সিএমএইচ থেকে বিশেষ বার্তায় এইচ এম এরশাদ : আমি অসুস্থ নই, গ্রেফতারের জন্য আটকে রাখা হয়েছে

Saturday, December 14, 2013

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেছেন, ‘আমি অসুস্থ নই। আমাকে গ্রেফতারের জন্য এখানে আটকে রাখা হয়েছে।’
গতকাল সন্ধ্যায় সিএমএইচ (সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল) থেকে তার বিশেষ উপদেষ্টা ববি হাজ্জারের মাধ্যমে বিশেষ বার্তায় তিনি এ তথ্য জানান। একতরফা নির্বাচনে অংশ না নেয়ায় বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ১২টায় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা এইচ এম এরশাদকে তার বাসা থেকে নিয়ে যায়। এরপর তারা তাকে সিএমএইচে ভর্তি করেন।

জাতীয় পার্টি সূত্রে জানা গেছে, এখন এরশাদকে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেয়ার চেষ্টা চলছে। আর তার অনুপস্থিতিতে জাতীয় পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে রওশন এরশাদকে একতরফা নির্বাচনের সহযাত্রী করতে সব ধরনের তত্পরতা চালিয়ে যাচ্ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। এ লক্ষ্যে গতকাল
দিনভর রওশনের গুলশানের বাসভবনে দফায় দফায় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সন্ধ্যায় রওশনের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা গওহর রিজভী এবং আওয়ামী লীগ নেতা শিল্পমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, রওশনকে ৪৭টি আসন দিতে চায় আওয়ামী লীগ। কিন্তু এ ব্যাপারে পূর্ণ নিশ্চয়তার অপেক্ষায় রয়েছেন রওশন।
তবে গতকাল সন্ধ্যায় পাঠানো বিশেষ বার্তায় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ঘোষিত তফসিলে জাতীয় পার্টি আসন্ন জতীয় সংসদ নির্বাচনে যাবেন না বলে আবারো খোলাসা করে জানিয়েছেন। সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে তাকে চিকিত্সার নামে আটকে রাখার নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেছেন, ‘আমি জাতীয় পার্টির সব নেতাকর্মীকে ধৈর্য ধরার এবং ঐক্যবদ্ধ থাকার নির্দেশ দিচ্ছি। আমি কাউকে আমার মুখপাত্র নিযুক্ত করিনি। একজন নেতা (মুজিবুল হক চুন্নু) পার্টির মুখপাত্র হিসেবে বিবৃতি দিচ্ছেন বলে শুনেছি। তিনি যদি এটা করে থাকেন, তাহলে এর দায়িত্বও তার নিজের। এবং এটি তার নিজস্ব মতামত হিসেবে বিবেচিত হবে। পার্টির শৃঙ্খলাবিরোধী যে কোনো কাজের জন্য আমি যে কারো বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারি।’
এরশাদ বলেন, ‘পার্টির মহাসচিব রুুহুল আমিন হাওলাদার ও আমার ভাই এবং পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য জিএম কাদের আমার কাছ থেকে প্রাপ্ত দিকনির্দেশনা দলীয় নেতাকর্মীদের কাছে পৌঁছে দেবেন। ববির মাধ্যমে আমি গণমাধ্যমকে আমার বক্তব্য জানাবো। অন্য কারো বক্তব্য, বিবৃতি এবং প্রচারণায় আপনারা বিভ্রান্ত হবেন না।’
তিনি আরো বলেন, ‘সব দলের অংশগ্রহণ ছাড়া জাতীয় পার্টি কোনো নির্বাচনে অংশ নেবে না। এজন্য ইতোমধ্যেই আমাদের দলের প্রার্থীরা তাদের মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখার স্বার্থেই এটা দরকার বলে তিনি মনে করছেন।
এদিকে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে ছাড়া জাতীয় পার্টির বিকল্প চেয়ারম্যান হিসেবে কাউকে মেনে নেয়া হবে না বলে জানিয়েছেন দলের মহাসচিব এবিএম রুুহুল আমিন হাওলাদার।
গতকাল সন্ধ্যায় বনানীতে দলের চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘এইচ এম এরশাদ যতদিন আছেন ততদিন দলে বিকল্প চেয়ারম্যান মেনে নেয়া হবে না। এরশাদই চেয়ারম্যান থাকবেন।’
নির্বাচনে অংশ নেয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনে না যাওয়ার ব্যাপারে এরশাদের সিদ্ধান্তে আমরা অটল। দেশ ও জাতির স্বার্থে সব দলের অংশগ্রহণ ছাড়া নির্বাচনে না যাওয়ার ঘোষণা দেয়ায় এরশাদ এখন সিএমএইচে। আমরা ঐক্যবদ্ধ আছি। প্রয়োজনে কঠোর কর্মসূচি দেব। রাতে একটি বৈঠক শেষে কর্মসূচি সম্পর্কে জানানো হবে।’ মনোনয়ন প্রত্যাহার প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘২৯০টি আসনে জাতীয় পার্টি মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিল। দলের সবাই মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নিয়েছেন বলে খবর পেয়েছি। রাতে জানানো হবে কত আসনে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার হয়েছে।’ এ সময় জাতীয় পার্টির মহাসচিব পটুয়াখালী-১ আসন থেকে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন।
এর আগে গতকাল দুপুরে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং এইচ এম এরশাদের ছোট ভাই জিএম কাদের অভিযোগ করে বলেছেন, এরশাদকে অস্বাভাবিকভাবে হাসপাতাল নেয়া হয়েছে। বেলা সাড়ে ১১টায় গুলশানে হাওলাদার কমপ্লেক্সে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এ অভিযোগ করেন। এ সময় পার্টির মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার উপস্থিত ছিলেন। প্রেস ব্রিফিং চলাকালে উপস্থিত নেতাকর্মীরা রুহুল আমিন হাওলাদারকে সরকারের দালাল দালাল বলে স্লোগান দিতে থাকে।
সাবেক মন্ত্রী জিএম কাদের বলেন, পার্টি চেয়ারম্যান এরশাদকে স্বাভাবিকভাবে হাসপাতালে নেয়া হয়নি। তিনি জানান, নির্বাচনে অংশ না নেয়ার ব্যাপারে এরশাদ তার সিদ্ধান্তে অটল রয়েছেন। তিনি (এরশাদ) আজকের (গতকাল) মধ্যে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের জন্য সবাইকে নির্দেশ দিয়েছেন। এ নির্দেশ অমান্য করা হলে দল থেকে বহিষ্কার করা হবে বলেও সতর্ক করে দেন। রওশন এরশাদ দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কি-না, জানতে চাইলে কাদের বলেন, পার্টির চেয়ারম্যান এখনো জীবিত এবং দেশেই আছেন। কাজেই কাউকে ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেয়ার সম্ভাবনা নেই। চেয়ারম্যান দেশের বাইরে গেলে কাউকে দায়িত্ব দেয়া হবে কি-না, সেটি পরের ব্যাপার।

রাজনীতিকদের শুভবুদ্ধির উদয় হোক by রোজিনা আক্তার

‘কী দেখার কথা, কী দেখছি? কী শোনার কথা, কী শুনছি? কী ভাবার কথা, কী ভাবছি? কী বলার কথা, কী বলছি? তিরিশ বছর (৪২ বছর) পরও আমি স্বাধীনতাকে খুঁজছি।’ এই গানের কথাগুলোই আমাদের বাস্তব জীবনের প্রতিচ্ছবি হয়ে দেখা দিয়েছে।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিশ্বের দরবারে স্বাধীন ও সাহসী জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর ইতিহাস। এই ইতিহাস সম্পর্কে সঠিক ও নির্ভুল তথ্য জানা আমাদের প্রতিটি নাগরিকের কর্তব্য। স্বাধীনতার অনেক বছর পর আমার জন্ম। তাই স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হিসেবে আমি গর্বিত। এই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের কথা প্রথম শুনি আমার পরিবার থেকে, তারপর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে।
মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি কিন্তু মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবি-নাটক দেখে, বই পড়ে মুক্তিযোদ্ধা, বুদ্ধিজীবী ও একাত্তরে শারীরিকভাবে নির্যাতিত নারীর সঙ্গে কথা বলে, তাদের মুখ থেকে সেই আগুনঝরা দিনগুলোর কথা জেনেছি। এসব ঘটনা আমাকে অনেক বেশি আলোড়িত করে। যখন একজন মুক্তিযোদ্ধা বলেন—‘এই হাতে অস্ত্র ধরেছি, শত্রুসেনা খতম করেছি; তখন নিজের অজান্তেই চলে যাই সেই সময়ের কাছে। যখন একজন মুক্তিযোদ্ধা নারী তার ত্যাগের কথা ও নির্যাতনের কথা করুণ কণ্ঠে বর্ণনা করেন, তখন চোখের সামনে ভেসে উঠে সেই বিভীষিকাময় দিনগুলোর কথা। মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস না জানলে কারও মধ্যেই দেশপ্রেম বা দেশাত্মবোধ তৈরি হবে না। জাগবে না দেশের প্রতি প্রকৃত সম্মান। একজন বুদ্ধিজীবী, মুক্তিযোদ্ধা বা বীরাঙ্গনা দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য নিজেদের সবকিছু উজাড় করে দিয়েছেন, দেশপ্রেমের জীবন্ত উদাহরণ হিসেবে জাতির কাছে স্মরণীয়-বরণীয় হয়েছেন। তারা তখনও সংগ্রাম করেছেন, এখনও করছেন। তাই পরিবারের পাশাপাশি চাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা, এরপর মিডিয়ার ভূমিকা। প্রযুক্তির যুগে মিডিয়াই পারে সঠিক ইতিহাস জাতির কাছে তুলে ধরতে।
কষ্ট হয় যখন দেখি একজন মুক্তিযোদ্ধা দীনহীন অবস্থায় চরম আর্থিক সঙ্কটে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। একজন মুক্তিযোদ্ধা নারী তার প্রাপ্য সম্মান থেকে বঞ্চিত হন। অন্যদিকে একজন ঘাতক দালাল দেশের প্রশাসনে সম্মানিত পদে বসে দেশের পতাকা গাড়িতে লাগিয়ে বুক ফুলিয়ে ঘুরছে। আসলে দেশপ্রেম বা দেশের প্রতি ভালোবাসা কখনও জোর করে তৈরি হয় না, এটা নিজের ভেতর জন্ম নেয়, যেমনি নিয়েছিল ’৭১-এ। নিজের অস্তিত্বের জন্য মানুষ তখনও অশুভ শক্তির কাছে হার মানেনি, এখনও মানবে না। আজকে লড়াই করে দেশ স্বাধীন হয়েছে বলে আমরা নিজেদের জন্য শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারছি। সে হিসেবে আমাদেরও উচিত দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ সঠিকভাবে পালন করা। দেশ আমাকে কী দিয়েছে এটা না ভেবে, নিজের স্বার্থকে বড় করে না দেখে দেশের উন্নতির জন্য কাজ করে যাওয়া প্রতিটি সুনাগরিকের দায়িত্ব ও কর্তব্য। আজ দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজ করছে। রাজনীতিবিদদের উচিত ক্ষমতার লোভ ও নিজের স্বার্থকে বড় করে না দেখে দেশের মানুষের কল্যাণের কথা ভেবে কাজ করা। আমাদের দেশের শাসকগোষ্ঠী ও রাজনীতিবিদরা যতদিন না দেশের মানুষের সবার আগে না ভেবে নিজেদের ক্ষমতালোভী করে প্রকাশ করবে, ততদিন দেশের মানুষকে নতুন করে বারবার স্বাধীনতা খুঁজতে হবে। মহান বিজয় দিবস সামনে রেখে রাজনীতিবিদদের শুভবুদ্ধির উদয় হোক, দেশে শান্তি ফিরে আসুক—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

‘ঝাঁপ দিলি তুই মরণ যমুনায়’ by সিরাজুর রহমান

Friday, November 29, 2013

খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে যাত্রা ধরনের এক রকম নাটক গ্রিসে খুবই জনপ্রিয় হয়। এশিলাস, সোফোক্লিস আর ইরিপাইডিস নাট্যকারদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় ছিলেন।
এ নাটকগুলো সাধারণভাবেই গ্রিক ট্র্যাজেডি নামে পরিচিত। নাটকগুলো উপকথা-ভিত্তিক হলেও সামাজিক ও রাজনৈতিক ঘটনাবলি দ্বারা প্রভাবিত ছিল। গ্রিক ট্র্যাজেডির একটা বৈশিষ্ট্য এই ছিল যে ট্র্যাজেডিগুলো যে ঘটবে, আগে থাকতেই সে সম্বন্ধে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল। কিন্তু ট্র্যাজেডিগুলো ঘটা প্রতিরোধের কোনো চেষ্টা কেউ করেননি।

ঠিক যেন বর্তমান বাংলাদেশ। বাংলাদেশ আজ সর্বনাশের গভীর খাদের একেবারে কিনারে এসে দাঁড়িয়েছে। দাঁড়িয়েছে বলা ভুল হবে। খাদে পড়ে যেতে শুরু করেছে। কিন্তু এ সর্বনাশ যারা ঠেকাতে পারতেন তারা পায়ের ওপর পা তুলে দিব্যি আয়েশে নিশ্চেষ্ট বসে আছেন। ইতিহাসে আছে, রোম যখন পুড়ছিল সম্রাট নিরো তখন বাঁশি বাজাচ্ছিলেন। আসলে তিনি ‘লুট’ (দোতারা জাতীয় বাদ্যযন্ত্র) বাজিয়ে এবং গান করে নিজের সঙ্গীত প্রতিভা জাহির করতে চেয়েছিলেন।
দেশের জনসমর্থন সরকারের পক্ষে নেই। দেশের এবং বিদেশের বিভিন্ন মিডিয়ার জরিপ অনুযায়ী ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ মানুষ বর্তমান সরকার এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর অধীনে বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন সম্ভব বলে মনে করে না। তারা তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতিতে না হলেও নিদেন একটা নির্দলীয় কর্তৃপক্ষের অধীনে নির্বাচন চায়। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী গোঁ ধরে বসে আছেন। তার অধীনে এবং তার খেয়াল-খুশি অনুযায়ী তিনি নির্বাচন করবেনই করবেন, কেননা তা না হলে তিনি পাকাপোক্তভাবে গদি ও গণভবন দখল করে রাখতে পারবেন না। অন্যদিকে দেশ-বিদেশের সবাই এখন বুঝে গেছে, প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এবং তার নেতৃত্বে ১৮ দলীয় জোট কিছুতেই এই প্রধানমন্ত্রীর অধীনে নির্বাচন হতে দেবে না। তারা জানে এ ব্যাপারে দেশের মানুষ পুরোপুরি তাদের সঙ্গে আছে।
মার্কিন সরকার, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ব্রিটেন, চীন, এমনকি জাতিসংঘও বার বার বলেছে, নির্বাচন করার আগে সরকারের উচিত বিরোধী দলের সঙ্গে সংলাপের ভিত্তিতে সবার গ্রহণযোগ্য একটা নির্বাচন পদ্ধতি উদ্ভাবন করা। প্রধানমন্ত্রী হাসিনা সামনা-সামনি তাদের ‘হ্যাঁ’ বলেছেন, কিন্তু পেছনে হাত দিয়ে দলের সমর্থকদের ইশারায় বলেছেন ‘না’। এবং বিদেশিরা সামনে থেকে সরে গেলেই তিনি বিরোধীদের টেনিস খেলার টেকনিকে ‘রং-ফুট’ করার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন। বনানীতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফের সঙ্গে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের আদৌ কোনো বৈঠক হয়েছে কি না জানি না, কিন্তু স্পষ্টতসই সরকারি অনুপ্রেরণায় জোর প্রচারণা হয়েছে যে বৈঠক অবশ্যই হয়েছে এবং ‘মেঘের কোলে রোদ’ অবশ্যই হেসেছে। বাংলাদেশের শান্তিকামী মানুষ মনে মনে খুবই আশাবাদী হয়েছিল।
এদিকে শেখ হাসিনা তার মহাজোটের ভেতরেই ঘুঁটি চালাচালি করে নতুন কয়েকজন মন্ত্রী এবং ১১ জন উপদেষ্টা নিয়োগ করে ঘোষণা দিলেন যে, তিনি একটা ‘সর্বদলীয়’ নির্বাচনী মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন। বাংলাদেশের সবচাইতে কম শিক্ষিত মানুষটিও আপনাকে বলে দেবেন, তার নিজের জোটের তিন দল থেকে কয়েকজনকে মন্ত্রী নিয়োগ করলে সেটাকে সর্বদলীয় বলা যায় না। খালেদা জিয়া তার ১৮ দলের জোটের প্রতিনিধিদের নিয়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তি প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদের কাছে আপিল করতে গেলেন। তাদের দাবি ছিল নির্বাচনী পদ্ধতি সম্বন্ধে সংলাপ এবং সমঝোতা হওয়া পর্যন্ত নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা বিলম্বিত করার জন্য প্রেসিডেন্ট যেন ইলেকশন কমিশনকে নির্দেশ দেন। জনাব আবদুল হামিদ তাদের হতাশ করলেন, প্রমাণ করলেন যে বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট হওয়ার চাইতে তিনি আওয়ামী লীগ দলীয় প্রেসিডেন্ট হওয়াই বেশি পছন্দ করেন।

মারাত্মক নির্বাচনী তফসিল
ভেতরে ভেতরে তিনি শেখ হাসিনাকে নির্বাচনকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অনুমোদন দেন এবং তার পরপরই সরকারের ক্রীড়নক প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দিন আহমেদ গত সোমবার রাত সাড়ে সাতটায় বিটিভি ও বাংলাদেশ বেতারে ভাষণ দিয়ে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করেন। এরপর যা হয়েছে তা থেকে বিরোধী দল ও জোট সম্বন্ধে একটা সঠিক বর্ণনা পাওয়া যায়। সিইসির ভাষণের পরপরই জোট ও বিএনপির নেতা খালেদা জিয়া নেতাদের একটা বৈঠক ডাকেন। আরও পরে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের মারফত ঘোষণা দেন যে মঙ্গল ও বুধবার বিএনপি ও ১৮ দলের জোট দেশব্যাপী অবরোধ কর্মসূচি পালন করবে।
লক্ষণীয় যে, মাত্র দিনদুয়েক আগেও খালেদা জিয়া এবং অন্য নেতারা পরিষ্কার বলেছিলেন, সংলাপ ও সমঝোতা ছাড়া নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করা হলে তারা লাগাতার হরতাল এবং সড়ক, রেল ও নদী পরিবহন অবরোধ করবেন। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ এবার আর ভুল করেনি। তারা নেতাদের নির্দেশের জন্য অপেক্ষা না করে তফসিল ঘোষণার পরপরই, অর্থাত্ সোমবার রাত আটটা থেকেই অবরোধসহ সরকারের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ কর্মসূচি শুরু করে। এ সংক্রান্ত সর্বোচ্চ তিতন ব্যক্তি, অর্থাত্ প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি ও সিইসির অন্যায্য এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণের প্রতিকারের দায়িত্ব বিরোধী দলের নেতাদের ওপর সম্পূর্ণ ছেড়ে না দিয়ে নিজেদের হাতেই তুলে নিয়েছে জনতা। আমার মনে হয় এ ব্যাপারটি থেকে বিএনপির কোনো কোনো নেতা শিক্ষা নিতে পারলে উপকৃত হবেন। তাদের বুঝতে হবে, নেতা হতে হলে জনতার সামনে থাকতে হবে, পেছনে থেকে নেতা হওয়া যায় না।

যে শিক্ষা সরকারকে জরুরিভাবে নিতে হবে
বাংলাদেশের সর্বত্র হরতাল ও অবরোধ চলছে। দেশের অবশিষ্ট অংশের সঙ্গে রাজধানী ঢাকার যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। যানবাহন ভাংচুর এবং সম্পত্তি পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। আওয়ামী লীগের ক্যাডার এবং দলীয়কৃত পুলিশ ও র্যাব মানুষ খুন করছে, জখম করছে, রক্ত ঝরাচ্ছে। ভুয়া অভিযোগে পুলিশ যাকে পাচ্ছে তাকেই গ্রেফতার করছে।
সরকারকেও বড় একটা শিক্ষা নিতে হবে সোমবার রাতের ঘটনাগুলো থেকে। তারা দেশে ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করেছে, বিএনপির শীর্ষ নেতাদের অনেককে গ্রেফতার করে রেখেছে, গ্রেফতারের ভয়ে অন্যরা পলাতক আছে। সরকার ভেবেছিল বিএনপির নেতৃত্বকে দুর্বল করে ফেলা হলেই সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন ভেস্তে যাবে। এখন তাদের বুঝে নেয়া উচিত যে তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতিতে, অন্তত নির্দলীয় কর্তৃপক্ষের অধীনে নির্বাচন সত্যিকারের একটা গণদাবি, শুধু খালেদা জিয়ারই নয়।
সরকারের গলাবাজ প্রচারবিদরা বিদেশিদের চোখে ধুলো দেয়ার কোনো চেষ্টারই ত্রুটি রাখবে না। কিন্তু সেটা অরণ্যে রোদনেরই শামিল হবে। বিদেশিদের চোখ হাসিনার গুপ্তচরদের চাইতেও বেশি তীক্ষষ্ট। মাত্র চার দিন আগে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট একটা সর্বসম্মত প্রস্তাবে সংলাপের ভিত্তিতে সবার গ্রহণযোগ্য একটা স্বচ্ছ নির্বাচন অনুষ্ঠান করার দাবি জানিয়েছে। তার দু’দিন আগে (২০ নভেম্বর) মার্কিন কংগ্রেসের পররাষ্ট্র কমিটিও এক আলোচনা সভায় একই দাবি জানিয়েছে। এ কমিটির চেয়ারম্যান কংগ্রেসম্যান স্টিভ শ্যাভোট কিছুদিন আগেই স্বচক্ষে বাংলাদেশের পরিস্থিতি দেখে গেছেন।
একই তারিখে নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকা এক সম্পাদকীয় প্রবন্ধে বাংলাদেশের বর্তমান সঙ্কটের জন্য শেখ হাসিনাকেই দায়ী করেছে। পত্রিকাটি ২০১১ সালে সংবিধান পরিবর্তন, মানবাধিকারের চূড়ান্ত অবমাননা, তথাকথিত আন্তর্জাতিক আদালতে রাজনৈতিক বিচার এবং বিরোধী দলগুলোকে বাদ দিয়েই নির্বাচনী প্রস্তুতির জন্য শেখ হাসিনার গদি-লিপ্সাকেই দায়ী করেছে। তাত্পর্যপূর্ণভাবে পত্রিকাটি বাংরাদেশের বিরুদ্ধে অবরোধের সম্ভাবনারও ইঙ্গিত দিয়েছে। তাত্পর্যপূর্ণভাবেই চীনও ‘স্বাধীন ও সমৃদ্ধ’ বাংলাদেশ দেখতে চায় বলে জানিয়েছে।

বাংলাদেশ কি উত্তর কোরিয়া হয়ে যাবে?
বিগত প্রায় পাঁচ বছরে সরকার বিদেশি দাতা ও বন্ধুদের সঙ্গে যে ধরনের আচরণ করেছে তাতে বাংলাদেশ বিশ্ব সমাজে উত্তর কোরিয়ার মতোই একঘরে ও অচ্ছুত হয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে। প্রথমেই বিচার-বহির্ভূত হত্যা ও মানবাধিকারের অবমাননার নিন্দায় বিশ্ব সমাজ সোচ্চার হয়েছে। শেখ হাসিনা তার স্বভাব-সুলভ গোঁয়ার্তুমি দিয়ে কারও পরামর্শই শোনেননি। ইলিয়াস আলীর মুক্তির দাবি জানিয়েছে ব্রিটেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্র। ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত ঈর্ষার বশবর্তী হয়ে তার এবং গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যাপারে বিশ্ব সমাজ, বিশেষ করে মার্কিন প্রশাসন ও নেতাদের তিনি রীতিমত অপমান করেছেন। পদ্মা সেতু দুর্নীতির জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিচারে বাধা দিয়ে ঋণদাতা দেশ ও সংস্থাগুলোর ক্রোধের উদ্রেক করা হয়েছে। এখন আবার রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনের জন্য সংলাপের ব্যাপারে তিনি ভারত ছাড়া গোটা বিশ্বের উপদেশ ও পরামর্শকে উপেক্ষা করে তাদের প্রতি অসৌজন্য দেখিয়েছেন।
বিশ্বায়নের যুগে কোনো দেশই বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকতে পারে না। একমাত্র চীন ছাড়া আর কোনো দেশের সঙ্গেই উত্তর কোরিয়ার সদ্ভাব কিংবা কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। চীনও এখন উত্তর কোরিয়ার ব্যাপারে অস্বস্তি দেখাচ্ছে। বাংলাদেশেরও হয়েছে সেই দশা। ভারত ছাড়া আর কোনো দেশ ঢাকার সরকারের ওপর প্রীত নয়। বাংলাদেশ বিদেশি ঋণের ওপর একান্তভাবে নির্ভরশীল। পদ্মা সেতুর দুর্নীতির বিচার না হলে বিশ্বব্যাংক সেতুর অর্থায়ন করতে অস্বীকার করেছে। ক্রমে ক্রমে অন্যান্য দেশ থেকেও ঋণ সম্পূর্ণ থেমে না গেলেও কমে আসবে। সেই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগও।
সরকারের ভ্রান্ত নীতি, বিশেষ করে শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত অবিমৃশ্যকারিতার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বাংলাদেশী শ্রমিক নিয়োগ বন্ধ করে দিয়েছে। বিদেশি রেমিট্যান্স হু-হু করে পড়ে যাচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জিএসপি বাণিজ্যিক সুবিধা দিতে অস্বীকার করছে বাংলাদেশকে। এদিকে দেশের ভেতরের সম্পদও লুটপাট হয়ে মালয়েশিয়া, দুবাই এবং লন্ডনে সম্পত্তিতে লগ্নি হয়ে গেছে। বর্তমান দুর্বৃত্ত সরকারকে গদিচ্যুত করা না হলে দেশ চালানো অসম্ভব হয়ে পড়বে। কিন্তু তাতে শেখ হাসিনার কী এসে যায়? তিনি দেশটাকে ভারতের হাতে তুলে দেয়ার পরিকল্পনা করেছেন বলেই মনে হয়।
সিরাজুর রহমান

পুলিশ দিয়ে মানুষ হত্যার বিচার হবে : জয়নুল আবেদীন

পুলিশ দিয়ে মানুষ হত্যার দায়ে শেখ হাসিনার একদিন জনতার আদালতে বিচার হবে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন।
তিনি বলেন, ‘পুলিশ দিয়ে মানুষ হত্যায় যারা দায়ী থাকবে তাদের একদিন বিচারের আওতায় আনা হবে।’

গতকাল সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির দক্ষিণ হলে ১৮ দলের ডাকা অবরোধ কর্মসূচির সমর্থনে বিক্ষোভ শেষে তিনি এ কথা বলেন।
সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে না আনলে বিএনপি নির্বাচনে যাবে না বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘শেখ হাসিনা আপনি খালেদা জিয়াকে হুকুমের আসামি করার কথা বলেছেন। আপনি যে পুলিশ দিয়ে শত শত গুলি করাচ্ছেন। শত মায়ের কোল খালি করছেন। আপনি যেদিন ক্ষমতা থেকে চলে যাবেন, হাজার হাজার, লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে আসবে। সেদিন জনতার আদালতে আপনার বিচার হবে।’
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, ‘দেশে এখন সমস্যা একটাই, শেখ হাসিনা। যে মুহূর্তে আপনি সরকার প্রধান না থাকার ঘোষণা দেবেন, তখন সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। এই ঘোষণা না দিলে বাংলাদেশের জনগণ আপনাকে টেনে ক্ষমতা থেকে নামাবে।’
এর আগে অবরোধের সমর্থনে সুপ্রিমকোর্ট এলাকায় মিছিল করে বিএনপি জামায়াতপন্থী আইনজীবীরা। মিছিলে অংশ নেন, অ্যাডভোকেট গাজী কামরুল ইসলাম সজল, অ্যাডভোকেট আবেদ রাজা, ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল, ব্যারিস্টার রাগিব রউফ চৌধুরী, মির্জা আল মাহমুদসহ অর্ধশত আইনজীবী।

বিএনপি-জামায়াত নেতাদের গ্রেফতার করুন : জয়

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় অভিযোগ তুলে বলেছেন, বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিতে চায় বললেও প্রকাশ্যে তারা সহিংসতার পথ অবলম্বন করছে।

গতকাল দুপুরে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে তার অফিসিয়াল পাতায় এক স্ট্যাটাসে তিনি আরও বলেন, বিএনপির সঙ্গে থেমে থেমে আলোচনা চলছে। তথাপিও, তাদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত মিথ্যাচার অব্যাহত রয়েই গেছে। ব্যক্তিগতভাবে তারা আমাদের ক্রমাগত বলেই চলেছে যে, তারা নির্বাচনে অংশ নিতে চায়। অথচ প্রকাশ্যে তারা সহিংসতার পথ অবলম্বন করছে। জয় আরও বলেন, আমরা বারবার বিএনপিকে সংলাপে বসবার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়ে যাচ্ছি। নির্বাচিত সর্বদলীয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনে তাদের একটি বড় ছাড় প্রস্তাব আমরা দিয়ে রেখেছি। বিএনপিকে সর্বদলীয় সরকারে তাদের পছন্দমত যে কোনো মন্ত্রণালয় নেয়ার জন্যও আমরা প্রস্তাব দিয়ে রেখেছি।
মিথ্যাচারই হলো বিএনপির চরিত্র—মন্তব্য করে তিনি বলেন, তারা মিথ্যাচার করেই চলে, ক্ষমতায় থাকলে নির্বাচনে কারচুপি করে এবং তারা মানুষ হত্যা করে। আবারও প্রতিবাদের নাম করে তারা সাধারণ মানুষের ওপর বোমা হামলা, ককটেল হামলা ও অগ্নিসংযোগে লিপ্ত হয়েছে।
সজীব ওয়াজেদ আরও বলেন, সারা দেশে তারা আমাদের নেতা-কর্মীদের লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। আমাদের কর্মীদের হত্যা করা হয়েছে, তাদের রগ কেটে দেয়া হচ্ছে এবং তাদের ওপর অন্য অনেক ধরনের নৃশংসতা চালানো হচ্ছে। এগুলো প্রতিবাদের ভাষা নয়। এগুলো হত্যাযজ্ঞ। এগুলো বন্ধ হওয়া দরকার। বিএনপি-জামায়াতের যেসব নেতা গত দুই সপ্তাহে এই হত্যার জন্য দায়ী তাদের সবাইকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা জরুরি। আমাদের নির্বাচন এবং গণতন্ত্র—মিথ্যাবাদী, সন্ত্রাসী আর যুদ্ধাপরাধীদের কাছে জিম্মি হয়ে থাকতে পারে না।

সেনাবাহিনীকে শৃঙ্খলা বজায় রাখার তাগিদ : ফখরুলের কুশল জানলেও সংলাপের বিষয়ে কিছুই বললেন না প্রধানমন্ত্রী

Friday, November 22, 2013

রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনে আরেকটি প্রত্যাশারও অপমৃত্যু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রধান বিরোধী দল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের সঙ্গে কথা বললেও বহুকাঙ্ক্ষিত সংলাপ নিয়ে কিছুই বলেননি। কুশল বিনিময়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলেন তিনি।
যদিও সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী মির্জা ফখরুলকে মহাসচিব পর্যায়ে সংলাপ শুরু করতে বলেছেন। জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় হুইপ উপাধ্যক্ষ আবদুস শহীদ সেনাকুঞ্জের অনুষ্ঠান শেষে গণমাধ্যমকে এ ধরনের তথ্য দেন।

গতকাল সশস্ত্রবাহিনী দিবসের অনুষ্ঠানে সেনাকুঞ্জে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ প্রসঙ্গে মির্জা আলমগীর গণমাধ্যমকে জানান, প্রধানমন্ত্রী তার সঙ্গে শুধু কুশল বিনিময় করেছেন। মির্জা ফখরুল বলেন, আমি কেমন আছি এবং ম্যাডাম কেমন আছেন—এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেছেন। তবে সংলাপের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কোনো কথা হয়নি।
সেনাকুঞ্জের অনুষ্ঠানে বিএনপির পক্ষ থেকে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমানসহ কয়েকজন সিনিয়র নেতা যোগ দেন। বিএনপি চেয়ারপারসন ও বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার কথা থাকলেও অসুস্থতার কারণে তিনি যোগ দিতে পারেননি বলে তার ব্যক্তিগত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালে সশস্ত্রবাহিনী দিবসের অনুষ্ঠানে সেনাকুঞ্জে দেখা হয় দুই নেত্রীর। ওই সময় কুশল বিনিময়ও হয় তাদের মধ্যে।
সশস্ত্রবাহিনী দিবসের এ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের নেতা তোফায়েল আহমেদ, আমির হোসেন আমু, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, ঢাকা সেনানিবাসের সশস্ত্রবাহিনী বিভাগে বীরশ্রেষ্ঠদের উত্তরাধিকারী, খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের উত্তরাধিকারী এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, জাতীয় সংসদের স্পিকার, প্রধান বিচারপতি, সাবেক প্রেসিডেন্টগণ, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিগণ, সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতিগণ, প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও কমিশনারগণ, বাংলাদেশে নিযুক্ত বিদেশি রাষ্ট্রদূতগণ, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিবসহ দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা যোগ দেন।
উল্লেখ্য, গত বছর সশস্ত্রবাহিনী দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া। তবে একই অনুষ্ঠানে দুই নেত্রী যোগ দিলেও তাদের মধ্যে কোনো কথাবার্তা কিংবা কুশল বিনিময় হয়নি।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য
সেনাকুঞ্জে সশস্ত্রবাহিনী দিবস উপলক্ষে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে দেয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের সেনাবাহিনী শুধু দেশে নয়, শান্তি মিশনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে জাতিসংঘেরও ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে।
শেখ হাসিনা বলেন, সেনাবাহিনী তাদের দক্ষতার সুনাম সারা বিশ্বে রেখেছে। তারা কাজের মাধ্যমে দেশের মানুষের বিশ্বস্ততা অর্জন করেছে। শান্তিপূর্ণভাবে দায়িত্ব পালন করে শুধু দেশের ভাবমূর্তি নয়, জাতিসংঘের ভাবমূর্তিও উজ্জ্বল করেছে। জাতিসংঘে সেনাবাহিনী যেন তাদের শীর্ষ অবস্থান ধরে রাখতে পারে, সেজন্য শৃঙ্খলা বজায় রাখার ওপর জোর দেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী সেনাবাহিনীর আধুনিকায়নে তার সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন। এছাড়া বিডিআর বিদ্রোহের বিচারের রায়ের মাধ্যমে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলেও দাবি করেন।
শেখ হাসিনা বলেন, সব বাহিনীকে শক্তিশালী করতে কাজ করে যাচ্ছে সরকার। সেনাবাহিনীর জন্য অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে, নৌবাহিনীকে ত্রিমাত্রিক হিসেবে গড়ে তোলা হবে। পরে তিনি সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীর উন্নয়নে তার সরকারের নেয়া বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কথা তুলে ধরেন।
এদিকে যথাযোগ্য মর্যাদা ও উত্সাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয় সশস্ত্রবাহিনী দিবস। এ উপলক্ষে গতকাল ফজরের নামাজ শেষে সেনানিবাস, নৌঘাঁটি ও স্থাপনা এবং বিমানবাহিনীর ঘাঁটির মসজিদগুলোতে বিশেষ মোনাজাত করা হয়।
দিবসটির শুরুতে সকালে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী স্বাধীনতা যুদ্ধে আত্মোত্সর্গকারী সশস্ত্রবাহিনীর সদস্যদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধার নিদর্শন হিসেবে ঢাকা সেনানিবাসের শিখা অনির্বাণে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এরপর সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ইকবাল করিম ভূইয়া, নৌবাহিনীর প্রধান ভাইস অ্যাডমিরাল এম ফরিদ হাবিব এবং বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার মার্শাল মোহাম্মদ ইনামুল বারী নিজ নিজ বাহিনীর পক্ষ থেকে শিখা অনির্বাণে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।
ঢাকা (সদরঘাট), নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, খুলনা ও বরিশালে বিশেষভাবে সজ্জিত নৌবাহিনীর জাহাজগুলো গতকাল বেলা ১টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত সর্বসাধারণের পরিদর্শনের জন্য উন্মুক্ত ছিল।
এদিকে সংবর্ধনা অনুষ্ঠান থাকায় ঢাকা সেনানিবাসের সব রাস্তা (শহীদ জাহাঙ্গীর গেট থেকে স্টাফ রোড পর্যন্ত প্রধান সড়ক) যানজটমুক্ত রাখার লক্ষ্যে সেনানিবাসে অবস্থান করা ব্যক্তি এবং আমন্ত্রিত অতিথিদের বহনকারী যানবাহন ছাড়া সব ধরনের যানবাহন গতকাল সকাল ৭টা থেকে বেলা সাড়ে ১১টা এবং দুপুর দেড়টা থেকে রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত সেনানিবাস এলাকায় বন্ধ ছিল।

একজন গওহর রিজভী by এম আবদুল্লাহ

Monday, September 5, 2011

বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর ৩৯ বছর তাকে এদেশে দেখা গেছে কমই। তবে বছর দেড়েক ধরে বাংলাদেশের সরকার তার উপস্থিতি অনুভব করছে প্রবলভাবে। আর নিজেকে তর্কে-বিতর্কে জড়িয়ে ফেলছেন অনায়াসে। ব্রিটেন ও বাংলাদেশের দ্বৈত নাগরিকত্বের অধিকারী তিনি। তবে তার স্থায়ী ঠিকানা যুক্তরাষ্ট্রের ক্যামব্রিজের ৭৯নং জন এফ কেনেডি স্ট্রিট। বড় একটা সময় কেটেছে ভারতে। লেখালেখি, ধ্যান-জ্ঞান, গবেষণা সবই ভারতকে ঘিরে। স্ত্রী ইতালির।
পারিবারিক প্রধান ভাষা উর্দু, হিন্দি। সালামের পরিবর্তে ‘আদাব’ বলে সম্ভাষণ জানাতে অভ্যস্ত। ধর্মবিশ্বাসে কাদিয়ানী। সব মিলিয়ে এক রহস্যময় চরিত্র। বাংলাদেশের এ সময়ের সবচেয়ে ব্যস্ত ও প্রভাবশালী ব্যক্তি ড. গওহর রিজভী। প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা। বাংলাদেশের ভবিষ্যত্ ভাগ্য নির্ধারণ করছেন। দ্রুততম সময়ে ভারতকে ট্রানজিট-করিডোর দেয়ার বেপরোয়া ভূমিকার জন্য দেশজুড়ে হালে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন তিনি। তার বক্তব্য শুনে অনেক সময় ভিমরি খেতে হয়। বুঝে উঠতে কষ্ট হয় তিনি কি ঢাকার না দিল্লির প্রতিনিধি। দেশপ্রেম, দেশের স্বার্থ বিষয়েও জ্ঞান দিয়ে চলেছেন তিনি। শোনা যায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়কে কিছুদিন পড়িয়েছেন তিনি। ড. রিজভীর পুরো পরিবার হালে অনেকটা আলাদিনের চেরাগ পাওয়ার মতো বাংলাদেশে বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক কিংবা পার্টনার।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পারিবারিক জীবনে ড. গওহর রিজভীরা চার ভাই ও দু’বোন। তার বাবা মরহুম নাসির উদ্দিন হায়দার রিজভী। ভাইদের মধ্যে সবার বড়জন বিমানের ক্যাপ্টেন। তিনি ক্যাপ্টেন রিজভী হিসেবে পরিচিত। দ্বিতীয়জন হায়দার রিজভী। তিনি বিটিভিতে প্রোগ্রাম ম্যানেজার ছিলেন। পরে বৈশাখী টিভিতে সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এখন কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক ও অংশীদার। তার স্ত্রী পোল্যান্ডের। ভাইদের মধ্যে তৃতীয় হচ্ছেন ড. গওহর রিজভী। তার স্ত্রী ইতালির নাগরিক। ছোট ভাই সৈয়দ আলী জওহর রিজভী সাধারণত শাহেনশাহ রিজভী হিসেবে পরিচিত। বাণিজ্যমন্ত্রী কর্নেল (অব.) ফারুক খানের পারিবারিক প্রতিষ্ঠান সামিট গ্রুপের সহযোগী সামিট এলায়েন্স পোর্ট লি, ওশান কন্টেইনার লি, ও গ্লোবাল বেভারেজ লি. এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক তিনি। গওহর রিজভীর দুই বোনই ইংল্যান্ড প্রবাসী এবং ব্রিটিশ নাগরিক। এছাড়াও ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী সময়ে বেশ কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে রিজভী পরিবার। সামিট গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোতে পরিচালকের তালিকায় আরও রয়েছেন সোবেরা আহমেদ রিজভী, সৈয়দ ইয়াসের হায়দার রিজভী ও সৈয়দ নাসের হায়দার রিজভী।
২০০৯ সালের ৯ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৭ম উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ড. গওহর রিজভী। তিনি মন্ত্রীর পদমর্যাদা, বেতন-ভাতাদি এবং আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন। অন্য ৬ উপদেষ্টার মতোই তিনিও মন্ত্রিসভার বৈঠকে অংশগ্রহণ করছেন রীতি ভেঙে। যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ড. গওহর রিজভী ওই বছরের ১৮ জুলাই বাংলাদেশে এসে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।
ড. গওহর রিজভী উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার আগে তার নামটি এদেশে খুব একটা পরিচিত ছিল না। নিয়োগের পর মিডিয়া অত্যন্ত কৌতূহল নিয়ে তার সম্পর্কে জানার চেষ্টা করে। খোদ সরকারি দলের অধিকাংশ নেতার কাছেও নামটি ছিল অপরিচিত।
উপদেষ্টা নিয়োগ সংক্রান্ত সরকারি ঘোষণায় বলা হয়, কার্য প্রণালী বিধির ৩-এর বি (আই) ধারার আওতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গওহর রিজভীকে তার উপদেষ্টা নিয়োগ করেছেন। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রায় পুরোটা সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ভারতে বসবাসকারী ব্রিটিশ নাগরিক গওহর রিজভীকে মন্ত্রী পদমর্যাদায় উপদেষ্টা নিয়োগের বৈধতা নিয়েও তখন প্রশ্ন ওঠে। কেন তাকে উপদেষ্টা নিয়োগ করা হয়েছে এবং কেনইবা বর্তমান শেখ হাসিনার সরকারে তার দোর্দণ্ড প্রতাপ সে সম্পর্কে অনুসন্ধান চালিয়ে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়কে কিছুদিন পড়িয়েছিলেন তিনি। সে সুবাদেই প্রধানমন্ত্রী পরিবারের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা। তার চেয়েও বড় বিবেচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায় ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী মইন-ফখরুদ্দিনের নেতৃত্বাধীন জরুরি সরকারের সময়ে তার ভূমিকা। জানা গেছে, ওয়ান-ইলেভেনের সেনা নায়কদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সমঝোতার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা ছিল তার। বিশেষত, সমঝোতা প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার বহুল আলোচিত ও প্রভাবশালী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আমিন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কারাগারে গওহর রিজভীর বৈঠকের ব্যবস্থা করেন। তার আগে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ডে সজীব ওয়াজেদ জয়ের উপস্থিতিতে যে সেমিনারে জেনারেল মইন যোগ দিয়ে আলোচিত বক্তব্য দিয়েছিলেন তারও আয়োজক ছিলেন গওহর রিজভী। এছাড়াও আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনার বিষয়ে ওয়ান-ইলেভেনের কুশীলবদের সঙ্গে সেতুবন্ধন রচনায় তার মুখ্য ভূমিকা ছিল বলে একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে। এ ক্ষেত্রে ভারতের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের সঙ্গে ড. গওহর রিজভীর গভীর সম্পর্কটাও বেশ কাজে লেগেছিল।
ড. গওহর রিজভীর অফিসিয়াল জীবন বৃত্তান্ত পর্যালোচনায় দেখা যায়, তিনি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অ্যাশ ইনস্টিটিউট অব ডেমোক্রেটিক গভর্নেন্স অ্যান্ড ইনোভেশন এর পরিচালকের দায়িত্বে রয়েছেন। এর আগে তিনি ১৯৯৮ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত নয়াদিল্লিতে ফোর্ড ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তারও আগে তিনি ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৮ পর্যন্ত একই সংগঠনের গভর্ননেন্স অ্যান্ড সিভিল সোসাইটি প্রোগ্রামের উপ-পরিচালক হিসেবে নিউইয়র্কে দায়িত্ব পালন করেন। ফাউন্ডেশনে যোগদানের আগে তিনি অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে বিভিন্ন পদে কর্মরত ছিলেন। তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষা অর্জনের পর অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে ইতিহাসে পিএইচডি করেন। এছাড়া ১৯৮৮ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত গওহর রিজভী আফগানিস্তান, জেনেভা, ইসলামাবাদ ও কাবুলে ইউএনডিপি’র সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন।
ড. গওহর রিজভী বেশ কয়েকটি জার্নালে একক ও যৌথভাবে লিখেছেন। তার বেশিরভাগ লেখাই ভারতের সমস্যা, সম্ভাবনা, পররাষ্ট্রনীতি, বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ে। ইন্দো-ব্রিটিশ রিলেশনস ইন রেট্রোসপেক্ট এবং বিওন্ড বাউন্ডারিজ শীর্ষক যৌথভাবে লেখা তার দুটি নিবন্ধ ভারতের উচ্চ পর্যায়ে প্রশংসিত।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গওহর রিজভীর ভাইসহ পরিবারের সদস্যদের আকস্মিক ব্যবসায়িক উত্থান নিয়েও নানা আলোচনা রয়েছে। এসব বিষয়ে কথা বলার জন্য গতকাল ড. গওহর রিজভীর মোবাইল নম্বরে কল করলে প্রথমে জানতে চান কোত্থেকে বলছি। আমার দেশ-এর পরিচয় জানার পর বলেন, রং নম্বর। জওহর রিজভীর সঙ্গে কথা বলতে সামিট ভবনে যোগাযোগ করলে জানানো হয় তিনি বনানীর গ্লোবাল বেভারেজ অফিসে আছেন। ওই অফিসে যোগাযোগ করে কথা বলতে চাইলে পরিচয় জেনে ফোন লাইন বেশকিছু সময় হোল্ড করে রেখে কেটে দেয়া হয়। এর পর কয়েকবার ফোন করলে কেটে দেয়া হয়। কোনো অফিস থেকেই তার মোবাইল নম্বর দেয়া হয়নি।

রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার যত ক্ষমা by এমএ নোমান ও নাছির উদ্দিন শোয়েব

Saturday, July 30, 2011

ত আড়াই বছরে বহুল আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলায় আদালতের চূড়ান্ত রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ২২ খুনিকে ক্ষমা করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান। এদের মাফ করা ছাড়াও দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আরও এক ভিআইপি আসামির দণ্ড মওকুফ করেছেন তিনি। তাদের এ দণ্ড মওকুফে জেল কোডের বিধানও যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। এমনকি আসামিদের পক্ষ থেকে দণ্ড মওকুফের প্রার্থনা জানিয়ে যেসব আবেদন করা হয়েছে তাও যথাযতভাবে পূরণ করা হয়নি। এ ব্যাপারে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামতও নেয়া হয়নি। এছাড়াও সাংবিধানিক এখতিয়ারের কথা উল্লেখ করে বিভিন্ন মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত আরও ৮৯৭ জন কয়েদির দণ্ড মওকুফ করেছেন রাষ্ট্রপতি। এদের মুক্তির বিষয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। তাদের অধিকাংশই বিভিন্ন আলোচিত হত্যা মামলার আসামি। আবেদন ছাড়া সাজা মওকুফের বিধান না থাকলেও সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর ছেলের সাজা মওকুফ করা হয়েছে জেলকোডের বিধান লঙ্ঘন করেই। রাজনৈতিকভাবে এসব কয়েদির দণ্ড মওকুফের পাশাপাশি বিশেষ ক্ষমার আওতায় আরও এক হাজার কয়েদির দণ্ড মওকুফ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।
ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ঢালাওভাবে এ ধরনের দণ্ড মওকুফের ঘটনা রাষ্ট্রপতিকে এবং তার সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠানকে এরই মধ্যে বিতর্কিত এবং কলুষিত করেছে। এতে করে দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টি এবং সমাজ দিন দিন অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে। আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার ভূলুণ্ঠিত হবে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ন্যায়বিচারের পথ রুদ্ধ হবে।
মহাজোট সরকারের গত আড়াই বছরে রাজনৈতিক মামলার তালিকায় আলোচিত খুনের মামলাসহ দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনে দায়ের করা প্রায় ৭ হাজার মামলা প্রত্যাহার করে এর আসামিদের মুক্তি দিয়েছে সরকার। পাশাপাশি রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক এখতিয়ারকে ব্যবহার করে নাটোরের চাঞ্চল্যকর গামা হত্যা মামলায় ২০ ফাঁসির আসামিকে ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে। আগে ক্ষমা করা হয়েছে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা বিএনপি নেতা ও খ্যাতিমান আইনজীবী আবদুর রাজ্জাকের হত্যাকারী এক ফাঁসির আসামিকে। এছাড়াও আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও জাতীয় সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা
চৌধুরীর ছেলে শাহাদাব আকবর ওরফে লাবুর ১৮ বছরের দণ্ড রাষ্ট্রপতির দফতর থেকে ক্ষমা করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি নিজ ক্ষমতাবলে লাবুর কারাদণ্ডসহ তার আর্থিক জরিমানা পুরোটাই মওকুফ করে দেন। কোনো আসামি কারাগারে না গিয়ে কারাগারকে ব্যবহার করে দণ্ড মওকুফের প্রস্তাব এবং রাষ্ট্রপতি কর্তৃক তা মঞ্জুর করার ঘটনা এটিই প্রথম। সম্প্রতি লক্ষ্মীপুরের জনপ্রিয় আইনজীবী নেতা অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলামকে হত্যাকারী বিপ্লবের মৃত্যুদণ্ডাদেশ মওকুফের ঘটনা গোটা দেশে হৈচৈ ফেলে দিয়েছে।
দণ্ড মওকুফ ও জেলকোডের বিধান : আইন মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দণ্ড মওকুফের বিষয়ে আমার দেশকে বলেন, কারাগারে বন্দি কোনো কয়েদির যে কোনো মেয়াদের দণ্ড মওকুফের বিষয়ে সংবিধান রাষ্ট্রপতিকে এ এখতিয়ার দিয়েছেন। তবে রাষ্ট্রপতির কাছে দণ্ড মওকুফের জন্য কে আবেদন করতে পারবেন, সেটা জেল কোডের বিধান অনুসরণ করে জেল কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ করে দেবেন। যে কোনো কয়েদি ইচ্ছা করলেই রাষ্ট্রপতির কাছে দণ্ড মওকুফের জন্য আবেদন করার সুযোগ নেই। মৃত্যুদণ্ড কিংবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদিদের বিষয়ে কারা কর্তৃপক্ষ তার নিজস্ব পর্যবেক্ষকদের দিয়ে তথ্য সংগ্রহ করবেন। এদের মধ্যে যারা কারাগারে ভালো আচরণ করেছে, যাদের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হচ্ছে এবং বার্ধক্য কিংবা অন্য কোনো কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে নিজ শক্তিতে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ছেন কারা কর্তৃপক্ষ শুধু তাদের মধ্য থেকে নির্বাচিত কয়েকজনের দণ্ড মওকুফের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করার সুযোগ করে দিতে পারেন। নির্ধারিত ফরমে এ আবেদন করতে হয়। এতে কয়েদির বয়স, কারাভোগের মেয়াদ ও বিবরণ, আচরণগত দিক, কারাগারে প্রবেশের তারিখে ওজন এবং আবেদন করার তারিখের ওজনসহ বিভিন্ন বিষয়গুলো উল্লেখ করবে আবেদনকারী। আবেদনকারীর এ আবেদন যাচাই-বাছাই ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে এতে সুপারিশসহ কারা কর্তৃপক্ষ তা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রশাসনিক কর্মকর্তা থেকে মন্ত্রী পর্যন্ত সর্বমোট ৮টি ধাপে এ আবেদন যাচাই-বাছাই শেষে এর আইনগত দিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয়। একইভাবে আইন মন্ত্রণালয়েও ৮টি ধাপে তা যাচাই-বাছাই করা হয়। এসব ধাপ অতিক্রম করে একটি সুপারিশসহ একটি আবেদন রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠাতে কম করে হলেও এক মাস সময় লাগার কথা। আইন মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে যে, গামা হত্যা মামলা, অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম হত্যা মামলার আসামিসহ অন্য আসামিদের দণ্ড মওকুফের আবেদন পর্যালোচনায় এসব রীতি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য : বিশিষ্ট ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ ও সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন আসামির দণ্ড মওকুফকে রাষ্ট্রপতির এখতিয়ার এবং জেল কোডের বিধান উল্লেখ করে বলেন, কোনো আসামিকে দেয়া নিম্ন আদালতের সাজা সর্বোচ্চ আদালতে বহাল থাকলে সেক্ষেত্রেই রাষ্ট্রপতির কাছে দণ্ডিত ওই আসামি উপযুক্ত কারণ ব্যাখ্যা করে দণ্ড মওকুফের প্রার্থনা জানাতে পারেন। জেলকোডের বিধান অনুযায়ী এটাকে ‘ক্ষমা ভিক্ষা’ বলে। জেল কর্তৃপক্ষ তার কেসস্টাডি, তার কারাভোগের বিবরণ, ব্যক্তিগত আচার আচরণ এবং বয়স সবকিছু উল্লেখপূর্বক দণ্ডিত ব্যক্তি ক্ষমার যোগ্য না-কি অযোগ্য তা উল্লেখ করে সুপারিশসহ প্রস্তাব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তা পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা শেষে আইনগত দিক ক্ষতিয়ে দেখার জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করবে। আইনি মতামতসহ আইন মন্ত্রণালয় সেটা পুনরায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তা রাষ্ট্রপতির কাছে প্রেরণ করবে।
বিপ্লবসহ বিভিন্ন আসামির দণ্ড মওকুফ সম্পর্কে সাম্প্রতিক সময়ের বিতর্কিত বিষয়ে খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, আমি যতটুকু জানি রাষ্ট্রপতি কর্তৃক খালাসপ্রাপ্ত কয়েকজন আসামির মামলা এখনও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। আপিল বিভাগে তাদের মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এ অবস্থায় রাষ্ট্রপতি তাদের ক্ষমা করায় মূলত উচ্চ আদালতের প্রতি অনাস্থা সৃষ্টি হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে যে দণ্ডিতরা প্রকৃত অর্থেই অপরাধী। এ কারণেই তারা সর্বোচ্চ আদালতে দণ্ড বহাল থাকবে এটা মনে করেই আদালতে নিষ্পত্তির অপেক্ষা না করে নির্বাহী বিভাগের কর্তৃত্ব প্রয়োগ করিয়ে রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে দণ্ড মওকুফ করিয়েছে। তিনি বলেন, এতে করে উচ্চ আদালতের প্রতি মানুষের আস্থা, বিশ্বাস ও শ্রদ্ধাবোধ কমে যাবে। ভয়ঙ্কর আসামিরা সরকারের আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে থেকে রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে ক্ষমা নেয়ার চেষ্টা করতে থাকবে। খন্দকার মাহবুব বলেন, যে আসামির দণ্ড মওকুফ করা হলো ওই ব্যক্তির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটি সুবিচার ও ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা নিয়ে বছরের পর বছর অপেক্ষা করেছে। রাষ্ট্রপতির এ দণ্ড মওকুফের মাধ্যমে তার সে আশা ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। অনেক সময় অপরাধীরা দণ্ড থেকে রেহাই পেয়ে বেপরোয়া হয়ে যায়। এর প্রমাণ নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলা চেয়ারম্যান ছানাউল্লাহ নুর বাবুকে প্রকাশ্য দিবালোকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা। খন্দকার মাহবুব বলেন, কাজেই রাষ্ট্রপতির দণ্ড মওকুফের ব্যাপারে তার সাংবিধানিক এখতিয়ার প্রয়োগের বিষয়টি আগে ভেবে দেখা উচিত।
প্রথিতযশা ফৌজদারি আইন বিশারদ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট খান সাইফুর রহমান বলেছেন, সর্বোচ্চ আদালতে বিচারাধীন মামলায় নিম্ন আদালত কর্তৃক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির ক্ষমা করে দেয়ার প্রবণতা কোনো সুস্থ সমাজের মানদণ্ড হতে পারে না। সামাজিক ও নৈতিকতা বলে একটা কথা রয়েছে, যেসব আসামির দণ্ড মওকুফ করা হয়েছে দেশে সামাজিক নৈতিকার রেষ থাকলে তাদের ক্ষমা করা সম্ভব হতো না। আমি ভাবছি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে নিয়ে। তাদের ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে। তাদের সে ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ রুদ্ধ হয়ে গেল। এ ধরনের দণ্ড মওকুফের ঘটনা সমাজকে অস্থিতিশীল করে তুলবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট শ. ম রেজাউল করিম বলেন, রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন দেশের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান। দণ্ড মওকুফ বা সাজা হ্রাস করার অধিকার সংবিধান তাকে দিয়েছে। কিন্তু সেই দণ্ড মওকুফ কতটা যুক্তিযুক্ত তা নির্ণয় করে দেয়ারও কর্তব্য স্বরাষ্ট্র এবং আইন মন্ত্রণালয়ের। আমি মনে করি রাজনৈতিক বিবেচনায় কোনো আসামির দণ্ড মওকুফ বাঞ্ছনীয় নয়। এতে রাষ্ট্রপতি পদ ও সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠানটি বিতর্কিত হয়ে পড়ে। কেননা যে লোক খুন হলেন তার পরিবারের সদস্য ও নিকটাত্মীয়দের মনে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে। ন্যায়বিচারের আশা নিয়ে তারাও অপেক্ষায় থাকেন। বাদী বা বিচার প্রার্থীদের অনুভূতির বিষয়ে বিবেচনা করা উচিত। বিপ্লবসহ সাম্প্রতিক সময়ে দণ্ড মওকুফের ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে রাষ্ট্রপতির ওই প্রতিষ্ঠানকে যাতে বিতর্কিত না হয় সেটা সরকারকে ভেবে দেখতে হবে।
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সাবেক ডিআইজি মেজর (অব.) শামসুল হায়দার সিদ্দিকী বলেন, রাষ্ট্রপতিকে এ ক্ষমতা সাংবিধানিকভাবেই দেয়া হয়েছে। সাধারণ মানুষ বা কোনো বিবেকবান জনগণ আশা করে রাষ্ট্রপতি তার ক্ষমতা সঠিকভাবে প্রয়োগ করলে করবেন। যেহেতু এ ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির রয়েছে তাই আমরা আশা করব সেটা সমাজে একটি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে তিনি তা না করুক। মানুষ তা কামনা করে না। শামসুল হায়দার সিদ্দিকী বলেন, যদি এ ক্ষমার ক্ষেত্রে বিবেচনা না করা হয়, তা হলে অন্যান্য খুনি বা বড়মাপের আসামিরা ক্ষমতা প্রয়োগের চেষ্টা করবে। রাজনৈতিক পরিচয়ের অপরাধীরা ক্ষমতা প্রয়োগ করে এভাবে ক্ষমা পাওয়ার পথ অনুসরণ করবে। যে দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন এই প্রতিযোগিতা অব্যাহত থাকলে তার পরিণাম কখনও শুভ হবে না। তিনি বলেন, বর্তমান রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞ এবং সচেতন একজন মানুষ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তার এ ক্ষমা প্রার্থনার বিষয়টি জনমনে কিছুটা হলেও বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। সাবেক কারা কর্মকর্তা শামসুল হায়দার সিদ্দিকী প্রশ্ন তুলে বলেন, বর্তমান রাষ্ট্রপতির স্ত্রী আইভি রহমান হত্যা মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে ভবিষ্যতে কোনো রাষ্ট্রপতি ক্ষমা করে দেন তখন ওনার কি বলার থাকবে?
রাষ্ট্রপতির আলোচিত ক্ষমা : বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্রপতির দফতর থেকে এখন পর্যন্ত তিনটি মামলায় মৃত্যুদণ্ডপাপ্ত ২২ আসামিকে মুক্তি দেয়া হয়েছে। নাটোরো গামা হত্যা মামলায় ২০ জন, জামালপুরে অ্যাডভোকেট আবদুর রাজ্জাক হত্যা মামলায় ১ জন ও লক্ষ্মীপুরে অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম হত্যা মামলায় এক জনকে মুক্তি দেয়া হয়। এর মধ্যে গামা হত্যা মামলার ২০ আসামির মধ্যে ১০ জনকে ঢাকা কেন্দ্র্রীয় কারাগার এবং অন্যদের সংশ্লিষ্ট কারাগার থেকে মুক্তি দেয়া হয়। রাষ্ট্রপতির ক্ষমা করার পর জামিননামা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ওই কারাগারের তত্ত্বাবধায়কের পৌঁছার পর যাচাই-বাছাই করে মুক্তি দেয়া হয়েছে।
গামার ২০ খুনি : ২০০৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি নাটোরের নলডাঙ্গা রামশার কাজিপুর বাজারে সন্ত্রাসীদের গুলি ও চাপাতিতে খুন হন সাবেক উপমন্ত্রী রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর ভাতিজা সাব্বির আহমদ গামা। এ সময় কাজিপুর গ্রামে ৫০টি বাড়িঘরে লুটপাট, ভাংচুর, নারী নির্যাতনসহ অগ্নিসংযোগ করে সন্ত্রাসীরা। এ ঘটনায় গামার বাবা রফিকুল ইসলাম তালুকদার বাদী হয়ে থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এসএম ফিরোজসহ ১৬ জনের নামসহ অজ্ঞাত আরও ১৫-১৬ জনের নামে নলডাঙ্গা থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। পুলিশ তদন্ত শেষে ২১ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করে। পরে উচ্চ পর্যায়ে তদন্তের পর মামলাটি ঢাকার দ্রুতবিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়। ২০০৬ সালের ২৪ আগস্ট ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক ফিরোজ আলম গামা হত্যা মামলার রায়ে ২১ জনকে ফাঁসির আদেশ দেন। আসামিদের আপিলের শুনানির আগেই ২০ আসামি গত বছর ১৫ এপ্রিল কারাগার থেকে আপিল প্রত্যাহার ও প্রেসিডেন্টের কাছে ক্ষমা চেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক আবেদন করে। এই আবেদনের প্রেক্ষিতে গত বছর ২ সেপ্টেম্বর প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমান ২০ আসামির দণ্ড মওকুফ সংক্রান্ত আদেশে স্বাক্ষর করেন। গত বছর ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকা ও রাজশাহী কারাগার থেকে মুক্তি পায় আসামিরা। ২০ জনের মধ্যে তিন সহোদর এসএম ফিরোজ, ফজলুল হক শাহ্ ও ফারুক, আনিসুর রহমান আনসার ও তার দুই ছেলে ফয়সাল ও সেন্টু, শাজাহান, জাহেদুল, বাদল, আ. জলিল ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে এবং জহুরুল শাহ্, সাজ্জাদ, সোহাগ, বাবলু, আবুল, আতাউর, আশরাফ, ফরমাজুল, ফকরউদ্দিন, ওহিদুর রহমান রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক ছিল। এক আসামি শুরু থেকেই পলাতক ছিল। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এ সংক্রান্ত সারসংক্ষেপ আইন মন্ত্রণালয় ঘুরে পাঠানো হয় প্রেসিডেন্টের কাছে। নিয়ম রয়েছে, এ ধরনের কোনো সারসংক্ষেপ প্রেসিডেন্টের কাছে পাঠানো হলে তা নোটিংয়ের মাধ্যমে প্রেসিডেন্টের কাছে উপস্থাপন করা হবে। কিন্তু চাঞ্চল্যকর গামা হত্যা মামলায় ২০ আসামির সাজা মওকুফের ক্ষেত্রে তা অনুসরণ করা হয়নি। ফলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো সারসংক্ষেপটি কীভাবে প্রেসিডেন্টের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে তা সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ের কোনো কর্মকর্তাই জানেন না। প্রেসিডেন্ট সাজা মওকুফ করলে তার একটি আদেশের কপি রাষ্ট্রপতির দফতরে সংরক্ষিত থাকে। কিন্তু গামা হত্যার আসামিদের সাজা মওকুফ সংক্রান্ত কোনো আদেশের কপি সংশ্লিষ্ট অফিসে সংরক্ষণ করা হয়নি। ফলে সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে ধারণা করা হচ্ছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রক্রিয়া করে ফাইল সরাসরি প্রেসিডেন্টের কাছে উপস্থাপিত হয় এবং প্রেসিডেন্ট তাতেই স্বাক্ষর করে দেন। এক্ষেত্রে নিয়মমাফিক প্রক্রিয়াগুলো যথাযথভাবে অনুসরণই করা হয়নি।
নুরুুল ইসলামের ঘাতক : লক্ষ্মীপুরে ১১ বছর আগে স্থানীয় বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম হত্যা মামলায় গডফাদার আবু তাহেরের ছেলে এএইচএম বিপ্লবের মৃত্যুদণ্ড রাষ্ট্রপতি ক্ষমা করায় তীব্র সমালোচনা উঠেছে বিভিন্ন মহলে। আতঙ্কিত এ জনপদের সাধারণ মানুষ। নিহত নুরুল ইসলামের পরিবার এ মৃত্যুদণ্ড মওকুফের বিষয়টিতে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। বিপ্লবের নেতৃত্বে সন্ত্রাসীরা ২০০০ সালে নুরুল ইসলামকে তার বাড়ি থেকে অপহরণ করে হত্যা করে। ঘটনার পর একটি মামলা হলেও তত্কালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তার কোনো অগ্রগতি হয়নি। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতাসীন হওয়ার পর মামলার পুনরায় তদন্তের মাধ্যমে লক্ষ্মীপুরের আলোচিত আওয়ামী লীগ নেতা ও পৌর মেয়র আবু তাহের, তার স্ত্রী ও তিন ছেলেসহ ৩১ জনকে আসামি করে পুলিশ অভিযোগপত্র দেয়। এরপর দ্রুত বিচার আদালতে তাহেরের তিন ছেলেসহ ৫ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয় আদালত। পরে হাইকোর্টেও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের অন্যতম তাহেরের ছেলে বিপ্লবের মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকে। বিপ্লবের মৃত্যুদণ্ডাদেশ মওকুফ সংক্রান্ত একটি চিঠি গত ১২ জুলাই নুরুল ইসলাম হত্যা মামলার বিচারিক আদালত চট্টগ্রাম বিভাগীয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পৌঁছায়। এতে বলা হয়, মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত বন্দির বাবা কর্তৃক ছেলের প্রাণভিক্ষার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য রাষ্ট্রপতি ‘মৃত্যুদণ্ড মওকুফ করা হলো’ লিখে স্বাক্ষর করেছেন। আইন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বিপ্লবের দণ্ড মওকুফের আবেদন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পর্যালোচনা শেষে গত ১০ জুলাই আইন মন্ত্রণালয়ে পৌঁছানো হয়। কোনো ধরনের পর্যালোচনা ছাড়াই কয়েক মিনিটের মধ্যে আইন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অন্ধকারে রেখেই ফাইলটি আইনমন্ত্রীকে দিয়ে অনুমোদন করিয়ে নেয়া হয়। আইনমন্ত্রী এ ফাইলের মতামত নিজে পড়ে দেখারও সুযোগ পাননি বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়।
আইনজীবী খুনের আসামি : জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও আইনজীবী আবদুর রাজ্জাক হত্যা মামলার প্রধান আসামি উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আহসান হাবীব ওরফে টিটু। নয় বছর আগে এক রায়ে আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। সে সময় টিটু ছিল পলাতক। বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর টিটু উচ্চ আদালতে আত্মসমর্পণ ও আপিল করলে উচ্চ আদালত তার মৃত্যুদণ্ড রহিত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। এরপর তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে সাধারণ ক্ষমার আবেদন জানালে তা মঞ্জুর হয়। গত ৯ মার্চ তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান।
আবেদন ছাড়াই দণ্ড মওকুফ : সংসদ উপনেতা ও আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর ছেলে শাহাদাব আকবর ওরফে লাবুর সাজা মওকুফ করা হয়েছে আবেদন ছাড়াই। জরুরি অবস্থার সরকারের সময় চারটি দুর্নীতির মামলায় ১৮ বছর সাজাপ্রাপ্ত শাহাদাব আকবরের সাজা বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর পলাতক অবস্থায়ই মওকুফ করে দেয়া হয়। পলাতক থাকা অবস্থায় আবেদন ছাড়াই দণ্ড মওকুফের ঘটনা এটাই প্রথম বলে দাবি করেছেন আইন মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান ২০০৯ সালে শাহাদাব আকবরের সাজা মওকুফ করেন।
 
Support : Dhumketo ধূমকেতু | NewsCtg.Com | KUTUBDIA @ কুতুবদিয়া | eBlog
Copyright © 2013. News 2 Blog 24 - All Rights Reserved
Template Created by Nejam Kutubi Published by Darianagar Publications
Proudly powered by Dhumketo ধূমকেতু