‘অপরাধ এবং বাংলাদেশের রাজনীতি’

Friday, February 7, 2014

১০ ট্রাক অস্ত্র মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অধিকাংশ আসামি বিরোধী দলের নেতা। এ ইস্যুটিকে গুরুত্ব দিয়ে লন্ডনভিত্তিক প্রভাবশালী সাপ্তাহিক ‘দ্য ইকোনমিস্ট’-এ ‘অপরাধ এবং বাংলাদেশের রাজনীতি’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, নিজ দেশের বিরোধী দলগুলোকে কোণঠাসা করতে যা করা প্রয়োজন, সবই করছে সরকার। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের গণতন্ত্রকে অসুস্থ করার জন্য এ পদক্ষেপগুলোই যথেষ্ট। প্রতিবেদনটির শুরুতে বলা হয়েছে, ১০ ট্রাক অস্ত্র পৌঁছানোর ১০ বছর পর অভিযুক্তরা শাস্তি পেলেন। বছরের পর বছর পার অতিক্রান্ত হলেও এ ইস্যুতে বাংলাদেশের আইনি ব্যবস্থা একরকম থমকে ছিল। অস্ত্র চালানের সঙ্গে জড়িতদের তখন চিহ্নিত করা হয়নি। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও এ সংক্রান্ত অভিযোগ নিয়ে তেমন কোন আগ্রহ দেখাননি। ২০০ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করে ও দোষীদের বিচারের আওতায় আনার ব্যবস্থা নেয়। এ বছরের ৩০শে জানুয়ারি অস্ত্র-পাচারের অভিযুক্ত ১৪ আসামিকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়, যার অধিকাংশই ছিলেন বিরোধী দলের শীর্ষস্থানীয় নেতা। এ অভিযোগে জড়ানো হয়েছে তারেক রহমানের নামও। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর যিনি অস্ত্রের চালানের বিষয়ে আগে থেকেই জানতেন, তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। একে একে জামায়াতে ইসলামীর নেতা মতিউর রহমান নিজামীসহ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নাম তুলে ধরা হয় ওই প্রতিবেদনে। সরকারি দমন-পীড়নে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ও তার সহযোগী জামায়াতে ইসলামী কোন সহিংস আন্দোলনে নামতে পারছে না বলে উল্লেখ করা হয় এতে। অন্যদিকে, একতরফা নির্বাচনে জয় পাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খোশ মেজাজেই রয়েছেন। বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতিতে ভারতও বেশ সন্তুষ্ট। নির্বাচনেও শুধু ভারতের স্বীকৃতি ছিল। জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদের স্বর্গ হিসেবে পরিচিত ভারত বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থান নিয়ে উদ্বিগ্ন। ইসলামের নীতি অনুসরণকারী কোন দলকে ভারত সরকার ক্ষমতায় দেখতে চায় না। বাংলাদেশী অভিবাসীর সংখ্যা কমাতেও বদ্ধপরিকর ভারত। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ সরকারও ভারত সরকারের লক্ষ্যকে কেন্দ্র করেই এগোচ্ছে। সে লক্ষ্যে নিজ দেশের বিরোধী দলগুলোকে কোণঠাসা করতে যা করা প্রয়োজন, তার সবই করছে ক্ষমতাসীন দল। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের গণতন্ত্রকে অসুস্থ করার জন্য এ পদক্ষেপগুলোই যথেষ্ট। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, বাইরে থেকে প্রতীয়মান এ শান্ত অবস্থা কিছু সময়ের জন্য বলবৎ থাকবে।

নগর দর্পণ: চট্টগ্রাম- ‘ফিরিয়ে দাও আমার বারোটি বছর...’ by বিশ্বজিৎ চৌধুরী

Tuesday, February 4, 2014

১০ ট্রাক অস্ত্র আটক মামলার রায় ঘোষণার পর কেন জানি প্রথমেই বদনী মেম্বারের কথা মনে পড়েছিল আমার। বদনী মেম্বার নামে এলাকার মানুষ চেনেন তাঁকে।
আনোয়ারার খোট্টাপাড়া গ্রামে এই নামে এত ব্যাপক তাঁর পরিচিতি, ভালো নাম যে মরিয়ম বেগম, এ কথাই জানেন না অনেকে। গত তিন মেয়াদে খোট্টাপাড়ার নির্বাচিত ইউপি মেম্বার তিনি। তো, অস্ত্র মামলার এত জাঁদরেল সব আসামির নাম ছাপিয়ে তাঁর কথাই বা প্রথমে মনে পড়ল কেন? পড়ল, কারণ এই অস্ত্র মামলার আট নম্বর আসামি ছিলেন তিনি। ১০ ট্রাক মামলায় যেখানে দেশি-বিদেশি চক্রান্ত ও তৎকালীন সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী-আমলাদের হাত রয়েছে বলে তথ্য বেরিয়ে আসছিল, সেখানে এক গ্রাম্য মহিলার নাম জড়িয়ে যাওয়ার ঘটনাটি কৌতূহলী করে তুলেছিল আমাকে। ২০০৫ সালের কোনো এক দিন (তারিখটা মনে নেই) সাংবাদিকসুলভ কৌতূহলে ছুটে গিয়েছিলাম আনোয়ারার খোট্টাপাড়া গ্রামে। সঙ্গে ছিলেন সহকর্মী প্রথম আলোর আনোয়ারা থানা প্রতিনিধি মোহাম্মদ মোরশেদ হোসেন।

বাড়ি চিনতে কোনো অসুবিধা হলো না। গ্রামের মানুষ সবাই চেনেন তাঁর বাড়ি। তাঁকে আড়ালে ‘দস্যু ফুলন’ ডাকা হয় এমন কথা শুনেছি গ্রামের মানুষের কাছেই। এ রকম নামকরণ কেন হলো, তার ঈষৎ নমুনা পেলাম বাড়ির প্রবেশদ্বারে দাঁড়িয়ে। ভেতর থেকে শোনা যাচ্ছিল বদনী মেম্বারের বাজখাঁই গলা। সালিস করতে বসেছেন তিনি। স্ত্রীর ওপর নির্যাতনকারী এক পুরুষকে যেভাবে বাক্যবাণে বিদ্ধ করছিলেন তিনি, তাতে অভিযুক্ত ব্যক্তির অন্তরাত্মা শুকিয়ে যাওয়ার কথা। ঘরের ভেতর প্রবেশ করে দেখলাম, চেয়ারে বসে আছেন বদনী মেম্বার। তাঁর সামনে কাঁচুমাচু বদনে দাঁড়িয়ে আছেন অভিযুক্ত।
তবে নিজের এলাকায় যত দাপুটেই হোক, মরিয়ম বেগম ওরফে বদনী মেম্বার আসলে খুব সাধারণ বাঙালি মুসলমান পরিবারেরই এক নারী। তাই যেখানে ১০ ট্রাক অস্ত্র আটক মামলাকে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বলছেন ‘হাইপ্রোফাইল মামলা’ বা রায় ঘোষণার পর আসামিপক্ষ পাল্টা বলছে ‘হাইপ্রোফাইল পলিটিক্যাল রায়’, সেখানে এই মরিয়ম বেগম কেন আট নম্বর আসামি হলেন, সেটা বড় প্রশ্ন হয়ে আছে অনেকের কাছে।
সেই প্রশ্নটাই আমি করেছিলাম তাঁকে, ‘কেন আপনাকে আসামি করা হয়েছিল?’
খুব অল্পে রেগে যাওয়ার অভ্যাস তাঁর, সেই রাগ সামলে জবাব দিলেন, ‘কেন আবার, আসল দোষীকে আড়াল করতে।’ খুব বিমর্ষ হয়ে মরিয়ম বেগম বললেন, ‘পাঁচ মাস জেল খেটেছি বিনা দোষে। অনেক টাকা খরচ হয়েছে। আমাদের এই পাড়ার লোকজনকে শুধু শুধু আসামি করেছিল। এজাহারে নাম ছিল না। কিন্তু অভিযোগপত্রে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। এখন আল্লা মুক্তি দিয়েছেন। অপবাদ থেকে মুক্তি পেলাম আমরা।’
মরিয়ম বেগমের মতো অপবাদ থেকে মুক্তি পেয়েছেন খোট্টাপাড়ার আরও ১৪ জন মানুষ। ১০ ট্রাক অস্ত্র আটক মামলায় আসামি করা হয়েছিল এ পাড়ার ১৭ জনকে। তাঁদের মধ্যে দুজন মৃত্যুবরণ করেছেন অপবাদের বোঝা মাথায় নিয়েই। দ্বীন মোহাম্মদ নামের একজনের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। বাকি ১৪ জন বেকসুর খালাস।
বিচারের রায়ে খালাস পেয়ে কেউ ছুটছেন মাজার জিয়ারত করতে, কেউ বা মিলাদ-মাহফিলের আয়োজন করেছেন বাড়িতে। এই মানুষগুলোর জীবনের ১০টি বছর কেটেছে মামলার বোঝা কাঁধে নিয়ে। ভুক্তভোগী ছাড়া আর কেউ হয়তো জানবে না কী দুঃসহ সেই কষ্টের বোঝা! খোট্টাপাড়ার মানুষের ব্যবসা-বাণিজ্য ছিল গ্রামসংলগ্ন সিইউএফএল ঘাটকে ঘিরে। কেউ ঠিকাদারি, কেউ পরিবহন কেউ বা এমনকি কুলি-কামিনের কাজও করতেন।
খোট্টাপাড়ার মানুষের আর কোনো অপরাধ কি ছিল না? ছিল। বন্দরসংলগ্ন এলাকা বলে এখানে ছোটখাটো কিছু চোরাচালানোর ঘটনা ঘটত প্রায়ই। জাহাজ থেকে বিদেশি সিগারেট, টেলিভিশন বা এ রকম কিছু পণ্যের অবৈধ বিকিকিনি চলত। স্থানীয় পুলিশও অবহিত ছিল। খুব সম্ভবত নিয়মিত বখরা পেয়ে চুপচাপ থাকত তারাও। এমনকি বদনী মেম্বারেরও এসব বিষয়ে প্রশ্রয় ছিল বলে লোকমুখে জেনেছিলাম তখন। ধারণা করি, এসব ‘দুর্বলতাকে’ই কাজে লাগিয়েছিল তৎকালীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সিইউএফএল ঘাটে অস্ত্র আটকের সেই ‘বিরাট কর্মযজ্ঞের’ দায় চাপানো হয়েছিল এই চুনোপুঁটিদের কাঁধে।
খোট্টাপাড়ার কথা তো গেল। এই অস্ত্র মামলার আসামি পুলিশের দুই সদস্যের কাহিনি আরও করুণ। বলতে গেলে পুলিশের এই দুই সার্জেন্ট হেলাল উদ্দিন ও আলাউদ্দিনের সাহসিকতা ও দায়িত্বশীলতার কারণেই উদ্ধার হয়েছিল ১০ ট্রাক অস্ত্রের চালানটি।
এপ্রিল মাসে কয়লা ডিপো পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ছিলেন হেলাল উদ্দিন। ওই একই সময়ে সার্জেন্ট আলাউদ্দিন ছিলেন বন্দর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ। ১০ ট্রাক অস্ত্র আটকের রাতে এই দুই পুলিশ কর্মকর্তা সিইউএফএল ঘাটে ছুটে যান। ঘটনাস্থল থেকে বেতার মাধ্যমে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে অস্ত্রের ব্যাপারে খবর দেন। তাঁদের দেওয়া খবরের ভিত্তিতেই ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছান পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। ভেবেছিলেন পেশাগত দায়িত্ব পালনে এই সাহস ও সততার জন্য পুরস্কৃত হবেন তাঁরা। কিন্তু পুরো ব্যাপারটি হঠাৎ এমন উল্টো দিকে মোড় নেবে কল্পনাও করতে পারেননি তাঁরা। অস্ত্র আটকের পর যে পাঁচজনকে ঘটনাস্থল থেকে আটক করা হয়েছিল তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশে, তাঁদের তো ছেড়ে দেওয়া হলোই, উপরন্তু খড়্গ নেমে এল সাহসী দুই পুলিশ কর্মকর্তার ওপর।
১০ ট্রাক অস্ত্র থেকে দুটি একে-৪৭ রাইফেল খোয়া গেছে এবং সেগুলো এই দুই কর্মকর্তা চুরি করে বিক্রি করেছেন এই অভিযোগে নির্মম অত্যাচার চালানো হয় তাঁদের ওপর। পিটিয়ে পা ভেঙে দেওয়া হয়েছে সার্জেন্ট হেলালের। দুর্ধর্ষ আসামির মতো পায়ে ডান্ডা বেড়ি পরিয়ে তাঁকে হাজির করা হয়েছিল আদালতে। দুই বছর চার মাস কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কাটাতে হয়েছে তাঁকে। একই ধরনের অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন সার্জেন্ট আলাউদ্দিনও। অথচ সরকার পরিবর্তনের পর অপরাধ তদন্ত বিভাগের রিপোর্টে দেখা যায়, ১০ ট্রাক অস্ত্রের মধ্যে কোনো একে-৪৭ রাইফেলই ছিল না। ২০০৫ থেকে ২০১১ সালের ৮ আগস্ট পর্যন্ত দুর্বিষহ জীবন কাটিয়েছে হেলালের পরিবার। হেলালের মা-বাবা দুজনই স্কুলশিক্ষক। সেই শিক্ষক দম্পতির ছেলে হেলালের ছবি পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল অপরাধী হিসেবে।
হেলাল উদ্দিন ও আলাউদ্দিন চাকরি ফিরে পেয়েছেন। কিন্তু কে ফিরিয়ে দেবে তাঁদের হারানো সময়? সার্জেন্ট আলাউদ্দিন যেমন পত্রিকান্তরে বলেছেন, ‘সব মানুষের কাজের একটি পিক টাইম থাকে। আমি তো জীবনের সেই সময় হারিয়ে ফেলেছি। এখন আমি বৃদ্ধ। ছয় বছর শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার শেষে নতুন জীবন পেয়েছি বটে, তবে সে জীবনের কোনো স্বাদ নেই। আমার পুরো জীবন এলোমেলো হয়ে গেছে। সামাজিক জীবনে আমি আর আমার পরিবার ঘৃণা ছাড়া আর কিছুই পাইনি। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আমার জীবনটা তছনছ হয়ে গেল।’
আজ বদনী মেম্বার, খোট্টাপাড়ার খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষগুলো আর দুই দায়িত্ববান পুলিশ কর্মকর্তার মনেও
হয়তো ঘুরছে সুচিত্রা সেনের সেই সংলাপ ‘ফিরিয়ে দাও আমার বারোটি বছর...’। তাঁদের জীবনের সোনালি সময়গুলো কে ফিরিয়ে দেবে?
মামলা, তদন্ত, বিচার-প্রক্রিয়ায় যত দিন ‘ওপর মহলের’ হাত থাকবে, তত দিন এই অবস্থা থেকে মুক্তি মিলবে না আমাদের। তত দিন দেশের কোনো না কোনো প্রান্তে কোনো না কোনো নির্দোষ ব্যক্তির বুক ভেঙে নেমে আসবে এ রকম হূদয়-নিংড়ানো দীর্ঘশ্বাস!

বিশ্বজিৎ চৌধুরী: কবি, লেখক ও সাংবাদিক।
bishwabd@yahoo.com

প্রসঙ্গ: মানবাধিকার by মনির হায়দার

Wednesday, January 22, 2014

ব্যাপারটা খুবই অনুচিত। কেবল অনুচিত নয়, কিছুটা অমানবিকও বটে। আমরা এতটা অকৃতজ্ঞ কেন? অবশ্যই আমাদের কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত। একটুখানি নয়, অনেকখানি।
এমনিতেই বাঙালির কৃতজ্ঞতাবোধ নিয়ে নানা কথা আছে। অনুযোগপ্রিয় জাতি হিসেবেও বেশ বদনাম আছে। প্রজাকুল তথা সাধারণ মানুষের এসব দোষ-ত্রুটির কথা রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন জনসেবকগণ হরহামেশাই টের পান। তাদেরও তো ধৈর্যের একটা সীমা আছে। এত সমালোচনা আর বিরোধিতা সহ্য করার মুচলেকা দিয়ে তো তারা মসনদে বসেননি। তাদের কর্মকাণ্ড কারও পছন্দ না হলে চোখ বন্ধ রাখলেই পারেন। জনসেবকদের কথাবার্তা কারও ভাল না লাগলে কানে দিতে পারেন তুলো। তাই বলে অধিকারের অজুহাতে সেবকদের সমালোচনায় এত মুখর হতে হবে কেন?

দেশবাসীর সুখ-শান্তি আর উন্নতির জন্য আমাদের খাদেমগণ তো কম চেষ্টা করছেন না। দিন-রাত কি অক্লান্ত পরিশ্রমই না তারা করে চলেছেন। শুধু কি কাজ? কণ্ঠকেও কোন বিশ্রাম দিচ্ছেন না বেচারারা। জনতার উদ্দেশে বিরামহীনভাবে বলে চলেছেন নানা রকম টক-ঝাল-মিষ্টি কথা। তাতে বিশেষ উপকার হচ্ছে সংবাদ মাধ্যমগুলোরও। তুলনামূলক অল্প চেষ্টাতেই মিলে যাচ্ছে দারুণ সব খবর। প্রজাকুলও সহজেই জানতে পারছে জনসেবকদের নানা রকম বৈচিত্র্যময় ভাবনা ও স্বপ্ন-কল্পনার সমৃদ্ধ সম্ভার সম্পর্কে। সুতরাং জনসাধারণের কাছ থেকে কৃতজ্ঞতা ছাড়া অন্য কিছুই কাম্য হতে পারে না।
রাষ্ট্রীয় কোষাগারের খরচ বাঁচাতে এবং ভোটারদের ভোগান্তির হাত থেকে রেহাই দিতে আমাদের শাসক মহল তাদের সর্বোচ্চ আন্তরিকতার প্রমাণ রেখেছে গত ৫ই জানুয়ারির ভোটকাণ্ডে। ১৫৩ আসনের ভোটারদের তো ঘর থেকে বের হওয়ার কষ্টটুকুও করতে হয়নি। সম্পূর্ণ বিনা পরিশ্রমে এসব নির্বাচনী এলাকার জনগণ পেয়ে গেছেন এক-একজন প্রভাবশালী এমপি। বাকি ১৪৭ আসনেরও বেশির ভাগ ভোটার ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার কষ্ট থেকে বেঁচে যান সরকার মহাশয়ের বদান্যতায়। এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের খরচ বাঁচানো কিংবা ভোটারকুলকে কষ্টের হাত থেকে রক্ষা করাই শুধু নয়, বরং অভিনব এ রাজনৈতিক চমকের মধ্য দিয়ে জাতি হিসেবে আমরা অনেকগুলো বিশ্বরেকর্ড অর্জনেও সক্ষম হয়েছি। সুতরাং এমন একটি জনদরদি শাসককুলের প্রতি অকাতরে কৃতজ্ঞতাই কেবল জানানো যায়।
দেশবাসীর নিরাপত্তা এবং আরাম-নিদ্রার জন্যও কি আমাদের রাজন্যবর্গের চেষ্টার কোন কমতি আছে? শহরে-গ্রামে সহিংসতা দমনের জন্য নেয়া হয়েছে কঠোর ব্যবস্থা। দেশীয় পুলিশ, বিজিবি ও র‌্যাবের সমন্বয়ে গঠন করা হয়েছে যৌথবাহিনী। এ বাহিনীর সুপ্রশিক্ষিত সদস্যরা রাতের ঘুটঘুটে আঁধার চিরে সহিংসতাকারীর খোঁজে চষে বেড়াচ্ছেন শহর-বন্দর-গ্রাম। কোথাও কোন সহিংসতাকারীর টিকি দৃশ্যমান হওয়া মাত্রই গর্জে উঠছে যৌথবাহিনীর রাইফেল। মুহূর্তেই এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে যাচ্ছে শত্রুর শরীর। আর বন্দুকযুদ্ধের গল্প তো সবারই জানা। সব যুদ্ধই জনগণকে দেখিয়ে করতে হবে এমন কোন কথা নেই। গুলির শব্দ শোনা গেলেই তো হলো। বাঙালির এ আরেক সমস্যা। সব কিছু নিজের চোখে দেখতে চায়। কিন্তু সব ক্ষেত্রেই কি তা সম্ভব? কোন হামলা মামলার প্রধান আসামি কিংবা অন্য আসামিদের লাশ কোথাও পাওয়া গেলে কিংবা আদৌ না পাওয়া গেলে সেটার সঙ্গে মানবাধিকারের কি সম্পর্ক? সীতাকুণ্ডের গ্রামে ১৪ বছর বয়েসী কিশোরের লাশ পাওয়া নিয়ে এত হইচইয়ের কি আছে? বয়সটাই বড় বিবেচ্য! সে তো শিবিরকর্মী। মানবাধিকারের অজুহাতে তাকেও ছেড়ে দিতে হবে? শিবির মানেই যে জঙ্গি, তা কি কারও অজানা আছে? রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে সড়ক-অবরোধের মতো গুরুতর অপরাধ কি ক্ষমা করা যায়? এ ধরনের অপরাধীরা যদি যৌথবাহিনীর হাতে ধরা না দেয়, তাহলে তাদের স্ত্রী-সন্তান কিংবা পিতা-মাতাকে আটক করে কারাগারে পাঠানো কি অন্যায়? তাদের ঘরবাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়ার মধ্যে মানবতার বিসর্জন কোথায়? এসবই ফালতু কথা। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ টাইপের কিছু ভুঁইফোড় সংগঠনের ভূমিকাও খুবই বিরক্তিকর। কয়েক দিন পরপরই অদ্ভুত ধরনের সব মানবাধিকার রিপোর্ট প্রকাশের মাধ্যমে এ দেশের সহজ-সরল মানুষকে বিভ্রান্ত করার অপপ্রয়াস চালায়। আমাদের উচিত সমস্বরে এসব কাজের নিন্দা জানানো। কেবল মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান একাই হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সমালোচনা করবেন, তার কি এতই দায় ঠেকেছে? সরকারের ইমেজ রক্ষার চেষ্টায় এমনিতেই শুদ্ধভাষী এই বেচারাকে দিন-রাত মহাব্যস্ত থাকতে হয়। এসব মহৎ কাজে প্রজাকুলেরও দায়-দায়িত্ব গ্রহণ করা উচিত। জনগণের প্রতি সরকার বাহাদুর যথেষ্ট দয়াশীল বলেই তো দেশের বেশির ভাগ মানুষ এখনও বেঁচে আছে। সকাল-দুপুর-রাতে খাওয়া-দাওয়া করছে, শঙ্কা-আতঙ্কের মধ্যেও বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
মতপ্রকাশের অধিকার নিয়েও আজকাল কিছু লোকের চেঁচামেচি ক্রমেই সহ্যের সীমা ছাড়াচ্ছে। সদাশয় সরকার মতপ্রকাশের জন্যই তো এতগুলো টিভি চ্যানেলের লাইসেন্স দিয়েছে। তাতে সবার মত সমানভাবে প্রকাশ করতে হবে এমন কোন কথা নেই। ক্ষমতাসীনদের মতটা ঠিকমতো প্রকাশের ক্ষেত্রে তো কেউ অবহেলা করছে না। তাহলে আর এতে কথা কেন? এখনও তো সব টিভিতেই টকশো হচ্ছে। সব সময়ই দর্শকদের চাহিদা বা পছন্দ অনুযায়ী অতিথি-আলোচক আনতে হবে এমনকি কোন দাসখত দেয়া হয়েছে? বশ্যতা মানতে না চাওয়ার কারণে দু’-চারটি টিভি চ্যানেল কিংবা সংবাদপত্র বন্ধ করে দেয়া হলে তাতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হলো কোথায়? খামোখা এসব মৌলিক অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কিংবা মানবাধিকারের ধুয়া তুলে সরকারের ইচ্ছাপূরণের পথে অন্তরায় সৃষ্টির চেষ্টা কি বরদাশত করা ঠিক?
 
Support : Dhumketo ধূমকেতু | NewsCtg.Com | KUTUBDIA @ কুতুবদিয়া | eBlog
Copyright © 2013. News 2 Blog 24 - All Rights Reserved
Template Created by Nejam Kutubi Published by Darianagar Publications
Proudly powered by Dhumketo ধূমকেতু