপুরে 'সেলিম আল দীন স্মরণোৎসব' by জাহারাবী রিপন

সাংসারিক চলমানতা ও যোগাযোগের নৈয়ায়িক ভেদবুদ্ধির কারণে ভ্রমণের সঙ্গে গতি ও গন্তব্যের যোগ প্রত্যক্ষ করি। যে চলেছে তার গতি আছে তবে গন্তব্যের ঘরে। কিন্তু সেখানে পেঁৗছানোর পরে গতি স্তব্ধ হয় নাকি! ঘরে পেঁৗছালেই গতি শেষ হয়ে যায় না।

সে তখনও অবিরাম চলতে থাকে। তাই তো কবি বলেন_ গতিতে জীবন মম স্থিতিতে মরণ। জঙ্গম জীবনে তবে স্থিতি নেই। ক্ষণিক অবসরে যেটুকু স্থিরতা জ্ঞান করি, তাও প্রাকৃত অর্থে স্থির নয়_ চলছে। তবে কি আমরা জীবন ঘরে বসে অবিরাম চলমানতার ছবি অঙ্কন করে চলেছি? অদৃশ্য তুলি ও ক্যানভাসে মন তবে ছবি অঙ্কন করে। গতি ও গন্তব্যের ঘরে ভ্রমণের ছবি! যার দেখার প্রখর দৃষ্টি_ দেখবে বলে জীবনের চলচ্ছবিতে কিছু ভ্রমণ অভিজ্ঞতার দৃশ্য সংযোজন করছি।

ডিসেম্বরের শুরুকালে শীতের শর্ষে ফুলের ভর দুপুরে প্রান্তর পারায়ে ঢাকা থেকে গেলাম ফরিদপুরে। শুক্রবার_৩ ডিসেম্বর। শীতের কাঁপন লাগা ভোরে গন্তব্য পথে যথারীতি নির্ধারিত বাহনের জন্য ঢাকার টেকনিক্যাল মোড়ে অপেক্ষা করছি। মাথায় শীত সকালের কুয়াশামাখা মস্নান সূর্য ক্রমে কুয়াশা ভেদ করে উত্তাপ ছড়াতে থাকে। ক্রমশ শীত কমে আসে। মোবাইলে রিং বাজলে ধরি। ঢাকার নাট্যসংগঠন 'স্বপ্নদল'-এর প্রধান সম্পাদক জাহিদ রিপনের কণ্ঠ। তিনি প্রায় আহত কণ্ঠে বলেন_গাড়িতে ঝামেলা হয়েছে, আসতে বিলম্ব হতে পারে_ আমরা শ্যমলী আছি, আপনি চলে আসেন। আহ্বানে সাড়া দিতে টেকনিক্যাল থেকে শ্যামলীর উদ্দেশে বাসে উঠি। পেঁৗছে পথে নেমে পকেটে হাত পড়তেই দেখি_ পকেট ফাঁকা। হায়_ কোন্ চোরায় করল রে চুরি! অর্থ পরিমাণে খুব বেশি নয়। কিন্তু মধ্যবিত্তের কষ্টার্জিত অর্থের এই অনাবশ্যক বিয়োগ বেদনা আমাকে আর অন্যদের মতোই ব্যথিত করে তোলে। আহত স্বরে ভ্রমণ সঙ্গীদের অর্থ বিয়োগের ঘটনা বললে তাদের কেউ কেউ ঠাট্টার ছলে যে ভাষায় সান্ত্বনার কথা বলেন তা যেন উজ্জ্বল অনলে ঘৃতাহূতি। আরো দ্বিগুণ বেগে বেদনা জ্বলে উঠে। মধ্যবিত্তের বিড়ম্বনার তো শেষ নেই। কিছুক্ষণ নীরব থাকি।

ভ্রমণে চলেছি_ত্রিশ জনের অধিক ভ্রমণ সঙ্গী। বয়সে সকলে সমান নয়, কিন্তু মনে মনে মিলের কোনো কমতি নেই। আমরা সকলে নাট্যকর্মী_ কেবল বাসের ড্রাইভার ও হেলপার ছাড়া। তবে জীবনমঞ্চে তারাও নিশ্চয় নটের ভূমিকা বহে নিয়ে চলেছে। নারী-পুরুষ মিলে বাহনে বসেছি। আমাদের সঙ্গে বয়োজ্যেষ্ঠ নাট্যব্যক্তিত্ব খায়রুল আলম সবুজও আছেন। তিনি ফরিদপুরের নাট্যোৎসবের একজন আমন্ত্রিত অতিথি। আমন্ত্রিত অতিথি যাত্রাপথের সামনে আরো একজন। আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন। তবে তিনি আর কেউ নন_আমাদের প্রিয় 'পারুল ভাবি'। নাট্যগুরু সেলিম আল দীনের সহধর্মিণী বেগমজাদী মেহেরুন্নেসা পারুল। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল তোরণে নেমে অপেক্ষমাণ পারুল ভাবিকে গ্রহণ করি। তিনিও সহাস্যে আমাদের বরণ করেন। অতঃপর যাত্রাপথের নির্ধারিত কর্মসূচির অংশে নাট্যগুরু সেলিম আল দীনের সমাধি প্রাঙ্গনে গমন করি। সেখানে কিছুক্ষণ শরণ ও অপেক্ষাতে পুষ্প-কৃতাঞ্জলিতে নীরব অশ্রুপাতের ক্ষরণ অনুভব করি। পাশে পূজ্যপাদ সৈয়দ আলী আহসানসহ আরো কয়েকজনার সমাধি দেখতে পাই। যার সবগুলো বাঁধাইকৃত_ মোড়কে নামের ফলকে আবৃত। কেবল সেলিম আল দীন সমাধি তখনও অপেক্ষমাণ। তবে আশা করছি_ এই সমাধিও মোড়কে ও নামের ফলকে অচিরেই শোভাময় হয়ে উঠবে নিশ্চয়। বিশ্ববিদ্যালয় কতর্ৃপক্ষ ও সেলিম অনুরাগীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

পুষ্পাঞ্জলি পর্ব অন্তে আবারও যাত্রা শুরু করি। পথে চলতে চলতে সেলিম আর দীন কৃত আর স্বপ্নদলের প্রযোজনায় মঞ্চে নিয়মিত 'হরগজ' নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র আবিদের কথা মনে পড়ে। কিন্তু সে ভাবনাতেও আছে বিপত্তি_ আমার পাশের আসনে বসা প্রযোজনায় আবিদের চরিত্রে রূপদানকারী জাহিদ রিপন। অবিদের কথা মনে করার সুযোগ কোথায়? তবুও যাত্রাপথের গতির সঙ্গে সে মহৎ নাটকের অভিগমনকে সাযুজ্য জ্ঞান করি। 'হরগজ' নাটকে আবিদ ত্রাণের উদ্দেশে আর্ত মানবের সেবায় ছুটে চলে গ্রামের মাঠ, প্রান্তর ও শস্যক্ষেত্র দৃষ্টির অমৃত কুম্ভে ভরে নিয়ে। তার গমনের উদ্দেশ্য মহৎ_ মানবতার সেবা ভিন্ন আর কিছু নয়। আমরাও চলেছি_ আবিদের মতো নয়। আবার আবিদের মতোও বটে! গতির বৈচিত্র্যে চিহ্নরেখার বন্ধনে ঘাট ভিন্নতর হলেও গন্তব্য হয়তো অভিন্ন। আমাদের উদ্দেশ্যও সেবা_ শিল্পের সেবা। সে অতি মহৎ কাজ কিনা জানি না_ তবে মানবের মনে ক্ষণিক আনন্দের অবসরে নবতর চেতনার স্ফূরণে তাকে জাগিয়ে তোলে। জানি এ কাজ সহজ নয়। তবুও ফরিদপুরে 'বৈশাখী নাট্যগোষ্ঠী'-র 'বিজন ভট্টাচার্য পথ নাট্যমেলা- ২০১০'-এর শেষ দিনে উৎসবে যোগ দিতেই আমাদের এই নির্ধারিত যাত্রা। উদ্দেশ্য আরো আছে। শোনার আগ্রহে জমিয়ে রাখছি।

যাত্রাপথের উপান্তে এসে পদ্মার সাক্ষাৎ মিলে। হায়রে প্রমত্তা পদ্মা! ভয়ঙ্কর বিস্তার ও খরতর প্রবাহের কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। শীর্ণ-বিশীর্ণ মৃতপ্রায় নদী। এই নদীর সঙ্গে মানব জীবনের খানিক মিলও আছে বটে। ভর যৌবনে দেখা নদী আর জীবন সায়াহ্নে দেখা নদীতে এই বুঝি পার্থক্য। গাঙের জোয়ার অপসৃত হলে ভাটার টানে জীবন ও নদীর বাঁক ঐক্য সূত্রে বন্ধনের কথা মনে করিয়ে দেয়। এখনও যৌবনের চোখে দেখছি নদী। দেখে মনে হয় একদিন আমাদের যৌবনও ভাটার টানে এই মৃতকায় নদীর রূপ পাবে নিশ্চয়। দেহমনের উত্তাপ একদিন একদিন কমে যাবে। মনের ফুটন্ত বালিতে তখন স্বপ্ন-বুননের খই আর ফুটবে কি? কোন মরা গাঙের স্রোতে কোন অদৃশ্য অদেখা পুরীতে পেঁৗছে যাবে এই শিল্পীমন! কে জানে?

সে যাই হোক। পদ্মাপারের অনতিদূরেই ফরিদপুর শহর। নদী পারাপারের পরে গতিপথে বেশি অপেক্ষা করতে হয়নি। বাহন বাসটি চলছে। চলছি আমরাও। কিন্তু সে চলনে ভেদ আছে। আমরা সচল বাসের সঙ্গে। আর বাসটি সচল গতি ও পথের পরিক্রমণে গন্তব্যের ঘরে। চলতি পথের মাঠ, প্রান্তর, শীতের শর্ষে ফুলের হলুদ আভা, বিকেলের সোনা রোদে দেখা নানা দৃশ্যমালা মন ভুলিয়ে দেবার মতো আবহ সৃজন করে। তবু মনে কখনও কখনও পথের শুরুতে আকস্মিক অর্থ হারানোর বেদনা মনের ক্ষতে কাঁটার মতো বিঁধতে থাকে। কিন্তু ফরিদপুর শহরে পেঁৗছে আমাদের গন্তব্য কবি জসীমউদ্দীন হল প্রাঙ্গণে বাস থেকে নামতে গিয়ে নাট্যকর্মীদের শ্রীহস্ত থেকে রজনীগন্ধা ফুলের যে অভ্যর্থনা পেলাম তা যেন জগৎ সংসারের সকল দুঃখ-বেদনা ভুলিয়ে দেবার মতো মতো ঘটনা। পথের শ্রান্তি ও বেদনার বিবরে তখন আনন্দ আর প্রশান্তির অদৃশ্য প্রবাহ চলতে শুরু করেছে।

কবি জসীমউদ্দীন হল চত্তরে এসে মনটা ভরে যায়। সেখানে ফরিদপুরের নানান দলের নাট্যকর্মীরা মিলে দেয়ালে পোস্টারে ঢাকার নাট্যদল স্বপ্নদলকে উদ্দেশ ও উপলক্ষ করে কিছু প্রশস্তি কথা ও নিবেদন বাণীতে যে দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছে তা একেবারেই অভিনব। আমার মধ্য জীবনের অভিজ্ঞতাতে তো বটেই। মনে থাকবে অনেক দিন।

অতঃপর একটু দূরে রাত্রি যাপনের জায়গায় গমন করি। সেখানের পথে পথে ও তোরণে নাট্যকার সেলিম আল দীনের ছবি সম্বলিত লেখা_ 'স্মরণে নাট্যভাষে নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন'। যথার্থ এই বাক্য নির্মাণ_যেন কোনো ঘোষণার গতি বিলোপন করে মনে। আর সেজন্যই তো আমাদের ফরিদপুরে আসা। সেখানে বিকেলের বিশ্রাম অন্তে উত্তীর্ণ সন্ধ্যায় বৈশাখী নাট্যগোষ্ঠীর পথ নাট্যমেলায় যোগ দিতে গমন করি অম্বিকা ময়দানে।

অম্বিকা ময়দান_এক বিখ্যাত ব্যক্তির নামের সঙ্গে অন্বিত। ফরিদপুরের কৃতি সন্তান বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ ও সমাজসেবক অম্বিকাচরণ মজুমদারকে স্মরণ করেই ফরিদপুরবাসীর এই নামকরণ। সার্থক নামকরণ বটে। সামন্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও যিনি মানবতার সেবায় নিজেকে নিবেদন করেন_তিনি মহৎ বলতে হবে। অম্বিকাচরণ মজুমদার মানবসমাজের এমনই একজন।

জাহিদ রিপনের নেতৃত্বে অম্বিকা ময়দানের মেলায় প্রবেশ মাত্র আয়োজন যা দেখলাম তাতে চক্ষু একেবারে চড়ক গাছ! এক অবিশ্বাস্য আয়োজনে। মেলার প্রবেশ মুখে নাট্যমেলার নামকরণ বৈদু্যতিক আলোকের ঝলকে জ্বলছে। ভেতরে একদিকে মঞ্চ_ তার বিপরীতে থৈ থৈ দর্শক নাটক দেখছেন। আর ময়দানের তিন দিকে পোস্টার প্রদর্শনীর এক বিশাল আয়োজন। শুধু আয়োজন নয়_ আয়োজন যজ্ঞ বলতে হবে। সে যজ্ঞে শোভিত পোস্টার প্রদর্শনীতে বাংলাদেশের নাট্যপ্রযোজনার গুরুত্বপূর্ণ সকল পোস্টার ও নাট্যকারদের ছবি, বিশ্ব নাট্যপ্রযোজনার উলেস্নখযোগ্য পোস্টার ও খ্যাতিমান নাট্যকারদের ছবির সঙ্গে ঢাকার স্বপ্নদল ও ফরিদপুরের বৈশাখী নাট্য গোষ্ঠীর উলেস্নখযোগ্য প্রযোজনা ও কর্মকৃতির দলিল সমুপস্থিত। পাশ্চাত্যের প্রাচীন গ্রীস থেকে শুরু করে প্রাচ্য-ভারতীয় প্রবীণ নাট্যকারদের সঙ্গে সমকালীন নাট্যকারদের অনেক দূর্লভ ছবি সংগৃহীত হয়েছে নাট্যমেলায়। অনন্যসাধারণ এক শ্রমসাধ্য ঘটনা বলতে হবে। হাজারের অধিক ছবি ও পোস্টারের সংগ্রহের আয়োজন তো কম কথা নয়! বৈশাখী নাট্যগোষ্ঠীর সক্রিয় উদ্যোগের পশ্চাতে সেখানে আরো একজনকে খুঁজে পাই। তিনি সরকারি ইয়াসিন কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ আলতাফ হোসেন। এ বিশাল পোস্টার ও ছবির আয়োজনের নেপথ্যজন অধ্যক্ষ আলতাফ হোসেনকে শরণ্য জ্ঞান করি। এমন নিবেদিতপ্রাণ সংস্কৃতিকর্মী এদেশে সংখ্যায় খুব কমই জন্মেছে।

নাটকের পোস্টার দর্শন শেষে স্বপ্নদলের ডাক পড়ে মঞ্চে। ইতোমধ্যে ঢাকার একটি দল নাটক প্রদর্শন সমাপ্ত করেছে, স্থানীয় আরো নাট্যদল অপেক্ষা করছে। স্বপ্নদল তাদের সর্বশেষ প্রযোজনা 'ফেস্টুনে লেখা স্মৃতি' মঞ্চস্থ করবে। ঘোষণা অন্তে যথারীতি নাটক শুরু হলো। নাট্যকার সেলিম আল দীনের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক স্মৃতিকথার নাটক। নাট্য প্রদর্শন কালে কোনা এক সময় মঞ্চে গান ও কোরিওগ্রাফির সঙ্গে বাংলাদেশের পতাকা ওড়ালেন নাট্যকর্মীরা। মঞ্চে তখন গানে ও পতাকার আবহে বাঙালির মহান মুক্তিযুদ্ধ মূর্ত হয়ে উঠেছে। অভিভূত প্রায় হাজার তিনেক দর্শক যেন নিজেদের অজান্তেই প্রবল করতালির মধ্য দিয়ে মঞ্চ ও মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে একাত্ম হয়ে উঠলেন! এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা। শিল্পের শক্তিকে আভূমি প্রণাম করি।

নাটক সমাপনান্তে মঞ্চে ডাক এলো। উপস্থিত হলাম। পারুল ভাবি এলেন। আরো এলেন জাহিদ রিপন। অতঃপর এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। এবার 'স্বপ্নদল' এবং ফরিদপুরে 'সেলিম আল দীন স্মরণোৎসব উদ্যাপন পরিষদ'-এর স্মরণ অনুষ্ঠান আয়োজনের উদ্বোধন ঘোষণার পালা। পারুল ভাবি 'ফেস্টুনে লেখা স্মৃতি' নাট্যপ্রযোজনা ও তদীয় অনুভুতির কথা ব্যক্ত করে স্বপ্নদল ঘোষিত বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে বছরব্যাপী সেলিম আল দীন স্মরণোৎসবের শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করলেন। ফরিদপুর থেকে শুরু হলো এ অনুষ্ঠান। আবারও প্রবল করতালি। মঞ্চ ও অম্বিকা ময়দান মুখর হয়ে উঠলো। সে এক উলেস্নখযোগ্য সন্ধ্যারাত্রি। অতঃপর 'ফরিদপুর চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রি'-র নিমন্ত্রণে অম্বিকা ময়দান থেকে তাদের ভবনে নৈশভোজে গমন। উষ্ণ আতিথেয়েতায় মুগ্ধ হলাম। নাট্যকর্মীদের জন্য অত্যন্ত আন্তরিক ভোজের আয়োজন। খাদ্য তালিকায় অন্যান্য উপকরণের সঙ্গে নদীর বড় পাঙ্গাস ও আইড় মাছ। মাছে ভাতে বাঙালি এই ঐতিহ্য থেকেই এ আয়োজন কিনা জানি না। তবে অনেক দিন পরে টাটকা বড় মাছ সোয়াদ মনে রাখার মতো ঘটনা বটে!

নৈশভোজে অন্তে ঘুমানোর স্থলে ফিরে এলাম। তখনও আরেক আয়োজন। ঘরোয়া পরিবেশে 'হরগজ' নাটকের রিহার্সেল। সেখানে পারুল ভাবি উপস্থিত হয়ে মহড়া উপভোগ করলেন। মধ্যরাত পেরিয়ে গেল। মহড়া অন্তে 'হরগজ' নাটক লেখার সময়কার নানা ঘটনা আর সেলিম আল দীনের রসবোধ নিয়ে দারুণ আড্ডা শেষে পারুল ভাবি ঘুমাতে গেলেন। সারা দিনের ক্লান্তি তখনও নাট্যকর্মীদের কাবু করতে পারেনি। নাট্যকর্মী দম্পতি লাবণী-পিন্জু দুজনে আমার দুই হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলেন দালানের ছাদে ক্যাম্প ফায়ার শুরু করতে। সেখানেও সবাই আছেন। অবশেষে মধ্যরাতে আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে শীতে অগি্নর খানিক উত্তাপ ও আনন্দ নিয়ে ঘুমালাম।

পরদিন ভোরে উঠেই পূর্ব সূচি অনুযায়ী যেখানে নিয়ে যাওয়া হলো আমাদের তা দেখে আমি অভিভূত। ফরিদপুরের 'জগবন্ধু আশ্রম'। প্রাকৃতিক সজ্জা ও আবহে অভিরাম পরিবেশ। দেখে মনপ্রাণ জুড়িয়ে যায়। শুনলাম এই আশ্রমে বিগত ৫০ বছরে কখনও গান থামেনি। গানের একদল আসে, গান গায় চলে যায়। আবার আরেক দল। চলছে। সেখানে আশ্রমের বিরাট আয়োজন। ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে মানুষ আসে_ অতিথি হয়ে এই আশ্রমে। রাত্রি যাপন করে চলে যায়। এখানের সকল অর্থভার বহন করছেন ফরিদপুরের কয়েক সমাজ হিতৈষী ব্যক্তি। ভাবতে ভালোই লাগে।

আশ্রম দর্শন অন্তে গেলাম কবি জসীমউদ্দীনের গ্রামের বাড়ি। পাশে কুমার নদী। শীর্ণকায়_ ওপাশের বালুচর দেখা যায়। আর এপাশে কবির পৈতৃক বাড়ি। দাদি, নানা পরিজন ও কবির কবর। কবির বিখ্যাত 'কবর' কবিতার ডালিম গাছও বর্তমান। আরো দেখলাম কবির মিউজিয়াম ও তদীয় নানা নিদর্শন। সেখানে বৃক্ষতলে সঙ্গীতের আয়োজন হলো। সেও এক সুখস্মৃতি।

অতঃপর নাটকের মহড়া, বিশ্রাম ও বিকেলে পর পর দু'টি প্রদর্শনী। কবি জসীমউদ্দীন মঞ্চে। 'হরগজ' নাটকের। নাটকের প্রারম্ভে সেলিম আল দীন স্মরণোৎসবকে উপলক্ষ করে কবি জসীমউদ্দীন হল চত্তরে সেলিম আল দীনকে উৎসর্গীকৃত স্বপ্নদলের সঙ্গীত-কোরিওগ্রাফির অভিনব পরিবেশনা সমবেত দর্শককে মুগ্ধ করে। তারপর 'হরগজ' নাটকের মঞ্চায়ন। হল ভর্তি দর্শক প্রযোজনাটি উপভোগ করলেন। নাটক শেষে যিনি মঞ্চে গেলেন তিনি অধ্যক্ষ আলতাফ হোসেন। মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে কাঁদছেন। কেন? 'হরগজ' নাটকে বিধৃত ঘটনার উপস্থাপনা দেখে। তিনি বলেন_ শিল্প এতটাই মর্মস্পশর্ী ও সুন্দর হতে পারে। আমরা জানা ছিল না। কান্নার ইতিহাস আরো আছে_ ফরিদপুর সুনিয়ম নাট্যচক্রের আমিনুর রহমান ফরিদ মঞ্চে এসে কাঁদছেন জাহিদ রিপনকে জড়িয়ে ধরে। শিষ্যের শিল্পদর্শনের সার্থকতায় গুরুর এই আনন্দাশ্রুর তুলনীয় দৃশ্য সমগ্র বিশ্বে দুর্লভ নিঃসন্দেহে! ভালো করে তাকাতেই অনুভব করা গেল হল ভর্তি দর্শকও চক্ষু মুছছেন। ধন্য হে সেলিম আল দীন_ ধন্য স্বপ্নদল!

সে উৎসবের আরো অনেক স্মৃতি_ অনেক কথা। সব তো একদিনে বলা সম্ভব নয়। সুন্দর ও সফল স্মরণোৎসব আয়োজনের জন্য ফরিদপুরের নাট্যকর্মী ও সংশিস্নষ্ট সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। তাঁদের আতিথ্য ও সে উৎসবের অভিজ্ঞতা কখনই তো ভুলবার নয়।
 
Support : Dhumketo ধূমকেতু | NewsCtg.Com | KUTUBDIA @ কুতুবদিয়া | eBlog
Copyright © 2013. News 2 Blog 24 - All Rights Reserved
Template Created by Nejam Kutubi Published by Darianagar Publications
Proudly powered by Dhumketo ধূমকেতু